#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৩৭
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
পুরো বাড়ির আঙিনা লোক সমাগমে ভরপুর। কোথাও দায়িত্বরত কর্মী, কোথাও আবার ভিড় জমিয়েছে অনুষ্ঠানে আগত মানুষজনেরা। বিশাল উঠানের এক পাশে প্যান্ডেল করা হয়েছে লোকজনের খাওয়ার ব্যবস্থায়। একদম দক্ষিণ দিকে চলছে রান্নার কাজ। কয়েকজন মহিলা আদা, রসুন, পেঁয়াজ, শসা কাটছে। দুজন পুরুষ লোক রান্না করবে। বড়ো একটা পাতিলে গোশ রান্নার জন্য যাবতীয় যা মশলাপাতি লাগে সব একে একে দিয়ে ভালো মতন মাখিয়ে নিল। বেরেস্তাগুলো বড়ো একটা ডিশে তুলে রেখেছে। একদিকে পানি গরম করা হচ্ছে আর অন্যদিকে মাছের পিস ভাজা হচ্ছে। কয়েক কদম সামনে যেতেই দেখা মিলে সামাদ ব্যস্ত হয়ে এটা ওটা তদারকি করছে। সৌভিক গিয়েই একটা চাপড় মারল।
– কিরে ব্যাটা আমাদের ওয়েলকাম করলি না যে?
সামাদ ওকে দেখে একটু চমকায়। এক হাতে জড়িয়ে বলল,
– সরি রে, দেখছিস তো কাজে ব্যস্ত। তোদের খেয়াল করিনি। ভিতরে গিয়ে বোস। আমি একটু পরে আসছি।
ওরা সবাই ভিতরে গেল। সামাদের নজরে এলো না কেউ একজন তার ঘামে জবজবে হয়ে থাকা শরীর কেমন বিতৃষ্ণা নিয়ে চেয়ে দেখছিল।
বাহিরে না যত মানুষের সমাগম, ঘরের ভিতরে তার চার গুণ। পা রাখার জায়গা নেই বললেই চলে। খুব স্বল্প পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে। কেউ প্রথম দেখায় বুঝবে না এ কোনো অনুষ্ঠান বাড়ি। লোক খাওয়ানোর ব্যবস্থা ছাড়া তেমন কোনো আয়োজন করা হয়নি। তবুও এত এত মানুষ।
সামাদের ছোটো চাচার দুই ছেলে। সেই দুই ছেলের সুন্নতে খতনার অনুষ্ঠান আজ। ভদ্রলোক পরিবার সমেত দেশের বাহিরে থাকে। সপ্তাহখানেক হলো দেশে এসেছে দুই ছেলের খতনা করাবে বলে। পরিবার পরিজন বলতে সবই তো দেশের মাটিতে। ভিন দেশে এমন অনুষ্ঠান করা অসামঞ্জস্য। সেজন্য বউ বাচ্চা সমেত দেশে আসা।
ইসলামি বিধানে খতনা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এটি ইসলামের মৌলিক নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি মুসলিম পরিবারের ছেলে শিশু একটু বড়ো হলে তার খতনা করানোর তোড়জোড় শুরু হয়। তবে খতনা করানোর সাথে অনুষ্ঠানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সুন্নতে খতনার অনুষ্ঠান একটি সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা। এটি শরিয়ার কোনো বিধান নয়। খতনা হলেই যে সুন্নাহ অনুষ্ঠান করতে হবে এরকম কোনো বিধান নেই। এটি একটি সামাজিক ও লৌকিক আনুষ্ঠানিকতা। লৌকিক আনুষ্ঠানিকতা হলে এটি করতে কোনো বাধা নেই। তবে এটাকে শরিয়া বা দ্বীনি কোনো বিধান দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ইসলামে এ ধরনের কোনো আনুষ্ঠানিকতার বিধান দেওয়া হয়নি।
ইমাম আহমাদকে একবার খতনার অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হলে তিনি দাওয়াত গ্রহণ করেন এবং খাবার খান। এ ধরনের দাওয়াত খাওয়ানোর বিশেষ কোনো ফজিলতও নেই। যেহেতু এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো শরয়ি দলিল উদ্ধৃত হয়নি। তবে যদি দাওয়াতকারী এর মাধ্যমে আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও মুসলমান ভাইদের খাবার খাওয়ানোর আমল পালনের উদ্দেশ্য করে, স্বীয় খাদ্যসামগ্রী ব্যয় করার নিয়ত করে তাহলে আল্লাহ চাহেত তিনি সে সওয়াব পাবেন।
