#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৩০]
ভোর রাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। পরীক্ষা শেষে সকালের ট্রেনে বাড়ি ফিরে এসেছে শিথিল। তবে এবার আর বৃষ্টিতে ভিজে আসেনি। সঙ্গে করে এনেছে ছাতা। হামিদুল হক বাড়িতে নেই। সকাল নয়টায় উনি কলেজে যান। ফিরতে ফিরতে কখনো দুপুর আবার কখনো বা বিকেল হয়। হারুন চাচাকেও এই সময়ে বাড়িতে পাওয়া গেলো না। অগত্যা এক্সট্রা চাবি দিয়েই ভেতরে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে নিলো শিথিল।নিজেই করল দুপুরের রান্না। ফ্রিজে রুই মাছ ছিল। সেটাই ভুনা করেছে আর সঙ্গে করেছে সাদা ভাত।
খাবার খেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমালো শিথিল। বহুদিন ঠিক মতো ঘুম হয় না। পরীক্ষার চাপে, বিরহে। যদিও বিরহ সে স্বীকার করে না। তবে ভোরের বৃষ্টি থামলো না। ঘুম ভাঙার পর বাবাকেও সে পেলো না। সম্ভবত এখনো ফিরেনি। ড্রয়িং রুমের কেবিনেটের পাশে ছাতাটাও নেই। হাঁটু পর্যন্ত একটা প্যান্ট আর কালো রঙের টি-শার্ট পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সে। মোবাইল রেখে এসেছে ঘরে। এই বৃষ্টির মধ্যে মোবাইল নিয়ে বের হলে ভিজে যাবে। একটা ছোট্ট কাগজে,“রান্না করে রেখেছি। খেয়ে নিও, বাবা। বাইরে থেকে ঘুরে আসি। চিন্তা করো না। ফোন করে লাভ নেই। মোবাইল ঘরে।” লিখে কাগজটা টেবিলের উপর ফুলদানির নিচে চাপা দিয়ে সদর দরজায় তালা মারলো। তারপর বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো শিথিল। রাজবাড়ীর মাঠে তখন খেলা করছে ছেলেদের দল। শিথিলকে দেখেই দুজন হাত নাড়িয়ে ডাকল,“ভাই! কবে এলে?”
শিথিল মৃদু হেসে প্রত্যুত্তর করল,“আজকেই।”
“আসো এক গেম খেলে যাও। দেখি আজ কয়টা গোল দিতে পারো।”
অমত করল না শিথিল। যদিও বাবা জানলে ভীষণ রাগ করবেন তবুও বৃষ্টির মধ্যেই ভেজা, কর্দমাক্ত মাটিতে খেলতে চলে এলো সে। যদি মনটা ভালো হয়! মুহূর্তেই পুরোনো দিনের স্মৃতি অকপটে ভেসে উঠল মস্তিষ্কে। স্কুল, কলেজ জীবনে ইউনিফর্ম পরে বন্ধুদের সঙ্গে কতবার যে এভাবে খেলেছে সে! এরপর চোরের মতো লুকিয়ে চুপিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করে হারুন চাচাকে দিয়ে ধুইয়ে নিয়েছে কাঁদা মাখানো পোশাক। তাও বাবার অগোচরে। তার সকল দুষ্টুমি, বাঁদরামির সঙ্গী ছিলেন এই হারুন চাচা। অথচ পরদিন স্কুল, কলেজে গিয়ে মায়ের হাতে বন্ধুদের মাইর খাওয়ার ঘটনা শুনে হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গিয়েছে তার। নিজেকে নিয়ে বরাবরই গর্ব হয়েছে।
