#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৭২.
শারাফ চোখ মেললো। সকালের উজ্জল আলো চোখে পরেছে ওর। চোখ খুলেই ঝলোমলো আলো, ফুল আর সবুজায়ন আবিষ্কার করলো চারপাশে। উঠে বসে নিজেকে রুমের বান্দায় খুজে পেলো ও। রুমের দিক তাকিয়ে স্নিগ্ধতার নাম ধরে ডাকলো দুবার। কোনো সাড়া না পেয়ে, চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় শারাফ। ওর স্নিগ্ধতার প্রেমময় মুহুর্তগুলো ব্যতিত আগেররাতের কিছুই মনে আসছে না ওর। শারাফ উঠে দাড়ায়। মাথার চুল উল্টে ধরে ভেতরে এগোয়। তারপর ফুলের বিছানায় থাকা ফোনটা হাতে নিলো। সেখানে সাইফের বাইশটা মিসড কল। কিছু একটা আন্দাজ করেই দ্রুততার সাথে হাত চালিয়ে মেইল অপশনে ঢোকে ও। দুটো ফাইল সেন্ট হয়েছে নজরে আসতেই মুখ দিয়ে দম ছাড়ে শারাফ৷ হতবিহ্বলের মতো একদন্ড দাড়িয়ে, ড্রেসিংটেবিল থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে, একপ্রকার ছুটে বেরোয় রুম থেকে৷ সিড়ি বেয়ে দৌড়ে নেমে বাসার বাইরের দিকে ছুটছিলো ও। ডাইনিংয়ে পুরো স্বপ্নীল বসে আছে তখন। মেহেরুন উচ্চস্বরে বললো,
– শারাফ? এখনই কোথায় বেরোচ্ছো তুমি?
শারাফ থামে। শুকনো ঢোকে গলা ভিজিয়ে, মেহেরুনকে পাল্টা প্রশ্ন করে,
– শাওন ভাইয়া ফিরেছে?
মেহেরুন মাথা এদিকওদিক করে না বুঝালো। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলালো শারাফ। মিসেস সেজান সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে শারাফের দিকে এগোলেন। একহাতে শারাফের হাত ধরে বললেন,
– স্নিগ্ধতা কোথায়? আর তুই কোথায় যাচ্ছিস? শাওনের কথাই বা বলছিস কেনো? ও ঠিকাছে তো? হয়েছে টা কি?
– টুকিভাবী কোথায়? তুই ওকে রুমে রেখে এখন বেরিয়ে যাচ্ছিস?
মা, শায়েরীর প্রশ্নের জবাব খুজে পায়না শারাফ। কেবল শান্ত রাখলো নিজেকে। মায়ের দুগাল ধরে কোনোমতে বললো,
– কিছু হয়নি৷ তবে আমাকে যেতে হবে মা। ফিরে এসে সবটা বলবো। তোমরা টেনশন করো না হুম? আসছি।
একদন্ড না দাড়িয়ে বেরিয়ে যায় শারাফ৷ মায়ের চোখে চেয়ে জীবনে প্রথমবার তাকে মিথ্যে বলেছে ও৷ দৃষ্টিচুরি আবশ্যক ওর।
পুরো স্বপ্নীল থম ধরে থাকে। ওপর থেকে মুসকান মিসেস নাহিদকে ডাক লাগিয়ে বললো,
– ও আম্মু? ভাবীন তো ঘরেই নেই! রাতে এসে রাতেই চলে গেলো ভাবীন? শারাফ ভাইয়া কি ভাবীনকে আনতে গেলো?
ডাইনিংয়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাড়ালো সবাই। একদৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। বিয়ের রাতে শাওন নেই, বিয়েতে সাইফ নেই। বিয়ের পরদিন সকালে স্নিগ্ধতা ঘরে নেই, শারাফও এভাবে বেরিয়ে গেলো। মেহেরুনের বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু করছে। ভয় নিয়ে চোখ ঘুরিয়ে স্বপ্নীলের একটা একটা পিলার দেখে নিলো ও। ওর এই হাসিখুশি পরিবারটায় কি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় আসতে চলেছে? এ বাড়ির ভিত্তি, প্রেম-সৌহার্দ্য সামাল দিতে পারবে তো সে ঝড়?
