“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
২০.
আজাদ বিশ্বাস সারাদিন বারান্দায় ঝিম মেরে বসে থাকেন। তাকিয়ে থাকেন আফজাল বিশ্বাসের ভাঙা ঘরটার দিকে। আরমান সামনে দিয়ে যাওয়ার আসা করেন। সবই দেখেন আজাদ। কিন্তু একটুও নড়তে ইচ্ছে করে না।
একদিন আরমান এসে বললেন, “ভাই আমার দোকানে চলো।”
অবুঝের মতো করো তাকালেন আজাদ।
“আমার সাথে থাকবে। চলো।” এক প্রকার টেনেই নিয়ে গেলেন আরমান। বুদ্ধিটা মেহরিমা শিখিয়ে দিয়েছিল। সে জানে শাহরিয়ার তার বাবাকে নিয়ে কেমন চিন্তায় থাকে। শারীরিক রোগ থেকে মুক্তি পেলেও মানসিক দিক দিয়ে আজাদ এখনো দুর্বল। সেই সময়ে তার পাশে থেকে আরমান নিজের করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইলেন। এতে আজাদ আরো গুড়িয়ে গেলেন। যাকে তিনি তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছে সেই মানুষটাই এসে তার পাশে দাঁড়িয়েছে। দৃশ্যটা চোখে আঙুল দিয়ে তার নৈতিক অবস্থান দেখিয়ে দিলো।
●● ●● ●●
শেলী ইদানিং তার কাছে কিছু একটা বলতে আসে। কিছুক্ষণ উশখুশ করে না বলেই চলে যায়। আতিয়া বুঝতে পারেন সে কি বলতে চায়। তিনি শুধু আজাদ বিশ্বাস একটু সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। লোকটা একদম দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু দিনদিন তার উল্টোটাই দেখলেন। নিজের হাতে গড়া ব্যবসা বাণিজ্য হাতছাড়া হওয়ার কষ্ট যতোটা না তাকে ঘিরে ধরেছে তারচেয়ে বেশি চাপ দিচ্ছে আরমানের স্বাভাবিক এবং সাহায্যকারী ব্যবহার। আজাদ নিজের মনেই লজ্জায় মিশে যাচ্ছেন। আতিয়া সেটা বোঝেন। বোঝেন বলেই কিছু বলেন না। এই মানুষটার লজ্জা পাওয়া দরকার। নিজের কাছে অনুতপ্ত হওয়া দরকার। তাই সব হারিয়ে যাওয়ার সংবাদ পেয়েও তিনি শক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন। নয়তো আজাদকে কে সামলাবে?
একদিন সুযোগ বুঝে আজাদের কাছে কথাটা বললেন।
“এবার একটা অনুষ্ঠান করা দরকার না?”
“কীসের?”
“শাহরিয়ারের বিয়ের। ছেলেমেয়ে দুটো একই বাড়িতে আছে কিন্তু আলাদা আলাদা। দেখতেই তো কেমন লাগে। আরমান ভাইই বা কি বলবে?”
“অনুষ্ঠান একটা করা দরকার। শাহরিয়ারের কাজের কি হলো?”
“কোথায় কোথায় যেন পরীক্ষা দিলো। ওসব নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে না। কাজের বিষয়ে ওর নিজের যথেষ্ট চিন্তা আছে।”
“আমি কি করবো?”
আতিয়ার বুকটা হু হু করে উঠলো। কোথায় গেলো আজাদের সেই দাপট!
“আরমান ভাইয়ের সাথে কথা বলুন।”
“আচ্ছা। আজকে রাতে বলব।”
ভাইয়ের ডাকে আরমান বসলেন। মনে মনে তিনি নিজেও ভাবছিলেন এই বিষয়ে কথা বলবেন। আজাদ ডাকায় সুবিধাই হলো।
“একটা অনুষ্ঠান করা দরকার না?”
“হ্যাঁ। আত্নীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীদের দাওয়াত দেয়া দরকার।”
“তাহলে কর আয়োজন। কবে করলে ভালো হয়?”
“সামনের শুক্রবারে?”