হাড্ডাহাড্ডি খেলা শুরু হলো দুই দলের ভেতরে। তাদের মধ্যে শিথিল হচ্ছে সবার বড়ো। এক সময় ফুটবলে লাথি মারতে গিয়ে আরেক ছেলের ধাক্কায় চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলো সে। সারাদেহ মেখে গেলো কাঁদায়। চুল, মুখ, কানও বাদ গেলো না যেন।
খেলা শেষ করতে করতে বিকেল পেরোলো। ওদের সঙ্গেই স্টেডিয়ামে গিয়ে কাদামাটি পরিষ্কার করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হলো। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, তাকে এই অবস্থায় দেখেও হামিদুল হক রাগলেন না।ধমকালেন না। কিংবা কিছু বললেন না পর্যন্ত। অথচ নিয়ম অনুযায়ী খুব রাগ নিয়ে উনার বলার ছিল, “মাথা গেছে? কাদাঁমাটিতে খেলার বয়স এখনো তোর আছে? এভাবে ভিজেছিস কেনো?কোথায় গিয়ে গড়াগড়ি করে এসেছিস? গর্দভ একটা। এত পড়াশোনা করেও বুদ্ধি সুদ্ধি হলো না।”
সেসবের কিছু আজ তিনি বললেন না।ভেতরে প্রবেশের জন্য জায়গা করে দিয়ে দরজা আটকালেন। খানিক চিন্তিত হয়ে বললেন,“ফুটবল খেলেছিস? ভালো করেছিস। খেলাধুলা করলে শরীর মন ভালো থাকে। যা গোসল করে শুকনো কাপড় পরে আয়। চুলায় চা চাপিয়েছি।”
ঠান্ডায় কাঁপছে শিথিল। যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল, “জানলে কীভাবে?”
“আসার পথে মাঠে তোকে দেখেছি। তাড়াতাড়ি যা নইলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
আর কৌতূহল দেখালো না শিথিল। ঘরে এসে লম্বা একটা শাওয়ার নিলো।গরম পোশাক পরে বসার ঘরের সোফায় এসে বসতেই হামিদুল হক ট্রে তে করে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা আর চানাচুর দিয়ে ঝালমুড়ি মাখা নিয়ে এলেন। বললেন,“কখন এসেছিস? এসে দেখি রান্নাবান্না কমপ্লিট। মাছটা কিন্তু দারুণ হয়েছে।”
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে পরপর তিনটে চুমুক দিলো শিথিল। মুঠো ভরে মুড়ি নিতে নিতে বললো,“সকালের ট্রেনে এসেছি। এসে দেখি বাড়িতে কেউ নেই। যা ক্ষুধা লেগেছিল না! হারুন চাচা কোথায় গিয়েছে? আবার নিরুদ্দেশ নাকি?”
“আরে না, গ্ৰামে গিয়েছে।আমিই পাঠিয়েছি জমিগুলো দেখে আসতে।”
“ওহ, ফোনে বলেছিলে গ্ৰামে যেতে হবে। কী নাকি দরকার?”
“পৈতৃক সম্পত্তি তোর চাচার থেকে উদ্ধার করতে যাবো। অনেক হয়েছে। অনেক ছাড় দিয়েছি।”
“এতোদিন যখন দেয়নি, এখন কী আর দিবে?”
“দিবে না মানে? দিতেই হবে। সে যেহেতু ছোটো ভাই- বোনদের ছাড় দেয়নি আমিও আর দিবো না। প্রয়োজন হলে জেল খাটাবো। তোর ফুফুরা এই মাসেই দেশে আসবে। উকিলের সঙ্গে অনেকদিন ধরেই আমার কথা চলছিল। পুরোনো মামলা নতুন করে খুলেছি। গ্ৰামের গুরুজন আর চেয়ারম্যানদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। এবার বেঈমানি করে যাবে কোথায়? তুইও তো বিয়ে করবি। আমার নাতি নাতনি আসবে। সম্পত্তি ছাড়া হয় কিছু?”
