মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:২৩]

0
2

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:২৩]

রমাদান মুসলিমদের জন্য একটি নেয়ামত। বছরের এই একটি মাস মানব জীবনে নিয়ে আসে আত্মশুদ্ধি। এই মাস একজন মুসলিমকে মুমিন হতে শেখায়। শেখায় ঠিক ভুলের পার্থক্য এবং আত্মসংযম। তবে বছরের প্রথম রোজাটা এবার আর রাখা হলো না আবৃত্তির। একান্তই মেয়েলি সমস্যার কারণে। দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই মোজাম্মেল হোসেনের কল এলো। রিসিভ করে সালাম দিতেই তিনি সালামের জবাব নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে বাইরে আয় মামা। বাসায় ফিরবো।”

আবৃত্তি অবাক হলো ভীষণ। আচমকা তাকে নিতে আসার কারণ কিছুতেই যেন ধরতে পারলো না। সব নিয়ম-কানুনের পাট চুকিয়ে নিচে নামতে নামতে অনেকটা সময় লাগলো তার। এগিয়ে এসে প্রশ্ন ছুঁড়ল, “ক্লাস তো এখনো চলছে, মামা। হঠাৎ বাড়ি যাব যে? কিছু হয়েছে?”

“না, কী হবে? তোর মামী বলছিল, রোজার মাসে বাইরে থাকবে মেয়েটা? ওকে বরং বাসায় নিয়ে এসো। তাই নিতে চলে এলাম। ক্লাস ওখান থেকে যাওয়া আসা করেই না হয় করবি।”

মামী বলেছে! এ কথাটা বিশ্বাস হলো না আবৃত্তির। তবু কিছু বললো না। সায় জানিয়ে উঠে বসলো গাড়িতে। জ্যাম না থাকায় পৌঁছাতে বেশি একটা সময় লাগলো না তাদের।

সাবেরা বিবি গিয়েছেন ছোটো মেয়ের বাড়ি। এবারের রমজান মাসটা ওখানেই থাকবেন। উনাকে না দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আবৃত্তি। বৃদ্ধা তেমন সুবিধার নয়। সুযোগ পেলেই তাকে দিয়ে গাধার মতো খাটিয়ে নেয়। সবসময় তো বড়োদের মুখে মুখে আর তর্ক করা যায় না। তাছাড়া আবৃত্তি সেসব পারেও না। তার আগমনে শাহিনূর খুশি হননি বলেই মনে হলো। দেখেও না দেখার ভান করে চলে গেলেন। কথা বললেন না। উনাকে আবৃত্তি ঠিক বুঝতে পারে না। একেক সময় একেক রকম আচরণ করেন। তাই সেদিকে আর মাথা ঘামালো না সে। সুশ্রী বাড়িতে নেই। রোজার মধ্যেই ক্লাসে দৌড়াতে হচ্ছে মেয়েটাকে। ওদিকে শাফিনের স্কুলও বন্ধ দেয়নি। সম্ভবত দশ রোজা গেলে দিবে। মিশমির তো এখন লেখাপড়া নেই। ইদের পর কলেজে ভর্তি হওয়ার ফরম বের হবে। তাই তার দিনগুলো কাটে বাড়িতে, আলস্যে।

আবৃত্তির আগমনে সবচেয়ে খুশি হলো মিশমি। দৌড়ে এসে জাপটে ধরল। গালে গাল মিলিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল,“তোমাকে খুব মিস করছিলাম, আবৃত্তি আপু। এবার আর আমার দিনগুলো একদম বোরিং যাবে না।”

আবৃত্তি হাসলো। সৌজন্যতা রক্ষার্থে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুমি?”

