#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৪০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আভিরা অসহায় চোখে ইয়াজমীনের পানে চেয়ে আছে। ইয়াজমীনও তেমন। তাদের সামনে তোফায়েল আহমেদ বেশ আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিল। আনেসা মেয়ের সাথে বসে রয়েছে। পুরো ঘরে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। তোফায়েল আহমেদ চায়ের কাপটা রেখে বলল,
– আপা আপনার ছেলের আর কতক্ষণ লাগবে। অনেক্ষণ তো হলো এলাম, এবার মেয়েকে নিয়ে যেতে হবে।
– ও আসছে। বাড়ির কাছাকাছি এসে গিয়েছে বোধহয়।
– বেশি দেরি করা সম্ভব নয় আপা। আমার কাজ আছে। মেয়ের মা, মেয়েকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আমায় আবার তাযীমের স্কুলে যেতে হবে।
বিনা খবরে তোফায়েল আহমেদ আর আনেসা সকাল সকাল হাজির হয়েছে। ইয়াজমীন তখন আভিরাকে খাইয়ে দিচ্ছিল। ওদের দেখে আভিরা, ইয়াজমীন দুজনই হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে।
আনেসা এসেই অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করলেও তোফায়েল আহমেদ একটা কথাও বলেনি। শুধু বলল আভিরাকে নিতে এসেছে, এখনই বের হবে তারা। কিন্তু ইয়াজমীন ছেলেকে না জানিয়ে মেয়েটাকে যেতে দেয় কেমন করে। তাই তোফায়েল আহমেদকে বলে নাওয়াজ এলে তারপর যাবেন না হয়। ছেলেটার আজ ডিউটি নেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। অথচ নাওয়াজের আজ ডিউটি ছিল। মিথ্যা বলল ইয়াজমীন। নয়তো এ কথা না বললে তোফায়েল আহমেদ ঠিক আভিরাকে নিয়ে এতক্ষণে বেরিয়ে যেত। আর তার ছেলে, ছেলেকে তো ভালো করেই চেনা। মেয়েটাকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছে শুনলেই তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলবে। সেজন্য মিথ্যা বলা।
নাওয়াজ এলো মিনিট দশেক বাদেই। ছেলেটার পায়ের গতি দেখে বুঝা যাচ্ছে কতটা অস্থির হয়ে ছুটে এসেছে।আভিরাকে ঘরে দেখে নাওয়াজ কিছুটা শান্ত হয়। তবে তার অস্থিরতা কমেনি। ইয়াজমীন খানিকক্ষণ আগে কল দিয়ে তাকে বলেছিল, তোফায়েল ভাই এসেছে আভিরাকে নিয়ে যেতে। ব্যস! এতটুকু শুনেই ছেলেটা ছুটে এসেছে।
তোফায়েল আহমেদ নাওয়াজকে দেখেই মুখাবয়ব গম্ভীর করে নেয়। নাওয়াজ গায়ের এফ্রোন খুলতে খুলতে বলল,
– কেমন আছেন?
– ভালো। তোমার কী খবর?
– জি, ভালো আছি।
তোফায়েল আহমেদ কোনো কথায় বলল না। ওনাকে কিছু বলতে না দেখে নাওয়াজ গিয়ে ওনার পাশে বসল।
খানিকক্ষণ নীরব থেকে বলল,
– আসবেন যে আগে বলেননি তো?
তোফায়েল আহমেদ কিছুটা রুক্ষ কণ্ঠে জানতে চাইল,
– কেন আমার মেয়ের বাড়িতে আসতে হলে তোমাকে জানিয়ে আসতে হবে?
