সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা২৮ (শেষাংশ)

0
1

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা২৮ (শেষাংশ)

🚫টক্সিসিটি, স্ট্রং ল্যাংগুয়েজ অ্যালার্ট‼️

বুক এখনো ধড়ফড় করছে আমার। ভয়ে নয় বরং উত্তেজনায়। আমাদের নাচ মাত্রই শেষ হয়েছে। শরীর ক্লান্তি এবং কৃতজ্ঞতার মিশ্রিত উত্তেজনায় ছেয়ে গিয়েছে। করতালিতে উদ্ভাসিত চারপাশ। বোধ হয় অনেক দিন বাদে আমি সত্যিই একটু প্রাণখুলে হেসেছি আজ। ব্যাপারটা বেশ অভাবনীয় বটে।

কার্ডিগানের হাতায় কপাল মুছে নিয়ে ঠোঁটে কোমল হাসি মেখে ঘুরে তাকালাম মিসিরের দিকে। খানিক হাঁপাচ্ছে ছেলেটা নাচের পর।

“মিসির?”

আমি ডাকতেই ঘুরে তাকাল প্রাক্তনের বন্ধু।

“হুম?”

“থ্যাংক ইউ মিসির, আই মিন ইট, রিয়েলি।”

একটি হাত বাড়িয়ে মিসিরের হাত ধরে আলতো করে চাপলাম কৃতজ্ঞতাবোধে। মিসির শুধু একগাল হাসল।

“বাহ্, মানতেই হচ্ছে। তুমি তোমার র*ক্তের যোগ্য উত্তরসূরী, সাবিন।”

পরিচিত কণ্ঠটি কানে আসতেই কিছু বুঝে উঠতে বাকি রইলনা। ঘুরে তাকালাম আমি এবং মিসির দুইজনই। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন জেসমিন। ধীরপায়ে, মৃদু হাসি মেখে এগিয়ে এলেন তিনি। আমার বরাবর দাঁড়ালেন। তবে এবার আর তার কার্যক্রমে আতঙ্কিত হলাম না। হাত ঝেড়ে বললাম,

“হুসেইনদের র*ক্ত সস্তা নয়। যোগ্য উত্তরসূরী তো হতেই হতো। সে যাক, আমার কাউকে প্রমাণ করার কিছু নেই। অনুষ্ঠান যেহেতু জমে জমজমাট হয়েই গিয়েছে, তখন প্লীজ কন্টিনিউ করুন। আমি আসছি।”

মিসিরের দিকে চেয়ে সামান্য হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে আমি উল্টো ঘুরলাম।

“শুধুই কি হুসেইনদের র*ক্ত?”

আমার পা জমে গেল। প্রাক্তন শ্বাশুড়ির প্রশ্নটি শুধুমাত্র মস্তিষ্কে নয়, গিয়ে লাগল একেবারে বুকের ভেতরে স্পন্দিত হতে থাকা হৃদযন্ত্রে। আন্দোলিত হলো তা অস্বাভাবিকভাবে। মাথার ভেতর দপদপ করে উঠল তীক্ষ্ণ এক যন্ত্রণা। হাজার চাওয়া সত্ত্বেও এক চুল নড়তে পারলাম না। যেন পায়ের তলায় শিকড় গজিয়ে আমাকে জোরপূর্বক আটকে রেখেছে এই ভূমিতে।

জেসমিন জাফরের দিকে ফিরলেন। কি যেন বললেন কানে কানে। নিজের পকেট থেকে দুটো পাঁচশ টাকার নোট বের করে নিজের স্ত্রীর হাতে দিলেন, খানিকটা দ্বিধান্বিত হয়েই। আমার দিকে অগ্রসর হলেন জেসমিন। সামনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখেই বললেন,

“আমরা অভিজাত বংশ। মনোরঞ্জন করা নাচনেওয়ালীকে খালি হাতে যেতে দিতে পারিনা। দাদা পরদাদারা শিখিয়ে গিয়েছেন, এতে অমঙ্গল হয় পরিবারের। নাও, সামান্য কিছু হাদিয়া, মুজরা দেখিয়ে সকলকে মুগ্ধ করার জন্য।”

