#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
অন্তিম পর্ব.
ধরনীতে সন্ধ্যে নেমেছে। আধার নেমেছে স্বপ্নীলেও। হাসোজ্জল বাড়িতে তখন শোকের স্তব্ধতা। শারাফ ভেতরে ঢুকে দেখে মেহেরুন ফ্লোরে পাথরের মুর্তির মতো বসে আছে। এলোমেলো চুল, কাজললেপা চোখ, শাড়ির আঁচল ফ্লোরজুড়ে। ওর পাশে ওর মা, মিসেস নাহিদ কাদছেন। চোখ ঘুরিয়ে সোফায় তাকাতেই দেখে মিসেস সেজান অজ্ঞান হয়ে পরে আছেন। শায়েরী মায়ের মাথায় হাত বুলাচ্ছে আর কাদছে। সেজান সাহেব নিজেও কাদছেন শব্দ করে। নাহিদ সাহেব কাদতে কাদতে ফোন করছেন ডক্টরকে। স্বপ্নের চেয়েও সাজানো স্বপ্নীলকে এমন ধ্বংসস্তুপের মতো দেখে শারাফের বুক হাহাকার করে ওঠে। মায়ের দিকে এগিয়ে যায় ও। শায়েরী ওকে জড়িয়ে ধরে, ‘ভাইয়া’ বলে ফুপিয়ে কেদে ওঠে। বোনকে শক্তকরে জরিয়ে ধরে শারাফ। সেজান সাহেব বললেন,
– কি থেকে কি হয়ে গেলো শারাফ? কি থেকে কি হয়ে গেলো?
কপাল চাপড়াতে লাগলেন তিনি। শারাফ বুঝে উঠতে পারছে না, কাকে কি বলবে। বোনকে ছেড়ে মায়ের সামনে বসে ও। মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদ্যু আওয়াজে ডাকে,
– মা? ও মা?
মিসেস সেজান সাড়া দিলেন না। শারাফ পানি ছেটালো তার চোখে। আবারো ডাকলো। কয়েকবার ডাকার পর চোখ মেললেন তিনি। শারাফকে দেখে উচ্চস্বরে কেদে উঠলেন। শারাফ মাকে জরিয়ে, তার মাথায় হাত বুলি বললো,
– শান্ত হও মা। শান্ত হও।
– আমার শাওন…
শারাফ মাকে সামলানোর চেষ্টা করলো। মিসেস সেজানের কান্নার বেগ বাড়ে। কাদতে কাদতে হঠাৎই তিনি উত্তেজনা নিয়ে বলতে লাগলেন,
– আমার ছেলেটাকে ওই মেয়ে মেরে ফেলেছে শারাফ। আমার ছেলেটাকে ও মেরে ফেলেছে।
– তোমার ছেলেকে কোনো মেয়ে মারেনি মা। তোমার ছেলেকে ওর পাপ মেরেছে।
মেহেরুনের শান্ত জবাবে বিস্ময়ে তাকালেন মিসেস সেজানসহ বাকিসব। স্নিগ্ধতা সাইফের কাছে ধরা দেবার পরপরই টিভিতে নিউজ করা হয়েছে, প্লাস্টিক সার্জারী করে স্নিগ্ধতার রুপ নেওয়া য়্যুমু প্রতিশোধের তাড়নায় নিজের চার ধর্ষক সৌরভ, তারেক, চঞ্চল আর শাওনকে হত্যা করেছে। এরমধ্যে শাওনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। ওর সাথে স্টোরেজে মোহিনীর লাশও ছিলো। জেনেলাকে স্টোরেজে ওরাই দুজন মিলে নিয়ে গিয়েছিলো। য়্যুমুর বাকিসব খু’নের কারন, তারা মেয়েদের সাথে বাজে ব্যবহার করেছে। সাইফ পৌছে যাওয়ায়, সময়সংকুলানের জন্য আরাফাতকে গুলি করে হত্যা করেছে য়্যুমু। শারাফের সাইফকে পাঠানো ড্রাগ আর হলের রাজনৈতিক কুকর্মের প্রমাণও দেখানো হচ্ছে টিভিতে। মেহেরুন বললো,
– তোমার ছেলে এতোবেশি পাপ করেছে, এতোবেশি পাপ করেছে যে, ওর সর্বোচ্চ সাজাটাই প্রাপ্য ছিলো। ওকে বা ওর সঙ্গীদের মেরে য়্যুমু কোনো দোষ করেনি। যদি য়্যুমুর জায়গায় আমি থাকতাম, আমিও হয়তো ওকে…
– মেহেরুন!
মিসেস সেজানের আওয়াজে মেহেরুন থেমে যায়। আবারো কান্না শুরু করলেন তিনি। মিসেস নাহিদ আর শায়েরী তাকে ধরে বসে রইলো। মেহেরুন উঠে দাড়ালো। মাকে বললো,
– চলো মা।
– কোথায়?
– চৌধুরী নিবাস।
স্বপ্নীলের সবাই বিস্ফোরিত চোখে তাকালো ওর দিকে। মিসেস সেজান কিছু বলতে যাবে, মেহেরুন তার আগেই বললো,
– আমাকে মেয়ে হিসেবে ডেকো মা। আমি আসবো স্বপ্নীলে। কিন্তু শাওনের নামে এখানে আর একমুহুর্ত না। আমি ওকে ঘৃনা করি। ওর নামকে ঘৃনা করি। ওর স্ত্রীর পরিচয়কে ঘৃনা করি! আসছি।
শারাফ ওর পথ আগলে দাড়ালো। মেহেরুন বললো,
– আমাকে আটকিও না শারাফ৷ আমি আর আটকাবো না। যদি পারো, য়্যুমুর শাস্তি মওকুফের চেষ্টা করো। অন্যায়ের সাথে অন্যায় করাটা অন্যায় না। যদি সত্যিই ওকে ভালোবাসো, ওকে স্বপ্নীলে ফিরিয়ে আনো শারাফ। সুন্দর, সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দাও। শি ডিসার্ভস ইট। তোমার ভাইয়ের চোখের মিথ্যে ভালোবাসাকে সত্যি ভেবেছি। তোমার চোখে ওর জন্য দেখা ভালোবাসাকে মিথ্যে প্রমান করো না।
চোখের পানি মুছে মেহেরুন স্বপ্নীল থেকে বেরিয়ে গেলো। পুরো স্বপ্নীল মুষড়ে যায়। যে মেহেরুনের চলাফেরায় স্বপ্নীলে ছন্দ উঠতো, সে মেহেরুন আর স্বপ্নীলে থাকছে না। শারাফের ফোনে সাইফের ম্যাসেজ আসে। ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট দিয়েছে। মিসেস সেজান শারাফকে আকড়ে ধরলেন। বললেন,
– ওই য়্যুমু নামের অভিশাপ এ বাড়িতে আর ঢুকবে না শারাফ।
– ও অভিশাপ না মা। ও স্নিগ্ধতা। স্নিগ্ধতা ইয়াকীন শারাফ।
এটুক বলে শারাফ মায়ের হাত ছাড়িয়ে দেয়। ও জানে, সবাই যখন সত্যিটা জানবে, কেউ আর স্নিগ্ধতার ওপর রাগ করে থাকবে না। দ্রুতপদে নিজের রুমে ঢুকলো ও। স্নিগ্ধতাকে এতোগুলো দিন অবসার্ভেশনে রেখেছিলো ও। চারবছর আগের এক্সিডেন্টের পর, সাইফ ওকে যে কনসাল্টেন্টের সাথে দেখা করিয়েছিলো, তার রিপোর্ট, এতোদিনে ওর নিজের বানানো রিপোর্ট, সেইসাথে আরো কয়েকজন বিদেশী সাইকোলজিস্ট-রিসার্চারের রিপোর্ট একসাথে করেছিলো ও। সেগুলো নিয়ে আবারো পুলিশস্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয় ও। কাগজগুলো নিয়ে সোজা সাইফের টেবিলে রাখে। খালি লকাপ দেখে বলে,
– স্নিগ্ধতা কোথায়?
সাইফ কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। শারাফ আবারো বললো,
– স্নিগ্ধতা কোথায় মিস্টার এহমাদ? কোথায় রেখেছেন ওকে?
…
– ‘ও য়্যুমু নয়, স্নিগ্ধতা।’ শুধু এটুকোতে আইন ওকে ছেড়ে দেবে না আমি জানি। এইযে ওর ডিআইডি’র রিপোর্ট। অনেক বড়বড় ডক্টরের রেফারেন্স আছে এখানে। এবার ওকে আর দোষী বলতে পারবেন না আপনারা। কোথায় ও?
…
– জবাব কেনো দিচ্ছেন না মিস্টার এহমাদ? স্নিগ্ধতা কোথায়?
ধৈর্যের সীমা পেরিয়ে যাওয়ায় এবার টেবিলে বারি মেরে উচ্চস্বরে বললো শারাফ। তৎক্ষনাৎ সাইফও উঠে দাড়ালো। টেবিলে শারাফের রাখা ফাইলগুলো ঠেলে ফেলে দিয়ে চেচিয়ে বললো,
– কোর্টে চালান করে দিয়েছি ওকে! কারন ওর কোনো ডিআইডি নেই! কোনো মাল্টিপল ডিজঅর্ডার নেই! ডিএনএ টেস্টে জেনেলা সাকলিকের ডিএনএ’র সাথে ডিএনএ ম্যাচ করেছে ওর! আমার ডিএনএ-র সাথে নয়! ও য়্যুমুই! টুকি না!
