প্রফেসরের_জেদিলতা #আরিবা_নাওশীন #পর্ব_২০

0
2

#প্রফেসরের_জেদিলতা
#আরিবা_নাওশীন
#পর্ব_২০

ঝড় কেটে যাওয়ার পর খান বাড়ির সকালটা যেন অনেক দিন পর এক মুঠো তাজা রোদ নিয়ে এলো। ড্রয়িংরুমের চেনা সোফায় বসে আয়াজ আরাম করে খবরের কাগজ পড়ছিল। পরনে তাঁর সাদা রঙের একটা সুতির ফতুয়া আর ট্রাউজার, চোখে সেই চড়া ফ্রেমের চশমা। লকআপের সেই ক্লান্তির কোনো ছাপ এখন আর ওনার মুখে নেই, বরং এক ধরনের রাজকীয় স্বস্তি খেলা করছে।

রান্নাঘর থেকে চায়ের ফ্লাস্ক আর গরম পরোটার থালা নিয়ে এলো ঈনশু। তার পরনে একটা বাসন্তী রঙের শাড়ি। সে টেবিলে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে আয়াজের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল, “কী ব্যাপার প্রফেসর সাহেব? আজ এত মনোযোগ দিয়ে কী পড়া হচ্ছে? আবার কোনো নতুন ক্রাইম থিওরি নাকি?”

আয়াজ কাগজটা একটু নামিয়ে চশমার ওপর দিয়ে ঈনশুকে দেখলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণায় সেই চেনা, মায়াবী বাঁকা হাসি। সে বলল, ” যে মেয়ে ঝড়ের রাতে ল্যাবের মেইন সুইচ অফ করতে পারে, তার সামনে সকালবেলা ক্রাইম থিওরি পড়া বড্ড ঝুঁকিপূর্ণ। আমি শুধু আবহাওয়ার খবর পড়ছি, মহারানী।”

ঈনশু চায়ের কাপটা ওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে নিজের সেই চিরচেনা জেদি চাউনিটা ফিরিয়ে এনে বলল, “খুব তো রসালো কথা বলা হচ্ছে! অথচ যখন লকআপে হাতটা ধরেছিলেন, তখন তো মনে হচ্ছিল কত নিরীহ এক সাধু পুরুষ!”

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধপধপ করে নেমে এলো সায়েব। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখে তখনও ঘুমের ঘোর। কিন্তু টেবিলে বিরিয়ানির গন্ধ না পেয়ে সে একটু মুখ কালো করল।

“কী রে ঈনশু! কাল তো থানায় দাঁড়িয়ে বড় বড় ডায়ালগ দিলি আয়াজ ভাই ফিরলে স্পেশাল বিরিয়ানি রাঁধবি! আর আজ সকালে দেখি সেই চিরাচরিত পরোটা আর ভাজি? মামা হলাম বলে কি আমার ডায়েটের এই অপমান সহ্য করতে হবে?” সায়েব চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল।

আয়াজ চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে কড়া গলায় বলল, “সায়েব, তোমার ডায়েটের চেয়ে তোমার রেজাল্টের চিন্তা করাটা বেশি জরুরি। আগামী পরশু থেকে কলেজ আবার রেগুলার খুলছে। আর হাবিবুল্লাহর কেসের কারণে যে ক্লাসগুলো মিস হয়েছে, সেগুলোর জন্য একটা স্পেশাল এক্সাম শিডিউল আমি অলরেডি তৈরি করেছি।”

সায়েব ওমনি পরোটার লোকমাটা মুখে নিয়ে জিব কেটে বলল, “বাপ রে! লকআপ থেকে ফিরেই লোকটা আবার জল্লাদ হয়ে গেছে! ঈনশু, তুই ওনাকে একটু শান্ত কর তো ভাই, সারাক্ষণ মাথার ওপর যেন একটা সিলেবাস ঘুরছে!”

ঈনশু আর আয়াজ দুজনেই সায়েবের এই করুণ মুখ দেখে একসাথে হেসে উঠল।

বিকেলের দিকে চারপাশটা বেশ নরম হয়ে এলো। ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে বসেছিল ঈনশু। তার কোলে মাথা রেখে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে ছোট্ট আয়াত। বাচ্চার সেই নরম নিঃশ্বাসের শব্দ আর দুপুরের শেষের মিষ্টি হাওয়া সব মিলিয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ।

আয়াজ ধীর পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ওর হাতে এক বাটি কাটা আম। সে ঈনশুর পাশে এসে বসল এবং একটা আমের টুকরো কাঁটা চামচ দিয়ে ঈনশুর মুখের সামনে ধরল।

ঈনশু একটু অবাক হয়ে বলল, “হুট করে এত আদর? প্রফেসর সাহেবের কি কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে?”

