মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১২ ]

0
1

#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১২ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি

আহিয়ানের দাদার নাম আমির আহমেদ। তার স্ত্রীর নাম আলফিনা বেগম। আমির আহমেদের চার ছেলে আর দুই মেয়ে।বড় ছেলের নাম আজাদ আহমেদ।
বড় ছেলে আজাদ আহমেদে’র স্ত্রীর নাম আইরিন আহমেদ।তাদের দুই ছেলে এক মেয়ে।বড় ছেলের নাম তৌফিক আহমেদ তুষার।ছোট ছেলের নাম সায়ান আহমেদ শিবলী। তাদের তিন সন্তানের মাঝে সবার ছোট হচ্ছে মেয়ে। যার নাম নাজনীন সুলতানা তৃষ্ণা। তৃষ্ণা অনার্স ১ বর্ষের শিক্ষার্থী।
তুষারকে গতবছর ধরে বেঁধে বিয়ে করানো হয়েছিল।তার বিয়ের একবছর পেরিয়েছে।তুষার এর বউের নাম আফরিণ মাহি।

আমির সাহেবের মেজো ছেলের নাম জাবির আহমেদ। যিনি আহিয়ান,অন্বেষা আর অবন্তির বাবা।

আমির সাহেবের সেজো ছেলের নাম মাহমুদ আহমেদ।মাহমুদের স্ত্রীর নাম জয়া আহমেদ।তাদের এক ছেলে এক মেয়ে।ছেলে তাজরিয়ান আহমেদ অর্ণ বুয়েটে পড়াশোনা করছে।মেয়ে মেহনূর মীরা ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে।

আমির আর তার স্ত্রী আলফিনা তিন ছেলের পর দুই জময মেয়ের দেখা পেয়ে ছিলেন । তাদের দুই মেয়ের চেহারাও হুবুহু এক রকম।তাদের নাম রাদিয়া আহমেদ আর রুবা আহমেদ।রাদিয়া আর রুবার বিয়ে হয়েছে প্রায় আঠারো বছর।এক দিনেই দুই বোনের বিয়ে হয়েছিল।

রাদিয়ার স্বামীর নাম সাহাব মীর্জা।রাদিয়ার দুই ছেলে। তাদের নাম তানিম আর তূর্য।তানিমের বয়স পনেরো।সে ক্লাস নাইনে পড়ে।তূর্যের বয়স দশ।তূর্য ক্লাস ফাইবে পড়ে।

রুবার স্বামীর নাম তুরাব চৌধুরী। রুবা এখনো নিঃসন্তান।বিয়ের এতো গুলো বছর পাড় হওয়ার পরেও তিনি আর তার স্বামী সন্তানের মুখ দেখতে পারলেন না।

আমির সাহেবের সবার ছোট ছেলের নাম আরভিদ আহমেদ।আহিয়ান আর শিবলীর থেকে আরভিদ মাত্র এক বছরের বড়।তিন চাচা-ভাতিজা ছোট থেকে এক সাথেই বড় হয়েছে।

___________________

গাড়ি থেকে নেমে রোদেলা কাচুমুচু করে দাড়ালো। এখানে সে কাউকেই চেনে না। রোদেলা মাথা উঁচিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলো বাড়ির মহিলারা আর বাচ্চারা সবাই তাদের দিকেই ছুটে আসছে।রোদেলা নিজের পিছনে বলষ্টি পুরুষালী বুকের অস্তিত্ব উপলব্দি করতেই পিছনে তাকিয়ে দেখলো আহিয়ান গাড়ি থেকে নেমে তার পিছনে এসে দাড়িয়েছে। রোদেলা আহিয়ানের উপস্থিতি লক্ষ‍্য করেই লজ্জায় মাথা নত করে, দ্রুত কেটে পরতে চাইলো।
বিধায় বৃষ্টির কারণে বাড়ির পিচ্ছিল উঠানে অসাবধানতা বসত পা ফেলতেই রোদেলা পড়ে যেতে নিল।আহিয়ান তৎক্ষনাৎ রোদেলার একটা হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো।রোদেলাও ভয় পেয়ে সঙ্গে আহিয়ানের একটা হাত খামচে ধরলো।রোদেলা আহিয়ানের দিকে তাকাতেই দেখলো আহিয়ান তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তখনি পিছন থেকে এই সিনেমাটিক দৃশ‍্য দেখে শিবলী শিস বাজিয়ে উঠে।দুষ্টমি করে শিবলী গলা ছেড়ে গান ধরলো-
চোখে চোখে দেনারে ইশারা…
তোর লাগি মনতো পাগল পাড়া
কি জানি কি দিয়া মন নিলি
ভালোতো লাগেনা তুই ছাড়া…

