#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৫ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
আহিয়ানদের গাড়িটা বিশাল বট গাছের সাথে গিয়ে ধাক্কা লেগেছে। ট্রাকটা যেই মুহুর্তে আহিয়ানদের গাড়ির উপর আঘাত হানবে ঠিক তখনি আহিয়ান স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িটা খোলা জায়াগায় নিয়ে গেল। আরেকটু দেরি হলেই ট্রাকের সাথে জিপ গাড়ির বিরাট একটা সংঘর্ষ ঘটে যেত।
রাস্তার পাশে অল্প বিস্তর জায়গা ছিল।সেখানটাই আবার বড় বড় দুইটা বট গাছও রয়েছে। জায়গা কম থাকায় গাড়ির সামনের অংশ বট গাছের সাথে বারি খেয়েছে। তবে গাড়িতে থাকা আহিয়ানদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।
গাড়ি থামতেই আহিয়ান গাড়ির দরজা খুলে ঠাস করে নেমে পরলো। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। আহিয়ানের পর পর শিবলীও রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেমে পরলো। সাদাফ,আরাফাত,রিদম আর রাফিনও গাড়ি থেকে নেমে পরলো।
আহিয়ানদের থেকে কয়েক হাত দূরে ট্রাকটা গিয়ে থেমেছে। নিজের কাজ পরিপূর্ণ করতে না পেরে রাগে ফুঁসছে ট্রাকের ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা জুলফিকার।আহিয়ানদের গাড়িটা এখন পাকা সড়কের সাইডে খালি জায়গায় দাড় করানো। আর ট্রাকটা তাদের থেকে অনেকটা সামনে পাকা সড়কে দাড়িয়ে আছে।
ট্রাকে সামনের সিটে দুইজন লোক বসে আছে। যাদের মুখ পুরোপুরি কালো কাপড়ে আবৃত। জুলফিকার ও তার সঙ্গি আহিয়ানকে গাড়ি থেকে নেমে পরতে দেখে, নিজেরাও গাড়ি থামিয়ে মাথা বের করে আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি দিল।
আহিয়ান সেটা দেখে তেড়ে ট্রাকটার দিকে এগোতে নিলে শিবলী আহিয়ানের হাত ধরে বাঁধা দিল। আহিয়ান তাতে তেঁতে উঠে বললো,
” হাত ছাড় শিবলী।”
আহিয়ান শিবলীর হাত ঝারা মেরে সরিয়ে দিয়ে এগোতে নিচ্ছিল, কিন্তু শিবলী এবার পিছন থেকে শক্ত করে আহিয়ানের কোমর জড়িয়ে ধরে আহিয়ানকে বাঁধা দিল। শিবলীও প্রচন্ড রেগে গিয়ে বললো,
” মরার জন্য পাখনা গজিয়েছে বুঝি? তুই কি ভুলে যাচ্ছিস ওরা আমাদের গাড়ির উপর অ্যাটাক করেছে। অভ্র ভাই আমার,শান্ত হ লক্ষ্ণী ভাইটি। আমাদের কাছে এই মুহূর্তে কোনো পিস্ত*ল নেই। কিন্তু ওদের কাছে তো আছে। তুই এগিয়ে যা এটাই তো ওরা চাইছে। ”
আহিয়ান রাগে এখনও ফুঁশছে।তার চারপাশে সাদাফ,আরাফাত,রিদম,রাফিন এসে আহিয়ানকে ঘিরে দাড়িয়েছে। আহিয়ান সবার জোরাজুরিতে দমে গেলেও চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে জুলফিকার এর দিকেই।
শিবলী বন্ধুদের ইশারা করে আহিয়ানকে সামলাতে বললো।তারপর নিজে গা ছাড়া ভাবে পাকা সড়কে গিয়ে দাড়ালো। শিবলী ট্রাকটা থেকে ভালো দূরবর্তীতে আছে। শিবলী ট্রাকে থাকা গুন্ডা গুলোর দিকে তাকিয়ে বিকট হেসে আচমকা নিজের বাম হাতের মিডিল ফিঙ্গার তুলে ধরলো।
আচমকা আহিয়ানদের গাড়িটাকে গাছের সাথে বারি খেতে দেখে আশেপাশের মানুষ ছুটে আসছে। রাস্তায় মানুষের সমাগম বাড়ছে ধীরে ধীরে।