“আচ্ছা।”
আরমান কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। উঠে যাওয়ার আগে বললেন, “ভাই চালের ব্যাবসা করবে?”
আজাদ মুখ তুলে তাকালেন, “কি?”
“আমার পরিচিত আছে একজন। কথা বললে একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে। এভাবে বসে থাকলে তো আরো অসুস্থ হয়ে যাবে। তার চেয়ে কিছু একটায় ব্যস্ত থাকো।”
“ব্যবসায় খাটানোর মতো টাকা তো আমার নেই।”
“আমার থেকে ধার নাও। পরে দিয়ে দিও।”
আজাদ মুখ নিচু করলেন। সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন আরমান প্রায় দশ পনের হাজার টাকা দিয়েছে। শাহরিয়ার সেটার হিসাব মেলাতে না পেরেই বুঝতে পেরেছে। আরমানের কাছে শুনলেও তিনি এড়িয়ে গেছেন। অধিকার নিয়ে ভাইয়ের জন্য কিছু খরচ করবেন সেই মুখ তার নেই। তাই লুকিয়ে চুরিয়ে যতটা পেরেছেন দিয়েছেন।
আর এসব খবরে আজাদ ক্রমশ মুষড়ে পড়ছেন। আফসোসের শিখাটা থেকে থেকেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। সেসময় স্থির থাকতে পারেন না তিনি।
আজাদ তৎক্ষণাৎ কিছু না বললেও শাহরিয়ার প্রস্তাব শুনে খুশি হলো। হাতে যা টাকা ছিল তার একটা অংশ দিয়েই শুরু করতে বলল। পাশাপশি এটাও শুনলো আগামী শুক্রবারেই তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান করা হবে।
তবে সবকিছু যতোটা সহজ হবে মনে হয়েছিল তেমন হলো না। আশেপাশে গুনগুন শুরু হয়ে গেলো। আজাদ বিশ্বাসের সাথে যাদের ভালো সম্পর্ক ছিল তারা ভাবলো আরমান কোনোভাবে আজাদকে ফাঁসিয়েছে। ফলে আজাদ না পেরে এমন ভাইয়ের মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে দিচ্ছে। অনেকে এটাও বলল মেহরিমাকে দিয়ে শাহরিয়ারকে হাত করেছে।
আবার আরমান যাদের কাছে ভাইয়ের নামে বাড়িয়ে ছাড়িয়ে নালিশ করেছিলেন তারা বলল সম্পত্তি যেন হাতছাড়া না হয় এজন্যই আজাদ ছেলেকে ব্যবহার করছে। নিজের জমিজমা সব হারিয়ে এখন ভাইয়েরগুলোর দিকে নজর দিয়েছে।
উপরি হিসেবে যোগ হলো ইউনূস। তার মামার বাড়িতে দাওয়াত দিতে গেলে মুখের উপরে দরজা বন্ধ করে দিলো তারা। প্রতিবেশীর মুখে শোনা গেলো মেহরিমার চরিত্র খারাপ বলেই ইউনূস তাকে বিয়ে করেনি।
কিছুই কারো অজানা থাকলো না। আজাদ, আরমান দুজনের কানেই সব এলো। মরমে মরে গেলেন দুজনেই। পুরো একটা দিন ঘরে বসে রইলেন। খুব করে চাইলেন কোনোভাবে মানুষের মন থেকে এসব কথা মুছে দিতে। উধাও করে দিতে সব নালিশ, অভিযোগ, অনুযোগ।
তবে তা তো হওয়ার নয়। তাদের মাঝের মনোমালিন্য ঠিক হলেও মানুষের কাছে তাদের প্রতিচ্ছবি তেমনই আছে যেমন তারা বানিয়েছেন। আজাদের বৃত্তের মানুষ আরমানকে দোষী সাব্যস্ত করতে দুবার ভাবলেন না। ছেড়ে কথা বললেন না আরমানের বন্ধু মহল। ফলে সুন্দর আয়োজনের মাঝেও কোথাও একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে রইলো।
