মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:১৯]

0
2

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:১৯]

রাতটা আরফিনের সঙ্গে থাকার জন্য হাসপাতালে এসে উপস্থিত হলো স্বাধীন আর শিথিল। শান্ত, সজীব আছে হলরুমে। তুহিনকে রেখে এসেছে ফ্ল্যাটে। অযথা এত মানুষ এসে ভিড় বাঁধিয়ে করবে কী? থাকার মতো জায়গাও নেই। পাশের সিটটা খালি। শিথিল ওখানেই বসলো। আবৃত্তিকে নামিয়ে দিয়ে সোজা বাসায় গিয়ে গোসল সেরে খেয়েদেয়ে তারপর হাসপাতালে এসেছে সে। স্বাধীন বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে। আরফিনের এক্সিডেন্টের খবরটা শুনে মা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে উনার আবার ভীষণ ভাব। মাসে এক দুইবার হলেও বাড়িতে আড্ডা দিতে চলে যায় তারা। আর উনি যত্ন করে নতুন নতুন রেসিপি ফলো করে রেঁধে খাওয়ান সকলকে। খাওয়া শেষে তাদের মুখে নিজ প্রশংসা শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন ভদ্রমহিলা। তাই হাসপাতালে স্বাধীনের থাকার খবর শুনেই তিনি টিফিন বক্স ভরতি খাবার দিয়ে দিলেন সঙ্গে।

খাবারগুলো বের করল স্বাধীন। প্রথমে একটি প্লেটে বেড়ে আরফিনের হাতে ধরিয়ে দিলো। শিথিলের উদ্দেশ্যে বললো,“জমিদারের মতো বসে আছিস কেনো? ধর, নিজেরটা নিজে বেড়ে খা।”

শিথিল ব্যস্ত হাতে টাইপ করছে। একপলক স্বাধীনের দিকে তাকালো। তারপর আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দিয়ে বললো,“আমি খেয়ে এসেছি।”

“খেয়ে এসেছিস? আর আমি যে খাবারগুলো নিয়ে এলাম?”

“নতুন রুমমেট এসেছে। ওরাই রান্না করেছে। জোর করে বললো টেস্ট করে রিভিউ দিতে। মুখের ওপর না করা যায় বল?”

রাগ করতে গিয়েও রাগ করল না স্বাধীন। বিষয়টা সে বুঝেছে। তাই চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। টাইপ শেষে উঠে দাঁড়াল শিথিল। যেতে যেতে বললো,“তোরা খেতে থাক। তোদের জন্য ঠান্ডা কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে আসি।”

আরফিন খেতে খেতে বললো,“আমার জন্য মোজো আনিস।”

স্বাধীন নাকোচ করল,“আমার জন্য লাচ্ছি ঠিক আছে। কালা জিনিস খাই না।”

“কালো জিনিস কী করল আবার?”

“এমনিতেই কালো আমি। তার উপর জিনিস কালো খেলে আরো কালো হয়ে যাবো। তাছাড়া আম্মাও নিষেধ করেছে।”

শিথিল আর আরফিন হাসলো। শিথিল আর কিছু না বলে চলে এলো বাইরে। আরফিন খোঁচা মেরে বললো,“আর সিগারেট খাওয়া ছাড়বি না? ধোঁয়া গিয়ে তো ফুসফুসসহ সব কালা করে দিচ্ছে।”

“ওইটা বিয়ের পর ছেড়ে দিবো। তুই চুপচাপ খা, মগা।”

“শ্লা, জীবনেও ভালো হবি না তুই।”

“শালা বলবি না। আমার বোন তোরও বোন।”

“আর তুই যখন বলিস?”

