সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৪৬

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৬

“তুই এখন আর ক্লাবে আসিস না কেন মামুর ব্যাটা?”

ফোনের ওপাশ থেকে বন্ধুর কথা শুনে কপাল ঘষতে ঘষতে আয়দান উত্তর করলো,

“তেমন কিছু না। জাস্ট ভালো লাগেনা।”

“তোর? মেয়ে মানুষ ভালো লাগেনা? মদ ভালো লাগেনা? কবে থেকে রে?”

আয়দান উত্তর করার আগে থেকেই বন্ধু তার আবারো বললো,

“আচ্ছা যা বাদ দিলাম। আজকে রাতে আমার ফ্ল্যাটে পার্টি আছে। খাসা মাল। ঐযে, মোনালিসাদের গ্রুপ আসবে। একেবারে ইমপোর্টেড মালও রেডি। চলে আসিস।”

“আমি আসবো না।”

শক্ত গলায় জবাব দিলো আয়দান। তাতে ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা ভর করল। অতঃপর ভেসে এলো,

“রিউমার তাহলে সত্য। তুই হুজুর হয়ে গিয়েছিস।”

ফোনটা শক্তভাবে চেপে আয়দান কঠোর কন্ঠে বললো,

“হুজুর হয়ে গিয়েছিস, কথাটার মানে কি? কেউ ধর্ম চর্চা করতে গেলেই তোরা এমন ট্যাগ দিস কেনো?”

“আরে চিল চিল দোস্ত। কথার কথা বললাম। আমাদের লিডার তো তুই ছিলি। এখন লিডারহীন অসহায় হয়ে গেলাম না আমরা?”

একটি নিঃশ্বাস ফেলে আয়দান ব্যক্ত করলো,

“দেখ, মানুষের জীবন সবসময় একভাবে চলেনা। যদি আমাকে লিডার হিসাবে মেনেই থাকিস, তবে অনুরোধ থাকবে, যদি পারিস ওখান থেকে ফিরে আসিস।”

“জানতাম। জ্ঞানের শরবত আমাদের উপরেও ঢালতে শুরু করবি। তাই ফোন দিতে চাইনি। নেহায়েত মিস করছিলাম। শোন, ওসব জ*ঙ্গিদের পথ ছেড়ে আয় বুঝেছিস? নাহলে পস্তাবি।”

এবার না পারতে হেসে ফেলল আয়দান। বন্ধু তার হতবাক হয়ে শুনল ওই হাসির আওয়াজ। মাথা ঝাঁকিয়ে ফোনটা কানে আরো শক্তভাবে চেপে হাসতে হাসতেই আয়দান বললো,

“জাস্ট বিকজ আমি মেয়ে ছেড়েছি, মদ ছেড়েছি আর নামাজ ধরেছি, তাই আমি জ*ঙ্গি হয়ে গেলাম? ওয়াও! হোয়াট আ লজিক, ম্যান!”

নীরবতা। আয়দান নিজের কথার পিঠে যুক্ত করলো,

“স্টেরিওটাইপ থেকে বেরিয়ে আয়, দোস্ত। জ*ঙ্গি তোর আমাকে তখন বলা দরকার ছিলো, যখন আমি মেয়েবাজি করতাম, বাপ মায়ের টাকা উড়িয়ে পার্টিতে বিলাতাম। কিন্তু না, তখন আমি ছিলাম কুল ব্যাড বয়! জ*ঙ্গি তারা দোস্ত, যাদের ইশারায় নাচছে গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। শিং দেখে আর শয়তান চেনা যায়না, শয়তান এখন স্যুট বুট পড়ে।”

“তুই খুবই দার্শনিক লেভেলের কথা বলছিস।”

“তাই নাকি? হয়ত জীবনের গন্ডির বাইরে বেরিয়ে ভাবতে শিখেছি তাই।”

“জীবনের বাইরে কি আছে?”

