#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৪
নিশাতের অফিসে আজ দুনিয়ার ব্যস্ততা। উপর থেকে স্যার এসেছে। বছরে দু’তিন বার এমন তারা আসেন! এটাও তাদের দায়িত্ব। তাদের কাজগুলো ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তার রিপোর্ট দিতে হয়, রিপোর্ট অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, নিজেরা এসে চেক করেন।
এই ব্যস্ততার মাঝে সজল ভাই এসে হাজির। নিশাত বিরক্ত মুখে বললো, — আজকে আবার কোন প্ল্যান নিয়ে এসেছো?
সজল হালকা হাসলো! হেসে চেয়ারে বসতে বসতে বললো, — এক ঘন্টা সময় দিলাম। যা যা কাজ করার কর। তারপর তুলে নিয়ে যাবো।
নিশাত কথা বাড়ালো না। কথা বাড়ানোর সময় অবশ্য নেই ও। যেই টিউবয়েলগুলো পাস হয়েছে সেগুলোর জন্য স্যাররা রাউন্ডে যাবেন। তাই দুনিয়া এখন জাহান্নামে যাক। সে বেরিয়ে গেলো।
ফিরলো ঘন্টাখানেক ফিরে। ফিরে দেখলো সজল ভাই সত্যি সত্যিই বসে আছে। আরে ভাই, কোন দরকার পড়ল আবার। সে এসেই বললো, — কাহিনী কি খুলে বলে তো? বিয়ের কথা শুনে আবার তারটার ছিঁড়ে যাইনি তো। আগেই বললাম কোন গন্ডগল করবে না।
সজল দাঁড়ালো! দাঁড়িয়েই মাথায় ঠাস করে একটা চাটি মারলো। মেরে বললো, — আর কোন কাজগিরি দেখিয়েছিস না খবর আছে তোর।
নিশাত মাথা ডলতে ডলতে বললো, — এতো জোরে মারে? মাথায় একটু আঘাতে কত ক্ষতি হতে পারে জানো?
— তোর আর নতুন করে কি ক্ষতি হবে? জন্মগত’ই তোর সব তারছেঁড়া।
— তারছেঁড়া থাক যা’ই থাক, মহামূল্যবান এক ঘিলু আছে। সেটার কথাতো আমার’ই ভাবতে হয়।
— আর একটাও কথা না, চল।
— কোথায়?
সজল নিশাতের দিকে শান্ত চোখে তাকালো। দৌড়াদৌড়ির জন্য নেয়ে ঘেমে একাকার সে। তবে আর কোন কথা বললো না। হাত বাড়িয়ে হাত ধরলো। সজলের বুক কাঁপলো! সেই কেঁপে উঠা পুরো উপেক্ষা করে নিশাতকে টেনে নিয়ে গেলো।
নিশাত বাড়ির সামনে এসে বললো, — বাড়িতেই আনবে তো এতো টেনে ছিঁচড়ে আনার কি হলো? আমি ভাবলাম কিডন্যাপ টিডন্যাপ করছো নাকি আবার। ছ্য্যঁকা খেয়ে মানুষ কতো রকম আকাম কুকাম করে। কলিজা তো আমার ধক ধক করছিল।
— তোর আবার কলিজা আছে নাকি?
— নেই?
— না।
— তাহলে কি আছে?
— কিছুই নেই। তুই হচ্ছিস রোবট।
— ছ্যাঁকা খেয়ে তোমার মাথা সত্যিই গেছে।
— আমি ছ্যাঁকা খেয়েছি?
— কি জানি তুমিই জানো? আমি ভাই আগে পিছে নেই।
— এজন্যই তো বললাম তুই রোবট।
— রোবট রোবট করবে না, নাক ফাটিয়ে দেবো।
— এই ছাড়া পারিস কি তুই?
নিশাত আবারো কিছু বলতে যাচ্ছিলো! তবে তাদের বসার রুমে পা রাখতেই থমকে দাঁড়ালো। রুমের চেহেরা আজ বদলেছে। কেন বদলেছে আন্দাজ করতে পারলো। সে দাঁড়িয়েই চোখ পাকিয়ে তাঁকালো। সজল জুতো খুলছে। খুলতে খুলতে বললো, — এই বাড়ির মেয়ে তুই। কাজি অফিসে বিয়ে করবি কেন? বাবা না থাক গার্ডিয়ান অবশ্যই আছে। তো বিদায় হলে এ বাড়িতে থেকেই হবি।
— আমাকে বিদায় করতে তোমার কলিজা কাঁপবে না?
