#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১১]
আজকের ভোর এলো খুব আয়োজন করে। ঘুম থেকে উঠেই আজ নিজ হাতে চা বানাতে হলো না হামিদুল হককে। খেতে হলো না হারুনের তৈরি ঝাল, নুনে পোড়া আধ সিদ্ধ খাবার। বাড়িতে বাবা আসার আনন্দে সেই কাক ডাকা ভোরে বিছানা ছেড়ে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করেই রান্নাবান্নার কাজে লেগে পড়ল সুহাসিনী। গরম গরম ফুলকো রুটি আর সাথে করল কষা মাংস। আহা কি তৃপ্তিদায়ক খাবার! তাও নিজ কন্যার হাতে, বহুদিন পর।
মেহমাদের বাবা-মা গতকাল রাতটা আদনানের ফ্ল্যাটে কাটিয়েছেন। আদনান আবার বউ সন্তান নিয়ে একই বিল্ডিংয়ে থাকে। উপরতলার ফ্ল্যাটটাই তাদের। নাস্তা সেরে নাতিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হলেন হামিদুল হক। সকালের আবহাওয়া উনার ভীষণ প্রিয় কিনা।
“বুঝলে নানা, ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় করে খোলা আকাশের নিচে হাঁটার মজাই আলাদা। প্রতিদিন নিজে নিজে উঠে বাবার সাথে মসজিদে যাবে, ঠিক আছে?”
মিথিনের হাতে বিট লবণ মাখানো আস্ত একটা শসা।নানার কাছে চিপস চাইতেই নানা তাকে কিনে দিয়েছে শসা। সেটাই সে ইঁদুরের মতো সামনের ছোট্ট ছোট্ট দাঁত দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। খেতে খেতে বললো, “বাবা তো মসদিদে যায় না। আম্মু দাকলে বলে ইকতু গুমাতে দাও।”
“তুমি ডাকতে পারো না? ডেকে বলবে, চলো বাবা মসজিদে যাই।”
“আমিও উততে পারি না। পচুল গুম থাকে।”
“তাহলে তো হলো না, নানা। আল্লাহ তোমার উপর রাগ করবেন।”
“ক্যানো? আমি তো গুড বয়।”
“গুড বয়রা অত বেলা পর্যন্ত ঘুমায় না। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।”
“দাদা বলেছে আমার নামাজ পলার বয়ছ হয়নি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হামিদুল হক। নামাজ ফরজ হয়নি বলে এসব শিখাবে বাচ্চাকে? এ তো গোঁড়ায় গলদ! নাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। অদূরে এক কিশোর রঙ বেরঙের বেলুন বিক্রি করছে। যা নজর এড়ালো না মিথিনের। বেলুন তার প্রিয়। ঘরের ভেতর উড়িয়ে দিয়ে খেলতে ভালো লাগে। তৎক্ষণাৎ সে চেঁচিয়ে উঠল,“নানাভাই নানাভাই, ওই যে বেলুন! কিনে দাও।”
কিছু বললেন না হামিদুল হক। মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের কিছু আবদার পূরণ করতে হয়। তাই মিথিনের হাতটা ধরে রাস্তা পার হলেন।রঙ বেরঙের পাঁচটা বেলুন কিনে হাঁটা ধরলেন বাড়ির পথে। মিথিনের খুশি আর দেখে কে?
