#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬০
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
বন্ধ দরজার ভিতরে কী কথা হচ্ছে আভিরার জানা নেই।আভিরা অস্থির হয়ে একবার এ মাথা থেকে ও মাথা চক্কর দিয়ে এসেছে। বন্ধ দরজার বাহিরেই দাঁড়িয়ে আছে সে। তার কদম থেমে থাকলেও চিন্তায় মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। খট করে দরজা খোলার শব্দে আভিরা সচেতন হলো। মাথা তুলে তাকাতেই লাবণ্য ইশারায় বুঝাল ইয়াজমীন ডাকছে। আভিরা ধীর পায়ে দরজা ঠেলে ভিতরে যায়।
ইয়াজমীনের দিকে তাকাতে আভিরা কিছুটা অপ্রস্তুত হলো। কেন জানি দৃষ্টি মেলাতে পারল না। অজানা কারণে ভয় লাগছে তার, গলা শুকিয়ে কাঠ। আভিরা মাথা নুইয়ে ফেলতে ইয়াজমীনের শক্ত কণ্ঠ কানে এলো।
– মাথা নামালে কেন? না কি তুমিও তার মতো কোন অন্যায় করে এসেছ?
হঠাৎ এমন হওয়াতে আভিরা কেঁপে উঠল। তুমি বলতে যে লাবণ্যকে বুঝিয়েছে তা বুঝতে বাকি রইল না তার। আভিরা ভিতরে ভিতরে কেমন ছটফটিয়ে ওঠে। আতঙ্কে চেহারার রঙ বদলে গেল। আভিরা ঢোক গিলে। ইয়াজমীন কী কোনোকিছু আঁচ করতে পেরেছে। অসম্ভব, কেউ না জানালে ইয়াজমীনের পক্ষে কোনোকিছু বুঝা সম্ভব না। তাহলে কী লাবণ্য বলে দিয়েছে?
আভিরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
– মা।
– মা বলে ডাকবে না আভিরা। মায়ের নজরে দেখলে নিশ্চয় এত বড়ো কথাটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে যেতে না।
আভিরা বুঝল লাবণ্য সবটা বলে দিয়েছে। কিছুটা বুজে আসা গলায় বলল,
– আমার কথাটা শুনুন…
– কী শুনব? আমার ছেলের সম্মান জড়িয়ে আছে এতে। তুমি বুঝতে পারছ কাল যদি তুমি সময়মতো না আসতে কত বড়ো অঘটন ঘটে যেত। সবাই আমার ছেলের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলত, চরিত্রহীন বলত আমার ছেলেকে। এত বছর এক বাড়িতে থেকে যা নিয়ে কথা উঠেনি কালকের পর থেকে লোকের মুখে মুখে সে কথা রটে যেত। লোকে বলত ইয়াজমীনের ছেলে ঘরে বউ রেখে বাড়ির আশ্রিতার সাথে ফস্টি, নষ্টি করে বেড়ায়।
ইয়াজমীনের মুখে আশ্রিতা সম্বোধন শুনে আভিরার চোখের পানি বাঁধ মানল না। আভিরা জানে ইয়াজমীন লাবণ্যকে কতটা ভালোবাসে। সেই তাকেই কি না আশ্রিতা বলছে। কতটা আঘাত পেলে মানুষ এমন কথা বলে।
আভিরা ধরা গলায় বলল,
– এসব কী বলছেন?
