নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা ৮.

0
2

#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা

৮.

স্নিগ্ধতাকে জ্ঞান হারাতে দেখে মাথা ফাকা হয়ে গেছে সাইফের। সবরকমের ভায়োলেন্সে ফোবিয়া আছে বলে সাইফ কখনো ক্রাইমসিনের বাতাসটাও লাগতে দেয়নি ওর গায়ে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে রক্ত, মৃতদেহের ছবি দেখে আগেও বেশ কয়েকবার জ্ঞান হারিয়েছে স্নিগ্ধতা। চঞ্চলের জন্য আজকেও তেমন পরিস্থিতি তৈরী হতে যাচ্ছিলো। আর এ ভয়েই জ্ঞান হারিয়েছে ও। ব্যস্তভাবে অনুর গায়ে হেলে পরা বোনকে জরিয়ে নিলো সাইফ। গলায় কথা জড়িয়ে আসছে ওর। স্নিগ্ধতার গালে হাত রেখে কম্পিতকন্ঠে ডাকলো,

-ট্ টুকি? এ্ এই টুকি? চোখ খোল? টুকি?

অগ্নিলা চোখের চশমা ঠেলে দিয়ে ঠিকমতো তাকালো সাইফের দিকে। গায়ের রঙ উজ্জল, বলিষ্ঠ দেহ আর চেহারায় আতংক। যেনো মেয়েটার অসুস্থতায় ওর নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসছে। মুহিব জানে, সাইফের কাছে স্নিগ্ধতা কি। স্বাভাবিক গলায় বললো,

-ভাইয়া, আপনি শান্ত হোন। তেমন কিছু হয়নি আপনার বোনের। সেন্সলেস হয়ে গেছে জাস্ট। চোখেমুখে পানি দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

সাইফ চোখ তুলে তাকালো মুহিবের দিকে। আর অগ্নিলা অবাকচোখে তাকিয়ে রইলো ওর জলভরা চোখের দিকে। বোনের শুধুমাত্র অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতেই ভাইয়ের এমন অবস্থা হয়, এটা প্রথমবার দেখলো ও। মুহিব ব্যাগ থেকে বোতল বের করে দিলো, আর অনু কিছুটা পানি ছিটিয়ে দিলো স্নিগ্ধতার মুখে। খানিকটা পর আস্তেধীরে চোখ মেললো স্নিগ্ধতা। মৃদ্যুস্বরে বললো,

-আমি ঠিক আছি ভাইয়া।

স্বস্তির শ্বাস ফেললো সাইফ। অনুকে ধরে দাড়ানোর চেষ্টা করলো স্নিগ্ধতা। পরেই যাচ্ছিলো। এবারে অগ্নিলা সামলে নিলো ওকে। স্নিগ্ধতা অসম্ভব সুন্দর এক হাসি দিয়ে বললো,

-থ্যাংক ইউ ম্যাম।

প্রতিত্তরে অগ্নিলা নিজেও হেসে বললো,

-ধন্যবাদের কিছুই নেই। বাট আই হ্যাভ আ এডভাইস ফর ইউ। ভয় না পেয়ে, যেকোনো প্রকার হ্যারাজমেন্টে ভয়েজ রেইজ করতে শেখো। ওদের বা অন্য কারো দিক থেকে আর কোনো প্রবলেম হলে আমাকে জানিও। এন্ড টেক কেয়ার অফ ইওরসেল্ফ হুম? আসছি।

অগ্নিলা পা বাড়াচ্ছিলো। সাইফ চুপচাপ শুনলো ওর কথা। কি ভেবে ওর সামনে গিয়ে পথ আগলে দাড়ালো। নিজের কার্ডটা অগ্নিলার সামনে ধরে বলে উঠলো,

-ওদের বা অন্য কারো দিক থেকে কখনো কোনো প্রবলেম হলে আমাকে জানাবেন, এমনটা আশা রাখবো। টেক কেয়ার।