•
বেলা বেড়েছে। স্বাভাবিক গতিতে চলছে কালো রঙের টয়োটা করোলা গাড়িটা। সে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে স্নিগ্ধতা। আর ওর পাশে ফ্রন্টসিটে আরাফাত। আরাফাতের দৃষ্টি মোবাইলে। গাড়িতে ওঠার পর স্নিগ্ধতা নিজেই ড্রাইভ করতে চেয়েছিলো। আপত্তি করেনি আরাফাত। স্নিগ্ধতার দিকে একপলক তাকিয়েই দৃষ্টি নামিয়ে নিয়েছে ও। গাড়ি স্টার্ট দেবার মিনিটতিনেক চুপচাপ ড্রাইভ করার পর মুখ খুললো স্নিগ্ধতা। বললো,
– কোথায় যাচ্ছি?
– হুম? আপাতত সয়দাবাদ। আমার একটা ছোটখাটো বাসা আছে ওখানে। এ কয়দিনে অনেকটা ধকল গেছে তোমার ওপর। একটু রেস্ট নিয়ে সেখান থেকে স্টেশন যাবো আমরা। আর তারপর…
– শাওনের স্টোরেজটা?
– ও নিয়ে ভাবতে হবেনা তোমাকে। তোমাকে সয়দাবাদ রেখে আমি আবারো ব্যাক করবো। ডক্টর জেনেলা এতোক্ষণে তার কাজ সেরে চলে গেছেন নিশ্চয়ই?
স্নিগ্ধতা জবাব দিলোনা। আরাফাত চোখ তুলে চাইলো। সামনে তাকিয়ে চুপচাপ ড্রাইভ করছে স্নিগ্ধতা। মোবাইলে কিছু একটা খুজলো আরাফাত। কিন্তু তার হদিশ না পেয়ে ওর কপাল কুচকে এলো। স্নিগ্ধতা বললো,
– স্টোরেজের সিসিক্যাম ফুটেজ খুজছেন?
আরাফাত চকিত চোখে চায়৷ স্নিগ্ধতা বললো,
– শাওনকে কোন ড্রাগ দিয়েছিলেন? কথা কেনো বলতে পারছিলোনা ও?
– কোন ড্রাগ মানে? যেটা তুমি বলেছিলে, ওটাই তো।
– তাই? তাহলে আপনাকে দেখে শাওন রিয়্যাক্ট কেনো করছিলো?
আরাফাত স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রয় ওর দিকে। স্নিগ্ধতাও একপলক ওর দিক তাকালো। চোয়াল শক্ত করে গাড়ির স্পিড বাড়ালো ও। আরাফাত সামনে তাকাতেই নিচে ঝুকলো স্নিগ্ধতা। আরাফাতের বুটের মধ্যে গোজা রিভলবারটা বের করে, মাথা তুললো। আরাফাত চমকে ওঠে। স্নিগ্ধতা একহাতে স্টেরিং ধরে রেখে রিভলবারটা ওর দিক বাড়িয়ে দিলো। বললো,
– শুট ইওরসেল্ফ মিস্টার আরাফাত।
আরাফাত চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম। ওর মনে হলো, পাশের ড্রাইভিং সিটের স্নিগ্ধতা আর স্নিগ্ধতা নেই। তার মাঝে নিসংকোচে খু’ন করতে জানা সিরিয়াল কিলারের প্রতিচ্ছবি। স্নিগ্ধতার দৃষ্টি সামনে। ছলছল চোখ নিয়ে ড্রাইভিং করছে ও। আরাফাত যেনো কথা বলা ভুলে গেছে। স্নিগ্ধতা সামনে তাকিয়েই বললো,
– যদি এখন আপনি নিজে নিজেকে মে’রে ফেলেন, তাহলে আমি আলাদাকরে কোনোরকম কষ্ট দেবোনা আপনাকে। বাকি তিন সঙ্গীর মতো অবস্থা হবেনা আপনার। সহজ মৃত্যুর অফার দিচ্ছি মিস্টার আরাফাত। শুট ইওরসেল্ফ।
আরাফাত তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে বললো,
– কি বলছো তুমি স্নিগ্ধতা! আমার বাকি তিন সঙ্গী মানে?
