প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৮১

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৮১
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

বিধির বিধান বড়ই নিষ্ঠুর! তার আজ্ঞা ব্যতীত এ ধরার পত্র পল্লব অবধি নড়ে না। মানুষের তাকদিরের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয় কীভাবে?
এ জীবনে আমাদের বহু মানুষের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তাদের সাথে গোটা জীবন কাটানোর সাধ জাগে অন্তঃকরণে। একটু একটু করে স্বপ্ন বুনি ছোটো একটা সংসারের। তার আর আমার সারা জীবনের সংসার হবে নয়তো বা একদিনের। তবে খোদা তায়ালার পরিকল্পনা বোধহয় ভিন্ন কিছুই। তার পরিকল্পনার নিকট মনুষ্য জাতি বড্ড অসহায়।
রাতের আঁধারে আড়ালে ফেলা অশ্রু, কিংবা প্রার্থনায় যার সঙ্গ চাইলাম, তাকে পাওয়া হয়ে উঠে না কোনোভাবেই। আমাদের হৃদয় ভাঙে, সে ভাঙা হৃদয় নিয়েই ঘর বাঁধতে হয় অন্য কারো সনে। যার বা পাঁজরের হাড় দিয়ে বানানো হয়েছে রমণীকে, যাকে জন্মের পঞ্চাশ বৎসর পূর্বেই নসিবে লেখা হয়ে গিয়েছে। তবুও আমরা প্রেমে পড়ি, প্রেমে মরি!

দ্বিতল ভবনে জমকালো লাইটিং, রঙ বেরঙের আলোতে শোভিত লন। মরিচা বাতিতে সজ্জিত সারি সারি লাগানো পবন ঝাউ। লনের দক্ষিণ দিকটায় ছাউনির নিচে সফট মিউজিকের তালে শরীর দুলিয়ে চলেছে একদল যুবতী। তাদের দিকে কারো তেমন খেয়াল নেই। সকলেই নিজ খেয়ালে ব্যস্ত, কেউ আবার ঘাড় বেঁকিয়ে দেখে চলেছে নাচে মত্ত রমণীদের।

বছর কয়েক বাদে চেনা পরিচিতদের সাক্ষাৎ এ প্রতিটা স্থান কোলাহলপূর্ণ। চা কফি হাতে সকলে মজেছে খোশগল্পে। বাচ্চাদের হাউকাউ, আমোদ প্রমোদে রমরমা ভাব। সকলে নিজ কাজে ব্যস্ত সময় কাটায়। বছরের পর বছর কাটে, কোনো অনুষ্ঠান, আড়ম্বর ছাড়া ফুরসৎ মিলে না একে অন্যের দেখা পাওয়ার। কিংবা সময় হলেও দেখা হয়ে উঠে না কোনো বিশেষ উৎসব পার্বণ, মৃতুয ব্যতীত।

ঝাঁজালো মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। খুদে সদস্যরা নাক টেনে ঘ্রাণ নেয়। আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে পেট মন তুষ্ট করতে মুখরোচক খাবারের ঘ্রাণই যথেষ্ট। বুফে স্টাইলে খাবার সাজানো লনের এক পাশে। অতিথিরা যে যার ইচ্ছে মতো খাবার নিচ্ছে। পরিমাণে যতটুকু দরকার ততটুকুই। বাড়তি প্লেট ভর্তি করছে না কেউই। মিস্টার সারওয়ার উপর থেকে দেখে চলেছে উৎসবমুখর পরিবেশের আমেজ। আত্ম গরিমায় চোখ মুখে ত্রুর হাসি।

