নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা ৫.

0
3

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা

৫.

স্বপ্নীল। গেইটের নেইমপ্লেটে লেখা নামটা দেখে প্রতিবারই মৃদ্যু হাসি ফোটে শারাফের ঠোটে। গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকে পার্ক করলো ও গাড়িটা। বাসায় ঢুকে চারপাশে চোখ বুলালো আগে। পরিবারের প্রতিটা লোকজন মিলে হাসি, আড্ডা, ভালোবাসা, আদরে সবসময় স্বপ্নময় করে রাখে এই বাড়ি। কিন্তু আজকে স্বপ্নীল নিরব। কোথাও কেউ নেই এমন ভঙিমায় খাঁ খাঁ করছে যেনো। শারাফ ঠোট টিপে হাসলো। উপরতলার দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে বললো,

-মা?

তৎক্ষনাৎ চুড়িগয়নার কিঞ্চিৎ আওয়াজ আসলো ওর কানে। দক্ষিনের কোনা থেকে মেয়েলী ফিসফিসানিও শুনতে পেলো শারাফ। ও ভালোমতোই জানে, এই মানুষগুলোকে বাইরে বের করার কেবলমাত্র একটাই উপায় আছে। ওয়ালেটটা বের করে সবে টি টেবিলে রাখতে যাবে, কেউ একজন ঝড়ের বেগে এসে হাত বাড়ালো ওর ওয়ালেটের দিকে। শারাফ তার আগেই সরিয়ে নিয়েছে ওয়ালেট। দৌড়ের টাল সামলিয়ে কয়েকপা এগিয়ে থামলো মেহেরুন। পেছন ফিরে কোমড়ে হাত গুজে বললো,

-এটা কি হলো শারাফ?

শারাফ শব্দ করে হেসে দিলো। ও জানতো, এমন কিছুই হবে। শুনশান ভাবের পর, ওর ওয়ালেট নেওয়ার জন্য এই ঝড়োবেগের দৌড়ানিটা কেউ না কেউ দিতোই। পেছন ফিরে বাকিদের চেহারাটা দেখে নিলো একবার। বাসা থেকে ওর বিয়ের জন্য একপ্রকার মরুয়া হয়ে আছে প্রত্যেকে। ভাইবোনগুলো তো আছেই! তারসাথে বাদ যায়নি মা, চাচীসহ বড়রাও। উপায়ন্তর না দেখে শারাফ বলে দিয়েছে, ওর ভালোলাগার মানুষ আছে। সময় হলেই জানাবে সবাইকে। ওয়ালেটে ছবিও আছে তার। তারপর থেকেই এ বাসার মেয়েগুলোর একমাত্র লক্ষ্য ওর ওয়ালেট। দায়িত্ব নিয়ে তাই প্রতিটা দিনই কোনো না কোনোভাবে ওর ওয়ালেটের ওপর হামলা চলে। শারাফ গিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বললো,

-এ বাসায় আসার পর থেকে রেগুলার এই বেচারা ওয়ালেটকে নিশানায় রেখে চলেছো ভাবি। একটু দম নাও এবার? ওয়ালেটের পেছনে ছুটতে ছুটতে বুড়ি হয়ে যাচ্ছো তো! দেশে ফিরে শাওন ভাইয়া বুড়ি বউ নিয়ে সংসার করবে নাকি?

মেহেরুন সরু চোখে তাকিয়ে। পাশ থেকে শারাফের একমাত্র ছোটবোন শায়েরী বললো,

-ওর কথার জালে ফেসো না মেহেরুন ভাবী। শাওন ভাইয়া কিন্তু বলে রেখেছে ওর জন্য মেয়ে দেখে রাখতে। যাতে ও ফিরলেই শারাফ ভাইয়ার বিয়েটা সেরে ফেলতে পারে।

-তোর এইচএসসির রুটিন দিয়েছে না?

