ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪০

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪০

পৃথিলার ঘুম ভাঙল ভোরে। সাবিহার খোয়ারের মোরগ, মুরগির ডাকে। ভোর হতেই তাদের গান শুরু হয়, সাবিহা উঠে খোয়ারের দোর খোলা না পর্যন্ত তাদের এই গান এভাবেই চলতে থাকে।

সাবিহা এখনো উঠেনি, তবে উঠে যাবে। গ্রামের বউরা বেলা করে ঘুমায় না। তার অবশ্য এমন কোনো সমস্যা নেই। কাজকর্ম নেই, ঘুমিয়েছে তাড়াতাড়ি, ঘুম ভেঙেছেও তাড়াতাড়ি।

পৃথিলা নিজের মতো করে উঠল, খুলে যাওয়া চুলগুলো হাত খোঁপা করল। গায়ের কাপড় গুছিয়ে ঠিক করল। মশারি সরিয়ে জানালা খুললো। ভোরের কোমল আলো ঘরে আসতেই টেবিলের ওপর ব্যাগটার উপরে চোখ পড়ল। কিসের ব্যাগ, কোথা থেকে এলো বুঝতে পারল না। তাই কিছুটা কৌতূহল নিয়ে প্রথমে ঘরের আলো জ্বালালো। আলো জ্বালিয়ে ব্যাগটা খুলল। খুলতেই দেখল, অনেকগুলো বই।

পৃথিলার বুঝতে দু’সেকেন্ডও লাগল না, এই বই কোথা থেকে এসেছে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়েছে, হয়তো রাতে পাঠিয়েছে। ঘুমালে সাবিহা তাকে ভুলেও ডাকবে না। তাই চুপচাপ রেখে দিয়েছে। তাছাড়া ফিরিয়ে দেবে সেই সাধ্য কই?

পৃথিলা বই প্রিয় মানুষ। বলতে গেলে অনেকটাই প্রিয়। তারেকের ফ্ল্যাটে তার বইয়ের আলাদা তাক ছিল। শাড়ি গহনার লোভ, আকাঙ্খা কখনও তেমন ছিল না। আর খরচের দিকে তারেক কখনও কোন হিসেব চায়নি। তাই ইচ্ছে হলেই দু,তিনটে বই এমনিই কিনে ফেলতো।

তবুও পৃথিলা আজ এই বই গুলো আর ধরল না। খুলে দেখলোও না, কি কি বই। বরং আস্তে করে হাত সরিয়ে নিলো। যেমন ব্যাগ, তেমনি পড়ে রইল। পৃথিলা বাতিটা নিভিয়ে বাইরে চলে এলো। কাল সারাদিন রাত বৃষ্টি গেছে। আজ অবশ্য নেই। তবে কোমল নরম মিষ্টি একটা মৃদু বাতাস গায়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে।

পৃথিলার ভালো লাগল। এগিয়ে বারান্দায় বসল। এখন অবশ্য বাইরে তেমন কিছু দেখা যায় না। মাঝারি সাইজের লোহার গেট লাগানো হয়েছে। ইমরান ভাই ফেরার সাথে সাথে গেটে তালা ঝুলানো হয়। এমনিতে অবশ্য সবসময় খোলা থাকে। তবে সারেং বাড়ির লোকের নজরের ভেতরে। চাইলেও এখন আর হুট করে কারো বাইরে বা ভেতরে আসা যাওয়ার উপায় নেই।

তখনি পৃথিলার নজর পড়ল সারেং বাড়ির দ্বিতীয় তলার বারান্দায়। জাফর লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। সোজা, পেছনে হাত মোড়ানো। গায়ে ঘরোয়া সাদা ফতুয়া। দৃষ্টি অবশ্য এদিকে নেই, আকাশের দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

পৃথিলার কেন জানি দৃশ্যটা ভালো লাগলো। সে গাছগাছালির ফাঁকে নিচ থেকে দেখছে। তাই আকাশ আর লোকটাকে একই রকম মনে হলো। মনে হলো, আকাশের একটুকরো মেঘ ভেসে একটু দূরে চলে এসেছে। এখন ফেরার জন্য উঁকি ঝুঁকি মারছে।