বাড়ির সবাই ড‍্যাব ড‍্যাব করে আহিয়ান আর রোদেলাকে পরখ করছিল। এর মধ‍্যে শিবলীর গলায় এমন একটা গান শুনে সবাই শব্দ করে হেসে দিল। আহিয়ানের দুই বোনও মুখে আঁচল চেপে হাসি আটকাতে ব‍্যস্ত। আহিয়ানদের অন‍্য গাড়িটাও ততোক্ষণে ভিতরে ঢুকে গিয়েছে।মাশরিফা,আফিয়া আর জাবির গাড়ি থেকে নেমে সামনে তাকিয়েছে মাত্র, তখনি শিবলীর মুখে এমন গান শুনে থমথম খেয়ে তারাও সামনে তাকাতেই রোদেলা আর আহিয়ানকে দেখতে পেল। শিবলীর অদ্ভুত ধাচের গানে তারাও না হেসে পারলো না।

বাড়ির সবাই রোদেলাকে ঘিরে ধরে দাড়ালো।নতুন বউকে সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে গেল ভিতরে।বাড়ির ছোট সদস‍্যরা নতুন বউের সাথে কথা বলতে ঘুরঘুর করছে। তৃষ্ণা আর মেহনূর রোদেলাকে হাতে ধরে একটা ছোফায় বসিয়ে দিয়েছে।রোদেলা এক এক করে বড়দের সবার সাথে পরিচয় হয়ে তাদের সালাম করছে।মাশরিফা নিজের শাশুড়ির পাশে বসে রোদেলাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সবার বেশ পছন্দ হয়েছে এই এক রত্নি মেয়েটাকে। রোদালা স্বভাব সুলভ ভীষণ কোমল। বিধায় সহজেই সবার সাথে মিশে গেল।বাড়ির পুরুষরা এখনও কেউ বাড়িতে ফেরেনি। আহিয়ান, শিবলী আর জাবির সাহেবও এখানে আসার পর বাজারে গিয়েছে।গরু আগে থেকে দুইটা কেনায় আছে আজ আরও একটা কিনবে তারা।দুইটা আগে থেকে কিনে রাখা হলেও বাড়িতে আনা হয়নি।আজকেই
আনা হবে ।

রোদেলার খালি হাত দুটো দেখে আহিয়ানের দাদি আলফিনির ভালো লাগলো না।তিনি মাশরিফাকে বললেন,
” ও মেজো বউ,আমার নাত বউ এর হাত খালি কেন? হাতে কিছু পরতে দাও নাই নাকি? ”

মাশরিফা শাশুড়ির কথায় হেসে বললেন,
” ওর জন‍্য হাতের বালা এক জোড়া বানাতে দিয়েছিলাম। এখনো বানানো হয়নি আম্মা। ”

” তোমরা যে কি করো না।”
রোদেলার হাত টেনে উঠে দাড়ালেন আলফিনা।রোদেলাকে বললেন,
” আয় বোইন। তুই আমার ঘরে আয়।”

রোদেলা মাশরিফার দিকে তাকাতেই,মাশরিফা চোখে ইশরা দিয়ে যাওয়ার আদেশ দিতেই রোদেলা দাদি শাশুড়ির পিছু পিছু গেল। তার পিছু পিছু তৃষ্ণা,মেহনূর আর আফরিণও গেল।

গত বছর তুষার এর বিয়ের পর আলফিনা বেগম তার কর্তাকে দিয়ে চার নাত বউ এর জন‍্য চার জোড়া বালা বানিয়ে তুলে রেখেছিল। আফরিণেরটা বিয়ের পরপর তিনি নিজ হাতেই বড় নাত বউকে পরিয়ে দিয়েছিলেন।
আহিয়ানের বউেরটা এতোদিন তুলায় ছিল।আজ তিনি রোদেলাকে সেগুলো নিজ হাতে পরিয়ে দিলেন।রোদেলা
আমত আমতা করে বলল,
” কি করো দাদি?এতো ভারি বালা আমাকে দিচ্ছ কেন? আমি এটা নিতে পারবো না। ”

