সমাপ্তির_ওপাড়ে #জাবিন_ফোরকান #পর্বসংখ্যা৫০ (শেষাংশ

0
2

#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫০ (শেষাংশ)

বাতাসে কড়া কফি বিনের ঘ্রাণ। মানুষের কথপোকথনের আওয়াজ, ক্ষণে ক্ষণে হাসির ঢেউ। ক্যাফের দরজা খুলছে, কেউ ঢুকছে, কেউ বা বেরিয়ে যাচ্ছে। ওয়েটার ছেলে মেয়েগুলো অর্ডার নিয়ে ব্যাস্ত পায়ে ছোটাছুটি করছে টেবিলে টেবিলে। এই জগত সংসার কখনো কারো জন্য থেমে থাকেনা। বয়ে চলে আপন গতিতে।

একদম এক কোণায়, ঠিক বুক কর্ণারের পাশে একটি খালি টেবিলে বসে আছি আমি। সামনেই চায়ের কাপ এবং দুই স্লাইস পিৎজা রাখা। ক্যাফেতে ঢুকতে না ঢুকতেই মীরা নিজ হাতে দিয়ে গিয়েছে। অথচ, সবকিছু অবহেলায় পড়ে আছে। একদম চুপটি করে বসে আছি আমি। দৃষ্টি বিক্ষিপ্ত। হাত দুটো জোড় বেঁধে তুলে রাখা টেবিলে, কনুইয়ে ভর দিয়ে চিবুকে সে হাত ঠেকিয়ে চেয়ে আছি ক্যাফের বাইরের দিকে। মৃদু আলো আমার শরীরে পড়ছে, ওম লাগছে। এই উত্তাপটুকু আমার ভেতরে চলা ঘূর্ণিপাককে শান্ত করতে যথেষ্ট নয়।

কিছুক্ষণ বাদে মীরা এসে থামলো আমার পাশে। নীল রঙের কুর্তির সঙ্গে নীল হিজাব বাঁধা মাথায়। ঝুঁকে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় শুধালো,

“মন ভালো নেই?”

শক্ত একটি ঢোক গলাধঃকরণ করলাম। কোনো উত্তর করতে পারলাম না। একনাগাড়ে চেয়ে থাকলাম সুদূরে। মীরা একটি চেয়ার টেনে আমার পাশেই বসে পড়ল। তারপর আমার চিবুক থেকে একটি হাত সরিয়ে নিজের মুঠোয় পুরে বললো,

“ডাক্তার কি বলেছে?”

সহজ একটি প্রশ্ন। কিন্তু মীরাকে সেটি উচ্চারণ করতেও এক সাগর যাতনাকে পারি দিতে হয়েছে। তার হাতের কাঁপুনিতেই টের পেলাম। আর আমি? আমার ভেতর কি হচ্ছে? এর চাইতে কয়েকশত গুণ বেশি কঠিন আমার কাছে এই প্রশ্নটির উত্তর দেয়া।

***
কয়েক ঘণ্টা আগে:

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে জায়দান। একপাশের স্ট্যান্ডে আইভি সংযুক্ত করে তাকে রক্ত দেয়া হচ্ছে। শরীরে হালকা জ্বর ভাব থাকায় ডাক্তার দ্রুত অ্যইন্টিবায়োটিক্সের ব্যবস্থা করেছেন। কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে স্বচ্ছ দেয়ালের ভেতরের দৃশ্যটি দেখে বুকের ভেতর ভেঙেচুরে গেলো সবকিছু। অশ্রুও এখন খেই হারিয়েছে। শুকিয়ে গিয়েছে বেদনাটুকু। শুষ্ক বেদনা আর্দ্র বেদনার চাইতেও ভয়ংকর। একদম ফাঁপা করে দেয় ভেতর থেকে। শক্ত বিছানায় ধবধবে সাদা দেয়ালে আবদ্ধ স্টেরাইল পরিবেশে নিজের জীবনের বটবৃক্ষতুল্য মানুষটাকে দেখার চাইতে যেন নিজের ধ্বংস দেখাও আমার জন্য শ্রেয় ছিল।

