#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৪
আজ আবহাওয়াটা কেমন যেন বিষণ্ন। বসন্ত গ্রীষ্মের মেলবন্ধনের বেলায় আকাশ জুড়ে গুমোট বেঁধেছে মেঘের দল। থেকে থেকে মৃদু গর্জন তুলছে। ভেঙে পানি হয়ে ঝরে পড়বে যেকোনো সময়। ঝিরিঝিরি ঠান্ডা বাতাস আগমনী ঝড়ের জানান দিচ্ছে বুঝি।
পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম আমি। অদূরে ছোট একটা লেক। তার ধার ঘেঁষে আমগাছ। থোকা থোকা মুকুল ধরতে শুরু করেছে সবে। তার তলায় কাঠের বেঞ্চ। সেখানে বসে আছে সুদীর্ঘ পুরুষটি। চশমাবিহীন বাদামী দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত লেকের টলটলে পানির দিকে।
আশেপাশে তেমন কোনো মানুষ নেই। শুক্রবারের এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় সকলেই আপন নীড়ে ব্যস্ত ভীষণ। আমি নিঃশব্দে আস্তে করে বেঞ্চের একপাশে বসে পড়লাম। ওপাশ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া হলনা। শুধুই নীরবতা।
কতক্ষণ কাটলো হিসাব নেই। অবশেষে মোলায়েম কন্ঠ ধ্বনিত হলো আমার,
“আমরা প্রত্যেকেই জীবনে এমন একটা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাই, যখন মনে হয়, এই দুনিয়ায় আমি ছাড়া আমার আর কেউই নেই। তোমার সঙ্গে ডিভোর্সের পর, নিজের আপন মানুষগুলোর কাছ থেকে ধোঁকা খাওয়ার পর আমারও তেমনটা মনে হতো জায়দান। এই জীবনে বেঁচে থাকাটা অনর্থক ছিল। নিজের জন্য বাঁচা নয়, বেঁচে থাকতে হয় বলে বাঁচা হয়েছিল। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আমি একটা একটা করে আমার কাছের কিছু মানুষ খুঁজে পেয়েছিলাম। আম্মু, মীরা, তুমি। তোমাদের যে কারো জন্য আমি একটা জীবন হাসতে খেলতে কাটিয়ে দিতে পারি। আমি ভাবতাম, এদিক দিয়ে তোমার আর আমার ভীষন মিল। আমরা দুজনই একাকীত্বের রোষানলে জর্জরিত দুটো সত্তা। অথচ আজ আমি বুঝলাম, তোমার যাতনার গভীরতাকে পৃথিবীর সবথেকে গভীর সমুদ্রের গভীরতাও কোনোদিন ছাড়িয়ে যেতে পারবেনা। আমি তো সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলাম। কিন্তু তুমি তো সবকিছুর মাঝেও নিঃস্ব ছিলে।”
কোনো কথা বললোনা জায়দান। তার দৃষ্টি তখনো লেকের দিকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে তার আমার প্রতি কোনো মনোযোগ নেই। অথচ আমি জানি, সে আমার প্রত্যেকটা কথা কত আগ্রহ নিয়ে শুনছে। আমি তার নিকট সরে বসলাম। হাঁটুর উপর রাখা পুরুষালী হাতের উপর নিজের হাতটা রাখলাম।
“যার কিছু নেই, তার আফসোস হয়না। যার সবকিছু থেকেও কিছু নেই,তার যন্ত্রণার তুলনা হয়না। আমি, সাবিন হুসেইন নামের ঘাড়ত্যাড়া মেয়েটাও তোমার যন্ত্রণায় কম ভূমিকা রাখিনি। অতীতে আমি যা যা করেছি, তার জন্য আমার কাছে কোনো ব্যাখ্যা নেই। থাকলেও দিতাম না। কারণ, আমি জানি আমি অপরাধ করেছিলাম। এক হাতে তালি না বাজলেও তালি বাজাতে উৎসাহ আমিই দিয়েছিলাম। তোমার কখনো না বলা কষ্টগুলোকে বাড়িয়ে দেয়ার জন্য যদি পারো, আমাকে ক্ষমা করো প্রিয়।”