চুপচাপ শুনলো শিথিল। হামিদুল হক ফের বললেন, “এই বাড়িটা তোর নামে লিখে দিয়েছি। সুহাসিনীকে দিবো হাড়িনালের জমিটা।”
মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো শিথিল। হামিদুল হক মুচকি হাসলেন। বিদ্রুপ করে বললেন,“তবে বাড়ির পুরো মালিকানা পাবি আমার মৃত্যুর পর। বেঁচে থাকতে মালিক আমি।”
এই পর্যায়ে শিথিলও হেসে দিলো। বললো,“শেয়ানা আছো।”
“এবার সত্যি করে একটা কথা বল। বাপের সামনে মিথ্যা বললে কিন্তু পাপ হবে।”
“তোমায় আমি মিথ্যে বলেছি কবে?”
“বলিসনি? এই যে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাস সেটা কখনো বলেছিস?”
বিষম খেলো শিথিল।নিজ মাথায় কয়েকবার হাত দিয়ে থাপড়িয়ে বিস্ফোরিত নেত্রে তাকালো বাবার দিকে। হামিদুল হক নির্লিপ্ত ভঙিতে বসে আছেন। রিমোট হাতে টিভিতে নিউজ চ্যানেল ছেড়ে বললেন, “বাপ যেখানে জীবনেও এসব ছোঁয়নি সেখানে ছেলে চিপায় চাপায় গিয়ে ধূমপান করে। এ দুঃখ আমি রাখবো কোথায়? হার্টের অসুখ বাঁধালে কিন্তু আমি চিকিৎসা করাবো না বলে দিচ্ছি।”
ভয়ে সরে বসলো শিথিল। আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,“কবে থেকে জানো? কীভাবেই বা জানো?”
“সেটা বড়ো বিষয় নয়। বাপ হই তোর। দ্রুত ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা কর। এসব খাওয়া ভালো না।”
“চেষ্টা করছি।”
“ওহ, আসল কথাই জিজ্ঞেস করা হলো না। বিয়ের ব্যাপারে কী ভাবলি?”
“কিছু না। লেখাপড়া শেষ হোক। চাকরি বাকরি পাই। এরপর দেখা যাবে।”
“সেকি কেনো? ক’দিন আগে না বিয়ে করতে চাইলি? আবৃত্তি মেয়েটাকে পছন্দ হলো?”
“ওর অভিভাবক নূর আন্টির হাজব্যান্ড। কিন্তু নূর আন্টি রাজি নয়। তুমি যাওয়ার পরেও রাজি হয়নি। মাঝখানে একবার বাসায় ডেকে যা বললো! তাতে বুঝা যায়, আমার সঙ্গে আবৃত্তির বিয়ে হোক তা উনি চান না। নানু তো একেবারে হিংস্র হয়ে উঠলেন। এরপর শুনলাম মাকসুদা আন্টির ভাসুরের ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করেছে। আঙ্কেল তো স্ত্রী, শাশুড়ির কথায় উঠেন আর বসেন। নিজের মতামত আছে? ওকে বললাম, চলো কোর্ট ম্যারেজ করে ফেলি কিন্তু রাজি হলো না। এরপর আমার আর কী করার আছে? এতোদিনে সম্ভবত বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা। সুশ্রী, মিশমির সঙ্গে যদিও কথা হয় না। এ নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই। সম্ভবত ভাগ্যে ছিল না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে মুখখানি মলিন হয়ে গেলো শিথিলের। হামিদুল হক তা খেয়াল করলেন। ছেলে মন খারাপ করে থাকলে উনার একদম ভালো লাগে না। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যখন নিজ থেকে ছেলেটা বিয়ে করতে চাইলো তখন কি খুশি যে তিনি হয়েছিলেন! সুহাসিনীকে নিয়ে উনার কোনো চিন্তা নেই। ওর জন্য মেহমাদ আর মিথিন আছে। কিন্তু শিথিলের জন্য নিজের মানুষ বলতে বাবা ছাড়া আর কে আছে? ছেলের জীবনটা গুছিয়ে দেওয়ার আগেই মারা গেলে আফসোসের আর শেষ থাকবে না ভদ্রলোকের। তখন কে সামলাবে এই ছোট্ট, অবুঝ ছেলেটাকে? একটা তো ভরসার হাত লাগবে নাকি? তাই তিনি কিছু না ভেবেই সেদিন রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। অথচ! না এভাবে ছেলেকে তিনি কষ্ট পেতে দেখতে পারবেন না।
_________
সেদিনের অসুস্থতায় আবৃত্তির বিয়ের সব কথাবার্তা পিছিয়েছে। এ নিয়ে আপাতত শাহিনূর আর কিছু বলেননি। তর্কে তর্কে আছেন, কখন স্বামীর মেজাজ ঠান্ডা হবে। সকালে আজ আর দোকানে গেলেন না ভদ্রলোক। ফুরফুরে মেজাজে নাস্তা করতে টেবিলে বসলেন। বাকি চেয়ারগুলো দখল করে আছে মিশমি, সুশ্রী আর আবৃত্তি। খেয়ে তারা নিজেদের কলেজের উদ্দেশ্যে বের হবে।
শাহিনূর আপাদমস্তক স্বামীকে পর্যবেক্ষণ করলেন। না আজ ভদ্রলোককে রসিক দেখাচ্ছে। খাবার বেড়ে দিয়ে বললেন,“ওরা আর দেরি করতে চাইছে না। এখন তো আবৃত্তি সুস্থ। কলেজ যাচ্ছে। ওদের আসতে বলি? শুভ কাজে দেরি করতে নেই।”
মোজাম্মেল হোসেন খুব শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কাদের?”
“সুজনের পরিবার।”
“বলে দাও।”
অনুমতি পেয়ে অবাক হলেন শাহিনূর। খুশিও হলেন ভীষণ। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন,“তাহলে আজ বিকেলেই চলে আসতে বলি?”
“না, আজ নয়। আজ আবৃত্তিকে নিয়ে আমি একটু বের হবো। ফিরতে ফিরতে রাত হবে। তুমি বরং কাল ডেকো।”
“কোথায় বের হবে?”
“তা তোমার না জানলেও চলবে। ওর বাপের দিকের কিছু জরুরি কাজ ছিল।”
সম্মতি দিলেন শাহিনূর। তবুও স্বামী যে রাজি হয়েছেন এতেই তিনি স্বস্তি পেয়েছেন। আবৃত্তি এতক্ষণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাচ্ছিল।মামার কথায় মাথা তুলে সামনে তাকালো। মোজাম্মেল হোসেন তার উদ্দেশ্য বললেন,“আজ আর কলেজে যেতে হবে না। একদিন না গেলে কিছু হবে না। ঘরে গিয়ে তৈরি হয়ে নে। অনেক দূর যেতে হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, বইখাতা, পোশাক গুছিয়ে নিস।”
শাহিনূর কথা কেড়ে নিলেন,“তুমি না বললে রাতে চলে আসবে? তাহলে সবকিছু গুছিয়ে নিবে মানে?”
“সবকিছু বলিনি। বলেছি প্রয়োজনীয় সবকিছু। মানে সারাদিন ওখানে অনেক মানুষের মধ্যে থাকতে হবে তো তাই আরকি।”
“আচ্ছা।”
“মিশমি চাইলে সঙ্গে যেতে পারিস কিন্তু। একটা সঙ্গী পেলো আবৃত্তি।”
“মিশমির কী কাজ? ওর যেতে হবে না। ও কলেজে যাবে। কোচিং ও তো আছে।”
মিশমি লাফিয়ে উঠল। এসব ব্যাপারে সে এক পায়ে খাঁড়া। লেখাপড়া গোল্লায় যাক। মুখের খাবার না চিবিয়ে গিলে ফেলল। বললো,“আমি রাজি। প্রয়োজনীয় সব আমারো কী গুছিয়ে ফেলা উচিত, বাবা?”