পুরো পৃথিবী থমকে যায় শারাফের। ও শতভাগ নিশ্চিত, ওর অবজার্ভেশনে ভুল নেই। স্নিগ্ধতা যে স্নিগ্ধতাই, এতে কোনো ভুল থাকতে পারে না। তাহলে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট কেনো উল্টো হবে? কেনো স্নিগ্ধতার ডিএনএ সাইফের পরিবর্তে জেনেলার ডিএনএ’র সাথে ম্যাচ করবে? শারাফ স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে। তখনই সাইফের ফোনে কল আসে একটা। ওপাশের কথা চুপচাপ শুনলো সাইফ। কান থেকে ফোন নামিয়ে চেয়ারে ধপ করে বসে পরলো ও। বললো,
– রাষ্ট্রপক্ষের উকিলের কাছে ইন্সপেক্টর বাকের সব প্রমান জমা দিয়েছে। চৌদ্দটা খু’নের দায়ে, আদালত য়্যুমুর ফাঁসির আদেশ জারি করেছে শারাফ। কাল বিকেল চারটায় ওর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হবে।
•
ইস্তাম্বুলের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় যে যার কাজে ছুটছে ব্যস্ত মানুষগুলো। ইটের বদলে সাদাপাথরে তৈরী ছোট্ট বাড়িটায় কাঠের দরজা। কলিংবেলের পরিবর্তে দুবার ধাক্কা পরলো সে দরজায়। দরজা খুলে যায়৷ দরজায় দাড়ানো শারাফকে দেখে ডক্টর জেনেলার চোখ থেকে জল গরালো। এক সপ্তাহের ব্যবধানে শারাফকে দেখছে সে। আর এ সাতদিনেই, মৃতপ্রায় হয়ে গেছে শারাফ। পরনে একটা হালকা রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট। এলোমেলো চুল, রুক্ষতা, ক্লান্তিভর্তি চেহারা। দেহে কোনোমতে কেবল শ্বাসটাই চলছে। বোঝাই যাচ্ছে, এ কয়দিনে তাকে খুজতে সব উল্টেপাল্টে দিয়েছে শারাফ। জেনেলা একটা ঢোক গিললো। তারপর দরজা ছেড়ে ভেতরে চলে গেলো। যন্ত্রমানবের মতো ভেতরে ঢুকলো শারাফ। কোনোদিক তাকালো না। জেনেলা কয়েকটা কাগজ হাতে ফিরে এলো। শারাফের দিকে এগিয়ে দিয়ে ইংরেজীতে বললো,
– শেষবার যখন স্নিগ্ধতার সাথে দেখা হয়, ও বলেছিলো, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেনো, শারাফ তোমার কাছে আসবে জেনিমম। ও এলে, ওকে এটা দিয়ে দিও।
কাগজগুলো দেখে শারাফের গায়ের জোর কমে আসে। জেনেলা বললো,
– য়্যুমুর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো তোমাকে ভালোবেসে বিডিতে যাওয়া। ওর সে ভুলের মাশুল এতোগুলো জীবনকে দিতে হবে, আমি ভাবতে পারিনি। এতো আক্ষেপ, আফসোসের ভীড়ে, স্নিগ্ধতাকে দেওয়া কথা রাখতেই এখনো বেচে আছি। আজ আমার সে দায়িত্ব শেষ। এবার তোমার পালা ইয়াকীন।
কাগজগুলো হাতে নেয় শারাফ। জেনেলা আস্তেকরে সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দিয়ে বসলো। তারপর বাইরের আকাশে তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টিতে। শারাফ হাতের কাগজের ভাজ খোলে। এইতো, স্নিগ্ধতার ঘ্রাণ সে কাগজে! আর তাতে গোটাগোটা হরফে লেখা,
❝
কলঙ্কস্নাত প্রেমিক,
এমন সম্বোধনের কারন তুমি জানো। ওদিক না যাই। কাগজ ফুরিয়ে যাবে। ইয়া বড়বড় ক্যানভাসে ছবি এটে দেওয়া স্নিগ্ধতার আজ কাগজ কলমের যে বড্ড অভাব। এইটুকোন কাগজ অতি কষ্টে জোগার করিয়েছি জেলার আঙ্কেলকে দিয়ে। সে বলছিলো, তুমি নাকি কারাগারের সামনে পাথরের মতো দাড়িয়ে আছো? বৃষ্টি-ঝড় কিছুই মানছো না? বিশ্বাস করো শারাফ! আমার তোমার এ অবস্থা সহ্য হচ্ছে না। পারলে ছুটে গিয়ে জরিয়ে ধরতাম তোমাকে। পৃথিবীর সব নিয়ম, সব দেয়াল ভেঙে গুরিয়ে দিতাম। ভালোবাসি বলে সব অপরাধের শাস্তি মাথা পেতে নিতাম। কিন্তু আমি নিরুপায়। যদি আমি তোমার সাথে দেখা করতে রাজি হয়ে যাই, তোমার বিধ্বস্ততা দেখতে হবে আমাকে। তোমার নিস্প্রান চাওনি দেখতে হবে আমাকে। তোমার এমন অবস্থা আমি মানতে পারবো না শারাফ। ও দৃশ্য আমার কাছে মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণার। তাই আর দেখা করলাম না তোমার সাথে। এগুলো জেনিমমের কাছে গচ্ছিত রাখলাম। এগুলোর কাছে কোনো একদিন তুমি ঠিক পৌছাবে। জানি আমি।
চিঠিটা লেখার উদ্দেশ্য তোমাকে আমার দিকটা বলা। সবাই যা দেখেছে, সবাই যা জানে, তার বাইরে আমার কথাগুলো বলা। গল্পের শুরুটা তুমি জানো। হ্যাঁ, এসবের শুরু সেই চারবছর আগের এক্সিডেন্ট। য়্যুমুর হয়ে স্নিগ্ধতার শোধ তোলার গল্প। বাবা মা হারিয়ে নিজেকে ঘরবন্দি তো রেখেছিলাম। কিন্তু সেসময়েই আমার হাতে প্রথম খু’ন হয়। এরপর আরো দুটো। এই খু’নগুলো কবে, কখন, কাকে কিভাবে করেছি নিজেও জানিনা। শুধু এটুক জানি, ওরাও কোনো না কোনো মেয়েকে অসম্মান করেছিলো। জেনিমম সবটা জানতো। আমাকে বোঝায় সে। কিন্তু আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমি বেরোতে পারবো না। তখনও আমি শাওন কিংবা ওর চার বন্ধুর বিষয়ে খবর লাগাতে পারিনি। সিদ্ধান্ত নেই, মনে রাখার জন্য নির্দিষ্ট ধাচে পরের খু’নগুলো করবো। করিও তাই। আরো চারটে খু’নের পর, কেইস চলে যায় আমার নিজের ভাইয়ের কাছে। ভাইয়া সেগুলো রিলেট করে ফেলে।
ততোদিনে নীলাভাবী আর বাকের স্যারের সাথে আমার পরিচয় হয়। তবে তারা শাওনের বিষয়ে জানতো না। তুমি দেশে আসলে। নিজের সাথে জড়াবো না বলে শুরুতে এভোয়েড করেছি তোমাকে। কিন্তু কাজে দেয়নি। অজান্তেই কখন যে তোমার…সে যাকগে। আস্তেআস্তে সবুজ, মোহিনী, চঞ্চল, তারেক, শাওনের চক্রের কথা জানতে পারি। আমার তখন একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, শাওনকে নরওয়ে থেকে দেশে আনা। তাই নীলাভাবীকে বিয়ের বিষয়ে বলি। যাতে বিয়েতে শাওন আসে, আর বিয়ের আগেই আমি ওদের শেষ করে এ সবটার ইতি টানতে পারি। কিন্তু শাওন বিয়েতে আসতে মানা করে দেয়। কয়েকদফায় পিছিয়ে যায় আমার পরিকল্পনা। নীলা ভাবী ভাইয়ার সাথে জুড়ে যায়। তারপর বুঝলাম, শাওনকে দেশে আনার একমাত্র উপায়, তোমার বিয়ে। আর ঠিক সেসময়েই তুমি আমাকে ভালোবাসো বললে।
