মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:২১]

0
2

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২১]

“তোমার জীবনে সুস্থ একটা পরিবার নেই, বুকে মাথা রেখে কাঁদার মতো কিংবা নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জন্য নিজস্ব কোনো মানুষ নেই, স্বস্তিদায়ক ঘর নেই, অপেক্ষা করার জন্য কেউ নেই। আর আমার ঘর থাকলেও ঘর সামলে রাখার মতো মমতাময়ী কোনো নারী নেই, মাথায় হাত রেখে ভরসা যোগানোর মতো মেয়েলি নরম হাত নেই। তাই আমরা একে অপরের হয়ে গেলে লাভ বৈকি কোনো ক্ষতি কিন্তু হবে না।”

আবৃত্তির দৃষ্টি সরলো না। বরং স্থির এবং গাঢ় হলো। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“মজা করছেন?”

“তাই মনে হচ্ছে?”

“না।”

“তবে?”

“প্রপোজ করছেন?”

“ধরে নিতে পারো।”

“এগুলো নিছক আবেগ। প্রেমের সম্পর্ক আমার পছন্দ নয়।”

“আমারো না।”

“তাহলে?”

“সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি।”

“হ্যাঁ!”—-অবাক হলো আবৃত্তি।

“চলো একেবারে বিয়ে করে নেই। প্রেম, ভালোবাসার জন্য বাকি জীবন তো পড়েই আছে। এসব না হয় বিয়ের পরে হবে।”

“কী বলছেন এসব?”

“ভুল কী বলছি? বিয়ের আগে মেয়েদের পেছনে ঘুরা কিংবা প্রেম করার মতো অহেতুক সময় আমার নেই। বিয়ের বয়স হয়েছে, তাই চলো বিয়ে করে নেই। এটা হঠকারিতা বা হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। তোমাকে আমি পছন্দ করি। কবে থেকে তা নিশ্চিত নই। তবে যতবার মস্তিষ্কে এসেছিলে ততবারই বিভিন্ন বাহানায় সরিয়ে দিয়েছি। কখনো ভেবেছি হয়তো তোমার জীবনের জটিলতা সম্পর্কে জেনে মায়া হচ্ছে, কখনো বা ভেবেছি এটা নিছকই আবেগ।কখনো জোর করে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছি আবার কখনো বা! মেয়ের চক্করে আমি কখনো পড়তে চাইনি। তাই দেড় বছর আগে যখন তৃতীয়বার আমাদের দেখা হলো তখন থেকেই আমি পুরোপুরি তোমায় এড়িয়ে যেতে চাইলাম। যতবার আন্টির বাড়ি গিয়েছি ততবারই এমনভাবে গিয়েছি যাতে তোমার মুখোমুখি না হতে হয়‌ কখনো। এভাবে একসময় ভুলেও বসেছি। তবে সেদিন চন্দ্রিমা উদ্যানে আবার আমাদের দেখা হলো। শুধু দেখা হলেও না হয় মানা যেতো। কিন্তু সেই মুহূর্তে আমার ভেতরে যে কী চলছিল তা একমাত্র আমিই জানি। চেয়েও আর তোমায় এড়িয়ে যেতে পারলাম না। এ কদিন অনেক ভেবেচিন্তে আমি গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিজের অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে গিয়েছি। দেখো আবৃত্তি, আমি সোজাসাপ্টা মানুষ। মনে যা মুখেও তা। অত ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না। তাই সোজাসুজি বলছি, বিয়ে করবে আমায়? ঠকবে না কিন্তু।”

হাতের তালু ঘেমে উঠল আবৃত্তির। অবাধ্য অনুভূতির তান্ডবে ধুকপুক করছে বুক। অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষটির থেকে এমন কিছুর সম্মুখীন যে তাকে হতে হবে তা কস্মিনকালেও যেন ভাবতে পারেনি মেয়েটা। এই মুহূর্তে ঠিক কী বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। শিথিল তার মুখ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষাও অবশ্য করল না। আজ নিজের মনের কথা জানানোর সময়। নিজেকে মেলে ধরার সময়। জিজ্ঞেস করল,“আমায় পছন্দ নয়? ভালো করে দেখো। আমি কী দেখতে খারাপ?”