— কাঁপলে কি করবি, আমার হবি?
— না।
— তাহলে এতো কথা বাড়াচ্ছিস কেন?
— এমনিই।
সজল বড় একটা শ্বাস ফেললো! ফেলে রুমের দিকে গেলো। নিশাতও আর দাঁড়ালো না। সোজা নিজের রুমে চলে গেলো। এ রুমে এসেও টাস্কি খাওয়ার জোগাড়। বিয়ের শাড়ি টাড়ি থেকে দুনিয়ার কিছু এসেছে। সে কিছু ছুঁয়েও দেখলো না। তার মা কোথায়?
সুলতানা বসে আছে রান্না ঘরে। না এখন আর তার চোখে পানি নেই। বসে আছে শুষ্ক চোখে। হেনা সারা জীবন ঝিম মেরে থাকলেও আজ সে বড়ই উৎফুল্ল।অবশ্য মনে হয় না বিয়ের জন্য । দুনিয়ার বাজার সদাই এসেছে। সেগুলো নিয়েই তিনি মহাব্যস্ত। তার ভাইয়ের বউদের খবর দিয়ে এনেছে। তারাও হাতে হাতে করছে।
জালাল উদ্দিন গেছে আশে পাশের কয়েকজন মুরব্বি ডাকতে। যে বেয়াদব মেয়ে! সংসার করতে পারবে না সে জানে। তার মধ্যে আগুনের গোলা শাশুড়ি। ছয় মাস টেকে কিনা সন্দেহ। সেই তার ঘাড়ে এসেই জুটবে। অবশ্য দুনিয়ার সয়- সম্মত্তি পাচ্ছে। নাও জুটতে পারে। তবে এমনি এমনি ছেড়ে দেবে তা তো না। দায়িত্ব নিয়েছে ফেলে দিতে পারে? তাই এই মুরব্বিদের নিয়েই তখন চেপে ধরতে পারবে। সংসার না করুক কাবিনের টাকা টা উসুল করা যাবে।
নিশাত রান্না ঘরে এসে দেখলো তার মা চুপচাপ বসে আসে। সে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু মুড়ে তার পাশে বসলো। বসতেই সুলতানা বললো, — আমি সব সময় চেয়েছি আমার মেয়ের জীবন আমার মতো না হোক। অবুঝ ছিলাম! মোহ পড়ে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে হাত ধরে পালিয়ে গেছি। কোন মুরব্বি নেই, কোন আত্মীয়- স্বজন নেই, গায়ে গয়না তো ভালোই সাধারণ একটা শাড়িও নেই। থ্রিপিসের ওড়নাটা মাথায় দিয়েই অচেনা এক কাজি অফিসে কবুল বলেছি। সাইন করেছি নিজের ধ্বংশের খাতায়। মেয়েদের বড় শত্রু কি জানিস? সে নিজে! চোখের সামনে সব থাকে তবুও তারা ভালোবাসে কল্পনার জগতে ঘুরতে। সেই ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করে এক সময় বাস্তবতার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে। পড়ে কেঁদে মরে বলবে তার সাথেই কেন এমন হলো? অথচ সব কিছু তার সামনে ছিল, সে ইচ্ছে করেই দেখেনি।
সুলতানার চোখে পানি চলে এসেছে। সে আঁচল দিয়ে পানি মুছে বললো, — আমার কি আর সাধ্য আছে ভাগ্য বদলাবো। তবে কিছু কিছু জিনিস আমি বদলাতে পারি। আমার মেয়ের বিয়ে আমার মতো না হোক। তার বিয়ে হোক তার চেনা গন্ডির মধ্যে। তার গায়ে বিয়ের শাড়ি হোক, গহনা হোক বলেই সাইড থেকে হলুদের বাটি থেকে একটু হলুদ নিয়ে নিশাতের কপালে ছোঁয়ালেন। ছুঁয়ে আবার বললেন, — হলুদের ছোঁয়া হোক। হাতে মেহেদির রং হোক সাথে স্বপ্ন জোড়া রঙিন সংসার হোক।
নিশাত হাসলো! সুলতানা আলতো করে নিশাতের গালে চাপড় মারলো। মেরে বললো, — খবরদার হাসবি না। তোর এই হাসি দেখলে মেজাজ খারাপ হয়। মেয়ে মানুষ কথায় কথায় এতো ঠোঁট ভেটকাবে কেন?