সংসারের কাজের চাপে দুদণ্ড বসার সময়টুকুও নেই সুহাসিনীর। শ্বশুর-শাশুড়ি তার এখানেই খায়। বড়ো পুত্রবধূর রান্না আবার উনাদের মুখে রোচে না। বড়ো জন কোনো কাজের নয়। বাচ্চাদের দোহাই দিয়ে রান্নাসহ সবকিছু ছুটা বুয়াকে দিয়েই করায়। বুয়ার রান্না খাওয়া যায়? ছোটো ছেলের সংসারে আবার কাজের লোক নেই। মেহমাদ বললেও সুহাসিনী রাখেনি। অযথা বাড়তি টাকা খরচের কী প্রয়োজন? তবে সেই সুযোগে পারভিন তাকে দিয়ে বাড়তি কাজও করিয়ে নেন। তিনবেলা রান্না, রোজ সব ঘর ঝাড়ু দেওয়া, বাচ্চা সামলানো, কাপড় চোপড় ধোয়া থেকে শুরু করে বুড়ো বুড়িকে একটু পরপর চা বানিয়ে দেওয়ার ঝামেলা। একা হাতে আর কত করা যায়? অসহ্যকর।
মেহমাদ অফিসে গেলো না। তিনদিনের ছুটি নিয়েছিল। তাই দিনের অর্ধেকটা পরিবারের সাথেই কাটলো তার। শ্বশুরকে ছেলেটা আবার ভীষণ ভয় পায়। প্রেমিকার বাপকে ভয় পায় না এমন কোনো প্রেমিক আদৌ আছে নাকি পৃথিবীতে? যদিও এখন সে স্বামী হয়েছে তবুও সেই ভয় কাটাতে পারেনি।
দুপুরের ভোজন শেষে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে গল্প করছেন হামিদুল হক, আদনান আর মেহমাদ। রফিকুল জামান হা হু করে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন শুধু।
শিথিল এসে উপস্থিত হলো ঠিক দুপুর দুইটা ত্রিশ মিনিটে। কাঁধে বিশাল এক ব্যাগ ঝোলানো। ভাইকে হঠাৎ এভাবে দেখে ললাটে ভাঁজ পড়ল সুহাসিনীর। দরজার সামনে থেকে সরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“কী রে? নায়ক সেজে এলি যে? আর এই ব্যাগে কী?”
বোনের প্রশ্নের জবাব দিলো না শিথিল। ব্যাগ মেঝেতে রেখেই বাবার পাশ ঘেঁষে বসলো। হাফ ছেড়ে বললো, “ট্রেন তিনটা পনেরোতে ছাড়বে। চলো বাড়ি ফিরে যাই।”
সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকালেন হামিদুল হক। মাঝেমধ্যে ছেলেকে চিনতে পারেন না তিনি। এই মুহূর্তে এর মতলব ঠিক সুবিধার লাগছে না। মুখে গাম্ভীর্য এঁটে জিজ্ঞেস করলেন,“কাল থেকে শুরু করে আজ দুপুর দুইটা পর্যন্ত কোথায় ছিলি?”
“কাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাসে ছিলাম। দুপুর থেকে সন্ধ্যা মিথিনের সাথে ছিলাম। সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা টিউশনে ছিলাম। সাড়ে নয়টা থেকে বারোটা পর্যন্ত মন দিয়ে লেখাপড়া করেছি। এরপর ঘুমিয়েছি। সকালেও ক্লাসে গিয়েছিলাম। একটায় ফিরে নামাজ পড়ে বাসায় গিয়ে সব গুছিয়ে এখানে চলে এসেছি, তোমাকে নিতে।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে দম ছাড়লো শিথিল। অবাক হওয়ার ভান ধরে নাটকীয় ভঙিতে আচমকাই বলে উঠল,“কত ভদ্র, বাধ্যগত ছেলে আমি! এই বয়সে এসেও বাবাকে সব বলে দেই।”
মেহমাদ চাপা শ্বাস ফেলল। শ্যালক যে কতটা ভদ্র তার চেয়ে ভালো আর কে জানে? সুহাসিনী বললো,“এসব নিয়ে পরে কথা হবে। খাবার বাড়ছি, খেতে আয়।”
“খাবো না, খেয়ে এসেছি।”
“খেয়ে এসেছিস মানে?”
“রুমমেট রান্না করেছিল। তাই খেয়ে এসেছি।”
সুহাসিনীর রাগ হলো। ভীষণ রাগ! রাগত স্বরে বাবার কাছে অভিযোগ জানাল,“দেখো বাবা। নিজ চোখে তোমার ছেলের কাজ কারবার দেখো। ওকে কল দিলে ঠিকমতো ধরে না। মাঝেমধ্যে নিজ থেকে কল দিলেও মিথিনের সাথে কথা বলেই রেখে দেয়। বাসায় আসতে বললে আসে না। ওর যে একটা বড়ো বোন আছে তা মনে আছে বলে তো মনে হয় না। আজ এলো তো এলো তাও আবার নাকি খেয়ে এসেছে। ওর আসলে সমস্যা কোথায়?”
হামিদুল হক ছেলেকে চোখ রাঙালেন। বাহুতে থাপ্পড় বসিয়ে মিছেমিছি ধমক দিয়ে বললেন,“বড়ো বোনের কথা শুনিস না কেনো, গর্দভ? ছোটো থেকে মায়ের মতো আগলে রেখেছে এইদিন দেখার জন্য?”