– শাওন, তারেক, চঞ্চল।
– হোয়াট ননসেন্স আর ইউ টকিং আবাউট? আমি বরাবর হেল্প করেছি তোমাকে!
আরাফাতের জবাবদিহি শুনে স্নিগ্ধতা তাচ্ছিল্যে হাসলো। বললো,
– হেল্প করেছেন? নাকি নিজের সার্থ হাসিল করেছেন?
– কি বলতে কি চাইছো তুমি?
শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলো আরাফাত। স্নিগ্ধতা স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে মোড় নিলো। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
– যখন আপনি আমার এইডসের ভুয়া রিপোর্ট সম্পর্কে জানতে পারেন, সেদিন আমার মনে হয়েছিলো, আপনি থামার নন। আমাকে পাওয়ার জন্য যেকোনো সীমা অবদি যাবেন আপনি। আর আপনার প্রতি ভাইয়ার সহমর্মিতা আমার পথে বাধা রটতে পারে। তাই আপনাকে সত্যি বলাটাই উচিত মনে হয়েছিলো। বিশ্বাস করে য়্যুমুর সাথে হওয়া দুর্ঘটনার কথা বলেছিলাম আপনাকে। বলেছিলাম আমি ওর হয়ে শোধ তুলতে চাই। নিরবে আমার কাজগুলো মেনে নিতে বলেছিলাম আপনাকে। আর তার বিনিময়ে, আমি আপনার হবো। সে এককথাতেই আপনি রাজি হলেন। শাওনকে মেরে ফেলার পরই আপনার সাথে বেরিয়ে যাবার চুক্তি হয় আমার।
কিন্তু আপনি তো আমাকে পেতে চুক্তিবদ্ধ হননি মিস্টার আরাফাত। আপনি তো ডাবলগেইম খেলছিলেন। কেননা য়্যুমুর রেপিস্ট চারজনের একজন না হলেও, শাওনের ড্রাগব্যবসার চার নম্বর পার্টনার আপনি। সৌরভ য়্যুমুর রেপিস্ট হলেও, এ ব্যবসার মুল ছিলোনা। সেটা হলেন আপনি। যে কিনা সর্বসাকুল্যে এই চারজনের ড্রাগব্যবসার দখলদারিত্ব চায়। যখন জানলেন আমি সৌরভকে এই ড্রাগব্যবসার চতুর্থজন ধরে আছি, আপনি সুযোগ পেয়ে গেলেন। আমাকে ব্যবহার করলেন। আমার সন্দেহের তালিকায় না আসার জন্য পুরোপুরিভাবে শাওনের কাজকর্ম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। কি বলে? আপনি বিধ্বসৃত, বিপর্যস্ত। আমাকে শাওনের ভাই শারাফ বিয়ে করছে এই ব্যাপারটা আপনি মানতে পারছেন না। কারন আপনি আমাকে ভালোবাসেন। চারজনের একজন হিসেবে আপনার মস্তিষ্কের অভাব ছিলো বলে গত কদিনে বেশ যাতনায় পরতে হয়েছে শাওনকে।
তবে তাতে আপনার কিছু যায় আসেনি। সবটা আপনার ভাবনা অনুযায়ী বেশ স্মুদলি চলছিলো। বিপাকে পরলেন তখন, যখন আমি আপনাকে আমার সাথে স্টোরেজে আসতে বললাম। কারন শাওন আপনাকে দেখলে আমার কাছে আপনার ইনভল্ব থাকার কথাও বলে দেবে। তাই এখানেও ট্রিক চালালেন আপনি। আমার সাথে স্টোরেজে গিয়ে, পেছন থেকে শাওনের মুখ বন্ধ করার মতো ড্রাগ পুশ করে ওকে থামিয়ে দিলেন। আর আসার সময় ওই ঘরে ক্যামেরাও লাগিয়ে আসলেন। যাতে পুলিশকে আংশিক ফুটেজ দেখিয়ে শাওনের খু’নী হিসেবে জেনিমমকে প্রমান করতে পারেন। সোজা হিসাব, এই কোটিকোটি টাকার ব্যবসায় বাকি তিনজনের পার্টনারশিপ থাকলো না, ওদের খু’নের দায়ে কেউ আপনাকে সন্দেহও করলো না। পুরোটাতেই আপনার রাজত্ব। আর তারসাথে উপরি হিসেবে স্নিগ্ধতা আপনার।
…
– হুয়াট আ গেইম মিস্টার আরাফাত। হুয়াট আ গেইম! নিঃস্বার্থ প্রেমিকের রোল প্লে করে, বেশ ভালো চাল চেলেছেন আপনি। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নামে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছেন বেশ ভালোভাবেই। আই এপ্রিশিয়েট ইওর প্লান!