“জীবনের বাইরে কি আছে, এই প্রশ্নের উত্তরটা যেদিন ধরতে পারবি, সেদিন তুই স্রষ্টার মন জয় করে ফেলবি। রাখি দোস্ত, আল্লাহ হাফেজ।”

ফোনটা কেটে দিলো আয়দান। চেয়ারে হেলান দিয়ে একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। লম্বা ঝাঁকড়া হয়ে আসা চুলে আঙুল চালিয়ে আপনমনে খানিকটা সময় নিয়ে সে ভাবলো, এই নগরে খারাপ হওয়া কতটা সহজ এবং ভালো হওয়া কতটা কঠিন! সুদ- ঘুষ নেয়ার সময় সমাজ পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে। অথচ সৃষ্টিকর্তার অনুসরণে গেলে বলবে জ*ঙ্গি, এক্সট্রিমিস্ট। এটাই এখনকার পৃথিবী, এটাই বর্তমান জগতের নিয়ম। স্রোতের বিপরীতে চলতে গিয়ে সবটাই একটু একটু করে আবিষ্কার করছে আয়দান।

মাথা ঝাঁকিয়ে সমস্ত চিন্তা ঝেড়ে সে হাতের একটা বইয়ে মনোযোগ দিলো। টেবিলে স্তূপ করে রাখা আছে আরও কিছু। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী স্কলারদের প্রকাশিত বই এগুলো। অনেক কিছু আয়দান পড়ছে, জানছে, শিখছে। কিন্তু কোনকিছুই অন্ধের মতন বিশ্বাস করছেনা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে গিয়ে এসব বিখ্যাত স্কলারদের বদ্ধমূল কিছু ধারণার বিপক্ষে তার মনে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। সে ঠিক করেছে, কোরআন পড়ার আগে সে আরবী ভাষা শিখবে। পড়ে তো সকলেই, বোঝে কয়জন? অন্যান্যদের তর্জমা? উঁহু, সে নিজে সবকিছুর ধারণা গড়তে ইচ্ছুক।

ইদানিং আরো একটা দারুণ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়। মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছা হয় তার। সেখানে গিয়ে নিজের মতন করে অনেক কিছুই করতে পারবে সে। একটা সময় মনে হতো, পড়ালেখার দরকার নেই। বাবার কোম্পানিতেই বসবে সে। কিন্ত এখন মনে হয়, নিজের জ্ঞানের জগৎটাকে আরো সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন। তবে জেসমিনের থেকে এই মুহূর্তে দূরে গেলে সবকিছু কিভাবে সামলানো যাবে এই ভয়টাই তাকে ঘরে বেঁধে রেখেছে।

বইটা রেখে আনমনে সে ফোনটা হাতে নিলো আবার। ইদানিং ওই ডিভাইসটা খুব বেশি ব্যবহার করা হয়না। আগে ঘণ্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো। যেন অন্তরের তাড়নায় গ্যালারিতে ঢুকলো সে। এখানে একটামাত্র ছবি আছে তার অতীতের। সেটাই ওপেন করলো। চোখের সামনে ভেসে উঠল ওই অপরূপার মুখখানি।

মীরা। ক্যাফের বাইরে দূর থেকে তুলেছে সে এটা বেশ কিছুদিন আগে। এখনো আয়দান সপ্তাহে একবার দুবার ক্যাফের আশেপাশে ঘুরঘুর করে আসে। এটা মীরাও জানে। কিন্তু কোনোদিন সে আর আয়দানকে কিছু বলেনি। না তো তার উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে। মীরার মাঝেও খানিকটা পরিবর্তন এসেছে। মেয়েটা শুরু থেকে মার্জিত ছিল। সালোয়ার কামিজেই তাকে দেখা যেতো বেশি। একদম বাংলাদেশী রমণী। তবে ইদানিং সে হাল ফ্যাশনের অনুকরণে হিজাব ব্যবহার করা শুরু করেছে। প্রথমে শুধু ওড়না মাথায় দিয়ে রাখতো। আজকাল দেখা যায় পিন দিয়ে সুন্দর করে সতর ঢেকে আটকে আসে। সেই হিজাব এবং বড় জামা পরনে একটা ছবিই আয়দান তুলেছে। রাণী গোলাপী বর্ণে মেয়েটিকে দেখাচ্ছে মিষ্টি এক পরীর মতন। আয়দানের ঠোঁটে অস্ফুট এক হাসি ফুটে উঠল। বৃদ্ধাঙ্গুলি ছুঁয়ে দিলো সে ছবিতে।

