#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ১৬
নিশাত বের হলো একেবারে রেডি হয়ে। গায়ে তার মেরুন রঙের থ্রিপিস। মাথায় হালকা ঘোমটা। নাকে হীরের ছোট্ট নাকফুল। সুবর্ণা নিশাতকে দেখলো খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ঘোমটা নাকফুল ছাড়া বিয়ের কোন লক্ষণ তিনি দেখতে পেলেন না। তাই শান্ত ভাবেই বললেন, — কোথাও যাচ্ছো?
নিশাত একেবারে গলে গেল। যাবে না কেন? শাশুড়ি মা বলে কথা! শ্বশুর বাড়িতে শান্তির প্রধান মন্ত্র হলো শাশুড়ি। শাশুড়ি ঠান্ডা, পুরো দুনিয়া ঠান্ডা। সে ভাই আগেই বলেছে সে শান্তি প্রিয় মানুষ। এখন শান্তির উৎসকে গলার মালা বানাবে না তা হয়? তাই তাকে খেয়াল করেনি এমন ভাবে জিভ কাটলো। কেটে সোজা এগিয়ে গেলো সালাম করতে। সুবর্ণা কিছুটা হকচকিয়ে গেলো। হকচকিয়ে বললো, — এসবের কোন প্রয়োজন নেই।
নিশাত হালকা হাসলো! সোজা দাঁড়িয়ে বললো, — স্যরি মা! আসলে ঘুমোতে ঘুমোতে খুব রাত হলো। আপনার ছেলেই বললো, – কফি খাবে? আমরা গরীর মানুষ। কফি টফির অভ্যাস আছে নাকি। খেয়ে ঘুম উধাও। গল্প করতে করতে কখন যে সময় গড়ালো বুঝতেই পারেনি। তাই সকালে উঠতে দেরি হয়ে গেলো। আপনার ছেলেকেও দেখুন একটু ডেকে যাবে তো নাকি?
সুবর্ণা শান্ত চোখেই নিশাতের দিকে তাঁকিয়ে রইল। মেয়েটাকে সে বুঝতে পারছে না। তবে এইটুকু ঠিকিই বুঝেছে সুলতানার মতো সহজও না। তবুও ভেতরে কোথাও যেন জ্বলে উঠল। তার ছেলে, এই মেয়ের সাথে একই রুমে একই খাটে। সে নিজেকে শান্ত রেখে আগের মতোই বললো, — কোথায় যাচ্ছো?
— অফিসে! হঠাৎ বিয়ে। ছুটি ছাটা তো নেওয়ার সুযোগ পেলাম না। তবে আজকে গিয়েই সপ্তাহ খানের নিয়ে আসবো। নতুন বউ এমন ডিং ডিং করতে করতে অফিসে যাবে ভালো দেখায় বলেন?
সুবর্ণা কিছুক্ষণ আগের মতোই তাঁকিয়ে রইলো। তারপর বললো, — দাঁড়িয়ে আছো কেন বসো।
নিশাত এগিয়ে সুবর্ণার পাশে বসলো। সুবর্ণা আগের মতোই বললো, — আমি জানি আমাদের সম্পর্কটা আর দশটা মানুষদের মতো না। অনেক তিক্ততা আছে। তবে যা গেছে তা আর মনে রেখে লাভ কি? আমি একা মানুষ! ওয়াহিদ বলতে গেলে সারাদিন বাইরে বাইরে। নিতু নিতুর মতো! আমি এমন একটা বউ চেয়েছিলাম যে সংসারটা আলো করবে। আমার ছেলেকে ঘর মুখো করবে। পছন্দও ছিল! আমার বোনের মেয়ে। যেমন দেখতে সুন্দর তেমনি ভদ্র মেয়ে। ওয়াহিদ আবার তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবে না। এখন সব আশা ভরসাতো তোমার কাছেই রাখবো, তাই না?