অগ্নিলা কিছুটা বিস্ময়ে হাতে নিলো কার্ডটা। সাইফ দাড়ালো না। স্নিগ্ধতাকে নিয়ে হাটা লাগালো গেইটের দিকে। গাড়ি করে আসার সময় দৃষ্টিতাক করলো ভার্সিটির উত্তরের রাস্তার মোড়ের দোকানে। স্নিগ্ধতার জ্ঞান হারানের সময়ও চঞ্চলের কুৎসিত চাওনিটা ছিলো ওরই দিকে। ওরা সবাই মিলে স্নিগ্ধতার পাশে ছিলো আর তখন চঞ্চল গিয়ে ওই দোকানে বাইক নিয়ে বসেছে। দাতে দাত চেপে গেলো সাইফ। স্নিগ্ধতার আশেপাশের এই কুৎসিত দৃষ্টি ওর সহ্য হচ্ছে না। একদমই সহ্য হচ্ছে না।

সাইফ-স্নিগ্ধতা বেরিয়ে গেলে কার্ডটার দিকে তাকিয়ে নিশব্দে হাসলো অগ্নিলা। ওর মুল্যবোধের অন্তরায়, প্রবলেম তৈরী করবে এমন কোনো উৎসকে অবশিষ্ট না রাখা রন্ধ্রে মিশে গেছে ওর। এমনিতেও, অন্যায়ের তাড়নায় যে এখনো অবদি পুলিশের শরনাপন্ন হয়নি, অন্যের তাড়নায় কেনো হবে?
মাথা নেড়ে হেসে, মনোবিজ্ঞান বিভাগের স্টাডিরুমের দিকে পা বাড়ালো অগ্নিলা। শারাফের আসার কথা ছিলো আজ। চারপাশে চোখ বুলিয়েও দেখতে পেলো না ও শারাফকে। এককোনে কলম মুখে পুরে আবির পেপারে থাকা শব্দজোট মিলাচ্ছিলো। অগ্নিলা এগিয়ে গিয়ে বললো,

-শারাফ আসেনি আবির? ওর তো আসার কথা ছিলো আজকে। সেমিনার কার্ড রিভ্যালিড করার জন্য।

আবির চোখ তুলে তাকালো না। নিজেরমতো ব্যস্ত থেকে বললো,

-ঘন্টাদুই আগে ফাইন আর্টসের এক্সিবিশনে গিয়েছিলো। কিছুক্ষন আগে আমাকে কল করে বললো পড়া শেষ করে চলে যেতে। ওর নাকি কি জরুরি কাজ পরে গেছে।

কপালে ভাঁজ পরলো অগ্নিলার। শারাফের চারুকলা প্রদর্শনীতে যাওয়ার কারনটা ওর কাছে যতোটা অস্পষ্ট, তেমনি অস্পষ্ট লাগছে ওর শিডিউল ভেঙে জীবনযাপন করাটা। যেটা স্বপ্নীলে কেউ খেয়াল না করলেও, ও ঠিকই খেয়াল করেছে। অগ্নিলা বুঝতে পারছে না, এটুকো অস্বাভাবিকতাকে কিভাবে নেওয়া উচিত ওর?

ছাত্রহলের পাশের পুরোনো লালইটের কলাভবনটার ছাদে নেশার আসর বসিয়েছে চঞ্চল। ওর সাথে আছে আরো ছয় সাতজন। কঠিন, তরল সবরকমের নেশাদ্রব্য নিয়ে মত্ত্ব হয়ে আছে প্রত্যেকে। চঞ্চল পেছনে একহাতে হেলান দিয়ে বসে আছে, আরেকহাতে সিগারেট টানছে একমনে। কিছুক্ষন পরপর আকাশের দিকে মুখ করে সিগারেটের ধোয়া উড়িয়ে দিচ্ছে। একজন ওর দিকে একটা বোতল এগিয়ে দিয়ে বললো,

-ভাই, নিবেন না আজ?

জবাব না দিয়ে চঞ্চল সিগারেটে টান দিলো। ছেলেগুলো একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। সবাই ব্যস্ত হয়ে নেশায় ডুব দিলেও আসার পর থেকে চঞ্চল শুধু সিগারেটই খাচ্ছে। ওদের মাঝের আরেকজন বললো,

-আপনারে ছাড়া নেশা জমেনা চঞ্চল ভাই! এই বিদেশী মালটার স্বাদ কেমন, কেমনে টানবো দেখাই দেন তো!

-কি ব্যাপার ভাই? আজকে কি সব আমাদের? এমন উন্মুক্ত উপভোগের সুযোগ দেওয়ার কোনো বিশেষ কারন?