তখনই জাফর ফিরে তাকালো। পৃথিলা কিছুটা থতমতো খেলো। খেয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে অবশ্য সেখানে আর বসলো না। এগিয়ে খোয়ারের দোর খুলে দিল। মোরগ, মুরগি গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো।

পৃথিলা আর সেদিকে তাকায়নি। তার তাকানোর প্রয়োজনও নেই। তবে জাফর, পৃথিলাকে যতোক্ষণ দেখা গেলো চোখ ফেরালো না। আগের মতোই তাকিয়ে রইল। আর থাকতে থাকতেই মনে হলো, তারা আসলে’ই সবাই স্বার্থপর।

এরশাদ জয়তুনের মুখোমুখি হলো সকালে। জয়তুনই ডেকে পাঠালো। দাদি তো এখন চোক্ষের বিষ। সামনে পড়লেও ফিরে দেখে না। দাদি তো মুখ ফেরাতে পারে না, তাই বেরিয়ে যাওয়ার আগেই খবর পাঠালো।

তবে কাজের লোক এসে জানালো, এরশাদ ভাই ঘুমে, একটু পরে আইতেছে। পরে আসছে শুনে অবাক হয়নি। অবাক হলো ঘুমাচ্ছে শুনে! এরশাদের ঘুম কম। কোনো রকম কাকের গোসলের মতো ঘুম তার। ঝলক পলক। সেই এরশাদ এত বেলা করে ঘুমাচ্ছে! জয়তুন কিছুটা বিস্ময় নিয়েই বসে রইলো।

তার পাশেই আয়না। পান ছেঁচে ভর্তা করছে। ভর্তা করতে গিয়ে তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে। পান ছেঁচার নিয়ম আছে। আস্তে আস্তে ঘষতে হয়। এই মেয়ে শরীরের যত শক্তি আছে, সবটুকু দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। সেই চালিয়ে যাওয়ার মাঝে চোখের আড়ালে মুখে কিছুটা পান পুরেছে। সেই পানে ঠোঁট লাল টকটকে হয়ে আছে। দেখতে ভালো লাগছে, তা না হলে জয়তুন এতক্ষণে দিতেন এক ধমক। সে জোটা পান খাবে?

আম্বিয়া তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। দিলেও স্বাভাবিক ভাবে কাজটাজ করছে। এও ভালো। এই মেয়ে থামলে সারেং বাড়ি থেমে যাবে। তবে আম্বিয়াকে টাইট সে দেবে। বিয়ের ঝামেলাটা আর এরশাদের ঝামেলাটা মিটুক, তারপর। জয়তুন সব সহ্য করতে পারে, তবে তার সাথে চাপা চালানো, এই স্পর্ধার কোন মাফ নাই।

ঠিক তখনই ঘুম ঘুম চোখে এরশাদ নামল। তবে তৈরি হয়েই নেমেছে। বেরিয়ে যাবে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আয়না দেখল। দেখে মুখ বাঁকাল। একটা ছোট শয়তান, আরেকটা বড় শয়তান! একটা পৃথিলা আপাকে জ্বালিয়ে মারছে, আরেকটা তাকে। এতোদিন জ্বালানো ছিল এক জ্বালানো, এখন শুরু হইছে আরেক জ্বালানো। প্রথমে কি ঢং। দেখতে পারে না, ঘৃণা করে। এখন কোথায় গেলো সেই ঘৃণা। তার দাদি ঠিক’ই বলতো। পুরুষ মানুষের রাগ, জেদ সব এক জায়গায় গিয়েই শেষ হয়। মাইয়া মানুষ! আর মাইয়া মানুষ দেখলে পুরুষ গলবো না, এমন পুরুষ দুনিয়ায় নাই। অবশ্য বলতে গেলে তার দোষও কম না। সে নিজেও রাগে জেদে কয়দিন রং ঢং করে বশে আনতে চাইছে। কেননা আজিজ চাচা হাসপাতালে বলেছিল, জয়তুন আরাকে ভাঙতে হলে নাতিদের ভাঙো। ভাঙার জন্য আগে, বশে আনতে হবে। তবে জয়তুন আরার নাতি দু’টাই বিটলা শয়তান। যাই করতে গেছে, হয়ে গেছে গন্ডগোল। এখন তো আর কিছু করছে না। তো গলছে কেন? উফ! জ্বালা তো ভালো লাগে না।