— অবশ্যই! আপনি বলুন আমাকে কি করতে হবে।
— কিন্তু তুমি তো অফিসে যাচ্ছো।
— আমার আরামের চাকরি মা । মানছি এখন অনেকটা দূর হয়ে গেছে। তবে আমি ম্যানেজ করে নেবো।
— আসলে ওয়াহিদ এখনো অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কিছু বলেনি। হয়ত সব ম্যানেজ করে বলবে। তবে আমি তো আত্মীয়- স্বজন নিয়ে থাকি। দুপুরে তো সম্ভব না। তাদের যদি রাতে ডিনারের ইনভাইট করি। তুমি সব ম্যানেজ করতে পারবে? আসলে খারার টাবার তো সবাই সবার বাসাই খায়। আমার বাসায়ও কাজের লোক আছে। তবে নতুন বউদের কাছে সবাই একটু আশা রাখে।
— অবশ্যই ! আপনি কোন টেনশন করবেন না। আমি দুপুরের কিছুটা পরপর’ই এসে হাজির হবো। বুঝতেই পারছেন, কালকেও হাফ ডে করেছি। আমার তো আর আপনার ছেলের মতো বাপের অফিস না। বসে বসে বসগিরি করবো।
সুবর্ণা ভ্রু কুঁচকে তাঁকালো। মেয়েটা অতি স্বাভাবিক ভাবে যে কোন কথা বলতে পারে। এতোটাই স্বাভাবিক যে কোনটা খোঁটা, কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ কিছুই ধরা যায় না। তখনি মাহফুজ নামলো। নিতু এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। সেই মহারাণী নিজের মতো চলে। এমন চলে দেখেই শ্বশুর বাড়িতে পা রাখতে চায় না। নিশাত হেসে বললো — আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া।
মাহফুজও হকচকিয়ে গেলো। সে ভাবে নি এভাবে কথা বলবে। কালকে যে মুখ করে বসে ছিল। সে ভেবেছে নিতুর টাইপ’ই মনে হয়। বিয়ে নিয়ে তো কোন মাথা ব্যথা দেখলো না। নিজের মতো ঘুরছে ফিরছে। তাই সে হকচকিয়ে সালাম নিলো।
— নাস্তা করেছেন ভাইয়া?
— না, এখনো করা হয়নি।
— আসুন না একসাথে করি। আমারও করা হয়নি।
— না ঠিক আছে। আপনার দেরি হতে পারে ।
— একদম না, আসুন তো। আমার হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখের চাকরি। একটা টিউশনিও করতাম। আর যাওয়া হবে না মনে হয়। আহারে সায়ান বাবাটা! যাক সায়ানের দুঃখ নিনিতকে দিয়ে ভুলবো, বলেই নিশাত এগিয়ে গেলো। নিজেই সব কিছু মাহফুজকে এগিয়ে দিলো। মাহফুজ অবাক হয়ে বললো, — ভাবি আপনি বসুন। কাজের লোক আছে তো, তারা দেখবে।
— কি যে বলেন না ভাইয়া। হাজার কাজের লোক থাক। যত্ন, ভালোবাসা এগুলো কি কাজের লোকের কাছে পাওয়া যায়। এই যে দেখুন আপনার ভাইয়া, বিয়ের প্রথম সকালেই গায়েব। এক সাথে নাস্তা করবো তা না। আর আসবে এই রকম সকাল বলেন?
মাহফুজ নিশাতের দিকে তাঁকালো। নিশাত আগের মতোই হাসলো। হেসে সুন্দর করে গুছিয়ে মাহফুজকে সব এগিয়ে দিলো।
সুবর্ণা ড্রইংরুম থেকেই শান্ত চোখে তাঁকিয়ে রইল। তখন তার মা তার পাশে বসলেন। বসতে বসতে বললেন, — নিজের সন্তান নিজের সন্তান’ই হয়। এই যে আমার মেয়ে সারমিন। কতোটা দুঃখে নিজের জীবন দিয়েছে। সে যদি তোর সন্তান হতো এতো সহজে মেনে নিতে পারতি?
সুবর্ণা উত্তর দিলো না। সে নিশাতের দিকে আবার তাঁকালো! সে খুব হেসে হেসে মাহফুজের সাথে কথা বলছে। নাস্তার প্রতিটা সময় সুবর্ণা খুব নিঁখুত ভাবে খেয়াল করলেন। খেয়াল করলো মাহফুজকেও। এই বাড়িতে এলে তার মুখে হাসি দেখা যায় না। শুধু যেন দায়িত্বের জন্য আসা।
নাস্তা করে সুবর্ণার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তারা এক সাথেই বেরুলো। মাহফুজ যখন আসে বেশ কিছুদিন এখানেই থাকে। এখান থেকে অফিস করে। তারা বেরুতেই সুবর্ণা বললো, — মমতা হাত বেঁধে ফেলেছে মা। নাজিম আমার কেউ ছিল না, সুলতানাও কেউ না। তারা থাকুক, মরুক, বাঁচুক তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তবে এবার আমার সন্তান মা। চলে গেলে আমি যে মরে’ই যাবো।
আফসানা হক বিরক্ত মুখে অন্য পাশে তাঁকালেন। সুবর্ণা চোখ বন্ধ করে সোফায় মাথা রাখলেন! রেখে বললেন, — আমার ছেলে তাকে এনেছে, ছেলেই ধাক্কা দিয়ে বের করবে। সুবর্ণার চুল পাকতে পারে বুদ্ধি না।
মাহফুজ বাইরে এসে বললো, — চলুন না ভাবি আমি পৌঁছে দিচ্ছি।
নিশাত কিছু বলবে তার আগেই এক লোক এসে বললো, — স্যার আপনার জন্য আলাদা গাড়ি রেখেছে ম্যাডাম। নিশাত শুনেও শুনলো না। মাহফুজকে বললো, — আপনার সমস্যা হবে নাতো?
