#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪২
সারেং বাড়িতে বিয়ের সানাই না বাজলেও মহাজন বাড়িতে ঠিক বেজে উঠল। ভালো ভাবেই উঠল। তাদের আত্মীয় স্বজন অনেক। ফাতেমা আশপাশের মানুষের সাথে মিল মহব্বত দিয়ে মিলেমিশে থাকে। মহাজন হলেও মিঠাপুকুরে আজিজের সুনাম অনেক বেশি। বিপদে আপদে, দান খয়রাতে সব কিছুতেই আগে। গ্রামের মানুষ সারেং বাড়িকে যেমন ভয় পায়, ঘৃণার চোখে দেখে, তেমনি মহাজনকে ভরসা করে ভালোবাসে। তাই তাদের বাড়ির বিয়ের আয়োজনে তারা মন থেকে’ই লেগে গেছে। কাল গায়ে হলুদ, তার নানা আয়োজনে পুরো বাড়ি এমনিতেই মুখরিত হয়ে আছে। তার মধ্যে ফাতেমার অনেক খাতিরের মানুষ তো টিপ্পনী কেটে বলছে, “মেয়ে আর পাও নাই? জয়তুন আরার নাতনি।”
ফাতেমা সিধেসাদা মনের মানুষ। তিনি শুনে হাসেন। ফরহাদ তাদের প্রিয় সন্তান। তার স্বামীর উপরে তার পুরো বিশ্বাস। সে জেনে শুনে ছেলের খারাপ হবে, এমন কিছু করবেই না। বরং এই বিয়েতে সবচেয়ে খুশি সে। এতো লোক থাকতে নিজ হাতে সব করছে। ঘুরে ফিরে আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নিচ্ছে। আশে পাশের, গ্রামের মানুষদের নিজে গিয়ে দাওয়াত দিয়েছে।
তখনই মনে পড়ল, দুপুরে আড়ত থেকে তিনি বীণার পড়ার কিসের কাগজ যেন পাঠিয়েছেন। বলেছেন, ফরহাদ স্কুল থেকে ফিরলে দিতে। স্কুল থেকে ফিরেছে বিকেলে, এখন সন্ধ্যা হয়ে চলল। এতো ঝামেলায় মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে।
ফাতেমা কাগজ নিয়ে দৌড়ে গেলেন। কথায় আছে যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া পড়শির ঘুম নাই। তাদের হয়েছে সেই অবস্থা। তারা বিয়ে বিয়ে করে মরছে, এদিকে যার বিয়ে সে দিব্যি আরামছে ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্কুল করছে। এমনি সোজা ঘোষনা দিয়েছে, তার রুমে যাওয়া নিষেধ, একদম নিষেধ।
বিয়েবাড়ি, এতো আত্মীয় স্বজনে খেয়াল রাখা যায়? পোলাপান সব যে যেখানে পাচ্ছে, হুটোপুটি খাচ্ছে। ঐ রুমে কখন গেছে বলতেও পারে না। স্কুল থেকে ফিরে দেখে একটাকে তো প্রায় তুলে আছাড় মেরেছে। তার ভাগ্নির ছেলে, ভাগ্যিস দেখে নাই। এমনিতেই সাত ঝামেলা ছাড়া বিয়ে হয় না, এদিকে তার ছেলেই হচ্ছে মহা ঝামেলা। তাই জয়তুন আরার নাতনি বলে তারা ভয় পাবে কি? তার তো এই মেয়েটার জন্যই ভয় করছে।
ফরহাদ পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসেছে। চোখ, মুখ কুঁচকে এমনভাবে খাতা দেখছে, যেন খাতার মালিককে পেলে ছাল তুলে নেবে।
ফাতেমা দেখে বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে এগিয়ে এসে ছেলের সামনে সাজেশন ধরে বলল,– নে ধর, তর ছাত্রী পাঠিয়েছে।
