নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ২৩.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

২৩.

এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলো স্নিগ্ধতার। বাইরের ঝলোমলো সকালটার দিকে ঘুমুঘুমু চোখে তাকালো ও। একটা নতুন সকাল। একটা নতুন শুরু। বারান্দার রেলিংয়ে বসা দুটো সাদা কবুতর ময়ুরের মতো পেখম মেলেছে। মাঝেমধ্যে পাখার পালকে মুখ গুজে আঁচড়ে দিচ্ছে দুজনে। ঠোটে হাসি ফুটলো স্নিগ্ধতার। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো ও। নিজের পুরো রুম জুড়ে চোখ বুলালো। অফহোয়াইট পেইন্টিংয়ের দেয়ালে ওর করা কারুকাজগুলোর পাশাপাশি সাইফ বেশ কয়েকটা রঙিন পর্দা দিয়ে সাজিয়েছে ওর রুমটা। ওগুলো দেখেই ওর মনে পরলো, সাইফ গতরাতে বাসায় ফেরেনি। ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলে বিছানা ছেড়ে নেমে আসলো স্নিগ্ধতা। খোলা চুলগুলো হাতখোপা করতে করতে পা বাড়ালো কিচেনের দিকে। রুম থেকে ড্রয়িংরুমে আসতেই ওর পা থামলো। ঠিকমতো তাকালো পাশ বরাবর থাকা সাইফের রুমটার দিকে। দরজা খোলা রেখে সাইফ ওর ইজিচেয়ারটায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে। পা টেবিলে তুলে দিয়ে, বুকে একটা ফাইল নিয়ে ঘুমোচ্ছে সে।

স্নিগ্ধতা কোমড়ে দুহাত রেখে একটা হতাশার শ্বাস ফেললো। চাবি আরেকটা দিয়ে সাইফ বাসায় ঢুকুছে, অথচ একটিবার ডাকেনি ওকে। তারওপর ঠিকঠাকমতো বিছানায় না ঘুমিয়ে কাজ করতে করতে চেয়ারেই ঘুমিয়েছে সে। স্নিগ্ধতা এগোলো। আস্তেধীরে ভাইয়ের বুক থেকে ফাইলটা সরালো। টেবিলটাও বেশ এলোমেলো হয়ে আছে কাগজপত্রে। চুপচাপ সেগুলো গোছাতে লাগলো স্নিগ্ধতা। কোনো একটা ফাইল টেবিলের ওপরপাশে সরিয়ে রাখতে গিয়ে ল্যাপটপে হাত লেগে যায় স্নিগ্ধতার। স্ক্রিন জ্বলে উঠলো তখনই। মানে ওতে কিছুক্ষন আগেও কেউ কাজ করছিলো। স্নিগ্ধতা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে সাইফের চোখের পাপড়ি কাপছে। স্বাভাবিক গলায় বললো,

– ঘুম না আসলে কাজ করতে পারো। ঘুমের ভান কেনো করছো?

একচোখে টিপে বন্ধ করে রেখে আরেকচোখ খুললো সাইফ। স্নিগ্ধতার স্বাভাবিক ভঙ্গি দেখে পুরোপুরিভাবে চোখ মেললো ও। নড়েচড়ে বসে একটা জোরপুর্বক হাসি দিয়ে বললো,

– ইয়ে, চোখ লেগে এসেছিলো আরকি।

– কাজের সময় তোমার চোখ লাগে ভাইয়া? এটা তো জানতাম না। যাইহোক, ফিরেছো কখন?

– ঘন্টা দুই হবে।

স্নিগ্ধতা গিয়ে পর্দাগুলো সরিয়ে দিলো। সাইফ মৃদ্যু হাসলো। আসলেই ওর ভঙিমা চিনতে কখনো ভুল হয়না স্নিগ্ধতার। হাত চেয়ারের পেছনদিকে রেখে বসলো সাইফ। বললো,

– ক্লাস আছে তোর আজ?