নিঃসন্দেহে খতনা আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব, আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ উপলক্ষ্যে ভোজ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে কোনো আপত্তি নেই। [ফাতাওয়াল্ লাজনাহ আদ্দায়িমা (ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটির ফতোয়াসমগ্র), খণ্ড-৫; পৃষ্ঠা-১৪২]
এছাড়া হাদিস শরিফে বর্ণিত, একবার হযরত উসমান ইবনে আবুল আস (রা.) কে খতনার একটি দাওয়াতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু তিনি তাতে শরিক হতে অস্বীকৃতি জানান। তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় আমরা খতনা উপলক্ষ্যে কোথাও যেতাম না এবং সেজন্য আমাদেরকে দাওয়াতও করা হতো না। (মুসনাদে আহমদ : ৪/২১৭)।
তবে কোনো কোনো সাহাবি খতনা উপলক্ষ্যে কখনো খাবারের ব্যবস্থা করেছেন এমন বর্ণনাও আছে। সুতরাং এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, খতনা উপলক্ষ্যে দাওয়াতের আয়োজন করা সাধারণ দাওয়াতের মতো মুবাহ মাত্র। অতএব এতে শরিয়ত গর্হিত কোনোকিছু না হলে এ আয়োজন করা এবং তাতে শরিক হওয়া জায়েজ আছে। তবে একে সামাজিক প্রথায় পরিণত করা যাবে না। আর যদি এ দাওয়াতকে বিশেষ সওয়াবের কাজ মনে করা হয় কিংবা এতে শরিয়ত গর্হিত কোনো কাজ থাকে, তাহলে এ আয়োজন করা এবং এতে শরিক হওয়া নাজায়েজ। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা : ৯/৩৪১; খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ৪/৩৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩৪৩; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৮/১৭৬)
তবে বর্তমানে খতনা উপলক্ষ্যে যে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের রেওয়াজ শুরু হয়েছে তা অবশ্যই বর্জনীয়। এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের অনুমিত ইসলাম দেয় না। এছাড়া ঐ অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, বাদ্য ইত্যাদি শরিয়ত বিরোধী কিছু থাকলে তা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।
যেহেতু জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আড়ম্বর ইসলামে বর্জনীয় সে কথা মাথায় রেখে শুধু লোক খাওয়ানো হবে। এছাড়া আর তেমন কিছু করা হয়নি। আর ভদ্রলোক এতকাল পর পরিবার সমেত দেশে এসেছে। তাই দূর দূরান্তের যত আত্মীয় স্বজন, পরিচিত লোক আছে সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। নয়তো এত মানুষ হওয়ার কথা না।
_
আভিরা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে এক কোণায় দাঁড়িয়ে রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আগত মানুষজনেরা সকলে নতুন বউ দেখতে ভিড় জমিয়েছে। সেই আসার পর থেকে যে তাকে জেঁকে ধরেছে এখন অবধি দেখায় শেষ হলো না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আভিরার পা ব্যথা হওয়ার জো। আশেপাশে বাড়ির কেউ নেই। তাদের সকলের মাঝ থেকে কয়েকটা কিশোরী মেয়ে তাকে নিয়ে এসেছিল। এখন এনে ছেড়েছে বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাদের মাঝে।
– তা মেয়ে পাক করতে জানো তো?
আভিরা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। পাক বলতে কী বুঝিয়েছে তাই বোধগম্য হলো না যেন। ওকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে একজন বলল,
– এমন করে তাকায় আছো কেন? তুমি রান্ধন জানো না।
এবার মেয়েটা বুঝল। মাথা নাড়িয়ে বুঝায় সে রাঁধতে জানে।
– তা জামাই তুমি বোবা মাইয়া বিয়া কইরা আনছো আগে কয়বা না?
