নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে- মিথিলা মাশরেকা ১৪.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে- মিথিলা মাশরেকা

১৪.

-যাকে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখে এতোসুন্দর একটা স্কেচ করে ফেলতে পারলেন, সামনাসামনি তাকে আপনার ভাইয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন না মিস স্নিগ্ধতা?

যার সাথে দেখা করতে এসেছিলো, সেই ইয়াকীন শারাফের সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে সেটা ধারনা করেনি সাইফ। শারাফের নাম শুনেই খুশি হয়ে গিয়েছিলো ও। কিছু বলতে যাবে, শারাফ ইশারায় থামতে বলেছে ওকে। সাইফ বুঝলো, পুলিশের সাথে দেখাসাক্ষাৎকে গোপনে রাখতে চাইছে শারাফ। বিষয়টা ভালো লাগলো ওর নিজেরও। পুলিশ-সাইক্যাট্রিস্ট হিসেবে ওদের আলোচনা আলাদাভাবেই হওয়া উচিত। শাফের কথায় কপাল কুচকে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। সাইফ স্বরে খানিকটা বিস্ময় মিশিয়ে বললো,

-তুই চিনিস ওনাকে টুকি?

কাচুমাচু চোখে এবার ভাইয়ের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। ডুবুডুবু কন্ঠে বললো,

-ইনি আমাদের ভার্সিটির এক্স সাইকোলজিয়ান। রিসার্চের জন্য ভার্সিটিতে যাওয়াআসা করেন। সার্ভে করার জন্য গতদিন ফাইন আর্টসে এসেছিলেন। অ্ অগ্নিলা ম্যামের পরিচিত উনি। এটুকোই চিনি ভাইয়া।

-আর এটুকো চিনেই আপনি যে চুপিচুপি আমার স্কেচ করে ফেললেন, হোয়াট আবাউট দ্যাট?

তীক্ষ্ম চোখে শারাফের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফ আস্তেকরে ‘ওপস্’ উচ্চারন করলো। ডানহাতের এক আঙুল বুকের বা দিকটায় ঠেকিয়ে ব্যথাতুর কন্ঠে আস্তেকরে বললো,

-লেগেছে।

বড়বড় চোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। সাইফের সামনে ওর সাথে এভাবে কথা বলছে, রীতিমত ফ্লার্ট করছে এই লোক! ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে তার প্রশ্নসূচক চাওনি। যেনো শারাফের এমন ব্যবহারের চেয়ে ওর লুকিয়ে স্কেচ করার কথাটাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সাইফের কাছে। স্নিগ্ধতা ঘাড় কাত করে বললো,

-ভাইয়া?

-সত্যি তুই ওনার স্কেচ করেছিস?

স্নিগ্ধতা হতাশার শ্বাস ফেললো। রাগ হচ্ছে ওর। এই একটা স্কেচ ওকে অনেকরকমভাবে অস্বস্তিতে ফেলছে। যদিও সেটা এখন ওর কাছেও নেই। শারাফ নিয়ে গেছে। শারাফের দিকে তাকিয়ে স্নিগ্ধতা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

-হ্যাঁ! করেছি ওনার স্কেচ। কে জানতো একটা স্কেচের বোঝা বইতে বইতে কেউ তুমি অবদি পৌছে যাবে?

সশব্দে হেসে দিলো সাইফ-শারাফ দুজনেই। বোকার মতো দুজনের হাসি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো স্নিগ্ধতা। শারাফ হাসি থামিয়ে বললো,

-একটু ভুল বললেন। স্কেচের বোঝা বইতে বইতে আমি কিন্তু মোটেও আপনার ভাই অবদি পৌছাইনি। আপনি অবদি পৌছেছি।

শারাফের দ্বি-অর্থের কথাগুলো বুঝতে সময় লাগছিলো না স্নিগ্ধতার। কিছু বলতে যাবে, শারাফ আবারো বলে উঠলো,

-এইযে ইনজার্ড হয়ে বসে আছেন। এগোলাম তো আপনাকে হেল্প করতেই তাইনা? আপনার ভাইয়া কিন্তু এখানে বহির্ব্যক্তি। যাকগে! এবার বলুন, আজকে হেল্প করায় কৃতজ্ঞতাস্বরুপ আমার আরেকটা স্কেচ ক্রে দেবেন কি না?