আমার দিকে পাঁচশ টাকার নোট দুটো বাড়িয়ে ধরলেন জেসমিন, অত্যন্ত শান্ত এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।

প্রগাঢ় নীরবতা। মিউজিক সিস্টেমে বাজতে থাকা মৃদু আওয়াজের সঙ্গীতও ম্রিয়মাণ হলো সহসাই। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল প্রত্যেক জোড়া নয়ন, আমার এবং জেসমিনের দিকে।

বাকরুদ্ধ চেয়ে রইলাম আমি জেসমিনের পানে। ঠিক কেমন অনুভব করছি? ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আমার প্রাক্তন শ্বাশুড়ি একজন জটিল মস্তিষ্কের প্রাণী। তিনি কিছু ক্ষেত্রে ভালো, কিছু ক্ষেত্রে ভয়ানক রকমের খারাপ।

কিন্তু এই ধরণের জঘণ্যতা? দোষটা আসলে কার? তার? নাকি এই কুটিল মনোভাবপূর্ণ সমাজের? কাকে দোষারোপ করা যায়? সবথেকে সহজ উপায় নিজেকে নিজে দোষ দিয়ে এই মুহূর্তে এই স্থান পরিত্যাগ করা। কিন্তু এত বড় অপমানের পরও কি মুখ বুঁজে চলে যাওয়া সম্ভব?

আমাকে নির্বাক চেয়ে থাকতে দেখে জেসমিন একগাল হাসলেন। আমার জমে যাওয়া হাত দুটোর একটা তুলে নিয়ে তাতে নোট দুটো গুঁজে দিয়ে বললেন,

“লজ্জা পাচ্ছ কেন? তোমার পরিশ্রমেরও তো দাম আছে, বলো? দিনে মনোরঞ্জন, রাতে বিছানা গরম। পরিচিত বাড়ি বলে ফ্রি সার্ভিস দিতে হবেনা। এটা তোমার প্রাপ্য।”

“আন্টি!”

সবার প্রথমে প্রতিবাদ করে উঠল মিসির। তার কন্ঠে ঝরে পড়ল হাহাকার এবং অবিশ্বাস। দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এলো সে, জেসমিনের পাশে দাঁড়াল,

“আন্টি। তোমার মাথা ঠিক আছে? কাকে কি বলছ তুমি?”

“কেন, মিসির? আমি ভুল কিছু বলেছি নাকি?”

জেসমিনের তীব্র দৃষ্টির বিপরীতে মিসির শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করল। আমি জানি সে কি ভাবছে। এটা তার পারিবারিক বিষয় নয়। কিন্তু একজন মানুষ হিসাবে সে চুপ থাকতে পারছেনা। অথচ পরিবারের মানুষগুলোই, জাফর এবং আয়দান, উভয়ই স্থির, নিশ্চুপ। তাদের ভূমিকা বরাবর তেমনি ছিল।

আর জায়দান?

বরাবরের মতোই সে দৃশ্যপটে হাজীর নেই।

মনে মনে বিস্তর হাসলাম আমি। অভাগা সাবিন! তুই কি মনে করিস? ওই লোকটা এখানে উপস্থিত থাকলেও বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করত? এতকিছুর পর দিবাস্বপ্ন নয় কি তা?

স্বপ্ন হোক, কি বাস্তব। আমার এখন আর কোনোকিছুতে কিছু যায় আসেনা। কারো সাহায্য? আমি আশা করিনা। কেন করব?

সাবিন হুসেইনের ক্ষমতা কি কোনো অংশে কম এই মেরুদণ্ডহীন সমাজের থেকে?

হাতের মাঝে মুঠো পাকিয়ে চেপে ফেললাম টাকার নোট দুটো। মিসির ততক্ষণে আরেক দফায় কথা বলতে শুরু করেছে,

“এটা আরেফিন বাড়ি নয়, একটা সামাজিক অনুষ্ঠান। আর এমন জায়গায় একটা মেয়েকে এভাবে অপদস্থ করা কি করে সমর্থন….!”