আভিরা মাথা তুলতেই নজরে এলো তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষটাকে। মেয়েটা কী বলবে বুঝে এলো না।
অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলার অভ্যাস তার নেই। তাছাড়া এত মানুষের সাথে সে কী কথা বলবে। ওনারা যা জিজ্ঞেস করছে অল্পস্বল্প তার উত্তর তো দিয়েছেই।
নাওয়াজ একটা চেয়ারে আয়েশ করে বসে, এক হাতে টেনে মেয়েটাকেও পাশের চেয়ারে বসায়। মাথার চুলগুলো পিছনে ঠেলে দিয়ে বলল,
– তার আগে বলো আমার বউকে এতক্ষণ ধরে দাঁড় করিয়ে রেখে জেরা করার মানে কী?
– কেমন সতীন আনলে একটু দেখছিলাম। কিন্তু মেয়ে দেখছি বোবা, কথা বলতে পারে না।
– নিয়ে এলাম বোবা মেয়ে। যেন তোমার সাথে ঝগড়া না বাঁধাতে পারে সে চিন্তা করে। আর তুমি তাকে বোবা বলে যাচ্ছ।
– রাখো তোমার কথা। মাইয়া রান্ধন জানে তো?
– একটু আধটু জানে। তোমার সতীন বিয়ে হতেই শাশুড়ির থেকে রান্না শিখেছে স্বামীকে রেঁধে খাওয়াবে বলে। মেয়ে সাংসারিক অনেক, স্বামীর খেদমত করতে জানে। তাই না আঞ্জুম?
বলেই আভিরার দিকে তাকায়। আভিরা লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেলে। এত লোকের সামনে এসব বলার কোনো মানে হয়।
– স্বামীর খেদমত করা হলো পূণ্যের কাজ। সবসময় এমন থাকলেই হইল। আজকালকার মাইয়া কওন যায় না। এরা তো জামাইয়ের কথা হুনতেই চায় না। এক কথা কয়লে হুনবো দো না ঐ আবার মুখে মুখে তর্ক ঠিকই করব।
দেখো বউ তোমার কয়দিন ঠিক থাকে। দেখতে নম্র ভদ্রই লাগতাছে, তবে কওন যায় না। বেশি লাই দিলে মাথায় উইঠা নাচবার চাইব। ছোটো মাইয়া যেমন আদরে রাখবা তেমন শাসনও করবা। তোমার কথার বাইরে যেন না চলবার পারে।
এহনতে লাগাম না টানলে দেখা যাইব এখনকার মাগি বেডি গো মতো জামাইয়ের মুখে মুখে তর্ক কাটব। তখন জামাইয়েরতে পাশের বাড়ির বেডায়াইতের কথা বেশি মধুর মনে হইব।
আভিরা চোখ খিঁচিয়ে নেয়। এদের মুখে দেখি কিছুই আটকায় না। এ লোকও কেমন শুনে যাচ্ছে।
– আরে বউ লজ্জা পাইয়ো না, এসব কথা কত শুনতে হইব। প্রথম শ্বশুর বাইত যাইয়া এসব হুইন্না আমরাও শরম পাইতাম। এহন দেহো নিজেরাই কই। তবে যাই ওক জামাইয়ের কথা হুইন্না চলবা, হের কথার অবাধ্য হইবা না।
আভিরা মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।
– সেসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। সে আমার কথার অবাধ্য হবে না কোনোকালে। এসব বাদ দিয়ে বলো সতীন পছন্দ হয়েছে তো।
– দেখতে হুনতে তো খারাপ না, চলনসই। তবে আমি এরতে ম্যালা সুন্দর। কেন যে আমারে ছাইড়া এমন বোবা মাইয়া বিয়া করতে গেলা।
নাওয়াজ হো হো করে হেসে উঠল।
_
মাহিরা অস্থির হয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। যদিও সে যেখানে বসেছে সেখান থেকে বাহিরের কিছু দেখা সম্ভব নয়। তবুও মেয়েটার চোখ ঘুরেফিরে ঐ বাহির দিকেই।
লাবণ্য দেখল মাহিরার এমন অস্থিরতা। কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
– অত কী দেখেছিস?