কখন ধরেই তো তাকে দেখছে আবৃত্তি। কথাটায় যেন সম্বিৎ ফিরে পেলো। আরো ভালো করে লক্ষ্য করল। বাদামী রঙের চোখ দুটো তার দিকেই নিবদ্ধ, স্থির। আহামরি ফর্সা না হলেও সুন্দর বলা চলে। চাপ দাড়িতে পৌরষত্ত্ব দারুণভাবে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। হ্যাংলা পাতলা, লম্বাটে দেহ। অপছন্দ হওয়ার কোনো কারণই থাকে না। তাই মাথা নাড়াল।শিথিল সন্তুষ্ট হয়ে বললো, “ছেলে হিসেবে আমি কিন্তু খারাপ নই। বাজে কোনো সঙ্গ নেই। মাঝেমধ্যে ওই একটু আধটু স্মোক করি, যা আজকাল সবাই করে। তবে তোমার যদি ভালো না লাগে তাহলে না হয় ছেড়ে দিবো। লেখাপড়ায়ও আমি খারাপ নই। রোজা আর ইদ শেষ হলে পরীক্ষা। চতুর্থ বর্ষ শেষ করে ফাইনাল বর্ষে উঠবো। ওই একটা বছর শেষ হলেই তারপর ইন্টার্নশিপের পেছনে দৌড়াবো। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরেও যেতে পারি ঠিক নেই। এ বিষয়ে বাবা ভালো জানেন। কারণ বাবার খুব বাধ্যগত ছেলে আমি। বিয়ের পর অত বিলাসিতা তোমায় দিতে না পারলেও কখনো দুঃখ দিবো না। না খাইয়ে মারবো না। কোনো কিছুতে জোর করবো না। নির্দ্বিধায় লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারবে। যদিও আমি এখন বেকার! বাবার টাকায় চলি তবুও তোমার সব দায়িত্ব আমার নিজের। বেশ কয়েকটা টিউশন পড়াই। রোজগার অসম্ভব ভালো। তুমি এলে না হয় আরো কয়েকটা বাড়িয়ে নিবো।”

বিস্ময় কাটছে না আবৃত্তির। সারা শরীর শুধু নিস্তেজ হওয়া বাকি। শিথিল যেন আগে থেকেই সবকিছু ভেবে রেখেছে। শীতল কণ্ঠে বললো,“আগেরবার বিয়ে থেকে পালিয়েছিলে কারণ ছেলে বয়সে তোমার থেকে দ্বিগুণ, দুই বাচ্চার বাপ আর ডিভোর্সী ছিল। কিন্তু আমি তার একটাও নই। আমার বর্তমান বয়স চব্বিশ চলছে। আর তোমার? তোমার কত? উনিশ নাকি বিশ?”

“উনিশ, মাস দুয়েকের মধ্যে বিশ হয়ে যাবে।”

“পারফেক্ট। ভালো করে ভেবে সিদ্ধান্ত নাও, আবৃত্তি। তোমার হাতে মাত্র এক মাস সময় আছে। রোজার মধ্যে আমাদের আর দেখা হবে না। পরনারীর সঙ্গে দেখা করে রোজা হালকা করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। ঈদের পর না হয় দেখা করবো। উত্তর হ্যাঁ হলে সোজা বাবার সঙ্গে দেখা করিয়ে তারপর বিয়ে। কোরবানির ঈদ পালন করবো তোমার শ্বশুরবাড়িতে। ভাবো ভাবো আবৃত্তি, এমন যোগ্য ছেলে হারালে কিন্তু কাঁদতে হবে আড়ালে।”

কথা শেষ করে চমৎকার একটা হাসি উপহার দিলো শিথিল। আবৃত্তি বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইল। বুক এখনো কাঁপছে। কী এক জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো সে? অনেক কষ্টে এলোমেলো বাক্যে শুধু জিজ্ঞেস করল,“উত্তর যদি না হয়?”

