“বয়ফ্রেন্ডের সাথে জেদ করে নিজের প্রফেসর চাচাতো ভাইকে বিয়ে করে নিলি? তুই নাকি তোর আয়াজ ভাইকে ভাইয়ের চোখে দেখিস?” অবাকের চরমে নিহা।
বন্ধুমহলে ঠোঁটকাটা হিসেবে পরিচিত নিহার এই প্রশ্নে ইনশিরাহ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দামি বেনারসি শাড়ির কুঁচিটা ঠিক করল। মুখে এক ফোঁটা অনুশোচনা বা ভয়ের ছাপ নেই, বরং এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, “এসব আমি ইচ্ছে করে করি নাই। কেমনে কেমন হলে গেলো। আর তাছাড়া রনির মতো চরিত্রহীনকে তো বিয়ে করব না!”
নিহা কপালে হাত দিয়ে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। “চরিত্রহীন বলে তুই রিলেশন ব্রেকআপ করতে পারতি। কিন্তু তার ওপর প্রতিশোধ নিতে নিজের আপন চাচাতো ভাই, ডিপার্টমেন্টের গম্ভীর হিটলার আরশাদ খান আয়াজকে বিয়ে করে বসলি? তাও আবার কাজী ডেকে হুট করে? তুই একটা আস্ত ভন্ড আর জেদি, ইনশিরাহ!”
ইনশিরাহ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। দুনিয়ার কাছে সে ভীষণ জেদি, একগুঁয়ে আর অহংকারী। সে যা ধরবে, তা করেই ছাড়বে তাতে পৃথিবী উল্টে যাক না কেন। কিন্তু সে যে মনে মনে কতটা চতুর আর নিজের স্বার্থে কত বড় কিছু করতে পারে, সেটা একমাত্র নিহাই জানে।
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ল।
নিহার যাওয়ার পরপরই দরজায় দ্বিতীয়বার টোকা পড়ল। নিহা দরজা খুলে দিয়ে ইনশিরাহকে একটা চোখ মেরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ড. আরশাদ খান আয়াজ। পরনে অফ-হোয়াইট শেরওয়ানি, চুলগুলো বরাবরের মতোই পরিপাটি। চোখে চশমা। ক্লাসরুমে যার একটা গম্ভীর চাউনিতে একশো ছাত্র চুপ হয়ে যায়, সেই মানুষটার চোখে এখন এক অদ্ভুত নরম আলো। তিনি খাটের এক কোণায় বসলেন, তবে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে।
ইনশিরাহ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গয়না খুলতে খুলতে আড়চোখে আয়াজকে দেখল। তারপর মুখে একটা মেকি নিরীহ ভাব ফুটিয়ে বলল, “কী ব্যাপার আয়াজ ভাই? এভাবে চোরের মতো বসে আছেন কেন? ক্লাসে তো বাঘের মতো গর্জন করেন!”
আয়াজ মৃদু হাসলেন। চশমাটা খুলে খাটের পাশের টেবিলে রেখে ইনশিরাহের দিকে তাকাল। তাঁর সেই গভীর চোখের দৃষ্টিতে ইনশিরাহ ক্ষণিকের জন্য একটু থমকে গেল। আয়াজ শান্ত গলায় বলল, “ক্লাসের বাঘ তো খাঁচায় বন্দি হয়ে গেছে, ইনশিরাহ। আর চোরের মতো বসব না কেন বলো? তুমি যে হুট করে রনির ওপর জেদ করে কাকা-কাকিমাকে বললে আমাদের বিয়েটা দিয়ে দিতে, আর কাকাও এক কথায় রাজি হয়ে কাজী ডেকে ফেললেন পুরো বিষয়টা কি আমার জন্য একটা মধুর ধাক্কা নয়?”
ইনশিরাহ একটু ভড়কে গেল, কিন্তু নিজের জেদি আর ভন্ড ভাবটা বজায় রেখে বলল, “আহা! আপনি তো যেন কিছুই জানেন না! খুব তো ভালো মানুষ সেজে রাজি হয়ে গেলেন। না করে দিলেই পারতেন!”
আয়াজ উঠে দাঁড়ালেন। ধীর পায়ে ইনশিরাহের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ইনশিরাহের সুবাসিত চুলের খুব কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “যে মেয়েকে আমি কৈশোর থেকে ভালোবেসে আসছি, সে যখন নিজের জেদ পূরণ করতে হলেও আমার নামে কবুল পরতে চায়, তখন কোন বোকা পুরুষ না করে বলো? সুযোগ হাতছাড়া করার পাত্র আমি নই।”
ইনশিরাহ এবার পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল। সে ভেবেছিল গম্ভীর প্রফেসরকে সে নিজের আঙুলের ইশারায় নাচাবে, কিন্তু এই মানুষটা তো প্রথম রাতেই তার সব চাল ধরে বসে আছেন! সে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ওহ, তাই নাকি? ভালোবাসা? রনিকে হিংসে দেখানোর জন্য আমি এই বিয়েটা করেছি, বুঝলেন? আমি কিন্তু আপনাকে স্বামী টামী মানি না!”
আয়াজ ইনশিরাহের এই জেদি রূপটা দেখে মনে মনে হাসল। সে আলতো করে ইনশিরাহের থুতনিটা ছুঁয়ে তার মুখটা নিজের দিকে তুললেন। তাঁর আঙুলের ছোঁয়ায় ইনশিরাহের সারা শরীরে যেন একটা মৃদু কারেন্ট খেলে গেল।
আয়াজ ইনশিরাহের চোখের দিকে তাকিয়ে এক টুকরো মুগ্ধতা নিয়ে বলল, “আমি জানি তুমি কতটা জেদি, আর এই বিয়ের পেছনে তোমার কারণটা ঠিক কোথায়। দুনিয়ার কাছে তুমি যতই ডানপিটে আর একগুঁয়ে হও না কেন, আমার কাছে তুমি আমার সেই ছোট্ট ইনশিরাহ-ই আছ। স্বামী মানতে সময় লাগবে? কোনো সমস্যা নেই, প্রফেসর আরশাদ খান আয়াজের ধৈর্যের অভাব নেই। তবে একটা কথা…”
আয়াজ আরও একটু ঝুঁকে ইনশিরাহের কানের কাছে এসে নিচু স্বরে বলল, “জেদ করে হলেও তুমি এখন আমার বিবাহিতা স্ত্রী। তাই রনির নামটা এই ঘরে আর উচ্চারণ না করাই ভালো। আমার হিংসে হলে কিন্তু আমি ক্লাসের প্রফেসরের মতো শাস্তি দেব না, অন্যভাবে শাস্তি দেব।”
ইনশিরাহের গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠল। সে চট করে আয়াজের হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “শাস্তি দেবেন মানে? কী করবেন শুনি?”
আয়াজ একটা চমৎকার রোমান্টিক হাসি দিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তারপর বিছানার একপাশে বালিশ টেনে শুয়ে পড়ে বললেন, “কী করব তা সময় হলেই বুঝবে। আপাতত লাইটটা নিভিয়ে ঘুমাও তো জেদিলতা ইনশিরাহ খান ঈনশু। কাল সকালে কিন্তু আবার আমার ক্লাসেই তোমাকে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে। সেখানে কোনো ছাড় নেই!”
ইনশিরাহ রাগে আর লজ্জায় লাল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই গম্ভীর প্রফেসরের সামনে তার কোনো ভন্ডামি খাটবে না। লোকটা যেমন রোমান্টিক, তেমনই বুদ্ধিমান!
চলবে,,
#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১