নাওয়াজ ক্ষীণ শ্বাস ফেলে। ধীর স্বরে বলল,
– আমার বউ নিয়ে যাওয়ার মনোভাব পোষণ করলে অবশ্যই জানিয়ে আসতে হবে।
তোফায়েল আহমেদ এ কথার প্রত্যুত্তর না করে ইয়াজমীনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– আপা মেয়েটার কী লাগবে না লাগবে যদি বের করে দিতেন।
নাওয়াজের দৃঢ় কণ্ঠ কানে এলো।
– সে এখন কোথাও যাবে না।
– মেয়েকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছি।
– কিন্তু সে এই অবস্থায় কোথাও যাবে না।
– কেন? তোমার কথায় তো সব হবে না। আমি মেয়ে নিয়ে যাব।
– আমি যেতে দিব না তাকে।
– নাওয়াজ বেশি বাড়াবাড়ি করছ তুমি। মেয়ের এমন একটা অবস্থা হলো সে খবরটা অবধি দাওনি তুমি। আজ এতদিন পর আমার জানতে হচ্ছে আমার মেয়ে শরীর পুড়িয়ে ফেলেছে। আপা আনেসাকে কল দিল বিধায়। নয়তো জানাই হতো না। এমন একটা খবর না দেওয়ার কারণ কী? এখন আবার বলছ মেয়ে দিবে না।
– হ্যাঁ, দিব না। আর শরীর পুড়েনি তার। হাত আর পায়ে কিছু জায়গায় দগ্ধ হয়েছে। সেরে যাবে।
– ভাইজান আপনি আমার ছেলেটাকে অযথা ভুল বুঝছেন। বেশি দিন তো হয়নি আপনি হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন। এখন হঠাৎ এমন একটা খবর পেলে নিশ্চয় চিন্তায় অস্থির হয়ে যেতেন, শরীর খারাপ হতো তাতে। তাই নাওয়াজ বলেছিল এখন এসব আপনাকে না জানাতে।
কাল রাতে ইয়াজমীন আনেসাকে কল দিয়েছিল। ভালো মন্দ জেনে আনেসাকে বলেছিল দুদিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা। সাথে তোফায়েল আহমেদও ছিলেন সে কথা ইয়াজমীন জানত না। স্পিকার দেওয়া ছিল বিধায় সব কথায় তোফায়েল আহমেদের কানে যায়। ভদ্রলোক শুধু পারেনি ঐ রাতেই বেরিয়ে আসতে। রাতের তখন সাড়ে এগারোটা। এত রাতে চাইলেই মেয়ের শ্বশুর বাড়ি আসতে পারেন না তিনি। সকাল হতেই মেয়ের কাছে এলো, মেয়েকে নিয়ে যাবেন সাথে করে।
নাওয়াজই বলেছিল এসব কথা এখন ও বাড়ির কাউকে না জানাতে। বিশেষ করে তোফায়েল আহমেদকে। এ লোক কেমন মেয়ের জন্য পাগল তা তো নাওয়াজের জানা। দেখা যাবে এসব শুনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরে ঐ লোককে আবার হসপিটালে ভর্তি করানো লাগবে। মেয়েটার শরীর কিছুটা ঠিক হলেই জানাবে ভেবেছিল। কিন্তু তার মা আগ বাড়িয়ে বলতে গিয়ে আরেক ঝামেলা বাঁধাল এখন।
– সে বুঝলাম। এখন মেয়েকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।
– বললাম তো উনি এখন এ বাড়ি থেকে কোথাও যাবে না।
তোফায়েল আহমেদ এবার রেগে গেলেন। এত কথা বলতে ভালো লাগছে না তার। সে কি এখন তার মেয়েকে নিয়ে যেতে পারবে না। এ ছেলের অনুমতি লাগবে মেয়ে নিতে।
– আমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাব। তুমি বাধা দেওয়ার কে?
