#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৮
মিঠাপুকুরের আর পাঁচ দশটা সকালের চেয়ে আজকে সকালটা ভিন্ন। বেলা তো হচ্ছে তবে সূর্য এখনো উঁকি দিতে পারেনি। আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে। মাঝরাত থেকে মিহি দানায় গুঁড়ি গুঁড়ি অবিরাম বৃষ্টি, পড়ছে তো পড়ছে।
পাকা ঘরে সেই বৃষ্টির গান বাজে না, তবে এই যে গায়ে শীত শীত একটা আমেজ, এই আমেজটাই বৃষ্টির স্বাদ ঠিক বুঝিয়ে দেয়। আর এই আমেজেই এরশাদের শেষ রাতের ঘুমটুকু গাঢ় হয়েছে। অবশ্য বলতে গেলে এখন প্রায় প্রতিদিন’ই ঠিকঠাক ঘুম হচ্ছে।
রাতে সে ঘুমোতে পারে না। ঘুমোলেই চোখের সামনে ভাসে শুধু রক্ত আর রক্ত। কত রাত গেছে নির্ঘুম। নির্ঘুম থাকতে থাকতে শুষ্ক চোখেরা শেষ রাতে ক্লান্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ে। সেই লুটিয়ে পড়াও কিছুক্ষণের। তার পরেই ভয়ংকর এক আতঙ্ক নিয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে, গলা শুকিয়ে আসে। চোখের সামনে ভাসতে থাকে বাবা, মায়ের মুখটা। যেই মুখ দেহ থেকে বিছিন্ন হয়ে আছে, চোখ দুটো খোলা। সেই শান্ত চোখ দু’টোতে দেখে কষ্ট, মৃত্যুর যন্ত্রনা। তখন তার অস্থির শুরু হয়, আর হলেই সবাইকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে।
আর এই অস্থির মাখা রাতের পর রাত গেছে এই যে চার দেয়াল, এই দেয়ালের মাঝে ছটফট করতে করতে। আর সেই করার যখন সে অভ্যস্ত, তখন একটা জাদুর ছোঁয়া। সেই ছোঁয়ায় অনেক দিন পরে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুমিয়ে গেছে। গাঢ় ঘুম! যেই ঘুমে আতঙ্ক নেই, ভয় নেই, জ্বলে যাওয়ার যন্ত্রনা নেই। সেই রাতটা ছিল যেদিন পৃথিলা মিঠাপুকুরে পা রেখেছে। নৌকা থেকে পানিতে পড়লো। সাঁতার জানে না, তার মধ্যে হঠাৎ এক ধাক্কায় পড়েছে। ভয়, আতঙ্ক, কাপড় সব মিলিয়ে তখন সে হুটোপুঁটি খাচ্ছে। সে টেনে বুকে জড়িয়ে নদীর পাড়ে নিলো। তখনো একটা হাত তার বুকে। বুকের শার্টটা শক্ত মুঠো করে ধরা। ধরেই হাতে মধ্যে শুয়ে থরথর করে কাঁপচ্ছে।
তখনই কিছু একটা হলো। সেই থরথর করে কাঁপা যেন তার শরীরের প্রতিটা কোণায় কোণায় পৌঁচ্ছে গেলো। আর সেই দিন থেকেই তার হারিয়ে যাওয়া শান্তির ঘুম অনেক দিন পরে চোখে এসে জমা হলো। এত ঝামেলায় কেউ খেয়ালই করেনি, এরশাদ সেদিন কত বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। ঘুম থেকে উঠেছে একেবারে তার দাদির সালিশের ঝংকারে।