— কি যে বলেন ভাবি। কিসের সমস্যা আসেন তো?
নিশাত এগিয়ে গেলো। যেতে যেতে হাত দিয়ে নিজের দু’ চাপা একটু মালিশ করলো। মাহফুজ দেখে বললো, — কোন সমস্যা?
— একদম না ভাইয়া!
— আমি কিন্তু আপনাকে অন্যরকম ভেবেছিলাম।
ভেবেছিলাম খুবই কঠিন টাইপ কেউ।
নিশাত হাসলো! হেসে বললো, — আসলে ভাইয়া সব সময় আমরা যা দেখি তা সত্যি হয় না।
— একদম ঠিক বলেছেন। প্রমাণতো আমার সামনেই। ভাইয়া খুব লাকি।
নিশাত আগের মতোই ঠোঁট ভ্যাটকালো। ভেটকিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলো। বসতে বসতে বললো, — আপনিও খুব লাকি। নিতুর মতো জীবন সঙ্গি পেয়েছেন।
মাহফুজ হাসলো! এ হাসি অবশ্য আগের মতো প্রাণবন্ত না। নিশাত দেখলো, দেখে রাস্তার দিকে তাঁকালো। তার ঠোঁটের কোণে আগের মতোই হাসি।
নিশাত অফিসে এসে দেখে একটা মেয়ে চুপচুাপ বসে আছে। মেয়েটাকে তার চেনা চেনা লাগলো। এতো মানুষ এখানে আসে বিশেষ ভাবে কারো চেহেরা মনে রাখা সম্ভব হয় না। নিশাত চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললো — তোমার নামটা যেন কি?
মেয়েটা একটু মলিন ভাবে হাসলো! হেসে বললো, — আফিয়া।
নাম শুনেই নিশাতের ঝট করে মনে পড়ে গেলো। আরে হ্যাঁ! সেই মেয়েটা। নিশাত ভালো করে মেয়েটার দিকে তাঁকালো, আগের চেয়ে অনেকটা শুকিয়ে গেছে,চোখের নিচে কালি জমেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ঘুম, আরাম তো ভালোই। ঠিক মতো খাবারও খেতে পেয়েছে কি না সন্দেহ।
সে একটা দীর্ঘ ছেড়ে বললো — দেখো কিছু দিনতো সময় লাগে’ই। কে কে পাবে এই লিস্টটা আমাদের হাতে এলেই আমরা সবাইকে জানিয়ে দেই।তোমার কষ্ট করে এখানে আসার প্রয়োজন নেই। যদি তোমার নাম আসে আমরা ফোন করে জানিয়ে দেব।
আফিয়ার মুখটা কালো হয়ে গেল। চোখটা ছলছল করছে। নিশাত কিছুক্ষণ তাঁকিয়ে রইল। তারপর এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে বললো –তোমার হাসবেন্ড কি করে।
আফিয়া হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাসটা নিলো। নিয়ে অবশ্য মুখে তুললো না। হাতে নিয়ে মাথাটা নিচু করে চুপচুাপ বসে রইল।
— বলতে সমস্যা থাকলে বলতে হবে না।
আফিয়া আস্তে করে বললো– নেই!
— নেই মানে?
— ফেলে চলে গেছে! গার্মেন্টসে কাজ করতো। সেখানের এক মেয়ের সাথে। বাবা কাজ করে এক খাবার হোটেলে। তাঁর অল্প আয়ে সংসার চালানোই মুশকিল। এই সন্তানের দায়িত্ব নেবে কিভাবে। ফেলে দিতে বলে। ফেলতো দিতে পারি না আপা। কলিজায় টান লাগে। তার কি দোষ?
