“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
২.
“কেমন আছো মেহরিমা?”
মেহরিমার মুখটা নিমিষেই তিতা হয়ে গেলো। লোকটার কমন সেন্স বলে কিচ্ছু নেই। বাড়িতে ঢুকে সোজা অন্দরমহলে চলে এসেছে। মেহরিমা বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ালো। ঘোমটা দেয়া ওড়না আরেকটু টেনে বলল, “ভালো আছি।”
ইউনূস বোধহয় আশা করছিল মেহরিমা উল্টো তাকে কুশল জিজ্ঞেস করবে। তার আশায় এক বালতি পানি ঢেলে মেহরিমা বলল, “মেহজাবিন ঐ ঘরে আছে না? আপনার এখানে কি দরকার?” চেপে রাখা ক্রোধটুকু কণ্ঠে প্রকাশ না পেলেও ভাষা সংযোগ রাখতে পারল না মেহরিমা।
ইউনূসের মুখটা এইটুকু হয়ে এলো, “না দরকার না। তোমার সাথে দেখা করতে এলাম আর কি।”
মেহরিমা শক্ত কণ্ঠে বলল, “কারো বাড়িতে ঢুকে সোজা অন্দরমহলে ঢুকে যাবেন না। জিনিসটা বাজে দেখায়।”
এরপর আর দাঁড়ানো যায় না। কোনরকমে সরি বলে চলে গেলো ইউনূস।
মেহরিমা শব্দ না করে দরজাটা লাগাতে চাইলেও শব্দ হয়েই গেলো। টান মেরে ঘোমটা খুলে ওড়নাটা ছুঁড়ে ফেললো। রাগে আরো গরম লাগছে। ফুল স্পিডে ফ্যান দিয়েও মেহরিমা স্থির হতে পারল না। কার উপর রাগ হচ্ছে? মায়ের ওপর, ইউনূসের ওপর, প্রয়াত দাদার ওপর নাকি নিজের ওপর? চোখ বন্ধ করলেই একটা সাজানো স্বপ্ন দেখে মেহরিমা। সে নিজেই সাজিয়েছে। এই স্বপ্নের বীজ বপন করেছে তার দাদা। মেহরিমা তো প্রথমে বোঝেইনি। উত্তর পনেরো থেকে সেই লুক্কায়িত বীজে পানি দিয়ে, সার দিয়ে চারা গজিয়েছে। এই সাত বছরে সেই চারা বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। এতটা দিন সমস্যা না হলেও ইদানিং বাবা মায়ের কার্যক্রমে মেহরিমা বুঝতে পারছে সময় সন্নিকটে। হয় এই মহীরুহকে সবার সামনে আনতে হবে নয়তো কেটে ফেলতে হবে লোকচক্ষুর আড়ালেই। মেহরিমা প্রথমটার সাহস করতে পারে না। কার ভরসায় এক পা এগুবে সে? বাকি রইলো দ্বিতীয় উপায়? তার চেয়ে সহজ বোধহয় নিজের অস্তিত্বই বিলীন করে দেয়া।
রাগে দুঃখে মেহরিমা চোখে পানি এলো। আর সহ্য করতে পারছে না সে। ডান হাতের অনামিকা আঙ্গুলটা ঠোঁটের কাছে এনে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। অশ্রু বিন্দুগুলো ফ্যাকাশে আংটিতে মাখামাখি হয়ে গেলো। কার কাছে যাবে মেহরিমা? কার কাছে গেলে এই অদ্ভুত জটিল সমস্যার আকাঙ্খিত সমাধান সে পাবে?
“মেহু? এই মেহু! দরজা খোল।”
মেহরিমা চুপ করলো। কান্না থামলেও অশ্রু থামেনি। চোখ মুছলেও তারা বাঁধা মানছে না। অনুভূতির সাথে অশ্রুও অবাধ্য হয়ে উঠেছে।
মেহরিমা আবার চোখ মুছলো। একটু কেঁদেও শান্তি নেই। চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে যায়। মেহরিমা উত্তর দিলো না। এই চেহারা সে কাউকে দেখাতে চায় না। চুপচাপ বসে রইলো প্রায় আধা ঘণ্টা যাবত।
দরজা খুলতেই শেলী এক প্রকার ঝাপিয়ে পড়লেন। মেহরিমা দুই পা পিছিয়ে এলো।
“তুমি কি এখানেই দাঁড়িয়ে ছিলে?”
