#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৭
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
প্রিয়তা বেগম হন্তদন্ত করে নিজের রুমে চলে গেলে , তার পিছু পিছু জাহানারা বেগমও চললেন।
জাহানারা বেগম কিছুটা কম্পিত কন্ঠে ডাকলেন ,
— “প্রিয়তা ?”
প্রিয়তা অভিমান দেখিয়ে বলল ,
— “কথা বলবি না আমার সাথে তুই !”
কথাটা বলেই আলমারি থেকে নিজের কাপড় বের করে বিছানায় রাখতে লাগল। প্রিয়তাকে এসব করতে দেখে , জাহানারা বেগম আটকে ফেলল তাকে। ভ্রু কুঁচকে বলল ,
— “কী করছিস এসব তুই ? পাগল হলি নাকি ?”
জাহানারা বেগমের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে , প্রিয়তা বেগম বিছানার কাছে যেয়ে কাপড় গোছাতে গোছাতে বললেন ,
— “আর এক মুহূর্তও থাকব না আমি এ বাড়ি ?”
জাহানারা বেগম আবারও এগিয়ে আসলেন প্রিয়তা বেগমের কাছে। প্রিয়তাকে জোর করে বিছানায় বসিয়ে , তার পাশে তিনিও বসলেন ,
— “কেন থাকবি না এ বাড়ি ? আমি তোকে কষ্ট দিয়েছি কোন ? কষ্ট দিলে বল !”
— “তুই মাহিরকে সাহায্য করছিস , তাই না ?”
প্রিয়তা বেগমের প্রশ্নে থমকে গেলেন জাহানারা বেগম। থমথমে মুখে বললেন , — “ছেলেটা তো খারাপ না রে , প্রিয়তা! আমার মনে হচ্ছে , মাহির সত্যি পিহুকে ভীষণ ভালোবাসে !”
প্রিয়া বেগম রাগে গজ গজ করতে করতে চেঁচিয়ে উঠলো , — “তো ? তাই বলে , পিহুকে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো নাকি ?”
জাহানারা বেগম ভ্রু কুঁচকে দাঁড়ালেন ,
— “পিহুকে ঐ ছেলেটির সাথে বিয়ে দিলে , সমস্যা কোথায় তোর ?”
প্রিয়তা বেগম প্রশ্ন ছুঁড়লেন ,
— “সমস্যা নেই কোন ? পাগল নাকি তুই ? মাহির পিহুর ভাই হয় , ইডিয়েট !”
জাহানারা বেগম প্রিয়তার দু’বাহু ধরে ঝাঁকালেন ,
— “পাগল আমি না তুই হয়েছিস ! মাহির পিহুর ভাই নয় , প্রিয়তা ! ওরা সৎ ভাই বোন ছিল যাস্ট! তুই তো সংসার করিস নি কখনো ঐ লোকটার সাথে !”
“তো ? তো কী হয়েছে ? ওরা এখনো সমাজের নজরে ভাই বোন ! আর আজীবনই ভাই বোনই থাকবে ! ওদের বিয়ে দিলে কী হবে জানিস তুই ? আমার পিহুকে এ দুনিয়া বাঁচতে দিবে , জাহানারা ! আমার পিহুকে কথার বাণে মেরে ফেলবে ওরা !” — প্রিয়তা বেগম এক শ্বাসে কথাগুলো বলে উঠলেন।
জাহানারা বেগম তখন চুপসে গেলেন কিছুটা। প্রিয়তা নিজের মাথা ধরল। ভীষণ টেনশন হচ্ছে তার ! এত দিন ভেবে ছিলেন পিহু মাহিরকে ভুলে যাচ্ছে ! কিন্তু পিহু তাকে ধোঁকা দিয়েছে ! পিহু তাকে একটা ছেলের জন্য পর করে দিয়েছে !
পিহু দরজার আড়াল থেকে দৃশ্যটি দেখে , ধীর কদমে নিজের রুমে চলে গেল। পিহুর কান্নার আসছে ! তার মা কখনো তাদের সম্পর্ক বুঝবেন না ! কখনো না !
পিহু নিজের স্কুল ব্যাগে মোবাইল ঢুকিয়ে কিছু না ভেবেই , বেরিয়ে পরল বাড়ি থেকে। কেউ তাকে দেখল না। কেউ টের পেল না পিহুর বিদায়। বাড়ির ভেতর তখনও তুমুল ঝগড়া করে যাচ্ছে প্রিয়তা বেগম আর জাহানারা বেগম !
পিহু বাড়ি থেকে একটু দূরে আসতেই থামল। ব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে কল লাগালো মাহিরকে।
কল রিং হয়ে হয়ে কেটে যাবে এমন সময় মাহির কল তুলল। মাহির অস্থির কন্ঠ বলল ,
—- “পিহু ?”
— “মাহির ভাইয়া আমাকে নিয়ে আসুন !”
পিহু কান্না করতে করতে বলল। মাহির আরও অস্থির হয়ে উঠল , — “কী হয়েছে , পিহু? এভাবে বলছিস কেন?”
পিহু এবার ফুঁপিয়ে উঠল , — “আম্মু…আম্মু আবারও আমাকে অন্য কোথাও নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে , মাহির ভাই ! আমি আর কোথাও যাবো না আম্মুর সাথে ! প্লিজ আমাকে নিতে আসুন !”
মাহির উৎকন্ঠা হয়ে উঠল , — “অন্য কোথাও নিয়ে যাবে মানে ? কোথায় নিয়ে যাবে তোকে ? তুই ওখানেই থাক! আমি এক্ষুনি বাড়িতে আসছি !”