“তোমার ক্ষমার অপেক্ষা আমায় আজীবন বাঁচিয়ে রাখুক, মীরা।”

বিড়বিড় করল সে। বুকের ভেতর কেমন একটা আবেগের ঢেউ উঠলো। চোখ বুঁজে নিলো সে সঙ্গে সঙ্গে। যখন চোখজোড়া খুললো, তখন বাদামী মণিজুড়ে টলটলে পানির রেখা। অশ্রু গড়াতে দিলোনা আয়দান। মোবাইলটা নিজের বুকে চেপে বেশ অনেকটা সময় বসে রইলো। অতঃপর হাতের উল্টোপিঠে চোখ মুছে নিয়ে মীরার একমাত্র ছবিটাও নিজের ফোন থেকে ডিলিট করে দিলো।

“ভাইজান, আপনাকে ম্যাডাম ডাকতেছে।”

মৃদু কণ্ঠটি আয়দানকে বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনল। মাথা ঝাঁকিয়ে সে ফোন রেখে ফিরে তাকালো। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রোজিনা। ভ্রু তুলে আয়দান বললো,

“আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি যাও, আমি আসছি।”

মাথা নেড়ে রোজিনা চলে যেতে যেতে ভাবলো, আগে তুই তুকারি করা ছেলেটা তাকে ইদানিং তুমি করে ডাকা শুরু করেছে। কথায় ঝাঁঝও বেশ কমে গিয়েছে। রোজিনার সঙ্গে দরকারে যেটুকু কথা বলে, তাতে ভদ্রতা থাকে। জায়দান হলে ঠিক ছিল। কিন্তু এই বাড়ির দস্যু ছোট ছেলেটা একদিন এমন হতে পারে সেটা রোজিনা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারেনি।

রোজিনা চলে যেতেই আয়দান নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে নেমে এলো। গোটা বাড়ি নিস্তব্ধ। ফাঁকা ফাঁকা। প্রাণহীন। এই বাড়িতে দম বন্ধ লাগে তার। শুধুমাত্র নিজের পিতামাতার মুখ চেয়েই সে পরে আছে। নাহলে হয়ত বাড়ি ছেড়ে বহু দূরে কোথাও গিয়ে ঘাঁটি গাঁড়ত। যাযাবরের জীবনটা তাকে বেশ টানে।

জেসমিনের কক্ষটা অন্ধকার। দিনের বেলায়ও ভারী পর্দা নামানো থাকে। জেসমিন কাউকে পর্দা সরাতে দেন না। আঁধারের জীব যেন। ওইদিন জায়দানের বাসা থেকে ফিরে আসার পর থেকে জেসমিন নিজেকে ঘরবন্দী করে ফেলেছেন। কোথাও যান না, কিছু করেন না। আগের মতন আয়দান কি করছে, খেয়েছে নাকি ঘুমিয়েছে এসব দিকেও তার খেয়াল নেই কোনো। আয়দান নিজের, জাফর, রোজিনা এমনকি রোজিনার বৃদ্ধা মা যে শুরু থেকেই জেসমিনের পাশে ছিল, এখন বয়সের কারণে আর কাজ করেন না, তিনি অবধি বেশ কয়েকবার এসে জেসমিনকে শান্তনা দিয়ে গিয়েছেন। অথচ লাভ হয়নি। তিনি ঘর থেকে বের হন না। কেউ গেলেও পছন্দ করেন না। আয়দান জবরদস্তি করে ঢুকে কয়েকবেলা খাবার খাওয়ায়।