তোমার ভালোবাসাকে স্বীকার করে নিলাম। জানো শারাফ? সেবার প্রথমবারের মতো ভয় হতে লাগলো আমার। সত্যিসত্যি তোমার ভালোবাসায় জড়িয়ে যাওয়ার ভয়। কথা ছিলো, শাওন দেশে আসলে, বিয়ের আগেই আমি ওর আর ওর চার সঙ্গীর ইতি টানবো। আর তারপর দুরে পাড়ি জমাবো। কিন্তু তা হলো না। ভালোবাসা নামক অদৃশ্য প্রতিঘাতে মুহুর্তে মুহুর্তে নিঃশেষ হয়ে যেতে লাগলাম আমি। সব বদলালো আমার! মনে হতো লাগলো, আমি নিজেকেই চিনছি না। ভালোবেসে ফেললাম তোমাকে। তারপর বিয়ের রাতে তুমি বললে, আমার ডিসঅর্ডার আছে। নিজের অবস্থান তখন পুরোপুরিভাবে পরিস্কার হয় আমার কাছে। টের পাই, কেনো আমি প্রথম তিনটে খু’নেরকথা মনে রাখতে পারিনি, কেনো খু’নের সময় আমি নিজেকে ভুলে য়্যুমুর কথা ভাবতাম, কেনো রক্তে ভীতু মেয়েটা রক্তে স্নান করতেও পিছপা হতো না। সব প্রশ্নের জবাব খুজে পেলাম আমি। অথচ আমি কিনা বরাবর নিজেকে বুঝিয়েছি, এসবের কারন ওই পশুদের পাপ, ওদের প্রতি ঘৃনা। কখনো মাথায় আসেনি, য়্যুমুকে ভাবতে ভাবতে, আমি য়্যুমুকেই ধারন করতে শুরু করেছিলাম।
তবে তাতে আফসোস নেই। খু’ন করার জন্য আমি অনুতপ্ত নই। আমিতো জ্বলছি কেবল তোমাদের কষ্ট দিয়ে। তোমার কথামতো বিয়ের রাতে যদি শাওন নিখোঁজ থাকতো, আমি হয়তো কিছুই করতে পারতাম না। সবটা তোমার ইচ্ছেমতো হতো। আমার ডিসঅর্ডারের রিপোর্ট দেখিয়ে, তুমি হয়তো আমাকে বাচিয়ে নিতে আর শাওনকে আইনি শাস্তি দিতে। কিন্তু শাওন তা করেনি। ও নিজের ডেরায় জেনিমমকে ধরে নিয়ে যায়। ভুলটা ওর ওখানেই ছিলো। জেনিমমের হাতঘড়ির ট্র্যাকার থেকে আমি জানতে পারতাম সে কোথায় আছে। এরপর এখানে তোমায় থামিয়ে মিস্টার আরাফাতকে নিয়ে সেখানে যাই। আর নীলাভাবীকে বলি ভাইয়াকে ট্র্যাকারের লোকেশনসমেত ছেড়ে দিতে। ভাবি করেও তাই। এজন্যই তোমরা আমাকে লোকেট করতে পেরেছিলে। বাকের স্যারকে দিয়ে সমস্ত এভিডেন্স আমি আগেই কোর্টে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। সেসব প্রমানে আদালত তার বা নীলাভাবির সম্পৃক্ততা কেউ খুজে পাবে না। মিডিয়ায় সবটা যা দাড়াবে, আমি য়্যুমু, নিজের ধর্ষকদের হত্যা করেছি। আর যারা মেয়েলী কাজে জড়িত, তাদেরও সহ্য করতে পারবোনা বলে মেরেছি। এখানে বাকের স্যার রাজি হতে চাননি। কিন্তু আগেপরে আমাকে মরতেই হবে, আর আমার মৃত্যুতে যদি সে পদোন্নতি পায়, ভবিষ্যতে আইননুসারে বহু নরপশুকে শাস্তি দিতে পারবেন তিনি। তিনিও বিচক্ষণ। তাকে এটুক বুঝাতে খুববেশি কষ্ট করতে হয়নি। আমি জানতাম, অনেকগুলো খু’ন, নিসন্দেহে ফাঁসির আদেশ হবে আমার। হয়েছেও তাই। যেহেতু বাকের স্যার আগেই সবটা প্রসিকিউশনে জমা দিয়ে দিয়েছিলেন, পুলিশস্টেশন আসার পরপরই কোর্টে চালান করে দেওয়া হয় আমাকে। মাঝখানে অতিরিক্ত কাহিনী যেটা হয়, ডিএনএ টেস্ট।
আমি জানি শারাফ, পুরো পৃথিবী মানলেও, তুমি কখনোই মানবে না আমি য়্যুমু। স্নিগ্ধতাকে স্পর্শ করা প্রথম পুরুষ তুমি। সেই তোমার ভুল কি করে হয়? সত্যিই তোমার ভুল ছিলোনা। তবে তোমার কথাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টও ভুল নয়। তুমি সবই জানো। কেবল চারবছর আগের এক্সিডেন্টের পুরোটা জানো না। ওসময় আমার প্রচুর ব্লাডলস হয়েছিলো। জিনগত কারনে আমার সিকল সেল ডিজিস ছিলো। বডিতে ঠিকমতো ব্লাড তৈরী হয় না, একইসাথে ব্লাডসেল দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। মানে ওই সময় শুধু ব্লাড প্রোভাইড করাটা এনাফ ছিলো না। সেসময় আমাকে বাচাতে গেলে দুটো কাজ আবশ্যক ছিলো। এক, ব্লাড দেওয়া; দুই, নতুন ব্লাডসেল তৈরী করতে পারে এমন বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। য়্যুমু তুলনামুলক সুস্থ ছিলো তখন। জেনিমমকে ওর সাথে ঘটা নৃশংসতার কথা বলে, গ্যাংরেপের সময় শাওনদের একে অপরের যে নাম ধরে ডাকতে শুনেছিলো, সেগুলো বলে দেয়। আমাদের টিস্যু ম্যাচ করে। আমার অবস্থা শুনে ও সিদ্ধান্ত নেয়, যতো ব্লাড দরকার, ও দেবে আমাকে। সাথে নিজের বোনম্যারোও। ওর শারীরিক অবস্থার জন্য ডক্টর মানতে চায়নি। ওই অবস্থাতে ব্লাড, বোনম্যারো একসাথে ডোনেট করলে ওর মৃত্যু নিশ্চিত ছিলো। এদিকে আমারও মরণাপন্ন দশা। জেনিমমকে য়্যুমু শান্তশিষ্ট ধমকি দেয়, ধর্ষিতার জীবন নিয়ে ও বাচতে চায় না। ওর কথা না শোনা হলে ও আবারো সুইসাইড এটেম্প্ট করবে। তারচেয়ে ভালো এটাই, ও আমার মাঝে বেচে থাকুক। স্নিগ্ধতা হয়ে। জেনিমম বিচক্ষণ। রাজি হলেন তিনি। ডক্টররা দুটো নিশ্চিত মৃত্যুর পরিবর্তে একজনকে বাচানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
চারবছর আগে আমি জেনিমমের মেয়ের বোনম্যারো নিয়েছি। আমার ব্লাডের ডিএনএ জেনিমমের সাথে ম্যাচ করবে, এটাই স্বাভাবিক। ভাইয়া স্যাম্পল নেবার সময় আমাকে চুল দিতে বলেছিলো। তা করিনি আমি। ইচ্ছে করেই ব্লাডস্যাম্পল দিয়েছি। কেননা চুলের ডিএনএ আমার নিজের। ওটা হুবহু ভাইয়ার ডিএনএ-র সাথে ম্যাচ করতো। আমি স্নিগ্ধতা জানলে, ভাইয়া দুর্বল হয়ে পরতো, ভেঙে পরতো। তুমিও আমার ডিআইডি রিপোর্ট আদালতে পেশ করার সময় সুযোগ পেতে। তখন আর যাই হোক, তোমরা দুজন আমার ফাঁসি হতে দিতে না। যেকোনো মূল্যে বাচিয়ে নিতে আমায়। কিন্তু আমি সেটা চাইনি শারাফ। এই সুন্দর পৃথিবী আমার কাছে বিষময় হয়ে উঠেছে। ক্লান্ত আমি। অন্যায়ের সাথে লড়তে লড়তে, অন্যায় করতে করতে ক্লান্ত আমি। তোমার প্রেম হয়তো আমাকে আগলে রাখতে পারতো। কিন্তু এই এতোগুলো খু’নের দায় আমাকে বাচতে দিতো না। আমার পারিপার্শ্বিক কখনোই স্বাভাবিক হতো না। তাই মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করলাম। আমি চেয়েছিলাম আমার মৃত্যুতে কারো শোক না থাকুক। তোমার, ভাইয়া, নীলাভাবী, স্বপ্নীল, আশ্রম, কারোর না। তাই পৃথিবীর কাছে য়্যুমু হয়েই বিদায় নিতে চেয়েছিলাম। চাইনি সতেরো খু’নের দায়ে ফাঁ’সিতে ঝোলা মেয়েটা য়্যুমু নয় স্নিগ্ধতা, এমনটা জেনে ভাইয়া কষ্ট পাক, আমার মৃত্যুতে আরকেউ আফসোসে থাকুক।
