নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৩২.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৩২.

আসর আজান পরেছে কিছুটা আগেই। নবীনবরন অনুষ্ঠানে নামাজ বিরতি চলছে আপাতত। সেই সময়টায় ক্যাফেটেরিয়ার পাশে এক গাছের নিচের শানবাধানো জায়গাটায় বসেছে স্নিগ্ধতা আর ওর বন্ধুমহল। বেগুনী-সাদা শাড়িতে মেয়েরা, ছেলেরা আকাশী পান্জাবীতে। প্রায় আট দশটা জুনিয়রের সাথে পরিচয়পর্ব চলছিলো ওদের। শেষ বিকেলের বাকা রোদ পরেছে সবার চোখমুখে। ক্যাম্পাসে নতুন আসা ছেলেগুলোর চেহারায় কেবল নতুন জীবনের উচ্ছ্বাস আশা করেছিলো মুহিব। কিন্তু সময়ের বিচরনে ওর অনুভব হলো, প্রত্যেকের চোরা চাওনি ওদের দলের সর্ববামের কোনাটায়। আর সেখানে থুতনিতে হাত রেখে, মিষ্টি একটা হাসির সাথে বসে আছে স্নিগ্ধতা। ওর সাদা শাড়ির আচঁলটা নিচের ঘাস ছুয়েছে। গলার ডানপাশ দিয়ে পেছনের ছাড়া চুলের বেশিরভাগই সামনে ঝুকেছে। তবে ঘন পাপড়ির চোখজোড়া স্থির নেই ওরও। হাসি আড্ডার মাঝে আশেপাশে খুজে চলেছে যেনো কাউকে। পান্জাবীটার গলার দিক ঢোলা দিয়ে উঠে দাড়ালো মুহিব। এক জুনিয়রের কাধে হাত রেখে বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বললো,

– আমাদের এক বাচ্চা তো কবিতা লিখছে, আরেক বাচ্চা ছবি আঁকাচ্ছে। এবার একটু ডেয়ারিং কিছু হোক। হোয়াট সে গাইস?

উৎসাহ নিয়ে নড়েচরে বসলো সবাই। এরমাঝে নাইম নামের ওদের এক বন্ধু ছেলেটার দিকে এগোলো। তালুতে তালু ঘষতে ঘষতে বললো,

– এটাকে আমি টাস্ক দেবো বন্ধু। হট যাও!

মুহিব বিব্রত হলেও কিছু বললো না। নাইম ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললো,

– তারপর বলেন নিব্বাসাব, কোনো নিব্বি আছে আপনার?

– স্ সরি?

– সরি? ও আচ্ছা। মহেদয় মনেহয় বাংলা বোঝেনা। জবাব দিচ্ছে আংরেজী মিডিয়ামের প্রোডাক্টের মতো। আচ্ছা চল, আমি এবার অন্য ভাষায় তোকে প্রশ্ন করবো, তুই ইংরেজিতে জবাব দিবি। আমার প্রশ্ন বোঝা না বোঝা বিষয় না। তবে জবাব দেওয়া মাস্ট! দিতে না পারলে কিন্তু…

নাইম কথা শেষ করলো না। ছেলেটা শুকনো ঢোক গিললো একটা। নাইম গা ছাড়া ভাবে বললো,

– লা মুষখোমু দিমা ইতায়ালা?

ওর কথা শুনে শব্দ করে হেসে দিলো সবাই। এদিকে জুনিয়র না পারছে বুঝতে, না পারছে জবাব দিতে। নাইম ভ্রু নাচিয়ে বললো,

– উত্তর কই?

– স্ সরি ভাই…

– আবার সরি!

– ভ্ ভাই, ভাই বুঝিনাই ভাই। সরি ভাই।

নাইম নিজেও ঠোট টিপে হাসলো এবারে। ভয়ে জড়োসরো হয়ে গেছে ছেলেটা। পেছন থেকে ওদের একজন বললো,

– আবে গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা জিজ্ঞেস করেছে!

কথাটা কর্ণগোচর হতেই দ্রুত ঘাড় নাড়িয়ে না বোঝালো ছেলেটা৷ নাইম ওর কাধে থাবা মেরে বললো,

– সিংহপুরুষের মতো মুখে কথা বল ব্যাটা! গার্লফ্রেন্ডের কথা বলতে না পারলে, ভার্সিটিতে কেনো এলি? কিন্ডারগার্টেন যেতি। এতো ভয় পেলে চলে?