– ভুল কী বললাম? বুঝলে আভিরা পর কখনো আপন হয় না। আমি এতদিন দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুসেছি।
আমাদের খেয়ে পড়ে ছোবল দিতে দু বার ভাবল না। এই মেয়েকে এসব করার জন্য আমি আমার বাড়িতে রেখেছি। অকৃতজ্ঞ একটা। আমার ছেলেটাকে এভাবে লোক সমাজের কাছে চরিত্রহীন লম্পট জাহির করতে চেয়েছিল। নাওয়াজের কথা না হয় বাদ দিলাম। ও ছেলেমানুষ, ছেলেরা শত অন্যায় করলেও লোকে তা মনে রাখে না। কিন্তু মেয়েদের চরিত্রে একবার কলঙ্ক লাগলে সেই কলঙ্কের দাগ আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। মেয়েটা নিজের কথাও একবার ভাবল না। এই নোংরা মেয়েটাকে খাইয়ে পরিয়ে এতদিন যাবৎ নিজের বাড়িতে রেখেছি ভাবতেই মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
বলতে বলতে ইয়াজমীন ঝরঝর করে কেঁদে উঠল। আভিরা অসহায় চোখে তাকায় শাশুড়ি মায়ের দিকে। ধীর পায়ে গিয়ে ইয়াজমীনের কাঁধে হাত রাখল।
– কাঁদবেন না। আপনার ছেলে আপনাকে এসব জানাতে নিষেধ করেছিল। আর আমারও মনে হয়েছিল আপনাকে এসব না জানালেই ভালো হবে। কিন্তু আপু বলে দিবে ভাবিনি। আপুকে নিয়ে ক্ষোভ রাখবেন না, ভুল করে ফেলেছে।
– কোনটাকে ভুল বলছ? আমাদের ছেলেটাকে চরিত্রহীন জাহির করতে চাওয়াটাকে ভুল বলছ, না কি তোমাকে যে আগুনে ফেলে দিয়েছিল? ও তোমার ভাইকেও পানিতে…
ইয়াজমীন চুপ হয়ে যায়। আভিরা স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মেয়েটা হঠাৎ যেন কান্না করতে ভুলে যায়, অবিশ্বাস্য চোখে চেয়ে আছে ইয়াজমীনের দিকে। মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না তার। কোনোরকম ধরা গলায় জানতে চাইল,
– এসব সত্যি?
– হ্যাঁ।
–
পুরো বাড়ি গোছগাছ করা হচ্ছে। সকাল থেকেই বর্ণা, মাহিরা, আভিরা কাজে ব্যস্ত। দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের। সকলে ঘেমেনেয়ে একাকার। আজ অনেক গরম পড়েছে। চারপাশে কেমন গুমোট ভাব। গাছের পাতা অবধি নড়ছে না। ফ্যানের বাতাসেও গরম অনুভূত হচ্ছে। টানা বর্ষণে শীতল অনুভব করা জনমানব হঠাৎ গরমে অতিষ্ঠ। একটু ঠান্ডার জন্য হাপিত্যেশ করছে জনসাধারণ। আভিরা সবগুলো রুম ধুয়ে মুছে নিচে নেমে এলো। সোফায় বসতে নিলেই মাহিরা চিল্লিয়ে উঠল,
– নতুন কুশন, কভার লাগিয়েছি। তোমার জামায় ময়লা লেগে আছে। বসো না।
আভিরা অসহায় চোখে চায়। মাহিরার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ক্লান্ত শরীরে হেলিয়ে দিল সোফায়।
– কী করলে আভিরা? আরে মেয়ে ময়লা লেগে যাবে তো।
– আমি ঝেড়ে দেব আপু। একটু জিরিয়ে নেই, খারাপ লাগছে অনেক।
মাহিরা ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে আভিরার পাশে এসে বসল। মেয়েটা চোখ বুজে পড়ে আছে।
– তোমার কি বেশি খারাপ লাগছে আভিরা?
আভিরা হাসে। চোখ বুজেই জবাব দিল,
– না ঠিক আছি। ফ্যানের পাওয়ার একটু কমিয়ে দিবেন। পাওয়ার বাড়ানোতে আরও বেশি গরম লাগছে।
– আচ্ছা দাঁড়াও কমিয়ে দিচ্ছি।
মাহিরা রেগুলেটর ঘুরিয়ে ফ্যানের পাওয়ার কমিয়ে দিতে শো শো করে ঘুরতে থাকা ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে ঘুরতে লাগল। মাহিরা রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে লেবু বের করে লেবুর শরবত বানিয়ে নিল। কয়েক টুকরো বরফ দিয়ে গ্লাস নিয়ে ছুটে হলরুমে গেল।
– নাও লেবুর শরবতটা খেলে ভালো লাগবে।
আভিরা চোখ মেলে হাত বাড়িয়ে শরবতের গ্লাস নিল। ক্লান্ত মুখে সামান্য হাসি টানার চেষ্টা করে বলল,
– এসব কেন করতে গেলেন?