হাত তুললাম আমি। সংকেত লক্ষ্য করে মিসিরের কন্ঠ জমে গেল। সম্পূর্ণ বাক্য শেষ করার আগেই সে চুপ করে যেতে বাধ্য হল। নিগূঢ় নিশ্চুপতার ভিড়ে আমি তাকালাম বরাবর জেসমিনের নয়নমাঝে। অত্যন্ত ধীরে, অশনির ন্যায় এগোলাম, সন্নিকটে।

“বর্বর মহিলার জাত!”

দাঁতে দাঁত পিষে বললাম, যেন শুধু জেসমিন শুনতে পান।

“আমার তো সন্দেহ হয়। আপনি আসলেই একটা মেয়ে তো?”

“সাবিন!”

গর্জে উঠে নিজের হাত তুলতে গেলেন জেসমিন। অথচ ক্ষীপ্রতায় তার কব্জি আঁকড়ে ধরে ফেললাম। তীব্র চাপে হাতখানি সামান্য বাঁকিয়ে ধরলাম। আমার চাপা কন্ঠস্বর এবার হুংকার দিয়ে উঠল,

“আমি নাহয় নাচনেওয়ালী! পুরুষের মনোরঞ্জন আর বিছানা গরম করি! কিন্তু আপনি কি জেসমিন শিকদার? একজন ব্যর্থ মেয়ে, একজন ব্যর্থ স্ত্রী এবং একজন ব্যর্থ মা! আমিও বলি এবার! যদি আপনার এতই সক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে আপনার বাড়ির পুরুষ, আপনার বাড়ির স্বামী কেন আমার মতন নাচনেওয়ালীদের দরজায় যায়? কিসের টানে? আপনার আঁচলের শক্তি এতই কম?”

তীব্র এক গুঞ্জণ হঠাৎ শুরু হয়েই আবার থেমে গেল। যেন আমার কণ্ঠস্বরের উপরে কেউ কিছু বলতেও নারাজ। হতবাক হয়ে চেয়ে থাকা জেসমিনকে দেখলাম। টলটলে অশ্রু জমেছে তার চোখে, ঠোঁট কাঁপছে তিরতির করে, অনুভূতি সংবরণে। তার হাতটা টেনে সেখানে মুচড়ে ফেলা টাকার নোট দুটো চেপে হিসিয়ে উঠলাম,

“এই হাদিয়া আপনার প্রাপ্য! যে অসাধারণ নাটক আপনি আজীবন আপনার কাছের মানুষগুলোকে দেখিয়ে চলেছেন, তার জন্য হাজার টাকা কিছুই না! আমি তুচ্ছ মানুষ, এর বেশি কিছু দিতে পারিনা!”

“সাবিন! তোমাকে আমি…”

“একদম চিৎকার করবেন না জেসমিন শিকদার! চিৎকার আমিও করতে পারি!”

চেঁচিয়ে উঠলাম। কপালের পাশে শিরা উপশিরা জেগে উঠেছে আমার ভীষন ক্রোধে। গ্রীবাদেশ ফুলে লালচে হয়ে উঠেছে। আমি জীবনে প্রচন্ড রাগ করেছি। অথচ, আজকের রাগ যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। কারণ প্রথমবারের মতন আমার অন্তর সায় দিয়ে বলছে, আমার রাগ করাটা সম্পূর্ণ জায়েজ।

“খবরদার! আমার মাম্মির সঙ্গে একদম বাজে ব্যবহার করবে না!”

প্রত্যাশার মতোই এগিয়ে এলো আয়দান। দুহাত মুষ্টিবদ্ধ। সটান উল্টো ঘুরলাম। ছেলে আর কিছু উচ্চারণ করার আগেই আমার ঘুষি আছড়ে পড়ল তার চোয়াল বরাবর। ছিটকে গেল আয়দান, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন তাকে ধরে ফেলল।

“তোর মাদারের সাথে আমি যে এখনো আপনি করে কথা বলছি, এটাই তোর সাত পুরুষের ভাগ্য, সন অব আ বিচ!”