– আব্বুর সাথে যাব আমি।
নাওয়াজ কিছু বলার আগেই আভিরার জবাব ভেসে এলো। হঠাৎ আভিরার এমন কথায় নাওয়াজের মেজাজ বিগড়ায়। দাঁতে দাঁত পিষে ছেলেটা। কত বড়ো সাহস এ মেয়ের। দেখছে সে বলেছে যেতে দিবে না। তবুও ও বাড়ি যাওয়ার কথা বলে। এমনিতেই তো তোফায়েল আহমেদকে মানাতে তোষামোদ করতে হচ্ছে। তার উপর এ মেয়ের মাতব্বরি।
নাওয়াজ ঘাড় ঘুরিয়ে চাইল ঐ মেয়ের দিকে। নাওয়াজের অমন দৃষ্টি দেখে মেয়েটা ভয়ে কুঁকড়ে যায়।
– আপনাকে আমাদের মাঝে কথা বলতে বলা হয়নি। চুপ করে দেখে যান। কোনো কথা বলবেন না। আমি আর আপনার বাবা কথা বলছি তো, মাঝে কেন কথা বলছেন।
আভিরা লজ্জা পেল, অপমানিত বোধ করল খানিকটা। এভাবে বলার কী আছে। তার বাবা আর এ লোক তো একপ্রকার তর্ক লেগে যাচ্ছে তাকে নিয়ে। সেজন্য বাবার সাথে যাওয়ার কথা বলল। কারণ বাবার রাগ তার জানা আছে। আগে পরে তাকে বাবার সাথেই যেতে হবে এও জানে।
নাওয়াজ জোরে জোরে শ্বাস ফেলে তোফায়েল আহমেদকে বুঝানোর জন্য বলল,
– আপনি সারাদিন কলেজে থাকেন, আন্টিও সকাল থেকে দুপুর অবধি তাযীমের জন্য স্কুলে থাকে। আপনারা দুজন বাহিরে থাকলে ওনার দেখভাল কে করবে?
তোফায়েল আহমেদ যেন নাওয়াজের কথা গায়ে লাগায় না। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে বলল,
– সেসব আমি বুঝে নিব। তোমার না বুঝলেও চলবে।
– আমি ওনার স্বামী, ওনার ভালো মন্দ আমাকেও বুঝতে হবে। আপনি না চাইলেও বুঝব। এখন তার আমার কাছে থাকাতেই ভালো।
– তাহলে তুমি থাকার পরও আমার মেয়ের এ অবস্থা হলো কী করে?
– আমি তখন ছিলাম না ওনার সাথে। আমি থাকলে এমন কিছু হতো না, তা আপনিও জানেন। আমি হতে দিতাম না।
তোফায়েল আহমেদ এবার কিছু বলল না। তিনি এ কথা ভালো করেই জানেন। তার থেকে ভালো বোধহয় আর কারো জানার কথা নয়ও। এ ছেলে নিজের জীবন দিয়ে দিবে, তবুও তার মেয়ের কিছু হতে দিবে না।
তোফায়েল আহমেদকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে নাওয়াজ আবার বলল,
– আপনার মেয়ের এখন তিন বেলায় ঔষধ খেতে হয়। ঠিক সময়ে ঔষধ না খেলে কি করে হবে। আপনাদের ওখানে গেলে তার দেখভালে কমতি রাখবেন না আমি জানি। কিন্তু সে এখানে বেশি ভালো থাকবে। মা, লাবণ্য সবাই আছে তাকে দেখার জন্য। ওখানে আপনি আর আন্টি ছাড়া কিন্তু আর কেউ নেই। আপনারা দুজনই ব্যস্ত থাকেন। এখন তাকে নিয়ে যাওয়ার কথা বলবেন না স্যার। আর এ অবস্থায় তাকে এত দূর জার্নি করে যেত দিব না আমি।
শেষ দিকে ছেলেটার কণ্ঠ কিছুটা দমে আসে। তোফায়েল আহমেদ এবার আর জোর করল না। এ অবস্থায় এতটা পথ জার্নি করা ঠিক হবে না। নয়তো তিনি ভেবেছিলেন মেয়ের জন্য না হয় আয়া রেখে দিবেন। যতক্ষণ তারা বাহিরে থাকবে মেয়ের দেখাশোনা না হয় ঐ মহিলায় করবে।
উনি গম্ভীর স্বরে বললেন,
– ওকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে কখন?