“আলহামদুলিল্লাহ।”

মোজাম্মেল হোসেন গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,“ঘরে যা। ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নে। ইফতারের পর তোর সঙ্গে কথা আছে।”

নিজের কথা শেষ করে চলে গেলেন তিনি। আবৃত্তির মনে ক্ষণিকের জন্য ভয় ঢুকে গেলো। পরিবেশ তেমন একটা সুবিধার ঠেকছে না। নইলে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ করেই মামা তাকে আনতে গেলেন কেনো? আর এসেই এমন কথা? শিথিলের ব্যাপারে জেনে যায়নি তো? কিন্তু সেকথা তো উনার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাহলে? শিথিল কী বলে দিলো সব? ভয় আর চিন্তায় আঁকুপাঁকু করছে মন। মিশমি টেনেটুনে তাকে নিজের ঘরে এনে বসালো। সঙ্গে আনা ব্যাগটা পড়ার টেবিলে রেখে বললো,“আপুর ঘরে যেতে হবে না। তুমি এবার আমার ঘরে থাকবে। ঠিক আছে?”

অসম্মতি প্রকাশ করল না আবৃত্তি। চুপচাপ মেনে নিলো মামাতো বোনের কথা।

তখন বিকাল। আছরের নামাজ পড়ে মিতাকে নিয়ে ইফতারের আয়োজন করছেন শাহিনূর। আজিজের সঙ্গে গিয়ে দোকান থেকে জিলাপি আর বোঁদে কিনে এনেছে শাফিন। সুশ্রী, আবৃত্তি এসব না খেলেও বাকিরা আবার খুব পছন্দ করে। এক দুপুর ঘুমিয়ে আবৃত্তি রান্নাঘরে এলো। সাহায্য করতে। মিতা বেগুনীর জন্য বেগুন কেটে বেসন মাখাচ্ছে।পাশেই দাঁড়িয়ে ছোলা বুট রান্না করছেন শাহিনূর। আবৃত্তি কিছু বললো না। নিরবে সিদ্ধ আলুগুলো ছিঁলে এরপর লবণ আর ভাঁজা মরিচ দিয়ে মাখতে লাগলো। শাহিনূর আড়চোখে সেসব লক্ষ্য করলেন কিন্তু তবুও কিছু বললেন না।

মিতা কাজ করতে করতে মুখ খুললো,“তুমি রোজা রেখেছো?”

আবৃত্তি ইতস্তত করে দুদিকে মাথা নাড়াল। মিতা হেসে ফিসফিস করল,“আমিও না।”

“কেনো?”

“তুমি যে জন্য রাখোনি।”

শাহিনূর এবার কথা বললেন,“তাহলে দুপুরে খেলে না কেনো? শাফিন বাচ্চা মানুষ তাই ওর জন্য রান্না করে রাখতে হয়। আমি অবশ্য মিতাকে দিয়ে একটু বেশিই করিয়ে রাখি।”

“ক্ষুধা লাগেনি তাই।”

“লজ্জা পাবে না। কাল থেকে খাবে। এটা লজ্জার কিছু নয়।”

আবৃত্তি মাথা নাড়াল। ছোট্ট করে আচ্ছা বলে হাত দ্রুত চালালো। সুশ্রী এলো ঠিক মাগরিবের আজান দেওয়ার কিছুক্ষণ পর। ততক্ষণে সকলে ইফতার করে নামাজে চলে গিয়েছে। আসার পথে যানবাহনেই পানি আর রুটি খেয়ে রোজা ভেঙেছে সে। বাড়িতে ফিরে সর্বপ্রথম টেবিল থেকে একটা চপ তুলে মুখে পুরলো। আবৃত্তিকে দেখে বেজায় খুশি হলো।

মোজাম্মেল হোসেন বসে আছেন শয়ন কক্ষের ইজি চেয়ারে। ঠিক মাগরিবের পরে ডাক পড়ল আবৃত্তির। ভেতরে প্রবেশ করে অজানা ভয়ে কু ডেকে উঠল মেয়েটার মন। এর আগে মামা কখনো তাকে এভাবে কথা বলার জন্য ডাকেনি। মোজাম্মেল হোসেন ভাগ্নিকে দেখে সোজা হয়ে বসলেন। হাতের ইশারায় সম্মুখ চেয়ারে বসার নির্দেশ দিলেন। দুরু দুরু বুকে বসলো আবৃত্তি।মিনমিনে স্বরে জিজ্ঞেস করল,“আমি কী কিছু করেছি, মামা?”

মোজাম্মেল হোসেন মাথা নাড়ালেন,“হ্যাঁ, এমনটা তোর থেকে আমি আশা করিনি।”

“কী করেছি?”