ভাইয়ের কথা শুনে চোরের মতো আশপাশ দেখে একটা জোরপুর্বক হাসি দিলো শায়েরী। গুটিগুটি পায়ে রওনা হলো নিজের ঘরের দিকে। শারাফ ছোটচাচীর দিকে তাকিয়ে বললো,

-সারাদিন পর বাসায় ফিরলাম, কোথায় সবাই মিলে আদরযত্ম করবে, তা না বিয়ে বিয়ে করে পাগলের ডাক্তারকে পাগল বানিয়ে দিচ্ছো বৌমা? মা? খেতে দাও কিছু?

মুসকান চকলেট খাচ্ছিলো। প্রায় শেষ হওয়া চকলেটটা শারাফের দিকে বাড়িয়ে বললো,

-এটা খাও ভাইয়া। তোমার তো খিদে পেয়েছে, পুরোটা দিয়ে দিলাম তোমাকে। আমার আর খাওয়া লাগবে না।

মুসকানের হাতে চকলেটের বদলে কেবল খোসাটাই চোখে পরলো শারাফের। ওকে কোলে বসিয়ে বললো,

-তুই ছাড়া কেউ বোঝে না আমাকে মুসু। বিয়ে তো তোকেই করা উচিত।

মিসেস নাহিদ হাত ধরে সরিয়ে আনলেন মুসকানকে। শাসানো স্বরে বললেন,

-এটাকে তুমি আর তোমার ছোটবাবা মিলেই কিন্তু বিগড়াচ্ছো শারাফ। ওর স্কুলের এক ভাবী আজকে আমাকে বলেছে, ও নাকি তার মেয়েকে বলেছে, আমি শারাফ ভাইয়ার নিকবউ হই। কতোটা দুষ্টু হয়েছে দেখেছো?

তার কথায় হেসে দিলো সকলে। এতোক্ষনে মুখ খুললেন শারাফের মা। বললেন,

-বুঝলে মেহেরুন, আমার কপালে বোধহয় ছোটছেলের বিয়ে দেখা নেই।

মায়ের কথায় হতাশ দৃষ্টিতে তাকালো শারাফ। উঠে দাড়িয়ে বললো,

-তোমার ছেলে সাইকোলজির স্টুডেন্ট ছিলো। এভাবে ইমোশনাল ব্লাকমেইল করে আজোবদি কোনো লাভ হয়েছে মা?

-তো যাতে লাভ হয়, এমন কোনো উপায় করছিস না কেনো তুই?

-বিয়ে মানে লাভ এটা কেমন কথা?

-বিয়ে মানে লাভ না হলেও, লাভ মানে প্রেম থেকে বিয়ে অবদি তো যেতেই পারো শারাফ। বাসায় বলে দিলেই পারো, আমাকে পছন্দ বলে কাউকে পছন্দ হচ্ছে না তোমার। এতো লজ্জার কি আছে বলো?

দরজায় দাড়ানো মেয়েটাকে দেখে হাসি ফুটলো সবার ঠোটে। শারাফ নিজেও খুশি হলো ওকে দেখে। কিন্তু হঠাৎই প্রেম শব্দটা শুনে অন্যজগতে হানা দিলো ওর মন। যেখানে হাজারো সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে চাওনি কাড়ে একজোড়া চোখ, সুন্দরতম এক মুখ! স্নিগ্ধতা!

ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বিছানায় বসে অনবরত কিবোর্ডে আঙুল চালাচ্ছে আরাফাত। একটা কোডিং শেষ করার চেষ্টা করছে অনেকক্ষন যাবত। কিন্তু কোনোমতেই মিলছে না ওটা। এ পর্যন্ত আটবার কোড এন্ট্রি দিয়েছে ও। তারপরও মিলছে না। অথচ এই সাধারন কোডিং ওর কতোবার করা। এরচেয়ে জটিল কোড কয়েকমুহুর্তে সলভ করেছে ও। তারপরও প্রতিবার স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ইরর কোড লেখাটা দেখে নিজেকেই শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছে ওর। ঠোটে ঠোট চেপে ধরে আরাফাত বেশ অনেকটা জোর খাটিয়ে কোল থেকে সরালো ল্যাপটপটা। তারপর ডানহাতে চুলগুলো উল্টে ধরলো নিজের। চোখ বন্ধ করে আস্তেধীরে শান্ত করার চেষ্টা করলো নিজেকে। কিন্তু তাতেও উল্টোটাই ঘটলো। চোখ বন্ধ করলেই স্নিগ্ধতার চেহারা ভেসে উঠছে ওর সামনে। তৎক্ষনাৎ চোখ মেললো আরাফাত। অস্থিরভাবে বিছানা থেকে নেমে রুমের মধ্যেই পাইচারী করতে লাগলো ও।

