প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_১৩

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_১৩

বসন্তের বিদায়ের পর যখন গ্রীষ্মের দাবদাহ শুরু হলো, খান বাড়ির অন্দরমহলে তখন এক থমথমে নীরবতা। ঈনশুর প্রেগন্যান্সির সপ্তম মাস চলছে। এই সময়টাতেই তার সেই চিরচেনা ছটফটে, চঞ্চল স্বভাবটা কেমন যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় রূপ নিতে শুরু করল। যে মেয়ে সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখত, সায়েবের সাথে বাজি ধরত, সে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আয়াজ এই পরিবর্তনটা সবার আগে লক্ষ্য করল। একজন সাইকোলজির প্রফেসর হিসেবে তিনি খুব ভালো করেই জানেন, হরমোনাল চেঞ্জের কারণে এই সময়ে মেয়েদের মানসিক অবস্থা কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

সেদিন রাতে কলেজ থেকে ফিরে আয়াজ দেখলেন, ঘরের আলো নেভানো। ঈনশু বিছানায় একপাশে গুটিসুটি মে-রে শুয়ে আছে, আর তার বালিশের এক কোণ ভিজা। সে কাঁদছিল।

আয়াজ চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ধীর পায়ে বিছানায় এসে বসলেন। তিনি ঈনশুর পিঠে হাত রাখতেই ঈনশু চমকে উঠে চোখের পানি মোছার চেষ্টা করল। তার সেই ভেতরের অহংকারী জেদিলতা এখনো নিজের দুর্বলতাটুকু সহজে প্রকাশ করতে চায় না।

“কী হয়েছে, ঈনশু?” আয়াজ খুব নরম, এক বুক মায়া মাখানো স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।

ঈনশু মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অভিমানী গলায় বলল, “কিছু হয়নি। আপনি এত রাতে কেন এসেছেন? আপনার তো কলেজ, থিসিস আর ডিপার্টমেন্ট নিয়েই দিন কেটে যায়। আমার দিকে তাকানোর সময় কোথায় আপনার?”

আয়াজ ঈনশুর এই অযৌক্তিক অভিমান দেখে রাগ করলেন না, বরং এক চিলতে হাসলেন। তিনি ঈনশুকে আলতো করে টেনে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিলেন। ঈনশু প্রথমে একটু বাধা দিতে চাইল, কিন্তু আয়াজের সেই চেনা পুরুষালি ও নিরাপদ আবেগের সামনে সে নিজেকে সঁপে দিল।

আয়াজ ঈনশুর চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “সাইকোলজি বলে, যখন একটা চতুর আর জেদি মেয়ে বিনা কারণে অভিমান করতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সে আসলে খুব একাকীত্বে ভুগছে। আমি দুঃখিত, ঈনশু। এই কদিন পরীক্ষার খাতা দেখার চক্করে তোমাকে একটু কম সময় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তুমি কি জানো, এই বুকের ভেতর যে ছোট্ট প্রাণটা বড় হচ্ছে, তার আর তার মায়ের চেয়ে দামি আমার এই দুনিয়ায় আর কিছু নেই?”

ঈনশু আয়াজের শার্টের কাপড়টা খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “আমার খুব ভয় করে, আয়াজ। আমি কি সত্যি একজন ভালো মা হতে পারব? আমার নিজের স্বভাবই তো এত জেদি, এত ভন্ডামি আর চাতুর্যে ভরা। আমি আমার সন্তানকে কী শিক্ষা দেব?”

আয়াজ ঈনশুর মুখটা উঁচিয়ে ধরে সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটোতে এখন এক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের মতো গভীরতা। তিনি বললেন, “ভন্ডামি নয় ওটা, ঈনশু। ওটা ছিল পরিস্থিতির সাথে লড়াই করার জন্য তোমার তৈরি করা একটা বর্ম। রনির ধোঁকা থেকে নিজেকে বাঁচাতে তুমি নিজের চারপাশে ওই চতুরতার দেয়াল তুলেছিলে। কিন্তু আজ? আজ তুমি একজন পরিপূর্ণ নারী। আর শিক্ষা? সন্তানকে শুধু বইয়ের পড়া দিয়ে মানুষ করা যায় না। একটা মেয়ে যখন নিজের আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্য লড়তে জানে, তার চেয়ে বড় শিক্ষা একটা সন্তানের জন্য আর কী হতে পারে বলো? তুমি তোমার জেদটাকে এবার একটা ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করো।”

আয়াজের এই একটা কথাই যেন ঈনশুর ভেতরের সমস্ত মেঘ কেটে দিল। জীবনটা শুধু সস্তা রোমান্স বা প্রতিশোধের গল্প নয়; জীবন মানে দায়িত্ব, জীবন মানে মানিয়ে নেওয়া আর নিজের ভেতরের দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করা।

পরের মাসেই সায়েবের ফাইনাল ইয়ারের প্রজেক্ট ডিফেন্স। খান বাড়ির ডাইনিং টেবিলটা এখন একটা মিনি লাইব্রেরি হয়ে গেছে। সায়েব দিনরাত জেগে পড়ছে, কারণ সে খুব ভালো করেই জানে বোর্ডের প্রধান পরীক্ষক আর কেউ নন, স্বয়ং ড. আরশাদ খান আয়াজ। ঘরে ভাইপো হলেও এক্সাম রুমে আয়াজ এক চুলও ছাড় দেবেন না।