জায়দানের মুখটা পাথরের মতন শক্ত। কে বলবে কিছুক্ষণ আগে এই পুরুষটি রীতিমত বাচ্চাদের মতন কাঁদছিলো? আমি একটি ঢোক গিললাম। তার হাতটি নিজের মুঠোয় তুলে আঙুলের ভাঁজে ভাঁজে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলাম।
“আমি তোমার অতীত মুছতে পারবনা, না পারবো কোনোদিন তোমার যন্ত্রণা লাঘব করতে। যে সময় তুমি হারিয়েছ, সে সময় উদ্ধার সম্ভব নয়। তবে এটুকু জেনে রেখো, এইযে তোমার হাতটা ধরেছি, তুমি সরিয়ে না দেয়া অবধি কিন্তু আর ছাড়বো না! আমি জানি তুমি নিজেকে প্রকাশ করতে পারো না, অনুভূতি বুঝতে পারোনা কিংবা বোঝাতে পারোনা। আমি এটাও জানি, আজ তোমার মুখ ফুটে যা বেরিয়েছে তা তোমার সত্যিকার অনুভবের কিছু অংশ মাত্র! বাকি সবটাই তোমার বুকের ভেতর রয়ে গিয়েছি, যেটা তুমি কখনো বাইরে আসতে দেবেনা, আর এটাই তোমার স্বকীয়তা।”
জায়দান প্রথমবার লেক থেকে চোখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকালো। চেয়ে রইলো নিঃশব্দে। আমি অপর হাতটা তুলে তার গাল স্পর্শ করলাম। আদরমাখা আওয়াজে বললাম,
“এটুকু শুনে রাখো, তুমি যেমন, আমার তোমাকে তেমনি ভালো লাগে। এই রোবটিক জায়দানকে আমার তিন কবুল। তোমার ভালো, তোমার মন্দ, তোমার দোষ, তোমার গুণ, তোমার স্বভাব, তোমার বৈশিষ্ট্য সবটা মিলিয়েই একটা গোটা তুমি তৈরী হয়েছ। আর আমি এই ইমপারফেক্ট তুমিটার মায়ায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গিয়েছি। আর তুমি আমার মতন একটা রগচটা, বেয়াদব, বেহায়া, উশৃঙ্খল অথচ কেয়ারিং মেয়েটার মায়ায় পড়ে গিয়েছ। আমরা দুজন দুজনের গুণকে বরণ করেছি, ত্রুটিকে আগলে নিয়েছি। সুন্দর না ব্যাপারটা?”
আমার পিঠে জায়দানের শক্তিশালী হাতের ছোঁয়া ঠেকলো। পরক্ষণেই এক ঝটকায় কাছে টেনে নিয়ে আমার ফিনফিনে শরীরটা নিজের বুকের সঙ্গে মিশিয়ে ফেললো সে। অত্যন্ত আবেগ নিয়ে স্বামীকে পাল্টা জড়িয়ে ধরলাম আমি। তার পিঠজুড়ে আমার হাতের স্নেহ খেলে চললো, যেন শান্তনা দিলো এক পথহারা ক্লান্ত পথিককে। আমার ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে পরে রইলো সে। নীরবতায় অনুভব করলাম আমরা একে অপরকে, বেশ অনেকটা সময়। অতঃপর আমার খোলা চুলের নিজের লম্বাটে আঙুল বুলিয়ে নিয়ে জায়দান নরম গলায় বলল,
“আ’ম সরি, মাই ওয়াইফ।”
“সরি? কিসের জন্য?”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জায়দান উত্তর করলো,
“তুমি আমাকে অতীতে কিভাবে কষ্ট দিয়েছ, সেটা বলে তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য। সরি।”
বুকের ভেতরটা আবেগে ভরে উঠলো আমার। মৃদু হেসে আলিঙ্গন ভেঙে দুহাতের আজলায় জায়দানের মুখখানি তুলে নিলাম।
“আমি কষ্ট পেয়েছি ঠিকই। তোমার কথা শুনে নয়, তোমার কষ্ট দেখে। আর কখনো হয়ত এমন হবেনা, তবুও তোমায় আজ বলে রাখি। কক্ষনো এভাবে কাঁদবে
না, কক্ষনো না! তুমি জানো না, তোমার চোখের অশ্রু আমার বুকে শিলা হয়ে ঝরে। কাঁদো তুমি অথচ ক্ষতবিক্ষত হই আমি। আমাকে এমন করে আর ভুগিওনা, কেমন?”