ভাইয়ের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। সেও যেনো ওর উত্তরের অপেক্ষায়। উঠে দাঁড়িয়ে বললো,

-কদাপি না। চলো ভাইয়া।

শারাফ-স্নিগ্ধতা দুজনের খুনশুটি বেশ উপভোগ করছিলো সাইফ। ‘চলো ভাইয়া’ কথাটা শুনে ধ্যান ভাঙলো ওর। স্নিগ্ধতা এগিয়েছে। এদিকে শারাফের সাথে ওর কথা বলার আছে। ভেবেছিলো স্নিগ্ধতাকে শপিংয়ে ব্যস্ত রেখে শারাফের সাথে কথা বলবে। কিন্তু এখন তো স্নিগ্ধতা বাসার দিকে পা বাড়াচ্ছে। ওকে থামাতে সাইফ তড়িঘড়ি করে বললো,

-এসব কি টুকি? উনি হেল্প করেছেন তোমাকে!

স্নিগ্ধতা থামলো। পেছন ফিরে বললো,

-তো?

-একটা স্কেচ করে দিতে ক্ষতি কি?

-লাভের কিছুও তো দেখছি না আমি।

স্নিগ্ধতার নির্লিপ্ত জবাব। সাইফ চোখ রাঙালো ওকে। কিন্তু ওর প্রতিক্রিয়ার কোনোরুপ পরিবর্তন ঘটলো না। সাইফ শারাফের দিকে তাকিয়ে জোরপুর্বক হেসে বললো,

-যেহেতু আপনি ক্যাম্পাসে যাওয়াআসা করেনই, টুকি ঠিক আপনার স্কেচ করে দেবে কোনো এক সময়। আপাতত একসাথে এককাপ কফি তো খাওয়া যেতেই পারে। হোয়াট সে?

শারাফ সুন্দরমতো একটা হাসি দিয়ে বললো,

-মাই প্লেজার মিস্টার এহমাদ।

-কিন্তু ভাইয়া…

-কোনো কিন্তু না।

জোর দিয়ে বললো সাইফ। স্নিগ্ধতা আজ আরো একবার অনুধাবন করলো, ভাইয়ের বোনপ্রীতি তীব্র। যে ওকে সাহায্য করেছে, তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে সাইফ কোনোরুপ ত্রুটি রাখবে না। আর যেহেতু কোনোদিন তাতে ও বারন করেনি, আজকে ওর বারন অহেতুক লাগবে সাইফের কাছে। কেবল স্বল্পস্বরে বললো,

-আমি খাবো না কফি।

-কেনো?

-শাড়ি দেখতে যাচ্ছি। সময় লাগবে আমার। তোমরা বরং বসেবসে কফি খাও। যতো লিটার খুশি।

কথা শেষ করে পার্সটা হাতে নিয়ে মলের ভেতরে চলে গেলো স্নিগ্ধতা। শারাফ ওর চলে যাওয়া দেখে হাসলো। রাগের বশে বেঞ্চের ওপর মোবাইলটা রেখে চলে গেছে স্নিগ্ধতা।ওটা সাইফের হাতে দিয়ে প্যান্টের পকেটে একহাত গুজে দাড়ালো শারাফ। বললো,

-সিচুয়েশন ক্রিয়েট করা আপনি দেখছি ভালোই জানেন মিস্টার এহমাদ। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট ঠিক মানুষটাকেই কেইসগুলো দিয়েছে। পরিস্থিতি তৈরীর প্রক্রিয়াটাই মুলত এই মা’র্ডা’রগুলোর মেইন স্ট্রাটেজি।

প্রতিত্তরে কেবল হাসলো সাইফ। শারাফ হাত বাড়িয়ে ওকে ইশারা করলো এগোনোর জন্য। তারপর দুজনে মিলে কফিশপের এককোনে বসলো। বেশ কিছুটা সময় সাইফ সিরিয়াল কিলার কেইস সম্পর্কে শারাফের ধারনা পরখ করে নিলো। মুচকি হাসি ঠোটে রেখে ওর প্রশ্নগুলোর জবাব দিলো। কফি আসলে মগের হাতলে আঙুল নাড়িয়ে শারাফ বললো,

-আমার একটা প্রশ্ন ছিলো মিস্টার এহমাদ।

-জ্বি বলুন?