কিছুক্ষণ বাদেই কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো এক মধ্যবয়স্ক নারী চিকিৎসক। টাইট করে বাঁধা খোঁপায় বয়সের রূপালী পরত পড়েছে। চোখে ভারী ফ্রেমের চশমা। অভিজাত, শালীন সালোয়ার কামিজ এবং এর উপরে অ্যাপ্রোন পরনে। নেমপ্লেটে জ্বলজ্বল করছে নাম, ডক্টর মিনা হাসান। আমাকে দেখে তিনি সামান্য ভ্রু কোঁচকালেন। তিনি জিজ্ঞেস করার আগেই নিজের পরিচয় দিলাম।

“আসসালামু আলাইকুম, ডক্টর। আমি সাবিন হুসেইন, ওয়াইফ অব ড. আরেফিন।”

মাথা দোলালেন মিনা।

“ওয়া আলাইকুমুস সালাম। উনি আমাকে বলেছেন। অস্বীকার করব না, এতদিন বাদে ওনার ওয়াইফকে দেখে আসলেই অবাক আমি। তবে, সেটা নিশ্চয়ই আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি জিজ্ঞেস করব না। আ’ম জাস্ট গ্ল্যাড দ্যাট হি ফাইনালি গট সামওয়ান!”

আমি কিছু বলতে পারলাম না। নিজেকে জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট এক প্রাণী বলেই অনুভব হলো সেই মুহূর্তে। মিনা আমাকে হাত দেখিয়ে অনুসরণ করতে বললেন,

“আমার কেবিনে আসুন।”

একনজর ভেতরে তাকালাম। জায়দান চোখ বুঁজে আছে। রক্তের ব্যাগ অর্ধেক ফাঁকা হয়েছে। দুজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে যেকোনো প্রয়োজনে। পরখ করে দেখছে সব ঠিকঠাক চলছে কিনা। আমি মিনার পিছন পিছন এগোলাম। করিডোর পেরিয়ে তিনি আমায় নিজের চেম্বার কেবিনে নিয়ে গেলেন।

বসলাম আমি। মিনাও নিজের অ্যাপ্রোন খুলে চেয়ারে বসলেন। চোখের চশমাটা খুলে নামিয়ে রাখলেন টেবিলে।

“আপনি নিশ্চয়ই জানেন আপনার হাসব্যান্ড অ্যাপলাস্টিক অ্যানেমিয়ার সেকেন্ড স্টেজে আছে?”

মনে হলো বুকের ভেতরটা খুবলে খুবলে খাচ্ছে শকুনের দল। মাথা দোলাতে বাধ্য হলাম,

“জি। জানি।”

মিনা একটি নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

“দেখুন, উনি ডায়াগোনাইজড হওয়ার পর থেকে নিজের চিকিৎসার বিশেষ কোনো লক্ষণ দেখাননি। আমি বারবার বলেছি, ইউ নিড ডোনার। উনি জানিয়েছেন, ওনার কোনো ডোনার নেই। বাইরে থেকে ডোনার অনুসন্ধান করা হয়েছে এতদিন। কিন্তু, বোন ম্যারোর ব্যাপার, এত সহজে ম্যাচ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর তাছাড়া, ভীষণ রিস্কি। তাই এতদিন ওনাকে ব্লাড অ্যান্ড অ্যান্টিবায়টিক রিসিভ চালিয়ে যেতে হয়েছে।”

“ডোনার ছাড়া এই ট্রিটমেন্টে বেঁচে থাকা সম্ভব না?”