চঞ্চল তখনো চুপ। ওর ঠিক পাশের একজন হেসে বোতলটা নিলো। ঠাট্টার স্বরে বললো,

-চঞ্চল আজ নেশা করবে না। স্নিগ্ধতা নামের ওই মেয়েটার রুপে আজকে সব বদনেশায় এলার্জি ধরে গেছে ওর। তাইনা রে চঞ্চল?

চঞ্চল সিগারেট নামিয়ে তাকালো ওর দিকে। ভ্রু নাচিয়ে ছেলেটা জিজ্ঞাসা করলো ও ঠিক বলেছে কিনা। সিগারেটটা ছাদের মেঝেতে ডলা মেরে ফাকা গলায় বললো,

-আমার ওকে চাই সবুজ।

সবুজ হেসে ফেললো শব্দ করে। চঞ্চল আর বাকিসব কপালে ভাজ ফেলে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। সবুজ হাসি থামিয়ে বললো,

-কাকে?

-ওই নেশালো চোখ, ঠোঁট, ওই পুরো মানবীকেই আমার চাই।

-ওই স্নিগ্ধ মানবীর নাম স্নিগ্ধতা এহমাদ।

চঞ্চল আরেকপলক তাকালো সবুজের দিকে। সবুজ একাধারে সিগারেট, বোতল মুখে পুরে বললো,

-ফাইন আর্টসের এই মেয়ের রুপে ঘায়েল হয়নি, এমন কম ছেলেই আছে ক্যাম্পাসে। তার বাসা বাইশ নম্বর রোড। বাবা মা কেউ নেই। শুধু একটা ভাই আছে। পুলিশ।

-ভাই পুলিশে তো কি? চঞ্চল ভাইয়ের কাছে ওসব কোনো ব্যাপার হলো সবুজ ভাই?

জুনিয়র ছেলেটা অতি তাচ্ছিল্যে বললো। সবুজ নাক ডলা মেরে জোরে শ্বাস নিতে নিতে বললো,

-ভাই পুলিশ বলে না। তবে এই প্রথমবার মনে হচ্ছে, কোনো মেয়ে মনে হয় তোর ধরাছোয়ার বাইরে চঞ্চল। এই ভার্সিটিতে আসার পর দলের নামে, বসের নামে ক্যাম্পাসের কম মেয়েকে ছুয়েছিস তুই? ছাত্রীহলেও রাশলীলার সুযোগ আছে তোর। কোনোদিনও এতোটুকোও ঝামেলা হয়েছে বলতো? আর আজকে কি হলো? প্রথমবার কোনো মেয়ের শুধু ওড়না ছুয়েই যে চড়টা খেয়েছিস, আজীবন মনে থাকবে আমার। অগ্নিলা ম্যাডাম তো…

কথা শেষ করলো না সবুজ। অগ্নিলার কথা মনে পরতেই চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো চঞ্চলের। সামনে থাকা ম’দের বোতল হাতে নিলো ও। একনাগাড়ে বোতল শেষ করে বাকা হেসে বললো,

-ওই ম্যাডামের তেজ কি করে কমাতে হয়, চঞ্চল তা খুব ভালোমতোই জানে।

-কি করবি? তুলবি?

-তা তো তুলবোই। কিন্তু তার আগে আমার ওই স্নিগ্ধতাকে চাই।

চঞ্চলের কথায় সবুজ আবার হাসলো। মদের বোতল শেষ করে পাশেরটা দেখিয়ে বললো,

-ওটা টান দে! কড়ক আছে!

চঞ্চল নিজেরটা শেষ করলো, তারপর পাশেরজনেরটাও শেষ করলো। চোখ যতোদুর সম্ভব ঝাপসা হয়ে গিয়েছে ওর। টালমাটাল অবস্থায় বসে সবুজ বললো,

-আগেই বুঝেছি, তোর নজরে ভালোমতোন পরেছে মেয়েটা। অবশ্য নজরে পরার মতোই। মানতে হচ্ছে, আলিশা না বললে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা বোধহয় তোর চোখের আড়ালেই থেকে যেতো। ওমন গায়ের রঙ, নাগিনের মতো চলন, আর…

