#প্রাচীর
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ২০
নিশাতের বিবাহিত জীবনের একেক সকাল হচ্ছে একেক রকম। জীবনতো না যেন স্টার জলসার সিরিয়াল। আজকে সকাল হলো অতি গুণধারী লামিয়া সুন্দরীর গুণ দেখে। সে নাস্তা টাস্তা বানিয়ে একাকার করে ফেলেছে। আর তার শাশুড়ি মা অর্ডার দিয়েছে আজকে সবাই একসাথে খাবে। কখন বাঁচেন মরেন। তাই যখন সবাই বাসায় থাকবে এক সাথেই খাবেন।
নিশাত এসে বসেছে সবার আগে। এই বাড়িতে আর যাই হোক ঘুম ভালো হচ্ছে। খেয়ে দেয়ে কমফোর্টার জড়িয়ে শুতেই ঘুম। অবশ্য অতীত ইতিহাস ঘাটলে ঘুমের সমস্যা তার কখনোও ছিল না। তাবে অচেনা বাড়িতে একটু উপর নিচ হওয়ার কথা। তবে সেই রকমও কিছু হচ্ছে না। তাই ঘুমায়ও আগে উঠেছেও আগে।
সে উঠেই বসেছে ড্রইং রুমে। আজকে তার অফিস নেই। একদিন রেস্ট! কলকে থেকেই আবার শুরু করবে। তবে আজকে দিন মাটি করার অবশ্য কোন ইচ্ছে টিচ্ছে নেই। সজল ভাইয়ের সাথে বের হবে। জায়গা দেখা হয়েছে। সে গিয়ে কনফার্ম করবে। বাকি যা আছে সব দায়িত্ব সজল ভাইয়ের।
সুবর্ণাও তার পাশেই বসা। আজকে তাকে পুরোই ঝরঝরে লাগছে। দেখে মনে হচ্ছে ফুরফুরে মেজাজেও আছেন। থাকবে না কেন? বোনের মেয়ে এনে এমন ভাব নিচ্ছেন তোপ নিয়ে এসেছেন। আরে বাবা তোপ নিয়ে আয় আর বোম নিয়ে আয় নিশাতের কি? সেই ওল্ড ফ্যাশন শাশুড়িগিরি। আরে বাবা কোন বউ এখন রান্নাঘর চায়, আর সেও কোন গুড বউ হওয়ার জন্য মরে যাচ্ছে।
মরে যাক আর না যাক তার ধারণা সে যতক্ষণ সামনে থাকে, পা থেকে মাথা পর্যন্ত তাকে পুরো স্ক্যান করতে থাকে। এতো করে টরে লাভ কি? যতো তীক্ষ্ণ নজরে’ই তাঁকাও, মানুষের ভেতর তো আর দেখা সম্ভব না। যদি হতো কেঁপে উঠতে গো শাশুড়ি মা। আপনের জমানায় আপনি বুনো ওল থাকলে, আমি আমার জমানায় বাঘা তেঁতুল। ইতিহাস সাক্ষী! পুরাতন যত শক্তিশালী’ই হোক। নতুন প্রজন্মের কাছে হার মানতেই হয়।
— তুমি রান্না- বান্না কিছু জানো?
নিশাত গলে গিয়ে বললো, — জ্বি না মা, আমি জানি না।
— জানো টা কি? শুধু চাটাং চাটাং জবান চালাতে।
— এক হিসেবে বলতে গেলে সেই রকম’ই।
— কেন, সুলতানা কিছু শেখায়নি?
— জ্বি না! দুঃখের হিসেব নিকেশ করেই কুল পায়না। মেয়ের দিকে নজর দেবে কি?
— তা ঠিক! দিন দুনিয়ার কোন জিনিসের প্রতি’ই তার নজর ছিল। নিজেও তো কোন কাজের ছিল না। দুনিয়া চেনার খবর নেই। এক জনের হাত ধরে আরেক জনের ঘাড়ে এসে বসা। শেখালামতো সব বলে বলেই।
— জ্বি অবশ্যই! তবে যত যত্ন করে অন্যের বউকে শিখিয়েছেন তত যত্ন করে নিজের মেয়েকে যদি শেখাতেন, অন্তত স্বামীর মনের মতো হতো।
— কিছু শেখাই আর না শেখাই জামাইকে কিভাবে ধরে রাখতে হয়। সেটা ঠিকিই শিখিয়েছি।
— একদম ঠিক! অন্যের জামাইকে কিভাবে টানতে হয় সেটাও কি শিখিয়েছিলেন?