কোমরটা তার এখনোও টাটাচ্ছে। উপর নিচ হতে গেলে কুঁকিয়ে উঠতে হচ্ছে। আম্বিয়াবু তো একবার ভ্রু কুঁচকে তাকালো। সে লজ্জায় শেষ। অথচ শয়তানটা দেখো। এখনোও কি সুন্দর পরে পরে ঘুমাচ্ছে। অবশ্য রাতে আর রুমের দরজায় গিয়ে ধরাম ধরাম করে তাল ফেলেনি। অন্য রুমে চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। তাই মুখ বাঁকিয়ে নিজের অজান্তেই আবার আরেকটু পান মুখে পুরল। আর মুখে পুরতেই কাল রাতের কথা মনে পড়লো। পড়তেই মুখ গোঁজ করলো।

জয়তুন নির্বিকার চিত্তে এবারো দেখলো। মনে মনে কার গোষ্ঠী উদ্ধার করছে কে জানে? করবি ভালো কথা। লুকিয়ে চুরিয়ে কর। তা না! সব হাবভাব মুখে বোঝা যাচ্ছে। সারেং বাড়ির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। একেবারে ডাহা অন্ধকার।

এরশাদ অবশ্য তাকালো না। সে নিজের মতো এসে জয়তুনের সামনে বসে তার স্বভাবমতো কোমল স্বরেই বলল,
— ডেকেছো দাদি?

জয়তুন ডানে বামে গেলেন না। গেলেই কথা উঠবে। অন্তত তিনি এখন আর কোনো ঝামেলা চান না। তাই সোজাসুজি বললেন, — হাতে তো সময় নাই। বিয়ের ব্যাপারে কী ভাবলি?

— ভাবার কী আছে! সব হয়ে যাবে। কাল থেকেই প্যান্ডেলের লোক কাজ শুরু করবে। বাজার, টাজার নিয়ে ভাবতে হবে না। সেগুলো আমি দেখব। শুধু দাওয়াতের ব্যাপারটা শাহবাজকে দেখতে বলো। আজকের মধ্যেই বইলো। হাতে আছে দু’দিন। আজকের মাঝে দাওয়াতটা না পৌঁছালে খারাপ দেখায়। হঠাৎ বিয়ে, সেই ভাবেই ওকে বলতে বলো। তাছাড়া, বলার মতো আত্মীয়-স্বজন তো আমাদের নেইও। গ্রামের মানুষ সমস্যা হবে না।

— আমার একমাত্র নাতনি। পুরনো গহনা আমি দেব না। নতুন চাই।

— সেগুলোর জন্য সময় দরকার। এখন যা আছে দাও। পরে আমি সব ব্যবস্থা করছি।

— না! বিয়ের সময়ই তো সবাই দেখে। পরে তো কেউ দেখতে আইবো না।

— তাহলে কী করব? এখন বানাতে দিলেও কমপক্ষে এক সপ্তাহ লাগবে। অথচ সময় মাত্র দু’দিন।

— ঢাকায় যা। সেখানে নাকি বিশাল বিশাল দোকান থাকে। তাদের নাকি তৈরি’ই থাকে। ফরহাদের ভাবিও তো সেখান থেকেই নিতাছে।

— এখন এতো কাজের মাঝে ঢাকায় যাওয়ার সময় কোথায়?

— কাজ শাহবাজ দেখবো। তুই গহনার ব্যাপারটা দেখ। তাছাড়া জামাইকেও তো অন্তত একটা নতুন চেইন, হাতের আন্টি দিতে হইবে। আমি পুরনো গহনা দিয়ে জামাই বরণ করব না।

— আমার এখন ঢাকায় যাওয়া সম্ভব না। শাহবাজকে বলো।

— ও বুঝবে? ও জীবনে এসব করেছে?