গায়ে ভারী লেহেঙ্গা। গর্জিয়াস মেকআপের আড়ালে পড়ে পেলব গালের পাঁচ আঙুলের ছাপ। পুতুলের মতো স্থির হয়ে বসে থাকা মেয়েটার গাল পেরিয়ে গলায় মেকআপের আস্তরণ দিয়ে চলেছে মেকআপ আর্টিস্ট। তার দক্ষ হাতে আড়াল করছে দৃশ্যমান ক্ষত। কামরা জুড়ে নিস্তব্ধতা থাকলেও বাহিরে হইচই, হৈ হুল্লোড়ে মাতোয়ারা। অস্পষ্টভাবে কানে বাজে সমস্বরে চিৎকারের শব্দ। বর এসেছে বর এসেছে কলরবে মুখরিত ভেতর, বাহির।

যেখানে হাঁটতে হিমশিম খেতে হয় সেখানে ভারী কারুকাজ খচিত লেহেঙ্গাতে দৌড়ে চলেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে আঁধার নেমেছে বহু আগে। নির্জন জনশূন্য সড়কে আঁধারে কোনোকিছুই স্পষ্ট নয়। তবুও যেন রমণীকে ভয় কাবু করতে পারে না। দৌড়ানোর একপর্যায়ে বেকায়দায় উল্টে পড়ে। পায়ের নখ উঠে গিয়েছে, জখম হয় মারাত্মকভাবে। গলগলিয়ে রক্ত পড়তে লাগে। আলতা রাঙা রক্তাভ পা জুড়ে কেবল লালচে লোহু। তবুও সে দৌড়ে চলেছে। পায়ের ব্যথা গ্রাহ্য করছে না মোটেও।

সামনে থাকা যুবক সটান দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি তার রক্তাক্ত পায়ে। সামান্য ঝুঁকে তর্জনী দ্বারা ছুঁয়ে দেয় রক্তাক্ত নগ্ন পা। অস্ফুটে আর্তনাদ করে উঠল রমণী। সাদা রুমাল রক্তে ভিজে লালচে বর্ণে ছেয়ে যায়। ডান পায়ে সাবধানে রুমাল বেঁধে মাথা উঁচিয়ে দৃষ্টি ফেলে আহত রমণীর পানে। দৃষ্টি মিলে দুজনার। অব্যক্ত কথনের ব্যক্ত করে চলেছে দু জোড়া আঁখি। নীরবে, নির্বাক্যে!

_

– বিয়ে বাড়ি ছেড়ে এখানে কেন এসেছ?

– আমি বিয়ে করব না।

– আমাকে কেন বলছ? এই কথা বলার জন্য বিয়ের আসর ছেড়ে এসেছ?

– না।

– তাহলে?

– আমাকে দূরে কোথাও নিয়ে চলুন আপনার সাথে।

কথা থেমে যায় কারো শক্ত হাতের ছোঁয়ায়। আব্দুল্লাহ জ্যোতির থুতনিতে নিজের রুক্ষ হাত ঠেকায়। তীক্ষ্ণ চোখে পুরো আপাদমস্তক নজর বুলিয়ে নেয়। তার চাঁদের সৌন্দর্যে যেন তার হৃদয় ঝলসে যাবে। তার মাদকময় নজরে জ্যোতি কেঁপে ওঠে। কী ধারালো চাহনি!

ক্ষীণ স্বরে জানতে চাইল,
– কোথায় নিয়ে যাব জ্যোতি?

– যেখানে ইচ্ছে। কিন্তু এখান থেকে নিয়ে চলুন। আমি অন্য কাউকে বিয়ে করতে চাই না।

আব্দুল্লাহ হঠাৎ হাত ছাড়িয়ে নেয়। দু পা পিছিয়ে কটাক্ষ স্বরে বলল,
– বরের দেওয়া বেনারসি গায়ে জড়িয়ে আমাকে এসে বলছ বিয়ে করবে না। বাড়ি ফিরে যাও। তুমি বাড়ি নেই জানাজানি হলে ঝামেলা হবে।