সুবর্ণা কঠিন চোখে তাঁকালো! নিশাত দেখেও দেখলো না। নিনিত এসে আস্তে করে তার পাশ ঘেঁষে বসলো। নিশাত হেসে নাক টিপে দিলো। তার সাথে সাথেই মাহফুজ এলো। আসতেই সুবর্ণা বললো, — নিশাত যাও লামিয়ার হাতে হাতে একটু হেল্প করো। সে মেহমান মানুষ, একা একা করছে। দেখতে কেমন দেখায়।
নিশাত উঠে গেলো! দু- মিনিটের মাথায় আবার ঘুরে এলো! হাতে তার চায়ের ট্রে। রাখতে রাখতে বললো, — সে একাই একশো মা। তার নাকি কোন হেল্প লাগবে না। বলেই হেসে মাহফুজের দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিলো।
মাহফুজ হেসেই চায়ের কাপ হাতে নিলো। সকালে এক কাপ চা ছাড়া তার দিন ভালো যায় না। এই কয়দিনেই কি সুন্দর খেয়াল করেছে। আর তার বউ বলতেও পারবেনা কি খায় না খায়।
সুবর্ণা থমথমে মুখে বসে রইল। চেঁচিয়ে এক কাজের লোককে বললো, — নিতু কে টেনে তুলতে। বেয়াদবের বেয়াদব! জামাই অফিসে যাবে তার খবর নেই।
মাহফুজ শাশুড়ির আচরণে অবাক’ই হলো। তিনি তার ছেলে মেয়ে বলতে অন্ধ। তাদের কোন কিছুতেই কোন দোষ নেই। তাই অবাক হয়েই বললো, — আমাকে ফিরতে হবে মা।
সুবর্ণা সব সময় মাহফুজ ফিরতে চাইলেও দু-একদিন এমনিতেও জোর করেই রাখেন। আজকে হেসে বললো, — বিয়ের ঝামেলা গেলে নিতুকে এসে নিয়ে যেও। আমি বেয়াই বেয়ানের সাথে কথা বলে নেবো। তারা যেন আগেই আসে।
মাহফুজ এবারো অবাক হলো। নিশাত ঠোঁট টিপে হাসলো! হেসে দেখলো নিতু ঘুম ঘুম চোখেই হেলেদুলে নামছে। সে সাথে সাথে মুখ কালো করে বললো, — এটা কেমন কথা বললেন মা। দু’দিন পরেই রিসিপশন এখন কেন ভাইয়া চলে যাবে। জামাই মানুষ সে থাকবে সবার আগে। আপনি তাকে যেতে দিচ্ছেন কিভাবে?
নিতুর ঘুম উবে গেছে। সে ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে বললো, — কি হয়েছে?
সুবর্ণার কি আর সুযোগ আছে, নিশাত সাথে সাথেই বললো, — ভাইয়া নাকি চলে যাবে। মা একটু থাকার জন্য বললোও না। আবার বলছে বিয়ের ঝামেলার শেষে নিতুকে এসে নিয়ে যেতে। কেন মা? নিতু কি আমাদের উপরে এতোই বোঝা?
নিশাতের কথা শেষ হতে দেরি নিতুর কথা ধরতে দেরি হয়নি — তুমি এসব বলেছো মা?
— নিতু চুপ!
— ওহ! এখন আমি চুপ। বোঝা হয়ে গেছি আমি। আর আমার জামাই এখন পর।
মাহফুজ এগিয়ে বললো, — এরকম কিছু না নিতু।
— তো কি রকম? এটা আমার বাবার বাড়ি। এখানে আমি যেমন মন চায় থাকবো। আমাকে ডেকে তোলা হলো কেন? কেন তোমাকে এই কথা বললো? কেন আমাকে নিয়ে যেতে বললো?