“আমার একটাই বোন। বাকি সব বউ।”

আরফিনের ইচ্ছে করল উঠে গিয়ে দুটো লাথি মারতে। কিন্তু ভাঙা পা নিয়ে তা আর পারলো না। তাই ভবিষ্যৎ এর জন্য তুলে রাখলো লাথিটা।

বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির থেকে বাতাসের তেজটাই বেশি। হাসপাতালের পাশের দোকানটাতে আর যেতে পারলো না শিথিল। অসময়ে হওয়া বৃষ্টিতে ভিজলে রোগ বাঁধার সম্ভাবনা রয়েছে বেশি। পোশাক বদলানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। হাঁসফাঁস করতে লাগলো মন। দুপুর থেকে এখনো পর্যন্ত সিগারেটে সুখটান দিতে পারেনি বেচারা। দিনে দুই থেকে তিনটা না খেলে তার আবার হয় না। আবৃত্তির সাথে পুরো সময়টা কাটানোর চক্করে ভুলে বসেছিল সেসব। তবে এখন না খেলেই যেন নয়। হাসপাতালের আশেপাশে ধূমপান করাটাও রিস্ক। ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে ভেতরের একটি দোকান থেকে পানীয় কিনে তৃষ্ণার্তের মতো ঢক ঢক করে গিলে ফেলল। আর উপায়ান্তর না পেয়ে শেষমেশ স্বাধীন আর আরফিনের জন্য তাদের পছন্দের পানীয় নিয়ে চলে আসার জন্য উদ্যত হলো।

দুদিন ধরে ওয়ার্ড আর ল্যাব পর্যবেক্ষণ করে রিপোর্ট তৈরির জন্য হাসপাতালে আসা যাওয়া বেড়েছে সুশ্রীর। একনাগাড়ে বেশ কয়েক ঘণ্টা সিনিয়র ডাক্তারের পিছু পিছু ঘুরে রোগী দেখে খাতায় নোট করতে করতে ঘাড় আর পা ব্যথা হয়ে গিয়েছে তার। অবশেষে কাজ সমাপ্ত হলো। বান্ধবী জুথি কোত্থেকে যেন দৌড়ে এসে হাতে ধরিয়ে দিলো ওয়ান টাইম সাদা চায়ের একটি কাপ। চমৎকার হেসে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল সুশ্রী,“এই মুহূর্তে এটারই প্রয়োজন ছিল খুব। জানলি কীভাবে?”

জুথি ঘাড় চুলকে প্রত্যুত্তর করল,“আমি না, আরাফাত স্যার পাঠিয়েছেন। তোর জন্য স্পেশাল চা। আমি তো শুধু বাহক মাত্র।”

“আরাফাত স্যার?”

“হ্যাঁ, তো আর কে? তোদের প্রেম দেখে মাঝেমধ্যে আমার খুব হিংসে হয়।”

অধরের হাসি বিলীন হয়ে গেলো সুশ্রীর। মুখভঙ্গি দেখেই বুঝা গেলো কথাটা যে তার পছন্দ হয়নি। চা আর খেলো না। জুথির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, “তোদের নয়। আমি উনাকে পছন্দ করি না। কখনো ভাবিনি পর্যন্ত। তাই নেক্সট টাইম এসব কথা বলবি না।”

“রাগছিস কেনো? আমি তো মজা করলাম শুধু।”

“এমন মজা আমার পছন্দ নয়।”

“স্যার কিন্তু ছেলে হিসেবে খারাপ নয়। সেম প্রফেশন। ভালো ফ্যামিলি থেকে বিলং করে। উচ্চপদে রয়েছে। সমস্যা কোথায়?”

“সেসব তুই বুঝলে তো ভালোই হতো।”

হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেলো জুথি। দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো সামনে। সুশ্রীকে থামিয়ে ইশারায় দেখিয়ে ফিসফিস করে বললো,“বলতে না বলতেই আরাফাত স্যার হাজির।”

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুশ্রীও সেদিকে তাকালো। আরাফাত ভদ্রলোক এদিকেই আসছেন। পরনে সাদা ডাক্তারি ইউনিফর্ম। কিছুক্ষণ আগেই রোগী দেখা শেষ করে বিরতি নিয়ে সোজা বাইরে চলে এসেছে। সুশ্রী সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলো। হঠাৎ দৃষ্টিগোচর হলো কাউকে। বেশ অবাক হলো। আশপাশ ভুলে বড়ো বড়ো কদম ফেলে এগিয়ে এসে উঁচু গলায় ডাকলো, “শিথিল ভাই!”