মোজাম্মেল হোসেন খানিকটা সময় চুপ রইলেন। গম্ভীর মুখে বললেন,“দুদিন আগে তুই তোর বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলি?”

অবাক দৃষ্টিতে মাথা তুলে ভদ্রলোকের পানে তাকালো আবৃত্তি। এমন গোপন সত্য তিনি জানলেন কীভাবে? এ কথা আবৃত্তি কাউকে জানায়নি। তাই কারো জানার কথাও নয়। তার নিরবতায় হতাশ হলেন মোজাম্মেল হোসেন। বললেন,“আইয়ুব আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তোর সঙ্গে আবার দেখা করতে চাইছে। আমি বললাম, তুই এখানে থাকিস না। তখন তোর ঠিকানা চাইলো। এতদিন পর হঠাৎ করে মেয়ের খবর নিচ্ছে ভেবেই সন্দেহ হলো, তাই চেপে ধরলাম। এরপর জানতে পারলাম সমস্ত কথা। কেনো দেখা করেছিলি?”

“প্রয়োজন ছিল।”

“যে লোক বাপের দায়িত্ব পালন না করে অন্যত্র বিয়ে করে সুখের সংসার করছিল তার সঙ্গে এত বছর পর কীসের প্রয়োজন?”

“কেনো দায়িত্ব পালন করেনি সেটাই জানার জন্য। এতটুকু জানার অধিকার তো আমার আছে।”

ফটাফট উত্তরে বেশ অবাক হলেন বলেই মনে হলো মোজাম্মেল হোসেনকে। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে কণ্ঠে স্নেহ ঢেলে বললেন,“সে তোকে কখনো চায়নি,আবৃত্তি। যদি চাইতো তাহলে এত বছর কেনো খোঁজ নেয়নি? সে কী পারতো না? তুই দেখা করার পর কাল আমার সঙ্গে ঠিকই যোগাযোগ করতে পেরেছে। তাহলে এতদিন কেনো পারেনি? তোর মা বেঁচে থাকাকালীন ওই মগবাজারে আমার লোহার ব্যবসা। সবাই ফারজানাকে ত্যাগ করলেও আমি করিনি। অগোচরে মাঝেমধ্যেই গিয়ে দেখা করতাম। তোর বড়ো মামার মৃত্যুর পর আমি নিজে ওই লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছি, আবৃত্তি এখনো ছোটো। ওর একটা ভবিষ্যৎ আছে। বাবা, বড়ো ভাই আর বেঁচে নেই। এবার তুমি ওকে নিয়ে যেতে পারো। কিন্তু ও কী বললো জানিস? বললো, আমি এখন দেশে নেই। আমার ছেলেরা ছোটো। ওদের নিয়েই সময়টা ব্যস্ততায় কাটছে। আপনাদের কাছেই আবৃত্তি ভালো থাকবে।”

লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল আবৃত্তির। মোজাম্মেল হোসেন পুনরায় বললেন,“তুই কষ্ট পাবি বলে আমি কখনো তোকে এসব কিছু জানাইনি। কিন্তু এখন তুই প্রাপ্ত বয়স্ক। তোর জানার অধিকার রয়েছে। ওই হীন বাপের কাছে তুই যেতে চাস?”

“চাই না, এখন আর যাওয়ার সময় নেই। যখন বাবা, মা আর একটা সুন্দর পরিবারের প্রয়োজন ছিল তখন তা পাইনি। বরং মামা-মামী, খালা-খালু, মামাতো ভাইদের তোপ আর মানসিক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে আমাকে ভয়ে, লজ্জায় বড়ো হতে হয়েছে। তাই এসব সয়ে গিয়েছে। এখন আর অসবের ভয় নেই। বাপ দিয়ে আর কী করবো? আমি শুধু গিয়েছিলাম সরাসরি উনার মুখ থেকে প্রশ্নের উত্তর শুনতে। এটা আমার অধিকার। আমার জীবনের সুন্দর সময় নষ্ট করার দায় কী কোনো অংশে কম উনার?”