– হোক ঝামেলা। আমি যাব না।

– যেতে হবে তোমাকে।

– না আমি যাব না।

বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে। দু হাতে আব্দুল্লাহর পা জাপটে ধরে আত্ম চিৎকারে কাতর আহত রমণী। তার চোখের পানি অনতিবিলম্বে গড়িয়ে পড়তে লাগে আব্দুল্লাহর পায়ে। অনড়, দৃঢ় চিত্তের মানব পায়ের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকায়। চোখের পানিতে পা শীতল হবার বদলে উল্টো উত্তাপে যেন পুড়ে যাওয়ার উপায়। আব্দুল্লাহ দ্রুত পা ছাড়িয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। জ্যোতি ক্রন্দনরত চোখে অবুঝের মতো চায়। তার মনে হচ্ছে সামান্য দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আব্দুল্লাহ আর তার মাঝে ক্রমশই দূরত্ব বেড়ে চলেছে।

জ্যোতি এগিয়ে এসে পা জড়িয়ে ধরে পুনর্বার। এবার তার চোখে পানি নেই। তবে কণ্ঠে অনুনয়,
– আমাকে আপনার সাথে নিয়ে চলুন। দোহাই লাগে। আপনার সাথে যাব আমি।

আব্দুল্লাহ হাঁটু গেড়ে বসে মেয়েটার সামনে। শক্ত কণ্ঠে আদেশ দেয়,
– পা ছাড়ো।

জ্যোতি পা ছাড়ে না। ওভাবে বসেই কাঁদতে লাগে সে।

– আমি জিদানকে কল করেছি, ও আসছে তোমাকে নিতে।

জ্যোতি অবিশ্বাস্য চোখে চায়। কম্পনরত কণ্ঠে কেবল শুধায়,
– কেন? আপনি আমাকে চাইছেন না?

– কখনোই চাইনি তোমাকে।

– তাহলে এত কিছু?

– কী এত কিছু? আমি বলেছিলাম এত কিছু করতে? বারবার মানা করা সত্ত্বেও তো শোনোনি। বিরক্ত করতে।

জ্যোতি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বলল,
– বিরক্ত করতাম?

জ্যোতির অনবরত প্রশ্নে আব্দুল্লাহ অতিষ্ঠ ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
– তা নয়তো কী?

– কোন অনুভূতি ছিল না?

আব্দুল্লাহ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
– না।

– আমার চোখে চোখ রেখে স্বীকারোক্তি দিন। আমার জবাব পেলেই চলে যাব ভাইয়ার সাথে।

আব্দুল্লাহ জ্যোতির চোখে চোখ রাখে। সেই ধারালো চোখের চাহনি কেমন নিস্পৃহ। মৃত মানুষের ন্যায় অনুভূতি শূন্য। জ্যোতি ভয় পেয়ে যায় এমন দৃষ্টিতে।

– কোনো অনুভূতি ছিল না।

– আপনি মিথ্যে বলছেন। অনুভূতি ছিল।

মেয়েটা আব্দুল্লাহর কলার চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নেয়।

– বলুন আপনি মিথ্যে বলছেন, অনুভূতি ছিল আমার জন্য। মিথ্যা কেন বলছেন আব্দুল্লাহ। আমি সব ছেড়ে এসেছি আপনার জন্য। আমাকে এভাবে ফিরিয়ে দিবেন না। আমার বিশ্বাস ভেঙে দিবেন না। মরে যাব আমি।

আব্দুল্লাহ কলার ছাড়িয়ে নেয় মেয়েটার হাতের মুঠো থেকে। কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখেই বলল,
– এসব মায়া কান্না কাঁদবে না আমার সামনে। কেউ কারো জন্য মরে না।

_

জিদান নাক বরাবর শরীরের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ঘুষি মেরে যাচ্ছে। নাক দিয়ে গলগল করে রক্ত বের হলেও জিদান ছাড়ে না ছেলেটাকে। ওরা ছাড়িয়ে নিতে চাইলে জিদান চেঁচিয়ে উঠল,
– ওর আর আমার মাঝে তোরা কেউ আসবি না।