ডাক শুনে পথিমধ্যে থেমে দাঁড়াল শিথিল। সবেমাত্র সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এসেছে সে। সম্মুখে তাকাতেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে হেঁটে আসতে থাকা সুশ্রীকে দেখে তার অধরেও দেখা মিললো হাসির। এগিয়ে এসে দূরত্ব কমালো,“আরে, ডাক্তার আপা!”

লাজুক হাসলো সুশ্রী। জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ, তুমি?”

“আমিও আলহামদুলিল্লাহ। হঠাৎ হাসপাতালে? কার কী হয়েছে? আঙ্কেল ঠিক আছেন?”

“হুম একদম ঠিক। বন্ধু এক্সিডেন্ট করেছে। পরিবারের লোক গ্ৰামে থাকে। তাই গার্ডিয়ান হিসেবে হাসপাতালে দৌড়াতে হচ্ছে।”

“ওহ, তাই বলুন।”

“তুমি এ সময় এখানে? নাইট ডিউটি পড়েছে?”

“না, এখনি কীসের? সন্ধ্যায় এসেছিলাম একটা কাজে। আম্মু প্রায় প্রায় আপনার কথা বলে। আপনি এখন আসেন না কেনো?”

“সামনে সেমিস্টার, তাই দিনকাল ভীষণ ব্যস্ততায় কাটছে।”

“বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার সময় তো ঠিকই পান। শুধু আমাদের বাসায় আসতে আর আমার কমেন্ট ম্যাসেজের রিপ্লাই দিতে আপনার যত ব্যস্ততা।”

কণ্ঠে অভিমান আর অভিযোগ ঝরে পড়ল যেন সুশ্রীর। শিথিল খানিকটা ভড়কে গেলো। বললো, “তোমরা দুই বোন মিলে আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করছো?”

“ইগ্নোর করেন?”

“বোনদের শুধু ভালোবাসতে হয়, বেশি পাত্তা দিতে হয় না। সুহাসিনী আপুকেও অলওয়েজ ইগ্নোর করে চলি।”

“আমি আপনার বোন?”

সরু দৃষ্টিতে তাকালো শিথিল,“তো কী? লেখাপড়ার চাপে কী এটাও ভুলে বসেছো? তুমি নিজেই তো হাফ ডাক্তার। তোমাকে এখন কার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিবো?”

“আপাতত ইঞ্জিনিয়ার হলেই চলবে।”

হাসলো শিথিল। দুষ্টুমি ভেবে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো কথাটা। আরাফাত দূর থেকে দুজনকে হেসে হেসে কথা বলতে দেখে বিরক্ত হলো। চোখেমুখে ফুটে উঠল কৌতূহল। বাধ বিচার না করেই এসে দাঁড়াল দুজনের মুখোমুখি। কৃত্রিম হেসে সুশ্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “উনি কে?”

হঠাৎ অপ্রত্যাশিত লোকটাকে দেখে ঘাবড়ে গেলো সুশ্রী। একপলক শিথিলের দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকালো। শিথিল সহজভাবে উত্তর দিলো,“কাজিন হই।”

“কেমন কাজিন?”

“খালাতো ভাই, আপনি?”

সুশ্রী তৎক্ষণাৎ জবাব দিলো,“উনি পুরোপুরি ডাক্তার। আমার অনেক সিনিয়র।”

আরাফাত সেই উত্তেজিত মুখশ্রী খেয়াল করল। মৃদু হেসে বললো,“ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবে না, সুশ্রী?”

অন্যের মুখে ভাই শব্দটা শুনে কান গরম হয়ে উঠল সুশ্রীর। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। উত্তর দিতে পারলো না। ইচ্ছে করল লোকটার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে। তার থেকে আশানুরূপ উত্তর না পেয়ে আরাফাত নিজেই হাত বাড়িয়ে দিলো শিথিলের দিকে। পরিচয় দিলো, “আমি ইয়াছিন আরাফাত। পেশায় নিউরোসার্জন। এই তো বছর দুয়েক হবে জয়েন করেছি। বাড়ি চট্টগ্রাম, তবে থাকি বনানী।”