স্নিগ্ধতাকে অনেকেই পছন্দ করে আর এখনো অবদি ও সবাইকে প্রত্যাখান করে এসেছে, সবটাই জানে আরাফাত। কিন্তু নিজেকে সেই সবার মাঝে মানতে পারেনি ও। সাইফের সাথে বন্ধুত্ব, ওদের বাসায় প্রায়শই যাতায়াত, স্নিগ্ধতার সাথে কথা বলা, সব মিলিয়ে ওর অবস্থান নিসন্দেহে আলাদাই ছিলো। তাই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিতে চেয়েছিলো ও স্নিগ্ধতাকে। আর সেই ওকেও প্রত্যাখান করলো স্নিগ্ধতা। কি বলে? ও নাকি এইচআইভি’র পেশেন্ট! ওর মতো কেউ কিছুদিনের জন্য এই পৃথিবী দেখবে। কয়েকদিনের মধ্যে নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে স্নিগ্ধময়ী, সুন্দরী মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলবে পৃথিবী। এই বিষাক্ত সত্য কি করে মানবে ও? কি করে নিজেকে বোঝাবে, যাকে এতোটা আপন করার জন্য একটুএকটু করে সবটা সাজিয়েছে, সে ওর হতে পারে না!এই মেয়েটাকে ভুলতে পারবে ও? কোনোভাবে?

ভেতর থেকে স্পষ্ট উত্তর শুনতে পেলো আরাফাত। ওর পক্ষে স্নিগ্ধতার মুগ্ধতা কাটানো সম্ভব না। ওর চাই স্নিগ্ধতাকে। পরে সে যাই হয়ে যাক না কেনো। একমুহূর্ত দেরি না করে ফোনটা হাতে নিলে আরাফাত। ডায়াল করলে সাইফের নম্বরে।
সাইফ কাজ করছিলো। টেবিলে দুটো ফাইল, কিছু পুরোনো খবরকাগজ, দুটো মৃতদেহের বিভিন্ন এঙ্গেলে তোলা ছবি, ফরেনসিক রিপোর্ট। পাশেই ফোন বাজছিলো ওর। কিন্তু সাইলেন্ট থাকায় রিংটোন কানে আসলো না ওর। সাইফ কি মনে করে ফোনের দিকে হাত বাড়িয়েছে, দরজায় নক পরলো তখনই। আওয়াজ এলো,

-কফি।

সাইফ দরজায় তাকালো। খোলা দরজায় একটা কফিমগ হাতে দাড়িয়ে স্নিগ্ধতা নক করছে। খুব বেশি অপ্রস্তুত হলো না ও। বরং অপেক্ষা করছিলো এই ডাকটার জন্য। প্রতি সন্ধ্যার এ সময়টা ওর কাজের সময়। আর নিয়ম করে এ সময়েই কফি বানিয়ে আনবে স্নিগ্ধতা। ওর দিকে তাকিয়েই ডেডবডির ছবিগুলো ফাইলে ঢাকলো সাইফ। বললো,

-তোকে কতোবার বলবো, আমার রুম্…

-আমার রুমে ঢুকতে তোর নক করার দরকার নেই টুকি। যখন খুশি তখন এ রুমে আসতে পারিস তুই। আমার আদুরে বোনটা আমার রুমে প্রতিনিয়ত নক করে আসে, এটা আমার একদমই ভালো লাগে না। আমার প্রয়োজনের সময় তো আমিই দরজা লক রাখি। সো যখন দরজা খোলা থাকবে, তুই নক না করেই ভেতরে আসতে পারিস, এটুকো বুঝিস না? এরপর থেকে নক করে আসতে হবে না আর! মনে থাকে যেনো!