কিন্তু তুমি সেটা হতে দিলেনা। সবার একইপ্রবাহে না থেকে, তুমি বিপরীতে চললে। তোমার ভালোবাসা তোমায় এতোবেশি শক্তিশালী, আর আমায় এতোবেশি দুর্বল করে দিলো যে, একমাত্র তোমার কাছে আমি এই স্বীকারোক্তি রেখে যাচ্ছি। অন্যকারো কাছে না। তাই সত্যিটা জানার পরও সবটা অগোচরে রেখো শারাফ। যতো যাই কিছু হোক না কেনো, আমার স্নিগ্ধতা হওয়ার সত্যিটা কাউকে বলো না। জানি আমার অনুপস্থিতি তোমার জন্য যন্ত্রণার। কিন্তু আমার চাওয়া, এমন যন্ত্রণা আর কারো না হোক। মানসিক অসুস্থতা আর অপরাধীর শাস্তি, এ দুয়ের মাঝের দ্বন্দ্ব শেষ করো শারাফ! পৃথিবী জানুক, অপরাধীর অপরাধ সবসময় অপরাধ নয়।
যাইহোক, অনেককথা বলে ফেলেছি। হয়তো এতো কথা বলার সুযোগ আমাদের সামনাসামনিও হয়নি তাইনা? জানো শারাফ? নিজের ওপর প্রচুর করুনা হচ্ছে আমার! তোমাদের আঘাত করার দায়ে পরকালে বেহেশত পাবো না। কিন্তু তুমি, ভাইয়া, নীলাভাবী, স্বপ্নীল সবাইকে নিয়ে এই পৃথিবীটা আমার জন্য বেহেশত হতে পারতো৷ হলো না। বরং যখন তুমি এই অনেককথার চিঠিটা পরছো, আমি ততোক্ষণে এই সুন্দর পৃথিবী থেকে দুর, তোমার থেকে অনেক দুর। স্নিগ্ধতা হয়ে আমি তোমায় স্নিগ্ধসিক্ত করতে পারিনি শারাফ। আমার স্পর্শে তুমি কেবল কলঙ্কস্নাত হয়েছো। তাই যদি সম্ভব হয়, জীবনের স্নিগ্ধতা নামক এই কলঙ্কিত অধ্যায়কে ভুলে যেও। ভুলে যেও কাউকে ভালোবেসে জন্য তুমি দিক্বিদিক হারিয়েছিলে। কেউ একজন তোমায় ক্ষতবিক্ষত করে, চিরনিদ্রায় শায়িত। হাজারো অপরাধের মাঝে, কেউ তোমার ভালোবাসাকে ছেড়ে যাবার মতো পাপ করেছে। যার কোনো ক্ষমা হয়না, ক্ষমার অযোগ্য সে কলঙ্কিনীকে ভুলে যেও শারাফ। ভুলে যেও।
পরিশিষ্টে, আমি তোমাকে ভালোবাসি শারাফ। স্নিগ্ধতার জীবনের এই স্নিগ্ধতম পুরুষকে, শেষবারের মতো, স্নিগ্ধসিক্ত ভালোবাসা।
ইতি
স্নিগ্ধতা
❞
শারাফ মেঝেতে বসে পরে। ওর চোখ থেকে জল গরায়। হাত থেকে পরে যায় কাগজগুলো। ঝাপসা চোখের পাতায় ভেসে ওঠে সেদিন বৃষ্টিতে দাড়িয়ে সাইফের করা স্মৃতিচারন। স্নিগ্ধতার চেহারাটা। বদ্ধ কালকুঠুরিতে কল্পনার শুভ্রপরীর মতো পা ফেলছে সে। হাতে হাতকড়া, অথচ ঠোঁটে হাসি। টানাটানা চোখের তারায় অদ্ভুত খুশী। শারাফ পাশের সেন্টারটেবিলে থাকা কাচের গ্লাস মুঠো করে নেয়। এতোটাই শক্তিতে যে, গ্লাস ভেঙে কাচ ওর হাতে ঢুকে পরে। আর ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ফ্লোরের রক্তস্রোতের দিকে। ওর জলভরা চোখজোড়া স্পষ্ট দেখছে, স্নিগ্ধতা একপা দু পা করে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগোচ্ছে। মঞ্চে ওঠার পর স্নিগ্ধতা সামনে ঝুলানো ফাসির দড়িটা পরখ করে নেয়। ওর পাশের এক পুলিশ চোখের পানি মোছে। এতো সুন্দর একটা প্রাণকে ফাঁসির সামনে দাড়াতে দেখে তার কলিজাও মুচড়ে ধরে হয়তো। সে স্নিগ্ধতাকে ধরা গলায় শুধায়,
– শেষ ইচ্ছে?
স্নিগ্ধতা ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়৷ ওর হাসিমুখটা দেখে আবারো ভদ্রলোকের ভেতরে চিনচিনে ব্যথা অনুভব হয়। অথচ সে মেয়ে তার অচেনা। সতেরো খুনের আসামী। স্নিগ্ধতা তেমনই মিষ্টি হাসি বহাল রেখে, হাতের ডানে তাকালো। সেখানে দাড়ানো সাইফ। স্থির হয়ে আছে ও৷ কেইসের দায়িত্বরত পুলিশ বলে ওকে ওখানেই থাকতে বলা হয়েছে। স্নিগ্ধতা ভিক্ষুকের মতোকরে বললো,
– শেষবারের মতো টুকিকে একটু আদর করে দেবে ভাইয়া?
সাইফ তৎক্ষনাৎ চোখ তুলে তাকালো ওর দিকে। স্নিগ্ধতার আবদার যেনো ওকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সিনিয়র অফিসার ইন্সপেক্টর আফজালের দিকে তাকালো ও। সেও মাথা ওপরনিচ করলেন। সাইফ কোমড় থেকে রিভলবার খুললো। মাথার টুপিটাও খুলে পাশেরজনের হাতে ধরিয়ে দিলো। তারপর স্নিগ্ধতার কাছে গিয়ে দাড়ালো। ওর মাথায় আলতোকরে হাত বুলিয়ে, কাপাকাপা গলায় বললো,
– ট্ টুকি!
স্নিগ্ধতা ঝাপিয়ে পরে ভাইয়ের বুকে। হাউমাউ করে কাদতে থাকে। সাইফ বিমূঢ় হয়ে দাড়িয়ে রয়। গত দুদিনের যন্ত্রনায় ওর মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটায় কতোদিন এতো শান্তি অনুভব হয় না! কতোদিন ও এই ভাইয়া ডাক শোনে না! ওর চোখের কার্নিশ বেয়ে জল গরায়৷ আস্তেধীরে স্নিগ্ধতাকে জরিয়ে ধরতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু তৎক্ষনাৎ দুপা পিছিয়ে যায় স্নিগ্ধতা। সাইফ অবুঝের মতো করে কিছুক্ষন ওর দিকে তাকিয়ে রয়। তারপর নিরবে নেমে আসে মঞ্চ থেকে। সহকর্মীর কাছ থেকে রিভলবার, ক্যাপ না নিয়েই রোবটের মতো পা ফেলে বেরিয়ে যায় ওখান থেকে। স্নিগ্ধতা চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নেয়। সে শ্বাসেরা ওকে যেনো বলে, ‘তোর পৃথিবীতে আসার কারন ফুরিয়েছে স্নিগ্ধতা।’ আবারো হাসি ফোটে স্নিগ্ধতার চেহারায়। হাসিমুখে ফাসির দড়ির দিকে এগোয় ও। ওর সম্পুর্ন মুখ কালো কাপড়ে ঢেকে দেওয়া হয়। গলায় ফাঁসির দড়ি পরানো হয়। আফজাল সাহেব ঘড়ি দেখলেন। ঠিক চারটে বাজতেই হাতে ধরে থাকা লাল রুমালটা ফেলে দিলেন তিনি।
জল্লাদের খুটির টানে স্নিগ্ধতার পায়ের নিচের অবলম্বন সরে যায়। ফর্সা পা জোড়া অবলম্বন খোজার জন্য ছটফটানি করতে থাকে। সে ছটফটানি শারাফের সহ্য হয় না। বাহাতের কবজির নিচে গ্লাসভাঙা কাচ দিয়ে কেটে ‘স্নিগ্ধত’ অবদি লিখে ফেলেছে ও এতোক্ষণে। শেষের আ কারটা গভীরভাবে আচড়ে দিয়ে জীবনের ইতি টানতে উদ্যত হয় শারাফ। কিন্তু কাচ আরো জোরে ধরতেই ওর মনে পরলো চিঠিতে ওর কাছে স্নিগ্ধতার শেষ চাওয়ার কথা। ‘মানসিক অসুস্থতা আর অপরাধীর শাস্তি, এ দুয়ের মাঝের দ্বন্দ্ব শেষ করো শারাফ।’ শারাফ কাচ দিয়ে আঁচড় লাগায় হাতে৷ হাত পা ছেড়ে দিয়ে, নিস্প্রাণভাবে বসে থাকে মেঝেতেই। বাইরের নীল আকাশে সাদা মেঘের পেজো উড়ছে। ধরণীর কি বিশুদ্ধ রুপ! কি স্নিগ্ধ রুপ। শারাফের পৃথিবীকে দোষী মানার জন্য সবাই ছিলো। অথচ ওর স্নিগ্ধতায় ঘেরা পৃথিবী ধূলিস্মাৎ করে দেওয়া, এই বহুরুপী পৃথিবীকে দোষারোপ করার কেউ নেই! কেউনা!
…..তিন বছর পর…..