●● ●● ●●
শাহরিয়ার অবশ্য এসব কিছু গায়ে মাখেনি। সে আগে থেকেই জানত এমন হবে। মেহরিমাকেও বলেছিল মানসিকভাবে শক্ত থাকার জন্য। কাজেই এসব তার কাছে অনাকাক্ষিত না। বাবা, চাচা নিজেদের গুটিয়ে নিলে সে দুই ফুপিকে খবর দিলো। ছেলে, মেয়েদের নিয়ে তারা রণমূর্তি ধারণ করে চলে এলেন। কেন এত বড় একটা খবর তাদের কাউকে জানানোর প্রয়োজন মনে করলো না কেউ এজন্য সবাইকে এক চোট ধমকাধমকি করলেন। এমনকি আজাদকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেলে যখন অতিয়াকে দেখতে এসেছিলেন তখন কেউ কিছু বলল না। তুলোধুনা করলেন সবাইকে। বাদ গেলো মেহজাবিন আর রুমিও।
রাগ ঝেড়ে মুহূর্তেই তার স্বতস্ফূর্ত হয়ে গেলেন। দুই ভাইয়ের এই দা কুমড়ো সম্পর্ক দেখতে তাদের কোনোদিনই ভালো লাগতো না। অনুভব করতেন আফজাল বিশ্বাসের অনুপস্থিতি। তিনি এমন একটা কাজ করে যাওয়া রাবিয়া, মাবিয়া দুবোনই খুশিতে বাক বাকুম হয়ে গেলেন। বংশের প্রথম বিয়ে। একইসাথে দুজনের। তাদের আনন্দ যেন ধরে না। সেই আনন্দের বাতাসের সামনে আশপাশ থেকে উড়ে আসা কটু কথার ধুলো সুবিধা করতে পারল না। উড়ে গেলো নিমিষেই।
●● ●● ●●
শাহরিয়ারের বিশেষ অনুরোধে তাদের জন্য আফজাল বিশ্বাসের ঘরটা সাজানো হয়েছে। ভাঙা ঘরের টিন পাল্টে টালি দেয়া হয়েছে। শাহরিয়ারের ইচ্ছা যেই মানুষ এই সম্পর্কের গোড়াপত্তন করে দিয়ে গেছেন তার থেকেই এই সম্পর্কটা আবার নতুনভাবে শুরু করা।
একদিক দিয়ে সুবিধাই হয়েছে। তারা ঐ ঘরে থাকায় দুই ফুপু, শাহরিয়ারের খালার বাড়ির লোকসহ আরো অনেক আত্মীয় স্বজনের থাকার জায়গার সমস্যা হচ্ছে না। দুবাড়ির ঘরগুলোতে আরামেই থাকতে পারছে।
বহু বছর আগের বিয়ে এবং সেদিনের রেজিস্ট্রি কোনোটাতেই কেউ প্রস্তুতি নেয়ার সময় পায়নি। সাজগোজ তো বহু দূরের বিষয়। আক্ষেপ ছিল শেলী এবং আতিয়ার মনেও। তারা মন ভরে নিজেদের সন্তানদের সাজিয়ে দিলেন। দুজনে রাশেদার কাছে গেলো। চোখে জল নিয়ে তাদের জন্য দোয়া করলেন রাশেদা। তার উপরে ন্যস্ত হওয়া গুরুদায়িত্ব আজ পালিত হয়েছে। আফজাল বিশ্বাসের আমানত রাখতে পেরেছেন তিনি।
●● ●● ●●
ফ্যানটা ঘরঘর করে শব্দ করছে। শাহরিয়ার বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বলল, “ওটার কি সমস্যা?”
মেহরিমা হেসে ফেলল, “ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজাচ্ছে।”
“তাই না?”
“হুঁ।”
“তোর তো মনে হচ্ছে মনে রং লেগেছে।”
“কি আশ্চর্য! জীবনে প্রথমবার বিয়ে করছি। মনে রং লাগবে না?”
“চৌদ্দ বছর ধরে এক বিয়ে করে যাচ্ছিস। তাও তোর মনের রং ফুরায় না?”