ফরহাদ বিরক্ত মুখে চোখ তুলে তাকাল। দেখে চিনতে এতটুকুও সমস্যা হলো না। তাই স্বাভাবিক ভাবে টেনে হাতে নিল। ভ্রু কুঁচকে গোল গোল লাল বৃত্তগুলো দেখল। বইয়ের পড়া বীণা পারে। ভালো ভাবেই পারে। তবে নিয়ম ঠিক রেখে কিছু কিছু প্রশ্নে পরিবর্তন আনা হয়েছে। স্বাভাবিক, পরীক্ষা একটু অন্যভাবে তো আসবেই। তার প্রস্তুতি হিসেবে স্কুল থেকে সেইভাবেই দিয়েছে। ক্লাসে অবশ্য বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্কুলে যাচ্ছে না, তাই সে জানেও না।
ফরহাদ দেখে সাইডে রাখল, খাতা দেখা বাকি আছে দু-তিনটা। সেই খাতায় আবার মনোযোগ দিল। ফাতেমা দেখে বলল, — কাল থেকে কিন্তু আর স্কুলে যেতে পারবি না।
ফরহাদ এমনিতেও যেত না। পুরো গ্রামের মানুষ জানে বিয়ে। গেলে সবাই অন্য চোখে দেখবে। তাই খাতা দেখতে দেখতে শুধু মাথা নাড়ল।
— বিয়ের কোনো কিছুই তো দেখলি না।
— দেখার কী হলো?
— ওমা! তোর বউ সব ঠিক আছে কি না, দেখবি না?
— আমার বউ এখনো হয়নি।
— বাকি আর কী?
— অনেক কিছু।
ফাতেমা আর কথা বাড়াল না। বিয়েবাড়ি, কাজের তো অভাব নেই। এদিকে তার বড় বউ হচ্ছে ঢেপের রানি। কাজের বেলা কিচ্ছু নাই। তাই নিজের মতো চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এসে বলল— এর আগে তোর আরো দু’বার বিয়ের কথা বার্তা হয়েছে। ঠিক আছে ঝামেলা করিস নি, তবে আগ্রহও দেখাসনি। তারা নিজেরাই সরে গেছে। এবার এমন কিছু করিস না বাপ, মেয়েরা শুধু ভাত কাপড়ের জন্য স্বামীর বাড়ি আসে না।
ফরহাদ উত্তর দিলো না। নিজের মতো খাতা দেখতে লাগলো। ফাতেমা ছেলের প্রতি তবুও বিরক্ত হলেন না। বরং মাথায় স্নেহ নিয়ে একবার হাত বুলিয়ে দিলেন। দিয়ে নিজের মতো চলে গেলেন। আর যেতেই ফরহাদ সাজেশন টার দিকে তাকালো। নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে’ই রইল। তারপর হাতের খাতাগুলো গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো।
সারেং বাড়িতে বিয়ের আয়োজন বলতে এরশাদ দুনিয়ার বাজার সদাই করে পাঠিয়েছে। যেমন বিয়ের বাজার, তেমনি ছেলে থেকে ছেলে বাড়ির জন্য যাবতীয় যা লাগবে, সব। এছাড়া আর তেমন কিছু নেই। বাইরের আয়োজন যা, তা সব কালকে সকাল থেকে শুরু হবে। অন্য সময় হলে আম্বিয়া নিজ থেকেই বিয়ের আয়োজনে লেগে যেতো। তবে এখন যেটুকু দরকার শুধু সেইটুকুই করছে। আর আয়না এতো কাজে কোন দিকে যাবে দিশে’ই পাচ্ছে না। তবে আম্বিয়ার সাথে বেশ ভাব জমেছে। কিছু করুক আর না করুক, তার পেছন পেছন ঠিক ঘুরছে।
জয়তুন বসে বসে সবই দেখল। তার মন একটু আদ্র হয়ে আছে। বিয়ে বাড়ি অথচ বিয়ের কোনো আমেজ নাই। কাজের লোক হাজার থাক, বাড়ির কর্ত্রী না থাকলে, কোনো আয়োজনই আয়োজন হয় না। এই যে মেয়েটার বিয়ে, ভালো মন্দ কেউ বুঝিয়ে বলবে সেই মানুষটাও নাই।
তখনই দেখল, ফরহাদ আসছে। হাতে মোড়ানো একটা কাগজ। জয়তুনের আদ্র মন ফুরুৎ করে উড়ে গেল। যেতেই ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আজকালকার ছেলেমেয়েদের রংঢং তার মাথায় কুলোয় না। রাত পোহালে গায়ে হলুদ, আর এদিকে জামাই শ্বশুরবাড়ি এসে হাজির।
তাই ভেতরে আসতেই ভ্রু কুঁচকেই বলল, — কাহিনী কি রে ফরহাইদা?