“না, শুধু আবৃত্তিকে গুছিয়ে দে।”
কিছুই মাথায় খেলছে না শাহিনূরের। কী করতে চাইছে উনার স্বামী? অজস্র প্রশ্ন নিয়েই চুপ রইলেন। পাছে যদি নিজের মত বদলে ফেলেন ভদ্রলোক? সুশ্রী খেয়ে উঠে গেলো। সবার থেকে বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বের হলো। আবৃত্তি আর মিশমিও চলে গেলো ঘরে। তৈরি হতে হবে তো!
সকালে বেশ দেরি করে ঘুম ভাঙলো শিথিলের। বাবা যে কেনো ডেকে দিলো না কে জানে? ঘুম থেকে উঠেই কড়া এক কাপ চা নিয়ে সোফায় বসলো সে। রিমোট হাতে নিতেই দৌড়ে এসে তাকে জাপটে দিলো ছোট্ট এক বাচ্চা ছেলে। হাতের চা ভর্তি কাপটা নড়ে উঠল। পড়ে যাওয়ার হাত থেকে কাপটা রক্ষা করে বাচ্চার দিকে তাকাতেই বিস্মিত হলো শিথিল। অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল,“মিথিন!”
মিথিন হাসলো। দুই হাত দিয়ে মামাকে জড়িয়ে ধরে পেটে মুখ ঘষে আমোদিত কণ্ঠে ডাকলো,“মামু!”
তারপর ছোট্ট মাথাটা তুলে তাকালো শিথিলের মুখের দিকে। শিথিলের বিস্ময় ভাব এখনো কাটেনি। চায়ের কাপ রেখে কোলে নিলো ভাগ্নেকে। জিজ্ঞেস করল, “কখন এলি? কার সঙ্গে এসেছিস? আম্মু নাকি বাবা?”
“দুজনের সাথেই ইকটু আগে এসেছি।”
“কোথায় তারা? দেখলাম না তো। তোর নানা কই?”
“নানাভাই আর বাবা বাদারে গেছে। আম্মু ঘরে।”
“এখনো ভুল উচ্চারণ! বাজার হবে।”
সেকথায় পাত্তা দিলো না মিথিন। পুলকিত হয়ে উঠল সে,“মামী কই?”
“কার মামী?”
“আমার মামী। দেকতেই তো এসেছি।”
“তোর মামা কয়টা?”
“একতা।”
“তাহলে মামী এলো কোত্থেকে ব্যাটা? বিয়ে করেছি আমি?”
অধরের হাসি বিলীন হয়ে কৌতূহল ফুটে উঠল মিথিনের মুখশ্রীতে। গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“সত্তি করোনি?”
“না বলদ। করলে তো তোর সামনে বসেই করতাম।”
“বাবা মিত্তা বলেছে?”
“তোর বজ্জাত বাপ বলেছে?”
উপরনিচ মাথা নাড়ায় মিথিন। শিথিল বিরক্ত হলো। সকাল সকাল মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো। তখনি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো সুহাসিনী। পেছন থেকে চাটি মারলো ছোটো ভাইয়ের মাথায়। মজা উড়িয়ে বললো, “কী রে কুমড়ো পটাস? মুখ লটকে বসে আছিস কেনো?”
“তোমার জামাইকে ভালো হয়ে যেতে বলো। ছোটো বাচ্চাটাকে আজেবাজে শিক্ষা দিচ্ছে।”
“একদম ওর নামে অপবাদ দিবি না। মেরে হাড়গোড় ভেঙে দিবো।”
“পারবা আমার সঙ্গে? একটা টোকা দিলেই না উল্টে পড়বে?”
চোখ রাঙাল সুহাসিনী। তখনি কলিং বেল বাজলো। দরজা খুলে দিতেই ভেতরে প্রবেশ করলেন হামিদুল হক এবং মেহমাদ। হাত ভর্তি বাজারের ব্যাগ তাদের। সুহাসিনী ব্যাগগুলো নিলো। রান্নাঘরের সামনেই ব্যাগ খুলে একে একে বের করল গরুর মাংস, মুরগির মাংস, কয়েক পদের মাছ আর বেশ কিছু সবজি। নানা, বাবাকে দেখে মামার কোল ছেড়ে দৌড়ে গেলো মিথিন। চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ঠান্ডা চা-টাই শরবতের মতো খেয়ে নিলো শিথিল। প্রশ্ন ছুঁড়ল,“আজ কোনো বিশেষ দিন নাকি? হঠাৎ এত বাজার সদাই আর অতিথি?”
