#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৫৬
সারেং বাড়ির আকাশেও তখন চাঁদ আর মেঘের লুকোচুরি খেলা। ঝিঁঝিঁ পোকা সমান তালে গান গেয়ে যাচ্ছে। মৃদু শীতল বাতাস দু’জন মানব মানবীকে যেন আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। শাহবাজ আয়নাকে বুকে জড়িয়ে সেই ছুঁয়ে যাওয়া অনুভব করল কিছুক্ষণ। তারপর সেভাবেই ধীরে ধীরে নিজেদের রুমে চলে এলো।
আর আয়না ঐ যে আকাশের খিলখিলানো চাঁদ, সেই চাঁদের মতোই শাহবাজের আকাশে লেপটে রইল। রুমে আসতে আসতে শাহবাজ বলল,
— এখন জোঁকের মতো লেপটে কোন লাভ? আকাম করার সময় মনে থাকে না?
আয়না ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল। গ্রামের সহজ সরল মানুষের কাছে পুলিশ জমের মতো, আয়নাও তার বাইরে না। তাই ঝরঝরিয়ে কেঁদে বলল,
— আমাকে নিয়ে কি করবে? ফাঁসি দেবে?
— দিতেও পারে। আকাম করার সময় এতো ভয় থাকে কোথায়?
— আমি তো পৃথিলা আপাকে শুধু সাহায্য করলাম।
— করেছো, এখন জ্বালা সামলাও।
— আপনি না বললেন সব আপনার?
— ওটা তো এমনিই বললাম। তাছাড়া ঘৃণার মানুষকে সাহায্য কে করে?
আয়না শাহবাজের বুক থেকে মাথা তুলল। শাহবাজের ঠোঁটের কোণে সব সময়ের মতো হাসি। তবে এই হাসি আয়নার কাছে সব সময়ের মতো মনে হলো না। মনে হলো জোর করে হাসি। তবুও আয়না মুখ ফোলালো। এক মুখে যে এরা কত কথা বলে! তার আসলেই কেউ নাই। তাই মুখ ফুলিয়ে নামার চেষ্টা করল।
শাহবাজ আরো শক্ত করে জড়িয়ে বলল,
— সেধে বুকে এসেছো, সেধে একটা চুমু খাও। তাহলে কিছু করতেও পারি।
আয়না শাহবাজের কথা শুনলও না। ভয়ে তার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। শাহবাজ সেই ভয়ের মুখটা দেখল। দেখে রুমে এসে নিজেই নামিয়ে দিল। দিয়ে খাটে বসলো। বসতেই আয়না বলল,
— সাবিহা ভাবি আমার নামে কেস করতে পারলো? আর কেউ না জানুক, সে তো জানে। আমি পৃথিলা আপার কখনো খারাপ চাইনি।
— জুঁই ভাইয়ের কাছে।
আয়না অবাক হলো! অবাক হয়ে বলল, — মানে?
শাহবাজ উত্তর দিল না। এখন আর তার মুখে হাসি টুকু নেই, তবে দৃষ্টি আগের মতোই আয়নার মুখে। কত রং যে এই মুখটুকুর মধ্যে! সেই রঙে ভরা মুখের দিকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে বলল, — সারেং বাড়ির অসংখ্য দোষ আছে। আমি, ভাই, দাদি কেউই দুধে ধোয়া না, আয়না। তবে সেই অসংখ্য দোষের মাঝে তোমার বাবা মায়ের রক্ত নেই। সত্যিই নেই। তোমার বাবা আজিজের লোক ছিল। তার সাথে মিলে সারেং বাড়িতে যে কাল রাত এসেছিল, সেই রাতের সঙ্গী হয়েছিল। আর…
শাহবাজ একটু থামল। বাবা মা তো তার নিজেরও। তাই বুক ছিঁড়ে আসে। সেই ছেঁড়ার কষ্টটুকু গিলে আয়নার মুখের দিকে তাকালো।
আয়নার সাদা মুখটা ফ্যাকাশে হচ্ছে। চোখে পানি নেই, থমকে তাকিয়ে আছে। থাক, তবে সত্য জানা দরকার। একদিন না একদিন তো জানবেই। যত তাড়াতাড়ি জানা যায় ততই ভালো। তাই শাহবাজ চোখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকাল। তাকিয়ে বলল, — তোমার বাবা মাকে আজিজ মেরেছে। এটাই সত্য। আরেকটা সত্য কি আয়না জানো? আমাদের কপালটাই জুড়েছে ঘৃণা দিয়ে। এই ঘৃণা দিয়েই আমাদের দেখা হয়েছে, বিয়ে হয়েছে, এই যে সামনি সামনি দাঁড়িয়ে আছি, সেই ঘৃণা নিয়েই। আর এই ঘৃণা নিয়েই আজীবন আমাদের দু’জনকে বাঁচতে হবে।
— আমি বিশ্বাস করি না।
— না করলে নেই, তবে এটাই সত্যি। যেই মহাজনকে তুমি বাবার মতো সম্মান করেছো, চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করেছো, সে তোমার বাবা মাকে খুন করেছে। তোমাকে গুটির চাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমাকে সব বলেছে তোমার খালা। আমি ঢাকায় সত্য জানতেই তার কাছে গিয়েছিলাম।
আয়না হাত পা গুটিয়ে নিচে বসে পড়ল। কত বোকা সে! বসে ফুঁপিয়ে উঠল। উঠেই বলল, — এজন্যই এরশাদ ভাই আমাকে মারতে চাইছে তাই না?