আরাফাত দাতে দাত চেপে যায়। বলে,
– একরাতের মাঝেই সবটা জেনে গেলে?
স্নিগ্ধতা শ্বাস ফেললো। স্বপ্নীল থেকে বেরোনোর সময় শাওনের ল্যাপটপের খোজ লাগিয়েছিলো ও। পায়নি। তারপর হুট করে মনে পরে, শাওনের সবটা শারাফ জানে। তাই শারাফের কাছে ওর সম্পর্কিত কিছু থাকবে তা ভেবে খোজ লাগিয়েছিলো ও। ওর ধারনা ভুল ছিলো না। কাবার্ডে লকারে থাকা পেনড্রাইভে শাওনের সমস্ত পাপাচারের খবর ছিলো। শারাফের ফোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে আনলক করেছিলো ও। সাইফকে করা দুটো মেইলের ফাইলও পেয়েছে। স্নিগ্ধতা স্পষ্ট বুঝলো, শাওনের বিপরীতে শারাফ সবটা গুছিয়েছে। স্ত্রী হিসেবে ওকে আপন করা, কাছে রাখাটা স্থির করেই শাওনকে সাইফের হাতে তুলে দিতো ও।
তবে তারচেয়েও ভয়ানক যেটা, শারাফের সে লিস্টে আরাফাতের নামও ছিলো। সেটা দেখে স্নিগ্ধতা আরেকদফায় আটকে যায়। ফাইলদুটো পড়ে ও টের পায়, শাওন, তারেকের পর হলের মাদকের কারবারের দায়িত্বে যে ছিলো, সে সৌরভ নয়, আরাফাত। স্নিগ্ধতার নিজেকে প্রচন্ড অসহায় অনুভব হলো। আরাফাতের ভালোবাসাকে বিশ্বাস করে ওকে সত্যিটা বলেছিলো ও। আর সেই আরাফাত কেবল ওকে ব্যবহারই করেছে। অথচ যে মানুষটাকে ব্যবহার করে ও শাওনকে দেশে টেনে আনতে চেয়েছিলো, সেই মানুষটাই ওকে সর্বস্ব দিয়ে ভালোবেসেছে৷ জেনেলার ঘড়ির ট্র্যাকার পরে, স্টোরেজের লোকেশন ও প্রথম শারাফের মেইলেই দেখেছিলো। ওর অগোচরে ওর একমাত্র রক্ষক শারাফই ছিলো। অদ্ভুত এক গর্ব অনুভব হলো স্নিগ্ধতার। ঔদার্যের সাথে বললো,
– হি ইজ ইয়াকীন শারাফ। তারথেকে দৃষ্টিচুরি মানেই আপনি ধরা পরে গেছেন। আপনি তো শারাফের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন। আপনার জানা উচিত।
শারাফের প্রশংসা শুনেই চেহারায় অকস্মাৎ ক্ষোভ চেপে বসে আরাফাতের। মুহুর্তেই স্নিগ্ধতার হাতের রিভলবারটা ছিনিয়ে নিয়ে ওর দিকে তাক করলো ও। রাগে কপালের রগ ফুটে উঠেছে আরাফাতের। স্নিগ্ধতা অবাক হলোনা, নড়চড় করলো না। ওর ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ। আরাফাত রাগ নিয়ে বললো,
– হ্যাঁ হ্যাঁ! ঠিকই জেনেছো তুমি। রেপিস্টদের চারজনের একজন না হলেও, শাওনের ব্যবসার পার্টনারশিপে আমি আছি। অনার্স শেষে শারাফ বিদেশ গেলেও আমি তো মাস্টার্স করার জন্য দেশেই ছিলাম। শাওন ভাই তখন আমাকে এপোয়েন্ট করে। এক্সপোজ হবার ভয়ে, শারাফ থেকে দুর থাকতে বলে। ওর আবার সব বুঝে যাওয়ার স্বভাব আছে কিনা। আমি করিও তাই। শারাফের সাথে বন্ধুত্বের ইতি টানি। সেসময় শারাফাতের চেয়ে টাকার দাম বেশি মনে হয়েছিলে আমার। শাওন ভাইয়ের দলের একজন হওয়ার পর থেকেই আমি এ খেলায় একত্ববাদ চেয়েছিলাম। তারেক, চঞ্চল এমনকি সবটার