– কথা না বলে ঝটপট শেষ করো তো। আমি ভাবির কাছে যাচ্ছি।
আভিরা ঘাড় কাত করে সায় জানায়। দু চুমুক দিয়ে শরবতের গ্লাস রেখে দিল। সকাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি। খালি পেটে শরবত খাওয়াতে কেমন গা গুলিয়ে আসছে তার। আভিরা দু হাতে মুখ চেপে ধরে। তড়িঘড়ি করে মুখে হাত রেখে বেসিনের কাছে গিয়ে থামে। ট্যাপ ছেড়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিল বেশ কয়েকবার। ওড়না দিয়ে গলা, ঘাড়ের পানি মুছে রান্নাঘরে ছুটে গেল। ফ্রিজ থেকে আগেই মুরগি, গোরুর গোশ নামিয়ে রেখেছিল। বরফ জমাট বেঁধে থাকা গোশ ছুটতেই হাঁড়ি থেকে তুলে বোলে রাখল। ভালোভাবে ধুয়ে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে রাখল পানি ঝরার জন্য। দ্রুততার সহিত কেজি খানেকের মতো পেঁয়াজ কেটে নিল। পেঁয়াজের ঝাঁজে মেয়েটার চোখ থেকে পানি পড়ছে। আভিরা আদা, রসুন কেটে কাঁচা মরিচগুলো পানিতে ভিজিয়ে রাখল। বর্ণা বা মাহিরা কাউকে বলবে কেটে দিতে। মরিচ কাটতে পারে না সে, হাত জ্বলে। হাতের তীব্র জ্বলনিতে ভুগতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেজন্য মরিচ কাটাতে হাত লাগায় না কখনো।
– আরে কাঁদছ কেন? ননদিনী চলে যাবে দেখে কী দুঃখ হচ্ছে?
আভিরার মুখের রঙ পাল্টে গেল। হাসতে থাকা মুখশ্রী দ্রুত থমথমে অবস্থায় রূপায়িত হয়। মৃদু স্বরে বলল,
– পেঁয়াজের ঝাঁজে এমন অবস্থা।
– ওহ আচ্ছা। মাহিরা বলল তোমার নাকি শরীর খারাপ। এই অবস্থায় আবার রান্না করতে আসলে কেন?
– মাহিরা আপু অযথা বাড়িয়ে বলেছে। শরীর খারাপ হবে কেন, তখন ক্লান্ত লাগছিল।
– এখন ক্লান্তি শেষ?
– হ্যাঁ।
– হ্যাঁ কী শেষ তা তো চেহারা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। দেখি সরো তুমি, রুমে যাও। রান্না করতে হবে না।
– আমি না করলে কে করবে?
– আমি করব। তুমি রুমে যাও।
– আপু ঠিক আছি আমি।
– সে তো দেখেই বুঝা যাচ্ছে কী ঠিক আছো।
আভিরা কথা বলে না। কড়াইয়ে তেল গরম হয়ে আসতেই নুন হলুদ দিয়ে মাখিয়ে রাখা বড়ো বড়ো সাইজের গলদা চিংড়ি ছেড়ে দিল। তেল ছিটতে খানিকটা দূরে সরে গেল। বর্ণা আভিরার হাত থেকে খুন্তি নিয়ে বলল,
– তোমাকে না রুমে যেতে বললাম।
– রান্না শেষ না করে রুমে যাই কী করে? আপনি একটু কাঁচা মরিচগুলো কেটে দিন।
বর্ণা আভিরার এমন কথায় অবাক চোখে চাইল আভিরার দিকে। আভিরার কথাগুলো কেমন গম্ভীর ঠেকছে তার কাছে। যদিও মেয়েটা প্রতিটা কথায় হেসে হেসে বলছে তবুও কেমন যেন লাগছে। যা বুঝল আভিরা রান্না শেষ না হওয়া অবধি রুমে যাবে না। বর্ণা কথা না বাড়িয়ে মরিচ কেটে গোরুর গোশ ম্যারিনেট করে রাখল।
চিকেন রেজালা আর চিংড়ি ভুনা হয়ে আসতে ম্যারিনেট করে রাখা গোরুর গোশ দিয়ে দিল হাঁড়িতে। গোরুর গোশ কষিয়ে এলে হাঁড়ি থেকে দু টুকরো গোশ বাটিতে তুলে এক টুকরো মুখে দেয় আভিরা। আরেক টুকরো বর্ণাকে দিয়ে বলল,
– খেয়ে দেখুন তো সিদ্ধ হয়েছে কি না? লবণ কম হলে বলবেন।
বর্ণা ফুঁ দিয়ে গোশের টুকরো মুখে পুরে। মুখে দিয়ে চোখ বুজে নেয় মেয়েটা। স্বাদের কথা বলতে গেলে অতুলনীয় হয়েছে। নুন, হলুদ সব পারফেক্ট।
– তোমার রান্নার হাত তো দারুণ আভিরা। সিদ্ধ হয়ে এসেছে। আরেকটু কষিয়ে নামিয়ে নিলেই হবে। লবণের পরিমাণও ঠিকঠাক, তবে ঝালটা একটু বেশি লাগছে। গোরুর গোশ এমন একটু ঝাল না হলে খেতে স্বাদ লাগে না।
– বেশি ঝাল হলে বলুন, আলুর টুকরো দিয়ে দেব।
– আলু দিতে হবে না। অত বেশি ঝাল হয়নি। পরে দেখা যাবে স্বাদ নষ্ট হয়ে গেছে।
– আচ্ছা।
– আর কী কী রাঁধবে?