আলফিনা ধমকে উঠলেন,
” চুপ কর মাইয়া।এটা আমার নাত বউরে দিছি।আমার সব নাত বউের হাতে এমন বালা থাকবে বুঝেছিস। ”

রোদেলা ছোট বাচ্চাদের মতো মাথা নাড়িয়ে কেবল জানালো,
” বুঝেছি”

আহিয়ানের নানুমনি আফিয়াও এসে হাজির হলো বেয়াইনের ঘরে।আলফিনা তাকে হাতে ধরে নিজের পাশে বসালেন। তৃষ্ণা আর মেহনূর দুষ্টুমি করে বলল,
” উহুমম….শুধু নাত বউদের জন‍্যই যতো দরদ বুড়ির।আমাদের নাতনিদের তো চোখেই পরে না। ”

আলফিনা মুখ বাকিয়ে বলল,
” তোদের যে গলার চেইন বানিয়ে দিলাম।সেটা গেল কোথায়রে হিংসুটে মা** ”

সবাই হেসে ফেলল।মেহনূর মুখ বাকিয়ে বলল,
” যাও বুড়ি। ”

” কি? আমারে বুড়ি কইলি?”

তৃষ্ণা খিলখিল করে হেসে বলল,
” না তোমাকে বলবে কেন? তুমি তো ষোল বছরের যুবতী।”

অন্বেষা আর অবন্তিও এসে হাজির হলো এখানে।অবন্তি জয়কে ঘুম পারিয়ে রেখে এসেছে।অন্ত তার মামার সাথে বাজারে গিয়েছে।অনন‍্যা অন্বেষার আঙুল ধরে মায়ের পিছু পিছু হাটছে।অন্বেষারা দরজার চ‍ৌকাঠের সামনে এসেই তৃষ্ণার কথায় হো হো করে হেসে দিল। রুমের বাকি সবাইও আরেক দফায় হেসে ফেলল। মাশরিফা,আইরিন আর জয়া রান্না ঘরে ব‍্যস্ত সময় পাড় করছে। তাই তারা এখানে যোগ দিতে পারছে না।

____________________

রাত দশটায় বাড়ির পুরুষ সদস‍্যরা সবাই বাড়ি ফিরেছে।আহিয়ানকে হুট করে বিয়ে করিয়ে ফেলার জন‍্য প্রথম প্রথম আমির সাহেব আর তার বাকি দুই ছেলে একটু রেগে থাকলেও মাশরিফা আর জাবির এর মুখ থেকে সব শুনার পর তাদের রাগ গলে গিয়েছে।আমির সাহেবের নাত বউকে বেশ পছন্দ হয়েছে। তিনি নাত বউকে দেখেই খুশি হয়ে পকেট থেকে পাঁচটা এক হাজার টাকার নোট বের করে নতুন বউ এর হাতে গুজে দিয়েছে।রোদেলা বাড়ির লক্ষ্ণী বউ মতো সবার জন‍্য লেবুর শরবত করেছে।সবাইকে লেবুর শরবত খাইয়ে রান্না ঘরে আসতেই আলফিনা বেগম বললো,
” যা এবার, আমার দাদু ভাইয়ের জন‍্য শরবতটুকু নিয়ে যাতো নাত বউ। ”

রোদেলার গলা শুকিয়ে এলো। হাত পা অস্বাভাবিক ভাবে কেঁপে উঠলো।রোদেলা শুকনো মুখে একবার দাদী শাশুড়িকে দেখে নিল।আহিয়ান বাড়িতে ফিরেই গটগট করে নিজের রুমে চলে গিয়েছিল।এখনও নিচে নামেনি তাই তো আলফিনা রোদেলাকে লক্ষ্ণী বউ এর মতো স্বামীর কাছে যেতে আদেশ করছে।রোদেলা জড়তা সংশয়ে ঢুক গিলল।ও বাড়ির সবাই আহিয়ান আর রোদেলার সম্পর্ক কেমন তা জানলেও এ বাড়িতে সবার কাছে সবটা অজানা।তাই তো আলফিনা তার নাতনির রুমে লক্ষ্ণী বউ সেজে স্বামীর সেবা করতে যেতে বলছে। কিন্তু তিনি তো আর জানেন না আহিয়ান আর রোদেলার সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়।রোদেলা মনে মনে বিড়বিড় করলো,
” দাদি গো! তুমি যেই ভাল্লুক মহাশয় এর কাছে আমাকে যেতে বলছো,সে তো আমাকে দুই চোখে সহ‍্য করতে পারে না। যদি রেগে গিয়ে আমাকে বকে পুরো বাড়ি মাথায় তোলে তখন? ”