তার এই অভিশপ্ত কলঙ্ক মাখা জীবনে কাউকে জড়াতে চায়নি। কোন মেয়েকে দেখে জড়াতে ইচ্ছেও হয়নি। তার জীবনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল। সেই বাকি দু’তিনজনকে খুঁজে বের করা। তাদের সামনে তাদের প্রিয় মানুষকে খুন করে যেই যন্ত্রনা দিয়েছে। সেই যন্ত্রনা তাদের চোখেও দেখা। তারপরে তার যা খুশি হোক আর আফসোস নেই। এমনিতেও প্রতিদিন মরে সে। তবে সেই মৃত শরীরকে অদৃশ্য এক মোহে হুট করেই এই মেয়ে তাকে জড়িয়ে ফেলেছে। এই জড়িয়ে ফেলায় অচেনা এক তৃষ্ণায় কাতর হলো। সেই তৃষ্ণা তার কমে না, বরং সেকেন্ডে সেকেন্ডে বেড়েছে। তাই তো আগে ঘুমের জন্য ছটফট করেছে, আর এখন এই মেয়ের জন্য করে। এই মেয়ে তাকে চম্বুকের মতো টানে। এই যে ঘুম ভেঙেছে, ভাঙতেই অদৃশ্য এক জাদুতে টানছে তো টানছে।
এরশাদ ঝট করেই উঠে বসলো। তার রুমটা ছোট, ছোট একটা জানালা। বাড়ির একেবারে পেছনের কোণায়। আলো আসে না বললেই চলে। তার মধ্যে আজকে সূর্য উঠেনি, পুরোই অন্ধকার। এই অন্ধকার ভরা রুমটা সে নিজ ইচ্ছায় নিয়েছে। আলো তো চোখে বাজে, যদি এই অন্ধকার একটু শান্তি দিতে পারে। আর সেই অন্ধকারে বসেই এরশাদ ঠোঁটে সিগারেট রাখলো। আগুন জ্বালিয়ে কয়েকটা টান দিলো।
রুম বদলাতে হবে তার। পৃথিলার খোলামেলা রুম পছন্দ, আলো পছন্দ, মৃদু বাতাস পছন্দ, আকাশ পছন্দ, খোলা জানালা পছন্দ। সেই জানালায় চাঁদের আলো পছন্দ, এই যে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, এই বৃষ্টিও পছন্দ।
আর এতো সব ভাবতে ভাবতেই এরশাদ ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। তার সকালগুলো পৃথিলা নামক মেয়েটিকে দিয়ে শুরু হবে কবে? সে সময় দিতে চাইছে, আবার অধৈর্য নিজেই হচ্ছে। এই অধৈর্যের বাঁধ টিকিয়ে রাখবে কী করে?
এরশাদ চিন্তিত ভাবেই হাতের মুঠোর সিগারেট নিয়ে নিচে নামলো। নেমে নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। জয়তুন সব সময়ের মতো বসার ঘরে বসা। সে নিশ্চুপ তাকিয়ে দেখলো। আর দেখে হাতের সাইডে তার প্রিয় পানের পাতাটা রেগে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। আম্বিয়া দেখলো, দেখে মুখ বাঁকিয়ে হাসলো।
পৃথিলা সকালের খাবার খেলো স্বাভাবিক ভাবে। খেয়ে স্বাভাবিক ভাবেই ওষুধ খেলো। সেইদিন লাইব্রেরি থেকে দুটো বই নিয়েছিল। আর হাত দেওয়া হয়নি। এমন আবহাওয়ায় ঘরবন্দি মানুষের বইয়ের চেয়ে ভালো অপশন আর কী হতে পারে! তবে কোথায় রেখেছে, মনে করতে পারলো না। ফেরার সময় ভ্যানে এমন কাণ্ড হলো। সেই কাহিনীর মাঝে বই মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তাই নিজের মতো ব্যাগে খুঁজে দেখতে লাগলো।
সাবিহা সবই দেখলো। খাবার খেয়েছে, সে খুশি। তবে এই স্বাভাবিক ব্যবহার তার হজম হচ্ছে না। তবে জিজ্ঞেস করবে, সেই ইচ্ছেও হলো না। থাক না নিজের মতো। তবে তাকে অবাক করে পৃথিলা খুঁজতে খুঁজতেই শান্ত ভাবে বলল,– টেবিলের ওপর একটা কাগজ আছে, পড়ে দেখ।
সাবিহা ভ্রু কুঁচকে টেবিলের দিকে তাকালো। সাথে সাথেই এগিয়ে গিয়ে কাগজটা হাতে নিলো। নিয়ে চোখ বোলাতেই বিস্ময় চোখে তাকালো। তার মাথায় ভালো মন্দ কিছুই এলো না। তবে এই ছেলে হচ্ছে জন্মগত ফাজিল! ফাজিল না হলে, কাউকে এমন ভাবে চিঠি লিখে? যেমন হাতে লেখা, তেমনি বাক্যের ছিঁড়ি, ছিঃ!