— জীবনে করবে না বলে, এমন কোন কথা নেই। করতে দিলেই পারবে।

— তোর গেলে সমস্যা কি?

এরশাদ উত্তর দিল না। সে যে ভাবে বসেছে, সেই ভাবেই উঠে দাঁড়াল। জয়তুনও তার মতো বললেন, — তা যাবি কেন? আমি তো খারাপ’ই। ভাই, বোন সব এখন পর!

এরশাদ এবারো উত্তর দিল না। বেরিয়ে গেলো। জয়তুন দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল। আয়না বসে বসে সবই দেখলো। দেখতে দেখতেই আরেকটু পান মুখে পুরল। এরশাদ ভাই ঢাকা যাবে নাকি? আজিজ চাচাকে জানাতে হবে। অবশ্য তিনি বলেছেন, টুকিটাকি সব জানাতে। যেভাবে পারে সেভাবে জানাতে। এই বাড়ি থেকে একটা সুতোও গেলে, যাবে আগে তার হাত হয়েই। তাই নিশ্চিন্তে সব কিছু করতে বলেছে।

এরশাদ সোজা বেরুতে গিয়েও থামলো। মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। পৃথিলা সাবিহাদের গেইটের ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। গায়ে ছাইরঙা একটা কাপড়। মাথায় সব সময়ের মতো হাত খোঁপা। জ্বর, গত কয়েক দিনের ধাক্কায় কিছুটা শুকনো লাগছে, তবুও এরশাদের চোখে অন্যরকম’ই লাগলো। আর এই লাগায় তার ঘোর লাগে। তাই মৌহ মুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলো। কাছে অবশ্য না, কিছুটা দূরে। সেই দূরে দাঁড়িয়ে বলল, — হাঁটতে যাবেন পৃথিলা?

পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। সেই বিরক্ত নিয়েই ভেতরে যেতে নিলো। এরশাদ আগের মতোই বলল, — ভয় পাচ্ছেন?

পৃথিলা থামলো! থেমে তার মতোই বলল,– হ্যাঁ, পাচ্ছি। ভয়ংকর মানুষ দেখে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।

— নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি একটা বিষয় ছাড়া আর কোন কিছুতেই জোর করবো না।

পৃথিলা শান্ত চোখে তাকালো! এরশাদ হাসলো। হেসে বলল, — বীণার বিয়ে, নানান ঝামেলায় থাকবো। এই সুযোগ সপ্তাহ খানেকের মধ্যে আর পাবেন না। তাই ভেবে দেখুন।

পৃথিলা এক সেকেন্ডও ভাবলো না। ভেতরে চলে গেলো। এরশাদ জানতো এমনই হবে। তাই ফিরে সদর দরজার কাছে এলো। বেরুবে তখনি তাকে অবাক করে পৃথিলা আবার বেরিয়ে এলো। হাতে তার হ্যান্ডব্যাগ। এরশাদ থমকালো! পৃথিলা অবশ্য স্বাভাবিক, স্বাভাবিক ভাবেই এসে বলল, — আমার কিছু কেনা কেটা আছে। সদরে যাবো।

পৃথিলা প্রথম তাকে কিছু বলছে। এরশাদের গলা শুকিয়ে এলো। সেই শুকনো গলায় ঢোক গিলে বিনা বাক্যে বলল,– আসুন।

ভ্যানে দু’জন বসলো দু’ প্রান্তে। এরশাদ যেমন পা ঝুলিয়ে বসলো, পৃথিলাও তেমন। এরশাদ দেখে বলল,– পড়ে যাবেন পৃথিলা, উঠে বসুন।

