প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৪

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

আভিরা তাযীমের উপর এক হাত তুলে ঘুমে বিভোর। গায়ের উপর জড়িয়ে রাখা ওড়নাটা ফ্লোর ছুঁয়ে। নাওয়াজ ওড়নাটা তুলে ভালো করে জড়িয়ে দিল ঘুমন্ত রমণীর গায়ে। মুখের উপর পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে দিল। খুব সাবধানে সরায় যাতে তার হাতের স্পর্শ না লাগে। সূর্যের হালকা আলো চোখে পড়তে আভিরা চোখ মুখ সামান্য কুঁচকে নেয়।
আভিরার কুঁচকানো মুখ দেখে নাওয়াজ মৃদু হাসল। দু পা এগিয়ে জানালার পর্দা টেনে হালকা আলোয় মুদে থাকা রুমটাকে আঁধারে নিমজ্জিত করে দেয়। আরেক পলক আভিরাকে দেখে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

পুরো এক ঘণ্টা রাউন্ড দিয়ে কেবিনে এসে বসে। এখন তার অবসর সময়। রাতে ওটি থাকলে সকালে খুব একটা চাপ থাকে না। মাথা ব্যথাটা বেড়ে চলেছে। পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করে একটা নাম্বারে মেসেজ করে মোবাইল পকেটে পুরে কোনোদিকে না তাকিয়ে বের হয়ে গেল।

সকাল বিধায় পুরো রাস্তা ফাঁকায় বলা চলে। শুধু মিনিট পাঁচেক পর সাঁই সাঁই করে দু একটা গাড়ি চোখের পলকে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে। নাওয়াজ এবার হাত ঘড়িতে নজর বুলিয়ে নিল। ইতোমধ্যে ঘড়ির কাঁটা নয়টা পেরিয়েছে।
ওর রাগ এবার আকাশ ছুঁই।
কপালে ঘামের উপনীত, সাদা শার্ট গায়ের সাথে আঁটসাঁট হয়ে লেগে আছে, গৌর আননে কেমন লালচে বর্ণ স্বর্ণাভ। শীতের দিনেও ঘামছে। মাথা ব্যথা করলে তার অসহ্য লাগে, যন্ত্রণায় টেকা দায়। নাওয়াজের যেন ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল এবার। মিনিট কুড়ি হলো হসপিটাল থেকে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়। বিরক্তিতে নাওয়াজের মস্তিষ্ক থেতিয়ে ওঠে।

পুরো দশ মিনিট বাদে হন্তদন্ত হয়ে একটা ছেলে নাওয়াজের সামনে এসে দাঁড়ায়। মুখে মেকি হাসি ঝুলিয়ে বলল,
– সরি রে, দেরি হয়ে গেল। আর বলিস না রাস্তায় যে জ্যাম কী বলব তোকে!

মাহাদকে দেখে নাওয়াজের রাগ কেমন যেন মিলিয়ে গেল। নাওয়াজ জানে মাহাদ মিথ্যা বলছে। ওসব জ্যাম ট্যাম কিছু ছিল না। জেনেও সে যেন রাগ দেখাতে পারল না। মাহাদের পেটে পাঞ্চ মেরে বলল,
– আর কতক্ষণ আমায় দাঁড় করিয়ে রাখলে তোর খবর খারাপ করতাম শালা।

– খবরদার শালা বলবি না। আমি তোকে আমার বোন দিব না।

নাওয়াজের মুখে তেরছা হাসির দেখা মিলে। ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল। ঠোঁট দুটো প্রসারিত করে বলল,
– তোর বোন নেওয়ার জন্য বুঝি মরে যাচ্ছি।

– তা যাচ্ছিস না কে বলতে পারে। এমনও তো হতে পারে আমার বোনের জন্য তোকে আমার পিছনে ঘুরঘুর করতে হবে।

– বলছিস?

– হুম।

– কিন্তু আমার যে বউ আছে তা বোধহয় তুই ভুলে গিয়েছিস।বরং আমার বোনের জন্য তুই আমার পিছনে পিছনে ঘুরবি।

– তোর সাহায্য ছাড়াই তোর বোনকে আমি আমার করে নিব।

– আর আমার সাহায্যের প্রয়োজন হলে?

– প্রয়োজন হলে কী সাহায্য না করে থাকবি?