নিশাত হাসলো! হেসে বললো, — তার দোষ সে তোমার হাসবেন্ডের সন্তান। রক্তের দোষের চেয়ে এই পৃথিবীতে আর বড় কোন দোষ নেই। বলেই মোবাইল তুলে নিলো। নিয়ে ফোন দিতে দিতে বললো, — যেই নাম্বার দিয়েছো, সেটায় বিকাশ নাম্বার আছে?
আফিয়া মাথা নাড়লো। সে ফোন করেছে ওয়াহিদকে, ধরলো আসিফ। তার স্বভাব মতো অতি ভদ্র ভাবে বললো, — আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম।
— ওয়া আলাইকুমুস সালাম আসিফ সাহেব। যতদূর মনে পড়ে এটা আপনার স্যারের নাম্বার।
— জ্বি ম্যাডাম! তবে স্যার মিটিংয়ে আছেন।
— এই দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় মিটিং হলো বউয়ের সাথে। বউয়ের সাথে মিটিং বন্ধ এই দুনিয়ার সব কার্যক্রম বন্ধ। এখন আপনার স্যারকে দিন। পাঁচ সেকেন্ড সময় দিলাম। তা না হলে আপনাদের সব কার্যক্রম বন্ধের ব্যবস্থা আমি করবো।
আসিফ দৌড়ে গেলো! এই মেয়ের ভরসা নেই। দৌড়েই কনফারেন্স রুমে সোজা ঢুকে গেলো। ওয়াহিদ বিরক্ত চোখে তাঁকালো। আসিফ অসহায় ভাবে বললো, — স্যার নিশাত ম্যাডাম লাইনে আছেন?
সবার দৃষ্টি ওয়াহিদের উপরে। সে খুক খুক করে কাশলো! এমন ঘটনা এই অফিসে প্রথম। তাই কেশে একটু হেসে বললো, — মাই ওয়াইফ! হয়তো ইমারজেন্সি। বলেই ওয়াহিদ উঠল। টান দিয়ে আসিফের হাত থেকে মোবাইল নিয়ে গটগট করে নিজের কেবিনে চলে এলো।
কনফারেন্সের সবাই অবাক হয়ে তাঁকালো! স্যার বিয়ে করেছে নাকি? আসিফ হেসে বললো, — এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। স্যারের বিয়ের বয়স এই কোম্পানির সমান সমান। তাই কষ্ট করে দু- মিনিট ওয়েট করুক।
ওয়াহিদ এসে হ্যালো বলতেই নিশাত বললো, — একটা একাউন্ট নাম্বার সেন্ড করছি। আমার সব ক্যাশ সেখানে ট্রান্সফার করুন।
— করছি।
— ধন্যবাদ বলেই নিশাত ফোন রাখতে গেলো ওয়াহিদ বললো, — শুধু এই কারণেই ফোন দিয়েছিলে?
— হ্যাঁ!
— এটা আসিফের কাছেও বলা যেত।
— আসিফের কাছে আমি কেন বলবো? কে সে? আসিফ আপনার চেলা, আমার তো না। আমি যা বলার আমার হাসবেন্ডকেই বলবো। ছয় কবুল বলে বিয়ে করেছি এমনি এমনিতো ছেড়ে দিতে পারি না।
— নয়।
— কি নয়?
ওয়াহিদ হেসে ফেললো! রেগে যাওয়ার মতো কাজ তবে কোন কারণে এই মেয়ে উপরে রাগতে পারছে না। কারণ কি? সে হেসেই বললো, — আমি এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি।
— অসংখ্য ধন্যবাদ! রাখছি।
— নিশাত
— কি?
— সময় হবে?
— না।
— পাঁচ মিনিট।
— না।
— চার
— না।
— তিন
নিশাত ফোন কেটে দিলো। দিয়ে আফিয়ার দিকে তাঁকিয়ে বললো, — তোমার বাবার নাম্বারে কিছু টাকা যাবে। সেগুলো দিয়ে চলো। আমি নিজে তোমার কথা বলবো। ইন শা আল্লাহ সামনের মাস থেকে ভাতাটা তুমি পাবে ।
আফিয়া কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে তাঁকালো। নিশাত তাদের কাজের খাতা টেনে নিতে নিতে বললো, — মেয়েদের জন্য এই পৃথিবীটা রণক্ষেত্র। এই রণক্ষেত্রে মেয়েদের সব সময় যুদ্ধ করে যেতে হয়। সেটা মেয়ে হিসেবে হোক, কারো স্ত্রী হিসেবে হোক আর মা হিসেবেই হোক। তাই সাহসী হও। যুদ্ধ তো সবে মাত্র শুরু।
কলিংবেলের শব্দ শুনে সুলতানা চমকে উঠল। এই সময় মেয়েটা বাসায় ফিরতো। ফিরে টুকটুক করে তার হাতে হাতে কাজ করতো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই জানালার দিকে তাঁকালো। তখনি সাবা দৌড়ে এলো। সুলতানা বিরক্ত মুখে বলল,– অযথা দৌড়াদৌড়ি করিস কেন?