– বিকেলে নিয়ে যাব।
– আচ্ছা, আভিরাকে এখন এখানেই রেখে গেলাম। তবে মেয়ে ঠিক হতেই তাকে নিয়ে যাব আমি।
– আপনাকে আসতে হবে না। সে ঠিক হলে কদিন বাদে আমি নিজেই নিয়ে যাব।
তোফায়েল আহমেদ কিছুটা বিরক্তি নিয়ে তাকায়। বিয়ে দিয়ে ভুল করেছেন মনে হচ্ছে। একা ছাড়বে না তার মেয়েকে। সাথে যাবে বলছে যখন আবার সাথে করেও নিয়ে আসবে।
– আচ্ছা ভাইজান এবার আসেন খেয়ে নিবেন।
– না আপা ছেলেকে আনতে যেতে হবে। এমনিতেই অনেকটা দেরি হয়ে গেল।
– না খেয়ে তো যেতে দিব না। কথা না বাড়িয়ে খেতে আসেন।
_
– হা করুন।
বাবা মা সবার সামনে এভাবে খাবার তুলে ধরায় আভিরা অস্বস্তিতে বুঁদ হয়ে রয়। তাছাড়া এ লোক তখন তাকে ধমকিয়েছে। এখন আবার আসছে মুখে তুলে খাবার খাওয়াতে। সে এ লোকের হাতে খেলে তো।
– কি হলো মুখ বন্ধ করে বসে আছেন কেন?
আভিরা না পারতে মুখ খুলে। তোফায়েল আহমেদ চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। ছেলেটা এমন বেয়াদব কবে হলো। বেশ বুঝল তাদের সামনে ইচ্ছে করে মেয়েকে খাইয়ে দিতে বসেছে এটা বুঝাতে যে, এখানে আভিরার যত্নের কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।
তোফায়েল আহমেদ খেতে খেতে ভাবল একবার মেয়ে নিয়ে যেতে পারলে তিনি আর মেয়ে দিবেন না। তখন এ ছেলে কী করে তার বাড়ি থেকে মেয়ে আনে তিনিও দেখবেন।
_
– আঞ্জুম কোন বোরকাটা বের করব? কালোটা বের করি।
– আচ্ছা।
আভিরার এমন নিভে যাওয়া কণ্ঠ কানে গেলেও নাওয়াজ কিছু বলল না। পাত্তা দিল না একেবারেই। বোরকা বের করে আভিরাকে পরিয়ে দেয়। হিজাব বাঁধতে গিয়ে কিছুটা বিপাকে পড়ে নাওয়াজ। ইউটিউব ঘেঁটে সহজ একটা টিউটোরিয়াল দেখে আভিরার হিজাব বেঁধে দিল। মন্দ লাগছে না দেখতে। নাওয়াজ ঠোঁট কামড়ে হাসল। প্রথমে শাড়ি, এখন আবার হিজাব। আর কত কী যে শিখতে হবে এ মেয়ের জন্য।
এই যে ছেলেটা এত কিছু করে গেল একবারের জন্যও আভিরার চোখে চোখ রাখেনি। তাকালে দেখতে পেত জল টলমল করা আঁখিদ্বয়।
_
আভিরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের সামনের গাড়িতে একজোড়া দম্পতি বসা। এদের সংসার জীবনের কম হলেও তিন, চার বছর হবে। ভদ্রমহিলা তার স্বামীর এক হাত আঁকড়ে একদম গা ঘেঁষে বসেছে। অপর পাশে আট, নয় বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে বসা। তার হাতে তিন, তিনটে শপিং ব্যাগ। বাচ্চাটা হবে বোধহয় তাদের বোনের বা ভাইয়ের ঘরের মেয়ে। এ ব্যাগগুলো তো তাদের হাতে থাকার কথা, এ বাচ্চা মেয়ের হাতে নয়।