তবে রোদেলা আলফিনাকে কিছু বলতে পারলো না। তার মনের কথা মনেই রইয়ে গেল।আলফিনার তাড়া খেয়ে রোদেলা আহিয়ানের রুমের দিকে পা বাড়ালো।এই বাড়িটা দুই তলা বিশিষ্ট প‍্যাঁচানো বাড়ি।মাঝখানের পুরো এরিয়ার নিচতলা জুড়ে বিশাল বৈঠকের ব‍্যবস্থা।আহিয়ানের রুম উপরের তলায় একদম কর্ণারে।রোদেলা রুমের সামনে এসে দরজয় টুকা দিতেই ভিতর থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে এলো,
” কাম ইন ”

রোদেলা দরজাটা এক হাতে ধাক্কা দিয়ে খুলে, পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকলো।আহিয়ান গরমের জন‍্য শুধু একটা স‍্যান্ডো গেঞ্জি আর কালো টাওজার পরে বিছানায় কাত হয়ে শুয়েছিল।রোদেলাকে শরবত হাতে রুমে প্রবেশ করতে দেখে আহিয়ান উঠে বসলো।আহিয়ানকে উঠে বসতে দেখেই রোদেলা আবারও জমে গেল।আহিয়ানের চোখ না চাইতেও রোদেলার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।রোদেলা ছটফট করছে,বিষয়টা বুঝতে অসুবিধা হলো না আহিয়ানের।আহিয়ান আবার ফিরে এসে বিছানায় ধপ করে বসে পরলো।আহিয়ান রোদেলার দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল নিজের পায়ের বুড়ো আঙুল বরাবর।সেদিকে তাকিয়েই আহিয়ান মুখ খুলল,
” কবুতর এর মতো ছটফট করার কারণটা কি জানতে পারি? আমি কাছে গেলেই এভাবে ছটফট করছো কেন?গতকালে যেটা হয়েছিল সেটা আমার অজান্তে ঘটেছে। সো বি নরমাল। তোমার এরকম উদ্ভট আচরণ আমাকেও অপ্রস্তত করে দিচ্ছে। ”

আহিয়ানের কথায়া রোদেলা কিছু না বলে মাথা নুইয়ে রাখলো।রোদেলাকে কোনো কথা বলতে না দেখে আহিয়ান বিরক্তি হলো।আচমকা বাজখায় গলায় বলল,
” সামন‍্য একটু অযাচিত ছোঁয়াই মরে যাচ্ছো।যদি আমি স্বামীর অধিকার খাটিয়ে আরও ছুঁইয়ে দিতাম তখন কি করতে মেয়ে? ”

রোদেলার আর সহ‍্য হলো না।ছোট বুকটা অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে তার।রোদেলা শরবতের গ্লাসটা বেড সাইডের টেবিলে রেখে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।আহিয়ান এটা দেখে আরও রেগে গেল।অতিরিক্ত রাগে হাতের মুষ্টি পাঁকিয়ে বললো,
” বালের একটা বিয়ে করেছি। বউ এখনো আন্ডা থেকেই ফুটে নি। সারাদিন মুরগির বাচ্চার মতো টইটই করে ঘুরে, আর হাসাহাসি করে। কই তখন তো কোনো কাঁপাকাপি দেখিনা। আমার সামনে আসলেই যতসব ভাব
বেড়ে যায়। ”

________

রাতে সবাই একসাথে ডিনার করতে বসেছে।শিবলীর বাবা সবে ভাতের একটা নলা মুখে তুলতে নিচ্ছিল তখনি শিবলী বলল,
” বাবা আমার কি বিয়ে হবে না? ”