অবুঝের মতন প্রশ্ন করলাম। মিনা চাইলে আমায় নিয়ে ঠাট্টা করতে পারতেন, তবে করলেন না। বরং একটু দম নিয়ে গুছিয়ে বলতে লাগলেন,

“মানুষের শরীরের বিষয়, কখনো কিছু নিশ্চিত হয়ে বলা যায়না। ওনার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলে ওনাকে র*ক্ত দিতে হচ্ছে। এভাবে ১ থেকে ৩ বছর অবধি নেয়া যায়। কিন্তু ওটুকুই। যদি ওনার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়, তাহলে টাইম স্প্যান আরও কমে যেতে পারে। এটা উনিও জানেন।”

দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললাম। নখ গেঁথে গেলো হাতের নরম তালুতে। মাথা নিচু করে ফেললাম।

“অর্থাৎ, ডোনার ছাড়া বিকল্প নেই?”

“ডোনার ছাড়া স্থায়ী কোনো সমাধান নেই। মেডিকেল সাইন্সের উন্নতি হয়েছে, অনেক কিছুই করা যায়, তবে সবকিছুই অস্থায়ী। এটা শুধু মৃত্যুকে প্রলম্বিত করা। আর কিছুনা।”

ভেঙে পড়তে ইচ্ছা হলো ইমারতের মতন। শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঝুলে যেতে চাচ্ছে। অথচ দিলাম না। কারণ, এটা আমার ভেঙে পড়ার নয়, বরং শক্ত হওয়ার সময়। অশ্রু বিসর্জন দিয়ে কি হবে? জায়দানকে সুস্থভাবে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে পারবে আমার অশ্রু? কোনোদিন পারবেনা। তার এখন আমাকে প্রয়োজন। আমিই একমাত্র তার অবলম্বন। নিজের মনকে হাজার বুঝ বুঝিয়ে অবশেষে দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকালাম মিনার দিকে। শুধালাম,

“বেশ। তবে ডোনারই সই। আমাকে টেস্ট করিয়ে দেখুন, ম্যাচ করে কিনা।”

হালকা একটু নিষ্প্রাণ হাসলেন মিনা। তাতে কোনো আনন্দ নেই। আছে বছর বছরের অভিজ্ঞতায় শক্ত হয়ে আসা অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ।

“গুড স্পিরিট মিসেস আরেফিন। আপনার এইচ এল এ টাইপিং টেস্ট করানো যায়, কিন্তু সরি টু সে যে আপনার ম্যাচ করার সম্ভাবনা নেহায়েত শূন্যের কোঠায়।”

“তবে ম্যাচ কারা?”

মিনা খানিকটা সময় নিয়ে বুঝিয়ে বললেন,

“এই রোগটা একটু জটিল ঘরানার। আমাদের শরীরে রক্ত তৈরি করে বোন ম্যারো। এক্ষেত্রে ম্যারো ঠিকভাবে লোহিত কণিকা তৈরি করতে পারেনা। ধীরে ধীরে রক্তের আরো দুটি কণিকা উৎপাদনও ব্যাহত হতে থাকে। যার দরুণ শরীর ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করতে পারেনা এবং অরক্ষিত হয়ে পড়ে। বোন ম্যারোর টিস্যু সাধারণত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়। এজন্য আমাদের হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন টেস্ট, সংক্ষেপে এইচ এল এ টাইপিং করতে হয়। একজন ব্যক্তির এইচ এল এ অর্ধেক আসে বাবার থেকে, বাকি অর্ধেক মায়ের থেকে। এক্ষেত্রে সাধারণভাবে বাবা মাকে হাফ ম্যাচ ধরে নেয়া যায়। তবে সবথেকে বেশি ম্যাচ, প্রায় ১০/১০ পাওয়া সম্ভব হয় যদি ব্যক্তির কোনো বায়োলজিকাল ভাই বোন থেকে থাকে, তাহলে।”

দৃষ্টি প্রসারিত হলো আমার।

“তার মানে ডোনার হিসাবে সবচেয়ে উপযুক্ত পরিবারের সদস্যরা?”