আভিরা সেদিকে আর ফিরেও চায় না। এসব মানুষ তার খুব একটা পছন্দ না। অপছন্দের কারণ বোধহয় বাচ্চা মেয়েটা। বাচ্চারা অনেক তুখোড় বুদ্ধিসম্পন্ন হয়। এসব তাদের চোখে বাঁধে বেশি। এই যে মেয়েটা ঘুরেফিরে সামনে থাকা মানুষ দুটোকে দেখছে তা আভিরার নজর এড়ায়নি। মেয়েটার সামনে খানিকটা দূরত্ব নিয়ে বসলেই হতো। যতই তারা স্বামী স্ত্রী হোক, তাদের সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, প্রেম ভালোবাসা হবে বদ্ধ ঘরে। লোক সমাজের সামনে এভাবে গা ঘেঁষে বসাটা দৃষ্টিকটু। আর বাচ্চাদের থেকে যতটা আড়ালে রাখা যায় তত ভালো। এসব দেখে নেগেটিভ চিন্তা ভাবনা তৈরি হয় বাচ্চাদের মনে।
বিরক্তিতে আভিরা চোখ মুখ কুঁচকে নেয়। এখনই জ্যামে পড়তে হলো। সেই কখন থেকে বসে আছে। জ্যাম ছাড়ার নাম নেই। পাশ ফিরে দেখল নাওয়াজের দৃষ্টি মোবাইলে। কি যেন দেখে চলেছে। ভ্রুদ্বয় খানিকটা গুটানো, কপালেও ভাঁজ পড়েছে পুরুষটার। তার মতো এ পুরুষও বোধ হয় বিরক্ত।
হঠাৎ নাওয়াজ পকেটে মোবাইল রেখে গাড়ি থেকে নেমে গেল। জায়গা থেকে নড়বেন না, আমি এখনই আসছি। এ কথা বলে আর দাঁড়ায় না।
কোথায় যাচ্ছে আভিরা তা জিজ্ঞেসও করতে পারল না। তার আগেই নাওয়াজ চলে গেল। আভিরা দেখল লোকটা রাস্তার অপর প্রান্তে ফুটপাতে বসে থাকা বছর ছয়েক একটা বাচ্চার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বাদাম, বুট এসব হাবিজাবি নিয়ে বসেছে ছেলেটা।
আজ বেশ ঠান্ডা পড়েছে। এ মৌসুমে তো শীতের তীব্রতায় টেকা দায়। ঠান্ডায় মানুষের শরীর জমে যাওয়ার জো হয়।
আভিরার গায়ে একটা চাদর জড়ানো। তারপরও শীতের তীব্রতা টের পাচ্ছে। চলতি গাড়িতে বয়ে চলা শীতল বাতাসে যেন শরীর কেঁপে ওঠে। এখনও আভিরার গা ঠান্ডায় হিম হয়ে রয়েছে। আর ঐ বাচ্চা ছেলেটার গায়ে শুধু একটা পাতলা গেঞ্জি। তাও আবার হাতা কাটা। আভিরা এতে খুব একটা অবাক হয় না। তার মনে প্রশ্ন জাগে না, এত ঠান্ডায় কীভাবে বসে আছে? সহ্য করছে কেমন করে? এ ব্যস্ত শহরে প্রতিনিয়ত এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
এরা জন্মের পর থেকেই বোধহয় এমনভাবেই বেড়ে ওঠে।এসবেই অভ্যস্ত হয় তারা। তারপর একটু বড়ো হলেই এ বাচ্চাগুলো বাবার সাথে, মায়ের সাথে রাস্তায় নামে পেটের দায়ে। কখনো আবার বাবা মা ছাড়া একাই এদের রাস্তায় নামতে হয় ঘরের লোকের জন্য খাবার জোগাড় করতে।
তাদের বয়সের বাচ্চাগুলো যখন দামি সু, শার্ট, প্যান্ট পরে গাড়ি চড়ে স্কুলে যায়, তারা তখন দশটা টাকার জন্য সেই গাড়ির পিছনে দৌড় লাগায়। কনকনে শীত এদের কাবু করতে পারে না। এরা এমন হেলায় ফেলায় জীবন কাটায়, কাটাতে হয়।