হঠাৎ এমন করাতে মেয়েটা কিছুটা ভয় পেল, চোখ পাকিয়ে তাকায় লাবণ্যর দিকে।
– তোর কোন কাজ নেই তাই না?
– আপাতত কোনো কাজ নেই।
– না থাকলে চুপচাপ বসে থাক।
– পাশে বসে কেউ হাঁসফাঁস করতে থাকলে চুপচাপ বসে থাকি কেমন করে?
– তাহলে চল আমার সাথে।
– কোথায়?
– বাহিরে।
মাহিরা লাবণ্যকে নিয়ে বাহিরে গেল। লাবণ্য হঠাৎ বাধা দিয়ে বলে উঠল,
– চল ভিতরেই বসে থাকি। বাহিরে যাওয়ার দরকার নেই।
– কেন? কী সমস্যা?
– অনেক মানুষ ওখানে। যাওয়ার দরকার নেই।
রান্নার ওদিকটায় প্রচুর মানুষের ভিড়। রান্না প্রায় শেষের দিকে। দুটো পাতিল নামিয়ে এক সাইডে করে রাখা হয়েছে।
ভাতটা হয়ে এলেই শেষ। মাহিরাকে দেখেই সামাদ হাতের কাজ রেখে গম্ভীর স্বরে ধমকে উঠল,
– এখানে এসেছ কেন? ভিতরে যাও।
মাহিরা গেল না। নিচু স্বরে বলল,
– তোমার সাথে যাব।
– দেখো মাহিরা, রাগিও না আমায়। দেখছ তো কত ব্যস্ত। এখন তোমার সাথে রঙ ঢং করার সময় নেই আমার।
দাঁড়িয়ে না থেকে ভিতরে যাও। এখানে অনেক পুরুষ। সবার নজর ঘুরেফিরে তোমার উপর।
মাহিরা বেশ বুঝল, সেদিন দেখা না করার কারণেই এত রাগ করেছে। তাই বলে তার দিকে তাকাবেও না। তার দোষ কোথায়। সে তো দেখা করবে ভেবেই রেখেছিল। পরে আর সময় পেল কই। অনুষ্ঠান বাড়ি রেখে চাইলেই তো আর বের হওয়া যায় না। মাহিরা সামনে তাকিয়ে দেখল দুটো ছেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। মাহিরা আর দাঁড়াল না। পা চালিয়ে বাড়ির ভিতরে গেল।
_
– সামাদ ওনাকে মাছ দিও না। এই মাছ সে খায় না।
– ভাবি তাহলে গোশ দেই?
– ঝোল একটু বেশি দিও, সাথে আলু।
সামাদের চাচাতো ভাই বলে উঠল,
– ভাই সব আপনি বললে, ভাবি কী বলবে? সে কী খাবে না খাবে তাকে বলতে দিন।
নাওয়াজ খেতে খেতেই ঠান্ডা স্বরে জবাব দিল,
– সে বলবে না।
আভিরা দু লোকমাও খেতে পারল না। এত এত মানুষের মাঝে খাওয়া যায়। আগে তো মা সাথে থাকত। সে খেতে না চাইলেও জোর করে পাতে এটা ওটা তুলে দিত। লোকটা যদিও সেসব খেয়াল রাখছে, তবুও মেয়েটা খেতে পারল না।
সে খায়নি দেখে নাওয়াজও আর খেল না। উঠে গেল টেবিল ছেড়ে। আভিরার খারাপ লাগল। তার জন্য লোকটা না খেয়েই উঠে গিয়েছে। মেয়েটা টইটম্বুর জল চোখে পুরুষটার যাওয়ার পানে চেয়ে রইল।
_
বসার ঘরে আড্ডা জমেছে। কথায় কথায় নাওয়াজের সুন্নতে খতনার কথা ওঠে। ইয়াজমীনই উঠিয়েছে। কী রঙিন ছিল সে দিনগুলো। তার চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে উঠল এক একটা দিন। ছেলেটা ভয়ে টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিল সেদিন। সে কিছুতেই খতনা করবে না।
নাওয়াজ হঠাৎ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে এতগুলো মহিলা মানুষের সামনে এসব কথা বলাতে। এখানে পুরুষ লোকের থেকে মহিলায় বেশি। নাওয়াজ চোখ রাঙিয়ে তাকায় মায়ের দিকে। ভরা মানুষের সামনে এসব বলার মানে কী। সে কি ছোটো বাচ্চা আছে এখনও। কয়েক বছর বাদে তার নিজের ছেলের খতনা করাবে। আর এখন তারই বউয়ের সামনে তার খতনার কথা বলে যাচ্ছে।
– কী জামাই? বউয়ের সামনে এসব বলায় বুঝি শরম পাইছ?