“অপরাধবোধ নয়, কৃতজ্ঞতা,” আয়াজ খুব নরম, নিচু এবং পুরুষালি স্বরে বলল। ওর চোখ দুটো আজ চশমার আড়ালেও বড্ড বেশি মায়াবী দেখাচ্ছিল। “কাল যদি তুমি ওই লকার থেকে আরিয়ানের ভিডিওটা উদ্ধার না করতে, তবে আইনি প্রক্রিয়াটা আরও অনেক জটিল হতো। আমি হয়তো জানতাম লকারটা কোথায়, কিন্তু চাবিটা যে করিম চাচা অত নিরাপদে রেখেছেন, তা আমার জানা ছিল না। তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও ঈনশু, তুমি আমার এই কঠিন জীবনের সবচেয়ে পারফেক্ট পার্টনার।”

ঈনশু আমের টুকরোটা মুখে নিয়ে আয়াজের চওড়া কাঁধে নিজের মাথাটা রাখল। তার চোখের কোণায় এক ফোঁটা সুখের পানি চিকচিক করে উঠল। সে ফিসফিস করে বলল, “আমি শুধু আমার ভালোবাসার মানুষটাকে ফিরিয়ে এনেছি, আয়াজ। আরিয়ানের আত্মা আজ নিশ্চয়ই শান্তি পেয়েছে। ও ওপর থেকে দেখেছে, তার ভাই তার জন্য কতটা লড়তে পারে।”

আয়াজ ঈনশুর চুলে নিজের হাতটা ডুবিয়ে দিল। আলতো করে চাপ দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। “আরিয়ানের চ্যাপ্টার এবার সত্যিই ক্লোজড। হাবিবুল্লাহ আর প্রিন্সিপালের রিমান্ড শুরু হয়েছে আজ থেকে। ওরা আর কোনোদিন এই সমাজে মাথা উঁচু করতে পারবে না। এখন থেকে আমার এই থিওরির দুনিয়ায় শুধু তুমি, আয়াত আর আমাদের এই ছোট্ট পরিবার।”

সন্ধ্যা নেমে আসার পর আয়াজ আবার তাঁর স্টাডি রুমে গেল কিছু পুরোনো ফাইল গোছাতে। ঈনশু আয়াতকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে নিচে যাচ্ছিল সুমি বেগমকে রাতের রান্নায় সাহায্য করতে।

হঠাৎ ড্রয়িংরুমের সদর দরজায় একটা কলিংবেলের শব্দ হলো।

সায়েব তখনো ল্যাপটপে গেম খেলছিল, সে গিয়ে দরজা খুলল। কিন্তু দরজার বাইরে কেউ ছিল না, শুধু দরজার নিচে একটা ল্যামিনেট করা খাম পড়ে ছিল।
“কীরে? কে এলো আবার?” ঈনশু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল।

সায়েব খামটা তুলে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। “জানি না তো । কোনো নাম লেখা নেই। শুধু লেখা’ড. আরশাদ খান আয়াজের উদ্দেশ্যে’।”

ঈনশু খামটা হাতে নিল। কেন যেন তার মনটা আবার একটু কুঁকড়ে উঠল। সে খামটা খুলে ভেতরের চিঠিটা বের করল। চিঠিতে কম্পিউটারে টাইপ করা মাত্র দুটো লাইন লেখা ছিল:

“ভেবেছ জামান আর হাবিবুল্লাহকে জে-লে পাঠিয়েই আরিয়ানের সব হিসাব চুকে গেছে, আরশাদ? সিন্ডিকেটের আসল গডফাদার কিন্তু এখনো মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, আর সে তোমাদের বড্ড কাছের কেউ। আগামী সপ্তাহে দেখা হচ্ছে।”

ঈনশুর হাত থেকে চিঠিটা মেঝেতে পড়ে গেল। তার চোখের সামনে আবার সেই কুয়াশা ঘনিয়ে এলো। আসল গডফাদার এখনো বাইরে? আর সে তাদের বড্ড কাছের কেউ?

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছিলেন আয়াজ। ওনার চোখে চশমাটা ঠিক করা। ঈনশুর ফ্যাকাশে মুখ আর মেঝের চিঠিটা দেখে ওনার চোয়ালটা আবার শক্ত হয়ে উঠল।

চলবে,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here