ফরহাদ শান্ত চোখে তাকাল। এই বুড়ি আর জীবনে ভালো হবে না। তাই শান্তভাবে বলল,– কোনো কাহিনী নেই, বীণা কোথায়?
— বীণা কোথায় মানে? বিয়ের আগে জামাই বউর যে মুখ দেখতে হয় না জানিস না?
— না জানি না, প্রথম বিয়ে তো তাই। আবার করতে গেলে তখন ঠিক জেনে যাবো।
— আবার করতে গেলে মানে, তোর কয়টা করার ইচ্ছা?
— দেখি, মন কয়টা করতে চায়।
— ইতরামি করোস?
ফরহাদ আর দাঁড়াল না, তাকে আবার ফিরতে হবে। এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্টের মানে হয় না। বিদ্যাসাগরি বিদ্যার জাহাজেই থাকার কথা। তাই বীণার রুমে যেতে যেতে বলল, — করলেও দোষ কী? সম্পর্ক তো ইতরামিরই।
— তোর ইতরামির খেতা পুড়ি। খবরদার, আমার নাতনির রুমে যাবি না।
ফরহাদ শুনলও না, তবে যেই উত্তর তার মাথায় এসেছে, সেটা দিলে এই বুড়ি এখানেই টাসকি খেয়ে পড়ে যাবে। তাই চুপচাপ নিজের মতো চলে এলো। আর আসতেই একটা ভুল করে ফেলল। জয়তুন আরার কথার তালে তালে এসেছে। তাই সোজা ঢুকে গেছে। দরজায় টোকা দিতে ভুলে গেছে। আর গেছে বলেই থমকে দাঁড়াল।
বীণা পড়ার টেবিলেই বসা। চুল ছাড়া, গায়ে ওড়না নেই। পা দুটো গুটিয়ে চেয়ারে তুলে বাচ্চাদের মতো পড়ছে। তাকে খেয়াল করেনি। ফরহাদ হাঁফ ছাড়ল। ছেড়ে আস্তে করে দু’কদম পেছাল। পিছিয়ে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে গলা খাঁকারি দিল।
বীণা বলতে গেলে লাফিয়ে উঠল। এই খাঁকারি কার সে জানে, ভালো করেই জানে। তাই কোন দিকে যাবে, দিশে পেলো না। ওড়না কই, চুলের রাবার কই? হাতের নাগালের জিনিসও তার চোখে পড়ল না। একবার রুমের এদিকে গেলো, আরেকবার ঐদিকে। পায়ে তার পা ঝাপ, সেই ধ্বনি পুরো রুমে ঝমঝম করতে লাগল। তার এই ঝমঝম সুর আর ঢেউ খেলানো চুল উড়িয়ে পুড়িয়ে দৌড়াদৌড়ি ফরহাদ পর্দার আড়াল থেকে দেখল, দেখে আজকে আর বিরক্ত হলো না, বরং নিজের অজান্তেই ঠোঁট টিপে একটু হাসল।
সেই হাসি অবশ্য খনিকের। বীণা একটু ধাতস্থ হতেই স্বাভাবিক ভাবে এগিয়ে গেল। গিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। চোখ তুলে অবশ্য তাকালো না। বিয়ে নিয়ে হাজার গা ছাড়া থাক, বিয়ে তো বিয়ে’ই। না চাইতেও একটা অস্বস্তি ঠিক জেগে ওঠে। বীণার ক্ষেত্রেও তাই হলো। এই বেলা পর্যন্ত বিয়ের কোনো কিছু মনে না হলেও, এই যে কালো শার্ট গায়ে মানুষটাকে দেখল, তখনি মাথার ভেতরে ভো ভো করতে লাগল। কাল বাদে পরশু তাদের বিয়ে। এই যে তার এতোদিনের নিজের হাতের সাজানো গোছানো চেনা পরিচিত রুম, রুমের জিনিস, প্রতিটা কোণা, এই যে ছোট বেলা থেকে বেড়ে ওঠা নিজের বাড়ি। সব, সব পর হয়ে যাবে। এদের মায়া ছিঁড়ে ছেড়ে যেতে হবে।