– প্রেম করি না ভাই।

নাইমের শেষ ভঙিমায় একটুও মনে হলো না ও কাউকে র‍্যাগ দিচ্ছে। ছেলেটা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে জবাব দিলো এবার। ওর কাধ থেকে হাত সরিয়ে, মোচড় তুললো নাইম। ঠোট উল্টে বাকিসবার দিকে ‘পোষালো না’ এমন প্রতিক্রিয়া দেখালো। হেসে দিলো সবাই। মুহিব সামনে দেখে, আলিশা ওর আরো দুটো সাঙ্গাপাঙ্গ নিয়ে ওদের দিকেই এগোচ্ছে। কিঞ্চিৎ হেসে, আয়েশী স্বরে বললো,

– তাহলে এক কাজ করি। আজকে প্রথম দিনেই আগে তোর একটা গার্লফ্রেন্ড জুটিয়ে দেই। আলিশা?

মুহিবের ডাক শুনে আলিশা এগোলো। সরু হাতার ব্লাউজের সাথে পাতলা বেগুনী রঙের শাড়ি পরেছে ও। একপলক স্নিগ্ধতাকে দেখে নিয়ে বললো,

– ডাকছিস কেনো?

– তোকে.…

– এ মুহিব, দাড়া দাড়া! আমি বলছি।

মুহিবকে থামিয়ে দিয়ে আবারো জুনিয়রের কাছে গেলো নাইম। উদ্দেশ্য, জুনিয়রের সামনে আলিশাকে অপদস্ত করা। মাত্রাতিরিক্ত ঢংগি মেয়েটাকে একদমই সহ্য হয় না ও। নাইম আলিশার দিকে তাকিয়ে, দাত কেলিয়ে জুনিয়রকে বললো,

– কি নাম যেনো তোর ফ্রেশার?

– ন্ নাইম। নাইম ভাই!

– আরেহ! নাইম। তাহলে তুই তো আমার মিতা রে মিতা! আচ্ছা চল, সে উপলক্ষে তোকে ডিসকাউন্ট। তুই পেয়ে যাচ্ছিস, এই আপুগুলোর মাঝে সবচেয়ে সুন্দরী আপুকে প্রোপোজ করার সুযোগ! এবার বল কাকে প্রোপোজ করতে চাস তুই? ফটাফট বল তো!

বিমুঢ়চোখে তাকালো ছেলেটা। কিন্তু মুহিবের বিরক্তি সীমা ছাড়ালো এবার। সবার মতো ওউ জানে উত্তরটা স্নিগ্ধতার দিকেই হবে। নিজেকে সংবরনের চেষ্টা করতে ব্যস্ত হয়ে পরলো ও। এখানে ওর কিছু বলা সাজেনা। আগে থেকেই সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কে, মজার উপলক্ষ্য হিসেবে এমনটা হয়ে আসছে। জুনিয়র বললো,

– আমার প্রোপোজ করা লাগবে না ভাই।

– লাগবে। আমি যখন বলেছি, তখন লাগবে। চল সিনিয়র আপু চুজ কর! জলদি জলদি!

– ভাই…

– আবে বলবি নাকি গেস্টরুম করবি?

এইটুক শুনেই থতমত খেয়ে গেলো ছেলেটা। তৎক্ষনাৎ আঙুল উচিয়ে স্নিগ্ধতাকে দেখিয়ে বললো,

– ওই আপুকে! ওনাকে ভাই!

ওওও বলে হেসে দিলো সকলে। স্নিগ্ধতা ঠোট টিপে হাসি আটকে রেখেছে। মুহিবের রাগ হলো। কিন্তু চেহারা একদম স্বাভাবিক রাখলো ও। ওদিকে ঈর্ষার লেলিহান দৃশ্যমান হলো আলিশার নজরে। সে তীক্ষ্মদৃষ্টি ছুড়লো ও নাইমের দিকে। নাইম আবারো ফোকলা হেসে বললো,

– সরি রে আলিশা৷ তুই নিজেকে যতোটা সুন্দরী ভাবিস, ততোটাও নস। যা আরেকটু আটাময়দা মেখে আয় গিয়ে। আমি দেখি এরমাঝে তোকে প্রোপোজ করার জন্যকোনো জুনিয়রকে মানাতে পারি কিনা। যা যা!

– আমার কথা তোকে ভাবতে হবে না নাইম। আর হ্যাঁ মিস সুন্দরীশর্মা, স্নিগ্ধতা! আজকে যতো খুশি, সিনিয়র, ব্যাচমেট, জুনিয়র সবার প্রোপোজ এন্জয় করে নে। শত হোক, মানুষের রুপ তো আজীবন থাকে না। তাইনা?