রুমে ঢুকতে ঢুকতে একশ্বাসে কথাগুলো বললো স্নিগ্ধতা। সাইফ থম মেরে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। স্নিগ্ধতা কফিমগটা টেবিলে রেখে দুহাত বুকে গুজে দাড়িয়ে বললো,

-এই অবদিই ছিলো, নাকি আজকে এর সাথে আরো কিছু এড করতে চেয়েছিলে?

সাইফ হেসে দিলো। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বললো,

-মুখস্ত করে ফেলেছিস দেখছি।

-অস্বাভাবিক কিছু? দৈনিক একই কথা হজম করতে হলে মুখস্থ না হয়ে যাবেই বা কোথায়? আমি চাই তুমি শান্তিতে কাজ করো। এজন্য নক করি। আর তুমি অহেতুক অনুমতি কথাটা এনে আমাকে কষ্ট দাও ভাইয়া! অকারন!

-ওভাবে বলিস না টুকি। তুই তো জানিস, আমি সব পারি, কিন্তু তোকে কষ্ট দেওয়ার কথা ভাবতেও পারি না। তুইই তো আমার সব। তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল? বাবা-মা চলে যাওয়ার পর…

কথা শেষ করার আগেই হুশ ফিরলো সাইফের। স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে দেখে ছলছল করছে ওর চোখজোড়া। নাকটা লাল হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি করে কথা ঘুরাতে বললো,

-দেখনা টুকি! আ্ আমার বুকশেলফটা একেবারে এলোমেলো হয়ে আছে! একটু গুছিয়ে দে তো ওটা!

স্নিগ্ধতা বেশ বুঝলো, কথা ঘোরাতেই এমন বলছে সাইফ। কিছু না বলে চুপচাপ শেলফ গোছাতে লাগলো ও। সাইফ নিরবে তাকিয়ে রইলো বোনের দিকে। এই মুখটার হাসি ওর জন্য সব। ওই চেহারায় মেঘ জমলে মানায়ই না! এগিয়ে ওর চুলে হাত বুলিয়ে বললো,

-সারাদিন ভার্সিটিতে থেকে চুলগুলোর কি হাল করেছিস টুকি? রঙও লেগে আছে দেখছি! চল তোর চুলে তেল লাগিয়ে দেই। এমন এলোমেলো চুল আমার টুকিকে মানায় না!

ভাইয়ের আদুরে গলা যথেষ্ট ছিলো স্নিগ্ধতার সবটুকো চোখের জলকে হার মানানোর জন্য। তবুও জলভরা চোখ লুকোতে পারলোনা ও সাইফের থেকে। দুদন্ড পরই টুপটাপ দুফোঁটা অশ্রু ঝরালো ওর চোখ থেকে। বললো,

-কেনো এমন হলো ভাইয়া? কেনো এমনটা হলো বলোতো?

সাইফ কিছুই বললো না। স্নিগ্ধতা নিশব্দে কাদতে কাদতে আস্তেধীরে মাথা ঠেকালো ওর বুকে। জ্বলতে থাকা ফোনটা চোখ পরলো স্নিগ্ধতার। ওয়েলপেপারে ওদের দুভাইবোনের ছবি। আর স্ক্রিনে আটটে মিসড্ কলের নোটিফিকেশন। আরাফাতের নামটা দেখে ভেতরটায় নিরব ঝড় বইতে লাগলো স্নিগ্ধতার। বুঝলো, আরাফাত মানবে না ওর কথা। সাইফকে সবটা জানাতে চলেছে ও। স্নিগ্ধতা মনেমনে নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগলো, আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের জন্য।

#চলবে…

[ গল্পের সবে শুরু। পরিচিতিতে তাই অনেকগুলো চরিত্র আনতে হচ্ছে। কাহিনীবিস্তৃতিতে মুল চরিত্রগুলোই পাবেন। ততোক্ষন ধৈর্য্য রাখার অনুরোধ রইলো। ভালোবাসা❣️
শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here