– হুম।

– আজকে আমার পুলিশস্টেশন যেতে হবে না।

– ওয়াও! ওয়ার্ক ফ্রম হোম? তো আমাকে কি…

– আজ তুইও বরং আর ভার্সিটি যাস না টুকি।

কপাল কিঞ্চিৎ কুচকে আসলো স্নিগ্ধতার। সাইফ পুলিশস্টেশন না গেলেও, ওকে ভার্সিটি নামিয়ে দিয়ে আসে। যাওয়া নিয়ে বারন করেনা কখনো। আজ হঠাৎ বারণ করার কারনটা ওর কাছে অবাক হওয়ার বিষয়ই বটে। সাইফ সেটা লক্ষ্য করলো। উত্তরটা সোজাসুজিভাবে বলে দেওয়াটাই সঠিক মনে হলো ওর। উঠে এগোলো ও স্নিগ্ধতার দিকে। একটু স্বতন্ত্রকন্ঠে বললো,

– গতকাল ক্যাম্পাসগেইটের কিছুটা সামনেই একটা অঘটন ঘটেছে। মোহিনী নামের কোনো এক ক্যাম্পাস পলিটিকাল ফিগারের চেহারায় এসিড ছুড়েছে কেউ। শুনেছিস কিছু এ নিয়ে?

স্নিগ্ধতার বিস্ফোরিত চাওনি। সাইফ বুঝলো, এ খবরটা এখনো অবদি ওর কানে আসেনি। বাসায় ফিরে ও গিয়েছিলো স্নিগ্ধতার রুমে। ব্যালকনির ক্যানভাস আর ঘুমন্ত স্নিগ্ধতার হাতে রঙ দেখে বুঝেছে, ভার্সিটি থেকে ফিরে আবারো আঁকতে বসেছিলো ও। রান্নাঘর, ডাইনিং স্পষ্ট বলেছে, না খেয়েই ঘুমিয়ে পরেছে স্নিগ্ধতা। তাই ও নিজেও খায়নি কিছু। মৃদ্যস্বরে বললো,

– চিনিস মেয়েটাকে?

– কালই প্রথম দেখেছিলাম ভাইয়া। কিন্তু এসব…

– শুনলাম এ ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই নাকি মেয়েটাকে দল থেকে পদচ্যুত করা হয়েছে। এরপরপরই এমন ঘটনা।

স্নিগ্ধতা স্তব্ধ হয়ে আছে। চঞ্চলের হুমকি, অনুর সাথে অদ্ভুত ঘটনা, মোহিনীর সাথে দেখা হওয়া, ওর পদচ্যুত হওয়া, তার সাথে শারাফের জড়িত থাকা, আর সবশেষে মোহিনীকে এসিড ছোড়ার মতো এই ঘটনা! কাল সারাদিনে ওর চারপাশে অনেকগুলো ভয়ানক ঘটনা ঘটে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে কিছু মনে না হলেও, এবার চাপা ভয় কাজ করছে ওর মনে, এমনটা টের পেলো স্নিগ্ধতা। একটা শুকনো ঢোক গিললো ও। সাইফ ওর নাথায় হাত বুলিয়ে আশ্বাসের সাথে বললো,

– ব্যাপার না। তুই এসব মাথায় নিস না হুম? এ নিয়ে ক্যাম্পাসে ঝামেলা হওয়ার সম্ভবনা আছে। ভায়োলেন্স তৈরী হতে পারে যেকোনোসময়। তাই এ কয়দিন তোকে আর ভার্সিটি যেতে হবে না। ক্লাসনোটস্ যেকোনোভাবে কালেক্ট করে নিস। হবেনা তাতে?

স্নিগ্ধতা অতি আস্তে করে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো। সাইফ বোনের চিন্তিত মুখটা উঁকিঝুঁকি দিয়ে দেখে নিলো। তারপর গলা ঝেড়ে বললো,

– এহেম! বলছিলাম কি, কেউ যদি চিন্তার মহাসাগর থেকে বেরিয়ে একটু আমার কথায় মনোযোগ দেয়, তাহলে আমি তাকে ভাবী গিফট করতে পারি। তার নাকি রায়বাঘিনী ননদীনি হওয়ার তীব্র ইচ্ছা?

স্নিগ্ধতা একপ্রকার চমকে উঠলো। ঠিক শুনলো, নাকি ভুল শুনলো এমন সন্দেহে বড়বড় চোখে ও তাকালো ভাইয়ের দিকে। সাইফ হেসে দিয়ে বললো,

– তোর অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য প্রতিবার কি এই কথাটাই বলতে হবে টুকি?