জায়দানের কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“তোমার সবকিছু থেকেও কিছু ছিল না। তবে জেনে রেখো, এখন তোমার একটা সাবিন আছে। তোমার একাকীত্বে ভাগ বসাতে পৃথিবীতে আরো একটা মানুষ আছে। মনে রেখো, প্লীজ মনে রেখো মাই লাভ।”
চোখ বুঁজে আমায় অনুভব করলো জায়দান। পরক্ষণে আমার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে অত্যন্ত যত্নে আমায় আগলে নিয়ে বললো,
“আমার তুমি, তোমার আমি, এই পৃথিবীর চেয়েও দামী। আমার আর পৃথিবী চাইনা, আমার শুধু তোমাকে চাই, মাই ওয়াইফ।”
আবহাওয়া যত খারাপ হলো, বাতাস তত শীতল হলো। সেই শীতল বাতাসে আমাদের একে অপরের উষ্ণতার আলিঙ্গন হলো আরও গাঢ়। এই আলিঙ্গন শুধু কোনো আলিঙ্গন নয়, একে অপরের কাছে করা এক অমোঘ ওয়াদা।
***
তাকবীর হুসেইন আজ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না। খোলা বেডরুমজুড়ে পায়চারি করে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে তিনটি সিগারেট সমাপ্ত করলেও ভেতরের উত্তেজনা কিছুতেই কমছেনা। পুরোদমে এসি চললেও ঘেমে যাচ্ছেন তিনি। এর মধ্যেই বারকয়েক থামলেন দেয়ালের ফুল লেন্থ মিররের সামনে। নিজের সিল্কের রোব জড়ানো পেটানো শরীর দেখলেন বারংবার। সামান্য ভুঁড়ি বেরিয়ে গেলেও তা ঠিক খারাপ লাগছেনা। আঙ্গুল চালিয়ে কলপ দিয়ে কালো করে রাখা চুল পরিপাটি থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আঁচড়ালেন। বহুদিনের পালিত স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে তার আজ!
অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটলো। ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসা মৃদু সুঘ্রাণটি তার ভেতরের সবকিছু বুঝি উলোট পালট করে রেখে দিলো। দরজা খোলাই। নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে তিনি বাইরে তাকালেন। দেখা মিললো কাঙ্ক্ষিত রমণীর।
গাঢ় বেগুণী রঙের জর্জেট শাড়ী পরনে ভেতরে প্রবেশ করলেন লাস্যময়ী সাবিনা। বয়স পঞ্চাশের কোঠায় হওয়া সত্ত্বেও তার রূপ, লাবণ্যে কোনো খামতি নেই। উল্টো বয়সের সাথে সাথে বুঝি জেল্লা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাবিনাকে দেখলে বরাবর ওয়াইন নামের এক পানীয়ের কথা মনে পড়ে যায় তাকবীরের। যত দিন যায়, ওয়াইনের স্বাদ তত বাড়ে। একদৃষ্টে সাবিনাকে আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করে গেলেন তিনি, বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জা বাদেই।
সাবিনা তীর্যক হাসলেন। এগিয়ে এসে বেশ সহজাত ভঙ্গিতেই রীতিমত চোখ দিয়েই তাকে গিলে ফেলতে থাকা তাকবীরের বুকে হাতের আঙুল ছুঁয়ে বললেন,
“খুব বেশি অপেক্ষা করালাম না তো?”
শুষ্ক হাসলেন তাকবীর। সাবিনার হাতটা বুক থেকে তুলে নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে জবাব দিলেন,
“এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছি! এই কয়েকটা ঘণ্টা তার সামনে নস্যি।”
ঝুঁকে এলেন সাবিনা। তার শরীর থেকে ভেসে আসা তীব্র বেলীর সুবাস তাকবীরকে মাতোয়ারা করে তুললো। কারোর শরীরের ঘ্রাণেও যে মাতাল হওয়া সম্ভব, সেটা সাবিনার সঙ্গে দেখা না হলে তিনি কোনোদিন বুঝতেই পারতেন না।
সাবিনা চতুর দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকালেন, জড়ানো গলায় বললেন,
“মাসুমা?”