নাওয়াজ দুটো আমড়া আর বাদাম নিয়ে ফিরে এলো।
ছেলেটা বাদামের খোসা ছাড়িয়ে মেয়েটাকে খেতে দেয়। আভিরা চুপচাপ মুখে দেয় তা, কিছু বলে না। দেখা যাবে সে না খেলে আবার কখন ধমকে উঠবে। বাদাম রেখে মেয়েটা লোকটার হাত থেকে আমড়া নিয়ে কামড় বসাল।
হঠাৎ নাওয়াজ তার খাওয়া আমড়ার একাংশ মুখে দেয়।
আভিরা তা দেখে গুটিয়ে বসে কেমন। সে তো এ আমড়ায় মুখ লাগিয়েছে। এখান থেকেই কেন এ লোককে খেতে হবে।
আভিরা লজ্জায় পারে না মরে যেতে। এমন বেহায়া পুরুষ তার ভাগ্যে কেন জুটল বুঝে এলো না মেয়েটার।
_
আভিরা হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। ওর এমন কান্নায় সকলেই হতভম্ব হয়ে তাকায়।
– কী হলো কোন সমস্যা? ব্যথা অনুভব হচ্ছে কী?
আভিরা জবাব দিল না। ডাক্তার কিছুক্ষণ আভিরার দিকে তাকিয়ে নার্সকে বলল,
– ডক্টর নাওয়াজ ইয়াজিদকে ডেকে আনো। বলো গিয়ে তার ওয়াইফ কাঁদছে।
নার্স খবর দিতেই নাওয়াজ একপ্রকার ছুটে এলো। কারো দিকে না তাকিয়ে মেয়েটাকে একেবারে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
– কী হলো কাঁদছেন কেন?
আভিরা জবাব দেয় না। নাওয়াজ আবার জানতে চাইল,
– আঞ্জুম কী সমস্যা? বলুন আমায়।
– ওটা খুলেছে কে?
নাওয়াজ বুঝে উঠতে পারল না কী খোলার কথা বলছে এ মেয়ে।
– কীসের কথা বলছেন?
– আমার পায়ে পায়েল নেই কেন?
নাওয়াজ থমকে দাঁড়ায়। পায়েলের জন্য এই মেয়ে এভাবে কান্না করছে। ব্যান্ডেজ খুলতে থাকা সেই ডাক্তারের হাতও বোধহয় থেমে গেল। সামান্য একটা পায়েলের জন্য এ মেয়ে এমন চোখের পানি ফেলছে। তিনি ভেবেছিলেন পায়ের ঐ গভীর ক্ষত দেখে হয়তো মেয়েটা সহ্য করতে পারেনি।সেজন্য কান্না করছে। তিনি আভিরাকে বলেছিলেন পায়ের দিকে না তাকাতে। বেশ গভীর ক্ষত। মেয়েটা সহ্য করতে পারবে না দেখে।
মেয়েমানুষ নিজের ত্বক নিয়ে বেশ খুঁতখুঁতে। মুখে দুটো ব্রণ হলেই তো তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। সেখানে তো পা পুড়ে পায়ের মাংস থেঁতলে গেছে, দগদগে ঘা দৃশ্যমান।
এই মেয়ের বয়স কম। এসব দেখে একেবারেই সহ্য করতে পারবে না। তাই বারবার বলেছিল না তাকাতে। দেখে নিশ্চয়ই সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু এখন দেখছে কান্নার কারণ খুবই নগণ্য। সামান্য একটা পায়েলের জন্য এভাবে কেউ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। ভদ্রমহিলা ভাবলেন এ মেয়ে নেহাতই পাগল। নয়তো পায়ে পায়েল নেই দেখে এমন কান্না করে। বাচ্চা মেয়ে তো, আবেগ বেশি। সেজন্য এত কান্না।