“হ্যাঁ। বায়োলজিকাল ফ্যামিলি মেম্বার সবচেয়ে সেইফ অপশন যদি কোনো কমপ্লিকেশনস না থেকে থাকে। এজন্য ড. আরেফিনের পরিবারের কাউকে দরকার। বাবা, মা, ভাই, বোন, অবশ্যই বায়োলজিকালি রিলেটেড। যদি তারা ডোনেট করতে রাজী থাকে, আমরা তাদের এইচ এল এ টাইপিং করিয়ে নিশ্চিত হতে পারবো তারা কতটুকু ম্যাচ করে এবং তাদের টিস্যু ব্যবহার করা নিরাপদ কিনা। কিন্তু ড. জায়দান নিজের পরিবার সম্পর্কে আমাদের কোনো তথ্য দেননি। শুধু সবসময় বলেছেন ওনার পক্ষের কোনো ডোনার নেই, রক্ত আর অ্যান্টিবায়টিক ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যেতে যতদিন সম্ভব।”

কিছু বলতে পারলাম না আমি আর। থম মেরে বসে রইলাম সেখানে। পরিবার? জায়দান ঠিকই তো বলেছে, তার না আছে পরিবার, আর না আছে ডোনার!

***
হাসপাতালের বাইরে জায়দানের বাইকের সামনে এসে থামলাম আমি। অদ্ভূত দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখে যাচ্ছি আমি। যত দেখছি, তত বিস্মিত হচ্ছি। এত ভয়ানক রোগ বাসা বেঁধেছে তার ভেতর, সেটা সুউচ্চ সুকঠিন অবয়ব দেখলে বোঝা দায়। চেহারা বেশ খানিকটা ফ্যাকাশে এবং নিঃশ্বাস প্রশ্বাসে দ্রুততা ছাড়া বোঝার কোনো উপায়ই নেই। কি সুন্দর নিজেকে লুকিয়ে রাখতে জানে আমার স্বামী! তাইতো একফালি আঁচ করতে পারিনি এতটা কাছাকাছি থাকার পরেও! নিজের কাছে নিজেকে ঘৃন্য লাগছে। আমার চোখের সামনে প্রিয়তম মানুষটা এভাবে তিল তিল করে শেষ হয়ে যাবে, আর আমি বাস্তবতার দোহাই দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখব? এটাই কি লিখা ছিল আমার ভাগ্যে?

জায়দান বাইকের সামনে থেমে আমার দিকে ফিরল। হেলমেট নিয়ে এগিয়ে এসে আমার মাথায় পরিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে বললো,

“ডক্টর তোমায় কিছু বলেছে?”

অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আমি আর কিছুই করতে পারলাম না। জায়দান হেলমেট পরানো শেষ করে আমায় কাছে টেনে নিয়ে নিজের বুকে ঠেকালো। তার দ্রুত স্পন্দিত হতে হৃদস্পন্দন শুনতে পেলাম আমি।

“ডক্টরের কথা শোনার প্রয়োজন নেই। আই অ্যাম গুড, অ্যান্ড আই উইল বি, ট্রাস্ট মি।”

তাকে আঁকড়ে ধরলাম। হাতের মাঝে খামচে ধরলাম তার পরনের স্যুটের অংশ। ভাঙা গলায় বলতে নিলাম,

“জায়দান…তোমার পরি…”

“আমার কোনো পরিবার নেই, মাই ওয়াইফ। কোনো পরিবার নেই।”

জায়দানের কন্ঠস্বর গম্ভীর হলো। আমার মুখটা আলতো করে তুলে হেলমেটের ভেতরে আমার কপালে আলতো চুমু দিয়ে সে বলল,

“তুমিই আমার একমাত্র পরিবার। মাই ওনলি ফ্যামিলি, মাই ওনলি হোম। গট ইট?”