স্নিগ্ধতা গাল ফুলালো। বললো,

– সবসময় মজা না করে, কখনো সত্যিসত্যি এমনটা বলে আমাকে সারপ্রাইজও তো দিতে পারো ভাইয়া।

– এক্সাক্টলি! আমি তো এমনটাই ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম হুট করে এভাবে বলে সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু সত্যিটাকেও যে আমার বোন মজা হিসেবে নেবে, তা কি করে জানবো বলতো?

সাইফের বলা সত্যি শব্দটা স্নিগ্ধতার নিউরনে ধাক্কা লাগালো যেনো। থেমে রইলো ও। সাইফ ঘাড়টা চুলকে আমতাআমতা করে বললো,

– তোর অগ্নিলা ম্যামের অগ্নিশর্ম পিতার কাছে ডিরেক্ট বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে এসেছি রে টুকি।

মুখ আপনাআপনি হা হয়ে গেলো স্নিগ্ধতার। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না ও। কি থেকে কি হলো, এ নিয়ে সবে কিছু বলতে যাবে, সাইফ উচ্চস্বরে বললো,

– আ্ আমার কাবার্ডটা গুছিয়ে দে বোন। বিনিময়ে কফি খাওয়াচ্ছি। জলদি গুছা!

বলতে বলতেই সাইফ একপ্রকার ছুটে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে। দুম শব্দে দরজাটাও লাগিয়ে গিয়েছে ও। স্নিগ্ধতা শব্দ করে হেসে দিলো ভাইয়ের কান্ড দেখে। বেশ কিছুটা সময় পর দরজায় গিয়ে চেচিয়ে বললো,

– পারবো না তোমার কাবার্ড গোছাতে। আমাকে না জানিয়ে এতোবড় কান্ড ঘটিয়েছো, এবার বউকেও নিয়ে আসো একাএকাই! সেই এসে গুছিয়ে দেবে তোমার কাবার্ড!

– যদি নাই গোছাবি, তাহলে তোকে বাসায় রেখে কি লাভ বল? রুমে এসে কাবার্ড গোছানো না পেলে তোকেই আগে বিয়ে দিয়ে বিদেয় করে দেবো দেখিস!

বিয়ের কথা শুনেই হাসিটা মিলিয়ে গেলো স্নিগ্ধতার। ওকে ঘিরে সাইফের আশা, স্বপ্নের কমতি নেই। আর ও? এসবের সাথে নিজের অস্তিত্বকে মানতে নারাজ। ধীরপায়ে কাবার্ডের দিকে এগোলো স্নিগ্ধতা। ওটা খুলতেই কয়েকটা টিশার্টের সাথে দুটো ফাইল নিচে পরলো। স্নিগ্ধতা একএক করে সেগুলো তুলে, ঠিকমতো গুছিয়ে রাখলো। ফাইলদুটোর একটা রেখে আরেকটা রাখতে যাবে, ক্লিনফাইলের ওপরের ছবিটাতে চোখ পরলো ওর। মানুষটার পরনে নীলসাদা চেইকের শার্ট। পার্শ্বদিক থেকে তোলা ছবিটা অতি নিকট থেকে তোলা। সে সামনে তাকিয়ে, আর ডানহাত এমনভাবে তুলেছে যেনো কপালের দিকে হাত বাড়িয়েছে সে। নিচের কাগজপত্রগুলোতে সে মানুষটার বিভিন্ন কর্মঅভিজ্ঞতার বিবরনী। বোঝাই যাচ্ছে, সাইফের কেইসে সম্পৃক্ততা আছে তার। স্নিগ্ধতার কন্ঠনালী দিয়ে মৃদ্যুস্বরে বেরোলো,

– ইয়াকীন শারাফ…

– সাইকোলজিস্ট ইয়াকীন শারাফ ড্রাইভার হিসেবে কেমন রে টুকি?