অডিটোরিয়াম জুড়ে লোক সমাগম। তিল ধারনের ঠায় নেই। বড় অর্ধবৃত্তাকার স্টেজের মাঝে সোফায় বসে উপস্থাপক আর এক যুবক। তার পরনে সাদা শার্টের ওপর কালো ব্লেজার। শার্টের হাতা কনুইয়ে ভাজ দেওয়া। সামনের কাচের গোল সেন্টারটেবিলে দুজনের মুখের দিকে দুটো ক্ষুদ্র স্ট্যান্ডমাইক দাড় করানো। অনুষ্ঠান শুরুর আওয়াজ আসতেই নড়েচড়ে বসলো দর্শক। উপস্থাপক উত্তেজনা নিয়ে বললেন,
– হ্যালো বাংলাদেশ! চলে আসলাম আপনাদের সবার প্রিয় লাইভ শো নিয়ে, যার নাম ‘কোশ্শেন-মার্ক’ প্রশ্ন আপনার, উত্তর আমাদের! আর আজকে আমাদের কাছে উত্তরদাতা হিসেবে আছেন বর্তমানের সবচেয়ে আলোচিত আর্টিকেল ‘রোগ? নাকি অপরাধ?’ এর রাইটার, সাব-কনশাস মাইন্ড আর সাহিত্যের এক অসাধারন কম্বিনেশনে তৈরী ‘ডিআইডি এন্ড শি’ এর পাবলিশার, দেশীয় মনোবিজ্ঞানকে অন্যতম গবেষনায় পৌছে দেওয়া সফল সাইকোলজিস্ট, কনসালটেন্টিসে এ অবদি সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মাইন্ড গেইমার, মিস্টার ইয়াকীন শারাফ!
হাততালিতে মুখরিত হয় অডিটোরিয়াম। কুশল বিনিময় শেষে উপস্থাপক বুঝিয়ে দিলেন, শো মুলত এটাই, দর্শকদের থেকে যে কেউ শারাফকে প্রশ্ন করবে, আর সে উত্তর দেবে। প্রশ্নপর্ব শুরুর আগে উপস্থাপক বললেন,
– প্রশ্নের ক্ষেত্রে এনি ক্রাইটেরিয়া স্যার?
শারাফ মাথা নেড়ে না বোঝালো। একেএকে শুরু হয় প্রশ্ন। টপিকই ছিলো, মন, মনোরোগ। একজন বললেন,
– ডিআইডি এন্ড শি, এটা কি আপনার মিসেস কে নিয়ে লেখা?
শারাফ হাসিমুখে জবাব দিলো,
– জ্বি।
– সাইকোপ্যাথ থেকে অপরাধ, এমনটা কি আদৌও ঘটে?
– বহু ঘটে। ওয়েবে সার্চ করলেই পাবেন। সাইকো-কিলার, সিরিয়াল কিলার এগুলোর উৎপত্তি এখানেই।
– আমরা তো মানসিক রোগীর লক্ষ্মণ দেখলেই ধরতে পারি। সুস্থ মানুষও তো অপরাধ করে মানসিক রোগী সাজতে পারে? যাতে তার সাজা কম হয়?
শারাফ নিশব্দে হাসলো। বললো,
– আপনার প্রশ্নের মাঝে আপনার প্রশ্নের উত্তর, একইসাথে ভুল ধারনাও আছে। দুটো ঘটনা বলি। সাল নিরানব্বইয়ে নিউইয়র্কে, একজন চলমান ট্রেনের সামনে এক মহিলাকে ধাক্কা দেয়। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে হবে, তাদের হয়তো কোনো শত্রুতা ছিলো। অথচ সত্যি তো এটাই, সে মহিলার সাথে তার কখনও দেখা হয়নি। অভিযুক্তর কেবল সিজোফ্রেনিয়া ছিলো। সেকেন্ড ওয়ান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৮২ সালে ঘটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বনাম হিঙ্কলি ট্রায়াল এর ঘটনা। এ লোক তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রিগানকে হত্যার চেষ্টা করেছিলো। চারজনকে গুলি করে আহতও করেছিলো। যেটা রাষ্ট্রদ্রোহর সমমানের অপরাধ। পরে প্রসিকিউশন খুজে পায়, সে মুলত একটি মানসিক রোগে ভুগছিললো এবং তার অপরাধমূলক কর্মগুলি সেই রোগের ফলাফল ছিল।
এবার আসি আপনার প্রশ্নের জবাবে। প্রথমজনের ক্ষেত্রে, প্রসিকিউশনকে অভিযুক্তর পুরোনো রেকর্ডস দেখে, অবসার্ভ করে তার রোগ সম্পর্কে জানতে হয়েছে। সে কিন্তু অসুস্থ সাজেনি। তবে ফৌজদারি বিচারে দ্বিতীয়জনকে স্বপক্ষে প্রমাণ পেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। তখন হিঙ্কলি বলে যে, সে একটি মানসিক রোগে ভুগছিলো এবং ওর অপরাধমূলক কর্মগুলি সেই রোগের ফলাফল ছিলো। তদন্ত শুরু হয়। আর প্রসিকিউশন তাকে অবসার্ভ করে, তার অতীতের রেকর্ড দেখে এসবের সত্যতা খুজে পায়। এক্ষেত্রে ঠিক কি ঘটলো? এতোবড় অপরাধ, যার কিনা ক্ষমা নেই। তবুও হিঙ্কলি নিজেই নিজের রোগ সম্পর্কে বলেছিলো। যেখানে ও জানে, ওর অপরাধ ঢাকার নয়। তো ব্যাপারটা এমন, এইযে অপরাধ করে মানসিক রোগী সাজতে চাওয়া প্রসঙ্গ, এটা কখনো ছিলোই না। এটা বলে কখনো পার পাওয়া সম্ভব না। যদি না আপনি সত্যিই মানসিক অসুস্থ হন। কারন ওইযে প্রশ্নের প্রথম লাইন, মানসিক রোগী দেখলেই বুঝে যান, এ্যাডেড, আপনার পুরোনো ইতিহাসও প্রসিকিউশান জানতে চাইবে।
উপস্থিত সবাই মাথা নাড়লো। আরেকজন হাত তুলে উঠে দাড়ালো। বললো,
– তাহলে তাদের বিচারব্যবস্থা কি? মানসিক অসুস্থ হলেই শাস্তি মওকুফ?
– না। বিচারব্যবস্থা ভিন্নতর হয়। আর সেটার নির্ভরতা ঠিক কিসে, তার মানদন্ডও জটিল। নিউইয়র্কের ওই লোককে হত্যার দায়ে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিলো। তার সিজোফ্রেনিয়াকে বিন্দুমাত্র মূল্যায়ন করা হয়নি। বিচারকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো সে মানসিকভাবে অসুস্থ কিন্তু দোষী। কারণ সে তার কর্মের প্রকৃতি এবং অর্থ জানতো। সে জানতো যে তার কাজ ভুল ছিলো। অথচ হিঙ্কলির কাজকে পাগলামো ধরা হয়। জুরি তাকে দোষী নয় বলে রায় দেয়। এবং কারাগারের পরিবর্তে, তাকে সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে পাঠায়। দুক্ষেত্রে, দু রকম।
– এই চিকিৎসা বনাম শাস্তির বিষয়টি ঠিক কীভাবে নিষ্পত্তি করা যেতে পারে? আপনার কি মত?
– আসলে চিকিৎসা করা বা শাস্তি দেওয়া, এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের কোন দ্ব্যর্থহীন সমাধান নেই। চিকিৎসা মডেল এবং শাস্তিমূলক মডেলের মধ্যে সাধারণ সূচক হল জননিরাপত্তা এবং বিপদ প্রতিরোধ। কানাডা, ইংল্যান্ডে আদালতের আদেশের অধীনে রোগীকে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছাড় দেওয়া হয়। শর্ত, অপরাধ করেছেন তবে তার ক্রিয়াকলাপের জন্য দায়ী ছিলেন না, সমস্যার মূল অসুস্থতা। তবে যদি ব্যক্তিটি অসুস্থ না হয়ে বিপজ্জনক থাকে, তাহলে তাকে হাসপাতালে না নন-মেডিকেল কারাগারে পাঠানো হয়। আমার মতে, চিকিৎসার ফলে যদি শাস্তিযোগ্য ব্যক্তি একটি সুন্দর জীবন পেতে পারে, একটু সুশৃঙ্খল নাগরিক হয়ে উঠতে পারে, দেন হুয়াই নট?
– তারমানে আপনি বলতে চাইছেন মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি যারা অপরাধ করে, তাদের শাস্তির পরিবর্তে মানসিক চিকিৎসায় রেফার করা উচিত?
– শুধরানোর সুযোগ দেওয়া মানবিক মুল্যবোধ, এসব আমাদের দেশে কেবল পাঠ্যবইয়েই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে না। প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তার মতো চিকিৎসাও আমাদের মৌলিক অধিকার, ক্লাস টু এর এই পড়া, সেকেন্ড ক্লাসের চাকরিতে এসে আমরা ভুলে যাই। আমার চাওয়া শুধু এটুকোই, রোগীর চিকিৎসার অধিকার এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের মধ্যে যেনো ভারসাম্য বজায় থাকে। জনগনের যেমন সুরক্ষার অধিকার আছে, একজন রোগীরও চিকিৎসা লাভের পরিপুর্ণ অধিকার আছে। দ্যাটস ইট।
আবারো হাততালিতে মুখোরিত হয় অডিটোরিয়াম। আরো কিছু প্রশ্ন-জবাবে শো শেষ হয়। শারাফ সামনের সেন্টার টেবিল থেকে ফোনটা হাতে নিলো চলে আসবে বলে। উঠে দাড়াতেই একজন বলে উঠলো,
– তিনবছর আগে য়্যুমু সাকলিককে আপনি ডিআইডি’র পেশেন্ট স্নিগ্ধতা এহমাদ প্রমান করতে চেয়েছিলেন। আপনার রিসার্চের শুরু কি সেখানেই?