নিশাত কিছু বললো না। মায়ের আঁচল নিয়ে কপালের হলুদ ঘষে মুছে ফেললো। সুলতানা শুধু তাঁকিয়ে তাঁকিয়ে মেয়ের কান্ডকারখানা দেখলো। মেয়েটাকে তিনি কখনো বুঝতে পারে না। অবশ্য কাওকেই পারে না।
নিশাতের বর যাত্রী এলো রাতে। সুর্বণা আসে নি তবে নিতু এসেছে, এসেছে মাহফুজ, নিনিত। ওয়াহিদ তেমন কাওকে বলেনি। ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মাঝে দু- জনকে বলেছে।
নিতু মুখ কালো করে বসে আছে। না এই বিয়ে নিয়ে আহামরি কোন আঙ্খাকা নেই। তবে নিশাতকে দেখে তার মেজাজ খারাপ হয়েছে। নতুন বউয়ের কোন হাবভাব সে দেখলো না। এসে দেখলো স্বাভাবিক ভাবেই এই রুম থেকে ঐ রুমে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এই তো কিছুক্ষণ আগে দেখলো স্টিলের এক জগে চা নিয়ে কিচেন রুম থেকে হেঁটে নিজের রুমের দিকে গেলো। এখন অবশ্য গায়ে তাদের দেওয়াই বিয়ের শাড়ি গহনা। কোন রকম পরেছে দেখাই বুঝা যাচ্ছে। নিচ দিয়ে শাড়ির কোণা ফ্লোরে লুটোপুটি খাচ্ছে।
সে বিরক্ত চোখে ভাইয়ের দিকে তাঁকালো।ওয়াহিদের মনোযোগ মোবাইলে! নিশাতের ঘিয়ে রঙের শাড়ির সাথে তার গায়ে ম্যাচিং পাঞ্জাবি। সে কিনেনি! তার এক বন্ধুর বউ ফ্যাশন ডিজাইনার। বিয়ের কথা শুনেই গিফ্ট করেছে। নিশাতের যেমন নতুন বউয়ের মতো কোন হাবভাব নেই, তার ভাইয়ের মাঝেও নেই। সে সব সময়’ই শান্ত এখনো শান্ত ভাবেই আছে। এই যে নিশাত এসেছে পর থেকে তাদের নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একবার ফিরে তাকিয়েছে কিনা সন্দেহ।
সে বিরক্ত মুখেই বসে রইলো। মাহফুজ এক কেটকে মেয়ের সাথে আলাপ জুড়েছে। এই মেয়েটারও হাব ভাব ভালো ঠেকছে না। একবার দেখলাম ভাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে, — এতো লম্বার রহস্য কি?
কেমন বিটকা মেয়ে। লম্বা হওয়ার আবার রহস্য কি? বাবা, মা যে সাইজের সেই সাইজের’ই তো যাবে। তাদের সাইজ যদি হয় মটর দানা তারা কি আর আমের আঠি হবে?