“না ফুরায় না।”
“কি একটা বিয়ে! আল্লাহ! বার বছরে কবুল বললাম, চব্বিশ বছরে রেজিস্ট্রি করলাম তারও এক কোটি বছর পর বাসর ঘর পেলাম।”
মেহরিমা বাঁকা চোখে তাকালো।
শাহরিয়ার বলল, “এভাবে তাকাচ্ছিস কেন? তুই যে এক নম্বরের কানি এটার প্রমাণ আমি পেয়ে গেছি। আর দিতে হবে না।”
“কি বললে!” মেহরিমা ক্ষেপে গেলো।
“শুধু শুধু হুংকার ছাড়িস না।” নির্বিকার কণ্ঠে বলে শাহরিয়ার পকেট থেকে একটা আংটি বের করলো। মেহরিমা দেখলো আংটিটা একদম তার আংটির মতোই। কিন্তু রংটা মলিন।
“এটা কার?” জিজ্ঞেস করলো মেহরিমা।
“তোর।” মেহরিমার হাত টেনে আগের আংটি খুলে ওটা পরিয়ে দিলো।
মেহরিমা বলল, “ওটা খুললে কেন? দাদার দেয়া।”
“দাদার দেয়া!” ব্যাঙ্গ করে বলল শাহরিয়ার। “চোখ দিয়ে দেখেছিস? ঐটা সিটি গোল্ডের ছিল। এটা দাদার।”
মেহরিমা দুটো আংটি পাশাপশি রেখে চোখ বড় বড় করে দেখলো।
“এমন ধোকাটা কেন দিলে আমাকে? আমি আরো ভাবলাম তুমি মনে হয় এটা ঘষামাজা করে এনেছ তাই চকচক করছে। ”
“তোর হাত থেকে যেদিন আংটি খুলেছিলাম সেদিনই মনে মনে ঠিক করেছি বাসর ঘরে ঢুকেই এটা তোকে দেবো। তার আগে না। কিন্তু তুই ঘ্যান ঘ্যান করছিলি তাই এটা নিয়ে এসেছি। কীভাবে যে এতো মিল পেয়ে গেলাম নিজেই জানি না।একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে। তুই সিটি গোল্ড, সোনা চিনিস না।আমি সিটি গোল্ড আনলেও তুই আরামসে সোনা বলে চালিয়ে দিতে পারবি।”
মেহরিমা ধুম করে শাহরিয়ারের পিঠে আঘাত করলো। শাহরিয়ার এক ঝটকায় মেহরিমার হাত পিছ মোড়া করে ধরে তাকে আটকে ফেললো।
“কত্ত বড় সাহস বরকে মা-রতে আসে! বাবা মা এই শিখিয়ে পাঠিয়েছে!” মেকি গম্ভীর কণ্ঠে বলল শাহরিয়ার।
মেহরিমা নিজেও শক্ত কণ্ঠে বলল, “বউকে তুই করে বলো। এসব শিখেছ তোমার বাবা মায়ের থেকে?”
শাহরিয়ার চট করে মেহরিমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। নরম কণ্ঠে বলল, “সরি। চেষ্টাই করিনি। আজকে থেকে করবো। প্রমিস।”
মেহরিমা ঘাড় কাত করে তাকালে শাহরিয়ার মুগ্ধ কণ্ঠে বলল, “তোকে অনেক সুন্দর লাগছে!”
মেহরিমার দুগাল গরম হয়ে এলো। কণ্ঠে রাগ নিয়ে বলল, “আবার তুই!”
পরপরই যেন শাহরিয়ার কি একটা বলল মেহরিমা খিলখিল করে হেসে উঠলো। ঝাঁকড়া জাম গাছের পাতার অলি গলিতে সেই হাসির শব্দ প্রতিধ্বনি হয়ে বাজতে থাকলো। বহুদিন, বহুদিন পর সময়ের ভারী পলির স্তরে চাপা পড়ে জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া দুটো সম্পর্ক নতুনভাবে জেগে উঠল। যেন অচিন কোনো রেখা। যে চলে গেছে বহুদূরে…
|সমাপ্ত|