ট্রাকে ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা জুলফিকার দূর থেকে শিবলকে দেখে ঘাড় বাঁকিয়ে পিস্তল বের করতে নিলে,তার সাথের ইব্রাহিম নামের লোকটা তাকে বাঁধা দিল।জুলফিকার চোখ গরম করে তাকালো ইব্রাহিমের দিকে।ইব্রাহিম সেটা পাত্তা না দিয়ে বললো,
” আরে কি করেন ভাই ? দেখছেন রাস্তার আশে-পাশে মানুষের ভীর জমেছে যে। এই অবস্থায় একটা গু*লি চালালে,জনগণ আমাদের মেরে রাস্তায় পুঁতে দিবে। তাড়াতাড়ি এখান থেকে কেটে পরেন ভাই। নয়তো আর কারো হাতে না মরলেও মেজর আহিয়ান অভ্রর কাছে ঠিক মারা পরবেন। ”
ইব্রাহিমের কথায় জুলফিকার কটমট করে তাকালো। তারপর আশেপাশে চোখ বুলিয়ে দেখলো সত্যিই মানুষের সমাগম বাড়ছে আহিয়ানদের গাড়ির কাছে। জুলফিকার নিজের মিশন সাকসেস করতে না পেরে স্টেয়ারিং এ জোরে থাবা মারলো। তারপর তাড়াতাড়ি স্টেয়ারিং ঘুরিয়ে চলে গেল।
________________
আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস এর আকাশছোঁয়া ভবনের সর্বোচ্চ তলায় নিজের ব্যক্তিগত পেন্টহাউসে বসে আছে ‘ ‘ ব্ল্যাক ভাইপার ‘ ইউনিটের অধিপতি মি. ইভান রেইনহার্ট। তার চারপাশের দেয়াল কাঁচের হওয়ায় বাইরে দৃষ্টিপাত করলেই শহরের অসংখ্য উঁচু উঁচু ভবন নজরে পরছে। রাতের নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস এর দূরে জ্বলজ্বল করছে বিভিন্ন কৃত্রিম আলোর সমাহার। ইভান রেইনহার্টের ত্রিশ তলা পেন্টহাউজ ভবন থেকে রাতের বেলা এই ব্যস্ত নগরীর দিকে তাকালে, এই নগরীকে মনে হয় যেন বিশাল এক আলোর সমুদ্র।
ইভান রেইনহার্ট পেন্টহাউসের ভেতরটা আধুনিক ও অভিজাত সাজে সজ্জিত। উঁচু ছাদ থেকে ঝুলে থাকা নান্দনিক ঝাড়বাতির আলো মেঝের চকচকে মার্বেলের ওপর প্রতিফলিত হচ্ছে।
_
আমেরিকায় সময় এখন রাত চারটা। পৃথিবীর অপর গোলার্ধে থাকা অর্থাৎ বাংলাদেশে সময় এখন বিকাল পাঁচটা।আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেসে এখন ভোররাত হলেও শহর কোথাও যেন, অন্ধকার নামতে পারছে না কৃত্রিম আলোর সমুদ্রেরর জন্য।ঘরের মাঝখানে গাঢ় কালো রঙের বিশাল একটি চেয়ার, আর সেখানে চোয়াল শক্ত করে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে ইভান।তার দৃষ্টি ভীষন স্থির মনে হচ্ছে।
একটু আগেই ইভান তার ডানহাত রিসান মেহমাদ এর কাছ থেকে জেনেছে, যে দুইজন লোককে আহিয়ানকে শেষ করতে পাঠানো হয়েছিল তারা আজ আবার ব্যর্থ হয়েছে।আবার কথাটি বলার কারণ হচ্ছে ইভান এর আগেও আহিয়ানকে তার পথ থেকে সরাতে আহিয়ানের মা*র্ডারের প্যান করেছিল। আর সেই প্ল্যানে সামিল হয়ছিল সয়ং আহিয়ানের ‘ প্লাটুন এ ‘ দলের দুইজন ল্যাফটেনেন্ট। একজন হচ্চে জুলফিকার তাসিম অপর জন হচ্ছে ইব্রাহিম শেখ। ইভানের সহযোগিতায় আহিয়ানের দলে থেকে আহিয়ানকেই হ*ত্যা করতে চেয়েছিল এই জুলফিকার আর ইব্রাহিম।
_