হাত মেলালো শিথিল। নিজের পরিচয় দিলো,“নাম শিথিল হামদাদ। বুয়েটে আর্কিটেকচার পড়ছি। চতুর্থ বর্ষের শেষ প্রান্তে আছি। বাড়ি গাজীপুর।”

হাত বুকে ছুঁইয়ে মৃদু হাসলো আরাফাত। সুশ্রীর থেকে বিদায় নিলো শিথিল। যাওয়ার আগে আরাফাতের দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ করে বলে গেলো,“আসি তবে? আর হ্যাঁ, অতদূরে এত বয়স্ক লোকের সঙ্গে কিন্তু বোন বিয়ে দিবো না।”

অধরের হাসি ঝট করে নিভে গেলো আরাফাতের। বোকা দৃষ্টিতে চেয়ে রইল ছেলেটার যাওয়ার পথে। সুশ্রী ঠোঁট চেপে হাসছে। মুখের উপর এভাবে অপমান করে কে?

খাওয়া দাওয়ার পর্ব অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। শিথিলকে ভেতরে ঢুকতে দেখে স্বাধীন ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“কোথায় গিয়ে মরেছিলি? ফিরতে এত দেরি হলো কেনো?”

“বৃষ্টি পড়ছে। গেইট পর্যন্ত গিয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কস নিয়ে ফিরে এসেছি। মাথা ব্যথা করছে। একটা সিগারেট না খেলেই নয়।”

“সিগারেটখোর অথচ পকেটে সিগারেট থাকে না?”

“ধরা পড়লে আমার বাপ আমারে বয়রা করে দিবে। তাই পকেটে এসব রাখি না।”

“অভ্যস্ত হওয়ার আগে মনে ছিল না?”

“কৈশোরে মানুষ কত ভুলই করে। তার মধ্যে এটা ছিল আমার প্রথম ভুল। ভাবছি ছেড়ে দিবো।”

“নাটক কম কর। আমার কাছে মনে হয় তিনটা আছে। আয় দুইজনে মিলে একটা ভাগাভাগি করে খাই।”

“তিনটা থাকতে একটা ভাগাভাগি করে কেনো খাবো? ভাই কি ফকিন্নি নাকি?”

“তুই ফকিন্নি। এই জিনিসে কোনো কম্প্রোমাইজ নয়।”

“লাগবে না। তোরটা তুই খা। বৃষ্টি থামলে নিচে যাবো।”

“আচ্ছা নে, গোটা একটাই নে। জানালার বাইরে মুখ নিয়ে ধোঁয়া ছাড়িস। দজ্জাল নার্সগুলো দেখলে আবার সমস্যা।”

কথামতো শিথিল গিয়ে তাই করল। আরফিন এদের কান্ড দেখে বিরক্ত হয়ে বললো,“তোরা দুইটাই আসলে একরকম। কীসব বাল খাস।”

“তোর মতো প্রেম তো আর করি না।”—শিথিল ধমকের সুরে বললো।

স্বাধীন ঠাট্টা করল,“এই আজকে তোর এক্সের বাসর না? নাম্বার দে। কল দিয়ে বিরক্ত করি।”

আরফিন আর একটা কথাও বললো না। বালিশে মাথা রেখে সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে মুখ ঢাকলো।
___________

সারারাত আর ঘুম হলো না আবৃত্তির। ফোনের অপেক্ষায় ছটফট করতে করতে রাত্রিযাপন করল। শিথিল বলেছিল রাতে ফোন করবে। যে কথাটা আবৃত্তি বোঝেনি সে কথাটাই বিশ্লেষণ করে বুঝাবে। তাহলে ফোন করল না যে? ভুলে গেলো? সম্ভবত ভুলেই হয়তো গিয়েছে।