— আমি বেঁচে থাকতে তোমার গায়ে ফুলের টোকাও আসবে না।
— কেন আসবে না? এটাই তো ঠিক। আমিও তো তাই করেছি।
— তুমি সত্য না জেনে করেছো।
— তবুও সত্য তো সত্যই। আমি আপনার বাবা মায়ের খুনির মেয়ে।
— তুমি শাহবাজের বউ। এটাই তোমার বর্তমান পরিচয়। আর কিছু মনে রাখার দরকার নাই।
— আপনি ভুলতে পারবেন? আমার মুখের দিকে তাকালে মনে হবে না, আমি খুনির মেয়ে।
— ভুলতে পারবো কি না, তা তো জানি না। তবে তোমার মুখের দিকে তাকালে আমি দুনিয়া ভুলে যাই।
— আমি মরে যাবো। সত্যিই মরে যাবো। এই পাপের বোঝা নিয়ে আমি বাঁচতে পারবো না।
— তুমি কোন পাপ করোনি আয়না।
— আমার রক্ত তো করেছো।
— করুক! আমরা কেউই শুদ্ধ না। তাই হাবিজাবি
কিছু করা আগে একটা কথা মাথায় রেখো। একটা একরোখা, ঘ্যাড়ত্যাড়া, শয়তান লোকের তোমাকে ছাড়া চলবে না।
— কেন?
— এক কালনাগিনী বিষের ছোবল মেরেছে। এই বিষ আর এই জীবনে নামবে না।
বলেই শাহবাজ উঠল! উঠে দরজার কাছে এগিয়ে গেল। আয়না ভেজা চোখে, চোখ তুলে তাকাল। শাহবাজ সেই ভেজা চোখের দিকে তাকিয়েই দরজায় বাইরে থেকে খিল দিলো। দিয়ে তালা ঝুলালো। ঝুলিয়ে চাবি পকেটে রাখতে রাখতে জাফরের রুমের দিকে একবার তাকাল। তাকিয়ে তার মতোই নিচে নামল। নেমে নিচের অন্য একটা রুমে ঢুকলো। এই রুমে বাড়ির কাজ করার জন্য দা, কোদাল থেকে শুরু করে যাবতীয় সব কিছুই আছে। সেখান থেকে কুড়াল হাতে তুলে নিল। নিয়ে বের হতেই আম্বিয়া দেখে আঁতকে বলল,
— কি করছিস তোরা?