নিরুত্তর রইল শিথিল। কিছু বলার প্রয়োজন মনে করল না যেন। তার নিরবতায় কষ্ট পেলো সুহাসিনী। ঘোলাটে হলো আঁখি। পল্লব ঝাপটে বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে স্থান ত্যাগ করল সে। মেহমাদ উঠে দাঁড়ালো। নম্র স্বরে বললো,“আপনারা বসুন, আমি দেখে আসছি।”
কথা শেষ করে স্ত্রীর পিছুপিছু ঘরে চলে গেলো সে। এই মুহূর্তে মেহমাদ ছাড়া কেই বা ভুলাবে সুহাসিনীকে? এরপর বেশ কিছুক্ষণ পাল্লা দিয়ে ড্রয়িং রুমে নিরবতা চললো। শিথিল পুনরায় বললো,“এখানে বসে থাকলে হবে না। দেরি হয়ে যাচ্ছে, বাড়ি চলো।”
“তোর লেখাপড়ার কী হবে?”
“কিছু হবে না। কাল বন্ধ। এরপর বৃহস্পতি আর শুক্রবার।”
“তোকে নিয়ে আর পারি না। মাঝেমধ্যে কী যে হয়? বাচ্চামি শুরু করে দিয়েছে। কী প্রয়োজন ছিল হাসির মন খারাপ করে দেওয়ার?”
“আপুর কথা বাদ দাও। এখানে ওর বাবা-মা, ভাই, বোন, স্বামী, সন্তান সব আছে। একটু পর মন আবার ভালো হয়ে যাবে।”
তার নির্লিপ্ত ভাবভঙ্গি দেখে আর কিছু বললেন না হামিদুল হক। ছেলে-মেয়েদের তিনি অযথা কিছু বলেন না। তবে ওদের মা বেঁচে থাকলে হয়তো বাবা হিসেবে অনেক কিছুই বলতেন, ভয় দেখাতেন। কিন্তু সে তো আর নেই। তাই উনাকেই এই গুরু দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। বসা থেকে উঠে চলে গেলেন তিনি। প্রয়োজনীয় সবকিছু নিতে হবে। তার আগে মেয়ের সাথে কথা বলতে হবে, রাগ ভাঙাতে হবে।
শিথিল ছেলেটা কেমন যেন। অদ্ভুতও অবশ্য বলা যায়। অল্পতেই তাকে ভেতর থেকে চিনে ফেলা মুশকিল। তার প্রকৃতি বর্ণনা করাও হয়তো অসম্ভব। তবে এতটুকু বলা যায় যে প্রেম, ভালোবাসা, মায়ার থেকেও শিথিলের সব থেকে বড়ো এবং দামি সম্পদ হচ্ছে তার আত্মসম্মান। তার জীবনের এমন অনেক স্বভাবই সে পেয়েছে বাবার থেকে।
তখন জানুয়ারি মাসের মধ্যভাগ। তারিখ কত? উমম চৌদ্দ কিংবা পনেরো হবে হয়তো। নাকি সতেরো? সঠিক মনে নেই শিথিলের। তারিখ সে কখনোই মনে রাখতে পারে না। এর জন্য বন্ধুদের কাছে প্রায়শই বকা খায়। মিথিনের তখন ভীষণ অসুখ। জ্বর, সর্দি, কাশি।ডাক্তার দেখিয়ে নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানোর পরেও সেরে ওঠার নাম নেই। সেই খবর পেয়ে ভাগ্নের পছন্দের সব খাবার নিয়ে ছুটে এলো শিথিল। বোনকে সে যতটা ভালবাসে মিথিনকেও ঠিক ততটাই ভালোবাসে। বাচ্চাটা যে ভীষণ আদরের।
মামাকে পেয়ে অসুখ ভুলে দুর্বল ছোট্ট দেহে মামার গলা জড়িয়ে ধরে বসে রইল মিথিন। ছেড়ে দিলেই যেন চলে যাবে মামা। শিথিল তাকে জড়িয়ে নিলো নিজের বাহু ডোরে। গরম কপালে চুমু খেলো। কোলে করে এদিক সেদিক হাঁটলো। মেহমাদ অফিসে। ইতোমধ্যেই ছেলের পেছনে দৌড়ে চারদিন অফিসে যাওয়া হয়নি।কর্পোরেট অফিসারদের আবার এমনিতেই খুব ব্যস্ততা।তার উপর এতদিন অফিস না গেলে চাকরি আদৌ থাকবে?চাকরি না থাকলে পরিবার চলবে কীভাবে?