কথা শেষ করে আলিশা ওর হাসিটা বহাল রেখে চলে গেলো। নির্বাক হয়ে ওর চলে যাওয়া দেখলো স্নিগ্ধতা। ওর কথার আগামাথা কিছুই বুঝে ওঠেনি ও। কপাল কুচকে আসলো মুহিব-নাইমের। অনুরও ব্যাপারটা সুবিধের লাগলো না। এরইমাঝে এনাইন্সমেন্ট আসলো অনুষ্ঠান পুনর্রাম্ভের। মুহিব জুনিয়রদের যাওয়ার জন্য ইশারা করলো। ওরা গেলে সবাই একেএকে দাড়ালো অডিটোরিয়াম যাবে বলে। স্নিগ্ধতাও জুতোজোড়া হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালো। নাইম হঠাৎ হেকে উঠলো,

– এই স্নিগ্ধতা? দাড়া তো! তোকে ডেডিকেট করে কবিতা লিখে দিয়ে গেলে নান্নাসা জুনিয়র! শুনে যা!

হতাশচোখে তাকালো স্নিগ্ধতা। নাইম হাতের কাগজটা দেখে, গলা ঝেড়ে পড়তে লাগলো,

– এহেম এহেম!

‘ তার কাছে স্নিগ্ধতমও মুখ লুকোয় লাজে
তার শুভ্রতার জুড়িতে প্রলয়া নাম সাজে
তার বেগুনীপাড় শাড়ি যেনো জারুলফুলের চ্ছটা
তার চুলের বহর, তা মেঘমাল্যের ঘনঘটা
তার চুড়ির আওয়াজ জানে শিঞ্জনের মধুরতা
তার আড় চাওনি ছোড়ে প্রেমবাণের তীক্ষ্ণতা
তার উপস্থিতি হৃদদন্ডের মতো আশ
তার ওষ্ঠ? সে হুবহু রক্তজবার নির্যাস
তার নুপুরের ছন্দ, হৃদস্পন্দনের কারন
তার গাজরার সুবাসে, শ্বাস থামানো বারন।
তার উপমার ইতি হয়না
অথবা হয়তো সে একচ্ছত্র চন্দ্রনন্দিতা
রুপকহীন রুপকে কি নাম দেবো তবে?
প্রেমকলঙ্কিনী? নাকি প্রেমাসক্তি? স্নিগ্ধতা…’

সশব্দে হাত থেকে জুতোজোড়া পরে গেলো স্নিগ্ধতার। বাকিসবাইও হা হয়ে তাকিয়ে আছে নাইমের দিকে। নাইম কবিতাটা পড়ে নিজেও বোকাবনে গেছে যেনো। মজার ছলে ছেলেগুলোর একটাকে স্নিগ্ধতাকে নিয়ে কবিতা লিখতে বলেছিলো ও। সে ছেলে এতো ভয়ানক লেখা লিখবে, এমনটা কল্পনাও করেনি। অনু এগিয়ে কাগজটা হাতে নিলো। এপিঠ ওপিঠ দেখে বললো,

– মিনিটবিশেক দেখেই মধুসূদন হয়ে গেলো?

এবার স্নিগ্ধতাই কাগজটা হাতে নিলো। সবটা পড়ে শুকনো ঢোক গিললো একটা। এই প্রলয়া নামটা ওর চেনা লাগছে। এই উপমা ওর চেনা লাগছে। মুহিব বললো,

– এখন কি এটা ধরেই বসে থাকবি? প্রোগ্রামে চল?

– তোরা যা, আমি আসছি।

অনু ভ্রু কুচকালো। নাইম বললো,

– কোথায় যাবি? তোর সলো পারফর্ম তো এখনো বাকি।

– ক্যাম্পাসেই আছি। তোরা যা।

স্নিগ্ধতা খালি পায়েই হাটা লাগালো। কেউ কথা বাড়ালো না আর। স্নিগ্ধতা শাড়ির কুঁচি ধরে, হাতে কাগজসমেত চলে এলো মনোবিজ্ঞান বিভাগের সেমিনারে। ও আসতেই চুড়ি, গয়নার আওয়াজে বেশিরভাগই চোখ তুলে দরজায় তাকালো। আর সেখানে দাঁড়িয়েই পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে নিলো স্নিগ্ধতা। হাতেগোনা পনেরো বিশজন ছেলেমেয়ে পড়ছে ওখানে। কম হবারই কথা। ক্লাসটাইম শেষে এখন কেবল চাকরীপ্রার্থীরা আর থেসিসকারীরাই থাকবে সেখানে। পুরো সেমিনার চোখ ঘুরিয়ে ডানপাশের সারিতে দৃষ্টি থামালো ও। সাদা শার্ট পরিহিত মানুষটা ওর চেনা। চিরচেনাই হয়ে যাচ্ছে হয়তো কালাধিক্রমে। ওখানের বেশিরভাগ ওর দিকে তাকালেও, সে মানুষটার হেরফের নেই। স্নিগ্ধতা দরজায় দাঁড়িয়ে ডান পা বা পায়ে বারি লাগালো।