পৃথিলা উত্তর দেয় নি, না উঠে বসেছে। সে বসলো নিজের মতো। আসলে তার কোন কেনাকাটা নেই। যদি থাকেও অন্তত এই লোকের সাথে সে কখনও যাবে না। যে যাচ্ছে পত্রিকা দেখতে। সেটা দেখলেই হাবভাব কিছুটা বোঝা যাবে। আর একটা চিঠি, নাম ঠিকানা অবশ্য তার বা ঢাকার পরিচিত গন্ডির কারো নেই। নামটা বানানো, ঠিকানা পাশের গ্রামের। চিঠিটা যাবে তারেকদের গ্রামের বাড়িতে। ভিন্ন নাম, তারেকের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা এখানের কারো জানার কথা না। তাই এই চিঠি যে পৃথিলার কেউ বুঝবেও না। অবশ্য সে জানে না, ডাকঘর পর্যন্ত কিভাবে যাবে। তবুও একটা চেষ্টা তো করাই যায়। কোন ভাবে গিয়ে যদি পৌঁচ্ছায়, তারা নিশ্চয়’ই কিছু একটা করবে। তাই তার মতোই চুপচাপ বসে রইল। তার দৃষ্টি ধানের ক্ষেতে। ধানের ক্ষেতে থাকলেও সে জানে পাশে বসা মানুষটার দৃষ্টি কোথায়। এই রকম দৃষ্টি যে কোন মেয়ের জন্যই অস্বস্তিকর। তাই না চাইতেও শান্ত স্বরে বলল,– দয়া করে দৃষ্টি সংযত রাখুন। তা না হলে আমি ভ্যান থেকে নেমে যাবো।

এরশাদ হাসলো! সে ইচ্ছে করেই তাকিয়ে ছিল। জানতো তার কথায় পৃথিলা উত্তর দেবে না। তাই কথা বলার ছোট্ট একটা প্রয়াস। তাই হেসেই দৃষ্টি ফিরিয়ে সামনে নিয়ে বলল,– কি কেনাকাটা করবেন?

পৃথিলা মিথ্যা বলতে পারে না। বলতে গেলে গলা কাঁপে। তাছাড়া এই লোকের কথার উত্তর দিতে ইচ্ছেও করছে না। তাই চুপচাপ’ই রইল।

— কিছু কিনতে আমার সাথে আসবেন না, সেটা জানি। কারণটা বলুন পৃথিলা।

— যদি না বলি?

— না, বললে নেই। তবে আমার কাছে নিজ থেকে প্রথম কিছু বললেন। সেই খুশিতে আমি সেটা এমনিতেই করে দেবো। তাই বলতে চাইলে বলতে পারেন। আপনার কষ্ট কম হবে।

— মনে হয় না করবেন?

— বলে দেখুন।

— জবান ঠিক আছে তো আপনার ?

— দুনিয়ার কাছে আছে কি না জানি। কখনও মহৎ হওয়ার চেষ্টা করিনি। নিজের মতো থেকেছি। তবে আপনার কাছে যেটা বলবো, কখনও নড়চড় হবে না। সত্যি বলছি, কখনও হবে না।

পৃথিলা এবারো শান্ত ভাবেই তাকালো। কিছু কিছু কথা গায়ে গরম সীসার মতো পড়ে। তাই তাকিয়ে শান্ত ভাবেই বলল,– মহৎ হওয়ার চেষ্টা করেন নি, তবে ভালো মানুষের মুখোশ ঠিক পরেছেন।

— কোথায় পরলাম?

— গ্রামে সারেং বাড়ির বদনাম আছে, তবে আপনার নেই। অথচ সারেং বাড়ির সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষটা হচ্ছেন আপনি।

এরশাদ হাসল! হেসে বলল, — তো? মানুষ অপরাধতো আর ডেকে ডেকে সবাইকে দেখিয়ে করবে না।

— না দেখানো, আর অপরাধে পর্দা ফেলায় ফারাক আছে।

— হয়তো! আমিতো আর আপনার মতো এতো জ্ঞানী না। তাই জানা নেই। তবে দুনিয়ার কাছে যাই থাক, আমার দ্বিতীয় কোন রুপ আপনার সামনে থাকবে না, আমি যা তাই থাকবে।

— জানতে পারি, এতো রহম আমার প্রতি কেন? মেয়ের অভাব হওয়ার তো কারণ নেই। রুপের দেওয়ানা আপনি না সেটা জানি। কারণ, তা হলে আমার জায়গায় আয়না থাকতো। সে আমার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দরী। তো, সাধারণ দেখতে একটা তালাক প্রাপ্ত মেয়ের প্রতি এতোটা সদয় হওয়ার কারণটা কি?