শাহবাজ হাসল, তবে উত্তর দিল না। বের হতেই দেখল এরশাদ উঠানে দাঁড়িয়ে আছে। শাহবাজ অবাক হলো না, জানত আসবে। তাই তার মতো করেই এরশাদের বরাবর সারেং বাড়ির লম্বা টানা সিঁড়িতে বসলো। বসে বলল, — দুনিয়া না জানুক, তবে আমরা তো জানি ভাই, এরশাদ শুধু তার শত্রুদের জন্য ভয়ংকর। কিন্তু তার প্রিয় মানুষদের সে যত্ন করে আগলে ভালোবাসে। সেটা জয়তুন হোক, ছোট চাচা হোক, ভাই বোন হোক, আর হোক পৃথিলা। এজন্যই ভাই, পুরো দুনিয়ার সাথে তুমি সহজে জিতলেও, আমার সাথে হেরে যাবে।
এরশাদ বড় একটা শ্বাস ফেলল! ফেলে শান্তভাবে বলল, — কুড়াল ফেল, ভেতরে যা। আমি পুলিশকে দেখছি।
শাহবাজ হাসল, তার সেই চিরচেনা হাসি। হেসে বলল,
— আমি পুলিশের জন্য বের হয়েছি, তোমাকে কে বলল? আমি তো চাই পুলিশ আসুক। আয়নাকে নিয়ে কি করবে? বড়জোর ধরে নিয়ে যাবে। সে তো আর কাউকে খুন করেনি, ভাই।
এরশাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। শাহবাজ আগের মতোই বলল, — আমি বের হয়েছি তোমার জন্য। তুমি, তোমার লোক, কেউই পুলিশকে সারেং বাড়ির সদর দরজা পেরুতে দেবে না। আমি জানি, ভালো করেই জানি। তাই! এখন শেষবার একটা কথা বলি ভাই। পৃথিলাকে তার মতো ছেড়ে দাও। আজিজ মরবে, সেটা আমার হাতে হোক বা তোমার। তবে বাকি সবাই নির্দোষ।
— যদি না ছাড়ি! কি করবি তুই?
— তুমি যেই ঝামেলা চাও না, সেই ঝামেলাই করব।
— দাদির কথা একবারও ভাববি না তুই?
— ভেবেছি বলেই তো এখনো চুপচাপ। সব ভুলে যাও ভাই। তুমি তোমার জেদ থেকে একটু সরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। দাদি ভালো থাকবে। চাচার শেষ সম্বল তার মেয়ে। যখন দেখবে তার মেয়ে ভালো আছে, সে তার সব দুঃখ জেদ এমনিতেই ভুলে যাবে। কেননা জয়তুনকে ঘৃণা করলেও, এরশাদ, শাহবাজ, বীণা এদের ঘৃণা করার সাধ্য তার নাই। তাই ভুলে যাও ভাই, ভুলে গেলেই সবাই ভালো থাকবে।
— আর আমি?
—- সে তোমাকে ভালোবাসে না ।
— আয়না তোকে বাসে?
— না বাসলেও, ভরসা করে, মায়া করে। বিপদে পড়লে দৌড়ে আমার কাছে আসে। তবে তুমি পৃথিলার কোথাও নাই।
— দাদির হাতের ঝুনঝুনির জবান খুলেছে। অথচ তার এক মুখের কথার জন্য খুন করতেও তো এতোদিন একবার ভাবতি না। হঠাৎ করে এতো ভালো, হজম হচ্ছে না।
— জয়তুন আরার নাতি কেউই ভালা না ভাই। যদি ভালো হতো, বড় ভাইয়ের বুকে কোপ মারার জন্য কুড়াল হাতে নিত না।
এরশাদ শান্ত চোখে তাকালো। তখনই তার এক লোক দৌড়ে এসে বলল, — পুলিশ মোড়ে এসে পড়ছে ভাই।
এরশাদের ভাবান্তর হলো না। আসুক! এসেও লাভ নেই। দরজা ভেতর থেকে লাগানো। সারেং বাড়িতে প্রবেশ করা এতো সোজা না। এরশাদ চাইবে, একমাত্র তখনই। তাই এরশাদও আর সময় নষ্ট করল না। আপাতত শাহবাজকে কিছুদিনের জন্য আটকানো দরকার। শাহবাজকে আটকালেই সব রাস্তা পরিষ্কার। তাই তার লোকের দিকে তাকালো। তাকাতেই তারা শাহবাজ ধরতে এগোলো।