শারাফ আবারো মুচকি হাসলো। ঝুকে দাড়িয়ে টেবিলে থাকা মিনি মাইকে মুখ নিয়ে বললো,
– ও স্নিগ্ধতা এহমাদ না। মিসেস স্নিগ্ধতা ইয়াকীন শারাফ। বুঝতেই পারছেন, শারাফের সবটার শুরু স্নিগ্ধতাতেই। থ্যাংকিউ অল।
শারাফ বেরিয়ে আসলো। প্রেসমিডিয়া ঝেকে ধরলো ওকে চারপাশ থেকে। ওর রিসার্চপেপার সর্বোচ্চ আদালতে পাঠানো হয়েছে। শাস্তি নির্ধারনে মানসিক অসুস্থতাকে প্রসঙ্গ হিসেবে যোগ করা হয়েছে। সবাইকে পাশ কাটিয়ে গাড়িতে চরে বসে শারাফ। কিছুটা সময় ড্রাইভের পর কল আসে ওর ফোনে। নম্বর শারাফ হেসে ব্লুটুথে কল রিসিভ করে। ওপাশ থেকে আবির খুশমেজাজে বলে ওঠে,
– কনগ্রাটস ইয়ার! তোর আর্টিকেল তো…
– কনগ্রাটস টু ইউ। মাত্রই শাই টেক্সট করেছে। একসাথে দুইছেলের বাপ হয়ে গেলি হু? কনগ্রাইস কনগ্রাটস। অনু কেমন আছে?
– আছে দুজনেই ভালো। হসপিটালে আসছিস তো তুই?
– হ্যাঁ। কাল পৌছে যাবো পাক্কা!
আরেকটু কথাবার্তা বলে শারাফ কল কাটলো। বুকের কোথাও একটা কিছুটা শান্তি। এ অধ্যায়ে কেউ তো আছে, যারা ভালোবাসা নিয়ে ভালো আছে। ড্রাইভ করে পুলিশস্টেশনে পৌছায় শারাফ। সাইফ ফাইলে লেখালেখি করছিলো। শারাফ সোজা গিয়ে ওর সামনে দাড়িয়ে বললো,
– নিউজ দেখেছেন মিস্টার এহমাদ?
চোখ তুলে তাকালো সাইফ। শারাফের চেহারায় এক অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য। অথচ স্নিগ্ধতা রুপী য়্যুমুকে নিয়ে তিনবছর আগে সবচেয়ে পাগলামি ওই করেছিলো। শারাফ দেখলো, সাইফের চোখমুখ বসে গেছে। বোঝাই যায়, ওর বুকজুড়ে কেবল হাহাকার। সাইফ বললো,
– অভিযুক্ত মানসিক অসুস্থ প্রমানিত হলে শাস্তির পরিবর্তে চিকিৎসার নতুন আইন প্রনয়ণ। তোমার এতোদিনের উদ্দেশ্য সফল।
শারাফ তাচ্ছিল্যে হাসলো। বললো,
– তিনবছর আগে এই ব্যাপারটা গুরুত্ব পেলে হয়তো…
– তুমি আজও ওকে স্নিগ্ধতা মানো?
– আপনিও ওকে স্নিগ্ধতা মানেন মিস্টার এহমাদ। নইলে আপনার মতো দৃঢ় পুরুষ, একজন অপরাধীর অনুপস্থিতিতে এমন বিধ্বস্ত হয়ে যেতো না।
সাইফ চোখ বন্ধ করে নিলো। তারপর উঠে দাড়িয়ে বললো,
– নীলা কোথায় শারাফ?
– আপনার মেয়ে ভালো আছে।
আর একমুহুর্ত না দাড়িয়ে পুলিশস্টেশন থেকে বেরিয়ে আসলো শারাফ। ওখানে বেশিক্ষণ থাকলে নিজের ওপর সম্মোহনী হারাবে ও। বেশি বলার অনুমতি নেই ওর। বলতে গেলে ও সাইফকে দোষারোপ শুরু করবে। হয়তো বলে দেবে, সেদিন কেনো ডিএনএ তার সাথে ম্যাচ করেনি। কিন্তু স্নিগ্ধতা থামিয়ে দিয়েছে ওকে। এতো বড় সত্যিটা পুরো পৃথিবীর আড়াল করতে বলেছে। আবারো গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শারাফ কল লাগালো কারো নম্বরে। ওপাশে কল রিসিভ করে বললো,
– কনগ্রাটস শারাফ।
– মিস্টার এহমাদ ভালো নেই নীলা।
অগ্নিলার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেলো। বললো,
– তার মেয়ে তার সাথে দেখা করতে চায়। যদিও আমি চাইনা ওদের দেখা হোক। তবে ওপরওয়ালা চাইলে সঠিক সময়ে তাদের দেখা হয়ে যাবে। সে অবদি তার আদর্শ নিয়ে এটুক খারাপ থাকুক সে।
কল কেটে যায়। শারাফ গাড়ি থামালো। গাড়ি থেকে নেমে স্বপ্নীলের দিকে তাকালো ও। রাতের আধারে ঢাকা পরা শূনশান স্বপ্নীল। অথচ এই স্বপ্নীল তিনবছর আগেও সবসময় কল্লোলে মেতে থাকতো, স্বপ্নপুরীর মতো সবসময় কেবল ঝলমল করতো। শারাফ ঠোঁটে হাসি ফুটায়। তারপর পরনের ব্লেজারটা খুলে বা হাতে বাঝিয়ে ভেতরে ঢোকে। ড্রয়িংরুমে সেজান সাহেব, নাহিদ সাহেব, তার মিসেস, শায়েরী সবাই বসে টিভি দেখছে। শারাফ দেখলো, ওটা ওরই রেকর্ডেড লাইভ শো। লাইভ দেখার পর আবারো একই শো দেখা স্বপ্নীলের আজন্মের ধর্ম। সবাই থাকলেও মিসেস সেজান নেই সেখানে। রাত বেরেছে বলে কোথাওএকটা বসে শারাফের জন্য চিন্তা করছে। আর বাকিসব টিভিতে এতোবেশি মনোযোগী যে, শারাফ যে ভেতরে ঢুকেছে, সেটাও খেয়াল করেনি কেউ। শারাফ মাথা নাড়িয়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে গেলো। ব্লেজারটা চেয়ারে রেখে, জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে বললো,
– এক শো সর্বোচ্চ কয়বার দেখলে তোমাদের মন ভরে গাইস?
ওর গলার আওয়াজে সবাই ওরদিক তাকালো। মিসেস সেজান কোত্থেকে যেনো ছুটে আসলেন। শারাফ চেয়ারে বসে পানি খেতে খেতে ইশারায় বুঝালো, ‘তুমি ড্রয়িংয়ে বসো। আমি ওখানেই আসছি।’ মিসেস সেজান মানলেন না। এগিয়ে এসে ছেলের গা ঘেষে দাড়ালেন তিনি। কাতরতায় বললেন,
– এতো রাত করে বাসায় ফিরিস না শারাফ। আমার চিন্তা হয়।
পানি খাওয়া শেষ করে মায়ের দিকে তাকালো শারাফ। মায়ের কোঠরে বসে যাওয়া চোখ, শুকনো মুখ, নিস্প্রান দেহটা দেখে শারাফের নিজের শরীরই ভার হয়ে আসতে চায়। কেননা কোনো না কোনোভাবে, এসবের জন্য ওউ দায়ী। শারাফ আবারো নিমীলিত হাসে। উঠে দাড়িয়ে মায়ের দুগাল ধরে বলে,
– প্রতিদিন রাত আটটার মধ্যে বাসায় ফিরি তো। আজ কোর্টে গিয়েছিলাম, শো ছিলো, একটু কনফারেন্সেও সময় দিতে হয়েছে। তাই একটু দেরি হয়ে গেছে। কিন্তু তোমায় কল করে জানিয়ে দিয়েছিলাম তো যে দেরি হবে। তবুও চিন্তা কেনো করো বলোতো?
– স্বপ্নীলের সব স্বপ্ন, সব সুখ কোনো অদৃশ্য গহ্বরে তলিয়ে গেছে। আর কিছুই নেই আমার। তোর কিছু হলে…
মিসেস সেজান কাদতে উদ্যত হচ্ছিলেন। শারাফ মাকে সামলাতে কিছু বলার আগেই কেউ বললো,
– হ্যাঁ! শারাফ ভাইয়া ছাড়া তো কিছু থাকবে না তোমার। সে বাড়িতেই থাকে, তবুও সব আদর, চিন্তা তাকে নিয়েই। আর একমাত্র মেয়েটা যে সুদুর রংপুর মেডিকেলে পড়াশোনা করতে গেছে, তার কোনো চিন্তাই নেই!