পৃথিলা সাবিহার চেহারা দেখলো। মুখটা মলিন, সেই মলিন মুখেই মৃদু হাসলো। হেসে বলল, — কী বুঝলি?
— কী বুঝবো! সাহায্য চেয়েছিস, তাই নিজ স্বার্থে’ই সাহায্য করছে। তা না হলে সেধে সাহায্য করবে এমন ব্যক্তি সারেং বাড়িতে নেই।
— না।
— কিসের না?
— তারা পথের কাঁটা সরাতে চাইছে না, বরং চিরতরে শেষ করতে চাইছে।
— মানে?
— ভাইয়ের সাথে ঝামেলা চায় না। তাই কাউকে বলতে নিষেধ করতেই পারে। তবে বিশেষভাবে তোদের নাম উল্লেখ করেছে। কেন করেছে জানিস? আমি বাইরে কাউকেই বলতে যাবো না। যদি বলি, সেটা তোদের। আর তোদের বলা মানে সাক্ষী থাকা। ধর আমি চলে গেলাম, নিজ ইচ্ছায়’ই গেলাম। তারা জানে এরশাদ আমাকে খুঁজে বের করবে। দুনিয়া এফোঁর ওফোঁড় করে হলেও করবে। তো তারা ঝুঁকি নেবে কেন? তাই যেহেতু কাউকে কিছুই বলিনি, হঠাৎ গায়েব হলে, এতো মানুষের মাঝে এরশাদ আঙুল উঠাবে কার দিকে? আর উঠলেও সবার আগে উঠবে তোদের উপর। কেননা থাকছি তো এখানেই। তোরা কিছুই জানিস না। তো সে আর তার দাদি অনায়াসেই ধরা ছোঁয়ার বাইরে। খুব সুন্দর করে তোদের ফাসিয়েও দেবে। ভাই রইল, ঝামেলা গেলো। কাহিনী খতম।
সাবিহা হা হয়ে গেলো। হা হয়ে বলল, — তুই এক্ষুনি এই চিঠিটা এরশাদ ভাইকে দেখা। সব ওই বুড়ির কারসাজি। সে সাপ মারবে, লাঠিও ভাঙবে না। এই বুড়ি দুনিয়ার শেয়ানা। এরশাদ ভাইও জানুক তারা কী করছে।
— না।
— কেন?
— আমি এর শেষ দেখতে চাই।
— মাথা গেছে তোর? এরা তোকে শেষ করতে চাইছে!
— করুক।
— নিজের প্রতি রহম কর পৃথিলা। এরা তোকে বাঁচতে দেবে না।
— তো? এখানেও বুঝি আমি বেঁচে থাকবো? এখানে থাকলেও আমি মরবো, তবে ধুকে ধুকে। প্রথমে পৃথিলার রুহ্, তারপর অহম, তারপর সম্মান। আর এই মৃত্যুর চেয়ে ঐটা আমার কাছে খুব ভালো। তবে বিনা অপরাধে শাস্তি পাচ্ছি, কিছুটা শাস্তি সারেং বাড়িও পাবে।
সাবিহার কথা আসে না। কি বলে এই মেয়ে?