গলা কাঁপলো আমার। এরপর আর কি বলা সম্ভব? কিভাবে প্রতিবাদ করা সম্ভব? কিভাবে কারো উঁচু মাথা টেনে নামিয়ে দেয়া সম্ভব? আমি কি পারব তা কোনোদিন? জায়দান লম্বাটে আঙুলে আমার কম্পমান চোখের পাঁপড়ি ছুঁয়ে শেষমেষ স্বাভাবিকভাবে জানালো,

“চলো। তোমায় ক্যাফেতে নামিয়ে দিয়ে আসি। আমার একটু ভার্সিটির দিকে যেতে হবে।”

***
বর্তমান।

মীরা আমার হাত দুটো ধরে বসে আছে। এখন আমরা দুজন আর ক্যাফের ভেতরে নেই। স্টাফ রুমে এসে বসেছি। দুজনই নিশ্চুপ। কারো মুখেই আর কোনো শব্দ নেই যেন। সবকিছু বিলীন হয়েছে। লুটিয়ে গিয়েছে পদতলে। মীরার চোখে টলটলে অশ্রু জমেছে। হিজাবের প্রান্ত গুটিয়ে চোখ মুছে সে দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে অবশেষে আমার দিকে তাকালো।

“তুই কি করবি বলে ভাবছিস?”

“আমি জানিনা। আমি সত্যিই আর জানিনা মীরা।”

মাথা নুইয়ে ফেললাম। জীবন যুদ্ধে পরাজিত লাগছে নিজেকে। সিদ্ধান্তহীন। উদ্দেশ্যহীন। মীরা আমার কাঁধ চেপে আমায় নিজের বুকে আশ্রয় দিলো। পিঠে শান্তনার হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

“জায়দান ভাইয়া চান না আরেফিন পরিবারের কাছে সাহায্য চাইতে। উনি মাথা নত করবেন না, সেটা স্পষ্ট।”

হঠাৎ করেই দূর্বিষহ লাগলো সবকিছু। মীরাকে পাল্টা জড়িয়ে ধরতে পারলাম না আমি। হাত দুটো মুঠো পাকিয়ে শক্তভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করলাম আমি। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সকল সিদ্ধান্ত বুঝি এভাবেই আসে। হঠাৎ করে!

“তাহলে আমাকে করতে হবে।”

চমকে উঠলো মীরা। জোরপূর্বক মুখ তুলে আমার চোখের দিকে তাকালো। তার নয়নজুড়ে অবিশ্বাস।

“কিঃ? সাবিন, তোর মাথা ঠিক আছে? কি বলছিস তুই? যাদের কাছ থেকে তুই লড়াই করে মুক্তি ছিনিয়ে এনেছিস, যাদের জন্য তোর জীবনটা ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে, যাদের জন্য তুই তিলে তিলে এত কষ্ট ভোগ করেছিস, তাদের কাছে মাথা নত করবি?”

“করব। ওর জন্য যদি নিজের উঁচু শিরদাঁড়া ভেঙে নিচে নামাতে হয়, আমি তাতেই প্রস্তুত।”

“পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই!”

আমায় ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো মীরা।

“জায়দান ভাইয়া জানতে পারলে তোকে বাহবা দেবে ভাবছিস?”

“বাহবা না দিক, ঘৃণা করুক, রাগ করুক, তবুও কিছু একটা করুক! আমার চোখের সামনে একটুখানি মানুষের মতন বেঁচে থাকুক! শুধু…বেঁচে থাকুক ও!”