যেতে হবে এই যে, এই মানুষটার ঘরে। যাকে নিয়ে কিছু ভাববে তো ভালো, দেখতেই পারে না। বীণার চোখে মুহুর্তেই পানি চলে এলো। সেই পানি সে লুকাতে পারল না, বরং এই হাত, ওই হাত দিয়ে চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ার আগেই মুছতে লাগলো।
ফরহাদ না তাকিয়েও বুঝল। বুঝে তার মতোই বলল,– পড়বি, না চলে যাবো?
বীণা মুখে কিছু বলল না, তবে চোখে পানি নিয়ে চেয়ার টেনে বসলো। বসতেই ফরহাদ তার মতো খাতা কলম টেনে নিলো।
জয়তুন আরা বসার ঘরে বসে গজগজ করতে লাগল। আয়না দেখে ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে নিজে থেকেই সন্ধ্যার নাস্তা পানি দিয়ে এলো। হাজার হলেও বাড়ির জামাই। অবশ্য জামাই বউয়ের কোন কিছু তার নজরে পড়ল না। দু’জন টেবিলের দু- প্রান্তে বসা। ফরহাদ ভাই নিজের মতো অংক বুঝাচ্ছে, বীণা মনোযোগ দিয়ে দেখছে। তবুও আয়নার দেখতে ভালো লাগলো। পর্দার আড়ালে বেশ কয়েকবার উঁকিও দিলো।
দিয়ে মনের আনন্দে টুকটাক কাজে লেগে গেলো। সে আছে বলতে গেলে মহা আনন্দে। শয়তানটা তাকে আর জ্বালিয়ে মারছে না। এমনকি তাকিয়েও দেখছে না। অবশ্য বিয়ে নিয়ে ঝামেলার কারণেও হতে পারে। তবুও এর চেয়ে আনন্দ আর কী হতে পারে! মনে হয় গলায় দড়ি দেওয়ার কথায় কাজে দিয়েছে।
তখনই কালাম খবর নিয়ে এলো, এরশাদ ভাইয়ের উপরে হামলা হয়েছে। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। হামলা করেছেন চেয়ারম্যানের লোক। অন্ধকার হলেও তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। এখন চেয়ারম্যানের নামে এরশাদ ভাই মামলা দেবে।
আয়না, বীণা বলতে গেলে চমকে উঠল, তবে জয়তুনের তেমন হাবভাব হলো না। শাহবাজ আগেই বাড়িতে নেই। তবে জাফর আর ফরহাদ শোনা মাত্রই দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
তেমনি দৌড়ে গেল আবদুল আজিজ। তবে হাসপাতাল না, বন্ধুর বাড়ি। মামলা টামলা নির্বাচনের জন্য ভারী পড়বে। তাছাড়া সারেং বাড়ির সাথে একমাত্র তার জন্যই লাগতে গেছে। অবশ্য লোভে পড়েই গেছে। কেননা আজিজ বলেছে, সারেং বাড়ির জায়গা দখল নিতে পারলে, তার জায়গাও দিয়ে দেবে। আর সেগুলো নিতে পারলে ইটের ভাটায় কব্জা করতে