– মাত্র তো তিন পদের রান্না চলছে। আরও দুই একটা পদ না রাঁধলে হবে। আবার হালকা পাতলা নাস্তার ব্যবস্থাও করতে হবে। আপু পাস্তা, নুডুলস, চিকেন রোল করলে কেমন হয়? না কি অন্য কিছু করব?
– এগুলো করলেই হবে। এত কিছু করার দরকার নেই। সাথে ফলমূল তো দিবেই।
– হ্যাঁ, মিষ্টিও দেওয়া হবে।
–
– হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত কেন নিলি?
– হঠাৎ বলছিস কেন? মেয়েকে কী সারা জীবন বাড়ি বসিয়ে রাখব।
– আরে সেই কথা বলিনি আমি। আর কয়েক মাস পরেই তো মাস্টার্স পরীক্ষা। তুই তো বলেছিলি পরীক্ষা শেষ হলে তারপর বিয়ে নিয়ে ভাববি।
– তখন মনে হয়েছিল মাস্টার্স শেষ হলেই বিয়ে দেব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার এ সিদ্ধান্ত আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল।
– মানে?
– কিছু না।
– এখন এসব না করলে হয় না?
– লাবণ্যর সম্মতি আছে। আমি জোরজবরদস্তি করে কিছু করছি না।
– যা করবি ভেবে করিস। মা মরা মেয়ে, এমন বিপত্নীক ছেলের কাছে বিয়ে দেওয়াটা ঠিক হচ্ছে না।
– বিয়ে দেওয়া হচ্ছে কোথায়? ওরা তো দেখতে আসবে। আর দেখতে আসা মানে তো বিয়ে হয়ে যাওয়া না। পছন্দ অপছন্দের একটা বিষয় আছে না। আর বিপত্নীক ছেলেরা তো খারাপ হয় না। এত বছর ধরে পেলে বড়ো করা মেয়েটাকে নিশ্চয় আমি যার তার হাতে তুলে দেব না।
– আচ্ছা ছেলের বাড়ির লোকজন কখন আসবে?
– সন্ধ্যায়।
– কতজন আসবে জানিয়েছে কিছু?
– আসবে হয়তো সাত আটজন।
– ওহ। আচ্ছা মেয়েগুলো একা একা কি করছে যেয়ে দেখে আসি। এত মানুষের রান্নার দায়িত্ব ওদের কেন দিলি?
– এত মানুষ কোথায়? আর সামান্য রান্নাই তো, না পারার কিছু নেই। আমি না থাকলে এর থেকে বড়ো বড়ো দায়িত্ব আমার বউ মাকে সামলাতে হবে।
– কী পাগলের প্রলাপ বকছিস? না থাকলে মানে? এই তোর কী হয়েছে? মাথা টাথা খারাপ হয়ে গেছে না কি? সকাল থেকেই রুমে বসে আছিস। ঘর থেকে বের হচ্ছিস না অবধি। ছেলের বাড়ির লোক এলেও কী এমন ঘরে বসে থাকবি?