বন্ধুরা সকলে পিছিয়ে গেল। একটা সময় জিদান নিজেই থামে। আব্দুল্লাহ উঠে খসখসে হাতের উল্টো পিঠে ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা রক্ত মুছে খুব রূঢ়ভাবে। সে নিস্প্রভ চোখে জিদানকে দেখে নিজের গায়ের এলোমেলো শার্ট টেনে ঠিক করে। জিদানের চোখে ক্রোধ, তবে আব্দুল্লাহর চাহনি বোঝার উপায়ান্তর নেই।

হট্টগোল লেগে থাকা জায়গাটা এখন কেমন নিস্তব্ধ, স্তব্ধ। সকলে শব্দহীন দাঁড়িয়ে, দৃষ্টি আব্দুল্লাহর আঘাতপ্রাপ্ত দেহে। আব্দুল্লাহর সামান্য আঘাতে যে জিদান অস্থির হয়ে যেত সে কি না আজ রক্তাক্ত করল আব্দুল্লাহকে? নিকটস্থ কারো প্রতারণা সইতে পারে না বলেই কী মানুষ এমন উগ্র হয়ে ওঠে? আঘাত করতে পরোয়া করে না?

জিদান নিজেকে ধাতস্থ করে কিছুটা নিষ্প্রাণ হয়ে বলল,
– এমন কেন করলি আব্দুল্লাহ?

– আব্বার চিকিৎসা করানো লাগব সামনের সপ্তাহে, বোনের বিয়া দেওন লাগব। ছেলেপক্ষ যৌতুক ছাড়া মাইয়া নিব না। বড়ো আপার বিয়া না হইলে ছোটো আপার বিয়াও দেওন যাইব না। বয়স হয়েছে, আর কত কাল ওদের রাখমু। ওদের বিয়া দেওয়া লাগব তো নাকি।

– বাহ্ নিজের বোনের এত চিন্তা? আর আমার বোন? আমার বোনের কথা ভাবলি না?

– না। ওর কথা ভাবনের কী আছে? শুনলাম যার লগে তোর বাপ বিয়া দিছে ঐ পোলা ম্যালা বড়োলোক। তোর তো ভালো জানার কথা। তোর বউয়ের চাচতো ভাই লাগে তো।

– টাকায় সব? ও তোকে ভালোবাসে। আর তুইও তো! টাকার বিনিময়ে ভালোবাসা বিক্রি করতে বিবেকে বাঁধেনি?

– ওসব বালের ভালোবাসা কিছুই না ভাই। টাকায় সব। দুই দিন পর দেখবি তোর বইন পেট বাঁধাইয়া তোরে মামা ডাক শোনাইব। তখন এই আব্দুল্লাহ পথেঘাটে পইড়া মইরা থাকলেও ফিরা চাইব না।

– কী চাইছিস তুই?

– ওকে নিয়ে যা।

জ্যোতি মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে। একদৃষ্টে আব্দুল্লাহর পানেই চেয়েছিল এ যাবৎ। মাথায় উষ্ণ স্পর্শে কেঁপে উঠে কেমন।আব্দুল্লাহ ঘন কেশে ঠোঁট ছুঁই। চোয়াল ছুঁয়ে উপরে তুলে নত মুখশ্রী। চোখে চোখ রেখে নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে।

– অধিকার নিয়ে তোমায় ছুঁতে চেয়েছিলাম প্রাণ। কিন্তু কে জানত গোটা তুমিটাই আমার জন্য নিষিদ্ধ। তবে জানো তো নিষিদ্ধ কারো উপর অধিকার খাটাতে মানুষ বড্ড ভালোবাসে। আরও একবার না হয় অপবিত্র হলে আমার ছোঁয়ায়! অপবিত্র বলায় রাগ করো না প্রাণ। তুমি ফুলের মতোই স্নিগ্ধ, পবিত্র। আমায় ভাবাও তোমার জন্য পাপ। আর আমি জানি তুমি আমায় ভাববে, মৃত্যু অবধি।

– উপরওয়ালা নসিবে রাখেনি বলে, নয়তো দুনিয়ার কারো সাধ্য ছিল না এই আব্দুল্লাহর থেকে তার প্রাণকে আলাদা করার।