ক্ষণিকের জন্য নিরব হয়ে গেলেন মোজাম্মেল হোসেন। এতগুলো দিন দশ কথায় রা না পারা মেয়েটার এতশত অভিযোগে অবাক না হয়ে পারছেন না। আবৃত্তি ফের বললো,“বাবা যেমন নানার থেকে আমার মাকে কেড়ে নিয়েছিল ঠিক সেই প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নানা বাবার থেকে কেড়ে নিয়েছিল আমাকে। তাদের দ্বন্দ্বের জেরে ভুক্তভোগী হতে হয়েছে আমাকে। তাই ওই লোক আবার আমাকে নিয়ে কিছু বললে এড়িয়ে যেও। যা কথা ছিল সব মিটে গিয়েছে। আর দেখা করার প্রয়োজন নেই।”

তারপর পুরো ঘর জুড়ে অনেকক্ষণ পিনপতন নিরবতা চলে। একপর্যায়ে মোজাম্মেল হোসেন বললেন,“আমি জানি সবটা। কিন্তু আমার কিছুই করার ছিল না। হাত- পা যে বাঁধা ছিল। যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু করার চেষ্টা করেছি। তবে কতটা সফল হয়েছি তা জানি না। তুই তো আর অবুঝ নস।”

“তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। বাবা বেঁচে থাকতেও এসব দায়িত্ব তো আর তোমাদের নয়। তবুও আমার জন্য তোমরা কম করোনি।তাই তোমাদের কাছে আমি ঋণী।”

“আমি তোর বিয়ে দিতে চাই।”

আশ্চর্য হলো আবৃত্তি। বিয়ে? হুট করে? মোজাম্মেল হোসেন বুঝতে পারলেন তার মনোভাব। বললেন, “তোকে নিয়ে আমার খুব চিন্তা হয়। অভিভাবক ছাড়া একটা মেয়ের জন্য এই সমাজ ভীষণ কঠিন রে মা। বিয়ে সবাইকেই একসময় না একসময় করতে হয়। তাই আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোর বিয়ে দিতে চাই। সাজানো গোছানো একটা সংসার দিতে চাই। মামার উপর এতটুকু ভরসা রাখ। ঠকবি না। এটাই বিয়ের উপযুক্ত সময়।”

কী বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না যেন আবৃত্তি। সরাসরি না বলা তার সাজে না। মামাদের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা মেয়েদের আবার নিজস্ব মতামত কীসের? সারাজীবন তো আর অন্যের ঘাড়ে বসে খেতে পারবে না। তাছাড়া জীবনে একা একা পথ চলা একটা মেয়ের জন্য যে কতটা কঠিন তা সে এই ছয় মাসেই ভালো করে টের পেয়েছে। ভাবতে ভাবতে শিথিলের মুখখানি ভেসে উঠল স্মৃতিপটে। ছেলেটা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। ভাবার জন্য মাসখানেক সময় দিয়েছে। তাকে না ভেবে মামাকে হ্যাঁ বলে দেওয়া কী ওই ভালো, ব্যক্তিত্ববান ছেলেটার অপমান করা নয়? শীতল কণ্ঠে আবৃত্তি শুধু বললো,“আর কয়েকটা মাস সময় দাও। তারপর যা বলবে তাই শুনবো।”

মোজাম্মেল হোসেন সন্তুষ্ট হলেন। কথা শেষে মামার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো আবৃত্তি। সুশ্রী তাকে চেপে ধরলো। মুড়ি মাখা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,“বাবা ডেকেছে কেনো? কী বললো?”

অভিজ্ঞদের মতো সত্যিটা চেপে গেলো আবৃত্তি। মিথ্যে বললো। তার এই মিথ্যে কথাটাই খুব সহজে বিশ্বাস করে নিলো সুশ্রী। ঘাঁটানোর প্রয়োজন কী? আমতা আমতা করতে করতেই আবৃত্তি ফটাফট বলে বসলো, “একটা প্রশ্ন করবো, আপু?”

“হুম কর, আগে মুড়ি খা।”

“আমি খেয়েছি।”

“আচ্ছা।”

দুমনা করতে করতে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“তোমার খালাতো ভাই শিথিল ছেলেটা কেমন?”