– একটু আগে তোর বলা ঐ কথার জন্য আমি তোকে সাহায্য করব তা ভুলে যা।

মাহাদ মুখে ইনোসেন্ট ভাব এনে বলল,
– তুই আমার সাথে এমনটা করতে পারবি ভাই।

– আলবাত পারব।

_

গাড়ির দু দিকের দরজা খুলে নেমে এলো দুজন সুদর্শন পুরুষ। দুজনের গায়ের সাদা এফ্রোনটা হাতের কব্জিতে রাখা। বিপরীত পাশে অবস্থানরত দুটো বাড়ির গেট খুলে ভিতরে প্রবেশ করল যুবক দুজন।

নাওয়াজ আর মাহাদের বন্ধুত্ব সেই কলেজ জীবন থেকে। নাওয়াজ মূলত গম্ভীর ধাঁচের মানুষ হওয়ায় ওর সাথে তেমন কোনো মানুষের বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি। বন্ধুত্ব হয়ে ওঠেনি বললে ভুল হবে। অনেকেই তার সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করেছে। তবে নাওয়াজ সকলকে এড়িয়ে চলত। তার এড়িয়ে চলার কারণও ছিল। ওদের সাথে ওর চিন্তা ভাবনা, স্বভাব কিছুই যেত না। কিন্তু মাহাদ যেন নাছোড়বান্দা। নাওয়াজের পিছনে লাগতে শুরু করে। এটা ওটা সাহারা করে কথা বলার চেষ্টা করত।
মাহাদ মানুষের সাথে ভাব জমাতে পটু। ক্লাসে মোটামুটি বেশ জনপ্রিয়তা আছে তার। তবুও যেন একটা মানুষের কাছে তার পাত্তা নেই। নাওয়াজের সবাইকে এড়িয়ে চলা, গম্ভীর স্বভাব মূলত মাহাদকে ভাবিয়ে তুলে। একটা ছেলে কীভাবে এত গম্ভীর ধাঁচের হতে পারে। কিছুটা আগ্রহ নিয়েই মাহাদ নাওয়াজকে সঙ্গ দেওয়া শুরু করে। নাওয়াজ বেশি দিন মাহাদকে এড়িয়ে চলতে পারল না। ধীরে ধীরে তাদের বন্ধুত্ব হয়ে ওঠে। যা আজ অবধি অনড়।

নাওয়াজ কলিংবেল বাজাতে লাবণ্য দরজা খুলে দেয়।
ভিতরে পা দিতে না দিতেই প্রশ্নের তোপে পড়তে হলো তাকে।

– রাতে আসোনি যে, ওটি ছিল?

– হ্যাঁ।

– কল দিয়েছিলাম।

– ব্যস্ত ছিলাম লাবণ্য, তাই ধরতে পারিনি।

কী এমন ব্যস্ত ছিল যে তার কল ধরার সময়টুকু পেল না। সে তো আর অযথা কল দেয়নি। রাতে বাড়ি না ফিরলে তার চিন্তা হয়। লোকটা তা বুঝলে তো। এ লোক যেন তাকে ছাড়া দুনিয়ার সব বুঝে।

লাবণ্য মুখ ভার করে বলল,
– ওহ!

নাওয়াজ সেদিকে নজর না দিয়ে বলল,
– মা কোথায়?

ইয়াজমীন হাসিমুখে ছেলের দিকে এগিয়ে আসে। ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়ালেই নাওয়াজ বাধা দিয়ে নিজের গাম্ভীর্যতা বজায় রেখে বলল,
– কাছে এসো না মা। আর কত বললে তুমি বুঝবে বলো তো। আমি বাহির থেকে এলে ফ্রেশ না হওয়া অবধি আমার কাছে আসবে না। সারাক্ষণ হসপিটালে থাকি। কত জীবাণু গায়ে লাগে তা জানা আছে তোমার। ফ্রেশ হয়ে আসি আগে।

– আচ্ছা যা।
হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় বলল ইয়াজমীন।

মায়ের এমন হাস্যোজ্জ্বল মুখের আদল খুব সূক্ষ্ম চোখে দেখে যায় নাওয়াজ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দ্রুত ফ্রেশ হতে গেল। সে জানে তার অপেক্ষায় মা না খেয়ে বসে আছে।