আজও ঢুকলো সে। অন্ধকারে চোখ সয়ে আসতেই দেখলো একদম টানটান গোছানো বিছানার একপাশে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন জেসমিন। তাকে দেখতে অন্যরকম লাগছে। শাড়ীর আঁচল লম্বা হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে বিছানায়। কোকড়ানো লম্বা চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে গেছে কাঁধের চারপাশে। নীরবে তিনি চেয়ে আছেন আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া নিজের অবয়বের দিকে। জেসমিনের চেহারা এখনো বেশ সুন্দর। বয়সের ভাবটা বোঝা গেলেও কেমন স্নিগ্ধ একটা মা মা প্রভাব আছে। যুবতীকালে আগুন সুন্দরী না হলেও নেহায়েত কম কিছুই ছিলেন না তিনি। অ্যালবামের ছবিতে তাই দেখেছে আয়দান। নিজের মায়ের দিকে এগোলো সে পায়ে পায়ে।

“মাম্মি? কি খবর, বলো?”

কোনো জবাব এলোনা। আয়দান আরো কয়েক পা এগিয়ে শুধাল,

“ক্ষুধা লেগেছে? রোজিনাকে দুপুরের খাবারটা দিতে বলি? আমার হাতে খাবে।”

“কিছু লাগবে না। আমার পাশে এসে একটু বসো, আয়দান।”

পারতপক্ষে জেসমিন কখনো আয়দানকে ‘তুমি’ করে ডাকেন না। তুই করেই ডাকেন, ডাকতেন। তুমি বলতেন তিনি জায়দানকে। তাই এই ব্যাপারটা অবাক করলো আয়দানকে। তবে নিজের কৌতূহল চেপে জননীর পাশে বসে গেলো সে। একটি হাত জেসমিনের হাঁটুর উপর রাখা হাতে রাখলো।

“বলো, আম্মু।”

“আমাকে আম্মু ডাকবে না। ও ডাকতো। তুমি মাম্মি বলো, সেটাই ঠিক আছে।”

“আচ্ছা, ডাকবো না। বলো, মাম্মি।”

“তোমাকে একটা প্রশ্ন করব।”

“করো।”

“আমি কি ভুল?”

আয়দান মোলায়েম হাসলো। নিজের মায়ের হাতটা চেপে জবাব দিলো,

“মায়েরা কখনো ভুল হয়না।”

“একদম। আমিও সেটাই ভেবে বের করেছি। আমি ভুল না।”

“তুমি আমার মা হিসাবে ভুল নও। কিন্তু বড় ভাইয়ার মা হিসাবে ভুল। কারণ তুমি তার মা হতে পারনি, মাম্মি।”

ঝটকা মতন খেলেন বুঝি জেসমিন। আয়দান শুধু কাঁপুনি টের পেলো তার শরীরের।

“আমরা কেউই ওর পরিবার হতে পারিনি। এটা ওর সফলতা এবং আমাদের ব্যর্থতা।”

জেসমিন আর কিছুই বললেন না। নড়লেন না। কতক্ষণ যে মায়ের পাশে চুপচাপ বসে থাকলো আয়দান, হিসাব করতে পারলোনা। অনেকটা সময় বাদে নীরব ঘরে এসে ঢুকলেন জাফর। কোম্পানি থেকে এসেছেন, পরনের কোট বুটে স্পষ্ট। তিনি এখন আর বিজনেস ট্রিপে মাসের পর মাস কাটিয়ে আসেন না। বাড়িতেই থাকেন। আয়দানকে দেখে তিনি খানিকটা অবাক হলেও মন্তব্য করলেন না। নীরবে এসে বিছানার একদম এক কোণায় বসলেন, মা ছেলের থেকে বহু দূরে। তারপর বললেন,

“ফোন করে ডাকলে। আমায় কি বলতে চাও, জেসমিন?”

