#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা
২১.
শারাফ একমনে ড্রাইভ করছিলো। গাড়ির স্পিড একটু বেশিই ছিলো ওর। স্নিগ্ধতা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। একেরপর এক, রাস্তার বাকিসব গাড়িগুলোকে পেরিয়ে চলেছে ওদের গাড়ি। যেনো কোনোরকম দেরি চাইছে না শারাফ। গোধুলীর আলোটা অবদি স্থিরভাবে দেখতে পারছিলো না স্নিগ্ধতা। অন্যান্যদিন সাইফ ওকে এই একই রাস্তা দিয়ে কতোকিছু বলতে বলতে নিয়ে যায়। এমনকি গাড়ি থামিয়ে হলেও ওকে আঁকার মতো মুহুর্তগুলো অবদি দেখিয়ে দেয়। আর আজকে যেনো অদম্য পক্ষিরাজে উঠেছে ও। এমনভাবে অভ্যস্ত না বলে ভালোই লাগছিলো না ওর। হঠাৎই নজরে এলো, ফুটপাতে একটা ছেলে হাতে একগুচ্ছ গোলাপ উচু করে ধরে আছে আর আরেকটা মেয়ে লাফিয়ে সেগুলো ধরার চেষ্টা করছে। উৎফুল্ল হয়ে ব্যাগ থেকে ড্রয়িংপেপার আর পেন্সিল বের করলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু ওগুলো হাতে নিয়ে জানালায় তাকাতেই ওর মন ভেঙে গেলো। ওটুকো সময়েই গাড়ি চলে এসেছে অনেকটা দুর আর ছেলেমেয়েদুটো চোখের আড়াল। একটুখানি দেখে নেওয়ার সময়টা শারাফ দেয়নি ওকে। শব্দ করে পেপার-পেন্সিল কোলে রাখলে স্নিগ্ধতা। শারাফের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্মস্বরে বললো,
– এতো তাড়া কিসের আপনার? বাসায় ব্…
তৎক্ষনাৎ ব্রেক কষে গাড়ি থামালো শারাফ। এতোটা জোরে ব্রেক করায় আশংকা নিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। শারাফ স্টেয়ারিংয়ে দুহাত ঠেকিয়ে, হাতের পিঠে থুতনি ঠেকিয়ে আরাম করে বসলো। তারপর আগ্রহী চোখে তাকালো স্নিগ্ধতার চোখের দিকে। স্নিগ্ধতা ওর সাথে সেভাবে কথা না বললেও, ওর চোখ ওর জন্য দুর্বলতা হয়ে উঠেছে। আস্তেধীরে চোখ মেললো স্নিগ্ধতা। শারাফ বললো,
– ইয়েস? কম্প্লিট প্লিজ?
দু দন্ড আগে কি বলতে যাচ্ছিলো, তা বুঝে উঠতে আবারো চোখ বন্ধ করে নিলো স্নিগ্ধতা। জিভ কামড়ে ধরে মনেমনে বকতে লাগলো নিজেকে। একটুপর কাচুমাচু চোখে তাকালো। শারাফ ঠোটে মুচকি হাসি। যদিও এই চোরাচোরা চাওনির চোখজোড়াই ওর সব সুখ কেড়েছে, তারপরও এরা ওর ভীষন প্রিয় হয়ে উঠেছে। স্নিগ্ধতা বললো,
– থ্ থাক! যাই আমরা?
শারাফ সোজা হয়ে বসে ঠোট কামড়ে হাসলো। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো,
– বউ রেখে আসিনি। তবে এখন আপনার সাথে এক গাড়িতে থাকা অবস্থায়, রাস্তায় লেইট করলে আই গেইস, বউ নিয়ে ফেরার মতো কান্ড ঘটিয়ে আমি ফেলতে পারি। আই হ্যাভ ফুল কনফিডেন্স ওভার মি।
বড়বড় করে তাকালো স্নিগ্ধতা। শারাফ এমনভাবে গাড়ি চালানোতে মনোযোগ দিয়েছে যেনো ও কিছু বলেই নি। শারাফ হঠাৎই চেহারায় কিছুটা গম্ভীরতা আনলো। বললো,
– আপনাকে কিছু বলার ছিলো। আসলে আমি…
– আব্ আমারো আপনাকে কিছু বলার আছে!