সামাদের দাদির কথায় সবাই উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। নাওয়াজ বহুকাল আগে থেকে সামাদের দাদিকে বউ বলে বেড়ায়। বয়োজ্যেষ্ঠ এ মহিলাও নাওয়াজকে দেখলেই জামাই জামাই করবে। তাদের সম্বোধনটা দাদি নানিতে যায় না কখনো।
নাওয়াজ কোনোরকম পালিয়ে বাঁচল। এখানে আর বসে থাকা ঠিক হবে না। দেখা যাবে পরে যা সম্মান আছে সব যাবে। আভিরা দেখল নাওয়াজের মুখ লুকিয়ে পালিয়ে যাওয়া। এই নির্লজ্জ পুরুষ আবার লজ্জাও পেতে জানে। আভিরার জানা ছিল না এ কথা। যে পুরুষ দিন রাত তাকে লজ্জায় ফেলে সে কিনা ভরা লোকের সামনে লজ্জা থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেল।
_
মেয়েলি চিৎকারে নাওয়াজ ঝড়ের গতিতে তিন তলা থেকে নেমে এলো। তার বুকের কম্পন অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
আভিরাকে ব্যথায় গোঙাতে দেখে নাওয়াজ নির্বাক হয়ে মেয়েটার পানে চেয়ে থাকে। তীব্র বৈশ্বানরে তার রুদ্ধশ্বাস দশা। অসহ্য ব্যথায় যেন বুকের বা পাশে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
শরীরের প্রতিটা অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নিপীড়িত হয় তীক্ষ্ণধী ক্লেশে। মস্তিষ্ক যেন স্থাবর হয়ে আসে। ক্রোধে, অসহায়ত্বে বাদামি চোখের মণি লেলিহান শিখার ন্যায় জ্বলে উঠল।
ভরা বাড়িতে এখন লোক নেই বললেই চলে। হাতে গোনা কয়েকজন বাদে সকলেই চলে গিয়েছে। সব গোছগাছ চলছে। বড়ো বড়ো দুটো পাতিল নামিয়ে রেখেছে ধারে কাছে। আভিরা দাঁড়িয়ে এদের কাজই দেখছিল। তাহলে এই জ্বলন্ত কাঠে পড়ল কেমন করে।
নিশ্চল পা যুগল টেনে আভিরার কাছে এসে থামে নাওয়াজ। মেয়েটাকে দু হাতে তুলে নেয়। অস্থির হয়ে জানতে চাইল,
– পড়লেন কী করে?
– জানি না। মনে হলো কেউ ধাক্কা দিয়েছে।
নাওয়াজের সবটা কথা কানে গেল না। সে ভিতর থেকে পানি আনার জন্য তাড়া দেয়। মগ ভর্তি পানি ঢালতে লাগল ডান হাতে, পায়ে। আভিরা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করার প্রয়াস চালিয়েও ব্যর্থ হলো। ব্যথা সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারায় সেখানেই। নাওয়াজের হাত থামে। মেয়েটার গালে হাত রেখে অধৈর্য হয়ে ডাকল,
– আঞ্জুম, চোখ বন্ধ করলেন কেন? চোখ খুলুন। এই মেয়ে চোখ খুলতে বলেছি আপনাকে।
মেয়েটা কাঠখোট্টা পুরুষের এত হম্বিতম্বি শুনলে তো। তার কপাল ঠেকল পুরুষটার শক্ত বুকে। কপাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া রক্তে ভিজতে লাগল ঐ শক্ত বুকখানা।