শাহবাজ হাসল, ঘাড় এই কাত করে ঐ কাত করতে করতে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে কুড়ালটা শক্ত করে মুঠো করে ধরল। আর তারপর যা হলো, আম্বিয়া দেখে এক চিৎকার দিল। তার চিৎকার সারেং বাড়ির প্রতিটা কোণায় ঝংকার তুলল। আর তুলল বলেই এই নিস্তব্ধ রাতে সবাই কেঁপে উঠল।
এরশাদ অবশ্য দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। তবে এক পলকে তাকিয়ে আছে। তার লোকেরা পিছু হটে গেছে। অবশ্য তাদের দোষ দিয়ে লাভ কি? দু- তিনটাকে শাহবাজ শুইয়ে ফেলেছে। আর এই ফেলার মাঝেই অনেক দিন পরে নিজেকে দেখল, ঐ যে যুবক বয়সের এরশাদ। তার ছোট ছোট ভাই বোন, দাদির জীবন বাঁচাতে বটি হাতে নিয়ে একের পর এক কোপ ফেলেছিল। তেমনি সারেং বাড়ির উঠোনে অনেক দিন পর সেই রকম কোপ পড়ল, রক্তে ভাসলো। তফাত এই যে, সেই দিন সে ছিল, আজ তার ছোট ভাই। সেই এক রাত তার জীবন নরক বানিয়ে দিয়েছিল। তার ভেতরে যে মানুষ বাস করত, সেই মানুষকে শেষ করে দিয়েছিল। জন্ম হয়েছিল এক পিশাচের। যেই পিশাচের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, তার পরিবার শেষ, যারা এর পেছনে তাদেরও শেষ হতে হবে। তবে শেষ করতে করতে সে সেই দিন, রাতের মতো আজিজের জায়গায় চলে এসেছে। এসেছে বলেই জয়তুন আরার দুই লাঠি, আজ দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে।
এরশাদ চোখ বন্ধ করল। তার কানে বাজল তার বাবার কথা, যে তার হাতে ছোট ছোট ভাই বোনদের হাত দিয়ে বলেছিল, ওদের দেখে রাখিস। আজ থেকে ওরা তোর আমানত।
এরশাদ সাথে সাথে চোখ খুলল। খুলে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালো। তাকালো শাহবাজও। রক্তে মাখা হাতে কুড়ালটা আরো শক্ত করে ধরল।
ততক্ষণে সবাই বেরিয়ে এসেছে। বেরিয়েছে সাবিহা, ইমরানও। সবাই হতবাক! হতবাক ভাবেই দৌড়ে গিয়ে বীণা এরশাদকে আড়াল করে দাঁড়ালো। ছোট ভাই তো কারোর পরোয়া করে না, যদি বড় ভাইকে কোপ দিয়ে বসে।
জয়তুন কাঁপতে কাঁপতে নিচে বসে পড়লো। আম্বিয়া এগিয়ে ধরলো। পাপ, আহা পাপ! পাপ ছাড়ে না বাপেরও। এই যে দুই প্রিয় নাতি, কি সুন্দর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। কার জন্য? তার জন্য। তার খুশি হওয়ার কথা। সে হতে পারলো না। যত কিছুই বলুক, পালছে তো বুকে রেখে। তাই হয়তো বুক কেঁপে উঠলো। আর উঠলো বলেই প্রথমবার জয়তুন নিজের দোষ স্বীকার করল। কাঁপতে কাঁপতে জাফরের উদ্দেশে আর্দ্র কণ্ঠে বলল, — জোছনাকে আমি খুন করেছিলাম। এই যে এই হাতে। এই হাতেই তোর সাথে আমি অন্যায় করেছিলাম। নে, যা শাস্তি দেওয়ার দে। তবুও এই পাপের বোঝা এখনই শেষ হোক।
জাফর থমকে গেলো। থমকে তার আম্মার দিকে তাকালো। কি বলে তার আম্মা?