সুহাসিনীর অবস্থা নাজেহাল। জোয়ান শাশুড়ি ঘরের কাজে ভুলেও সাহায্য করে না। বরং সময় অসময়ে ভুল ধরতে ওস্তাদ। অসুস্থ ছেলেকে নিয়েই সব কাজকর্ম একা হাতে সামলাতে হচ্ছিল তাকে। নাতিকে নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির আহ্লাদ শুধু মুখ দিয়েই। সরাসরি এক মুহূর্তের জন্যও সামলাতে পারে না। বিরক্তি নিয়ে বলে,“আর পারছি না, বউমা। তোমার কাছে যেতে চায়।”
মিথিন শিথিলের কোলে থাকায় সব কাজ শেষ করে হাফ ছেড়ে বাঁচলো সুহাসিনী। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো দুপুরে, খাবার টেবিলে। বাড়িতে যে কেউ এলেই অনেক আয়োজন করে সুহাসিনী। রাঁধতে, যত্ন করে খাওয়াতে তার ভীষণ ভালো লাগে। সেখানে শিথিল তার ভাই। নিজের মায়ের পেটের ভাই। বাড়িতে ভালো মন্দ রান্না হলে ভাইয়ের কথা খুব মনে পড়ে সুহাসিনীর। ভাই বাসায় এলেও ভাইয়ের পছন্দসই রান্না করার চেষ্টা করে।
ব্যাচেলর থাকে সে। বুয়া কীভাবে রাঁধে না রাঁধে কে জানে? অসব খেয়ে মানুষ সুস্থ থাকতে পারে? শিথিল আবার সবার হাতের রান্না খেতে পারে না। তাই সেদিনও মোটামুটি আয়োজন করল সুহাসিনী। চার পদের লোভনীয় তরকারি আর সাদা ভাত। কিন্তু পারভিনের তা একদম সহ্য হলো না। ভদ্রমহিলা লোভী প্রকৃতির মানুষ। বিয়ের সময় একটা স্বর্ণের চেইন ছাড়া বাপের বাড়ি থেকে কিছুই সঙ্গে আনেনি সুহাসিনী। আসল কথা হচ্ছে, মেহমাদ আনতে দেয়নি। হামিদুল হক অনেক কিছুই মেয়েকে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু মেহমাদ মানা করেছে। অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে পণ নেওয়া তার অপছন্দনীয়। এতে সম্মান ক্ষুন্ন হয়। পুরুষের মেরুদণ্ড অকেজো হয়ে যায়। এসকল গুণাবলীর কারণেই তো নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে তাকে বেছে নিয়েছিল সুহাসিনী। আর হামিদুল হকও মেনে নিয়েছিলেন তাদের সম্পর্ক।
পারভিনের বিশেষ লোভ হামিদুল হকের গাজীপুরের বাড়িটির উপর। এই লোভ উনার মনে ঢুকিয়েছে স্বামী রফিকুল জামান। বেশ কয়েকবার ওখানে ঘুরতে যাওয়ায় তখনি মনে ধরেছিল। সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে দুতলা বাড়ি। জমিসহ এমন বাড়ির দাম আজকাল আকাশ ছোঁয়া! হামিদুল হক পৈতৃক সূত্রে পেয়েছেন তা। উনার বাবা সেকালে অনেক ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তখন তো জায়গা জমির দামও খুব কম ছিল। তাছাড়া আজকে যা শহর তখনকার আমলে তা ছিল ঘন জঙ্গল।
সেসব কথা যাক, সুহাসিনী একমাত্র মেয়ে। তার কী ওই বাড়ির উপর কোনো অধিকার নেই নাকি? আলবাত আছে। আর সুহাসিনীর যা তার সবই তো মিথিনের। সেটাই অনেকবার ছেলে, বউকে বুঝিয়েছেন পারভীন। সুহাসিনীর এক উত্তর,“আমি বিবাহিতা। স্বামীর যা আছে তা নিয়েই আমি খুশি এবং সুখী। বাবার ওই বাড়ির একমাত্র ভাগীদার আমার ভাই। তাই এ ব্যাপারে আর কিছু শুনতে চাই না, মা।”
মেহমাদ স্ত্রীর সাথে একমত,“সুহা যা চায় তাই হবে। আমাদের তো এখানে একটা ফ্ল্যাট রয়েছে। অযথা অসব ব্যাপারে কথা বলার কী প্রয়োজন, মা? এত লোভ ভালো নয়।”
এরপর এ ব্যাপারে কথা না বললেও শিথিলের উপর চাপা একটা ক্ষোভ উনার রয়েছে। সেই রাগটাই সেদিন উগড়ে দিলেন,“বিয়ের সময় তো বোনকে কিছু দিতেও পারেনি তোমার বাবা। অথচ দুদিন পরপর গাণ্ডেপিণ্ডে গিলতে চলে আসো?”