আহিয়ানকে মেরে ফেলতে গিয়ে আজ আবার ব্যর্থ হয়েছে জুলফিকা আর ইব্রাহিম। এই খবর নিজের অত্যন্ত বিশ্বস্ত লোক রিসান এর থেকে শুনেই ইভান রেইন হার্ট চোয়াল শক্ত করে মুখ খানা গম্ভীর করে বসে আছে।
এই তো কিছু দিন আগেও আহিয়ানের জন্য ইভানের ত্রিশ কোটি টাকার মাল বর্ডারে ধরা পরেছে। এর আগেও আহিয়ানের চতুর্মাত্রিক বুদ্ধির কারণে ইভানকে অনেকবার লসের সম্মুখীন হতে হয়েছে। তাই তো সে ঠিক করেছিল এই বান্দাকেই উপরে পাঠিয়ে দিবে একেবারে।
_______________
রাত নয়টা। আহিয়ান আর শিবলী সবে বাড়িতে ফিরেছে।রোদেলা ড্রয়িং রুমেই ছিল। বাড়ির মেয়েরা সবাই বসে গল্প করছিল। আজকে দুপুরে ছোট দাদার বাড়িতে গিয়ে রোদেলারা কি কান্ড ঘটিয়েছিল তা নিয়েই হাসাহাসি হচ্ছিল। আহিয়ানকে মুখখানা গম্ভীর আর চোয়াল শক্ত করে ঢুকতে দেখে রোদেলা ভ্রু কুঁচকে নিল।আহিয়ানের পিছু পিছু শিবলীও ঢুকলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো শিবলীর মুখখানাও কেমন যেন শক্ত হয়ে আছে। সবাই থমথম খেয়ে দুই ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।আহিয়ান কারো দৃষ্টির পরোয়া না করে ধুপধাপ পা ফেলে চলে গেল নিজের রুমের দিকে। শিবলী সবার দৃষ্টি লক্ষ্য করে ফাঁকা ঢোক গিলে কৃত্রিম হাসি দিল। সবাই তাতে আরও ভ্রু কুঁচকে তাকালো। শিবলী এবার কি করবে বুঝতে না পেরে কারো প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার আগেই নিজের রুমের দিকে কেটে পরলো।শিবলীকে এভাবে বোকা বোকা হেসে চলে যেতে দেখে সবাই একে আপরের মুখের দিকে তাকালো।
____
রাত নয়টায় সবাইকে খাওয়ার টেবিলে ডাকা হলো। আজকে মাশরিফা,আইরিন আর জয়া খাবার পরিবেশন করবে। বিশাল ডায়নিং টেবিল জুড়ে খাবার সাজিয়ে রাখা হয়েছে। রোদেলা আর আরফিণ হাতে হাতে শাশুড়িদের সাহায্য করেছে।
আমির সাহেবের ভাইয়ের দুই নাতি, ইরফান আর সাইফান এসেছে। আমির সাহেব ভাইয়ের দুই নাতিকে এখন থেকে নিজেদের বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া করার আদেশ করেছেন। বাড়ির সব পুরুষ সদস্যরা খাবার খেতে বসেছে একসাথে।আহিয়ান আর শিবলীকে না দেখে আমির সাহেব দুই নাতির খোঁজ করলো।মাশরিফা শশুড়ের কথার উত্তর দিল,
” ওরা আসছে আব্বা। আমি ডেকে এসেছি। ”
আমির সাহেব চেয়ার টেনে বসতেই আহিয়ান আর শিবলী হাজির হলো।আহিয়ান আর শিবলী দাদার দুই পাশের দুইটা চেয়ার টেনে বসলো। নতুন দুই মুখ অর্থাৎ সাইফান আর ইরফানকে দেখে আহিয়ান আর শিবলী তাদের দিকে তাকাতেই।ইরফান আর সাইফান সালাম দিয়ে তাদের পরিচয় দিল।তাদের সাথে কথা বলা শেষ করে আহিয়ান আর শিবলী খাওয়ায় মনোযোগ দিল। আইরিন,মাশরিফা আর জয়া আজকে খাবার সার্ব করছে। আরফিণ আর রোদেলা তাদের হাতে এটা সেটা এগিয়ে দিল জোর করে। রোদলা আহিয়ানের চেয়ারের পাশেই দাড়িয়ে ছিল।
আমির সাহেব খাওয়ার সময় কথা বলা পছন্দ করেন না। তাই এই সময়টা সবাই নীরব থেকে খাবার শেষ করলো। আহিয়ান খাবার শেষ করে উঠে দাড়িয়ে রোদেলার কাছ থেকে তোয়ালে নিয়ে নিজের হাত মুছলো।শিবলী সেটা আড় চোখে দেখে শয়তানি হাসি দিল। শিবলী নিজেও খাবার শেষ করে রোদেলাকে ডাক দিল,