জয়তুন জাফরের মুখটা দেখলো। দেখে প্রথম বার মনটা ছিঁড়ে যেতে চাইলো। যেই চোখে সম্মান দেখে আসছে, সেই চোখে ঘৃণা দেখা সহজ কথা না।
চমকালো বাকি সবাইও। তবে শাহবাজ নির্বিকার, এরশাদ হাসল, তার সেই সরলতা মাখা হাসি। হেসে বীণার মাথায় হাত রাখল। রেখে মমতায় হাত বুলিয়ে বলল, — ফরহাদকে বলিস, আমি তার গলায় সত্যিই ছুরি ধরতে পারতাম। অমানুষ তো, অমানুষরা সব পারে।
বলেই শাহবাজের দিকে এগোলো। এগিয়ে তার হাত থেকে কুড়ালটা টেনে নিল। ভাইয়ে ভাইয়ে মুখ দেখানো আহ্লাদ কখনও ছিল না। তবে আজ হাতের সাদা শার্টের কোণা টেনে ভাইয়ের রক্তে ছিটকে যাওয়া মাথা মুছল, মুখ মুছল, হাত মুছল। মুছতে মুছতে বলল, — সারেং বাড়িতে ভয়ংকর একজনই থাক। সেই ভয়ংকর মানুষটার হাতের আমানত তোরা। সেই আমানতের খুশির জন্য বাকি সবাইকে মাফ করলাম।
শাহবাজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এই ভাই যে তাদের বড় অচেনা। এই অচেনা ভাইকে চেনার চেষ্টায় চোখের কোণা লাল হয়ে গেলো। এরশাদ সেই লাল চোখের দিকে আর তাকালো না। তার প্রিয় ছোট চাচার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল, — তোমার মাকে আমার দাদি খুন করেছে। আমার পুরো পরিবারকে তোমার ভাই খুন করেছে। আর বাকি সব তো জানোই। নাও এবার সন্তান, স্বামী, বাবার দায়িত্ব পালন করো। আর তোমার মেয়েকে এরশাদ কোথায় রাখতে পারে আর কেউ না জানলেও তুমি জানো। এরশাদের এমন কোন কারবার নেই, এরশাদের প্রিয় চাচা জানে না।
বলেই সদর দরজা নিজ হাতেই খুলে দিল। দিয়ে ঘাটের দিকে যেতে যেতে তার বাকি লোককে বলল, — ইমরানের দরজা দিয়ে এদের হাসপাতালে নিয়ে যা। একটারও যেন দম না বেরোয়। আমার ভাইয়ের হাতে যেন খুনের দাগ না লাগে।
তারা সাথে সাথেই ইমরানের বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। আর শাহবাজ সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। পাথর হয়ে! পুরুষ মানুষ কাঁদে না, তবুও শাহবাজের চোখ থেকে টুপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বড় ভাইরা হারলে বুঝি এতোটাই কষ্ট লাগলে।আর তখনই পুলিশের জিপ গাড়ি এসে সদর দরজায় থামল।
থামতেই সব পুলিশ সারেং বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। তবে সাবেত দাঁড়ালো সদর দরজার সামনে। সে বাড়ির ভেতরে পা রাখল না। সেখান থেকেই জাফরের দিকে শান্ত চোখে তাকালো।
সেই শান্ত দৃষ্টির দিকেই জাফর চোখ তুলে তাকালো। সাবেতকে সে চেনে। পৃথিলার খোঁজ যখন ঢাকায় পেয়েছিল, তখন দেখেছে। না, হিংসে হয়নি। হিংসে করার মতো মানুষ জাফর না। বরং শায়লা ভালো আছে, জেনে ভালো লেগেছে। তবে এই লোকের সামনে পৃথিলাকে নিজের মেয়ে বলার সাহস তার হলো না। কেননা জন্ম দিলেই পিতা হওয়া যায় না। পিতা হতে হৃদয় লাগে, সাহস লাগে, কলিজা লাগে। এগুলো তার কোনদিনও ছিল না। সে সব সময় কাপুরুষই ছিল, আছে। তাই শান্ত ভাবেই বলল, — আপনার মেয়ে কোথায় আছে, আমি জানি। তবে তার আগে আমি কেইস ফাইল করতে চাই। আমার মায়ের খুনির নামে। আমার দ্বিতীয় স্ত্রী, বড় ভাই, ভাবি, আমার মেয়ে, তুল্য আম্বিয়ার মায়ের খুনির আবদুল আজিজের নামে। আর সাক্ষী দিতে চাই আমাদের গ্রামে যত মানুষ গায়েব হয়েছে, আর আপনার মেয়ের প্রাক্তন স্বামী তারেকের খুনি এরশাদের বিপক্ষে।
সাবেতের কোন ভাবান্তর হলো না। তার সব চিন্তা তার মেয়েকে নিয়ে। সে শান্তভাবেই বলল, — আমার মেয়ের কাছে নিয়ে চলুন।
— যাচ্ছি।
— আমার মেয়ের অপরাধী কে?
— এরশাদ।
— সে কোথায়?