“এই বেয়াদব! ওভাবে দরজা লাগালি কেনো তখন?”
মেহরিমার শান্ত মেজাজটা আবার তপ্ত হয়ে উঠল, “একটা দামড়া লোক সোজা তোমার মেয়ের ঘরে ঢুকে পড়ে। তুমি কিছু বলতে পারো না?”
“ভাষার কি শ্রী! দামড়া বলছিস কাকে? মানুষ পাত্রী দেখতে আসে না?”
“এটা কোন স্টাইলের পাত্রী দেখা? সকালে এসে দেখে যায় আমাকে ঘুম থেকে উঠে কেমন লাগে, দুপুরে দেখে কাজ করে কেমন লাগে, বিকেলে দেখে সেজেগুজে কেমন লাগে! শোনো আম্মু! এভাবে যে আমাকে সস্তা বানানো হচ্ছে একটু বোঝার চেষ্টা করো।”
“সস্তার কি আছে? ও তোকে দেখতেই পারে। আজ নাহোক কাল..”
“কথা শেষ করো। কাল কি? এসব চোর পুলিশ কার সাথে খেলছো? আমি কি বলেছি এই লোকটাকে আমার পছন্দ? আমার কাছে একবার শুনবেও না তোমরা!” হতাশা ঝরে পড়ল মেহরিমা কণ্ঠ থেকে।
শেলী অবাক হলেন, “ইউনূসকে তোর পছন্দ না!” তিনি ভাবতেই পারেননি ইউনূসকে মেহরিমা অপছন্দ করতে পারে। কোনদিক দিয়েই ছেলেটা ফেলে দেয়ার মতো না।
“না।”
“কেন? কি ভালো লাগে না?”
“একটা কিচ্ছু ভালো লাগে না। তুমি একটু থামো তো আম্মু! আমি কি তোমাদের বোঝা হয়ে গেছি?”
শেলীকে নরম হতে দেখা গেলো, “বোঝা হবি কেন? মেয়ে উপযুক্ত হলে তার বিয়ে দেব না?”
“মেয়ের কাছে না শুনেই?”
“ইউনূস তো কি সুন্দর দেখতে! পড়াশোনাও শেষ।”
“পড়াশোনা শেষ তো করে টা কি?”
“এই যে টিউশন।”
মেহরিমা কপালে হাত দিলো, “এসব আমার ভালো লাগে না। টিউশন স্টুডেন্ট অবস্থায় মানা যায়। সারাজীবনের জন্য না।”
“কিন্তু টাকা তো কামাচ্ছে।”
“কামাক। আম্মু আপাতত দুই এক বছর একটু থামো। এভাবে ঘোড়া ছুটিও না।”
“তোর এই এক সুর! থামবো কেন রে? মেয়ের বয়স বানানোর জন্য? ফুপুদের মতো বুড়ি হয়ে বিয়ে করবি?”
“তোমার সব কথা ফুপুদের কাছে যেয়েই শেষ হয়।”
“ছ্যাঁত করে উঠছিস কেন? বংশের ধারা পেয়েছিস।”
“আম্মু তুমি কি থামবা?”
“তোর বাপের সাথে কথা বলব। ইউনূসকে ভালো না লাগলে অন্য জায়গায় দেখব। কিন্তু বসে থাকবো না। তোর চাচা কি ভেবেছে? তোর ভালো বিয়ে দিতে পারবো না আমরা?” গজগজ করতে করতে চলে গেলেন শেলী। মায়ের শেষ কথায় দ্বিধায় পড়ে গেলো মেহরিমা। এর মাঝে হুট করে চাচা এলো কোত্থেকে!