গুরু স্বয়ং শাওন ভাইকেও টাকার ভাগীদার হিসেবে থাকতে দিতে চাইনি। সুযোগ খুজছিলাম নিজে না ফেসে ওদের সরিয়ে দেওয়ার। ভার্সিটির এমবিএ’র স্টুডেন্ট থাকাকাকীন ছাত্রীহলে হলে যাতায়াত আমারো ছিলো। ব্যস সেটা তুমি জানতে পারোনি। কিকরেই বা জানবে? তোমার তাকে ছিলো তারেক, চঞ্চল, সৌরভ, শাওন। আর আমার লক্ষ্যে, ওদের পাটনারশিপের ইতি। কোনোরকম ঝামেলায় পরলে সাইফের সুযোগ নেবো, ওর সাথে যোগাযোগের অন্যতম কারন ছিলো এটা।
তবে একটা কথা সত্য, তোমাকে দেখার পর আর ছাত্রীহলে যাইনি আমি। এমন সুন্দরী বউ হলে, এক নারীতে আসক্ত হওয়াতে ক্ষতি নেই। তাছাড়া সাইফের আদরের বোনকে হাত করা মানে ওকেও হাত করা। তাই সাইফের কাছে তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবো ভেবেছিলাম। আমি তো আর জানতাম না যে তারেক, চঞ্চল আর শাওন চারবছর আগেই কক্সবাজারে নিজেদের মৃত্যু লিখে এসেছিলো। তার পরপরই তুমি পাশা উল্টালে। যেইনা জেনেলার ভুয়া রিপোর্ট নিয়ে আমি তোমাকে পাকড়াও করলাম, তুমি বলে দিলে, তুমি য়্যুমুর শোধ তুলতে চাও। শাওন, তারেক আর চঞ্চলকে মে’রে ফেলতে চাও। তোমার মতো একজন অপরাধীর সাথে আমি যেনো নিজেকে সাথে না জড়াই! ব্যস! তখন আমার মেঘ না চাইতেই জল টাইপ ঘটনা। রাজি গেলাম চুপ থাকতে! আফটার অল, আমার ভূমিকা ছিলো চুপ থাকা। অবশ্য নীলার হলুদের দিন যেচে গিয়ে শারাফকে একটু খুচিয়েছিলাম আমি। ওকে গিল্টিফিল করাতে আরকি। যাতে ও ঘুনাক্ষরেও তোমাকে সন্দেহ করার সুযোগ না পায়। এন্ড আই গেইস আই ওয়াজ সাকসেসফুল। হোয়াট সে?
স্নিগ্ধতার চোখ দিয়ে জল গরায়। তবুও হাসি ফুটালো ও ঠোঁটে। বললো,
– এতো সহজে সাকসেসফুল হতে চাইছেন? প্লান তো ছিলো জেনিমম শাওনকে মারবে আর মাদকগুলো আপনার ভরসায় ছাড়বো। যাতে আপনি সেগুলো শাওন আর ওর সঙ্গীদের কুকীর্তির প্রমান হিসেবে পুলিশে হস্তান্তর করতে পারেন। কিন্তু আপনিও এসবে জড়িতে সেটা জেনেও এই প্লানমাফিক কাজ করবো, এতোটাও ভালো আমি নই। এজ ইউ আর অ্যাডাল্টেরেটেড, আই হ্যাড টু মেক প্লান বি।
আরাফাত কিছুটা হচকিয়ে যায়। স্নিগ্ধতা ওরদিক তাকিয়ে বললো,
– ওই গোডাউন জেনিমম জ্বালিয়ে দিয়েছে মিস্টার আরাফাত। শাওন ওর এতোদিনের পুজি করা সব ব্রান্ডের মাদক নিয়ে ওখানেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। সেই সাথে আপনার কোটিপতি হওয়া, নির্দোষ সাজার সব পরিকল্পনাও রাখ করে দিয়েছি আমি।
আরাফাত রাগের জন্য চুল উল্টে ধরলো নিজের। সিটে থাবা মেরে শান্ত হলো। তারপর বিরবিরিয়ে বললো,
– তুমি বাচলে, পুলিশ আমার বিষয়েও জেনে যাবে সবটা। তাছাড়া সবথেকে বড় কথা, শারাফের সাথে বাসর সেরে আসা স্নিগ্ধতাকে আমি নিসন্দেহে চাইনি। ইউ নো হোয়াট আই মিন রাইট?