— আছে, সে পালাবে না। চিন্তা নেই।
— পালালেও আমি তাকে ছাড়বো? আমার মেয়ের এক একটা চোখের পানির হিসেব দিতে হবে।
জাফর উত্তর দিলো না। তার কেন জানি মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এই যে এই লোকটা, এই লোকটার সামনে নিজেকে এতো ছোট মনে হচ্ছে। সে ঘরে যাওয়ার জন্যই পা বাড়াতেই ধপ করে পড়ে গেলো।
শাহবাজ ইমরান সবাই দৌড়ে ধরলো। ধরতেই শাহবাজকে বলল, — তাড়াতাড়ি থানায় যা। এরশাদ তার বাবা মায়ের লাশ ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছে, মৃত্যুর আগে হলেও বাবা মায়ের খুনিকে শেষ করবে। আর আজিজ থানায়। মিঠাপুকুরে এমন কোন কাজ নেই সে করতে পারে না। আমার এরশাদের হাতে আর কোন পাপ না হোক।
সাবেত শুনে হাসলো! শাহবাজ সেই হাসি আগুন চোখেই দেখলো। তবে সময় নষ্ট করলো না। দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। থানার ভেতরে এমন কিছু করলে, ভাইকে কোনদিনও আর বাঁচানো যাবে না।
হঠাৎ করেই পুরো থানা অন্ধকারে তলিয়ে গেল। নতুন কিছু না। দিন, রাত কারেন্ট আসে যায়। ঘড়ির কাঁটা তখন বারোটার ঘরে। মহাজনকে থানায় আনার পর সরগরম থাকলেও, অফিসার সারেং বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়ার পরে আস্তে আস্তে কমেছে। এখন নেই বললেই চলে। কনস্টেবল আছে এক, দুজন। এখানে, ওখানে ঝিমুচ্ছে। কারেন্ট গেছে, আলো জালালোর কোন তাড়া তাদের মধ্যে দেখা গেলো না।
সেই না, যাওয়ার মাঝেই আজিজ খেয়াল করল, তার সেলের তালা খোলা হচ্ছে। অন্ধকারে সে কিছুই বুঝলো না। তবে একটু খেয়াল করতেই জ্বলজ্বল করা দুটো চোখ দেখল। দেখে কিছু বলবে, তার আগেই কেউ মুখ চেপে ধরল। ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—- ইচ্ছে ছিল অনেক শাস্তি দেওয়ার। আমি যেমন রাতের পর রাত ছটফট করেছি, সেইভাবেই ছটফট করে করে শাস্তি দেওয়ার। তবে তোর কপাল ভালো, খুব কম শাস্তিই দিলাম।
বলেই ব্লেড দিয়ে গলায় এক টান দিল। আজিজ ছটফটিয়ে উঠল। শক্ত পোক্ত এরশাদের সাথে তার পারার কথা না। তাই গলা দিয়ে একটু শব্দও বের করতে পারল না। তবে চোখের সামনে শুধু একটা মুখই ভেসে উঠল, — তার প্রিয় সন্তান, ফরহাদ।
ফরহাদের মুখটাই আস্তে আস্তে ঘোলা হতে লাগল। আর আবদুল আজিজ সেই ঘোলা চোখ নিয়েই শরীর ছেড়ে দিল। এরশাদ সেই ছেড়ে দেওয়া শরীর রাস্তার কীটের মতো ছুড়ে ফেলল। ফেলেও কেন জানি শান্তি হলো না। এত সহজ মৃত্যু! এটা তার মন মানতে পারল না। তাই লোহার সিকের পাশে কুড়ালটা রেখেছিল। সেটা হাতে তুলে নিল। নিয়ে মনে মনে বলল, — পৃথিলা, আপনার ধারণা ঠিক। এরশাদ আসলেই পাগল। বলেই এগিয়ে গেল।
আর নিস্তব্ধ থানার সব কনস্টেবলরা কোন কিছুর শব্দে চমকে উঠলো। চমকে ধড়ফড়িয়ে উঠল ফরহাদও। নিজের রুমের টেবিলে মাথা রেখেই ক্লান্ত ভাবে চোখ লেগে গিয়েছিল। আর উঠতেই অন্য রকম এক অস্থিরতায় ভেতরটা ছটফট করে উঠলো। যেই পিতার প্রতি ঘুমানোর আগ পর্যন্তও ঘৃণা গলায় দলা পাকিয়ে ছিল, সেই ঘৃণা কোথায় যেন উবে গেল। বাবার কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য মন অস্থির হয়ে গেল। তাই আর দেরি করল না, নিজের অজান্তেই দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।
চলবে…..