তাকবীরের ঠোঁটে বিস্তৃত এক হাসি ফুটলো।
“ভাগ্নের বিয়ে, লন্ডনে গিয়েছে। তাছাড়া ও থাকলেও যে খুব ক্ষতি হতো, তা কিন্তু নয়। তোমার কি মনে হয়, আমি ওকে ভয় পাই? আমার সামনে ও তটস্থ থাকে, একেবারে বিড়ালছানার মতন।”
সাবিনার মুখের দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে তাকবীর যুক্ত করলেন,
“আমার যা চাই, তা আমি হাসিল করেই ছাড়ি। এই যেমন, তোমাকেও করলাম। ছেলে ছোকরাদের মতন বলি, মাই সুইটহার্ট!”
মুচকি হাসলেন সাবিনা। পরক্ষণে হেঁটে গিয়ে সামনের কফি টেবিলে রাখা বরফের বাকেট থেকে হুইস্কির বোতল তুলে দুইটি গ্লাসে ঢেলে নিলেন। তাকবীর ধৈর্য্য ধরে দেখলেন। এই রমণীর প্রতিটি কার্যক্রম তার অন্তরে নাড়া দেয় বারবার। একটি গ্লাস তাকবীরের হাতে দিয়ে তাতে নিজের গ্লাস ছুঁয়ে সাবিনা বললেন,
“চিয়ার্স!”
“চিয়ার্স টু আস, সুইটহার্ট!”
গ্লাস ঠোঁটে ঠেকিয়ে ঢকঢক করে সম্পূর্ণটা গিলে ফেললেন তাকবীর। অতঃপর সেটি টেবিলে রেখে ঠোঁট মুছে নিলেন হাতের উল্টোপিঠে। আর সহ্য করতে পারলেন না, ভেতরের আগুন জ্বলে উঠেছে দাবানলের মতন। সাবিনা নিজের হুইস্কি অর্ধেকও শেষ করতে পারলেন না, এর আগেই তাকবীর এগিয়ে এসে ধাক্কা দিয়ে তাকে বিছানায় ফেলে দিলেন। কাঁচের গ্লাস মেঝেতে পরে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেলো। পরোয়াই করলেন না তাকবীর। হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এলেন সাবিনার উপর। এক হাতে টেনে শাড়ীর আঁচল সরিয়ে ফেলে মুখ ডোবালেন ঘাড়ে। খিলখিল করে হেসে উঠে তার পিঠ খামচে ধরলেন সাবিনা।
“সবুর সিংহ, সবুর। সবুরে মেওয়া ফলে।”
“মেওয়া আমি বহু খেয়েছি। এবার আমার শুধু তোমার মধু চাই, সাবিনা মাই সুইটহার্ট!”
মিনিটখানেকের মাথায় সাবিনার উন্মুক্ত কাঁধে ঠোঁট বোলাতে বোলাতেই তাকবীরের শরীরটা ভারী হয়ে ঢলে পড়ল। অবশেষে বুকের ভেতর চেপে রাখা নিঃশ্বাসটা ফেলে অত্যন্ত ঘৃণায় শরীরটা ধাক্কা দিয়ে নিজের উপর থেকে সরিয়ে উঠে বসলেন সাবিনা। তাকবীরের চোখজোড়া বন্ধ, গভীরতম ঘুমে আচ্ছন্ন সে। নাকের কাছে আঙুল নিয়ে, গালে থাপ্পড় দিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সাবিনা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। রুমে ঢোকার সময়ই চোখ বুলিয়ে দেখে নিয়েছেন সব।
একপাশে, দেয়ালের সঙ্গে লাগোয়া ক্যাবিনেটের উপর ম্যাকবুক এবং তিনটি স্মার্টফোন। সবকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অগোছালো ভাবে। সেদিকে এগিয়ে ম্যাকবুক ল্যাপটপটি খুললেন সাবিনা। নিজের শাড়ীর কুচির ভেতরে, কোমরের দিকে গোঁজা পুঁটলি থেকে পেনড্রাইভ বের করে নিলেন। ছোট্ট ডিভাইসটি পোর্টালে ঢুকিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালেন। দুই মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাচ্ছে বুঝি কেউ তার। ঘেমে যাচ্ছেন। বারবার ফিরে ফিরে তন্দ্রাচ্ছন্ন তাকবীরকে দেখছেন তিনি।
অবশেষে যখন দুই মিনিট পূর্ণ হলো, নিজের ব্যাগ থেকে ফোন বের করে নির্দিষ্ট নাম্বারটিতে মেসেজ করলেন,
—পাইসো, আব্বাজান?