“তাহলে তোমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো একটা ভুল হবে। আমার সেল্ফ রেসপেক্ট বরাবরই হাই লেভেলের। না বললে মেনে নিবো। ইগোতে লাগবে। ছ্যাঁচড়ার মতো পেছনেও অবশ্য ঘুরবো না। তোমার দিকে ফিরেও তাকাবো না। কারণ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে আমি জানি। মেয়েদের পেছন পেছন ঘুরঘুর করার মতো ছেলে আমি নই।”

কোথাও যেন তীরের মতো বিঁধলো কথাটা। শিথিল ছেলেটাকে আজ নিজের কাছেই ভীষণ অপরিচিত লাগছে। এবার সত্যি সত্যিই ভাবতে বসলো আবৃত্তি। নিজেকে নিয়ে, এই পুরুষটিকে নিয়ে। তার চাহনি দেখে নিজের বুকে একহাত ছুঁইয়ে গুনগুন করে গেয়ে উঠল শিথিল,

‘আমার ভাঙ্গা ঘরে
ঝিমঝিমিয়ে বৃষ্টি নামবে যখন
আমি বুকটা পেতে আগলে রাখতে জানি
তুমি এই বুকেতে রাখবে মাথা মানি…
_________

আরফিনের পায়ের ব্যথা কিছুটা কমেছে। এখন আপাতত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে পারে সে। কলেজের সামনে আবৃত্তিকে নামিয়ে দিয়ে তাদের হলরুমে এসে বসলো শিথিল। বাকিরা তখন ওখানে বসেই আড্ডা দিচ্ছিল। শিথিলকে দেখে উৎসুক হয়ে উঠল সকলে। সজীব সোজাসুজি প্রশ্ন ছুঁড়ল,“কী রে, কোথায় ছিলি? আজ টিউশন নেই?”

“দুইটা ছিল। তার মধ্যে একটা বন্ধ। ছাত্রের ডায়রিয়া হয়েছে। আরেকটা সন্ধ্যার পর।”

“তো ছিলি কোথায়? কতবার ফোন দিয়েছিলাম? ইদানিং কেমন যেন বদলে গিয়েছিস।”

সরু দৃষ্টিতে সকলকে দেখলো শিথিল। স্বাধীন খোঁচা মারলো,“প্রেমে পড়লে এমন একটু আধটু হয়।”

সকলে একযোগে চমকালো,“প্রেম আর শিথিল!”

স্বাধীন রহস্যময় হেসে মাথা নাড়ল। শিথিল প্রথমে চোখ রাঙাল এরপর মেনে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে চোখ বুঁজলো। স্বাধীনের মুখ একবার খুলেছে মানে সব আজ ফাঁস করে দিয়েই তার নিস্তার মিলবে। সত্যটা জেনে সবার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। চার জোড়া দৃষ্টি এসে স্থির হয়ে রইল শিথিলের দিকে। সেসবে পাত্তা দিলো না শিথিল। ঘাড় চুলকে পা নাচাতে লাগলো। যেন কিছুই হয়নি এমন একটা ভাব। আরফিন দাঁতে দাঁত পিষে বললো,“আমি একটু প্রেম করেছি বলে কত কথা শুনালি। আর এখন কিনা নিজেই প্রেম করছিস?”

তুহিন রাশভারী কণ্ঠে বললো,“তোকে আমি নিজের রোল মডেল ভাবতাম। শেষমেশ তুইও ধোঁকা দিলি?”

“তোদের এতকাল বন্ধু ভেবে সব কথা শেয়ার করলাম। অথচ জামালপুইরার কথা তোরা বিশ্বাস করে আমার উপর প্রেমের মতো খারাপ জিনিসের অভিযোগ দায়ের করছিস?”