বিস্ময়সূচক শব্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল চারপাশ। আরওয়ার বাবাকে দেখলাম একপাশে, পকেটে হাত ভরতে ভরতে যিনি বলছেন,

“আমি এক্ষুণি পুলিশে কল করছি। এই লাগামহীন মেয়েকে…”

“করুন। পুলিশ আসুক! আমিও তাদের বলব একটা মেয়ের টুঁটি চেপে ধরা এই নামমাত্র গুরুজন আর সমাজকে কিভাবে শায়েস্তা করতে হয়! পুলিশেরও শেখার দরকার আছে! গুরুজন যদি গুরুর মতন আচরণ না করে, তাহলে তাকে পায়ের নিচে ফেলে স্রেফ পিষে ফেলতে হয়!”

জমে গেল সবাই। খুব ভালোমত বুঝতে পারছি আমি। আমার মতন কোনো মেয়েকে দেখে কেউই অভ্যস্থ নয়। তাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে সকলে। আতঙ্কও কাজ করছে অনেকের। গর্বিত হলাম নিজের প্রতি। ঝট করে ফিরে তাকালাম জেসমিনের দিকে, যিনি এই মুহূর্তে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছেন। যেন কিছুক্ষণ আগেই তিনি হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিলেন না। কর্কশ গলায় চড়া কন্ঠে বললাম,

“এই সমাজে পুরুষকে কি দোষ দেব? যেখানে নারীরাই নারীদের সবথেকে বড় শত্রু? এক নারী অন্য নারীকে ভরা মজলিশে টেনে নামাতে এক সেকেন্ড চিন্তা করেনা, সেখানে সেই নারী অন্যের কাছে কিভাবে সম্মান আশা করে? এই সামাজিক বৈষম্যের মূল কারণ পুরুষ নয়, আপনাদের মতন কিছু অথর্ব গুরুজন নামক কুলাঙ্গারের ভূমিকা আছে আজকের এই অধঃপতনের পিছনে! কারণ আমার মতন মেয়েরা, আপনাদের মতন মহিলাদের দেখেই বড় হয়, আর নিজেরা যখন কারো স্ত্রী হয়, কারো মা হয়, তখন ভাবে অন্য মেয়ের সাথে এসব করা আমার জন্য জায়েজ! হ্যাঁ, আমি এসব আপনাকেই বলছি জেসমিন শিকদার! যতই গলাবাজি করে নিজের ঔদ্ধত্য এবং আভিজাত্যের গৌরব জাহির করতে চান না কেন, দিনশেষে আপনি একটা জঘণ্য মা! মায়ের মতন পবিত্র শব্দের সঙ্গে জঘণ্য শব্দটা জুড়ে দেয়ার পাপে আপনার জাহান্নামেও স্থান হবেনা!”

পিনপতন নীরবতা।

নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠল আমার। শুধুমাত্র সেই ধ্বনিই যেন শোনা যাচ্ছে গোটা প্রাঙ্গণজুড়ে। অনুষ্ঠান? সে তো কবেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছে। নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে পৌঁছেছি আমি, যে এতজন মানুষ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কেউ আমার দিকে একটা আঙুল অবধি তোলার সাহস করতে পারছেনা।

পদক্ষেপধ্বনি। হালকা ঘাস মাড়িয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার মৃদু মন্থর আওয়াজ। চোখ তুলে তাকালাম। অবশেষে দেখতে পেলাম তাকে।

লম্বা পায়ে দীর্ঘ দূরত্ব পেরিয়ে এগিয়ে আসছে জায়দান। বাদামী নয়নজোড়া শীতলতায় ভরপুর। তার পিছনেই খানিকটা তাড়াহুড়ো করে আসছে আরওয়া, জায়দানের সঙ্গে দূরত্বে পেরে উঠছেনা স্পষ্ট। প্রত্যেকের মনোযোগ ঘুরে গেল সেদিকে।

সকলের সামনে এসে দাঁড়াল জায়দান। ঠান্ডা দৃষ্টি বোলালো একে একে প্রত্যেকের উপর। অতঃপর সেই দৃষ্টি থামল জেসমিনের অবয়বে। মাকে থরথর করে কাঁপতে দেখে ভ্রু সামান্য উঁচু হল তার। দাঁতে দাঁত ঘষল জায়দান, শান্ত অথচ কর্কশ গম্ভীর আওয়াজে শুধাল,

“কি হয়েছে?”