-ছ মাস আগে, বিভিন্ন জায়গায়, কয়েকদিনের ব্যবধানে তবে একই উপায়ে চারজনের খু’ন হয়। এরমধ্যে দুজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী, একজন বিল্ডার, একজন উঠতি পলিটিশিয়ান। আর ছ মাস পর এই পঞ্চম খু’ন। ভার্সিটির স্টুডেন্টের। শুধুমাত্র প্রসিডিওর ছাড়া আর এ খু’নগুলোতে কোনো মিল পাননি আপনারা? বাকিসবার কথা বাদ দিলাম। আপনিও অতিরিক্ত কিছু পাননি? নাকি আপনি নিজে জেনেছেন, তবে কাউকে জানানো উচিত বলে মনে করেননি। কোনটা?

সাইফ বুঝলো, কেইসগুলো নিয়ে অনেককিছু জানে শারাফ। বেশ ভালোমতোই আয়ত্ব করে এসেছে ওকে পাঠানো কেইসফাইলগুলো। মৃ’তদের সম্পর্কে খোজ নিয়ে সাইফের মনে হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জীবনে বহুনারীর ঘটনা ছিলো। তবে তার কোনো জোরালো প্রমান মেলেনি। তাই চুপ আছে ও। শারাফ আরো কিছু বলতে যাবে, এরমাঝে ফোন বেজে উঠলো। সেদিকে না তাকিয়েই কেবল সোয়াইপ করে সাইফ কেটে দিলো কলটা। মোবাইল টেবিল থেকে পাশের চেয়ারে রেখে শারাফকে বললো,

-ইউ কন্টিনিউ।

শারাফ মেনুবুকের ওপর থাকা কলমটা হাতের আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বলতে শুরু করলো। নিজের ধারনার সাথে শারাফের অবজার্ভেশনের এতোবেশি মিল দেখে হতভম্ব না হয়ে পারলো না সাইফ। বলা শেষ করে বুকে হাত গুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো শারাফ। আর সাইফের কপালে ভাজ পরেছে। শারাফ কফিশপের দরজায় তাকিয়ে দেখে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকছে স্নিগ্ধতা। ও এসেই সরাসরি সাইফকে বললো,

-শাড়ি পছন্দ হয়নি। কফি খাওয়া শেষ?

-ইয়াপ! আমার তো শেষ!

কথাটা বলে শারাফ উঠে দাড়ালো। সাইফও উঠে দাড়িয়ে স্বাভাবিক করলো নিজেকে। ও জানতো, যেভাবে রেগে চলে এসেছে, ওমন মুড নিয়ে কোনো শাড়িই পছন্দ হতো না স্নিগ্ধতার। ওকেই কিনে দিতে হবে। শারাফ শার্টের হাতা আরেকটু টান মারার ভঙিমায় স্নিগ্ধতার দিকে ঝুকলো। ফিসফিসিয়ে বললো,

-আমার শাড়ির চয়েজ কিন্তু বেশ ভালো মিস স্নিগ্ধতা। সো ইফ ইউ ওয়ান্ট, আমি আপনাকে আবারো হেল্প করতে পারি।

শারাফ সরে দাড়ালো। কটমটে চোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। এই লোকটা এভাবে ফ্লার্ট করতে পারে, কল্পনাতেও ছিলোনা ওর। তারচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, সাইফ কিছুই বলছে না শারাফকে। অন্য দুনিয়াতে মত্ত্ব ও। স্নিগ্ধতা এবার ধারালো গলায় বললো,

-যাবে তুমি?

-আসছি মিস্টার এহমাদ। ইট ওয়াজ নাইস টু মিট উইথ বোথ অফ ইউ।

সাইফের সাথে হ্যান্ডশেইক করে কফিশপ থেকে বেরিয়ে গেলো শারাফ। সরু চোখে ওর চলে যাওয়া দেখলো স্নিগ্ধতা। এই লোকটার চলে যাওয়া ওর কাছে কেনো যেনো অদ্ভুত লাগে। শারাফ চোখের আড়াল। স্নিগ্ধতা সাইফের দিকে তাকিয়ে দেখে তার চেহারায় চিন্তার রেখা। আস্তেকরে ভাইয়ের হাতে নাড়া দিয়ে বললো,

-ভাইয়া?

-হুম?