শারাফকে বলার সুযোগই দিলো না স্নিগ্ধতা। একপলক ওর দিকে তাকালো শারাফ। একহাতে আরেকহাতের কবজি মুঠো করে শক্ত হয়ে বসে আছে সে। একটা ক্ষদ্রশ্বাস ফেলে শারাফ আবারো সামনে তাকিয়ে বললো,
– আপনার কিন্তু বলার কিছুই নেই মিস স্নিগ্ধতা। আমাকে বলতে দেবেন না বলে কথার মাঝে কথা বলছেন আপনি।
স্নিগ্ধতা চুপ করে গেলো। মনেমনে নিজেকে অকর্মন্য বলে কয়েকবার সম্বোধন করতে বাধলো না ওর। ঠোটের কোনে রাখা কথা বুঝে ফেলার অদ্ভুত ক্ষমতা শারাফ রাখে, এটা সবাই জানে। সেখানে ওর তো সমবসময় এটা মাথায় থাকার কথা। তারপরও ভুলে ভুলভাল বলে ওঠে ও।
– তারপরও বলুন, কি বলতে চান শুনি?
শারাফের কথায় ধ্যান ভাঙলো স্নিগ্ধতার। এদিকওদিক চিন্তা করে বললো,
– আব্…মোহিনীর পদ খোয়া যাওয়ার পেছনে আপনার হাত আছে তাইনা?
শারাফ নিশব্দে হাসলো। বললো,
– আমার কাছ থেকে কথা ঘোরানো হয়তো আপনার দাড়াই সম্ভব হলো। প্রথমবারের মতো।
…
– এনিওয়েজ! চলুন আপনার টপিকেই কথা বলি আজ। হ্যাঁ মোহিনীম্যাডামের পদচ্যুতিতে কিছুটা অবদান আমার আছে। তবে যেভাবে আপনি ভাবছেন, সেভাবেও না। মুলতা কাজটা আমার বড়ভাইয়ের।
– আপনার বড়ভাই?
স্নিগ্ধতার বিস্ময়ী আওয়াজে ভ্রু কুচকালো শারাফ। স্নিগ্ধতা নিজেকে সামলে বললো,
– আ্ আইমিন, উনি কি করে মোহিনীকে পদচ্যুত করতে পারেন? উনি তো ওখানে ছিলেনও না রাইট?
– ভাইয়া বিডিতেও নেই। নরওয়েতে। আমাদের ভার্সিটিরই সিএসই-র স্টুডেন্ট ছিলো সে। যদিও ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ছিলো না, তবে তার পরিচিত অনেকেই এখনো আছে সেন্ট্রাল পলিটিকাল লিডারশিপে। আপনাকে যখন মোহিনী ট্রিগার করছিলো, আমি তখন ভাইয়াকে ওর বিষয়ে টেক্সট করেছিলাম। নামের সাথে ক্ষমতার অপব্যবহার শিরোনামটা তার কাছে বলতে হয়েছে শুধু। বাকিটা সেই সামলে নিয়েছে।
– নরওয়েতে বসেও বাংলাদেশে মোহিনীর মতো এতো ক্ষমতাধরকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেন উনি। বাহ!
বিরবিরিয়ে বললো স্নিগ্ধতা। কিন্তু সেটাও শারাফের কানে ঠিকই গেছে। তাই প্রশ্নসুচক চাওনিতে স্নিগ্ধতাকে বললো,
– আপনার প্রশ্নটা কোথায় বলুনতো মিস স্নিগ্ধতা? আমার বড়ভাই নরওয়েতে থাকতে পারে কি না সেখানে? নাকি ছয়বছর ক্যাম্পাসে থেকে এটুকো কমিউনিকেশন সে রাখতে পারে না কিনা সেখানে?
– আপনার প্রশ্নগুলো এতোটা প্যাচানো কেনো, সেখানে!