জেসমিন মাথায় হাত চেপে টলে উঠলেন খানিক। তৎক্ষণাৎ এগিয়ে জননীকে বুকে টেনে নিল বড় সন্তান। জেসমিনের গালে হাত ছুঁয়ে দ্বিতীয় দফায় জিজ্ঞেস করল,

“কি হয়েছে, আম্মু?”

“কি হয়েছে তুমি জানো না? আশেপাশে তাকাও, তাহলেই বুঝতে পারবে।”

ঘড়ঘড় আওয়াজে জবাব দিলেন জাফর। জায়দান সুচারু চোখ মেলে তাকাল। তবে আমার দিকে নয়, তার দৃষ্টি ঘুরে ফিরল সবার মাঝে। প্রত্যেকে নির্বাক মূর্তি যেন। শুধুমাত্র রুশমিই সর্বপ্রথম এগিয়ে বলে উঠলেন,

“এই মেয়ে আমাদের সবার সামনে যা নয় তাই বলে অপমান করেছে জেসমিনকে!”

বরাবর আমার দিকে আঙুল তুলে নির্দেশ করলেন তিনি। জায়দান অত্যন্ত ধীরে নয়ন ঘুরিয়ে অবশেষে দেখল আমার পানে। ভ্রুজোড়া তীব্র কুঞ্চন ধারণ করল আমার। মুখোমুখি হলাম প্রাক্তনের দৃষ্টির, বিনা অনুভূতিতে। জায়দানকে খানিকটা ভাবুক দেখাল। তার বদলে মুখ খুলল আরওয়া,

“মম। তোমরা কেন শুধু শুধু একটা ছোট বিষয়কে টেনে টেনে এত লম্বা করছ? আমার ভুল হয়েছে সাবিনকে এখানে ডেকে! ক্ষমা করো আমায়! সাবিন প্লীজ, আপনি আসতে পারেন এখন!”

বাঁকা হাসলাম আমি। আরওয়ার কথা কানে গেলেও প্রতিক্রিয়া করলাম না কোনো। বরাবর চেয়ে রইলাম জায়দানের নয়নমাঝে। আমার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বোধ হয় সে অস্বস্তিবোধ করছে, তাই চোখ ফিরিয়ে নিল। জেসমিনকে নিজের মাঝে অতি সাবধানে আগলে রেখে গভীর গলায় বলল,

“আপনারা সকলে, প্লীজ, একটু শান্ত হন। পরিস্থিতি বোঝদার হয়ে নিয়ন্ত্রণ করুন। এটা একটা সামাজিক জায়গা। এখানে সবার উত্তেজিত মনোভাব মানায় না।”

একটি চেয়ার টেনে আনল জায়দান কাছে। জেসমিনকে ধরে বসিয়ে দিল। ছেলের বাহু আঁকড়ে ধরে হাঁপানি রোগীর মতন হাঁপিয়ে উঠলেন তিনি,

“এই মেয়ে আমাকে বাঁচতে দেবে না, বাঁচতে দেবে না শান্তিতে!”

“আজ যদি আপনি মরেও যান, আমার কিচ্ছু যায় আসবেনা। উল্টো আমি গর্বিত হব এই ভেবে যে, পৃথিবী থেকে একটা নর্দমার কীট দূর হয়েছে!”

আমার শক্তিশালী কন্ঠস্বর ধ্বনিত হল। আঁতকে উঠল প্রত্যেকে। স্থির হল জায়দান, ঝট করে মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। এবার ওই বাদামী দৃষ্টির মাঝে আর কোনো শান্ত মনোভাব নেই। বরং অন্তর্দ্বন্দ্ব বইছে ভীষণভাবে। ভারিক্কী, অশনি সংকেত মাখা গলায় সে রীতিমত একটা একটা করে শব্দ উচ্চারণ করল,

“হোয়াট। ডিড। ইউ। সে?”