মীরা থমকে গেলো। আমার চোখের মাঝে জ্বলন্ত যে তীব্র ব্যথার আগুন সে দেখলো, তা বুঝি তাকে ভেতর থেকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ঝট করে উঠে পড়লাম। চেয়ারে ঝুলিয়ে রাখা কার্ডিগান গায়ে জড়িয়ে স্কুটির চাবি নিয়ে হনহন করে এগোলাম ক্যাফের বাইরের দিকে। কিছুক্ষণ বাদেই টের পেলাম, মীরাও আমার পিছু পিছু আসছে। তাকে বাঁধা দিলাম না। স্কুটিতে যখন দুজন চেপে বসলাম, তখন পিছন থেকে মীরা অনিশ্চিত গলায় বলতে গেলো,

“আমার মনে হয় আয়দান…”

সে কথাটি অর্ধেক বলেই চুপ করে গেলো। অথচ আমি বুঝে নিলাম সে কি বলতে চাচ্ছে।

“কোনো কিছুই কোনোদিন সুনিশ্চিত হয়না, মীরা।”

ঠান্ডা কন্ঠে বলেই স্কুটি চালু করলাম। সড়ক বেয়ে ছুটে চললো স্কুটি, আরেফিন বাড়ির উদ্দেশ্যে।

***

আরেফিন বাড়ি।

একটা বিশাল লাগেজের ভেতর নিজের শাড়ী, পোশাক সবকিছু ছুঁড়ে ছুঁড়ে রাখছেন জেসমিন। জাফর কক্ষের এক কোণায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রুষ্ট দৃষ্টিতে দেখে যাচ্ছেন স্ত্রীর কর্মকান্ড।

“এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ, জেসমিন।”

তার গম্ভীর গলায় একটুও বিচলিত মনে হলোনা জেসমিনকে। বরং তিনি হাতের জোর আরো বাড়িয়ে দিলেন। লাগেজে জিনিসপত্র ভরতে ভরতে কঠোর গলায় বললেন,

“বাড়াবাড়ির আর দেখেছ কি তুমি? এটা তো সবে শুরু।”

“তোমার মনে হয় এই বয়সে এমন পাগলামি করা যাচে? আমার থেকে ডিভোর্স নিয়ে তুমি কি করবে? নতুন সংসার পাতবে, নাকি ভালোভাবে বাঁচতে পারবে? কোনটা? তোমার মনে হয় তোমার নবাবের বংশ তোমায় ফিরিয়ে নেবে?”

সামান্য সময়ের জন্য থামলেন জেসমিন। ভ্রু কুঁচকে স্বামীকে দেখলেন,

“তোমার কি মনে হয় জাফর? তুমি খুব দাপটের সাথে নিজের বংশের মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছ?”

জাফর থমকালেন। তার মুখ শক্ত হয়ে উঠল। সুগভীর এক শীতল গলায় সে জবাব দিলেন,

“এই বংশে আগুন লাগিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সাবিন। তোমার বড় ছেলে সেই আগুনকে দাবানলে পরিণত করে গিয়েছে। সামনে এখন শুধুই ধ্বংস।”

জেসমিন ক্রুব্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন জাফরের দিকে। পরক্ষণে জিনিসপত্র ছুঁড়ে ছুঁড়ে রাখার কার্যক্রমে বিরতি দিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালেন স্বামীর সামনে। তার চোখে জ্বলে উঠলো শীতল আগুন। দাঁতে দাঁত পিষে হুমকি দিলেন তিনি,

“ধ্বংস তো তোমায় আমি করব, জাফর! যেটা আমার বহু বছর আগে করা উচিৎ ছিল!”

শিরদাঁড়া বেয়ে শিহরণ খেলে গেলো জাফরের। সামান্য কাঁপলেন তিনি। জেসমিনের মাঝে বছর বছরের জমা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। ঝরে পড়ছে তা আগ্রাসী অগ্নুৎপাত হয়ে। জাফর কিছু বলতে পারলেন, প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগও পেলেন না। এর আগেই হন্তদন্ত হয়ে রুমের ভেতরে ঢুকলো রোজিনা।

“ম্যাডাম, স্যার, দেইখা যান নিচে কে আসছে!”

_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_চলবে_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_⁠_

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here