চেয়ারম্যানের বেগ পেতে হতো না। তাই অনায়াসেই রাজি হয়েছে। অবশ্য চেয়ারম্যান জানে না, জমি তো শুধু বাহানা। সে তো সারেং বাড়িকে ধ্বংসের জন্য নেমেছে। শুধু ভেতর থেকে না, বাহির, ডান বাম, উপর নিচ সব জায়গা থেকে। অনেক আগে একবার এভাবেই নেমেছিল। তবে ভাগ্যে জোরে বেঁচে গেছে। এবার বাঁচতে দেবে না। তাই সবার আগে সারেং বাড়ির রক্ষাকবচ এরশাদকে ভাঙতে হবে। আর সেই ভাঙার চাবি দিয়েছে, সারেং বাড়ির নয়া বউ আয়নামতি। আহা আয়নামতি, তুই তো তোর বাপের চেয়েও বেশি উপকারে আসলিরে মা।
এরশাদরা ফিরল মধ্যরাতে। মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে। তার মাথায় ব্যান্ডেজ থাকলেও আজ শাহবাজের হাতে প্লাস্টার নেই। খোলার ডেট আরও পরে। তবে ধৈর্য আর কুলালো না। তাই খবর শুনে হাসপাতালে যখন গিয়েছে এক কাজে দু’ কাজ করেছে। একদিকে ভাইয়ের মাথায় পেঁচিয়েছে আরেক দিকে তার হাতের টা খুলেছে। খুলেই গেছে থানায়। চেয়ারম্যান মানুষ, শুধু মামলায় কি আর হবে? তাই ওসির পকেট একটু মাল পানি ঢেলেছে। যাক বাবা এক দিক ঠান্ডা। এতো ঝামেলা আর ভালো লাগছে না।
সেই খুশিতেই হেলে ঢুলে নিজের রুমে চলে এলো। এসে দেখলো পুরো রুম আলো করে আয়নামতি শুয়ে আছে। তার ভয়ে তো এখন আর দরজায় খিল দেয় না। তবে বাতিও নেভায় না। এতো আলোতে ঘুমায় কী করে কে জানে। তবে ঘুমায় খাটের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে। এক কাতেই রাত শেষ। কোনো নড়চড় নেই।
শাহবাজ দরজায় খিল দিয়ে বাতি নিভিয়ে দিল। দিয়ে এগিয়ে জানালা খুলে দিল। আজ আকাশে চাঁদও নেই, মেঘও নেই। তবে মৃদু একটা আলো পুরো রুমে ছড়িয়ে গেল।
সেই আলোতে শাহবাজ একধ্যানে ঘুমন্ত আয়নার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। নিজেকে কোনো কিছুর জন্য শাসালো। সে এক পাগল। তার কপালে জুটেছে আরেক পাগল। সত্যি সত্যিই ফ্যানে ঝুলে গেলে আরেক সমস্যা। তাই চুপচাপ সাইডে শুয়ে পড়ল। শুলেই বুঝি ঘুম আসে। এই যে খাটের কোণায় মানুষটা, চম্বুকের মতো টানতে লাগলো। চোখ বুঝে দাঁত চেপে অনেকক্ষণ পড়ে রইল। তারপর ফট করে চোখ খুলল। খুলে দাঁত চিবিয়ে বলল, শালার ঘরে ফ্যানই রাখবো না। বলেই এগিয়ে এক ঝটকায় আয়নাকে ঘুরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো।