এগোলাম আমি। মুখোমুখি দাঁড়ালাম প্রাক্তনের। মাথা উঁচু করে উচ্চশিরে দৃষ্টি মেলালাম তার সঙ্গে।

“আই সেইড, আই ডোন্ট কেয়ার ইফ ইওর মাদার ডাইস বায় মাই হ্যান্ডস!”

ক্ষণিকের জন্য ওই বাদামী সমুদ্রমাঝে ঘূর্ণিপাক দেখলাম। এক হাত মুষ্টিবদ্ধ করে শক্তভাবে চেপে ভ্রু কুঁচকে জায়দান দেখল আমাকে। বোধ হয় নিজেকে সংবরণের অন্তিম প্রচেষ্টা। অথচ আমার এই লোকটার প্রতি বিন্দুমাত্র টান অনুভব হলনা। তীব্র অভিমান, তীব্র জ্বালা টের পেলাম, যা আমার কণ্ঠের হাহাকার হয়ে ঝরে পড়ল।

“একটা জীবন্ত পাথর তুমি! পরিবারের হাতের কাঠপুতুল!”

জায়দানের কাঁধজোড়া সামান্য কেঁপে উঠল।

“সীমা লঙ্ঘন করছ, সাবিন!”

“সীমা?”

অশুভ এক হাসি হাসলাম। তারপর সহসাই দুহাত বাড়িয়ে জায়দানের কলার আঁকড়ে ধরলাম। সকলে দেখছে? লোকে গল্প করবে? করুক! আজ আমার কিচ্ছু যায় আসেনা! কিচ্ছু না! টলমলে হয়ে উঠল দৃষ্টি না চাইতেও, গর্জে উঠলাম,

“কোথায় ছিলে তুমি এতক্ষণ যাবৎ, বাড়ির কুখ্যাত বড় ছেলে? কোথায় ছিল তোমার সীমা যখন তোমার আম্মু ভরা সমাজে তোমারই প্রাক্তন স্ত্রীর আত্মমর্যাদার উপর পশুর মতন হামলে পড়েছিল? সেটা সীমা লঙ্ঘন হয়নি জায়দান আরেফিন?”

বাকরুদ্ধ জায়দান চেয়ে রইল আমার দিকে। আজ বাঁধ ভেঙেছে আমার সকল জমিয়ে রাখা কষ্টরা। এক ঝটকায় কাছে টেনে নামিয়ে তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দাঁত পিষে বললাম,

“অন্য মেয়ের সম্মান রক্ষায় নিজের আপন ভাইকে জেলে পাঠাতে দুইবার ভাবে না যে পুরুষ, নিজের স্ত্রীর বেলায় সেই পুরুষের ঠোঁটে সেলাই কেন? এমন পুরুষত্বের উপর আমার থুথু!”

জোরালো ধাক্কায় জায়দানকে দূরে সরিয়ে দিলাম। পিছিয়ে গেল সে, প্রসারিত নয়ন মেলে আমায় দেখল। আমার চোখের টলমলে অশ্রু হার মেনেছে। গাল বেয়ে চুঁইয়ে নামছে অথচ মুখের কঠোরতা তাতে একটুও প্রভাবিত হয়নি। আশেপাশে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে উঠলাম,

“শোনো ছেলেরা, যদি নিজের স্ত্রীকে পরিবারের কলুষতা থেকে হেফাজতের মতন হ্যাডম না থাকে, তাহলে পিঠের ভেতর যে মেরুদন্ডটা আছে, সেটাকে গুঁড়িয়ে ফেল! মেরুদণ্ডহীনদের মেরুদন্ড মানায় না! শ্বাশুড়ি, ননদ, মা, বোনের কূটনীগিরি প্রতিরোধ করার হ্যাডম না জন্মানো অবধি বিয়ে নামক শব্দটাই ভুলে যাও! বিয়ে তোমাদের জন্য না, খেটে খাওয়া একজন রিকশাওয়ালার জন্য, যে স্বল্প উপার্জনের ডালভাত নিজের মুখে দেয়ার আগে বউয়ের মুখে তুলে দেয়!”