পৃথিলা বই পেয়েছে। ব্যাগেই ছিল, আর বের করা হয়নি। তাই নিয়ে জানালার পাশে বসলো। বসতেই ঐ যে সারেং বাড়ি আর এই বাড়ির সেতু, চিকন গলিটা। তার একটা গাছের পাশে, বৃষ্টিতে নীল রঙা শার্টে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। কে সে, পৃথিলা জানে। এই কয়দিনে এতটুকু ঠিক চিনে গেছে।
পৃথিলা চোখ ফিরিয়ে নিলো। সে ভালো করেই জানে তাদের কোন কথা সেই পর্যন্ত যাবে না। তাই বইয়ে মনোযোগ দিতে দিতে বলল, — চিঠিটা যত্ন করে তুলে রাখ সাবিহা। দূর্বল মানুষের মুখের কথার দাম কই? তবে আমি যখন চলে যাবো, এই চিঠিটা সারেং বাড়ির বড় নাতির হাতে দিবি। সুন্দর করে নিজের হাতে’ই দিবি।
সাবিহা হতভম্ব। হতভম্ব হয়েই বলল,– এরশাদ ভাই সব ধ্বংস করে ফেলবে।
পৃথিলা উত্তর দিলো না। মুখের হাবভাবেরও তেমন পরির্বতন হলো না।তবে বইয়ে চোখ রেখেই আস্তে করে জানালার কপাটটা দিয়ে দিলো। এরশাদ সেই বন্ধ কপাটের দিকে তবুও আগের মতো’ই তাকিয়ে রইল। তাকিয়ে সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে হাত দিয়ে তাদের লোকদের একজনকে এদিকে আসার ইশারা দিলো। দেওয়ার সাথে সাথে এগিয়ে এলো। আর আসতেই বলল,– গিয়ে দেখতো, খেয়েছে কি না।
লোকটা সাথে সাথে সাবিহার ঘরের দিকে গেলো। ফিরে এলো কিছু সময়ের মাঝেই। এসে বলল,– খাইছে ভাই।
সিগারেটের আগুনে পোড়া কালচে ঠোঁট দুটোয় হাসিরা ছুঁয়ে গেলো। সেই হাসির ছোঁয়া নিয়ে আর বাড়ির ভেতরে গেলো না, বাইরের দিকে এগুলো। চেয়ারম্যানের সাথে তাদের আলাদা ঝামেলা নেই। ইমরান তাদের সব জায়গা জমির হিসাব দেখে। তাই ইমরান জানালো, চেয়ারম্যান নাকি নদীর পাড়ে জায়গা নিয়ে ঝামেলা করছে। কিসের কাগজপত্র নাকি বের করছে। সেই জমি নাকি তাদের। সারেং বাড়ির মানুষেরা জোর করে ভোগ করছে। যদি ভালোয় ভালোয় জমি বুঝিয়ে দেয় ভালো। তা না হলে আঙুল বাঁকা করবে।
আঙুল বাঁকা নিয়ে এরশাদকে চিন্তিত দেখা গেলো না। এই জমি তাদের’ই। এক দাগের জায়গা। তার মধ্যে কয়েটা শুধু আজিজ চাচার আর চেয়ারম্যানের। তো পায়ে পাড়া দিয়ে হঠাৎ করে এমন ঝামেলার মানে কী?
—-
আয়না খাবার ঘর থেকে বেরুতেই দেখলো বসার ঘরে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে। জয়তুন আরার সাথে কিছু নিয়ে কথা বলছে। এই লোককে সে চেনে। আজিজ চাচার লোক। তার সাথেই সব সময় থাকে।
সে বেরুতেই তার দিকে তাকালো। তাকিয়ে হেসে বললো, — ভালো আছেন?