ঈনশু এখন আর আগের মতো সায়েবকে খেপায় না, বরং সে নিজে সায়েবের পাশে বসে কফি বানিয়ে দেয়, নোটসগুলো গুছিয়ে দেয়। মাতৃত্ব যেন ঈনশুকে এক লহমায় অনেক বড় আর দায়িত্বশীল বানিয়ে দিয়েছে।
পরীক্ষার আগের রাতে সায়েব ড্রয়িংরুমে বসে মাথা চেপে ধরে বলল, “ঈনশু, আমার খুব ভয় করছে রে। আয়াজ ভাই যদি কাল আমাকে এমন কোনো সাইকোলজিক্যাল প্রশ্ন করেন যার উত্তর আমি জানি না, তবে তো আমার লাইফটাই শেষ!”

ঈনশু সায়েবের মাথায় হাত রেখে খুব শান্ত গলায় বলল, “সায়েব, উনি তোকে ফেল করানোর জন্য প্রশ্ন করবেন না, বরং তুই কতটা চাপ নিতে পারিস সেটা দেখার জন্য করবেন। তুই প্রফেসরের কড়া রূপটাকে ভয় পাচ্ছিস, কিন্তু ওনার ভেতরের শিক্ষকটাকে বোঝার চেষ্টা কর। উনি চান আমাদের খান বাড়ির ছেলে যেন সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। তুই নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ।”

ঠিক দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ঈনশুর এই কথাগুলো শুনছিলেন আয়াজ। তাঁর ঠোঁটের কোণায় এক গর্বের হাসি ফুটে উঠল। যে মেয়ে একদিন রনির দেওয়া আঘাতে ভেঙে পড়েছিল, সে আজ অন্য একজনকে ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচাচ্ছে। এটাই তো আসল শিক্ষা, এটাই তো জীবনের আসল উপন্যাস!

ঠিক নবম মাসের শেষে, এক ঝোড়ো বৃষ্টির রাতে ঈনশুর লেবার পেইন শুরু হলো। পুরো খান বাড়িতে তখন তোলপাড়। ইব্রাহিম খান আর ইসমাইল খান গাড়ি বের করলেন, সুমি বেগম আর শাপলা বেগম ঈনশুকে ধরে গাড়িতে তুললেন।

হসপিটালের করিডোরে আয়াজ পায়চারি করছে। তাঁর জীবনের বড় বড় সেমিনার বা ভাইভাতেও তিনি কোনোদিন এতটা নার্ভাস হননি, যতটা আজ এই হসপিটালের করিডোরে দাঁড়িয়ে হচ্ছেন। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চশমাটা বারবার খুলে মুছছেন।
সায়েব এসে আয়াজের কাঁধে হাত রাখল, “আয়াজ ভাই, শান্ত হও। আমাদের ঈনশু বড্ড জেদি মেয়ে, ও এত সহজে হেরে যাওয়ার বান্দা নয়।”

ঠিক ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে ওটি (OT)-র লাল বাতিটা নিভে গেল। ডাক্তার বের হয়ে এসে হাসিমুখে বললেন, “কনগ্রাচুলেশনস ড. আয়াজ! আপনার ঘরে এক লক্ষ্মী কন্যাসন্তান এসেছে। মা আর সন্তান দুজনেই সুস্থ আছেন।”

আয়াজ যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল।

কেবিনে যখন আয়াজ ঢুকল, তখন ভোরের নরম আলো এসে পড়েছে ঈনশুর মুখের ওপর। ঈনশু ক্লান্ত, ফ্যাকাশে কিন্তু তার মুখে এক স্বর্গীয় হাসি। তার পাশে শুয়ে আছে এক টুকরো চাঁদের কণা, যার হাত-পায়ের আঙুলগুলো একদম ঈনশুর মতো।

আয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ঈনশুর পাশে বসলেন। তিনি প্রথমে ঈনশুর কপালে এক দীর্ঘ, পবিত্র চুমু খেলেন। তারপর আলতো করে সেই ছোট্ট কন্যাটিকে নিজের কোলো তুলে নিলেন।

ঈনশু দুর্বল গলায় মৃদু হেসে বলল, “দেখুন প্রফেসর সাহেব, আপনার ঘরে আর একটা জেদিলতা চলে এসেছে। এবার একে সামলানোর থিওরি বের করুন।”

আয়াজ নিজের কন্যার ছোট্ট হাতটা নিজের আঙুলে জড়িয়ে ধরে ঈনশুর দিকে তাকাল। তাঁর চোখে তখন এক নতুন জীবনের অপার শিক্ষা আর আনন্দ। তিনি বললেন, “এর জন্য কোনো থিওরির প্রয়োজন নেই, ঈনশু। যে গল্পে জেদ আর চতুরতা দিয়ে শুরু হয়েছিল, আজ সেখানে শুধু এক বুক ভালোবাসা আর দায়িত্বের শাসন রাজত্ব করছে।”

বারান্দার বাইরে তখন ভোরের পাখি ডাকছে, আর খান বাড়ির এই নতুন অধ্যায়ে যুক্ত হলো এক অনন্ত এবং অর্থপূর্ণ জীবনের গল্প।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here