” এই ফুলকলি? ”
ফুলকলি নামটা শুনে রোদেলা চমকে নিজের বিপরীত পাশে থাকা শিবলীর দিকে তাকালো। আহিয়ান শিবলীর দিকে কটমটিয়ে তাকালো। শিবলী সেটা দেখেও পাত্তা দিল না। শিবলী গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বললো,
” শুধু স্বামীর দিকে নজর দিলে হবে? দেবরকেও তো যত্ন করে হাত মোছার জন্য তো তোয়ালে এগিয়ে দিতে হবে নাকি? ”
রোদেলা শিবলীর কথায় লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিল। এই দেবরের জন্য বেচারীর মান সম্মান সব গেল শশুর,চাচা শশুরদের সামনে। আহিয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকালো শিবলীর দিকে। রোদেলা মাথা নুইয়ে রেখেই তোয়ালে নিয়ে শিবলীর দিকে এক পা বাড়াতে নিলে, আহিয়ান খপ করে রোদেলার হাত ধরে তাকে বাঁধা দিল। হাতে বাঁধা পেয়ে রোদেলা আহিয়ানের দিকে তাকাতেই আহিয়ানের শক্ত দৃষ্টি পরখ করে সে জমে গেল।আহিয়ান রোদেলার হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে বললো,
” তুমি যাও এখন। তোমার এখানে আর দাড়াতে হবে না। ”
আহিয়ান রোদেলাকে আদেশ ছুড়ে দিয়ে তোয়ালেটেটা গোল করে দলা পাঁকিয়ে শিবলীর দিকে ঠাস করে ছুড়ে মারলো। শিবলী থমথম খেয়ে তাকালো আহিয়ানের দিকে। আহিয়ানের লাল হয়ে ওটা চোখের দিকে তাকিয়ে ফাঁকা ঢোক গিলল বেচারা। রোদেলা ততোক্ষণে আহিয়ানের শক্ত মুখের আদেশ শুনেই কেটে পরেছে। শিবলী রোদেলার হাত থেকে তোয়ালে না পাওয়ার দুঃখ কেঁদে দিবে যেন। শিবলীর এই অনাগ্রহ সহ্য হলো না। সে সোজা তার বাবা মাহমুদ সাহেবের দিকে তাকালো।মাহমুদ সাহেব খাবার শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠে যাচ্ছিলেন।তখনি শিবলী ঝর ঝরে গলায় উত্তেজনায় জোরেই ডাক দিল,
” বাবা ”
শিবলীর বাবা কথাটা বলা এতোই জোরে ছিল যে উপস্থিত সবাই থমথম খেয়ে তাকালো তার দিকে।মাহমুদ সাহেব পিছনে ঘুরে ছেলের মুখের দিকে তাকালো। মনে মনে তিনি আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে বললেন,
” এই বজ্জাত ছেলের মুখ থেকে, ভরা মজলিসে কোনো বেলাঘাম কথা বের করো না খোদা। বাপ ভাইয়ের সামনে আমার মান সম্মান রক্ষা করো। ”
মাহমুদ সাহেব ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,
” কি হয়েছে? এভাবে গলা ফাটিয়ে বাবা ডাকছিস কেন?আমি কি কানে কম শুনি? কি বলবি বল। ”
শিবলী তার বাবার কথায় ঘাঢ় চুলকে পরনের টিশার্ট ঠিক করতে করতে মুচকি মুচকি হাসলো।তারপর নিজের চুলে হাত চালিয়ে সিথি ঠিক করতে করতে বললো,
” বাবা তুমি কি ওই গানটা শুনেছো? ”
ছেলের কথায় মাহমুদ ভ্রু কুঁচকে বললো,
” কোন গানটা? ”
আহিয়ান আর আমির সাহেব সহ সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে শিবলীর দিকে। শিবলী বাবার কথায় সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে লজ্জা পাওয়ার অভিনয় করে বাঁকা হাসলো। তারপর বললো,
” ওই যে ওই গানটা,
তিরিশে দিছি পা,আর কবে বিয়া করবাম…?