মুড়ি খেতে খেতে মোবাইল দেখছিল সুশ্রী। প্রশ্ন শুনে চট করে মাথা তুলে তাকালো ফুফাতো বোনের দিকে। প্রবল সন্দেহ নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল,“কেমন মানে? হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

ভয় পেয়ে গেলো আবৃত্তি। ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। ফের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললো,“এমনি। অনেকবার দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল তার উপর!”

“তার উপর?”

“মনে আছে আমি বিয়ে থেকে পালিয়ে খালার বাড়ি থেকে এখানে চলে এসেছিলাম? তাও রাতে?”

“হ্যাঁ, তো?”

“ওই রাতেই বাসে উনার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়। রাস্তাঘাট না চেনার কারণে উনার কাছে সাহায্য চাই।তাই উনিই বেইলী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলেন আমায়। তারপর কাকতালীয়ভাবে অনেকবার দেখা। চারিত্রিক দিক থেকে তিনি ভালো তা আমি আঁচ করতে পেরেছি কিন্তু কখনো জানা হয়নি মানুষ হিসেবে কেমন।”

উৎসুক হয়ে উঠল সুশ্রী। কথাটা শুনে বিষম খেলো। উৎফুল্ল হয়ে বললো,“ওয়াও! বলিস কী? এত্ত বড়ো কাহিনী ঘটে গেলো অথচ কখনো বলিসনি তো?”

“অতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।”

“ছেলে হিসেবে শিথিল ভাই লাখে একটা। কি অমায়িক ব্যবহার! পরোপকারী মানুষ বললেও ভুল হবে না। বিশেষ করে আঙ্কেল অর্থাৎ উনার বাবা খুব ভালো মানুষ। এই জন্যই মূলত তিনিও ভালো মানুষ। বাবার স্বভাব রপ্ত করেছেন। খারাপ দিক হচ্ছে, মেয়েদের তেমন পাত্তা দেন না। এমনকি আমাকে আর মিশমিকেও না। মাসের পর মাস ম্যাসেজ দিয়ে রাখলেও সিন করার নামগন্ধ নেই। আত্মীয়-স্বজনদের এড়িয়ে চলেন। নিজের বড়ো বোনকেও। এসব নিয়ে উনার উপর অভিযোগের অন্ত নেই।”

“ধরো সে যদি তোমায় বিয়ের প্রস্তাব দেয় কখনো? রাজি হবে?”

এটা আবার কেমন প্রশ্ন? লজ্জা পেলো সুশ্রী। নাজুক স্বরে বললো,“রাজি না হওয়ার কোনো কারণ তো নেই। ভালো পরিবারের ছেলে। দেখতে শুনতে ভালো। পড়াশোনায়ও খুব ভালো। ব্রাইট ফিউচার তার।”

চুপ রইল আবৃত্তি। আবারো নতুন করে ভাবতে বসলো।
___________

প্রথম রোজাটা ভীষণ শান্তিতে কাটলো। সন্ধ্যায় বাবা, চাচার সাথে ইফতার করে মাগরিবের নামাজ, এরপর তারাবীহ পড়ে ঘুমিয়েছিল শিথিল। ভোরে ঘুম ভাঙলো বাবার ডাকে। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে দিলো আবারো একটা ঘুম।

সকাল সাড়ে আটটা। হামিদুল হক বাহু ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ডাকতে লাগলেন,“এই শিথিল! সকাল হয়ে গিয়েছে। ওঠ তাড়াতাড়ি। শিথিল! এবার কিন্তু পিঠে মাইর পড়বে।”

শিথিল উঠে বসলো। তবে ঘুমের চোটে চোখ খুলতে পারলো না। ঘুম ঘুম কণ্ঠে বাচ্চাদের মতো করে বললো,“একটু আগেই না ঘুমালাম? আরেকটু ঘুমাই।একেবারে আজান দিলে উঠে গোসল করে নামাজে যাবো।”

“কাল রাতেই না বললি, আজ চলে যাবি? পড়ার খুব চাপ? ওই যে শান্ত এসেছে। বসার ঘরে অপেক্ষা করছে।”