● ● ●
আজাদ বিশ্বাস এবং আরমান বিশ্বাস দুই ভাই। তাদের আগে বড় দুই বোন আছে। মাবিয়া সবার বড়। তারপর রাবিয়া, আজাদ এবং আরমান। দু বোনের বিয়ে হয়েছে ঝিনাইদহের ভেতরে। সদর থেকে খুব দূরে না।
সাত বছর আগে আফজাল মারা গেছেন। সমাজের অনুকরণে তিনি মারা যাওয়ার এক বছরের মাঝেই দুই ভাইয়ের মাঝে মনোমালিন্য শুরু হয়। মাবিয়া, রাবিয়া দুজন হাজার চেষ্টা করলেও লাভের লাভ কিছুই হয়নি। তাদের মন কষাকষি বেড়েছে বৈ কমেনি।
আফজাল বিশ্বাসের আঠারো শতক জমি ছিল। ভাই বোনদের মাঝে সেটা ভাগ হলো তিনি মারা যাওয়ার সপ্তাহ খানেকের মাথায়। বোনেরা পেলো তিন শতক করে এবং ভাইয়েরা ছয় শতক। হিসেব এখানেই মিটে যায়নি। আফজাল বিশ্বাসের একটা বিশাল পুকুর ছিলো। সারা বছর সেটায় মাছ চাষ হতো। সকলেই সেটা জানতো। কিন্তু কারো ভাগে ওটা না দেখে আরমান বিশ্বাসের সন্দেহ হলো। দুদিনের মাথায় তিনি রহস্য উদ্ধার করলেন। বংশের প্রথম সন্তান এবং বড় ছেলে হিসেবে আজাদ বিশ্বাসের ছেলে শাহরিয়ারকে তিনি সেটা উপহার দিয়েছেন। মুহূর্তেই রাগে ফেটে পড়লেন তিনি। এত বছর ধরে তার বাবা, বড় ভাই দুজনেই বিষয়টা চেপে গেছে। কেনো?
রাগের আগুনে ঘি দিলো আশপাশের মানুষজন। তার তো দুটোই মেয়ে। কোনো ছেলে নেই। অর্থাৎ তার ভাগের পৈতৃক সম্পত্তির বেশ বড়সড় একটা অংশ শাহরিয়ার পাবে। এই সব সমীকরণ মিলিয়ে আরমান বিশ্বাস দেখলেন তার নিজের আর কিছুই থাকছে না। নিজের না থাকুক, মেয়ে দুজনের জন্যেও কিছু নেই। তিনি বড় ভাইয়ের কাছে যেয়ে অদ্ভুত আবদার করলেন। শাহরিয়ারের নামে থাকা পুকুরটা তার মেয়েদের দিতে হবে। সেখান থেকে যা আয় হবে তাই দিয়ে তিনি মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাবেন। বলা বাহুল্য আজাদ বিশ্বাস প্রস্তাব মানলেন তো না-ই ছোট ভাইয়ের সাথে একরকম দূর ছাই ব্যবহার করলেন। ব্রাদারি হকে আরমানের সম্পত্তিও যে তিনিই পাবেন এটা শুনিয়েও খোটা দিলেন। সম্পর্কের সুতো বন্ধন তৈরির বদলে পেঁচিয়ে গিট তৈরি করলো। ক্রমেই তা শক্তিশালী হয়ে বন্ধন ছিন্ন করে ফেললো। অবস্থা এতই খারাপ হলো যে আজাদ বিশ্বাস ছেলের পড়াশোনার দোহাই দিয়ে আবাস ছেড়ে ঢাকায় পাড়ি জমালেন। সমস্যার সুরাহা হলো না। বরং সেটা লেজুড় হয়ে ঝুলে রইলো বিশ্বাস বংশের সাথে। বন্ধ হলো যোগাযোগ। লোকচক্ষুর আড়ালে গড়ে উঠতে থাকা সম্পর্কের ওপর আরো এক পাল্লা পর্দা পড়ল।
● ● ●
“শাহরিয়ার একবার ঝিনাইদহে যেতে হবে।”
খাওয়ায় ব্যস্ত হাতটা সহসাই থেমে গেলো। আজাদ বিশ্বাস একমনে খেয়ে যাচ্ছেন। রুমি বা আতিয়ার মাঝেও কোনো বিকার দেখা গেলো না। কেবল থেমে গেলো শাহরিয়ার।
“কেন?” মনের ভাব চাপাতে বেশ দক্ষ সে। এজন্য আতিয়ার অভিযোগেরও শেষ নেই। ছেলেটা নাকি তাকে মনের কথা বলে না।
“ওদিকের জমিটা বেচে দেবো। ওখানে এসব বাজিয়ে রেখে লাভ নেই। তার চেয়ে ঐ টাকা দিয়ে উত্তরার ফ্ল্যাট কেনাটা এগিয়ে রাখলাম।”
শাহরিয়ার অবাক হলো, “দাদার বাড়ি। বেচবে কেনো? ওটা থাকুক।”
“সেই সাথে এসব ঝগড়াঝাটিও চলুক তাই তো? কোনো মানে হয় না।” আতিয়া বেগম বললেন।
“তো ঝগড়া করো কেনো তোমরা? এসব মিটিয়ে ফেললেই তো হয়।”
“বড়দের মাঝে কথা বলো না রুমি। যা বোঝো না তা নিয়ে নাক গলাবে না।”
বাবার ধমকে রিমির নাক ফুলে উঠলো। এদের দুই পরিবারের ইগোই শেষ হয় না। মাঝে চাপা পড়েছে তারা ভাই বোনেরা। কতদিন মেহু আপার সাথে তার কথা হয় না! ফোন করেছে শুনলেই আতিয়া বকাবকি শুরু করেন। মেহজাবিনটা অবশ্য তাকে বেশি একটা ভালবাসে বলে মনে হয় না। কেবল মেহু আপার জন্য মন পোড়ে।
“আমার ডিফেন্স শেষ হওয়ার আগে সম্ভব না।” শাহরিয়ার গম্ভীর কণ্ঠে বলল।
“কবে শেষ হবে? এখানে জয়েন করতে পারবে কবে?”