তীব্র দৃষ্টিতে তাকালাম একপাশে হতবিহ্বল, নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা আরওয়ার দিকে।

“আপনাকেও অন্তিম বারের মতন সাবধান করছি আরওয়া এহসান, দেখছেন তো আমাকে, দেখছেন না? আপনি বেঁচে যাবেন ভেবে থাকলে আপনি একটা আহাম্মক। এক বছর পর হোক কিংবা পাঁচ বছর পর, যদু যে ভোগা ভুগেছে, কদুকেও তা ভুগতে হবে! আফতার অল, কুকুরের লেজ কোনোদিন সোজা হয়না!”

আর দাঁড়ানোর সামর্থ্য নেই আমার। সমস্ত শরীর বুঝি ভেঙে আসছে। আর পারছিনা আমি। ক্ষীপ্র গতিতে এগোলাম এলোমেলো পদক্ষেপে। থমকালাম, অন্তিম বারের জন্য।

আমার দৃষ্টি মিলিত হলো তার সঙ্গে। ওই বাদামী নয়নজোড়াকে নির্লজ্জের মতন দেখলাম, নিজের অশ্রুভরা টলটলে নয়নে। অতঃপর দৃষ্টি হটিয়ে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গেলাম, গেটের বাইরে। একবারের জন্যও আর পিছনে ফিরে দেখলাম না। ভ্যান অপেক্ষা করছে আমার, অথচ থামলাম না আমি। ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়া অস্তিত্ব নিয়ে ছুট লাগালাম, ঊর্ধ্বশ্বাসে, অজানার উদ্দেশ্যে।

যেদিকে আজ এই পা জোড়া আজ আমায় নিয়ে যায়, সেই ঠিকানাই আমার অন্তিম ঠিকানা।

★ ★ ★

কিছুক্ষণ আগেই ঝেঁপে বৃষ্টি নেমেছে। শীতকালে আচানক বৃষ্টিপাত একটা মন খারাপ করা ইঙ্গিত দেয়, প্রকৃতির বড় অসুখ। হাতে জ্বলছে সিগারেট, ধোঁয়া বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে দেহ। তবুও সিগারেটের প্রতি আজ বিশেষ মন নেই সাবিনার। উদাস মুখে চেয়ে আছেন তিনি জানালার বাইরে। আকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেন তারও আজ মন খারাপ।

পরনের পেটিকোট এবং পাতলা ক্রপ গেঞ্জির ভিতরে শিরশির করে হিমেল হাওয়া ঢুকছে। এই হাওয়ায় আর্দ্রতা ব্যাপক। চোখ কুঁচকে ফেললেন সাবিনা। বেশ বয়স হয়ে যাওয়ার পরেও বিশেষ যত্নে এখনো লাবণ্যময়ী থাকা শরীরটা টেনে উঠলেন। ঘোলাটে অন্ধকার রুমের কোণায় রাখা ট্রাংক থেকে কাশ্মীরি চাদর বের করে নিলেন। এই চাদরের বেশ দাম। নিজের কেনা নয়, উপহার পাওয়া। এই তল্লাটে অভিজাত মহলের উপহারের অবাক হয়না।

ট্রাংকের গায়ে হেলান দিয়ে চাদর গায়ে ছড়িয়ে অবশিষ্ট সিগারেটে টান দিলেন সাবিনা। তামাটে উষ্ণ ধোঁয়া কন্ঠনালী বেয়ে ঢুকে নাসারন্ধ্র বেয়ে বেরিয়ে এলো। বেশ আরাম লাগল এই ঠান্ডায়। বৃষ্টি বিলাস করতে করতে ভাবলেন, কাজের ছেলেটাকে বাজারে পাঠিয়ে খিচুড়ির চাল, মুসুরির ডাল আর তরতাজা ইলিশ আনিয়ে নেবেন। সারারাত কাস্টমারদের সার্ভিস দেয়ার পর ক্লান্ত মেয়েগুলো বৃষ্টি বাদলে ভালো খাবার পেয়ে নিশ্চয়ই বেশ আনন্দিত হবে। কুঠির মালকিন হিসাবে মাঝে মধ্যে মেয়েগুলোর যত্ন নেয়ার দায়িত্ব আছে তার। শুধু শাসন করে লভ্যাংশ বুঝে নিলেই হয়না।