—পারফেক্টলি ডান। গুড জব, আম্মু।
মৃদু হেসে ফোন রেখে পেনড্রাইভ খুলে নিলেন সাবিনা। ল্যাপটপ পুনরায় যেমন ছিল তেমনটা রেখে তিনি চলে এলেন বিছানায়। ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের শাড়ীর আঁচল খুলে, ব্লাউজের ভাঁজ এলোমেলো করে তিনি শুয়ে পড়লেন তাকবীরের ধার ঘেঁষে। এখন শুধু এই বান্দার জেগে ওঠার অপেক্ষা। উঠে গেলে কিছুই মনে করতে পারার কথা নয়। যদিও বা করে, সামলানোর জন্য তিনি তো আছেনই।
লোকটার মুখটা দেখতে দেখতে সাবিনার বারকয়েক ইচ্ছা হলো ফ্লোরে ভাঙা কাঁচের টুকরো তুলে এনে বু*ক বরাবর বসিয়ে দিতে! অথচ তিনি কিছুই করলেন না। এখনি নয়! ধৈর্য্য ধরতে হবে তাকে! অত্যন্ত ঘৃণায় তাকবীরের ঘুমন্ত লালায়িত জন্তুর মতন মুখটা দেখতে দেখতে তিনি আপনমনে বিড়বিড় করলেন,
“নারী আর নেশার সামনে পুরুষ আসলেই আহাম্মক হইয়া যায়!”
***
কেটে গিয়েছে বেশ কিছুদিন।
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। ক্যাফে থেকে মাত্রই বাসায় ফিরেছি আমি। এতটা ক্লান্তি লাগছে আজ যে বলে বোঝানোর মতন নয়। বিয়ের সিজন শেষ, এখন কর্পোরেট সিজন শুরু। বিশাল বিশাল অর্ডার কভার করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাজের বাইরে কিছু চিন্তায় রাখাটাই দুষ্কর হয়ে উঠতে দিনদিন। তার উপর মীরার পরীক্ষা, সেমিস্টার ড্রপ দিয়েছে সে। আমি আগ বাড়িয়ে দায়িত্ব বাড়িয়ে নিয়েছি নিজের উপর।
খাবার খাওয়ার মতন ইচ্ছাটুকুও আজ নেই। এসে কোনোমতে বাইরের কাপড় পাল্টে চেয়ারে ঝুলতে থাকা একটা টি শার্ট গায়ে জড়িয়ে বিছানায় লাফিয়ে পড়েছি। টি শার্টটা আমার নাকি তাও খেয়াল করিনি। চেনা চেনা গন্ধ আসছে, জায়দানের শরীরের সুঘ্রাণ। নিজের গায়ে সেটি জড়িয়ে অতি আরামে আমি পাড়ি দিলাম ঘুমের জগতে।
ঠিক কতক্ষন ঘুমিয়েছি আমি জানিনা। কানে অতি মৃদু কিছু শব্দ যাচ্ছে। ওঠার জন্য যথেষ্ট না হলেও চোখ পিটপিট করে তাকালাম আমি। কম্বল সরিয়ে সামান্য ফাঁক করে দেখলাম বাইরে।
বেডরুমে ল্যাম্পশেডের অতি মৃদু হলদেটে আলো জ্বলছে। আবছায়া আলো আঁধারির মাঝে দেখলাম, ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। কোটের কাফলিংক খুলছে। মাত্রই বাহির থেকে ফিরেছে। আজ ভার্সিটির বোর্ডের একটা মিটিং ছিল, সভাপতি হয়ে তাকে পরিচালনা করতে হয়েছে বিধায় এতটা দেরী। নাহলে বেশিরভাগ সময় আমার আগেই সে বাসায় চলে আসে। নতুবা বাইক নিয়ে ক্যাফেতে চলে যায়। আমার কাজ শেষে একসঙ্গে বাসায় ফিরি আমরা।