– স্পিডটা বেশি।

সাইফ শব্দ করে হেসে দিলো এবারে। ভ্রুকুচকে ভাইয়ের হাসি পরখ করলো স্নিগ্ধতা। অজান্তেই সাইফের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে ও। সাইফ এগিয়ে একটা কফির মগটা ওর হাতে ধরিয়ে দিলো। স্নিগ্ধতা মগটা বেডসাইড টেবিলে রাখলো। নিজেরটাতে একচুমুক দিয়ে, স্নিগ্ধতার হাত থেকে শারাফের ছবিটা হাতে নিলো সাইফ। বললো,

– শুনেছিলাম মেয়েরা তাদের জীবনসঙ্গীর বাহ্যিকবেশিষ্ট্যে তাদের বাবা অথবা ভাইকে খোজে। কথাটা ঠিকই শুনেছিলাম তারমানে।

– মানে?

– মানে এদিকে আমি অগ্নিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে বেশিই তাড়াহুড়ো করে ফেললাম, ওদিকে তুই শারাফের অভারস্পিড নিয়ে বলছিস। কেমন অদ্ভুত মিলসম্পন্ন লাগছে না বিষয়টা?

– দ্ দেখো ভাইয়া…

সাইফের ফোন বেজে ওঠে। বিছানায় থাকা ফোনটার স্ক্রিনে ‘আরাফাত’ লেখা। হাসিটা কমে আসলো সাইফের। তবুও ঠোটে জোরালো হাসি ফুটিয়ে রিসিভ করলো ও কলটা। স্নিগ্ধতা মেঝের দিক তাকিয়ে চুপ করে রইলো। একটুপর সাইফ এগোলো স্নিগ্ধতার দিকে। বললো,

– আরাফাত দেশের বাইরে যাচ্ছে কিছুূদিনের জন্য। দেখা করতে চায়।

দুহাতে দুহাতের তালু খামচে ধরলো স্নিগ্ধতা। সাইফের চোখ এড়োলো না সেটা। বললো,

– যদি তুই না চাস তাহলে…

– ওনার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো ভাইয়া। উনি ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন গতকাল।

– আচ্ছা। আমি একাই গিয়ে দেখা করে নেবো। ত্ তুই কফিটা শেষ কর। আমি ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছি আজ।

নিশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সাইফ। স্নিগ্ধতা জানালা দিয়ে বাইরের আকাশের দিকে তাকালো। একফোটা জল গরালো ওর ডানচোখ থেকে। কারন হিসেবে উজ্জল আকাশের আলোকরশ্নিকে দায়ী করলো স্নিগ্ধতা। চোখের জলকনা মুছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে স্মিতকন্ঠে বললো,

– প্রকৃতির চার পরিক্রমা মাটি, পানি, বায়ু, আগুন। এদের মিলিয়েই মুলত সৃষ্টির সব রুপ প্রকাশ পায়। অথচ ধ্বংসের জন্য সবগুলোকে প্রয়োজন হয়না। একটার তান্ডবই যথেষ্ট সবকিছু শেষ করে দিতে। কি অদ্ভুত নিয়ম! হাহ!
আমাদের পছন্দের জিনিসগুলোও বোধহয় এমনই হয় তাইনা? এরা কখনো অবৈধ, কখনো নিষিদ্ধ, কখনো দামী, কখনো বা অন্যকারো। কোনো না কোনো দোষে দুষ্ট হয়েই আমাদের পছন্দের তালিকার সর্বোপরে স্থান করে নেয় এরা। ধ্বংসাত্মক হয়ে পরে ওই এক দোষ নিয়েই।

তাহলে আমি কেনো মিস্টার আরাফাত? আমি তো আপনার জন্য এ সবগুলো কলঙ্কে কলঙ্কিত। না আমার বৈধতা আপনার জন্য, না আমি আপনার জন্য অনুমিত, না আপনি আমি নামক মানুষটার দাম চুকাতে সক্ষম, নাইবা আমি আপনার। তবুও যদি বারবার বলার পরও আপনি পিছপা হতে রাজি নন। অবশ্য সেটা আপনার ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া আর কিছুই হবেনা। কারন আমি আপনাকে এগোতে দেবো না। জেনেশুনে আপনার ধ্বংস কামনা করতে পারিনা আমি। আমায় ক্ষমা করবেন মিস্টার আরাফাত। স্নিগ্ধতা আর যারই হোক, আপনার নয়! আপনার নয়…

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here