শিবলীর কথায় সবাই খাওয়া রেখে শিবলীর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।শিবলীর বাবা আজাদ সাহেব প্রথমে কথাটা বুঝেও ভুল শুনেছে ভেবে আবার জিঙ্গাসা করলো,
” কি বললে? ঠিক বুঝতে পারলাম না? ”

শিবলী নির্লজ্জের মতো হাসি দিয়ে বলল,
” আরে বাবা বলেছি, আমার কি বিয়ে হবে না? ”

আজাদ সাহেব ছেলের মুখে নির্লজ্জের মতো নিজের বিয়ের কথা নিজেকে বলতে দেখে থমথম খেয়ে কেঁশে উঠলো।আরভিদ তার ভাইয়ের দিকে পানি এগিয়ে দিয়ে শিবলীকে বললো,
” হারামজাদা চাচাকে রেখে বিয়ে করে ফেলবি?তুষার না হয় আমার তিন বছরের বড় তাই করেছে।আহিয়ানেরটা ভিন্ন বিষয়। তবে এবার আমার আগে তোকে বিয়ে করতে দিচ্ছি না ভাতিজা। ”

আহিয়ান ছোট চাচার কথায় তার চাচার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।শিবলীর আর আরভিদের কথায় ডাইনিং টেবিলে রীতি মতো একটা বোম ব্লাস্ট হয়েছে।আমির সাহেব ছোট ছেলের কথায় চোখ পাকিয়ে তাকালো।শিবলী দাদাকে এভাবে তার দিকে আর ছোট চাচার দিকে তাকাতে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বলল,
” এই বুইড়া তোমার এই ছোট মিয়ার বিয়া দাও না কেন হে? ওর জন‍‍্য আমার বিয়েটাও হচ্ছে না। ”

বাড়ির মহিলারা লজ্জায় মুখে শাড়ির আঁচল চেপে হাসি আটকালো।মেহনূর আর তৃষ্ণা আহিয়ানের ভয়ে জোরে হাসতে পারছে না।তবে মুখে ওড়না চেপে ঠিকি হাসছে।রোদেলা খাবার সার্ভ করছিল।হঠাৎ শিবলীর কথা শুনে তার হাতের চামচ থেমে গিয়েছে।

শিবলীকে বেশি লাগম ছাড়া হয়ে যেতে দেখে আহিয়ান এবার শিবলীর পিঠে থাবা দিয়ে ধরলো,
” চুপ কর হারামজাদা। খাওয়ার সময় যদি আর একটা কথা বলিস তবে পাশের বাড়ির ফেলানির সাথে তোর বিয়েটা এক্ষুনি দিয়ে দিব,বলে দিলাম। ”

আহিয়ানের হুমকিতে শিবলী চুপ করে গেল। এই আহিয়ানের বিশ্বাস নেই বাবা।পরে দেখা যাবে সত‍্যি সত‍্যিই পাশের বাড়ির ফেলানির সাথে তার বিয়ে দিয়ে দিবে।ফেলানি তাদের ছোট বেলার খেলার সাথী ছিল।মেয়েটার সারা বছর সব সময় সর্দি লেগে থাকতো। আর সেটা সব সময় নাক দিয়ে নামতে থাকতো। পুরোনো দৃশ‍্য মনে করেই শিবলীর গা ঘিনঘিন করে উঠলো।না বাবা সে আপাদত সেফ জোনে থাকতে চায়।এমনিতেই এই মেজরের মাথা গরম আছে।পরে বেশি কিছু করে ফেললে সে জানে তাকেও সবটা ভোগাবে এই ইতরটা।

সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হতেই সবাই নিজেদের রুমে চলে গেল।

____________

রোদেলা কাচুমুমু করে মহিলাদের সাজ ঘরে বসে আছে।এই বাড়িতে মহিলাদের জন‍্য আলাদা একটা সাজ ঘরের ব‍্যবস্থা আছে।সেখানেই আলফিনা,আফিয়া রোদেলাকে বসিয়ে রেখেছে। রোদেলা আর আহিয়ানের বিবাহিত জীবন কেমন সবই আফিয়া নিজের বেয়াইনকে খুলে বলেছে। সব শুনে আলফিনা বেগম আর আফিয়া নাতি আর নাত বউকে কাছাকাছি আনার মিশনে নেমেছে।

