#অভিমাননামা
#md_shifu/২য় পর্ব
সাজেদ ভাই, আপনার প্যান্ট ফাটা দেখা যায়!”
কথাটা বলেই হো হো করে হেসে উঠলো চাঁদ।
হঠাৎ এমন কথা শুনে পুরো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সাজেদ।
মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের ভাব পাল্টে গেল। হতভম্ব হয়ে তাড়াতাড়ি নিজের প্যান্টের এদিক-ওদিক হাত দিয়ে দেখতে লাগলো কোথায় ফেটেছে।
সাজেদের সেই অস্থির খুঁজাখুঁজি দেখে চাঁদ ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছে। তার চোখেমুখে স্পষ্ট দুষ্টুমি ঝিলিক দিচ্ছে।
সাজেদ কয়েকবার দেখে নিশ্চিত হলো কোথাও কিছু ফাটেনি। তারপর সন্দেহভরা চোখে চাঁদের দিকে তাকাতেই দেখলো মেয়েটা শয়তানি মার্কা হাসি দিচ্ছে।
আর তখনই বুঝতে বাকি রইলো না সে আবারও চাঁদের কাছে গোল খেয়েছে!
সাজেদ রাগে দাঁত চেপে বলল,
“আমি এখন বাহিরে যাবো আর তুই আমার সাথে ফাজলামি মারাচ্ছিস?!”
সাজেদ ক্ষেপেছে বুঝতে পেরেই দৌড় দিল উঠান পেরিয়ে। দৌড়াতে দৌড়াতেই হাসতে হাসতে বলল,
“হায় আল্লাহ! সাজেদ ভাই সত্যি সত্যি খুঁজতেছিল!”
ওর হাসি দেখে সাজেদের মাথা পুরোপুরি গরম হয়ে গেল।
“চাঁদ!”
সাজেদের সেই চিৎকারে পুরো বাড়ি কেঁপে উঠলো যেন। ঘরের ভেতর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল রাহেলা। মুখে চিন্তার ছাপ।
“কি হইছে সাজেদ? এমন করে চিৎকার করতেছস কেন?”
সাজেদ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“কেন চিৎকার করতেছি তা তোমার ওই আদরের চাঁদ কে জিজ্ঞেস করো!”
একটু থেমে আবার দাঁত চেপে বলল,
“ওই ইতর, বদমাশ, ফাজিলটারে মানা করে দিবে ডাইরেক্ট আমার সামনে যেন না পড়ে। পড়লে একদিন মেরে নদীতে ভাসায় দিবো!”
কথাটা শুনে চাঁদের খারাপ লাগলেও আরো ক্ষেপানোর জন্য হেসে ফেললো।
রাহেলা বিরক্ত মুখে বললেন,
“আহ্ চাঁদ! তুই আবার কী করলি?”
চাঁদ হাসতে হাসতেই বলল
“আমি কিছু করি নাই মামি। একটু মজা করছি শুধু!”
“এইটারে তোর মজা লাগে?” সাজেদ গর্জে উঠলো।
চাঁদ এবার ভেংচি কেটে বলল,
“আপনারে রাগাইতে অনেক মজা লাগে সাজেদ ভাই!”
কথাটা শুনে সাজেদ আবারও রাগে তাকালো তার দিকে।
আর চাঁদ?
সে তখনও হেসেই চলেছে। যেন এই রাগী ছেলেটাকে ক্ষেপানই তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় কাজ।
……….