আয়না সাথে সাথে মাথা দোলালো। জয়তুন দেখে বলল, — নয়া বউ বীণার জুতা, আর ব্লাউজের মাপটা নিয়ে আসো তো। আজিজের বউ নাকি পাঠাইছে। তার বড় পুতের বউ সব নাকি শহর থেকে কিনবে। তাই মাপ চায়। ঢং দেখে আর বাঁচি না। আমাগো সদরে জিনিসের অভাব আছে। শ্বশুর শাশুড়ির খবর নাই, জামাই নিয়া দিছে উড়াল। এখন দেবরের বউ নিয়া আদিখ্যেতা। যাও তাড়াতাড়ি আইনা দেও। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাকি রওনা দেবো।
আয়না বীণার রুমের দিকে গেলো। অনেক দিন পরে তার ঘর থেকে গুনগুন করে পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। শুনতে ভালো লাগছে। এই বিয়ে নিয়ে ফরহাদ ভাইয়ের যেমন মাথা ব্যথা নেই, বীণারও নেই। একজন বাপের নেওটা আরেকজন লেখাপড়ার। বিয়ে পরে কি হবে আল্লাহ’ই জানে।
তাই আয়না এগিয়ে গেলো। বীণাকে অবশ্য জ্বালালো না। নিজেই এক জোড়ে জুতা নিলো,আলনা থেকে ব্লাউজ নিলো। কালকে পড়বে বলে আম্বিয়াবু সব বের করেছিল। এখনো গুছানো হয়নি। বীণাও ধরে নি! আম্বিয়াবু আবার রাগে গজ গজ করবে। তাই সেখান থেকেই একটা নিলো। বীণা পড়তে পড়তে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কাহিনী কি?”
আয়না ঠোঁট টিপে হেসে বলল,– চুরি করি।
বীণাও হাত তুলে ইশারা দিলো। নিয়ে যাও! পারলে সব নিয়ে যাও।
আয়না হেসেই একটা ব্যাগে ভরলো। ভরে বেরিয়ে এলো। এসে এগিয়ে দেবে তার আগেই লোকটা দু’কদম এগুলো। এগিয়ে হেসে হাত বাড়ালো। আয়না অবশ্য বুঝেনি, এই দু’কদমে জয়তুনের চোখের আড়াল হয়েছে। তাই ব্যাগ দিতে গিয়ে’ই একটু চমকালো। কেননা ব্যাগ নেওয়ার সাথে সাথে’ই ছোট্ট একটা কাগজ তার হাতে গুজা হয়েছে। আর বুঝতেই সাথে সাথে’ই নিজেকে সামলে নিলো।
জয়তুন দেখে বিরক্ত মাখা কণ্ঠে বললো, — এমন গায়ের উপরে উঠে যাচ্ছিস কেন রে হারামজাদা। সর আমার নাত বউয়ের সামনে থেকে।
লোকটা জ্বিহা কেটে কানে হাত দিয়ে সাথে সাথেই দূরে চলে গেলো। যেতে যেতে বলল,– কি যে কন আম্মা। আপনের নাত বউ, আমাগো মা জননী। মায়ের কষ্ট হবে তাই এগিয়ে গেছি।
— হ, হ জানা আছে তগো মা জননী। যা ভাগ।
লোকটা হেসেই বেড়িয়ে গেলো। আয়না আগের মতোই দাঁড়িয়ে বলল,– আপনার কিছু লাগবে দাদি?
— না! শাহবাজ কই?
— ঘুমে।
— কয়ডা বাজে এহন? আরেকটু পরে তো যোহরের আজান পড়বো।
আয়না উত্তর দিলো না। কালকে সে ঘুমিয়েছে আগে। এখন তো আর দরজায় খিল দেয় না। তাই জানে না শাহবাজ কখন এসেছে। কাল মেহমান যাওয়ার পর ইচ্ছেমত গোসল করলো। করে কয়টা খেলো। নিজের হাতেই খেলো। খেয়ে বেরিয়ে গেছে। সকালে ঘুম ভেঙে দেখে পাশে শুয়ে আছে। গাঢ় ঘুম। অবশ্য ঘুমালে এর দিন দুনিয়ার হুঁশ থাকে না। ঘুমায়ও খুব এলোমেলো ভাবে। কোথার সে, কোথায় লুঙ্গি তার খবরও থাকেনা। তাই আয়না এক ঝলক দেখে আর তাকায়ইনি। নিজের মতো উঠে চলে এসেছে। আর ওমুখো হয়ইনি।
— যাও ডাইকা তুলো। এক ওয়াক্তের খানাও তো ঠিক সময়ে খায় না।
আয়না দাঁড়ালো না! বলতে গেলে কিছুটা হনহনিয়ে’ই চলে এলো। অবশ্য রুমে গেলো না। ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। শয়তানটা জেগে থাকলে’ই তার অশান্তি । তাই সোজা চলে এলো ছাদে। এখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ভিজে ভিজে একটা নরম ছায়া মেখে আছে চারপাশে। সেই ছায়ার মাঝেই সে চুপচাপ চিঠিটা খুলল। খুলে চোখ বুলালো। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই টের পেল, কেউ একজন পেছনে। আয়নার কলিজা কেঁপে উঠল। আর সাথে সাথে কাগজটা মুড়িয়ে ব্লাউজের ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললো।
শাহবাজ পেছন থেকে সামনে এলো। তার চোখে মুখে ঘুমের চিহ্ন। মাত্রই ঘুম থেকে উঠেছে। বেরুবে, দেখলো এই রমণী হনহনিয়ে ছাদের দিকে যাচ্ছে। এই মেঘ বৃষ্টির দুপুরে ছাদে কি? তাই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,–
— কি লুকালে?