রাতটা নির্ঘুম কাটলেও ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়েছিল আবৃত্তি।সেই ঘুম ভাঙলো গিয়ে বেলা বারোটা নাগাদ। রুম তখন পুরোপুরি ফাঁকা। যে যার মতো ক্লাসে গিয়েছে।কিন্তু মাঝখানে তার ক্লাসটাই মিস হয়ে গেলো। ঘুম থেকে উঠে গোসল সেরে বাইরে বের হলো আবৃত্তি। খুব খিদে পেয়েছে। সকালের নাস্তা সকাল আটটা সাড়ে আটটার মধ্যেই রুম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দুপুরেরটা আসতে আসতে দুই বা দেড়টা বাজে। এতক্ষণ ধরে না খেয়ে থাকা একদমই সম্ভব নয়। পাশের একটি হোটেল থেকে পরোটা আর তরকারি কিনে এনে ক্ষুধা নিবারণ করল আবৃত্তি।তারপর টেবিলে বসে সমাপ্ত করল ক্লাসে দেওয়া অর্ধ সমাপ্ত এসাইনমেন্টটা।

শরীরটা বেশ ঝরঝরে ফুরফুরে লাগছে তার। বেলা করে ঘুমানোর জন্যই হয়তো। মোবাইল হাতে নিতেই চোখে পড়ল একটি নোটিফিকেশন।ছাত্রীনিবাসে উঠার পর থেকেই বাবাকে সে খুঁজছে। শুধু একবারের জন্য দেখা করার উদ্দেশ্যে। ভদ্রলোকের সাথে অনেক হিসাব নিকাশ বাকি রয়েছে। সেই হিসাব নিকাশ না চুকালে এ জীবনের অর্থই বা আর থাকলো কই? এমন অর্থহীন জীবন আর ভালো লাগছে না আবৃত্তির। অন্যায় না করেও প্রতি মুহূর্তে শাস্তি ভোগ করতে ভালো লাগছে না। খালার সঙ্গে তার আর যোগাযোগ নেই। নিজ থেকে খালা নিলুফা কখনোই আর আবৃত্তির সাথে কথা বলার প্রয়োজন মনে করেননি। তাছাড়া মামাদের কাছে বাবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর পাবে না বলেই নিশ্চিত সে।

তাই নিজের জন্ম সনদ ঘেঁটে দাদার ঠিকানা খুঁজে বের করেছে। বাবার ছবি আর পুরো নামটাও সেখান থেকেই পেয়েছে। এরপর স্যোশাল মিডিয়া ঘেঁটে ঘুঁটে বের করেছে ভদ্রলোকের আইডি। সেখান থেকেই আবার সন্ধান পেয়েছে লোকটার বোন ছেলের। সেই বোন ছেলের নাম পাভেল। বর্তমানে সে ঢাকা কলেজে মাস্টার্স পড়ছে। তার সঙ্গে দেখা করতেই তো সেদিন চন্দ্রিমা উদ্যানে গিয়েছিল আবৃত্তি। পাভেলের থেকে জানতে পেরেছে বাবা এখন আর বাংলাদেশে থাকেন না। স্ত্রী সন্তান নিয়ে সুদূর কানাডায় বাস করেন। বছরে দুইবার আসেন। তাও পরিবারের সঙ্গে ইদ পালনের উদ্দেশ্যে। এসেই এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে সর্বপ্রথম উঠেন ঢাকায় নিজেদের ফ্ল্যাটে। ওখান থেকে গ্ৰামের বাড়ি নরসিংদী যান।

এখনকার ম্যাসেজটাও পাভেলের থেকেই এসেছে। সেই ম্যাসেজে নজর ঘুরালো আবৃত্তি। তাতে লেখা, “এবার মামা বোধহয় রমজানের ইদটা আর দেশে পালন করবেন না। নানু ভীষণ অসুস্থ। গতকাল দুপুরে ঢাকার একটি হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়েছে। তাই কাল পরশুর মধ্যে মামার আসার সম্ভাবনা বেশি। এসে এক সপ্তাহ থাকবেন নিশ্চিত। এ খবর যে আমি তোমাকে দিয়েছি তা আবার কাউকে বলো না প্লিজ।”