সাজেয়া আর সাজেদের বাবা বহু বছর ধরে বিদেশে কাজ করেন। দুই-এক বছর পর পর একবার বাড়িতে আসেন। ছোটবেলায় সংসারের অবস্থা খুব একটা ভালো না থাকলেও এখন আর তেমন কষ্ট নেই। খুব বড়লোক না হলেও আল্লাহর রহমতে টাকা-পয়সার অভাবও নেই তাদের।
বিদেশে থেকে সাজেদের বাবা যথেষ্ট কষ্ট করেছেন বলেই আজকে সংসারটা স্বচ্ছলভাবে চলছে। গ্রামের মধ্যে তাদের পরিবারকে এখন সবাই সম্মানের চোখেই দেখে।
সাজেদের মাস্টার্স শেষ হয়েছে কয়েক মাস আগেই। এখন বিভিন্ন কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিচ্ছে সে। যদিও এখনও চাকরি হয়নি, তবুও সে হাল ছাড়েনি। প্রতিদিন নতুন নতুন জায়গায় সিভি পাঠাচ্ছে, ইন্টারভিউ দিচ্ছে আর নিজেকে প্রস্তুত করছে।
তবে সাজেদের আসল স্বপ্ন অন্য জায়গায়।
সে চাকরি করতে চায় ঠিকই, কিন্তু সারাজীবন অন্যের অধীনে কাজ করার ইচ্ছে তার নেই। তার স্বপ্ন নিজের একটা ব্যবসা দাঁড় করানো। নিজের পরিচয়ে সফল হওয়া।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সে ব্যবসাটা নিজের টাকায় করতে চায়। চাইলেই বাবার কাছে টাকা চাইতে পারতো। সাজেদের বাবা ছেলের জন্য টাকা দিতে নিশ্চয়ই না করতেন না। কিন্তু সাজেদের আত্মসম্মান আর ব্যক্তিত্বটা একটু আলাদা। সে মনে করে, নিজের স্বপ্ন নিজের পরিশ্রমের টাকাতেই পূরণ করা উচিত।
তাই আপাতত তার পরিকল্পনা হলো আগে একটা ভালো চাকরি করবে। কিছু টাকা জমাবে। সেই সাথে ব্যবসা সম্পর্কে শিখবে, মার্কেট বুঝবে, রিসার্চ করবে।
কারণ শুধু “ব্যবসা করবো” বললেই ব্যবসা করা যায় না। ব্যবসায় নামার আগে ধৈর্য লাগে, অভিজ্ঞতা লাগে, হিসাব বুঝতে হয়। কোন জিনিসের চাহিদা আছে, কোথায় লাভ, কোথায় ঝুঁকি সব জানতে হয়। আর সেই কারণেই সাজেদ এখন নিজেকে সময় দিচ্ছে।
চাকরি করবে, শিখবে, টাকা জমাবে তারপর একদিন নিজের স্বপ্নটা বাস্তবে রূপ দিবে।
………
“মা, আমি আজকে শহরে যাচ্ছি একটা ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য। শহরে কিছু কাজও আছে। সব শেষ করে ফিরতে ফিরতে হয়তো রাত হয়ে যাবে। তোমরা খেয়ে নিও। আর ওই চাঁদ নাকি পাদ যাই হোক তাকে মানা করে দিবা আমার রুমে যেন না ঢুকে।”
নাস্তা করতে করতেই কথাগুলো বলে গম্ভীর মুখে উঠে দাঁড়ালো সাজেদ।
রাহেলা ভ্রু কুঁচকে বললেন,
— “চাঁদ কি তোর রুমে গিয়ে কিছু করছে নাকি?”
সাজেদ পানির গ্লাসটা টেবিলে রেখে বিরক্ত গলায় বলল,
“ও কিছু না করলেও সমস্যা, কিছু করলেও সমস্যা। ওই মাইয়ারে আমি বিশ্বাস করি না।”
পাশেই বসে নাস্তা খাচ্ছিল চাঁদ। সাজেদের কথা শুনে খারাপ লাগলো কিনা বুঝা গেলো না তবে পাল্টা কিছু বলতে এক সেকেন্ড ও সময় নিলো না।
“উফফ! আমাকে নিয়ে এত ভয় কেন সাজেদ ভাই? আপনার রুমে কি গুপ্তধন রাখা আছে নাকি?”
সাজেদ কটমট করে তাকালো তার দিকে।
“তোরে আমি ভয় পাই? তুই আমার রুমে ঢুকবি না, ব্যাস!”
চাঁদ এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“আহারে! মানুষটা আমাকে একদমই সহ্য করতে পারে না!”
সাজেয়া পাশে বসে হাসি চাপার চেষ্টা করছে।
রাহেলা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোরা কি সারাক্ষণ ঝগড়া ছাড়া আর কিছু পারিস না?”
কেউ কোনো উত্তর দিল না। সাজেদ ব্যাগটা কাঁধে তুলে দরজার দিকে হাঁটতে লাগলো। বের হওয়ার আগে একবার ঘুরে আবারও বলল,
“মা, আমার কথা মনে থাকে যেন।”
চাঁদ মনে মনে বলে
” ঘরে ঢুকতে মানা করতেছে হু আমি যেনো তার কথা শুনবো। একশো বার ঢুকবো। আমার মনের ভিতর ঢুকে বসে আছে আবার আমাকে মানা করতেছে রুমে না ঢুকতে।
…….
দুপুরে সবাই ভাত খেয়ে যে যার রুমে ঘুমাতে চলে গেল। পুরো বাড়িটা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এলো। বাইরে শুধু মাঝে মাঝে গরম হাওয়ায় টিনের চাল কাঁপে, আর দূরে কোথাও একটা কোকিল ডেকে উঠছে।
কিন্তু চাঁদের চোখে ঘুম নেই।
বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় উঠে বসলো সে। তারপর ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে বের হলো। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিশ্চিত হলো সবাই ঘুমিয়ে আছে।
তারপর নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল সাজেদের রুমের সামনে। দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকলো চাঁদ।
রুমটায় হালকা একটা ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে। হয়তো সাজেদের পারফিউমের গন্ধ। ছোট্ট বুকশেলফ, টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা বই, দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ি সবকিছুতেই কেমন যেন সাজেদের উপস্থিতি লেগে আছে। চাঁদ ধীরে ধীরে গিয়ে সাজেদের বিছানায় শুয়ে পড়লো।
তারপর ছাদের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে ফিসফিস করে বলতে লাগলো
“ছোটবেলায় তো কতজন কত কিছুই করে। অনেকেই ভালো থাকে, অনেকেই খারাপ থাকে। এইসব ধরে বসে থাকলে কী হয়, সাজেদ ভাই?”