-আমার ফোনটা বোধহয় হারিয়ে ফেলেছি।

অপরাধীর মতো করে বললো স্নিগ্ধতা৷ সাইফ হেসে ফেললো। চেয়ার থেকে ফোনটা নিয়ে সামনে ধরলো স্নিগ্ধতার। স্নিগ্ধতা মন খারাপ রেখেই বললো,

-মানলাম একই মডেলের ফোন আমাদের। তা বলে তোমার ফোন কেনো দিচ্ছো?

-এটা তোরই। বাইরে বেঞ্চেই রেখে এসেছিলি রাগ দেখিয়ে।

-সরি।

গাল ফুলিয়ে বললো স্নিগ্ধতা। সাইফ হেসে ওর গাল টেনে হেসে দিলো। তারপর দুজনে মিলে গেলো শাড়ির দোকানে। দুটো দোকান ঘোরার পর কল আসায় সাইফ দাড়িয়ে গেলো। ওকে রেখেই সামনে থাকা দোকানের দিকে এগোলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু কাচের দেয়ালের ওপারে শারাফকে শাড়ি ধরে বসে থাকতে দেখে পা থেমে গেলো ওর। একদম ওর বরাবর একটা গাঢ় নীল পাড়ের সাদা শাড়ি ধরে রেখেছে শারাফ। একহাতে শাড়ির হ্যাঙ্গার ধরে ঘাড় বাকিয়ে স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো ও। হাত উচিয়ে স্নিগ্ধতাকে ইশারা করলো খানিকটা ডানে সরে দাড়ানোর জন্য। স্নিগ্ধতা আশেপাশে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো, ইশারাটা ওকেই করেছে শারাফ। বাকামো দেখাতে ইচ্ছে করে বা দিকে সরে দাড়ালো ও। হতাশার ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলে শারাফ ওর হাতের শাড়িটাই বা দিকে সরিয়ে ধরলো এবার। ঘনকালো মেঘের মতো এলোচুল আর শুভ্রবরন মুখশ্রীতে কিঞ্চিৎ রাগের লালচে ভাব স্নিগ্ধতার। শারাফ মৃদ্যুস্বরে বললো,

-তোমার পরনে কেবল শারাফের পছন্দের শাড়িটাই মানানসই হবে প্রলয়া। আপাতত চিন্তা একটাই। ওই গাল যখন রাগের পরিবর্তে লাজুকতায় রাঙা হবে, তখন আমার কি হবে?

ওকে ওভাবে শাড়ি ধরে মুগ্ধচোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে অস্বস্তিবোধ হচ্ছিলো স্নিগ্ধতার। একপলক সাইফের দিকে তাকালো শারাফ। মোবাইলে ব্যস্ত সে। উঠে দাড়িয়ে বেরিয়ে আসলো ও দোকান থেকে। এসে সোজা স্নিগ্ধতার সামনে দাড়িয়ে গেলো। বড়বড় চোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। শাড়িটা ওর কাধে দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে শারাফ বললো,

-শুনুন মিস, এটাতে মাত্রাতিরিক্ত মানাবে আপনাকে। কিনবেন না প্লিজ। আমি চাইনা আমার পছন্দ করা শাড়িতে আমি ছাড়া আপনাকে অন্য কেউ দেখুক।

স্নিগ্ধতার চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। শারাফ সরে এসে হাতের ঘড়ির দিকে তাকালো একবার। কিছু না বলে চুপচাপ বেরিয়ে আসলো দোকান থেকে। যেনো কিচ্ছুটি ঘটেনি। স্নিগ্ধতার কানে একটা কথাই বাজছে। ‘কিনবেন না প্লিজ’। একটা জেদী নিঃশ্বাস ছেড়ে কাধের শাড়িটা মুঠো করে নিলো স্নিগ্ধতা। দোকানে ঢুকে ওই শাড়িটাই কিনে বেরিয়ে আসলো ও। বিস্ময়ে বোনের হাতে থাকা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলো সাইফ। পুরো ঘটনা না দেখলেও, দোকানের বাইরে থেকে শারাফকে হাতে শাড়িটা নিয়ে বসে থাকতে দেখেছিলো ও। প্রথমবারের মতো আজ নিজের আর সাইফের পছন্দের বাইরে শাড়ি কিনেছে স্নিগ্ধতা। আর সে পছন্দ অন্য কারো নয়, ইয়াকীন শারাফের।

#চলবে…

[রিচেইক হয়নি]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here