চোখ মেলে তাকালো শিথিল। শোয়া থেকে উঠে মুখ ধুয়ে ঘর থেকে বের হলো। শান্ত সোফায় বসে মোবাইল ঘাঁটছে। শিথিলকে দেখতেই বলে উঠল,“এত ঘুমায় কেমনে মানুষ? নয়টার ট্রেন মিস করতে না চাইলে তাড়াতাড়ি রেডি হ।”

“তুই এত সকাল সকাল বিরক্ত করতে আসলি কেনো? হুজুরের সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছে। সবে ঘুমটা এসেছিল।”

“তোর হাতে পনেরো মিনিট সময় আছে। তৈরি হয়ে আয়।”

হামিদুল হক পেছন থেকে ধমকালেন,“কিছু শেখ ওর থেকে। কী সুন্দর টাইম মেইনটেইন করে চলে। আর আমার গর্দভটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে এখানে।”

বিপরীতে শান্ত অমায়িক হাসলো। যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। কি ভদ্র! শিথিল চোয়াল শক্ত করে কঠিন দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে একপলক তাকিয়ে চলে গেলো ঘরে। রোজার দিন বলে মনে মনে গালিও দিতে পারলো না। এই শান্তটা বরাবরই বদমাইশ। সারা দুনিয়া জুড়ে অপকর্ম করে বেড়ালেও বন্ধুদের বাবা- মায়ের সামনে হয়ে থাকে সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের মতো নিষ্পাপ। গতকাল শিথিল আর সে একসঙ্গেই ট্রেনে করে এসেছে নিজেদের জেলায়। এরপর যে যার মতো রওশন সড়ক পর্যন্ত এসেই হয়ে গিয়েছে আলাদা।

শিথিল ধীরে সুস্থে গোসল করে তৈরি হলো। এরপর ব্যাগ গুছিয়ে ঘর থেকে বের হলো। হামিদুল হক সুযোগ বুঝে ছেলের পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“দুজনে সাবধানে যাবি। ট্রেন না পেলে এখান থেকে সোজা অটোয় করে টঙ্গী গিয়ে সিএনজি নিবি। রোজা রেখে জ্যামে বসে থাকতে হবে না।”

শিথিল মুখ ভার করল,“টাকা আমার কাছে আছে। এখন আর লাগবে না। লাগলে চেয়ে নিবো।”

হামিদুল হক ছেলেকে চোখ রাঙালেন। শান্ত’র উদ্দেশ্যে বললেন,“লেখাপড়া কেমন চলছে তোর?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, চাচা। এ বছরই বিএসসি শেষ করে বের হবো।”

“সে কী! শিথিলের তো এখনো আরো এক বছর বাকি রয়েছে। তাহলে তোরটা এ বছর কীভাবে?”

“আবার ভুলে গেছেন, চাচা? ডিপার্টমেন্ট আলাদা। আমি সিএসই নিয়ে পড়ছি।”

“ওহ আচ্ছা, ভালো করে লেখাপড়া করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল কর। সাবধানে যাস।”

হাস্যোজ্জ্বল মুখে মাথা নাড়িয়ে বিদায় নিলো শান্ত। যেতে যেতে কড়াকড়ি ভাবে বাবার উদ্দেশ্যে বলে গেলো শিথিল,“নিজের যত্ন নিবে। রাত জেগে একদম বই পড়বে না। নোংরা পোশাক লন্ড্রিতে পাঠাবে। সময় না থাকায় এবার আর ধুয়ে দিতে পারলাম না। ইদের আগেরদিন এসে ধুয়ে দিবো।”

হামিদুল হক হাসলেন। গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বললেন,“হ্যাঁ, এবার আপনি যান পন্ডিত মশাই। দেখে শুনে যাবেন। টো টো করে না ঘুরে মন দিয়ে লেখাপড়া করবেন। দেড় বছর পর কিন্তু আপনার টাকায় আয়েশ করার জন্য আমি রিটায়ার্ড করছি।”

শিথিল প্রত্যুত্তরে হেসে বিদায় নিলো।

চলবে __________

(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here