জেসমিন দীর্ঘক্ষণ উত্তর করলেন না। অতঃপর তার কন্ঠ থেকে ধ্বনিত হলো,

“লেটস গেট ডিভোর্সড, জাফর।”

***
মিটিংরুমজুড়ে পিনপতন নীরবতা। শুধুমাত্র হোস্টের কন্ঠস্বর ধ্বনিত হচ্ছে মাইক্রোফোনে। পিছনের প্রজেক্টরের স্ক্রীনে পাই চার্ট ভেসে আছে, সঙ্গে টেন্ডারের সকল তথ্য। সেগুলো ইংরেজি ভাষায় অত্যন্ত দক্ষভাবে ক্লায়েন্টদের সামনে উপস্থাপন করছে হোস্ট ছেলেটা। তাকবীর লম্বা টেবিলের প্রধান চেয়ারে বসে সবটা দেখছেন। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। এটা তার জীবনের সর্ববৃহৎ ডিল হতে চলেছে।

কিছুদিন আগেই ফ্রান্সের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে তার কোম্পানি। যে সে কোনো প্রজেক্ট এটি নয়, রীতিমত হাজার কোটি টাকা মূল্যের সোনার হরিণ! একবার যদি এই ডিল সফল হয়ে যায়, তাহলে তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হবেনা। তরতর করে বাড়বে কোম্পানি, বাড়বে প্রভাব প্রতিপত্তি। হাজার কোটি টাকার মাইলস্টোন ছুঁয়ে গেলে বাংলাদেশের টপ একজন ব্যবসায়িক টাইকুনে পরিণত হয়ে যাবেন তিনি। সেই স্বপ্নটাই তো বুনে এসেছেন আজীবন! অভিজাত মহলের সিংহাসনে বসে হুকুমের ছড়ি ঘোরাবেন। আগের মতন ছোট ভাইয়ের চাকরগিরি করতে হবেনা বড় ভাইকে। ঠিকই তো! তাকদীর তো তাকে নিজের চাকরই মনে করতো! ওই তাকদীর হুসেইনের থেকে তার প্রাপ্যতা অনেক অনেক বেশি!

ফ্রান্স থেকে আসা ফরাসি প্রতিনিধিরা টেবিলের একপাশে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সবকিছু শুনছে এবং দেখছে। হোস্ট প্রজেক্টরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছে,

“আমরা প্রফিট মার্জিন বাড়াতে চাইলে বাংলাদেশের এই স্থানগুলোর কনজিউমারদের টার্গেট করতে পারি। কারণ এদেশে মানুষ দেশী প্রোডাক্টের থেকে বিদেশী প্রোডাক্ট বেশি পছন্দ করে। সেক্ষেত্রে আমরা কনজিউমারদের….”

হোস্ট মাঝপথেই থেমে গেলো। প্রজেক্টর স্ক্রীনে কেমন যেন ডিস্টার্বেন্স দেখা দিচ্ছে। গ্লিচ হচ্ছে। ভ্রু কুঁচকে তাকবীর তৎক্ষণাৎ অদূরে নিয়ন্ত্রণ প্যানেলে থাকা কর্মীর দিকে তাকালেন। হুমড়ি খেয়ে পড়ল বেচারা ল্যাপটপের উপর। তাকবীর খানিকটা হেসে ডিলারদের বোঝাতে চাইলেন,

“সরি। টেকনিক্যাল ফল্ট। আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।”

“ল্যাপটপ কাজ করছেনা।”

একজন ছুটে এসে তাকবীরের কানে ফিসফিস করে জানালো। তিনি নড়েচড়ে বসলেন। কোনমতে নিজের রাগ লুকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে মৃদু আওয়াজে বললেন,

“কাজ করছেনা মানে কি?”