নীলাভ আসমানে লাল আবিরের ছিটা। শুভ্র মেঘ রাশি কৃষ্ণ মেঘের আড়ালে পড়ে। কালো, লালচে আবিরের মিশেলে আকাশের রঙ বদলে ধূসর বর্ণে রূপ নেয়। কোনো আগাম বার্তা ছাড়ায় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির পানিতে গা ভিজে সকলের। যন্ত্রণায় কোনো এক ব্যর্থ পুরুষের চোখও ভিজে। সকলের আড়ালে, অগোচরে! তাদের অপ্রত্যাশিত বিচ্ছেদে আকাশও যেন কাঁদে।

বর্ণ কাঁপা হাতে জ্যোতির বরফ শীতল হাত মুঠোয় নেয়। এক পলক আব্দুল্লাহকে দেখে জিদানের ইশারায় টেনে নিয়ে যায় জ্যোতিকে। বর্ণের হাত কাঁপছে অসম্ভব রকম। আব্দুল্লাহর নিস্পৃহ চোখ দেখে মনে হচ্ছে, কারো প্রাণ ভোমরা নিয়ে যাচ্ছে সে। এমন অন্যায় করে সে আদৌ ক্ষমা পাবে?

_

জিদান যেতেই সকলে আব্দুল্লাহর পাশে বসে।

– মেয়েটাকে এভাবে ফিরিয়ে না দিলে হতো না?

আব্দুল্লাহ দু হাত পেছনে নিয়ে হেলে বসে কিছুটা। আকাশের পানে চেয়ে বলল,
– ঐ চাঁদ দেখছিস তোরা? সে ঐ চাঁদের মতোই, আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাকে চাওয়া যাবে তবে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা যাবে না।

– তুই চাইছিস না সেইটা বল। তুই চাইলে জিদান পুরো দুনিয়ার সাথে লড়াই করে ওকে তোর করে দিত।

– চাঁদকে ভালো রাখার সাধ্য এই বখাটের নেই। নয়তো এই আব্দুল্লাহ নিজের মানুষ ছিনিয়ে নিতে জানে। আমার প্রাণ অন্য কারো জন্য না এই আব্দুল্লাহর জন্য বউ সাজত আজ।

বলেই উন্মাদের মতো হাসতে লাগে। সকলে স্তব্ধ হয়ে দেখে ব্যর্থ এক প্রেমিক পুরুষের পাগলামি। আব্দুল্লাহ টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল ভেজা কর্দমাক্ত ঘাসে। তার ভেজা শার্টে, গায়ে ময়লা লাগলেও সেভাবেই পড়ে থাকে। যেন এভাবেই সে গোটা জনম শেষ করবে।

এলাকা জুড়ে মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে জ্যোতির বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবর। বরপক্ষের কাছে এ কথা যেতে সময় লাগে না। মিস্টার সারওয়ার বুঝানোর চেষ্টা করলেও ছেলেপক্ষ যেন কথা শুনতে নারাজ। তাদের কথা যে মেয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে পালিয়ে যায় সে মেয়েকে তারা ঘরে তুলবে না কিছুতেই। বর্ণের বাবাও নিজের বড়ো ভাইকে বুঝানোর চেষ্টা করে অনেক। এ প্রস্তাবটা তিনিই নিজের বড়ো ভাইয়ের কথায় রেখেছিলেন। এখন মনে হচ্ছে বড্ড ভুল করে ফেলেছেন। তার ভুলের দায় তার মেয়ের উপর গিয়ে যেন না পড়ে।

অকস্মাৎ শব্দে উপস্থিত সকলে কেঁপে ওঠে। জ্যোতি মাথা নুইয়েই দাঁড়িয়ে আছে। তার হাত এখনও বর্ণের হাতের মুঠোয়। মিস্টার সারওয়ার পুনরায় হাত তুলতে চাইলে বর্ণের বাবা আগলে নেয় জ্যোতিকে।