শারাফ এবারে শব্দ করেই হেসে দিলো। স্নিগ্ধতা আড়চোখে ওর হাসিটা দেখলো কিছুক্ষন৷ ওর ভয় ছিলো এই স্পষ্ট কথাটা নিয়ে। শারাফ হাসতে হাসতে বললো,
– সত্যি বলতে, সোজা কথায় কোনোদিন কিছু হয়ই নি আমার লাইফে। ইনফ্যাক্ট কিছুক্ষণ আগেও আমি চেষ্টা করেছিলাম, সোজা কথায় কথা আগানোর। সেটা আর হলো কোথায়?
…
– আসলে আমার নেভিগেশন ফিল্ডটাই এমন। হিউম্যান সাইকোলজি পড়তে গিয়ে নিজেরটাকেই বুঝাতে ভুলে যাচ্ছি প্রায়। সামনের জনকে রিড করাটাই এখন মেইন ফ্যাক্ট হয়ে দাড়িয়েছে এখন। রিসার্চ লেখার জন্য টানা কয়েকবছর ব্যক্তিভেদে আমার প্রশ্নের সুর যেমন পাল্টাতে হয়েছে, তেমনি ব্যবহারভঙ্গিও। এজন্য সব প্রশ্নগুলোতে সেসবের ছাপ থেকে যায় হয়তোবা। কান্ট হেল্প অফ দ্যাট।
– আর সে অভ্যাসটা আমার সাথেও ফলিয়ে চলেছেন!
– আমি তো আপনার ওপর অভ্যাস ফলাতে চাই না মিস স্নিগ্ধতা। আপনাকে ঘিরে থাকা সমস্ত স্নিগ্ধতা আমার অভ্যাস হোক, এমনটা চাইছি।
চমকানো চাওনিতে তাকালো স্নিগ্ধতা। পশ্চিমের ডুবুডুবু রোদটা চোখ বরাবর লাগছে ওর। গাড়ির সামনের সানভাইসর শেল্ড নামিয়ে দিলো শারাফ। কিন্তু একদমই তাকালো না স্নিগ্ধতার দিকে। পুরো পথটা নির্লজ্জের মতো নিরবে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো স্নিগ্ধতা। বাসার সামনে চলে আসায় শুধু আস্তেকরে বললো,
– এটাই।
গাড়ি থামিয়ে এতোক্ষণে আবারো স্নিগ্ধতার দিকে তাকালো শারাফ। চোখ সরিয়ে সিটবেল্ট খুলে ফেললো স্নিগ্ধতা। গাড়ি থেকে নামলো দ্রুততার সাথে। মাথা নিচু করে গাড়ির ওপরপাশ থেকে ঘুরে আসছিলো ও। কিন্তু অকস্মাৎ কারো বুকে বুকে ধাক্কা খেয়ে দুপা পিছিয়ে গেলো। চোখ তুলে দেখে শারাফ দাাড়িয়ে। ওর আগেই নেমে দাড়িয়েছে সে। শারাফ ওর দিকে কিছুটা ঝুকে দাঁড়িয়ে বললো,
– ড্রাইভ করছিলাম বলে আপনার চোখে চোখ রাখার রিস্ক নেইনি। যাইহোক, এখন কিছু বলার নেই আপনার?
ঘাম গরাতে লাগলো স্নিগ্ধতার কানের পাশ বেয়ে। অথচ ডিসেম্বরের মাঝামাঝি এ সন্ধ্যেটা শীতল হাওয়ায় পরিপূর্ণ। আর এমন কথার জবাবে জবাব দিয়ে, আজোবদি অনেককেই পাশ কাটিয়ে এসেছে স্নিগ্ধতা। সেই ওর গলায় আজ কথারা দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। শারাফের আগ্রহী দৃষ্টির কোনো এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি যেনো থামিয়ে দিচ্ছে ওকে। স্নিগ্ধতার গলা দিয়ে কোনোমতে কেবল বেরোলো,
– থ্ থ্যাংকস্।
– ফর?
স্নিগ্ধতা একটা বড় শ্বাস নিয়ে বললো,
– ফর এভরিথিং। আ্ আসছি।
দ্রুতপদে শারাফকে পাশ কাটিয়ে আসলো স্নিগ্ধতা। টের পেলো, ওর হৃদস্পন্দনের গতি বেড়েছে। শারাফ পেছন থেকে বললো,
– যদিও আমি কোনো সোজা প্রশ্ন করিনি, তবুও আপনার সোজা উত্তরের অপেক্ষায় থাকবো।
স্নিগ্ধতা পেছন ফিরলো। শারাফ অন্যদিক তাকিয়ে হাসি দিলো একটা। মেয়েদের এভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানোটা আসলেই ভয়ানক হয়। স্নিগ্ধতা বললো,
– ম্ মানে?