দু দন্ড আগে কানে আসা রিনরিন আওয়াজ তখনতখনই মস্তিষ্কের নিউরনে আঘাত হেনেছিলো শারাফের। স্নিগ্ধতার উপস্থিতি জানান দিয়েছে ওকে। কিন্তু বাকিসবের মতো তাকায়নি ও। নিজেকে সংবরন করে দৃষ্টি স্থির রেখেছে বইয়ে। কিন্তু এবার নুপুরের শব্দটা ওর বুকের বা পাশটায় লেগেছে। চোখ বন্ধ করে নিলো শারাফ। পেছন ফিরলো না। আর তাতে অভিমানের মেঘ যেনো পুরোপুরিভাবে দখল নিলো স্নিগ্ধতার মনে। আরো দুপা এগিয়ে, পরপর তিনবার ডান পা বা পায়ে বারি লাগালো ও। ফলে নুপুরের আওয়াজ তীক্ষ্ণ হলো। আর এদিকে টেবিলে রাখা হাত মুঠো করে নিলো শারাফ। মুচকি হেসে সামনেই তাকিয়ে রইলো ও। বেশ বুঝছে, ও ব্যতিত আশেপাশের প্রতিটা দৃষ্টি দরজায়। মেয়েদের মধ্যে কেউকেউ নিজস্ব ব্যাডামানুষকে চোখ রাঙালো, সেটাও দেখলো শারাফ। নুপুরের আওয়াজ শুনে সেমিনারের তত্তাবধায়ক স্নিগ্ধতাকে বললেন,

– এই মেয়ে, সেমিনারে সাউন্ড রেস্টিক্টেড। জানোনা? নুপুরের শব্দ হচ্ছে তোমার।

– খুলছি নুপুর।

একদম নোয়ানো স্বরে বললো স্নিগ্ধতা। ওর ওখান থেকে শারাফের পেছনদিকটা দেখা যাচ্ছে কেবল। কলম দিয়ে আস্তেধীরে, আরাম করে খাতায় কিছু লিখছে ও। নুপুর খুলতে গিয়ে, ইচ্ছে করে চুড়ির আওয়াজ তুললো স্নিগ্ধতা। তত্ত্বাবধায়ক এবারো বললেন,

– আরেহ্! এখন আবার চুড়ির আওয়াজ করছো কেনো? আওয়াজ না করে নুপুর খোলা যায় না?

– চুড়িও খুলছি।

নিজের হাতের দিকে তাকালো স্নিগ্ধতা। বা হাতভর্তি চুড়িগুলো। কতো শখ করে পরেছিলো ও। তারপরও সব মুল্যহীন লাগছে ওর এই মুহুর্তে। ওগুলো খুলে ফেলতে শুরু করলো স্নিগ্ধতা। শারাফ কলম মুখে গুজে, অতি সানন্দে চুড়ি খোলার আওয়াজ শুনতে লাগলো। স্নিগ্ধতা চুড়ি খোলার পর এবার চুলে হাত দিলো। গাজরাটা ফুলগুলো হাতের নখে ডলা মারলো। অদ্ভুতভাবে সে ফুলের ঘ্রাণ ছড়ালো পুরো সেমিনারজুড়ে। তত্ত্বাবধায়ক নাক উচিয়ে দুবার শ্বাস নিয়ে খেয়াল করলেন, এটা ফুলের ঘ্রাণ। স্নিগ্ধতা ইচ্ছে করে চুলের গাজরা নষ্ট করছে। কিন্তু শব্দ না করায় কিছু বলার পেলেন না উনি। শারাফ একটাবার ফিরলো না দেখে একটানে গাজরা খুলে ফেললো স্নিগ্ধতা। ছলছল চোখে বেরিয়ে আসলো সেমিনার থেকে। ফাকা করিডোর পেরোতে গিয়ে, দু ফোটা কান্নাও মুছলো চোখের। শ্বাস নিয়ে সবে পাশের বিনে নষ্ট গাজরাটা ফেলতে যাবে, কেউ অকস্মাৎ হাত ধরে ফেললো ওর। গায়ের পুর্নজোড় খাটিয়েছে সে স্নিগ্ধতার ওপর। ন্যানোসেকেন্ড ব্যবধানে স্নিগ্ধতা টের পেলো, আগুন্তকের বাহুবন্ধনীতে ও আবদ্ধ। ওর দুহাত ছাড় না দেবার সুনিপুন ভঙিতে, কোমড়ের পেছনে চেপে ধরেছে সে।

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here