“ডিফেন্স পরের সপ্তাহে। জয়েনিং এর দেরি আছে। কয়েক মাস লাগবে।”
“লাগুক। তুমি তাহলে এদিকের কাজ শেষ করে একবার ঘুরে এসো। তুমি সব গোছগাছ করলে তারপর আমি যাবো। আমি বলে দিয়েছি জমি বেচে দেবো।”
“ছোট চাচাকে বলেছ?”
আজাদ বিশ্বাস এক প্রকার ধমকে উঠলেন, “ওকে বলতে হবে কেন?”
“বাড়ি তো জয়েন্ট। বেচে দেয়া মানে বাইরের একটা লোককে বাড়িতে ঢোকানো। চাচার সেটা জানা উচিত। এছাড়াও উনি যদি জমিটা নেন তাহলে তো ভালো হয়। বাড়ির জমি বাড়িতেই থাকে।”
“শোনো শাহরিয়ার, বড় হয়েছো বলে সবসময় জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করবে না। ঐ জমি সারা জীবন রেখে দিতে হলেও আমি আরমানকে দেবো না। ভিক্ষা দিলেও ওকে দেবো না। আর ওর কেনার মুরোদ আছে মনে করো তুমি? ফার্নিচার বেচে কয় টাকা ইনকাম করে ও? যদি করতই তাহলে ফকিরের মতো আমার কাছে চাইতে আসতো না।” হনহন করে চলে গেলেন আজাদ বিশ্বাস।
রুমি ফিসফিস করে বলল, “আম্মু আব্বু কি চাচাকে একটুও ভালোবাসে না?”
আতিয়া স্বগতিক্ত স্বরে বললেন, “এমনই দেখছি বিয়ের পর থেকে। বড়জন যেমন ছোটোজন তার চেয়ে কম না। সমান সমান। কিন্তু তোর আব্বু একটু বেশিই করে।”
আতিয়া বেগম চলে গেলে রুমি ভাইয়ের কাছে বায়না ধরলো, “ভাইয়া আমিও তোমার সাথে যাবো।”
“আমি তো ঘুরতে যাচ্ছি না রুমি।”
“না যাও তাও নিয়ে যাও।”
“তোর কলেজে পরীক্ষা চলছে না?”
“না। অর্ধ বার্ষিক শেষ হয়েছে। বার্ষিক এখনও দেরি আছে। নিয়ে যাও না!”
শাহরিয়ার উত্তর দিলো না। তার মাথায় ভিন্ন কথা ঘুরছে। সেই ঝিনাইদহে যেতেই যখন হচ্ছে এবার তাহলে একটা সুরাহা করে আসবে। কুয়াশার মতো যে প্রশ্নটা ঝাপসা তবে আজও অস্তিত্বে আছে সেই প্রশ্নের একটা উত্তর খুঁজে আনবে। তার কথা কি মেহরিমার মনে আছে?
~চলমান~
(“কৌমুদী” যারা পড়েছেন বইটইয়ে রিভিউ, রেটিং দিয়েন।)

