মেঘমেদুর_দিনে লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই #বিশেষ_পর্ব —০১

0
1

#মেঘমেদুর_দিনে
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
#বিশেষ_পর্ব —০১

উদাস বিকেল। পেঁজা তুলোর মতো মেঘমালারা দলবেঁধে ছুটে চলছে আকাশে। বুয়েট ক্যাম্পাসে সবুজ ঘাসের উপর গোল হয়ে বসে আছে বন্ধুদের দল। আজ বহুদিন পর এক হয়েছে তারা। গিটারের টুংটাং শব্দে আড্ডায় প্রাণ ফিরে এসেছে যেন। দূরের গাছে বর্ষার জলে ভেজা রক্তিম কৃষ্ণচূড়া খেলা করছে। গাছের নিচে পড়ে আছে ছোট্ট এক টুনটুনি ছানার মৃত দেহ। সকলে গলা ছেড়ে গাইছে অনিকেত প্রান্তর—

‘তবু এই দেয়ালের শরীরে
যতো ছেড়া রং, ধুয়ে যাওয়া মানুষ
পেশাদার প্রতিহিংসা তোমার চেতনার
যতো উদ্ভাসিত আলো রং
আকাশের মতন অকস্মাত নীল
নীলে ডুবে থাকা তোমার প্রিয় কোন মুখ
তার চোখের কাছাকাছি এসে কেন পথ ভেঙ্গে
দুটো মানচিত্র এঁকে দুটো দেশের মাঝে
বিঁধে আছে অনুভুতিগুলোর ব্যবচ্ছেদ।’

আশেপাশে বসে থাকা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা সকলের আগ্ৰহভরা দৃষ্টি তাদের দিকেই নিবদ্ধ। সকলেই যেন ভীষণ করে উপভোগ করছে একযোগে ছেলেদের গলা ছেড়ে গাওয়া গানটি। গান শেষে ভেজা ঘাসের উপরেই শুয়ে পড়ল শান্ত। দৃষ্টি আকাশে স্থির। ফাইনালের রেজাল্ট এখনো পাবলিশড হয়নি। তাই হলরুম এখনো ছাড়েনি সজীব আর সে। চলছে পুরোদস্তুর চাকরির প্রস্তুতি। শিথিলরা অবশ্য এখন পঞ্চম বর্ষে। তাই ক্লাস আর থিসিস নিয়ে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে তাদের। খোলা আকাশে ডান ঝাপটানো পাখিদেরকে মনোযোগী দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে শান্ত কেমন করে যেন বলে উঠল,“প্রায় পাঁচটা বছর তোদের সাথে এই ক্যাম্পাসে কাটিয়ে দিলাম। কত স্মৃতি, কত আবেগ জড়িয়ে আছে, বল? অথচ একসময় চাইলেও আর এক হওয়া যাবে না। কর্পোরেট দুনিয়ার পেছনে ছুটতে গিয়ে বন্ধুত্বের সম্পর্কগুলো কেমন ফিকে হয়ে যায়, তাই না? জীবন এমন কেনো, বল তো?”

স্বাধীনও শুয়ে পড়ে তার পাশ ঘেঁষে। ডান হাত মাথার নিচে রেখে বলে,“আজ ইমনদের কথা ভীষণ মনে পড়ছে। ভাব, তাদের কতটা কষ্ট হয়েছিল সেদিন!”

শিথিল বললো,“আমাদের বন্ধুত্ব কখনোই ফিকে হবে না। এই কর্পোরেটের দুনিয়ায় নিজেদের প্রমাণ করতে করতে যখন ক্লান্ত হয়ে যাবো তখন আবার না হয় এক হয়ে লম্বা একটা আড্ডা দিবো। মন ভালো করার জন্য দিশেহারা পথ চলবো। সম্পর্ক তো আসলে ফিকে হয় অযত্নে, মিছে ব্যস্ততার বাহানায়। আমরা কী আর তেমন নাকি? আমরা হচ্ছি যত্নশীল।”

সকলের অধরেই তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ফের মজে গেলো আড্ডায়। তুহিন চুপচাপ বসে আছে একপাশে। সজীবের বোকা বোকা হাস্যরসাত্মক কৌতুকও তাকে হাসাতে পারছে না। হঠাৎ করেই মোবাইলে টুং করে শব্দ হলো। মনোযোগ বিঘ্ন ঘটলো শিথিলের। স্ক্রিনে ভাসমান ম্যাসেজটা দেখতেই মুখের রং পাল্টে গেলো। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল সে। আরফিন কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,“উঠলি কেনো?”