আয়নার ঘুম পাতলা। তার মধ্যে থাকে আতঙ্কে । এক ঝাঁকিতেই তার ঘুম ছুটে গেল। আর ছুটতেই পুরো শরীরে শীতল স্রোত বয়ে গেল। না, আজকে আর শক্ত মূর্তি হওয়ার সুযোগ পেল না। না পেলো মাগো বলে চিৎকার দিতে। বরং কেঁপে উঠল, এই কেঁপে উঠা শুধু শরীরে না, মনে, মস্তিষ্কে, অন্য কোন অচেনা জগতের। আর এই জগতের বেপরোয়া এক ঢেউয়ে আয়না লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।
……
সকালে উঠে সাবিহা প্রতিদিনের মতো উঠান ঝাড়ল, খোয়ার খুলল। মোরগ, মুরগিকে চাল ছিটিয়ে, বাসি কাপড়গুলো উঠানে মেললো। তখনি দেখল এরশাদ ভাই আসছে। মাথায় ব্যান্ডেজ। হামলার কথা ইমরানের কাছে রাতে শুনেছে। শুনে পৃথিলাকে বলল। পৃথিলা সবই শান্তভাবে শুনল। শুনে শান্তভাবেই বলল,– এটা সারেং বাড়ির মানুষেরই কাজ। জমি নিয়ে ঝামেলা। তার মধ্যে সেইদিন গন্ডগোল হয়েছে। ব্যস, এক কোপে দু’ মাথা ফেলেছে।
সাবিহা তখন হাঁ হয়ে বলেছে,– মানে?
— মানে আবার কী? ভর সন্ধ্যায় কে হামলা করতে যাবে? তাও আবার এমন মানুষদের, তাও পুরো গ্রাম জানে তাদের মধ্যে গন্ডগোল হয়েছে। গাধাও আসবে না এখন হামলা করতে। আর আমার চেয়ে সারেং বাড়ির মানুষদের তুই ভালো জানিস। এরা মাথার বদলে মাথা নেয়। থানা পুলিশের ধার ধরে নাকি? এই থানা পুলিশ পর্যন্ত যাওয়ার জন্যই এই হামলা। এখন চেয়ারম্যানের মানুষ নিজের সম্মান বাঁচাতে মামলা নিয়ে উঠে পড়ে লাগবে। আর জায়গার কথা চুপচাপ হজম হয়ে যাবে।
সাবিহা আর কিছু বলেনি। এতো প্যাঁচ কি আর তার মাথায় ধরে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়াল। পৃথিলা এখনও ঘুম থেকে উঠেনি। মেয়েটার খাওয়া ঘুম সব অনিয়মিত হচ্ছে।
সাবিহা ভেবেছিল এসে সোজা পৃথিলার কথা জিজ্ঞেস করবে। তবে তাকে অবাক করে সামনে দাঁড়িয়ে শান্ত ভাবে বলল,– বীণা কাঁদছে, তুমি কি একটু যাবে, সাবিহা? ও তোমাকে খুব পছন্দ করে। মা, চাচির মতো তো কেউ নেই। যে একটু বুঝিয়ে মাথায় হাত রাখবে।
সাবিহা বড় একটা শ্বাস ফেলল। সারেং বাড়িতে বিয়ের আয়োজন ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। এই যে সূর্য উঠতে না, উঠতেই ভ্যানের লাইন লেগে গেছে। জয়তুন আরা কালকেই খবর পাঠিয়েছে। তার যেতে ইচ্ছে করেনি। তবে আজ আর নিষেধ করল না। বরং হালকা হাসলো! হেসে বলল,– আমি যাবো।
এরশাদ নিজেও হাসলো। হেসে জানালার দিকে এক পলক তাকালো। তাকিয়ে বলল,– আমি জানি সে যাবে না। তবুও ইচ্ছে হলে নিয়ে যেও। আর যদি না যায়, রুম থেকে বের হওয়ার দরকার নেই। যে কেউ আসুক, একদম দরকার নেই।
চলবে……