— অযথা করবো কেন? তোমার মেয়ে এসেছে।
সুলতানা অবাক চোখে তাঁকালো। তার অবাকের মাঝেই নিশাত রুমে ঢুকে হাত পা ছড়িয়ে ধরাম করে খাটে শুয়ে পড়লো। শুয়ে বললো, — এতো অবাক হওয়ার কি আছে। হলুদ দিয়ে, মেন্দি দিয়ে বিদায় করেছো। পরের দিন ফিরতি আসবো না?
সুলতানা কি বলবে ভেবে পায় না। এই মেয়ের রং দেখতে দেখতে সে দিশেহারা। হেনা এগিয়ে এসে বললো, — আমি আগেই বলেছি এই মেয়ে দু’দিনও টিকতে পারবে না। এলাকায় আর নাক রাখা যাবে না । এক ননদ ঘাড়ে এখন আবার ননদের মেয়েও ঘাড়ে।
নিশাত তার বালিশ টেনে আরাম করে শুতে শুতে বললো, — এতো সহজে আসছি না মামি। কষ্ট করে আরো কয়েকটা দিন থাকো। তারপরে ঠিক ঘাড়ে চেপে যাবো ।
হেনা ছুটলো তার স্বামীকে কল দিতে। কি করে এসেছে কে জানে? সুলতানা অসহায় ভাবে মেয়ের দিকে তাঁকালো।
আর এদিকে ওয়াহিদ বাসায় ফিরলো রাতে। সুর্বণা থমথমে মুখে ড্রইংরুমে বসে আছে। কেন সে বুঝতে পারলো না। নিশাত যে ঐ বাসায় গিয়েছে সে জানে। তার পেছনে লোক লাগানো আছে। সে কি করে না করে সব কিছুই তার কাছে আপডেট আসে।। ওয়াহিদ পাশে বসে বললো, — কি হয়েছে মা?
সুবর্ণা উত্তর দিলো না। তবে নিতুর বুলেট ট্রেনের গতিতে মুখ ছুঁটলো। তার বউয়ের জন্য মায়ের আজ কত বড় অপমান হলো। থাকবে না তো কথা রাখলো কেন? অপেক্ষা করতে করতে সবাই কতো কিছু বলে বিদায় নিলো। মা মনের কষ্ট মনে চেপে তোমার বউকে মানতে চেষ্টা করছে। তোমার বউ কি করলো?
ওয়াহিদ শান্ত ভাবেই সব শুনলো। শুনে মায়ের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — আমি দেখছি মা। হয়তো কাজ পড়ে গেছে।
সুবর্ণা রাগে দাঁতে দাঁত পিষলো। সে ভেবেছিল আত্মীয় – স্বজন আসলেই একেক জন একেক কথা তুলবে। তুললেই তো নাটক শুরু। কিন্তু তার চাল তার উপরেই পড়েছে। উল্টো সবাই তাকেই খোঁচা মেরে গেলো। বউতো তাকে গোনায়’ই ধরছে না। এত বছরের জীবনে কখনও তাকে নিয়ে উপহাস করার সুযোগ পায়নি। এখন হয়ত বাসায় গিয়ে তাই করছে, ঠোঁট টিপে হেসে মরছে। আর বলছে, “কোথায় গেলো তার সব কিছু হাতে রাখার যোগ্যতা। ”
ওয়াহিদ রুমে ফিরে নিশাত কে কল দিলো। নিশাত ঘুম ঘুম কন্ঠে হ্যালো বললো। ওয়াহিদ নিশাতের ঘুম জড়ানো কন্ঠ শুনে কিছুই বলতে পারলো না। তবে ফোনও রাখলো না। নিশাত ঘুমিয়ে গেছে। তার ভারী নিশ্বাসের শব্দ ওয়াহিদ কান পেতে শুনতে শুনতেই খাটে গা এলিয়ে দিলো। অনেক দিন পর তার রুটিনে হেরফের হলো। না চেঞ্জ করলো না তার অতি প্রিয় কফি খেলো।
চলবে…..