বলা শেষ করে আরাফাত রিভলবার স্নিগ্ধতার কপালের পাশে ঠেকালো। আবারো তাচ্ছিল্যে হাসলো স্নিগ্ধতা। বললো,
– এজন্যই আমি আসার পর একনজর পরখ করে আপনি আর চোখ তোলেননি রাইট? শারাফ তো ওর ভালোবাসার চিহ্ন একেছে আমার শরীরে। আমাকে আর এক্সেপ্ট কেনো করবেন আপনি? অথচ গতরাতের আগ অবদিও আমি আপনাকে পৃথিবীর বিশুদ্ধ মানুষগুলোর একজন ভেবে আত্নগ্লানিতে ছিলাম। শারাফের কথায় তো দুর, চোখের সামনে দেখেও বিশ্বাস করিনি, অনুকে স্টোররুমে আটকে দেওয়া মানুষটা আপনি হবেন। শাওনকে দেশে আনতে শারাফ আমার জন্য অনিবার্য ছিলো। আপনি নন। তাই আপনার ছোয়াও আমার শরীরে রাখিনি আমি। না জানি কখন তার দায়ে আপনার প্রতি দুর্বল হই। মোটকথা আপনাকে নিজের সাথে জড়িয়ে, কোনোভাবে কষ্ট দিতে চাইনি আমি। আর আপনি কি করলেন? পায়ে রিভলবার গুজে এনেছেন আমাকে সরিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে।
…
– যাইহোক! এটার অপেক্ষাতেই ছিলাম মিস্টার আরাফাত। যারা গল্পের এ অবদি আসবেনা, তারা জানবেও না, আরাফাত ঠিক কতোটা ভালোবেসেছিলো স্নিগ্ধতাকে। ধন্য আপনার ভালোবাসা।
স্নিগ্ধতা দুফোটা চোখের জল ফেললো। আর আরাফাত গান লোড করলো দুহাতে। স্নিগ্ধতা অকস্মাৎ ব্রেক কষে। স্টেয়ারিং এমনভাবে ঘোরায় যে, আরাফাত ঝোক সামলাতে ব্যর্থ হয়। ওর হাতের রিভলবারটা একহাতে কেড়ে নিয়ে সেটা ওরই দিকে তাক করে স্নিগ্ধতা। আরেকহাতে স্টেয়ারিং ধরে রেখে গাড়ি থামালো ও। তারপর দুহাতে রিভলবার আরাফাতের দিকে ধরে শীতলকন্ঠে বললো,
– সব ড্রাগস আমি পুড়িয়ে দিয়েছি। আর আপনার এগেইনিস্টের সব প্রমান ভাইয়াকে মেইল করেছে শারাফ। জেল থেকে বাচা কিংবা বেচে থাকার উদ্দেশ্য, এর কোনোটাই আপনারও নেই।
আরাফাত ভরকে যায়। রাগের বশে ও ভুলে গিয়েছিলো, এই সেই স্নিগ্ধতা, যে কিনা দক্ষ হাতে বারোটা খু’ন করেছে। স্নিগ্ধতার হাতে থাকা রিভলবারটার দিকে তাকিয়ে বললো,
– প্ পুট দ্যা গান ডাউন স্নিগ্ধতা…আমরা একসাথে…
স্নিগ্ধতা ঘাড় কাৎ করে নিশব্দে হাসলো। আরাফাত বললো,
– গান লোড করা আছে। ওটা নামাও স্নিগ্ধতা। লেটস স্টার্ট ইট টুগেদার। আমি…
স্নিগ্ধতা এবারে শব্দ করে হাসলো। তারপর রিভলবার নামিয়ে আনমোনা হয়ে গেলো হঠাৎই। নতদৃষ্টিতে বললো,
– শারাফের ছোয়া আমার শরীরজুড়ে মিস্টার আরাফাত। এ শরীরে আমি আর কোনো কলঙ্ক লাগাতে চাইছি না। মৃত্যুর আগোবদি ওর স্পর্শের অনুভব নিয়ে থাকতে চাইছি।
…
– সো ডু মি দিস ফেভার। শুট ইওরসেল্ফ!