শিথিলের কথায় সকলে দম ফেলল। স্বাধীনের দিকে তাকালো তির্যক দৃষ্টিতে। সেসব দৃষ্টিতে থতমত খেয়ে গেলো স্বাধীন। বিলীন হলো অধরের হাসি। শিথিল ফের দাম্ভিক কণ্ঠে বললো,“বিয়ের আগে প্রেম পিরিতি করে বোকারা। তারপর ছ্যাঁকা খেয়ে বাঁকা হয়ে কান্নাকাটি করে। কিন্তু আমি তো বোকা নই বরং ভীষণ চালাক। তাই সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এসেছি।”

হতভম্ব হয়ে গেলো সকলে। সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব? সজীব আশ্চর্যান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“বলছিস কী? কাকে দিয়েছিস? কীভাবে কী?”

ধীরে ধীরে সমস্ত কাহিনী বন্ধুদের খুলে বললো শিথিল। সকলেই যেন ঘোরের মধ্যে ডুবে গেলো। পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে হুঁশ ফেরালো। স্বাধীন চোখমুখ কুঁচকে বললো,“তুই তো শ্লা কামিনা নিকলা! জাস্ট ভালো লেগেছে বলতে বলতে একেবারে দেখা টেখা করে সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এলি? আমাদের ভাবনার চেয়েও তুই পাক্কা খেলোয়াড়।”

বাহবা শুনে শিথিল দাম্ভিক হাসলো। আরফিন জিজ্ঞেস করল,“মেয়ে রাজি?”

“সরাসরি জানায়নি কিছু। জানানোর অবশ্য সুযোগ দেইনি। পুরো রোজার মাস ভাবার জন্য দিয়ে এসেছি। মনে হয় না হতাশ করবে।”

“যদি করে? যদি না বলে?তোর আন্টি রাজি না হলে?”

“ও না করবে বলে মনে হয় না। যদি করেও তাহলে শেষ একটা চেষ্টা আমি করবো। তবে আন্টি যে রাজি হবে না সেটা শিওর। ওই দিক বাবা সামলে নিবে।”

“তোর বাবাও জানে?”

“আরে না এখনো বলিনি।”

সবাই এবার শান্তি পেলো কিছুটা। কিন্তু ঝটকা কমলো না কিছুতেই। নারীদের থেকে একশ হাত দূরে থাকা তাদের প্রিয় বন্ধু সিঙ্গেলের খাতা থেকে নাম কেটে সোজা একটা মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে এলো! ভাবা যায়?

আবৃত্তির শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছে। সম্ভবত জ্বর আসবে। বাইরে থেকে এসে কোনোমতে হাত-মুখ ধুয়ে কাঁথা মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছে সে। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। বিদিশা আজ আর বের হয়নি কোথাও। নতুন এসাইনমেন্ট দিয়েছে কলেজ থেকে। সেগুলোই বসে বসে করছে। আবৃত্তির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল,“এই অসময়ে শুয়ে আছিস যে? এসাইনমেন্ট করবি না?”

“পরে করবো।”

“কিছু হয়েছে? কোথায় গিয়েছিলি?”

“একজনের সঙ্গে দেখা করতে।”

“টিউশন ফিউশনে যাস না যে? এমন করলে তো ওরা তোকে আর রাখবে না।”

“দুইটা টিউশন করাতাম। তার মধ্যে একটা ছেড়ে দিয়েছি। আরেকটায় সম্ভবত ওরাই আমায় ছাড়িয়ে দিবে।”

“সে কী, কেনো?”

“ছাত্রটা কেমন যেন। পড়তে বললে ঠিকঠাক পড়ে না। কথা শোনে না। সারাক্ষণ মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। সেদিন তো সোজা চিঠি দিলো। খুলে দেখি আই লাভ ইউ লেখা।”

হাসলো বিদিশা,“ইউনিক ব্যাপার স্যাপার তো! শেষে কিনা ছাত্র ম্যামের প্রেম?”