লেট করলে হবে দেরি,কবে ইস টু কুলু করবাম…?
ঘুম আসে না, ভালো লাগে না,বেকায়দা ব্যারাম।
আমায় বিয়া দাও,বিয়া দাও,বিয়া দাও বাজান…
আমায় বিয়া দাও, বিয়া দাও, বিয়া দাও বাজান।
শিবলীর মুখে এই অদ্ভুত কিছিমের গান শুনে তার চাচারা সবাই গলা খাঁকাড়ি দিয়ে কেটে পরলো। মাহমুদ সাহেব বেফাঁস ফেসেছেন ছেলের কান্ডে।তিনি শক লাগার মতন ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরভিদ,যে কিনা শিবলীর চাচা হয়ে এখনো বিয়ে করেনি সেখানে শিবলীকে বিয়ের জন্য এভাবে লাফাতে দেখে আরভিদের মেজাজ গরম হয়ে গিয়েছে।
মাহমুদ সাহেব কিছু বলবেন তার আগেই শিবলী গান থামিয়ে মুখটা মলিন করে বললো,
” তবে একটা দুঃখের বিষয় কি জানো বাবা? ”
মাহমুদ সাহেব ছেলের মুখের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। শিবলী বাবার দৃষ্টির মানে বুঝতে পেরেও সেটাকে পাত্তা না দিয়ে আবার বললো,
” দুঃখের বিষয়টা হলো আমার বয়স বত্রিশ। ”
শিবলী কথাটা শেষ করতে না করতেই তার মায়ের হাতে একটা গাট্টা খেল। আইরিন দূরে দাড়িয়ে মুখে আঁচল চেপে এতক্ষণ ছেলের লাঘাম ছাড়া কথা বার্তা শুনছিল। আইরিন ছেলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে হাতে থাকা ঝাড়ুটা উপরে তুলতেই,শিবলী তাড়াতাড়ি দৌড় লাগালো।আইরিন ঝাড়ুটা নিয়ে কয়েক কদম তেড়ে গিয়ে বললো,
” এখন দৌড়ে চলে গেলি কেন বাদর? সাহস থাকলে সামনে দাড়িয়ে থাকতি। ”
শিবলী দৌড়ে সিড়ি পেরিয়ে দুই তলার করিডরে উঠে
মায়ের কথায় থেমে গেল। শিবলী তার মায়ের কথায় মুখে হাত নিয়ে তওবা কেটে একবার কানে ধরে আবার দৌড়ে চলে গেল নিজের রুমে।শিবলীকে এভাবে পালাতে দেখে মেহনূর,রোদেলা,তৃষ্ণা খিল খিল করে হেসে ফেলল। অন্ত আর অনন্যাও তাদের সেজো মামুর সাথে সাথে দৌড়ে গেল। ছোট জয় তৃষ্ণার কোল থেকে হেসে হেসে বললো,
” বাদর মামু পালায় হি হি হি ”
জয়ের কথায় ডাইনিং রুমে উপস্থিত সবাই আরেক দফায় পেট চেপে হাসলো। আহিয়ান এসব রঙ তামাশা মুখখানা গম্ভীর করে শুধু পরখ করে গেল। রোদেলার হাসতে আহিয়ানের দিকে চোখ পরতেই দুজনার চোখাচোখি হলো। আহিয়ান রোদেলার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছে। রোদেলা আহিয়ানের এরকম করে তাকিয়ে থাকার কারণ বুঝতে না পেরে সাথে সাথে হাসি থামিয়ে দিল। আহিয়ান সেটা পরখ করে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে, গটগট করে হেটে উপরে চলে গেল। নিচে দাড়িয়ে থাকা সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার আহিয়ানের নির্লিপ্ত ভাবে চলে যাওয়া দেখলো।
_