— অনেক কারণ আছে। যদি বলতে যাই এই পথ শেষ হয়ে যাবে। তাই কখনও বলবো অফুরন্ত সময়ে।

পৃথিলার মুখ তেতো হয়ে এলো। তারেকের ধোকার পরে এই সব মিষ্টি যে কোন শব্দে তার এক আকাশ সমান ঘৃণা। সে কাউকে দেখায় না, বোঝায় না। তবে কেউ কি জানে। পুরো দুনিয়া ছেড়ে একজনের হাত ধরতে কতোটা সাহস লাগে? আর সেই একজন যদি ধোকা দেয়, কতোটা আঘাত লাগে। তাই সেই তেতো কণ্ঠে’ই বলল — সেই অফুরন্ত সময় কখনও আসবে না।

— সময় বলবে।

— ভালো।

— অবশ্যই ভালো। তবে বললেন না, সদরে কেন?

— আজকের পত্রিকা দেখবো।

এরশাদ হাসলো! তার সেই সরলতা মাখা হাসি। হেসে পকেট থেকে সিগারেট বের করলো। এতোক্ষণ পৃথিলার কথা ভেবে সিগারেট না ধরালেও এখন ধরালো। ধরিয়ে বলল,– হয়ে যাবে।

— আর একটু লাইব্রেরিতে যাবো।

— কোন লাইব্রেরি?

পৃথিলা একটু ভাবলো। ডাকঘর সে চেনে না। তাহলে আশে পাশের কোন দোকান বলা যেতো। তাই বলল, — আমি এখানের কিছু চিনি না। একটা লাইব্রেরি চিনি, সেখানে’ই চলুন। এক কাজে দু’কাজ হলো। কয়েকটা বইও নেওয়া যাবে। জেল খানার কয়েদি বানিয়ে রেখেছেন। সময় কাটানোর জন্য কিছু তো দরকার।

এরশাদ আবারো হাসলো। হো হো করা হাসি। সে যেমন সেইদিন ঘুরিয়ে শান্ত ভাবে হুমকি দিয়েছে, তেমনি আজ ঘুয়িয়ে শান্ত ভাবে বলে দিলো। আপনার উপহারের আমার প্রয়োজন নেই। তাই হেসেই বলল, — কোন লাইব্রেরি?

— সদর বাজারের ভেতরে যেটা।

এরশাদ আর কিছু বলল না। ভ্যানওয়ালাকে দোকানের কথা বলল। বলে বলল, — পত্রিকা দেখে কি হবে?

— মনের শান্তি, হাজার খারাপ হলেও, সংসার তো করেছি। কতোদিন করেছি? ওহ! আপনার তো জানার কথা না। চার বছর। তারেকের সাথে আমার সংসার জীবন চার বছর।

এরশাদ এবার হাসলো না। বরং চোয়াল শক্ত হয়েছে। পৃথিলা যে তাকে ইচ্ছে করেই এই সব বলছে, সে জানে। ঘাটে ঘাটে বুদ্ধি। এরশাদের সহ্য হবে না, ঠিক জানে। হলোও তাই, তার মেজাজ বিগড়ে গেছে। অবশ্য তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই। সে সব সময়ের মতোই শান্ত। শান্ত ভাবেই আগের মতো সিগারেটে টান দিলো।

সারা রাস্তা আর একটা কথা কেউ কাওকে বলল না। তবে এরশাদ একটার পর একটা সিগারেট খেলো। সেই সিগারেটের ধোঁয়ায় পৃথিলার দম বন্ধ হয়ে এলো। আর না পেরে আঁচল দিয়ে নাক, মুখ চেপে ধরল।