“এই জন্যই ছেড়ে দিয়েছি।”

“আর দ্বিতীয়টা?”

“জানি না। ওদের হাবভাব সুবিধার ঠেকছে না।”

“আমার কাছে আরো দুইটা টিউশনি আছে। লাগলে বলিস। প্রয়োজন হলে ফ্রেন্ডদের বলে আরো জোগাড় করে দিবো না হয়।”

“সত্যি?”

“হ্যাঁ, টেনশন নিস না।”

কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল আবৃত্তির। বেশ কিছুক্ষণ নিরব থেকে হঠাৎ করেই জিজ্ঞেস করল,“আচ্ছা, হঠাৎ কেউ যদি বিয়ের প্রস্তাব দেয় তাহলে কী করা উচিত?”

“ছেলে ভালো, যোগ্যতাসম্পন্ন এবং ভালো পরিবারের হলে রাজি হয়ে যাওয়া উচিত।”

“সত্যি?”

“বিয়ে তো একদিন না একদিন করতেই হবে। বিয়ে, স্বামী, সংসার, সন্তান এগুলোই নারী জীবনের আসল সফলতা। মাঝখানে লেখাপড়া করো, চাকরি করো এগুলো তো আমাদের উপর মানুষের চাপিয়ে দেওয়া কিছু উদ্ভট নিয়ম।তাই সুযোগ এলে বিয়ে করে নেওয়াই উচিত। সবসময় মনের মতো ভালো মানুষ পাওয়া যায় না। আর যদি ওই তিন গুণ না থাকে তবে মুখের উপর না বলে দেওয়াই উত্তম। তোকে আবার কেউ প্রস্তাব দিয়েছে নাকি?”

আবৃত্তি ছোট্ট করে উত্তর দিলো,“হু।”

বিদিশার হাত থেমে গেলো। চমকিত দৃষ্টিতে চোখ তুলে তাকালো,“কে দিয়েছে? আগে থেকে চিনিস? একদম এসব ফাঁদে পা দিবি না বলে দিচ্ছি। এখনো তুই মানুষ চিনতে শিখিসনি। পারলে আমার সঙ্গে দেখা করা। কথা বলে দেখি।”

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো সে। আবৃত্তি মিহি স্বরে বললো,“ছেলে আমার পরিচিত। সেদিন বললাম না, মামাতো বোনের দূরসম্পর্কের খালাতো ভাই।”

“বলিস কি!”

“ছেলে মন্দ নয়। মামা মামীর খুব প্রিয় সে। আমার সেজো মামা খুব চৌকস লোক। খারাপ মানুষদের তিনি পছন্দ করেন না। হেসেও তাদের সঙ্গে কথা বলেন না। সুশ্রী আপুর থেকেও উনার অনেক প্রশংসা শুনেছি অবশ্য।”

“ওহ, সেদিন চেহারা অত ভালো করে দেখতে পারিনি। ডিটেইলস বল। ছেলে কী করে? বাড়ি কোথায়? কেমন দেখতে?”

ধীরে ধীরে সমস্তটাই তাকে বলে দিলো আবৃত্তি। মুখ হা হয়ে গেলো বিদিশার। বাহবা দিয়ে বললো,“ওরে ওরে, ভেজা বিড়াল হয়ে থাকার পরেও তোর কপাল তো একেবারে খুলে গেলো রে!”

আবৃত্তি জানতো এমন কিছুই যে মেয়েটা বলবে তাকে। কিন্তু বিয়ের মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হুটহাট তো আর নিয়ে নেওয়া যায় না। শিথিলের কথা বারবার তাকে ভাবাচ্ছে। ছেলেটা যে ভালো তা আবৃত্তি জানে। কিন্তু কতটা ভালো? এ খবর তার জানা নেই। একজন পুরুষ কেমন তা তখনি জানা যায় যখন তার সঙ্গে এক ছাদের নিচে, একই বিছানায় থেকে সংসার করা যায়।