কুৎসিত একটা ভঙ্গিমায় ম’দের বোতলে চুমুক দিলো সবুজ। টলতে টলতে বললো,

-শোন চঞ্চল, স্নিগ্ধতাকে এনে আগেই বসকে বলিস না। তোর পরে ওই মেয়েকে আমি একটু…

বলা শেষ করার আগেই চঞ্চল সামনের কাচের বোতলগুলোর একটা বারি লাগালো মেঝেতে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবুজকে ঠেলে ফেলে দিয়ে, ওর বুকের ওপর চরে বসেছে চঞ্চল। টুকরো কাচ সবুজের একচোখে ঢুকিয়ে দিতে যাচ্ছিলো নির্বিকারভাবে। অল্পের জন্য থেমেছে ওর হাত। আর্তনাত করে ওঠার চেষ্টা করলো সবুজ। পারেনি। ওর মুখে গুড়ো ড্রাগসের পুরো প্যাকেটটা পুরে দিয়ে মুখ আটকে ধরেছে চঞ্চল। বাকি সবাই উঠে দাঁড়িয়ে গেছে এমন দৃশ্য দেখে। চঞ্চল উদ্ভ্রান্তের মতো সবুজের মুখের কাছে মুখ নিলো। ঝাপসা চোখে সবুজ ওকে দেখতেই পাচ্ছে না ভালো করে। চঞ্চল ফিসফিসিয়ে বললো,

-ওই মেয়ে ওর সব রুপ দিয়ে শুধু চঞ্চলের তৃষ্ণা মেটাবে সবুজ। আগে পরে চঞ্চল ছাড়া, কেউ থাকবে না ওর। বস-ও না! মনে রাখিস, যে চোখ ওর দিকে ক্ষুধার্তের দৃষ্টিতে তাকাবে, সে চোখ তুলে নেবো আমি। শুধুমাত্র বস তোকে ভালোবাসে বলে আজকে ছেড়ে দিলাম তোকে। নইলে তুই যে আমার বন্ধু, তা কিন্তু আমি ভুলে গেছি। তোর এই চোখ দুনিয়ার সব মেয়ের ওপর থাকলেও স্নিগ্ধতার থেকে দুরে রাখ। নাহলে আমি এই চোখকেই তোর থেকে আলাদা করে দেবো। কথাটা মাথায় রাখিস!

চঞ্চলের ক্ষিপ্রতা দেখে ভয়ে জড়োসরো হয়ে গেছে বাকিসবাইও। সবুজের বুকের ওপর থেকে নেমে, চঞ্চল আরো কয়েকদফায় সিরিন্জ পুশ করলো হাতে। রক্তজমা চোখে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,

-যে যার রুমে চলে যা। আর স্নিগ্ধতাকে কিভাবে ট্রিট করবি, সেটা মাথায় রাখিস।

অবস্থা অনুকুলে নেই বুঝে, গরগরিয়ে সালাম দিয়ে, দ্রুতপদে ছাদ থেকে নেমে গেলো সবাই। চঞ্চল উঠে দাঁড়িয়ে, একটা বোতলের পুরোটা ঢেলে দিলো সবুজের মুখে। বললো,

-হুশে ফের সবুজ। রুমে যা।

মাথার চুল টানতে টানতে এলোমেলো পায়ে বেরিয়ে আসলো চঞ্চল। সবুজ মাথা ঝারা মারলো৷ চোখ ডলা মেরে দৃষ্টিশক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। পারছেই না। ওকে পাউডার পুরোটা খাইয়েছে চঞ্চল। চারপাশ সমানে ঘুরছে ওর। শোয়া থেকে উঠে বসার শক্তিটুকোও পাচ্ছে না। হঠাৎ অনুভব করলো, কেউ একজন আছে ওর আশেপাশে। নিজেকে সামলানোর আগেই ওর সম্পুর্ন মুখ বেধে দিলো কেউ। হাতপা ছোড়াছুড়ির চেষ্টা করলো সবুজ। কিন্তু ততোক্ষনে নেশার প্রভাব ছড়িয়েছে ওর শরীরজুড়ে। চোখের সামনের ঘুটঘুটে অন্ধকার ওকে অকস্মাৎ মনে করিয়ে দিলো, এ অন্ধকার কেবলমাত্র অন্ধকার নয়। এ অন্ধকার, স্নিগ্ধতার ঔজ্জ্বল্যের মোহে পরে যাওয়ার শাস্তি। ভয়ানক শাস্তি!

[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here