হতভম্ব হলো শিথিল। চমকাল, থমকাল। পারভীনের ঠোঁটের কোণে তখন বিশ্বজয়ের হাসি। সুহাসিনী চাপা স্বরে বললো,“এসব কী বলছেন, মা? ও আমার ভাই। ছোটো মানুষ। এ ধরণের কথা বলা কী খুব জরুরি ছিল?”
“তুমি তোমার ভাইয়ের সামনে আমায় অপমান করছো? আজ আসুক আমার ছেলে।”—হায় হুতাশ করতে লাগলেন পারভীন।
সুহাসিনী এরপর আর কিছু বললো না। তিলকে তাল বানাতে ভালো পারেন ভদ্রমহিলা। ভাইয়ের উদ্দেশ্যে আমতা আমতা করে বললো,“বাদ দে। গায়ে মাখিস না। খা তুই।”
পারভিন চলে যেতে যেতে বিদ্রুপ করে বলে গেলেন, “হ্যাঁ খাও, খাও। আবার কবে না কবে ভালো মন্দ খেতে পাও।”
কথাগুলো সূচের মতো শিথিলের গায়ে গিয়ে বিঁধলো যেন। তাদের অবস্থা বরাবরই ভালো ছিল। আহামরি ধনী না হলেও গরীব তারা নয়। বরং উচ্চ মধ্যবিত্ত বলা যায়। মা ব্যতীত জীবনে আর কোনো কষ্ট বাবা তাদের পেতে দেননি। সেখানে এত বড়ো একটা অপমান! তাও খাওয়ার সময়? শিথিলের ইচ্ছে করল উঠে চলে যেতে। কিন্তু উঠতে পারলো না। বাবা ছোটোবেলায় শিখিয়েছিলেন,“আর যা কিছুর উপরেই রাগ করিস না কেনো, খাবারের উপর রাগ একদম করবি না। রিজিকের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ।”
তাই চুপচাপ খেয়ে শেষবারের মতো মিথিনের সঙ্গে দেখা করে সেই যে চলে এসেছিল এরপর আর কখনো এ বাসায় শিথিল আসেনি। এমনকি এ বাসার এক গ্লাস পানিও পান না করার শপথ নিয়েছিল। গতকালও না আসারই ইচ্ছে ছিল কিন্তু মিথিনের জন্য বাধ্য হয়েই আসতে হয়েছিল।ছেলেটা মায়ের মোবাইল থেকে তাকে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল,“মামা কালকে আমার দন্মদিন। বাবা বলেছে বড়ো কেক আনবে। তুমি না এলে আমি কান্না কলবো।”
এই সুন্দর আধভাঙা বাক্যে বলা কথাগুলো প্রত্যাখ্যান করার মতো দুঃসাহস কী তার আছে?
____________
লিলির বিয়ে হলো ঠিক দুপুর দুইটার এদিক ওদিক সময়ে। বিকেলের দিকে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশ্যে তাকে বিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে নয়টা বাজলো সুশ্রীদের। মেয়েদের উপর ভীষণ রেগে আছেন শাহিনূর। কোনো ভালো পরিবারের মেয়ে এত রাত পর্যন্ত বাইরে দিয়ে টো টো করে ঘুরতে পারে না। এ শিক্ষা মেয়েদের তিনি দেননি।
মোজাম্মেল হোসেন চোটপাট করলেন। আড়চোখে স্ত্রীর রাগত চেহারা দেখে কৃত্রিম ধমকের সুরে সুশ্রীর উদ্দেশ্যে বললেন,“ফিরতে এত রাত হলো কীভাবে? বিয়ে তো সেই দুপুরেই শেষ হয়েছে। তুই সবার বড়ো। তোর কোনো কান্ড জ্ঞান নেই?”