সিগারেট ফুরিয়ে আসতেই ধোঁয়া ছেড়ে সেটি জানালার বাইরে ছুঁড়ে ফেললেন সাবিনা। হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি ঝনঝন করে ঝংকার তুলল। টেবিলের কোণায় রাখা পুরাতন রেডিওসেট অন করলেন হাত বাড়িয়ে। ক্যাসেট থাকায় মুহূর্তেই বেজে উঠল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। দুই হাত ছড়িয়ে মুজরার ভঙ্গি তুলে অতর্কিতে নাচতে আরম্ভ করলেন তিনি। বেশিরভাগ সময় তিনি সকল কাজকর্ম এরকম হঠাৎ করেই করেন, কোনো কারণ ছাড়া।

বাইরে বৃষ্টির ঝমঝম ধ্বনি এবং রুমের ভেতর চুড়ির রুনুঝুনু। বড়ই প্রশান্তিদায়ক। আপনমনে বিস্তৃত হাসলেন সাবিনা। হেলেদুলে নিজের ভঙ্গিমা বদল করে আয়নায় অবয়ব দেখলেন। কে বলবে তার বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই?

“ম্যাডাম! ও ম্যাডাম! দেইখা যান তাড়াতাড়ি, কেডা আইসে দুয়ারে আইজ!”

খোলা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁকি দিল এক মেয়ে। কালো কুচকুচে বর্ণ শরীরের, অথচ মুখখানি যেন স্রষ্টার মায়ায় পূর্ণ। সাবিনা থামলেন। রেডিও বন্ধ করে খানিক বিরক্তি নিয়ে তাকালেন,

“এমন সময়ে কে আইসে বৃষ্টি মাথায় নিয়া বিরক্ত করবার?”

মেয়েটি জবাব দিতে পারলনা। এর আগেই বাইরে থেকে গুঞ্জণ শোনা গেল। সাবিনা অপেক্ষা করলেন না। খালি পায়ে স্যান্ডেল গলিয়ে হনহন করে হেঁটে গেলেন বাইরে। মেসের মতন লম্বা বারান্দা ধরে এগোলেন। সামনেই উপরে উঠে আসার সিঁড়ি, সেখানেই কুঠির মেয়েরা খানিক ভিড় পাকিয়েছে।

“এই সর! সর মুখপুড়িরা, দেখবার দে!”

সকলেই সম্মান দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ সরে দাঁড়াল। সাবিনা ভ্রু কুঁচকে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর তার বিরক্তিমাখা নয়নজোড়া সামনের দৃশ্য দেখে প্রসারিত হয়ে উঠল মহা বিস্ময়ে।

সিঁড়ির উপরের ধাপে হাঁটুতে হাত রেখে ঝুঁকে হাঁপাচ্ছে এক রমণী। পরনের ফ্রক এবং কার্ডিগান চুপচুপে ভেজা, টপটপ করে পানি গড়াচ্ছে চুল বেয়ে। বৃষ্টির মাঝে ভিজে এসেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সাবিনা আসতেই রমণী মুখ তুলে তাকাল। তার ওই কোমল মুখে বৃষ্টির ফোঁটায় সিক্ত ত্বকের মাঝেও টলটলে অশ্রুভরা নয়নযুগল সাবিনার অন্তরে বুঝি ছুরির ফলা হয়ে গেঁথে গেল। হাহাকার করে উঠল ভেতরটা।

“সাবিন, আম্মা তুমি!”

হাঁটু ভাঁজ করে অসহায় ভঙ্গিতে সেখানেই বসে পড়ল সাবিন, দুহাতে আঁকড়ে ধরল সাবিনার কোমর। চাদরের আড়ালে নরম পেটে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল,

“আম্মু! আমি আর পারছিনা আম্মু! আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো না, আম্মু!”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here