– কিছুনা। টেক কেয়ার।
এটুকো বলেই শারাফ গিয়ে গাড়িতে চরে বসলো। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সময়টুকো স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে রইলো ও। স্টেয়ারিংয়ে থাকা ওর হাতের কাটা দাগটায় দৃষ্টি আটকালো স্নিগ্ধতা। রাস্তার বাকে শারাফের গাড়িটা চোখের আড়াল হতে দৃষ্টি নামিয়ে নিলো ও। ধীরপায়ে বাসায় ঢুকে আগে বাসার দরজা লক করলো। তারপর নিজের রুমে গিয়ে, ব্যাগটা বিছানায় রেখে সোজা সোজা চলে গেলো ব্যালকনিতে। ওখানে ওর ক্যানভাস রয়েই যায় সবসময়। মনের সবটুকো অভিব্যক্তি যেনো যখনতখন তুলিতে আচড়ে দিতে পারে, সেজন্য। ছোটবেলা থেকেই অনেক শখের ওর এই প্রতিটা তুলি, প্রতিটা রঙ। কিন্তু সামনের তুলির প্লেটটাতে থাকা সাতরঙে দেখে আজ দম বন্ধ লাগতে শুরু করলো স্নিগ্ধতার। ধবধবে সাদা ক্যানভাসের দিকে তাকালো ও। কতো নির্দাগ! কতো নির্মল শুভ্রতায় ঝকঝক করছে ক্যানভাসটা!
অস্থিরতা বাড়লো স্নিগ্ধতার। ঢোক গিলে ও গলা ভিজালো নিজের। তারপর ব্যস্ত হয়ে আশেপাশে কিছু খুজতে শুরু করলো। মাথার চুল একহাতে উল্টে ধরে, জলরঙের কৌটো রাখার বক্সটা বের করলো ও। বারো তেরোটা কাচের কৌটোর মধ্যে সবার আগে চোখে পরলো কালো রঙটা। শুভ্রতায় সবচেয়ে কুৎসিৎ দাগ এটে দেওয়া কালো রং! কম্পিতহাতে কালো রঙটা হাতে নিলো স্নিগ্ধতা। ছিপি খুলে, চোখ বন্ধ করে পুরো কৌটোর রঙ ক্যানভাসে ছিটে মারলো। তারপর যখন চোখ খুললো, ততোক্ষণে ওর সাদা কাগজের ক্যানভাস কালোর ছোয়া পেয়েছে। দাগ লেগেছে সবটুকো শুভ্রতায়।
স্নিগ্ধতা শব্দ করে কেদে দিলো এবারে। কাদতে কাদতে হাত দিয়ে ডলা লাগালো ক্যানভাসে। মিটছে না সে দাগ! কেবল ছড়াচ্ছে! ও যতোই কালো দাগ মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে, তা কেবলই ছড়াচ্ছে। তবুও স্নিগ্ধতা থামলো না। কাদতে কাদতেই হাত চালালো ক্যানভাসে। ওর হাত কালিতে ভরে আছে, চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। চোখের জল মুছতে গিয়ে মুখে, কপালে কালি লেগে গেছে। অনেকটা সময় পর ক্যানভাস ছেড়ে একপা দুপা করে পেছোতে লাগলো স্নিগ্ধতা। রুমের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ধপ করে পরলো ও। ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ব্যালকনিতে থাকা ক্যানভাসে। সেখানে কালো রঙে আঁকা বিভীষিকাময় এক প্রতিচ্ছবি। আবারো টপটপ করে জল গরাতে লাগলো স্নিগ্ধতার চোখ বেয়ে। যে দাগ ওকে বারবার হিংস্রতার আভাস এনে দেয়, সে দাগ কি করে জীবন সাজাবে ও? এই কলঙ্কিত দাগ দিয়ে যে হাজার চেষ্টা করেও কখনো কিছু সাজানো যায় না। সংসার তো নয়ই!
#চলবে…