“বাসায় ফিরতে হবে রে। কথা ছিল ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে কাঁচা মরিচ নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু গল্পের ছলে ভুলে গিয়েছি।”

তপ্ত শ্বাস ফেলল সকলে। বন্ধুমহলের ছটফটে, বুদ্ধিমান ছেলেটির সংসারমুখো স্বভাবে যারপরনাই অবাক হলো। স্বাধীন নাকমুখ কুঁচকে বললো,“এর হাবভাব দেখে আমি শুধু অবাক হচ্ছি। বিয়ে আর বউ কি একটা জিনিস রে, ভাই! স্ট্রেট ফরওয়ার্ড ছেলেদেরকেও কিনা কেমন সংসারী বানিয়ে দেয় ভাব।”

শিথিল তাদের কথায় পাত্তা দিলো না। যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো সামনে। বললো,“তোরা শুধু ভাবতেই থাক। অন্যেরটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই তোদের দিন যাক। আর আমি শুধু বউ নিয়ে সুখের জীবন কাটাই।”

নিজের কথা শেষ করে প্রস্থান করল শিথিল। সজীব ভ্রু কুঁচকে বললো,“আমরা সিঙ্গেল বলে কী শালা আমাদের খোঁচা দিয়ে গেলো?”

শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল,“তাই তো মনে হচ্ছে।”

স্বাধীন মুখ বাঁকিয়ে বললো,“আজকেই বাড়ি ফিরে আম্মার সঙ্গে কথা বলবো। অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার মামাতো বোনকে বউ বানিয়েই ছাড়বো। তারপর নাক উঁচু বিবাহিত বন্ধুর থোতা মুখ ভোঁতা করে দিবো।”

তুহিনও উঠে দাঁড়াল। প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে বললো, “বিয়ে না হয় করলি কিন্তু তোর বউ টিকবে তো?”

“ক্যান টিকবে না?”

উত্তর দিলো না তুহিন। যেতে যেতে বললো,“থিসিসের কাজ শুরু করতে হবে। গেলাম আমি।”

স্বাধীন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বেশ কয়েকটা গালি দিলো কিন্তু তুহিন শুনেও যেন শুনলো না। তাতে রাগটা আরো বৃদ্ধি পেলো স্বাধীনের। কত বড়ো সাহস! তাকে অপমান!

কোমরে ওড়না বেঁধে দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটটি ঝাড়ু দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলো আবৃত্তি। একে একে রান্নার সমস্ত উপকরণ গুছিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বেজে উঠল কলিং বেল। আবৃত্তি দৌড়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেও সঙ্গে সঙ্গে খুললো না দরজা। সাংসারিক মেয়ে হলেও চেঁচামেচি সে একদম করতে পারে না। নিজের রাগটাও প্রকাশ করতে পারে না। শিথিলের সামনে তো একদমই নয়। তাই এটাই হোক ছেলেটার শাস্তি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকুক বাইরে। দুপুরে আসার বদলে বিকেলে এসেছে। শাস্তি তো পাওয়াই উচিত। এভাবেই মিনিট পাঁচেক পেরোলো।

এতোটুকুতেই অস্থির হয়ে পড়েছে শিথিল। কলিং বেল বাজাতে বাজাতে স্ত্রীর নাম্বারে দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক কল। এই ফ্ল্যাটটিতে আবৃত্তিকে নিয়ে সে উঠেছে দিন পনেরো হবে। যদিও এখনো পুরোপুরি সাজানো হয়নি তবুও বেশ ভালোভাবেই চলছে তাদের টুনাটুনির সংসার। টানা ছয় মিনিট তাকে এমন করে দাঁড় করিয়ে রেখে দরজা খুললো আবৃত্তি। স্বামীর চিন্তিত মুখে তাকানোর সাহস পেলো না। নত দৃষ্টিতে দ্রুত হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা টেনে নিয়ে হাঁটা ধরলো রান্নাঘরে। শিথিল একদৃষ্টিতে স্ত্রীর কর্মকান্ড শুধু দেখে গেলো। চিন্তিত মুখখানায় তৎক্ষণাৎ সূর্যের আলোর মতো জ্বলজ্বল করে উঠল একফালি প্রশান্তিময় হাসি।