একটু থামলো সে।
চোখ দুটো কেমন যেন ধীরে ধীরে ভিজে উঠছে।
“মানুষ বড় হলে পরিবর্তন হয়। আপনি যদি একটু চোখ খুলে দেখতেন তাহলে বুঝতেন আমিও বদলাইছি।”
চাঁদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“সেই ছোটবেলা থেকে আপনি আমারে শুধু ঘৃণাই করে গেলেন। অথচ কিশোরী বয়সে কখন যে আপনি আমার মনের ভিতর ঢুকে বসে আছেন সেটা আমি নিজেও বুঝি নাই।”
মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে হাসার চেষ্টা করলো। কিন্তু সেই হাসির মাঝেও কষ্ট লুকানো।
“অনেক চেষ্টা করছি আপনাকে মন থেকে নামাইতে। পারি নাই। উল্টো যত বড় হইছি তত বেশি আপনার দিকে টান অনুভব করছি।”
জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস এসে চাঁদের চুল উড়িয়ে দিল।
সে চোখ বন্ধ করে আবার ধীরে ধীরে বলল—
“কি করলে বুঝবেন আমি আগের মতো নাই? সবসময় শুধু আমার জ্বালানোটা দেখলেন ভালোবাসাটা দেখলেন না।”
কথাগুলো বলার পর কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ শুয়ে রইলো চাঁদ। রুমের নিস্তব্ধতার মাঝেও তার বুকের ভেতরের শব্দ যেন পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।
…………..
“একটা ছেলে মনের আঙিনাতে
ধীর পায়েতে এক্কাদোক্কা খেলে।
মন পাহাড়ি ঝরণা খুঁজে,
বৃষ্টি জলে একলা ভিজে…”
মিষ্টি সুরে গাইতে গাইতে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল চাঁদ। তার কণ্ঠে এমন একটা নরম আবেশ ছিল, যেন রাতের নিস্তব্ধতার মাঝেও গানটা ধীরে ধীরে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে।
রাতের খাবার শেষ করে সাজেয়া, রাহেলা আর চাঁদ একসাথে গল্প করতে বসেছিল। গ্রামের রাতগুলো এমনিতেই শান্ত। দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, হালকা বাতাসে দুলতে থাকা বাঁশঝাড়ের শব্দ সব মিলিয়ে চারপাশে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে আছে।
সাজেয়া অনেক আগে থেকেই জানে চাঁদের গানের গলা খুব সুন্দর। তাই গল্পের মাঝেই হঠাৎ বলে উঠেছিল
“চাঁদ, একটা গান গা না!”
প্রথমে একটু না না করলেও পরে সাজেয়ার জোরাজুরিতে রাজি হয়ে যায় চাঁদ। তারপর ধীর কণ্ঠে গানটা গাওয়া শুরু করে।
“সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে…
সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে…”
ঠিক তখনই দরজায় লাগানো পর্দার ওপাশে কারো ছায়া দেখতে পেল চাঁদ। আর বুঝেও পেলে সেটা কে হতে পারে এটা। বুঝতে পেরেই হালকা হেসে উঠে।
সাজেদ ঘন্টাখানেক হবে আসছে। এসে ভাত খেয়ে শুয়েছিলো তবে পানির তৃষ্ণা পেলে পানি খেতে বের হয়। ঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদের গানের শব্দ কানে আসতেই অজান্তেই থেমে যায় সে।
মেয়েটা এত সুন্দর গান গাইতে পারে, সেটা সে কখনো খেয়ালই করেনি। আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো চাঁদের কণ্ঠ শুনতে তার খারাপ লাগছিল না। বরং অনেকদিন পর হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন অচেনা একটা শান্তি অনুভব করছিল সে।
কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজের ভাবনায় বিরক্ত হয়ে গেল সাজেদ।
“ধুর! আমি এসব কী ভাবতেছি!” বিরক্ত মুখে দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল সে। অথচ চাঁদের গানের লাইনগুলো তখনও কানের ভেতর ঘুরে বেড়াচ্ছিল
“সেই ছেলেটা আমায় ছুঁয়ে ফেলে”
চলবে…..
বি:দ্র: সবাই পড়ে থাকলে রেসপন্স করবেন। আর কোথাও ভুল হলে জানাবেন। নতুন লিখতেছি তাই অনেক ভুল হতেই পারে। ভালো লাগলে অন্য কে পড়তেও সাহায্য করুন