– না। তখন তো বের হতেই হবে। এখন বাইরে বের হতে ইচ্ছে করছে না। তুই এক কাজ কর, একটু গিয়ে দেখে আয় রান্না কত দূর।
– আচ্ছা যাচ্ছি।
রান্না শেষ হতেই আভিরা কাপড় নিয়ে গোসলে ছুটল। শরীর জ্বলে যাচ্ছে তার। অসহ্য রকমের গরম পড়েছে আজ। গরমে তার নাজেহাল অবস্থা। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। আভিরা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছে নেয়। দ্রুত গোসল সেরে বের হলো। ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে ভেজা চুল ছেড়ে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। ক্লান্ত লাগছে তার, শরীরে কাঁপন অনুভব হচ্ছে সামান্য। সকাল থেকে খাওয়া হয়নি। দুর্বল তো লাগবেই। তার উপর আজ সারাটা দিন কাজের উপর গেল।
হট্টগোলের শব্দে আভিরা চোখ মেলে চায়। চোখ লেগে গিয়েছিল। মাথার নিচে বালিশ অবধি নেই। চুল ছেড়ে যে মাথা হেলিয়ে দিয়েছিল ঐভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আভিরা আস্তে ধীরে উঠে বসল। সদ্য ঘুম থেকে উঠায় মাথা কাজ করছে না তার। চট জলদি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘরের বাইরে পা বাড়ায়। দ্রুত কদমে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামল। সোফায় চোখ পড়তেই মাথায় ওড়না টানে মেয়েটা। বর্ণার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
আভিরাকে দেখে বর্ণা চাপা স্বরে বলল,
– কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
– ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
– উঠে এলে কেন?
– ঘুম ভেঙে গেল।
– আচ্ছা। এখন শরীর ঠিক লাগছে?
– হ্যাঁ। ওনারা কখন এসেছেন?
– এই তো দশ মিনিট হবে।
ছেলের বাড়ির লোকেরা মেয়ের পিছনে মাথায় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে কথায় ব্যস্ত থাকা রমণীকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে চলেছে। অনেকটা বাড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া, সেজন্য মুখশ্রী দেখা যাচ্ছে না পুরোপুরিভাবে। তবে গায়ের ফর্সা রঙ চোখে ধরা দিল সহজেই। চোখে পড়ার মতোই রঙ। গোলগাল চেহারার মেয়েটাকে দেখেই যেন তাদের ভালো লেগে গেল। কি নিচু স্বরে কথা বলে যাচ্ছে। তাদের দিকে তাকায়নি একবারের জন্যও। ছেলের দিকে তাকিয়ে ছেলের মা মৃদু হাসল। ইশারায় কী যেন বুঝাল একে অপরকে। সম্মতি পেয়ে কথা তুলতে চাইল। তবে গটগট শব্দ করে কারো আগমনে ভদ্রমহিলা মাথা ঘুরিয়ে দরজার দিকে চাইল। নজরে এলো সুঠাম দেহের এক পুরুষকে। যার চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তিভাব। মাথা নামিয়ে দ্রুত কদম ফেলে হেঁটে এদিকেই আসছে।
হলরুম ভর্তি এত মানুষ দেখে নাওয়াজ ভ্রুকুটি করে। অপরিচিত মানুষজনের দিকে নজর যেতেই কদম থামে তার। শাড়ি জড়িয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখেই নাওয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মুখ তুলে কঠিন চোখে চাইল বর্ণার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আভিরার দিকে। আভিরার নজর আগে থেকেই নাওয়াজের দিকে স্থির। দুজনের দৃষ্টি এক হতেই আভিরা মাথা নামিয়ে নেয়। নাওয়াজের অমন কঠিন নজরে ভিতরে ভিতরে ভীত হয় সে। যদিও মুখের ভাবভঙ্গি তার স্বাভাবিক, ঘাবড়ে যাওয়ার ছাপ নেই মুখশ্রীতে।
ইয়াজমীন ছেলেকে দেখিয়ে বলল,
– আমার ছেলে নাওয়াজ।
– ভালো আছো বাবা?
– জি।
গম্ভীর স্বরে জবাব দেয় নাওয়াজ। প্রশ্নের বিপরীতে পাল্টা তাদের ভালো মন্দের খবর জানতে চাইল না। ছেলের বাড়ির লোকেরা খানিকটা অপমানিত বোধ করে। এ কেমন ধারার ছেলে। কেউ ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করলে তাকেও জিজ্ঞেস করতে হয় এই ছেলে জানে না নাকি। ছেলের মা চোখ মুখ কুঁচকে চাইল ইয়াজমীনের দিকে। মৃদু হেসে বলল,
– আপা একটা কথা বলার ছিল।
– বলুন।
– আসলে…
– আরে এত সংকোচ বোধ করছেন কেন? যা বলতে চান বলে ফেলুন।
– কিছু মনে করবেন না আপা। আসলে আপনার ছোটো মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছে আমাদের। যদি আপনাদের আপত্তি না থাকে তাহলে আমরা কথা এগোতে চাই।