শারাফ, মিসেস সেজান পেছন ফেরে। শায়েরী বেশ বিরক্তিমাখা মুখ করে বুকে হাত গুজে দাড়িয়ে আছে। শারাফ নিশব্দে হেসে দেয়। মাত্র তিনবছরের ব্যবধানেই ওর ছোট্ট বোনটা কতো বড় হয়ে গেলো। শায়েরী মায়ের দিকে এগিয়ে বললো,
– আচ্ছা! একটা সত্যি কথা বলোতো মা? আমাকে সত্যিই ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পেয়েছিলে তোমরা। তাইনা? নাহলে নিজের সন্তানের মাঝে এমন বৈষম্য কি করে হয়?
– তোকে কুড়াতে গিয়ে বাবার সেসময় বারো হাজার টাকা ভর্তুকি গেছে। সি সেকশন। আর তুই বলছিস তোকে কুড়িয়ে পেয়েছে? বৈষম্য হচ্ছে? ডাক্তারটা হয়ে আগে বাবার টাকাটা শোধ কর। নইলে দেখবি বাবার সুপুত্র হিসেবে আমিই তোকে ডাস্টবিনের মালিক দেখে বিয়ে দিয়ে দেবো।
মিসেস সেজান কাদতে কাদতে মার লাগালেন শারাফকে। শারাফ হেসে মাকে জরিয়ে ধরলো। শায়েরীকে চোখের ইশারায় সঠিক সময়টায় কথা বদলানোর জন্য আন্তরিকতাও বুঝালো। ততক্ষণে বাকিসবও উঠে এসেছে। প্রফেসর নাহিদ বললেন,
– তোর ডকুমেন্টারিটা অসম্ভব ভালো হয়েছে শারাফ। মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা শিরোনামে এটার সত্যিসত্যি অনেক বড়সর একটা ইফেক্ট পরতে চলেছে আশা করি।
– থ্যাংকস ছোটবাবা।
মিসেস সেজান সরে দাড়ালেন। মিস্টার সেজান এসে শারাফের কাধে হাত রাখলেন। গর্বভরে বললেন,
– নাহিদ সাইকোলজিতে থাকলেও আমার তোমার সাইকোলজিতে পড়া নিয়ে শুরুতে অমত ছিলো। কিন্তু আমি জানতাম তুমি জাই করো না কেনো, একদিন সফল ঠিকই হবে। এন্ড ইউ প্রুভড মি রাইট। প্রাউড অফ ইউ মাই সন! প্রাউড অফ ইউ!
শারাফ অশ্রুসজল চোখে বাবাকে শক্তকরে জরিয়ে ধরলো। আলিঙ্গন শেষে তাকে ছেড়ে শারাফ মিসেস নাহিদকে বললো,
– মুসু কোথায় বউমা? ঘুমিয়ে গেছে? ও তো এতো দ্রুত ঘুমায় না।
মিসেস নাহিদের হাসিটা কমে আসলো। শারাফের মায়ের দিকে একপলক তাকালেন উনি। তারপর ধীরস্বরে বললেন,
– মুসু চৌধুরী নিবাসে।
– চৌধুরী নিবাসে? কার সাথে গেলো?
– আমি আর ভাবী মিলে আজ মেহেরুনকে দেখতে গিয়েছিলাম। মেহেরুন বারবার থাকতে বলছিলো। আমাদের থাকার উপায় নেই বুঝে মুসুকেই দুটোদিন কাছে রাখতে চাইলো। আমি ওকে না করতে পারিনি শারাফ।
– কেমন আছে মেহুভাবী এখন?
– বাবা-মায়ের মুখের দিকে চেয়ে জোরপুর্বক হাসতে শিখেছে। তবে এখন অগ্নিলার জন্য বেশি চিন্তা করে। এতোগুলো বছর পেরিয়ে গেলো, তবুও ওর সাথে কোনোরকম যোগাযোগ…
শারাফ দৃষ্টি নামিয়ে নিলো। মিসেস সেজান বললেন,
– অনেক তো হলো শারাফ। এবার তো বল অগ্নিলা কোথায়? আমরা জানি, আর কেউ না জানলেও, তুই ঠিকই জানিস ও কোথায়। মিস্টার এন্ড মিসেস চৌধুরীর মনের অবস্থা ভাবলেই আমার শ্বাসরুদ্ধ লাগে। তাদের দুটো মেয়েরই জীবন এভাবে…ওদিকে সাইফের জীবনেও আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সে তো…
– তার জীবন সে নিজে বেছেছে মা।
– তুইও জানিস ও অগ্নিলার খোজ করেছে।
– লোকে বলে, যে নিখোঁজ, তার খোঁজ করা যায়। কিন্তু যে হারাতে চায়, তাকে নাকি ফিরে পাওয়া যায় না। নীলাকে নিয়ে মিস্টার সাইফ দ্বিতীয়টাতে আটকে আছেন। অথচ আমি বরাবর মেনে এসেছি, খোজ করার যন্ত্রনার আগে ধরে রাখা শিখতে হয়। আর আমরা চাইলেই যে কাউকে ধরে রাখতে পারি!
শারাফ থামলো। ঠোঁটে পুনরায় হাসি ফুটিয়ে বললো,
– আমার জনকেই দেখো না। সে তো কম চেষ্টা করেনি আমার থেকে দুরে যাবার। পেরেছে কি?
মিসেস সেজান প্রসারিত চোখে চাইলেন। শারাফ চেয়ারে থাকা ব্লেজারটা হাতে নিয়ে আরো বড়সড় হাসি টানলো ঠোঁটে। বললো,
– পারেনি। আর পারবেও না। কারন আমি তাকে আমার থেকে দুর হতে দেইনি, দেবোনা! জীবনের এই দুইমাত্র নারীকে নিয়ে পরেছি মহাবিপদে। দেরি করে বাড়ি ফিরলে একজনের চিন্তা হয়। আর আরেকজনের অভিমান হয়। তোমার চিন্তা তো নিষ্পত্তি করেছি। এবার দেখি আরেকজনের অভিমান ভাঙাতে পারি কিনা। আসছি হুম? গুড নাইট!
শারাফ অসম্ভব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বড়বড় পা ফেলে চলে আসলো ওখান থেকে। রুমের দরজায় এসে পুরো ঘরে চোখ বুলিয়ে নিলো একবার। ওর দৃষ্টি আটকায় ব্যালকনিতে। রাতের ঘন কালো আধারের প্রভাব ব্যালকনিতে বিন্দুমাত্র নেই। কেননা কাচের দেয়ালের ওপারে শুভ্রতা ছড়িয়ে বসে আছে কেউ। হাতের ব্লেজারটা বিছানায় রাখলো শারাফ। আস্তেকরে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে একমুঠো নতুন রুপালি চুড়ি হাতে নিলো। একহাতে শার্টের গলার কাছের বোতামদুটো খুলতে খুলতে, মুচকি হাসি ঝুলিয়ে ও এগোলো বারান্দায়। শারাফ যতোটা অগ্রসর হয়, সামনের সে শুভ্র রমনী ততো স্পষ্টতর হতে থাকে ওর চোখে। সাদা আনারকলি পরিহিত রমনী তার জামা-ওড়না মেঝেতে ছড়িয়ে, কাচের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে। তার ঘন কালো চুলের বেশির বা দিকের কাধে। ঘাড় পেরিয়ে চুলগুলো ওর চেহারায়ও ঢেকে রেখেছে কিঞ্চিৎ। তিন চার পা এগোতে মেয়েটার হাতের ছোট্ট ক্যানভাসটাও চোখে পরে শারাফের। এ্যাক্রলিক রঙতুলির আঁচড় ওতে। শারাফ এগিয়ে তার পাশে দাড়ালো। ওর পা দেখে একদন্ডের জন্য ক্যানভাসের তুলি থেমে যায়। বাহাতে সামনে চলে আসা চুলগুলো কানে গুজে দেয় রমনী। দৃশ্যমান হয় তার পুরো চেহারা। কিছু না বলে, আবারো ক্যানভাসে তুলি চালাতে থাকে সে। শারাফ হেসে ওর ঠিক পাশে বসে যায়। নিজের পায়ের মোজাজোড়া ছাড়াতে ছাড়াতে বলে,
– এতো অভিমান?
…
– আমি কি প্রতিদিন লেইট করি?
রমনী জবাব দেয় না। শারাফ চুড়ির মুঠো ওর কানের কাছে নিয়ে, নাড়াতে শুরু করে। একটানা রিনঝিন শব্দ শুনে, সে পাশ ফেরে। বিরক্তি ভাব নিয়ে বলে,
– জ্বালাচ্ছো কেনো বলোতো? দেখছো না ড্র করছি?
– না দেখছি না। ড্র করলে, হাত নাড়ালে, তোমার হাত থেকে চুড়ির আওয়াজ আসে। কই? আজকে কোনো আওয়াজ আসছে না তো! তাহলে কিভাবে বুঝবো তুমি ড্র করছো? হু?