এই মিশনে প্রথমেই আজকে রোদেলাকে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে আহিয়ানের রুমে পাঠাতে, উঠে পরে লেগেছে দুইজন।আলফিনা নিজের একটা লাল টুকটুকে জামদানি শাড়ি বের করলো। মেহনূর একটা লালটুকে ব্লাউজ নিয়ে এসেছে রোদেলাকে পরাতে। রোদেলা এদের এতো চাপাচাপিতে লজ্জায় লাল হয়ে বসে আছে। আফিয়া আর আলফিনা আর কানে কানে দুষ্ট কথা শিখিয়ে দিচ্ছে। তৃষ্ণা তার সাজার সব আধুনিক জিনিস পত্র নিয়ে হাজির হয়েছে।

গাঢ় লাল রঙের গোল্ডেন পারের শাড়িটা রোদেলার ফর্সা কোমল গায়ে বেশ মানিয়েছে।রোদেলার নারী সুলভ কোমল কায়ায় সৌন্দর্য যেন ঝলমল করছে। তৃষ্ণা আর মেহনূর মিলে সুন্দর করে সাজিয়ে দিল রোদেলাকে। সামান‍্য কাজল,লাল রঙা সফট লিপস্টিক আর পাউডার এর সামান‍্য প্রলেপে রোদেলা যেন মুহুর্তেই লাস‍্যময়ী হয়ে উঠেছে। লম্বা চুল গুলো খুলে রাখা।এই ঝলমলে লম্বা স্ট্রেইট চুলে এটা বেলি ফুলের মালা গুজে রাখা হয়েছ। সবাই রোদেলার এই আবেদনময়ী রূপ দেখে বললো,
” মাশাল্লাহ। ”

রোদেলা লজ্জা পেয়ে মাথা নুইয়ে নিল।আলফিনা আর আফিয়া রোদেলার কানে ফিসফিস করে কত কি শিখিয়ে দিল।রোদেলা দাদি শাশুড়ির আর নানি শাশুড়ির কথা গুলো শুনে লজ্জায় লাল নীল হচ্ছে।মেহনূর আর তৃষ্ণা শয়তানি করে বলল,
” আমাদেরও একটু বললনা।আমরাও শিখে রাখি। ”

আলফিনা হাত তুলে বিছানার ঝাড়ু খুঁজে বলল,
” দাড়া শিখাচ্ছি ভালো করে। ”

তৃষ্ণা আর মেহনূর দৌড়ে পালিয়ে গেল। রোদেলা মেহনূর আর তৃষ্ণাকে আপু বলেই ডাকে। যেহেতু তারা রোদেলার বড় তাই রোদেলা আপুই ডাকে। মেহনূর আর তৃষ্ণা রোদেলাকে তুমি করে বলললেও ভাবি ডাকে।একবার ভুলে দাদির সামনে মেহনূর রোদলা বলে ডাকতেই সেই ঝাড়ি খেয়েছে।তাই এখন বাধ‍্য হয়ে দুই জন রোদেলা ভাবি ডাকলেও তুমি করে সম্মোধন করে।

আলফিনা হেসে রোদেলার থুতনিতে হাত রেখে বলল,
” শোন বোইন,পুরুষ মানুষ একটু রাগী হয়ই।তবে বউ এর কাছে কিন্তু সব পুরুষই বিড়াল। বাইরে তারা সিংহ হয়ে ঘুরলেও বউ আঁচলের তলায় এসেই দেখবি কেমন বিড়াল হয়ে যায়। তাই এখন থেকেই নিজের স্বামীরে আঁচলে বাঁধতে শিখ।বুঝেছিস কি বললাম। ”

আলফিনা উঠে দাড়িয়ে রোদেলার হাত ধরে দাড় করিয়ে দিল। আফিয়াকে উদ্দেশ‍্য করে বললো,
” ও বেয়াইন উঠেন। মিশনে নামার সময় হলো। ”

আফিয়া আঁচল চেপে হাসি আটকে বললো,
” চলেন বেয়াইন।আল্লার নামে শুরু করা যাক। ”

চলবে….

( গল্প লুকিয়ে লুকিয়ে না পড়ে সবাই রেসপন্স করার চেষ্টা করবেন। 1 k হলে নতুন পর্ব আসবে। এত কম রেসপন্স দেখে গল্প লিখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here