পিহু নাক টেনে বলল , — “বাড়িতে না ! আমি তো রাস্তায় !”
মাহির ভড়কে গেল , — “রাস্তায় মানে ? রাস্তায় কী করছিস তুই ?”
পিহু আগের মতো নাক টেনে বলল ,
—- “বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি !”
মাহির চেঁচিয়ে উঠল , — “পাগল নাকি তুই ? এটা একটা বাড়ি থেকে চলে আসলি ! পিহু , বাড়ি যা এক্ষুনি! আমি কল করছি , মিসেস প্রিয়তা ! সে যাবে না কোথাও ! আমি এক্ষুনি আসছি তোর কাছে !”
পিহু জেদ ধরল , — “যাবো না কোথাও !”
মাহির আকুতির সুরে বলল , — “প্লিজ পিহু! আমার কথা শোন ! বাড়ি যা ! আমি বলছি তো , সে তোকে কোথাও নিয়ে যাবে না !”
“না…উম্ উম্…” — মোবাইলের অপর পাশ মাহির পিহুর গোঙানির শব্দ পেল। মাহির ঘাবড়ালো। পিহুকে চেঁচিয়ে ডাকল ! কিন্তু মোবাইলের অপর পাশ থেকে পিহু উত্তর আসল না কোন।
পিহুর কথা বলার সময়ই পিহুকে কেউ পেছন থেকে , মুখ চেপে ধরেছে। পিহু নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো! আরেক ছেলে তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে সাথে সাথে কল কেটে দিল মাহিরের। মোবাইলটাও বন্ধ করে ফেলল।
মাহির দ্বিতীয় বার কল করে পেল না পিহুকে। তড়িৎ গতিতে ভার্সিটি থেকে ছুটল পিহুর বাড়ির উদ্দেশ্যে! পথিমধ্যেই ফোন করল প্রিয়তা বেগমকে। প্রিয়তা বেগম আর জাহানারা বেগম আশপাশ খোঁজ করলেন এলাকা জুড়ে পিহুর !
পিহুর খোঁজ মেলল না। মাহিরও এসে পরেছে ইতোমধ্যে। পুলিশকে কল করে জানানো হয়েছে ! পুলিশও খুঁজে চলেছে এলাকা জুড়ে পিহুকে! রেদওয়ানও পিহুর খোঁজে চলে এসেছে মাহিরের কাছে ! মাহির ফোন করছে বার বার পিহুর নাম্বারে ! কিন্তু মোবাইল বন্ধ ! সকাল থেকে সবাই না খাওয়া ! রাতের তখন বারো’টা বেঁজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট! প্রিয়তা বেগম আর জাহানারা বেগম রীতি মতো কান্না করছেন ! রাশেদা বেগম ছুটে এসেছেন বোনের কাছে !
রেদওয়ান আর মাহির তখনও বাড়ির বাইরে ! পুলিশ এসে জানালো , তন্ন তন্ন করে এলাকা খুঁজেও পিহুর খোঁজ মিলল না কোথাও ! মাহিরের কান্না আসল ভীষণ! মুখে হাত গুঁজে কান্না করে ফেলল ছেলেটা! শরীর কাঁপছে তার রীতিমতো ! রেদওয়ান পিঠে হাত বুলালো মাহিরের! পুলিশ অফিসারটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে , থানায় আসতে বলল। পিহুর নাম্বারে আবারও কল লাগালো মাহির ! কয়েক বার পর মোবাইলে কল ঢুকল! মাহির অস্থির হয়ে উঠল ! কিন্তু কেউ কল তুলল না ! কল কেটে গেল ! মাহির ফের কল দিল ! কিন্তু কল তুলল না কেউ ! মোবাইল বন্ধ বলছে !
মাহির দ্রুত জিপিএসে মোবাইলের শেষ লোকেশন দেখার চেষ্টা করল। জায়গাটার ঠিকানা দেখে মাহিরের মাথায় হাত ! রেদওয়ান সহ পুলিশ অফিসারগুলো তাড়া দিল , জায়গার লোকেশন দেখানোর জন্য ! মাহিরের হাত থেকে ছো মেরে মোবাইলটা নিয়ে নিল রেদওয়ান! মোবাইলের স্ক্রিনে ঠিকানার নাম পড়ে , রেদওয়ানের গলা শুকিয়ে আসল। ইতো মধ্যে গাড়ির দিকে দৌড়ে গেছে মাহির! পিহুকে যেকোন মূল্যে আজই খুঁজে আনবে সে !
রেদওয়ানের পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসারটা বিড় বিড় করে পড়ছিল ঠিকানাটা। তারও কপালে হাত! ভয়ার্ত কন্ঠে বলল , — “এটা তো প/তি/তা/দের এলাকা ! এখানে একটা মেয়ে ঢুকে পরলে , কখনো ফেরানো যায় না তাকে !”
রেদওয়ানও মুহূর্তেই গাড়ির দিকে দৌড়ে গেল। পুলিশ অফিসাররাও সকলে তাড়া দিলেন যাওয়ার জন্য ! মাহিরের গাড়ি সবার আগে ছুটল ! ফের রেদওয়ান আর পুলিশদের গাড়ি ! কিন্তু মাহির! হাইস্পিডে গাড়ি ছুটিয়েছে সে ! তার ভয় হচ্ছে ভীষণ ! নিজের প্রেয়সীর জন্য খারাপ চিন্তা মাথায় ঘুর ঘুর করছে !
চলবে—