_

নাওয়াজদের বাড়ি খুব একটা বড়ো না। আবার ছোটোও বলা চলে না। মাঝারি সাইজের দোতলা একটা বাড়ি। এই বাড়িই যেন তাদের একমাত্র সম্বল।
স্বামী হারিয়ে ইয়াজমীন যেন নিজেকে ভুলতে বসেছিল। তার যে ছোটো একটা ছেলে আছে তাও বোধহয় মনে ছিল না। ছোটো নাওয়াজ তখন হঠাৎ করে বুঝদার হয়ে ওঠে।একটু একটু করে সব সামলে আজ এত দূর। বাবার মৃত্যুই নাওয়াজকে কেমন বদলে দেয়। এত বছরেও স্বামীর জন্য মন কেমন করে, চোখে অশ্রু আসে। ছেলের সামনে হাসিখুশি থাকলেও আড়ালে কান্নায় ভেঙে পড়ে ইয়াজমীন।

তিন সদস্যের সুখী পরিবার ছিল তাদের। সব মিলিয়ে ভালোই চলছিল। নাওয়াজ তখন মাধ্যমিক শেষ করেছিল। পরীক্ষা শেষে তখন তার হাতে অফুরন্ত সময়। কোথায় ঘুরবে না ঘুরবে সে চিন্তায় ছিল ছেলেটা। বন্ধুদের সাথে সিলেট যাওয়ার পরিকল্পনাও সেরে নিয়েছিল। পরে তা বাদ দিয়ে বাবা মায়ের সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাবে। মাকে জানাতে সেও সায় দেয়। পুরো পরিবার মিলে কয়েক দিনের জন্য না হয় সিলেট যেয়ে ঘুরে আসবে। এর মাঝেই খবর এলো ইয়াজমীনের মায়ের শরীর খুব একটা ভালো না। তাকে দেখতে চাইছে। ছেলেকে রেখে স্বামীকে নিয়ে মাকে দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কিন্তু পথিমধ্যে অমানবিক এক সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়। মাকে আর দেখতে যাওয়া হলো না। সেই দুর্ঘটনায় চিরতরে হারাতে হয় নিয়াজ সাহেবকে।

বাবাকে হারিয়ে নাওয়াজ নির্বাক চিত্তে বাবার লাশের দিকে অনিমেষ চেয়েছিল। না একবারের জন্য মায়ের কাছে যায় আর না বাবার লাশ আঁকড়ে অশ্রুপাত করে। কবর দেওয়ার পর শুধু কবরের মাটি আলতো ছুঁয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলেছিল,
– তুমি আমাদের একটুও ভালোবাসো না বাবা। নয়তো আমাদের একা করে এভাবে ফাঁকি দিয়ে ওপারে চলে যেতে। আমার সিলেট যাওয়া হলো না বাবা। তুমি কিন্তু আমায় কথা দিয়েছিলে। তুমি কেন তোমার কথা রাখলে না? জানো সবাই কান্না করেছে, শুধু আমি বাদে। যারা কথা দিয়ে কথা রাখতে জানে না আমি কেন তাদের জন্য চোখের পানি ফেলতে যাব।

ঐ শেষবার বোধহয় বাবার কাছে অভিযোগ করেছিল। কিন্তু প্রতিউত্তরে তিনি ছেলেকে স্বান্তনা দেননি।

বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও কী হবে? তাদের মধ্যে ছিল অগাধ শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, ভালোবাসা। সে মানুষটাকে হঠাৎ হারিয়ে ইয়াজমীন তখন পাগলপ্রায়। একমাত্র ছেলের কথা তার মাথায়ও আসেনি। সদ্য বাবা হারিয়ে তার যে মাকে এখন ভীষণ দরকার। আত্মীয় স্বজনরাও কয়েক দিন থেকে যে যার মতো চলে যায়। ভঙ্গুর ছেলেটার কথা কেউ ভাবেনি। ইয়াজমীন দিনকে দিন নিজেকে গুটিয়ে নিতে থাকে। স্বামীর মৃত্যুর জন্য তিনি একপ্রকার নিজেকে দোষারোপ করতেন। মায়ের এমন দশা দেখে নাওয়াজ একা হাতে সবটা সামলে চলত। একা একা সবকিছু করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হতো তাকে। মাঝে মাঝে রাগে দুঃখে কান্না করে দিত। বাবার উপর অভিমান হতো ভীষণ। কেন একা ফেলে চলে গেল?

একটা সময় বাদে ইয়াজমীন অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কিন্তু ছেলে তার সময়ের ব্যবধানে অনেক পাল্টেছে। হয়ে উঠেছে কঠোর চিত্তের অধিকারী। মাত্রাতিরিক্ত রাগী, গম্ভীর, বদমেজাজি যাকে বলে। তবে মায়ের সামনে এমন খোলসে থাকে না। একদম অনাবৃত থাকে। যাতে কোনো বাধা ছাড়াই তার ভিতর বাহির সবটা তার মা পড়তে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here