কথায় আছে সাত ঝামেলা না লাগলে বিয়ে হয় না। তবে নিশাত আর ওয়াহিদের বিয়ে হলো পুরো নির্ঝঞ্ঝাট ভাবে। নিশাত কুবুল বললো স্বাভাবিক ভাবে, ওয়াহিদও বললো তার মতো। তার মতো বললেও বিয়ে পড়ানোর শেষে চোখ তুলে প্রথম তার বধুর দিকে তাঁকালো।বাড়ির হাতের সাঝ। কোন বাড়তি আড়ম্বর নেই। বিরক্ত মুখে চোখ মুখ কুঁচকে বসে আছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই আয়োজন পছন্দ হয়নি। সে মনে হয় শটকাটে ঝামেলা সারতে চেয়েছিল।
ওয়াহিদ চোখ ফিরিয়ে নেবে তখনি নিশাত তাঁকালো। আর ঠিক তখনি দু- জনের চোখে চোখ পড়ল। ওয়াহিদ চোখ ফেরালো না তবে নিশাত মুখ ফিরিয়ে নিলো। ফিরিয়ে নিলেও জানে ওয়াহিদের দৃষ্টি এখনো তার দিকেই। সে না তাঁকিয়েই মুখ বাঁকালো। বাঁকিয়ে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো, — ছ্যাঁচড়া।
ওয়াহিদ হেসে ফেললো। আর কেউ খেয়াল না করলেও নিতু ঠিক দেখলো। দেখতেই তার মাথায় যেন ঠাটা পড়লো। তার ভাই হাসছে? সে সাথে সাথে তার মাকে ম্যাসেজ করলো। “তোমার ছেলে গেছে। মুখে তালা মেরে বসে রইলে তো। এখন দেখো এই মেয়ে কিভাবে মায়ের আঁচল থেকে টেনে নিজের আঁচলে বাঁধে। ”
বিদায়ের বেলা নিশাতের চোখে মুখে কোন বিষাদ দেখা গেলো না। সুলতানা, সজল দু’জনের একজনও রুম থেকে বের হলো না। নিশাতও না কাউকে খুঁজলো, না কাউকে বললো। নিজের মতোই বেরুলো। বেরুতে গিয়ে তাদের চিকন সিঁড়ি মধ্যে সেই বেরিয়ে থাকা শাড়ির কোণায় পা লেগে উষ্ঠা খেতে যাচ্ছিলো। ওয়াহিদ হাত ধরে ফেরালো! নিশাত সেই হাতের দিকে তাঁকালো। তখনি ওয়াহিদের এক বন্ধু বললো, — এক মিনিট! এক মিনিট। ওয়াহিদ এভাবেই থাক ভাই। বলেই মোবাইল বের করে ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললো।
সুবর্ণা ভিলায় নিশাত এলো তখন ঘড়ির কাটায় দশটা পেরিয়ে গেছে। নিশাত গাড়ি ভেতর থেকেই বাড়িটার দিকে তাঁকালো। নিশ্চুপ, শান্ত বাড়ি। তবে আলোতে ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল করা আলো পেরিয়ে তাদের গাড়ি বাড়ির সামনে যেতেই ওয়াহিদ নিজেই বেরিয়ে দরজা খুললো।
নিশাত কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসলো। তারপর নেমে দাঁড়াতেই দেখলো, বাড়ির মেইন ফটকে সুবর্ণা দাঁড়িয়ে আছে। তার সাথে বেশ কয়েকজন মানুষ। এই মানুষ গুলো তার পরিচিত। সুবর্ণার মা আরো কিছু আত্মীয়- স্বজন। বয়সের ভাজে পরিবর্তন এলেও নিশাতের চিনতে সমস্যা হলো না। সে সুবর্ণার দিকে চোখ রেখেই এগুলো। এবার অবশ্য শাড়িতে পা বাজলো না। তবুও পড়ে যেতে নিলো।
এবারো ওয়াহিদ ধরলো! তার বন্ধুরা শিস বাজিয়ে বললো, — কোলে নাও বন্ধু। সময় সুযোগ করে দিচ্ছে। এই সময় আর ফিরে আসবে না।
ওয়াহিদ অবশ্য কোলে নিলো না। দরজায় মা, নানি, মামিরা দাঁড়িয়ে। সে নিশাত কে গুছিয়ে দাঁড় করালো। তবে হাত ছাড়লো না। নিশাত সেই ধরা হাতের দিকে তাঁকিয়ে সুবর্ণার দিকে তাঁকালো। তাঁকালো সুবর্ণাও। তার দৃষ্টি দেখে বোঝার উপায় নেই। তার ভেতরে আগুন জ্বলছে, দাউদাউ করা আগুন। এক মমতায় হয়েছে সে হিংস্র আরেক মমতায় হতে হচ্ছে তাকে শান্ত।
চলবে……