বাবার সাথে সুশ্রীর সম্পর্ক ভালো। মায়ের হাতে মার খেলেও বাবার কাছে কখনো বকাটাও পর্যন্ত খায়নি। অপরাধীর ন্যায় মুখ করে নত স্বরে বললো,“অনেক দিন পর কলেজের বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ব্যস্ততার কারণে তো দেখাই হয় না। তাই ওদের সাথে একটু ঘোরাঘুরি করে রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। সবসময় কী আর এমন হয়, বলো বাবা?”
“আচ্ছা আচ্ছা, যাও মায়ের কাছে গিয়ে স্যরি বলো।”
ইশারা করলেন মোজাম্মেল হোসেন। সুশ্রী সেই ইশারায় মাথা নাড়ল। কিছু বলার পূর্বেই শাহিনূর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“প্রয়োজন নেই। যা ইচ্ছে করুক গিয়ে। এখন বড়ো হয়েছে। কোনো কিছুতে মায়ের অনুমতি নেওয়ার আর দরকার আছে?”
মন খারাপ হলো সুশ্রীর। সত্যি বলতে সব দোষ এই মিশমির। মাঝপথে ডিনারটা রেস্টুরেন্টে করার জন্য সে-ই আবদার জুড়ে দিলো। অনলাইনে কয়েকদিন আগে এক নতুন রেস্টুরেন্টের সন্ধান পেয়েছে নাকি। শাফিনটাও হয়েছে এই মেয়ের মেল ভার্সন। এত করে অনুরোধ করল না! সুশ্রী আর না করতে পারলো না। আবৃত্তি তো আবার চুপচাপ মানুষ। তাকে যে পথে যেতে বলা হবে ও সে পথেই দৌড়াবে। গতকাল গায়ে হলুদে না গেলেও আজ তাকে জোরজবরদস্তি করেই নিয়ে যেতে হয়েছে।
ছেলে-মেয়েদের অপেক্ষায় রাতে দেরি করে খেতে বসলেন মোজাম্মেল হোসেন। সুশ্রী, শাফিন আর খেলো না। কিন্তু মিশমি যথা আজ্ঞা খেতে বসে পড়ল। বাইরে যতই গলা পর্যন্ত গিলে আসুক না কেনো, বাড়িতে এসে এক প্লেট ভাতে লেবু চটকে না খেলে সে স্বস্তি পায় না। আবৃত্তির অবস্থা আবার ভিন্ন। মানুষের ভিড়ে সে খেতে পারে না। লজ্জা পায়। তাই সেও বসলো একটি চেয়ার টেনে।
শাহিনূর গম্ভীর মুখে সবাইকে খাবার বেড়ে দিলেন। মিশমি মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে বাবার উদ্দেশ্যে আচমকাই বলে উঠল,“মেয়েটা ভীষণ সুন্দর না, বাবা?”
মোজাম্মেল হোসেনের ভুঁড়িটা বেড়েছে। তাই আজ রাতে রুটি খাচ্ছেন তিনি। খেতে খেতে উত্তর দিলেন, “সুন্দর বলেই তো বিয়ে করেছিলাম।”
“কাজকর্মও তো ভালোই পারে।”
“আগে পারতো না। বিয়ের পর ধরে ধরে সব আমি শিখিয়েছি।”
“তবে রাগলে ভয়ংকর লাগে।”
“ইচ্ছে করে মুখে কস্টেপ লাগিয়ে দেই।”
বাবা, মেয়ে একসঙ্গে হো হো করে হেসে উঠল। শাহিনূর রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে দৌড়ে এলেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন,“খাবার খাবে নাকি খুন্তির বাড়ি?”
দুজনেই ভড়কে গেলো। একে অপরকে ইশারা করে খেতে লাগলো। আবৃত্তি বিরস মুখে সেসব দেখে গেলো শুধু। ভেতরে কোথাও ভালো লাগা কাজ করল। কিছু মুহূর্ত অতিক্রম হতেই সেই ভালো লাগা বদলে গেলো আফসোসে। আজ নিজের মা বেঁচে থাকলে বাবার সাথে তার সম্পর্কটাও হয়তো এমন সুন্দর হতো। সুন্দর একটা পরিবার পেতো সে।
চলবে _________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