এতটুকুই লেখা। তার নিচে দেওয়া একটি ঠিকানা আর হাসপাতালের নাম।ঠিকানাটা আবৃত্তির বাবার। সেদিকে তাকিয়ে বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আবৃত্তির। জানালার বাইরে তাকিয়ে বিষণ্ণ হাসলো। কতটা নিষ্ঠুর হলে একজন লোক এত সহজে নিজের রক্তকে এভাবে ভুলে যেতে পারে?ওই নিষ্ঠুর লোকটার মুখোমুখি হতে চায় আবৃত্তি। চোখে চোখ রেখে সব প্রশ্নের উত্তর চায়। এভাবে তো আর লোকটাকে সুখে থাকতে দিতে পারে না সে।

ক্লাস সেরে বিদিশা এলো ঠিক দুপুরে। পরনের পোশাক না বদলেই বিছানায় ছেড়ে দিলো শরীর। মেয়েটা ক্লান্ত হয়ে যায় অল্পতেই। ক্লান্ত কণ্ঠেই বললো, “আধ বেলা একা একা ঘরে বসে থাকতে কেমন লাগলো?”

“খারাপ না। তুমি আমায় ডাকলে না কেনো?”

“ডাকিনি মানে? কুম্ভকর্ণের মতো পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলি তুই। ডাকলাম, চিমটি কাটলাম তারপরেও উঠিসনি।”

“রাতে ঠিকমতো ঘুম হয়নি তাই। আগে তুমি তোমার এসব বদভ্যাস দূর করো তো। বাইরে থেকে ফিরেই হাত মুখ না ধুয়ে বিছানায় শুয়ে পড় কেনো? নোংরা।”

“আসছে আমার পরিষ্কার ওয়ালী।”

ভেংচি কেটে উঠে গেলো বিদিশা। পোশাক বদলে সেরে এলো একেবারে গোসল। দুপুরের খাবার এলো তার কিছুক্ষণ পর। খেতে খেতে বিদিশা বললো,“কাল নাকি বইমেলার লাস্ট ডেট। চল আজ গিয়ে ঘুরে আসি। সব ট্রিট তোর দুলাভাইয়ের।”

আবৃত্তি নাকোচ করল,“তোমরাই যাও। আমি আজ আর বের হবো না। গতকাল গিয়েছিলাম।”

“কার সঙ্গে গিয়েছিলি? আমি ছাড়া তো তোর আর কোনো বান্ধবীও নেই। আর অতগুলো বই কে কিনে দিলো?”

তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো না আবৃত্তি। রয়ে সয়ে বললো, “এক ভাইয়ার সাথে। উনিই উপহার দিয়েছেন।”

অবাক হলো বিদিশা। আতঙ্কিত কণ্ঠে চেঁচালো,“কিহ! একটা ভাইয়া! মানে একটা ছেলে! একটা ছেলের সঙ্গে তুই বইমেলা ঘুরে এসেছিস? তাও রাতবিরেতে? আমার বিশ্বাস হচ্ছে না কেনো? চিমটি কাট।”

শঙ্কিত হলো আবৃত্তি। চোখ রাঙাল,“আসতে বলো। যা ভাবছো তেমন কিছু নয়। অনেকদিনের পরিচয়।”

“কতদিনের? কেমন করে পরিচয় যে একেবারে বিশ্বাস করে ঘুরতে চলে গিয়েছিস? কই আমার সঙ্গে তো কখনো সন্ধ্যার পরে বের হসনি।”

“আমার মামাতো বোনের দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই।”

“অ্যা! এটা আবার কেমন সম্পর্ক?”

বিদিশা ভেবে পেলো না। খাওয়া রেখেই ভেঙে ভেঙে মিলাতে লাগলো সম্পর্ক। কিন্তু কিছুতেই মিলাতে পারলো না। দুপুরের খানিক বাদে অপরিচিত নাম্বার থেকে কল এলো। আবৃত্তি রিসিভ করতেই বিপরীত পাশ থেকে কথা বলে উঠল একটি পুরুষ কণ্ঠ, “আসসালামু আলাইকুম। ফ্রি আছো, আবৃত্তি?”

আবৃত্তির গলা কাঁপলো। সালামের জবাব নিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কে?”

“আমি শিথিল। ফ্রি থাকলে বাইরে এসো।”

উত্তরের অপেক্ষা না করেই কেটে দিলো কল।

চলবে ________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here