মেহমাদ ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর নিয়ে এসে বসলো পাশে। বললো,“বিশেষ দিনই। তবে অতিথি কাকে বলছো?”
“কেনো, আপনি।”
“আমি অতিথি নই।”
“তো কী?”
“এ বাড়ির জামাই।”
“বিয়ে এপ্রোভ করেছি?”
“ছোটো মানুষের এপ্রোভ মানি না।”
“পরেরবার আসলে মুলা আর শালগম খাওয়াবো। যেহেতু বাড়ির সদস্য বলে কথা!”
হাসলো মেহমাদ। শিথিল এবার সিরিয়াস ভঙিতে ফের জিজ্ঞেস করল,“কী বিশেষ দিন? আমি কিছু জানি না কেনো?”
“তোমার বিয়ে।”
মেহমাদকে ভীষণ আনন্দিত দেখালো। কিন্তু শিথিল পাত্তা দিলো না সেকথায়। হেলায় উড়িয়ে দিলো।বাজার হাতে পেতেই সুহাসিনী গিয়ে ডেকে আনলো পাশের বাড়ির কাজের মেয়েটাকে। এরপর বসিয়ে দিলো রান্না। সবকিছুই মাথার উপর দিয়ে যেতে লাগলো শিথিলের। মিথিনকে খুঁচিয়েও আর পেট থেকে বের করা গেলো না কোনো রহস্য। আর মেহমাদ! একে তো কস্মিনকালেও বিশ্বাস করে না সে। তাই ব্যাটাকে অগুরুত্বপূর্ণ লিস্টেই রেখে দিলো।
হামিদুল হক ছেলেকে ধমকালেন,“এখনো বসে আছিস কেনো? যা গিয়ে গোসল করে আয়। মাথায় শ্যাম্পু করবি। নতুন পাঞ্জাবি এনেছি। গোসল সেরে ওইটা পরে আতর লাগিয়ে তৈরি হয়ে নে।”
“কোরবানি দিতে নিবে নাকি?”
“হ্যাঁ, তার আগে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে হবে। সন্তান কোরবানি দেওয়া চারটে খানি কথা?”
“কিন্তু আজ তো শুক্রবার নয়।”
“তুই যা।”
দৃষ্টিতে সন্দেহ খেলে গেলো শিথিলের। বুঝতে পারলো তার বাপ আর অপ্রিয় দুলাভাই মিলে নিশ্চিত কোনো একটা জগাখিচুড়ি পাকাচ্ছে। কিন্তু সেটা কী? শেষ পর্যন্ত দেখার জন্য বাধ্য ছেলের মতো গিয়ে তৈরি হয়ে এলো সে। যহরের আজান দিতেই ছেলেকে টেনে ধরলেন হামিদুল হক। বগল দাবা করে বললেন, “চল।”
“সেজেগুজে যাচ্ছি কোথায়?”
পেছন থেকে মেহমাদ হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠল, “চাংড়িপোতা।”
“কীসের জন্য?”
“নেমন্তন্ন।”
মজার ছলে শিথিলও অমন করেই পাল্টা জবাব দিলো,“বিয়ের বুঝি?”
“হ্যাঁ, শালাজী।”
“কার বিয়ে?”
“শিথিলের বিয়ে!”
বাঁকা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল শিথিল। কোলে থাকা মিথিনও বাবার সঙ্গে শরীর দুলিয়ে হেসে উঠল। বাদ গেলেন না হামিদুল হকও।
চলবে ________
(কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।)