– আপনার মতো সম্মানিত মানুষের থেকে এমনটা আশা করিনি। মেয়ের গায়ে হাত তোলা কোনো সমাধান নয়। এতে লোক হাসাহাসি কমবে না, আর না আপনার হারিয়ে যাওয়া সম্মান ফিরে পাবেন।

– ওকে জিজ্ঞেস করুন ও আমার বাড়ি কেন এসেছে? যার কাছে গিয়েছিল সে রাখেনি? এই মেয়ের জায়গা আমার বাড়িতে হবে না। আমার বাড়ি থেকে ওকে বেরিয়ে যেতে বলুন। এক্ষুনি, এই মুহূর্তে।

– বেরিয়ে তো জ্যোতি মা যাবেই। তবে এভাবে না। তিন কবুল বলেই এই বাড়ি থেকে বের হবে।

– মানে?

– আমার মেয়েটাকে আপনার বাড়িতে দেওয়ার পর থেকে আমার ঘর শূন্য হয়ে গিয়েছে ভাইজান। আমার আম্মাজানের কমতি মেটাতে চাইছি আপনার মেয়েকে আমার বাড়িতে নিয়ে। জ্যোতিকে আমার বর্ণের হাতে তুলে দিন। আর্থিক অবস্থা ততটা সচ্ছল না হলেও আপনার মেয়ে ভালো থাকবে সেই নিশ্চয়তা আমি দিচ্ছি আপনাকে।

জ্যোতি অনুভূতি শূন্য হয়ে কাঠ পুতুলের মতো তিন কবুল বলে কাগজে স্বাক্ষর করল। মেয়েটার কণ্ঠনালী একবারের জন্যও কাঁপল না। অনেকেই অবাক দৃষ্টিতে চেয়েছিল। এই দিনে মেয়েরা এমন অনুভূতি শূন্য হয়ে থাকে? অন্তত কবুল বলার সময় ভয়, শঙ্কায় আতঙ্কগ্রস্ত হয় মুখাবয়ব।

কবুল বলেই মেয়েটা মূর্ছা গেল। বুশরা এক হাতে আগলে নেয়। জিদান উদ্বিগ্ন হয়ে বোনের পাশে বসে। গালে হালকা চাপড় মেরে অস্থির হয়ে ডাকল অচেতন হয়ে পড়ে থাকা মেয়েটাকে। চেতনা ফিরতে জ্যোতি কেমন অপ্রকৃতস্থের ন্যায় আচরণ করতে লাগে। সে এক মুহূর্তের জন্যও এই ম্যানশনে থাকবে না। জিদান সকলের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বোনকে নিয়ে বেরিয়ে আসে। মিস্টার সারওয়ার শেষ সময়ে কঠোর হয়ে থাকতে পারলেন না। যতই হোক তিনি বাবা। মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন আলগোছে। গলা ধরে এলো ভদ্রলোকের। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কিছু বলতে গিয়েও মেয়ের স্বাভাবিক কণ্ঠ কানে আসতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

– আমি আপনাকে কখনো ক্ষমা করব না। যে প্রাচুর্যের দাম্ভিকতায় তাকে আমাকে আলাদা করলেন সেই প্রাচুর্যের ধ্বংস হবে খুব শীঘ্রই। আপনি জানেন না, বাবা হয়ে মেয়েকে কীভাবে জীবন্ত খুন করলেন আপনি।

ভাই ভাবির বিয়া হইয়া গেছে।
ফোনের স্ক্রিনে চোখ পড়তেই আব্দুল্লাহর রক্তাভ চোখের মণি জ্বলে ওঠে। তার চোখ জ্বলছে, বুকের সাথে মাথায়ও অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। দু হাতে মাথা চেপে ধরে ছেলেটা। বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
– সেদিন অধর ছুঁয়ে ভেবেছিলাম তুমি আমার হয়ে গেলে। তোমাকে হারানোর ভয় নেই। কে জানত অধর ছুঁয়েও হারাতে হবে, যেন তোমাকে না হারিয়ে হারালাম নিজেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here