নিশাত আবারো মুখ খুলতে যাচ্ছিলো। সুবর্ণা সাথে সাথেই হাত তুলে থামালেন। এই মেয়ের মুখ না জানি কবে সে নিজ হাতে সেলাই করে দেয় । তাই বিরক্ত চেপে বললেন, — এমন কিছু না। যাও ফ্রেশ হয়ে নাও। লামিয়া অনেক কষ্ট করে নাস্তা তৈরি করছে। আমরা সবাই এক সাথে খাবো।
— তোমার লামিয়া বাবুর রান্না তুমিই খাও। ঢং দেখে আর বাঁচি না। নাস্তা তৈরি করেছে। কে করতে বলেছে ওকে? কাজের লোক নেই।
লামিয়ার মুখ অপমানে থমথমে হয়ে গেলো। তার কোন দরকার আছে এসব করার। খালামণি মাকে কি বলেছে কে জানে? ঠেলে পাঠালো।
সুবর্ণা শ্বাস ফেললো! এই মেয়েকে তিনি সত্যিই বেয়াদব বানিয়ে ফেলেছেন। বড় ভাইয়ের মুখের উপরে কথা বলেছে। তখন কিছু বলেনি, সেই বলা এখন নিজের উপরে পড়ছে। সে মাহফুজের দিকে তাঁকিয়ে বললো, — বাবা আসো নাস্তা করবে। আর এসবের জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত।
মাহফুজ আছে স্তব্ধ হয়ে। কি থেকে কি হচ্ছে সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। তাই স্তব্ধ হয়েই বললো, — না মা আজকে আর নাস্তা করার সময় হবে না। আপনারা বরং করুণ। আমাকে আজ একটু তাড়াতাড়ি বেরুতে হবে। বলেই বেরিয়ে যেতে গেলো।
নিশাত আফসোস মাখা কন্ঠে বললো, — আহারে জামাই মানুষ। লজ্জা পেয়েছে! মেয়েদের জীবন’ই এমন। বিয়ের পরে না থাকে মা – বাপ, না থাকে বাপের বাড়ি। সবই পর, শুধু সময়ের অপেক্ষা।
নিতু আবার ফুঁসে উঠল! ফুঁসে তার মাকে বললো, — মাহফুজ যদি রাগে আর না আসে। আমি আগুন জ্বালিয়ে দেব বলে দিলাম।
— তুমি একদম ভেবোনা নিতু। এই দায়িত্ব আমার। আমি থাকতে ভাইয়া রাগ করে আসবে না। এটা হতেই পারে না। আমি দরকার পড়লে অফিসে গিয়ে নিজে নিয়ে আসবো।
সুবর্ণা আগুন চোখে তাঁকালো! নিশাত অসহায় মুখ করে তাঁকালো! যেন ভয় পেয়ে গেছে। নিতু রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উপরে চলে গেলো। সুবর্ণা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। হঠাৎ করে কোথা থেকে কি হলো, সে ভেবে পেলেন না। তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। নাস্তার কথা তার মাথাও রইল না। ধীরে ধীরে উপরে গেলেন। আর যেতে যেতেই নিশাতের দিকে আবার ফিরে তাঁকালেন। অনেক অনেক দিন পরে সে রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। আর তার রাগের এক সমস্যা। রাগলে না কাওকে চোখে দেখে না হিতাহিত জ্ঞান থাকে।
সবাই যেতেই নিশাত লামিয়ার দিকে তাঁকালো। একটু হেসে বললো, — মন খারাপ করো না লামিয়া। কেউ না থাক আমি আছি না। বলেই টেবিলে গিয়ে বসলো। খাবার এগিয়ে নিতে নিতে বললো, -” জায়গা বুঝে গুণ দেখাতে হয় লামিয়া। অপাত্রে ঘি ঢালো আর মধু। কোন কাজে আসবে না।”
লামিয়া নিতুর মতো হনহনিয়ে চলে গেলো। নিশাত ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে আরামছে বসে বসে নাস্তা করলো। এক কাপ চা নিয়ে গুন গুন করতে করতে রুমে এলো।
ওয়াহিদ সেই আগের মতোই শুভ্র চাদরে কুশন বুকে চেপে শুয়ে আছে। নিশাত এসেছে পর থেকে এখানেই ঘুমাচ্ছে সে। ঘুমাক! ভাব বেশি হলে এই দশাই হয়।
নিশাত গুন গুন করতে করতে পর্দা টেনে সরালো। এই বাড়ির কারো শান্তি তার সহ্য হয় না। আর এতো আরামের ঘুম ?
ওয়াহিদ চোখ মুখ কুঁচকেই বললো, — পর্দা টানো নিশাত।
— না।
— কেন?