আয়নার মাথা ঘোরা শুরু হয়ে গেছে। তাই ঢোক গিলে বলল, — কই?
— মাত্রই দেখলাম কিছু একটা আপনার অতি মূল্যবান গোপন কুঠরিতে পাচার করলেন।
আয়নার গলা কাঁপছে, তবুও অনেক কষ্টে নিজেকে সামলালো। সামলে কোন রকম বলল — একদম বাজে বকবেন না।
— তো কি বলবো? সত্য বললে আবার শাহবাজ বেশরম।
— কিসের সত্য, আমিতো এমনিই ঝাড়লাম।
— আচ্ছা দেখি।
আয়না দু’কদম পিঁছিয়ে গেলো। তবে শাহবাজ এগুলো, দাঁড়ালো আয়নার একদম মুখোমুখি। দাঁড়িয়ে বলল,– ঘুম থেকে উঠে এতো তেনাবেনা ভালো লাগে না। আর একবার বলবো। তারপর ঊনিশ বিশ হলে আমার দোষ নেই।
আয়না ভয়ে ঢোক গিললো। এই তারছেঁড়ার ভরসা নেই। ভয়ে সব সময় যা করে তাই আজও করতে গেলো। শাহবাজকে এক ধাক্কা দিতে গেলো। অবশ্য লাভ হলো না। এতোদিনে এই মেয়েকে শাহবাজের চিনতে বাকি আছে আর। তাই ফট করে’ই সাইড হয়ে ডান হাতে কব্জি ধরে ফেললো। বেশ শক্ত করেই ধরলো। আরেক হাতে প্লাস্টার, এই মেয়ে যে তাকে উল্টো ফেলবে না, সেই গ্যারান্টি কি? বাসর রাতে ফেলেছে চেয়ার থেকে, সেই দিন সিঁড়ি আর আজ নির্ঘাত ছাদ। তাই শক্ত করে ধরে বলল,– না দেখে আমি ছাড়ছি না।
আয়না কেঁদে ফেললো। শাহবাজ ভ্রু বাঁকিয়ে তাকিয়ে বলল,– কেঁদে লাভ নেই। বের করো।
— কি বের করবো?
— যেটা লুকিয়েছো?
— মিথ্যা কথা।
— উঁহুম, আপনি মিথ্যাবাদী।
আয়না আর কিছু বলল না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে তো মরে গেলেও বের করবে না। শাহবাজও তার মতো দাঁড়িয়ে রইল। একহাত গলায় আরেক হাত আয়নার কব্জিতে। আর গুঁড়ি গুড়ি বৃষ্টি তাদের দু’জনের উপরে পড়তে লাগলো অবিরত। এই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শরীরকে ভেজাতে পারে না। তবে মোহনীয় ঠিক করতে পারে। আর তাই তো শাহবাজ আস্তে করে কব্জি ছেড়ে দিলো। দিয়ে মনে মনে দু’টো শব্দ’ই আবার বলল,– শালার প্লাস্টার।
চলবে…..