“ল্যাপটপ নিজে নিজেই চলছে!”

“নিজে নিজে চলছে!”

তাকবীর কথাটা শেষ করতেই আঁতকে ওঠার ধ্বনিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল গোটা মিটিং রুম। ডিলার সকলে বি*স্ফারিত দৃষ্টিতে দেখছে স্ক্রীন। তাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই তাজ্জব বনে গেলেন তাকবীর।

সমস্ত স্ক্রীনজুড়ে ভাসছে তার নিজের একটি ছবি। সেই ছবির উপর লাল কালিতে লেখা একটি বাক্য জ্বলছে নিভছে। ঠিক যেন লাল টকটকে বিপদসংকেতের সাইরেন।

॥আই অ্যাম আ মা*র্ডারার॥

একেবারে অতর্কিতে বেজে উঠলো সাইরেন। পুলিশের সাইরেনের মতন! সমস্ত মিটিং রুম কেঁপে উঠলো। কয়েকজন তো সইতে না পেরে ভয়ে চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে পড়ল চিৎকার করতে করতে। সমস্ত মিটিংরুম ভরে গেলো বিশৃঙ্খলায়। তাকবীর তখনো হতবাক হয়ে দেখে গেলেন স্ক্রীন এবং তাতে ভাসা বাক্যটি।

কিছুক্ষণ পর।

নিজের কেবিনের প্রত্যেকটা জিনিসপত্র এদিক সেদিক ছুঁড়ে নিজের রাগ ঝেড়েছেন তাকবীর। কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, এমন ভয়ানক অনুভূতি হচ্ছে তার। কোনমতে ডিলারদের কিছু একটা বুঝিয়ে সরানো হয়েছে ঠিকই। কিন্তু তিনি নিশ্চিত, এই ডিল আর তার কপালে জুটছে না। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো কখনো কাঁচা কাজ করেনা। তবে ডিলের থেকেও বড় চিন্তা এখন তার সন্মান এবং রেপুটেশন। আজ মিটিংরুমে যা হয়েছে, তা যদি কোনভাবে ফাঁস হয়ে যায় তাহলে সবকিছু শেষ! তার তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রত্যেকটা জিনিস এক ঝটকায় ধুলিস্যাৎ হয়ে যাবে।

“স্যার, আপনি…চিন্তা করবেন না। ব্যাপারটা আমরা সামলাচ্ছি। বিপরীত দিকের চক্রান্ত এবং গুজব সবকিছুই। ওনারা নিশ্চয়ই বুঝবে বড় বড় মানুষদের কত শত্রু থাকে।”

অ্যাসিস্টেন্ট লোকটা বলতেই তাকবীর খেঁকিয়ে উঠলো,

“হ্যাঁ! মাথামোটা তাই করো গিয়ে! এতগুলো মাস ধরে গাধার মতন খেটেছি এই দিন দেখার জন্য? মাঝপথে ল্যাপটপ নিয়ন্ত্রণহারা হয় কি করে? চেক করে দেখো না তোমরা? আজকে আমি সবার চাকরি খাবো! সবার!”

বলে কয়েকটা ফাইল অহেতুক ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে ঝড়ের বেগে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন তাকবীর।

“আই অ্যাম আ মা*র্ডারার।”

তাকবীরের চোখজুড়ে এখনো ভাসছে বিশাল প্রজেক্টরের স্ক্রীনে ভেসে ওঠা বাক্যটা। কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারছেন না তিনি স্মৃতিটুকু। দম বন্ধ করা ভয়ানক এক অনুভূতি। বেখেয়ালী পদক্ষেপে করিডোর বেয়ে এগোতেই সামনের দৃশ্য তাকে সম্পূর্ণ জমিয়ে দিলো।

দন্ডায়মান সাবিন। মুখে বিরাট এক প্রফুল্ল অভিব্যক্তি। বাঁকা হাসিমাখা ঠোঁটে শক্তিশালী প্রভাবের অধিকারী রমণী নিজের হাতে ধরে রাখা একটা বক্স তুলে তাকবীরকে দেখিয়ে বললো,

“তোমার ভীষণ বিরিয়ানী পছন্দ, তাইনা চাচ্চু?”