সাজেশন দেখে বীণার মাথায় হাত। অন্য বিষয় যেমন তেমন, গ্রামার আর গণিতে অনেক পড়া। সে পড়া দেখে তার মাথা ঘুরে গেলো। ঘুরে যাওয়া মাথা আর পড়ার চিন্তায় সে তার “পড়া শেষ, হজম শেষ ” এর ডাট বাট সব ভুলে গেলো। আর ভুলেই দৌড়ে গেলো।

এরশাদ চলে গেছে। জয়তুন বসে আছে আগের মতোই। তার মন মেজাজ ঠিক নেই। এরশাদকে সরানো দরকার। তবে মনে হয় না, সরবে। নতুন গহনার কথা বলেছে, গহনা ঠিকই আসবে। তার লোকের অভাব নেই। চেনে তো এরশাদকে? কোন কাজ সে ফেলে রাখে না। তবে সরাবে টা কী করে?

ঠিক তখনই বীণা এসে বলল, — ফরহাদ ভাইকে আসতে বলো।

জয়তুন চিন্তায় ছিল, খেয়াল করেনি। ভ্রু কুঁচকে বলল, — কারে আইতে বলবো?

— ফরহাদ ভাইকে।

— কোন কালের ভাই তোর?

— যেই কালেরই হোক, সেটা তোমার দরকার নেই। তাকে আসতে বলো।

— ক্যা ?

— দুনিয়ার পড়া বাকি। আমার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না।

জয়তুন দাঁতে দাঁত চেপে তাকালো। এরশাদ, শাহবাজকে তিনি উঠতে বসতে বকাবকি করেন, আগে শক্তি থাকতে দুই চারটা চড় থাপ্পড়ও দিয়েছেন। তবে বীণার সঙ্গে কখনও জয়তুন কড়া হয়নি। বরং ধৈর্য নিয়ে বুঝিয়ে সুজিয়ে সব করেছেন। এখন মনে হচ্ছে কয়েকটা চড় থাপ্পড় এই মেয়েকে দেওয়ার দরকার ছিল। তা না হলে আজ এমন বেয়াদব হতো না। আর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল এই ডারে স্কুলে দেওয়া। তাই ঝাঁজের সাথেই বলল, — থাপড়াইয়া দাঁত ফেইলা দেবো রে বীণা! শরম লজ্জার ধার নাই। যার সাথে বিয়া, তারে কয় ভাই আবার খবর দিয়া বাড়িতেও আসতে কছ!

— বললে কী হবে? সে কি আমাদের বাড়িতে নতুন আসছে?

— তুই যাবি, বীণা?

— না, তাকে আসতে বলো।

— আমি তো জীবনেও বলুম না।

বীণা মুখ ফুলিয়ে চলে এলো। তার খবরে ফরহাদ ভাই আসবে না। সে মাথার চুল টেনে ধরলো। তখনই আয়না এলো। আয়নাকে দেখে বীণা যেন কলিজায় পানি পেলো। এরশাদ ভাই কখন ফিরবে ঠিক নেই। সে থাকলে এক ব্যবস্থা হয়ে যেত। তাই ঝটপট সাজেশনে যা যা পারে না, লাল কালি দিয়ে বৃত্ত করলো। তারপর আয়নার হাতে ধরিয়ে দিলো।

আয়না অবাক হয়ে বলল, — আমি কী করবো?

— আমি কী জানি? ভাবি হইছো, ননদের মুশকিল আসান করো।

— আমি?

— হুম। ছোট ভাই তো এখনো বাড়িতে। যাও যাও, তাড়াতাড়ি যাও। চলে গেলে আরেক ঝামেলা।

আয়না ঢোক গিললো। গিলে তার পান খাওয়া ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে অবশ্য সে আরেকটা কাজ করলো। চিঠি লিখে সুন্দর করে সাজেশনের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলো। জীবন যখন হাতের তালুতে নিয়ে বাঘের গুহায় যাবেই, এক কাজে দু’কাজ হোক।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here