জায়দানকে দেখে কেন যেন আমার ঘুম এবং ক্লান্তি দুটোই উড়ে গেলো। একদৃষ্টে পর্যবেক্ষণ করলাম সবকিছু, লোকায়িত দৃষ্টিতে। স্বামী আমার ধীরে ধীরে নিজের কোট খুলে সুন্দরভাবে হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে ক্লোজেটে রাখলো। ভীষণ গোছালো সে। ঘরের একটাও জিনিস কখনো এদিক সেদিক থাকেনা। আমি সবকিছু এলোমেলো করি এবং সে সেসব গুছিয়ে রাখে। এটাই আমাদের কাজ। হাতঘড়ি এবং টাই খুলে যাওয়ার পর গায়ের খয়েরী শার্টের বোতাম ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করলো জায়দান। এই মুহূর্তটাও এসে কেন যেন আমার বুকের ভেতর ধুকপুক করতে লাগলো। কম্বলের আড়াল থেকে চোখ বের করে অতি উৎসাহ নিয়ে আমি দেখতে লাগলাম।
কিছু সেকেন্ডের মধ্যেই শার্টটা খুলে যেতেই বস্ত্রটি তার কাঁধ বেয়ে নেমে এলো। উন্মুক্ত হলো প্রশস্ত পিঠ। মসৃণ ত্বকে অতি পাতলা রোমের আস্তরণ। মাংসপেশীর খাঁজে খাঁজে শক্তিশালী ভাঁজ। কোমরের দিকটায় ছড়ানো বেশ কয়েকটি কালো চুকচুকে তিল। শক্ত একটি ঢোক নেমে গেলো আমার কন্ঠ বেয়ে পাকস্থলীতে। জায়দানকে উদাম গায়ে বেশ কয়েকবার দেখেছি আমি। তবে কখনো এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করিনি। আজ কেন করছি? জানিনা! সম্মোহিত হয়ে গিয়েছি বুঝি।
শার্ট খুলে লন্ড্রি বাস্কেটে রেখে জায়দান ঘুরলো। এবার দৃশ্যমান হলো তার সমস্ত বুক। প্রশস্ত বুকটা মাংসল। সবসময় ঢিলেঢালা পোশাক পড়ায় বোঝা যায়না। সিনেমার হিরোদের মতন কোনো অকল্পনীয় সিক্স প্যাক নেই, একেবারে চাপা খাঁজকাটা মেদহীন উদর। বুকের মাঝখান বেয়ে নেমে গিয়েছে অত্যন্ত সরু – ক্ষীণ এক রোমশ রেখা, উদর বেয়ে নেমে তা আড়াল হয়ে গিয়েছে কোমরের আরো নিচে যা প্যান্টের কারণে দেখা যাচ্ছেনা। এবার আমার মুখটা টুকটুকে লাল হয়ে উঠল। কম্বলের ভেতর ভীষণ গরম লাগছে! ঘেমে যাচ্ছি। অথচ সরাতে পারছিনা, সরালেই ধরা পড়ে যাব যে!
জায়দানের কোনদিকে বিশেষ মনোযোগ নেই। বাদামী চোখজোড়া চারকোনা নতুন চশমার আড়ালে জ্বলজ্বল করছে। নিজের প্যান্টের দিকে হাত বাড়ালো সে। লম্বাটে আঙুলগুলো বেল্টের বাকল খুলতে লাগলো। ধাতব শব্দটা কানে যেতেই আর সহ্য করতে পারলাম না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তড়াক করে উঠে বসলাম বিছানায়। হঠাৎ এভাবে জ্যান্ত ম*রাকে উঠে বসতে দেখে মাঝপথে থেমে গেলো জায়দান। সে কোনো প্রশ্ন করার আগেই আমি বলে উঠলাম,
“এই বাসায় তিনটা বাথরুম আর একটা গেস্ট বাথরুম আছে, ইন কেইস ইউ ফরগট!”