আতঙ্কে শিরশির করে উঠলেন তাকবীর। তবে কি….!

সাবিন এগিয়ে এলো তার দিকে, পায়ের হিলজোড়া ঠকঠক ধ্বনি তুললো শক্ত টাইল বিছানো মেঝেতে।

“শুনেছি, আজ তোমার ফরাসি কোম্পানির সাথে বিরাট বড় হাজার কোটি টাকার ডিল এগ্রিমেন্ট মিটিং ছিলো? কংগ্র্যাচুলেশন্স! এইযে দেখ, সেলিব্রেট করতে নিয়ে এসেছি নিজের হাতে রেঁধে, শুধু তোমার জন্য চাচ্চু!”

তাকবীর কেন যেন আর সইতে পারলেন না। মস্তিষ্ক বুঝে ওঠার আগেই মনের আক্রোশে হুংকার দিয়ে উঠলেন,

“সাবিন হুসেইন! আই উইল কি*ল ইউ রাইট নাউ!”

“আর একবার আমার স্ত্রীর উপর চিৎকার করে দেখুন, আপনার জিভ কত হাত লম্বা সেটার দৈর্ঘ্য মাপতে আমার কোনো স্কেলের প্রয়োজন হবেনা।”

থমকে গেলেন তাকবীর। হতবাক হয়ে দেখলেন সাবিনের ঠিক পিছনে এসে দাঁড়ানো সুদীর্ঘ পুরুষটিকে। চশমার ওপাশ থেকে চেয়ে আছে শীতলতম ধারালো বাদামী তীরের ফলা। সাবিন মাথা কাত করে তাকালো তার দিকে, আবারো বললো,

“চাচ্চু, বিরিয়ানী খাবে না?”

তার কথার পিঠে জায়দান সুগভীর হিমশীতল কণ্ঠে বললো,

“আমার স্ত্রী শখ করে বানিয়ে এনেছে, একটা ভাতের দানাও যদি মিস যায়, আই উইল মেইক ইউ লিক হার শুয, মাই ডিয়ার আংকেল।”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

[ 🍂নোট:

গত পর্বের মিশ্র প্রতিক্রিয়া আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমার পুরাতন পাঠক পাঠিকা যারা আছেন, তাদের প্রতি আমি যেমন কৃতজ্ঞ তেমন দুঃখিত। আমার লিখায় প্রাণহীন আবেগগুলো কিছুটা অতিরিক্ত উপস্থাপনের জন্য আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদও জানাই আমাকে এত সুন্দর করে উৎসাহ দিয়ে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য। মাফ করবেন। ইনশাআল্লাহ, আমি ভবিষ্যতে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা করব।

আর অনেকদিন যাবৎ ঠিকঠাক মন্তব্যের উত্তর না করার জন্যও দুঃখিত। আসলে অনেকেই ব্যস্ততায় হারিয়ে গেছেন, আমিও ব্যাস্ত তাই খুব একটা সময় দিতে পারিনা। তবে আজ থেকে আবার আপনাদের আগের মতন দুর্দান্ত মন্তব্যগুলো দেখতে এবং সেগুলোর উত্তর করতে ইচ্ছা হচ্ছে। যদি হাতে সময় থাকে, তবে গল্প পড়ে কিছু কথা লিখে যাবেন। আমি উত্তর দেয়ার অপেক্ষায় থাকবো। গল্পটা শেষের দিকে, তাই শেষটুকু সুন্দর করার প্রচেষ্টা থাকবে আমার। অনেক অনেক ভালোবাসা সকলকে।🌸 ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here