শিথিলের কথাবার্তা আবৃত্তির ভালো লাগে। ছেলেটার কথা বলার ভঙ্গি ব্যতিক্রম। যখন বলে তখন মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শোনা ছাড়া উপায় থাকে না। মিশমিকে জিজ্ঞেস করবে? ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে এড আছে। মাঝেমধ্যে কথাও হয়। এই মেয়েটার সাথে থেকে থেকেই অবশ্য আবৃত্তির অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। কাটিয়ে উঠতে পেরেছে জড়তা। সব স্থানেই নিজেকে জাহির করতে পারার আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। তবে মেয়েটা চতুর। সহজেই অন্যের মন পড়তে পারে। যদি তার উদ্দেশ্যও বুঝে যায়? উফ কী এক মুসিবতে শিথিল তাকে ফেলল?
___________

কয়েকদিন ধরে মিশমির ভীষণ মন খারাপ। তুহিনকে তার একটু বেশিই ভালো লেগে গিয়েছিল।অথচ সেদিন শিথিলের সঙ্গে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই ছেলেটা তাকে ব্লক মেরে দিলো। কত বড়ো অপমান! মিশমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, এসব শিথিল বজ্জাতটার কারসাজি।

শাফিন বেশ কিছুক্ষণ পিছুপিছু ঘুরছে। স্কুল থেকে কিছু আঁকতে দিয়েছে। আঁকাআঁকি শাফিন ভালো পারে না। সুশ্রী এসবে বেশ অভিজ্ঞ। কিন্তু সুশ্রীর ইদানিং ব্যস্ততা চলছে। দিনে বাসায় থাকে না আর রাতে হয় ঘুমায় নয়তো বই নিয়ে বসে থাকে। তাই মা কড়াকড়ি ভাবে দুই ভাই-বোনকে বলে দিয়েছেন, একদম বড়ো বোনকে বিরক্ত করবি না। মায়ের কথা সবসময় অমান্য তারা করে না। মার খাওয়ার ভয়ে। বিরক্ত সহ্য করতে না পেরে ভাইয়ের পিঠে শক্ত একটা কিল বসিয়ে দিলো মিশমি। ধমকালো,“দেখছিস না আমার মন খারাপ? বিরক্ত করছিস কেনো? নিজের ছবি নিজে গিয়ে এঁকে নে।”

মার খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেলো শাফিন। খানিক বাদে ঘরে ফিরে এলো মাকে নিয়ে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে বললো,“ছোটো আপু আমাকে মারছে, আম্মু!”

শাহিনূরের হাতে বিছানা ঝাড়ু। চোখেমুখে রাগ স্পষ্ট। মিশমি এক লাফে উঠে পড়ল বিছানায়।আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,“আজব! ঝাড়ু এনেছো কেনো?”

“শাফিনকে মেরেছিস কেনো? একটামাত্র ছোটো ভাই অথচ একটু সহ্য করতে পারিস না? সারাক্ষণ টো টো করে ঘুরতে ভালো লাগে, তাই না? ওর সব হোমওয়ার্ক আজ তুই করাবি। সুন্দর করে বোঝাবি। আরেকটা শব্দ যদি পাই তাহলে সত্যি সত্যি এই ঝাড়ু দিয়ে ঠেঙাবো।”

কথা শেষ করে শাহিনূর চলে গেলেন। রাগে দুঃখে নিজ মাথার চুল টেনে ধরলো মিশমি। অসহ্যকর! এই বাসায় আর কোনোভাবেই টিকা যাচ্ছে না। কোথাও চলে যেতে পারলে ভালো হতো। শাফিন ব্যাগ নিয়ে এসে বসলো ছোটো বোনের পড়ার টেবিলে।চোখেমুখে তার বিজয়ী হাসি। মিশমি বিড়বিড় করল,“আম্মুর চামচা একটা। একবার শুধু বাগে পাই তারপর তোর এই হাসি আমি বের করবো।”

চলবে _______

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here