রাত দশটায় রোদেলা আহিয়ানের রুমের সামনে এসে দেখলো দরজাটা মিশিয়ে রাখা, খোলায় আছে।রোদেলা দরজায় দুইবার হাতে শব্দ করে নক করে নিল। তারপর দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখলো, আহিয়ান বিছানায় বসে ল্যাপটপে কি যেন করছে। আহিয়ানের পরনে একটা ছায় রঙা টাওজার আর সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি।হলদেটে অলিভ ওয়েল রঙা হাতের বলিষ্ঠ বাহু দুইটা উন্মুক্ত হয়ে আছে। অনেক দিন চুল না কাটায় আহিয়ানের চুলগুলো এবার অনেকটা বড় হয়েছে। জবে থাকলে হয়তো চুলগুলো এতো বড় হতে পারতো না ।রোদেলা আহিয়ানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।আহিয়ান রোদেলার দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারলো রোদেলার দৃষ্টি তার উপরেই আঁটকে আছে। আহিয়ান গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বউের মুখেরদিকে তাকালো। আহিয়ানের সাথে চোখাচোখি হতেই রোদেলা দৃষ্টি সরিয়ে বিছানার অপর পাশে চলে গেল। আহিয়ান বাঁকা চোখে দেখলো সবটা।
রোদেলা বিছানায় বসতে বসতে তার বিপরীত পাশে থাকা আহিয়ানের দিকে তাকালো। বলা তো যায় না আজ আবার এখানে থাকতে আসার জন্য এই রগচটা লোকটা তাকে ধমক দিয়ে বসে কি? কিন্তু আহিয়ান কিছু না বলে চুপচাপ ল্যাপটপ রেখে দরজা লাগিয়ে লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে পরলো। রোদেলা আহিয়ানকে আজকে কিছু না বলে এতোটা শানত থাকতে দেখে ভড়কালো।রোদেলা অন্ধকারে হাতটা বিছানায় হাতরে বালিশ ঠিক করে নিজেও আহিয়ানের পাশে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পরলো।
প্রায় বিশ মিনিট পেরিয়েছে রোদেলার চোখে কিছুতেই ঘুম আসছে না। রোদেলা বারবার হাসফাঁস করছে কেবল। অন্ধকারের মাঝেই রোদেলা কয়েকবার আহিয়ানের বলিষ্ঠ পিঠের দিকে তাকালো,আহিয়ান উল্টো পাশ ফিরে শুয়ে আছে।
রোদেলাকে না ঘুমিয়ে ছটফট করতে দেখে আহিয়ান রোদেলার দিকে ফিরে কাত হয়ে শুয়ে,রোদেলার চোখের দিকে তাকালো। আহিয়ানকে হঠাৎ নিজের দিকে ফিরে এভাবে তাকাতে দেখে রোদেলা লজ্জা পেয়ে আহিয়ানের কাছ থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে সরে যেতে নিল।তখনি আহিয়ান খপ করে পিছন থেকে রোদেলার সরু কোমর খানা নিজের বলিষ্ঠ হাতে জড়িয়ে ধরলো। আহিয়ানের পুরুষালি শক্ত হাতের ছোঁয়া পেয়ে রোদেলা থমথম খেয়ে লজ্জায় কাচুমুচু করে উঠলো। রোদেলা কিছু বলবে আর আগেই আহিয়ান রোদেলার কোমর জড়িয়ে রেখেই রোদেলাকে এক টানে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে ফেললো। রোদেলার মেয়েলী কোমল পিঠটা আহিয়ানের বলিষ্ঠ পুরুষালী বুকের সাথে গিয়ে ধাক্কা খেল। রোদলার ছোট বুকটা এই অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ধক করে উঠলো।
চলবে….
( দেরি হওয়ার জন্য দুঃখিত। অসুস্থতার জন্য গল্প দিতে পারিনি। সবাই রেসপন্স করবেন। আর পেইজের রিভিউ অপশনে ঢুকে গল্পে সম্পর্কে ভালো লাগা খারাপ লাগা জানিয়ে যাবেন। )