– অভিমানী মনে চুড়ি সাজে না।
– হুম। তবে অভিমান তোমাকে অলংকারের মতোই মানায় স্নিগ্ধতা।
স্নিগ্ধতার অভিমানী গালজোড়ায় নিমিষেই মিষ্টি হাসির ভাজ পরে। চোখ নামিয়ে লাজুক হাসে ও। আর শারাফ মুগ্ধচোখে চেয়ে দেখে সে হাসি। চুড়িগুলো মেঝেতে রেখে বলে,
– আর আমি এই অভিমানিনীকে সীমাহীন ভালোবাসি। তো অনুগ্রহ করে আমার ভালোবাসা মঞ্জুর করে, আপনার অভিমানের ইতি টানুন বেগমসাহেবা। আমি ধন্য হয়ে যাই।
স্নিগ্ধতা মুচকি হেসে চুড়িগুলো হাতে নেয়। ওগুলো দুহাতে পরে শিশুসুলভ খুশি হয়ে যায়। হাত নাড়িয়ে, ঘুরিয়ে দেখতে থাকে চুড়ি। খুশিতে চকচক করতে থাকে ওর চোখজোড়া। শারাফ দেখলো মেঝেতে পরে থাকা ক্যানভাসে ওর সেই কান ধরা ছবিটা। তফাৎ এটুকোই, আগেরটা স্কেচ ছিলো, আর এটা রঙ তুলিতে আঁকা রঙিন ছবি। স্নিগ্ধতা চুড়ি দেখছে, আর শারাফ ওকে। চুড়ির রিনঝিন শব্দ যেনো বুকজুড়ে শান্তির হাওয়া ছড়িয়েছে। শারাফের চোখের মুগ্ধতা আর ঠোঁটের হাসি দেখে ঘরের দরজায় দাড়ানো মানুষগুলোর বুক কেপে ওঠে। মিসেস সেজান শাড়ির আঁচল মুখে গুজে ডুকরে কেদে ওঠেন। মুখ লুকান সেজান সাহেবের বুকে। শায়েরীর চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গরাচ্ছে। মিসেস নাহিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
– নিজের চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না, যে ইয়াকীন শারাফ কিনা সাইকোলজি এন্ড মাইন্ড টপিকে দেশে বিদেশে হুল্লোড় তুলে দিয়েছে, সে নিজেই এতোবড় ভ্রমের শিকার। তিনবছর হলো এক অদৃশ্য সংসারজীবন পালন করছে সে। এক অস্তিত্বহীন মানবীর ভালোবাসায় সিক্ত সে। আর সে ভালোবাসা এতোটাই বেশি যে, ওর কল্পনায় বাস্তবেরও কোনোরুপ জোর খাটছে না।
মিসেস সেজানের কান্নার বেগ বাড়ে। শারাফ ব্যতিত, পুরো ঘরে কেউ নেই। ওর আনা চুড়িটা ওর সামনেই মেঝেতে রাখা। ওগুলো হাতে পরার মতো কেউ নেই ওর জীবনে। স্নিগ্ধতার ফাঁসি হবার তিনবছর পেরিয়েছে। সে ঘটনার পর দ্রুতই স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে শারাফ। আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই ওর জীবনযাপন। কেবল বদলায়নি স্নিগ্ধতার প্রতি ভালোবাসা। ও যেনো আরো বেড়েছে। এমনভাবে বেড়েছে যে, শারাফ ভাবতেই পারেনা স্নিগ্ধতা মৃত। দিনশেষে যখন ও ঘরে ফেরে, একজন দায়িত্ববান স্বামীর মতো বউয়ের অভিমান ভাঙাতে ফুল, চুড়ি হাতে করে ফেরে। প্রেমময় কথায় কেবল ওর চোখে দৃশ্যমান স্নিগ্ধতার মান ভাঙায়। এভাবেই চলছে। মিস্টার সেজান ভাইকে বললেন,
– কিছু করছিস না কেনো নাহিদ? আমার ছেলেটা আর কতোদিন এভাবে কষ্ট ভাবে?
– শারাফ তো কষ্ট পাচ্ছে না ভাই। এটাই ওর সুখ। স্নিগ্ধতাকে ভালোবেসে যাওয়াই ওর জীবনধর্ম। যে অসুস্থ, তাকে সুস্থ করার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু ও তো স্নিগ্ধতাকে কল্পনা করেই বেচে আছে। সুস্থ হলে, স্নিগ্ধতা নেই জানলে ও তো তখনই…
মিস্টার নাহিদ কথা শেষ করেন না। একআঙুলে চোখের পানি মুছে চলে গেলেন ওখান থেকে। শায়েরী চোখের পানি মুছে মাকে সামলালো। একে একে চলে গেলো সকলে।
স্নিগ্ধতা চুড়ি পরখ করতে করতে থেমে গেলো একসময়। হাসি গায়েব হয়ে অসহায়ের মতো করে তাকালো শারাফের দিকে। ছলছল চোখে চেয়ে বললো,
– তুমি জানো আমি নেই।
কথাটা শুনে শারাফ দেয়ালে মাথা ঠেকালো। একহাটুতে হাত রেখে, চোখ বন্ধ করে বললো,
– তুমি আছো স্নিগ্ধতা। আর তুমিই থাকবে। আজীবন।
– তোমাকে তো আমি জীবনের এই কলঙ্কিত অধ্যায় ভুলে যেতে বলেছিলাম শারাফ। আর তুমি কি করলে? তুমি সে অধ্যায়কেই নিজের পুরো জীবন বানিয়ে নিলে? কেনো?
শারাফ চোখ মেললো। পাশে তাকিয়ে দেখে স্নিগ্ধতার চোখ বেয়ে জল গরাচ্ছে। ওর খুব ইচ্ছে করছিলো, স্নিগ্ধতার গাল ছুয়ে সে অশ্রু মুছে দিতে। ওই কপাল, চোখে, ঠোঁটে। আদর করতে। শারাফ সেটা করলো না। ও জানে, সেসবের সুযোগ নেই। শুধু নিজের ঠোঁটের হাসিটা বহাল রেখে বললো,
– তোমাকে ভুলতে গেলে, সে মুহুর্তেই আমার মৃত্যু হবে স্নিগ্ধতা। তুমি নেই ভাবলে, সে মুহুর্তেই শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা পরবো আমি। কিন্তু আমাকে বাচতে হতো। তাই বাধ্য হয়ে এই পথ বেছেছি। তুমি আমার কাছেই আছো, এমনটা ভেবে নেওয়া। যেখানে কারোর কোনো হাত নেই। এমনকি তোমারও কিছু করার নেই। তুমি চাইলেও আমার ভাবনা থেকে দুর হতে পারবে না।
স্নিগ্ধতা হার মানে। দৃষ্টি আকাশের দিকে তাকায় ও। পূর্ণচাঁদের আলো পরেছে ওর মুখে। শারাফ কেবল ওর মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। স্নিগ্ধতার মুখের ওপর পরা চাঁদের আলো কেমন কমে আসছে। আকাশের মেঘ বোধহয় ঢেকে দিয়েছে চাঁদকে। শারাফ নিশব্দে হাসলো। বললো,
– ওই আকাশের চাঁদটাও সবসময় আকাশে থাকে না। কিন্তু শারাফের মনের আকাশে তুমি চাঁদ হয়ে ছিলে, আছো আর সবসময় থাকবে স্নিগ্ধতা। শারাফ তোমাকে ওই আকাশের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
স্নিগ্ধতার দৃষ্টি আকাশে। কাদছে ও। অথচ ওর ঠোঁটে হাসি। কতো সুখের হাসি। কতোটা তৃপ্তির হাসি! হয়তো পুরো পৃথিবীর কাছে ও স্নিগ্ধতা নয়, য়্যুমু। চাঁদের পরিবর্তে, চন্দ্রকলঙ্ক। কিন্তু এই একটা মানুষের কাছে ও স্নিগ্ধতা। যে কিনা বরাবর শারাফের কাছে চাঁদের মতো প্রসংশিত, নন্দিত। শারাফের জন্য স্নিগ্ধতা, চিরন্তন নন্দিত চন্দ্রকলঙ্ক!
~ সমাপ্ত
[ সর্ববৃহৎ গল্পটায় ‘সমাপ্ত’ লেখার অনুভূতি অদ্ভুত! রোমাঞ্চকর যাকে বলে! গল্পটা শুরুর সময় ভাবিই নি, গল্পটাকে নিয়ে ৭৪ পর্ব অবদি পৌছে যাবো। যদিও বৃহদাংশে শারাফ-স্নিগ্ধতার প্রেমকাহিনী ছিলো। তারপরও। প্লট তো আলাদা কিছুই তাইনা? ৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, একবছরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ইতি টেনেছে গল্পটা। অনেকবেশি গ্যাপ, অপেক্ষার বিব্রতি নিয়ে আপনারা তবুও ধৈর্যের সাথে এ অবদি আমার পাশে থেকেছেন। এজন্য হৃদয়ঙ্গম শুকরিয়া পাঠকমহল। নন্দিত চন্দ্রকলঙ্কে আমার ভাবনার কতোটুকো ঠিকঠাকমতো তুলে ধরতে পেরেছি, আজকে শেষবারের মতো একটু জানিয়ে যাবেন। আমি অধীর হয়ে আপনাদের মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকবো।
আরেকটা বিষয়। আমরা মানুষেরা কেউই ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নই। আমার জ্ঞানসীমা তো আরো নগণ্য। নিসন্দেহে, গল্পে ভুলভ্রান্তি আছে। আমি বিনীতভাবে সেগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানাচ্ছি। দুয়া করবেন আমার জন্য। এই আদুরে মানুষগুলোর প্রতি আমার বিরামহীন ভালোবাসা রইলো। ভালো থাকবেন সবাই। আসসালামু আলাইকুম। ]