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো জায়দান। পাল্টা প্রশ্ন করলো,
“তুমি ঘুমাওনি?”
“ঘুমাতে আর দিলে কোথায়?”
জায়দানকে খানিকটা বিহ্বল দেখালো। আমি ঝাঁঝ দিয়ে বললাম,
“আমার সামনে একদম খালি গায়ে ঘুরঘুর করবে না, অসভ্য!”
আমার কথায় ভ্রু তুলে নিজের দিকে চেয়ে পরক্ষণে আবার ফিরে দেখল জায়দান।
“তুমি আমাকে এভাবে আগেও অনেকবার দেখেছ। আজ এত রিয়্যাক্ট করছো কেন?”
“আগে তোমাকে পছন্দ করতাম না, এখন করি।”
“তো?”
চোয়াল ঝুলে পড়লো আমার। ভ্রু কুঁচকে খেঁকিয়ে উঠলাম,
“বত্রিশ বছরের পাঠা কোথাকার! ফিডার খাও? বোঝো না কিছু?”
জায়দান প্রশস্ত বুকে শক্তিশালী দুবাহু বেঁধে চশমার ওপাশ থেকে আমায় দেখলো। তার ঠোঁটে সামান্য একটুখানি হাসির রেখা ফুটলো,
“বুঝিয়ে বললেই হয়। আমি নিজের ঘরে খালি গায়ে ঘুরলে তোমার কি সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা! আমার ফিলিংস এসে যায়!”
প্রথমটায় খানিকক্ষণ আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো জায়দান। পরমুহুর্তে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি আটকে মাথা কাত করে উচ্চারণ করলো,
“কেমন ফিলিংস?”
“তোমার উপর হায়েনার মতন ঝাঁপিয়ে পড়ার ফিলিংস!”
রাগে গজগজ করে উঠলাম। জায়দান মাথা ঝাঁকিয়ে বাঁকা হেসে বললো,
“উঁহু উঁহু উঁহু, মাই ওয়াইফ! দুই দুইবার ঠকেছি। তৃতীয়বার আমাকে ঠকাচ্ছো না তুমি! গট ইট?”
ততক্ষণে আমি নিজেও জানিনা আমার মুখটা কতখানি লালচে হয়ে গিয়েছে। কান দিয়ে রীতিমত ধোঁয়া বেরোচ্ছে। লাফিয়ে নেমে পড়লাম বিছানা থেকে। সরাসরি এগোলাম জায়দানের দিকে। বান্দা সরলো না। বরং বিরাট আগ্রহ নিয়ে আমার প্রতিটা পদক্ষেপ দেখলো। তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। ভ্রু তুলে কর্কশ গলায় বললাম,
“ডোন্ট কমপ্লেইন দ্যাট আই ডিড নট ওয়ার্ন ইউ।”
“ওয়ার্ন অ্যাবাউট হোয়া…উমমম!”
জায়দানের কোমরে দুহাত রেখে সজোর টানে তাকে নিচে ঝুঁকিয়ে এনেই ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে ফেললাম আমি। স্থির হয়ে থাকলো সে। কয়েক সেকেন্ড শুধু। পরপরই আমার চারপাশে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো নিজের বাহুজোড়া। বুকের ভেতর চেপে ফেললো একেবারে। ঠোঁটের স্বাদ আস্বাদন করতে করতে মাঝপথে থেমে চশমাটা খুলে নিলো সে। ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে আমার ঘাড়ে হাত রেখে মুখটা তুলে অধরে অধর ছুঁয়ে ফিসফিস করল,
“আর তুমি যে আমার টি শার্ট পরে ঘুরঘুর করো, আমি কি একবারও বলেছি তোমাকে জাস্ট…”
“আমাকে জাস্ট?”
আমার মুখটা নিজের প্রশস্ত তালুতে চেপে জায়দান গুঙিয়ে উঠলো,
“খেয়ে ফেলতে ইচ্ছা হয়।”
_________চলবে_________