সোজা ঘরে চলে গেলো শিথিল। কালো প্যান্টে কাঁদা লেগে আছে। শার্টটা ভিজে গিয়েছে ঘামে। তাই পরনের পোশাক বদলে গোসল দিলো একেবারে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে তেল মশলার ছ্যাৎ ছ্যাৎ শব্দ। ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে সেখানে এসে হাজির হলো সে।
আবৃত্তি টের পেলো স্বামীর উপস্থিতি। তবুও না দেখার ভান করে রইল। শিথিল বুঝলো, বউ তার রাগ করেছে। তাই ধীর পায়ে এগিয়ে এসে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে শব্দ করে গাঢ় একটা চুমু খেলো।

খুন্তি নাড়াতে থাকা হাত থেমে গেলো আবৃত্তির। কম্পিত হলো সারাদেহ। লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল মুখশ্রী। নারী দেহের সেই কম্পন টের পেয়ে মোহে আচ্ছাদিত হয়ে পড়ল শিথিল। কামিজ ভেদ করে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলো উদর। আবৃত্তি এবার যেন আর সহ্য করতে পারলো না।ঢোক গিলে কম্পিত কণ্ঠে বললো, “রান্না করছি।”

“করো।”

“ছাড়ো।”

“রাগ করেছো?”

“না।”

“উহু, করেছো।”

“আচ্ছা।”

“চলো রাগ ভাঙাই আগে।”

“প্রয়োজন নেই।”

“আছে।”

“গরম খুন্তিটা হাতে ছোঁয়াবো?”

“পারবে? কষ্ট হবে না?”

আবৃত্তি চুপ করে গেলো। সত্যিই সে পারবে না। শিথিল ব্যথা পাবে বা কষ্ট পাবে এমন কিছু করা তার পক্ষে অসম্ভব। শিথিল জিজ্ঞেস করল,“ক্লাসে যাওনি কেনো, ম্যাডাম?”

“এমনি।”

“এমনি?”

“ভালো লাগে না।”

“তো কী ভালো লাগে? স্বামী সোহাগ?”

নিশ্চুপ আবৃত্তি। রান্নার মাঝপথেই শিথিল গ্যাসের চুলা হঠাৎ করে নিভিয়ে দিলো। আবৃত্তি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“কী করলে এটা?”

“কাল থেকে রোজ কলেজে যাবে। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে ভালো সিজিপিএ আনতে হবে তো!”

“এখন পড়তে বসাবে?”

“উহু, ক্লাস করাবো।”

“কী ক্লাস?”

“স্বামী-স্ত্রীর রোমান্টিক ক্লাস।”

আঁতকে উঠল আবৃত্তি। কিন্তু পালাতে চেয়েও পারলো না। ঝট করে তাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে গিয়ে বিছানায় ফেলল শিথিল। ফিসফিস করে বললো,“কী জাদু করলে, মিষ্টি মেয়ে আবৃত্তি? বাইরে গেলেও মনটা শুধু বউ বউ করে।”

জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে পুনরায় বললো,“দিনটা সুন্দর না? একেবারে রোমান্টিক ওয়েদার।”

আবৃত্তি ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে রইল স্বামীর মুখের দিকে। বুক কাঁপছে তার। মনে বেজে উঠছে গানের একটি লাইন—

‘রেখো না আর, বেঁধো না আর
কুলের কাছাকাছি।
আমি ডুবতে রাজি আছি
আমি ডুবতে রাজি আছি।’

তার চাহনি, চোখের ভাষা খুব সহজেই পড়ে ফেলল শিথিল। চমৎকার হেসে নিজের সাথে জড়িয়ে নিলো মেয়েটিকে। আবৃত্তি আর বাঁধা দিলো না। আবেশে বুজে নিলো চোখ। জানালার কাঁচ ছুঁয়ে বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করছে হিমেল হাওয়া। তাতে পরিবেশটা যেন হয়ে উঠল আরো সুন্দর।

(সকাল থেকে গাজীপুরে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই ওদের নিয়ে লিখতে ইচ্ছে করল।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here