— এমনিই।
ওয়াহিদ ওপাশে ফিরে শুলো। কুশন মাথার উপরে চাপলো। নিশাত হাসলো! হেসে এক গাদা কাগজ পত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাটে বসলো। কতক্ষণ কাজ করলো কে জানে। তার ধ্যান ভাঙলো ফোনের শব্দে। ফোন করেছে সজল ভাই। সে হেসে রিসিভ করলো। করে কানে রাখতেই হাসিটা মলিন হলো। মুখটা হলো শান্ত, টলমলে দিঘীর মতো। ফোন রেখে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। তারপর শান্ত ভাবেই ফোন, পার্সটা নিয়ে রুম থেকে বেরুলো। যেতে যেতে একবার সুবর্ণার দরজার দিকে তাঁকালো। তাঁকিয়ে শান্ত ভাবেই বেরিয়ে গেলো।
সে বেরুতেই ওয়াহিদের ফোন বাজলো। ঘুম ঘুম চোখেই রিসিভ করলো। করতেই চোখ খুললো। খুলতে দেরি উঠতে দেরি হয়নি। গায়ে তার ঘরোরা সিম্পল টিশার্ট, টাউজার। সেগুলো পরেই দৌড়ে বেরুলো।
নিশাত রাস্তার পাশ দিয়েই ধীরে ধীরে হাঁটছে। এটা অভিজাত এলাকা! রিকশা পাওয়া যাবে না। দারোয়ান দৌড়ে ড্রাইভারকে বলতে বলতেই সে বেরিয়ে এসেছে।
তার হাঁটার মাঝেই ওয়াহিদ গাড়ি নিয়ে এলো। নিশাত দেখেও দেখলো না। ওয়াহিদ গাড়ি রেখে নিজেই বের হয়ে এলো। এসে হাত ধরতে গেলো। নিশাত হাত সরিয়ে শান্ত ভাবে বললো, — আপনার মায়ের অ্যাক্সিডেন্টে যেমন আমি ছিলাম না। খোঁজ খবরও নেই নি। তাই আমার মায়ের কাছ থেকেও দূরে থাকুন।
ওয়াহিদ এগিয়েই হাত ধরলো। ধরে বললো, — আমি কোন বিনিময়ের জন্য তোমাকে বিয়ে করিনি নিশাত। আমার জন্য রাঁধতে হবে, আমার জন্য অপেক্ষা করতে হবে, আমার সেবা করতে হবে। এসব কোন কিছুর’ই আমার দরকার নেই। তোমার ইচ্ছে হলে করবে, না হলে নেই। আমার টুকু তো আমি অবশ্যই করবো।
নিশাত হাসলো! তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে হাত ছাড়িয়ে নিলো। নিয়ে নিজেই গাড়িতে উঠে বসলো।
সুলতানা বের হয়েছিল সবজি নিতে। সাইডেই তো ছিল। কোথা থেকে এক সিএনজি এসে দিলো ধাক্কা। সে উল্টে পড়লো। বেশি আঘাত অবশ্য পায়নি। তবে পড়ার জন্য মাথায় একটু আঘাত পেয়েছে।
নিশাত ডাক্তারের সাথে কথা বলে, মায়ের কাছে এলো। এসে অবশ্য কিছু বললো না, শান্ত চোখে তাকিয়ে রইল। সুলতানা মেয়ের হাত ধরে বললো, — তোর চোখে পানি আসে না কেন রে নিশাত? ঐ দেখ সাবা হাপুস নয়নে কাঁদছে। মায়ের জন্য এতটুকুও মন পুড়েনা বুঝি।
— না মা পুড়ে না। কারো জন্যই না।
— আমার জন্যও না?
— না।
— কেন?
— ভালোবাসলে ভালোবাসার মানুষের উপরে বিশ্বাস রাখতে হয়।
— আমি রাখিনি?
— না।
সুলতানা হাসলো! হেসে বললো, — তুই রাখিস! আমি যে যে ভুলগুলো করেছি। সেই ভুলগুলো তুই করিস না।
— আমি করিও না মা। তাই তো কাঁদিনা। দেখনা তোমার মেয়ে শুধু হাসে আর হাসে।
সুলতানা মেয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষল তাঁকিয়ে রইলেন। তারপর প্রথম বার ওয়াহিদকে নিজে থেকে কাছে ডাকলেন। ডেকে পাশে বসিয়ে বললেন, — মেয়ের জামাইয়ের কাছে সব মায়ের চাওয়া থাকে, মেয়েটাকে সব সময় হাসি খুশি রাখুক। তবে তোমার কাছে আমার চাওয়া রইলো। আমার মেয়েটা একটু কাঁদুক! প্রাণ ভরে কাঁদুক। কেঁদে কেঁটে তার বুকের জমানো বরফ গলে নিঃশেষ হোক।
ওয়াহিদ সুলতানার হাত মুঠোপুরে নিশাতের দিকে তাঁকালো। আর নিশাত তার মতোই চোখ ফিরিয়ে নিলো।
চলবে…..