মেয়েটার পায়ের ব্যান্ডেজ তার খোলার কথা ছিল না। আজ তো তার ডিউটিও ছিল না। নাওয়াজ কল দিল বিধায় বাড়ি থেকে এসেছেন তিনি।
নাওয়াজ বলেছিল আভিরাকে যেন ব্যান্ডেজ খোলার সময় ভুলেও পায়ের ক্ষত দেখতে দেওয়া না হয়। সে তো জানে এ মেয়ে এসব দেখতে পারে না। পায়ের ক্ষত দেখে নিশ্চয় ভয় পাবে। নার্স খবর দিতেই সে ছুটে এলো। ভেবেছিল ঐ ক্ষত দেখেই বোধহয় কান্না করছে। কিন্তু এখন দেখছে পুরো ভিন্ন কারণ। নাওয়াজ খানিকটা রয়েসয়ে বলল,
– খুলতে তো হতোই। তখন কী এটা রেখে ব্যান্ডেজ করা যেত।
– কিন্তু আপনি আমাকে বলেছিলেন এই পায়েল কখনো না খুলতে। এটা আমার পা থেকে কেন খোলা হলো। আমি এতদিন খেয়াল করিনি কেন আমার পা যে খালি, পায়েল নেই আমার পায়ে।
নাওয়াজ বোধহয় আবার থমকাল। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো তার। প্রথম রাতে মেয়েটাকে বলেছিল এটা যেন কখনো না খুলে। সেজন্য এ মেয়ের এমন কান্না, এত পাগলামি। এ পায়েলের জন্যই? না কি সে খুলতে নিষেধ করেছিল সেজন্য?
আভিরা এতদিন খেয়াল করেনি। তেমনভাবে দেখায় হয়নি। খেয়াল করবে কেমন করে। এখন ডাক্তারের বারবার মানা করা সত্ত্বেও সে তাকিয়ে ছিল পায়ের দিকে। কতটা গভীর ক্ষত হয়েছে তা দেখার জন্য। কিন্তু হঠাৎ পায়ে পায়েল না দেখেই ফুঁপিয়ে ওঠে।
মেয়েটা সেই কখন থেকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে যাচ্ছে।
আভিরার এমন চাপা আর্তনাদে ভারী হলো হাসপাতালের পরিবেশ। এই কান্না বুঝি পুরুষটার বুকও এফোঁড়ওফোঁড় করে দিচ্ছে। নাওয়াজ অনুভব করল সূক্ষ্ম ব্যথায় তার বুক কামড়ে ধরেছে।
ছেলেটা মেয়েটার চুল গলিয়ে পিঠে হাত রেখে বলল,
– কয়েক দিন বাদেই পরতে পারবেন। এভাবে কান্না করবেন না। অনেক হয়েছে। এবার কান্না থামান।
মেয়েটা তবুও থামে না। নাওয়াজের ইশারায় সেই কখন কেবিন খালি হয়েছে। খালি কেবিন জুড়ে শুধু এক রমণীর ফুঁপিয়ে যাওয়ার শব্দের তোড়। নাওয়াজ আভিরাকে আর নিজের থেকে আলাদা করে না। ওভাবেই জাপটে ধরে শুয়ে পড়ে বেডে।
– আঞ্জুম আপনার শরীর থেকে অদ্ভুত একটা স্মেল আসছে। কী দিয়েছেন আজ?
আভিরাকে কথা বলতে না দেখে নাওয়াজ তপ্ত শ্বাস ফেলে। মেয়েটার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
– আপনার সব কষ্ট আমি সারিয়ে তুলব। একটু অপেক্ষা করুন। কিছুদিন বাদেই ঠিক হয়ে যাবে।
আভিরা বিড়বিড় করে বলল,
– কিন্তু দাগ, এ দাগ রয়ে যাবে।
নাওয়াজ স্পষ্ট শুনল এ কথা। মেয়েটাকে একেবারে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেয়। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
– পুরো শরীর ঝলসে গেলেও ছাড়ব না।