স্নিগ্ধতা আবারো রিভলবার বাড়িয়ে ধরলো আরাফাতের দিকে। আরাফাত বিমুঢ়! স্নিগ্ধতার একেকবার একেক রুপ ওর বাকশক্তি থামিয়ে দিয়েছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে স্নিগ্ধতার। সামনের ড্রয়ার থেকে ইনজেকশন বের করলো ও। আর সিটের ওপর ডানহাত রেখেছিলো আরাফাত। স্নিগ্ধতা মুহুর্তেই আরাফাতের তালুর ওপরের রগে ইনজেকশন পুশ করে দিলো। আর্তনাদ করে হাত চেপে ধরে আরাফাত। কিছু করে ওঠার আগেই সেকেন্ড পাঁচেকের মধ্যে টের পায়, ওর শরীর বিবশ হয়ে আসছে। স্নিগ্ধতা রিভলবার ওর হাতের মুঠোয় গুজে দিলো। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে শক্তকন্ঠে বললো,
– ডু ইট মিস্টার আরাফাত! শুট ইওরসেল্ফ। নইলে আপনিও জানেন, এ দায়িত্ব আমি নিলে কি হতে পারে। স্নিগ্ধতা কতো ভ’য়ানক মৃ’ত্যু দিতে জানে!
আরাফাতের মস্তিষ্ক টালমাটাল। হাতে থাকা রিভলবার চেয়েও স্নিগ্ধতার দিকে তাক করতে পারছে না ও। শরীরে থাকা তরল আর চলমান গাড়ি দৃষ্টিভ্রম করছে। জ্বালা করছে ওর সমস্ত শরীর। তারপরও ও চেষ্টা করলো পাশে বসা স্নিগ্ধতাকে শুট করার। নিচু হতে গিয়ে স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে ফেলে স্নিগ্ধতা। ওর গাড়ি ঘুরে উঠে রাস্তার পাশের খাদে পরতে যাচ্ছিলো। কিন্তু ঠিক তখনই আরেকটা গাড়ি এসে ওর গাড়িটাকে ধাক্কা মারে। আর ঘুর্ণনের সময় দু গাড়ির ড্রাইভিং সিটে থাকা মানুষদুটোর চোখাচোখি হয়৷ স্নিগ্ধতা অস্ফুটস্বরে বলে ওঠে,
– শারাফ…
সামনের বাকে দুটো গাড়িকে ঘুর্নায়মান দেখে সাইফ ওর গাড়িটা দুরেই থামিয়ে দেয়। অগ্নিলার দেওয়া ওর ফোনে স্নিগ্ধতার লোকেশন দেখাচ্ছিলো। সেটা শারাফকেও সেন্ড করেছিলো ও। সাইফ নেমে আসে গাড়ি থেকে। এগোতে যাবে, ঠিক সে মুহুর্তেই সামনের গাড়ির একটা থেকে বুলেটের আওয়াজ হয়। সাইফ থমকে যায়। ওর পা থেমে যায়। বুকের ভেতরটায় যেনো অজানা তুফান শুরু হয়। সে তুফান যেনো বুকচিরে বেরোতে চায়, হাউমাউ করে কাদতে চায় আকাশ বাতাস কাপিয়ে। টপটপ করে জল গরায় সাইফের চোখ বেয়ে। আদর-খুনশুটি, প্রেম-অভিনয়, ভালোবাসা-প্রনয়, মান-অভিমান, রুপ-ভ’য়বহতা, নন্দিত-নিন্দিত, চাঁদ-কলঙ্ক, সবটার বুঝি এখানেই ইতি! এখানেই শেষ! নন্দিত চন্দ্রকলঙ্কের পরিসমাপ্তি এখানেই…
#চলবে…

