মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৭.১ ] #মেহুলিনা_প্রাপ্তি

0
2

#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৭.১ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি

রামিশা রোদেলার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ মাখা হাসি ছুড়ে দিয়ে রোদেলাকে দেখিয়ে মেহনূরের কাছে জানতে চাইলো,
—-” তোদের বাড়ির নতুন আশ্রিতা নাকি? না মানে তোদের ফ‍্যামিলির সবাই তো উদার দিলের মানুষ। বিশেষ করে দাদা ভাই। সে তো যাকে তাকে আশ্রিতা করে
নিয়ে আসে। ”

রামিশার বিদ্রুপ মাখা শক্ত কথা গুলো শুনে রোদেলার চোখে পানি এসে পরলো। রোদেলা ঠোঁট টিপে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলো।রামিশার কথায় সবাই একে অপরের মুখে তাকিয়ে রোদেলার মলিন হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকালো।

মাশরিফা রান্না ঘরে ছিল সেখান থেকে আসার সময় রামিশার কথা শুনতে পেয়েছে।মাশরিফা কোনো কথা না বলে সোজা রোদেলার কাছে গিয়ে দাড়ালো। রোদেলার মলিন মুখটা দেখে তার ভালো লাগলো না। রোদেলার কোল থেকে জয়কে নিজের কোলে নিয়ে রোদেলার হাত ধরে রামিশার সামনে এসে দাড় করালো। রামিশা মাশরিফাকে দেখেই বললো,
—-” হ‍্যালো! আন্টি. কেমন আছেন? অনেক দিন পর আপনার সাথে দেখা হলো। ”

মাশরিফা থমথমে কন্ঠে কোন জড়তা আর ভনিতা ছাড়ায় বললো,
—-” ভালো আছি। তোবে তোমার মতো দায়িত্বশীল বুঝদার মেয়ের মুখে কিছু কথা শুনে একটু বিরক্তই হয়েছি বটে।আচ্ছা যাক সেসব কথা। ”

মাশরিফার কথা শুনে রামিশা থমথম খেয়ে তার ফুফির মুখের দিকে তাকালো। রামিশা এবার সবার দিকে তাকিয়ে দেখলো সবাই কেমন যেন একটা অসন্তুষ্টি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রামিশা আবার থমথম খেয়ে সামনে তাকালো। মাশরিফা রোদেলার একটা হাত টেনে রোদেলাকে রামাশার আরও সামনে নিয়ে এলো। রোদেলা তার শাশুড়ির দিক থেকে এবার সামনে দাড়িয়ে থাকা রামিশার দিকে এক পলক তাকিয়ে মাথা নামিয়ে রাখলো। রোদেলার বয়স কম তাই তার বুঝটাও কম।কেউ তাকে আঘাত করে কথা বললে সেটা সে সহ‍্য করতে পারে না। এখানে বিয়ে হওয়ার পর আহিয়ান মাঝে মাঝে তার সাথে একটু খারাপ ব‍্যবহার করলেও বাকিরা কোনদিন খারাপ ব‍্যবহার করেনি।বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আগলে রেখেছে সকলে। তাই আচানক অতিথির মুখ থেকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বলা কথা শুনে রোদেলার ছোট মনটা ভেঙে গিয়েছে।

মাশরিফাকে রোদেলাকে নিয়ে এতো আদিখ‍্যেতা করতে দেখে রামিশা বিরক্তিতে মুখ বাঁকালো। আসার পর থেকেই রোদেলাকে তার কাছে অসহ‍্য লাগছে। বিশেষ করে রোদেলার রুপের স্নিগ্ধতা আর সৌন্দর্য্য যেন রামিশার মনকে আরও বিষিয়ে তুলছে।রামিশা নিজেও ধবধবে ফর্সা। সে উচ্চতায় প্রায় ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি।চেহারাও দেখতে সুন্দর।অতি সাধনার ফলে বলিউডের নায়কাদের মতো একটা সুন্দর মেয়েলী শরীরের অধিকারীও সে।

তবে রোদেলার সৌন্দর্যটায় বাঙালি আনা স্নিগ্ধ একখানা ভাব আছে। যা চোখে প্রশান্তি আনে। রোদেলার হোলদেটে গায়ের রং আর ছোট গোল সুশ্রি পেলব মুখটা যেন মায়ার ভান্ডার রূপে কারুকার্য করা। এই মেয়েটার মুখের দিকে ঘন্টার ঘন্টা তাকিয়ে থাকলেও চোখে যেন ক্লান্তি আসবে না।বরং এই ছোট কিশোরীর মায়ায় পড়ে যাওয়াটাই যেন স্বাভাবিক বলে গণ‍্য হবে।

মাশরিফা রোদেলার হাত টেনে সামনে এনে গলা খাঁকাড়ি দিল। তারপর আহিয়ানের মতোই গমগমে স্বরে রামিশাকে বলতে শুরু করলো,
—-” পরিচয় করে দিই তোমাকে, ও হচ্ছে রোদেলা। আমার আহিয়ানের স্ত্রী। মানে আমার একমাত্র পুত্রবধূ।সে এই বাড়ির কোনো আশ্রিতা নয়। তার চেয়েও বড় কথা ও আমার পুত্রবধূ হওয়ার আগে আমার আরেকটা মেয়ে। ”

রামিশার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো।রামিশা রোদেলার থেকে কয়েক হাত দূরে সরে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে খানিকক্ষণ আগে তুচ্ছ‍্য তাচ্ছিল্য করা মেয়েটির দিকেই। রোদেলা মাশরিফার দিকে তাকিয়ে ছিল। সে এবার সামনে অতি আধুনিক মেয়েটার দিকে তাকালো।

রাফতান রশিদ মেয়েকে ভেঙে পরতে দেখে মেয়ের হাত ধরলেন এসে। রামিশা তার বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে বললো,
—-” উনি কি বলছে বাবা? এসব কি সত‍্যি? তুমি জানতে? প্লিজ বাবা বলো। ”

রাফতান রশিদ মেয়ের কথায় ফ্লোরের দিকে তাকালেন। এক মাত্র মেয়ের মনবাসনার কথা অজানা নয় তার। তিনি জানেন মেয়ে কি চায়। তবে আজ সে অসহায় পিতার মতো মেয়ের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখতে পারছে না।
রাফতিন রশিদ মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
—-” শান্ত হও মা । রুমে গিয়ে রেস্ট করো। ”
জয়া জোর করে ভাতিজিকে টেনে নিয়ে গেলেন। রামিশা যাওয়ার সময় রোদেলার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো। যেন রোদেলাকে এক্ষুনি কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে।মেয়েটা এমন করলো কেন? তা রোদেলার মাথায় আসছে না।

_____________

রাতে রোদেলা মেহনূরদের সাথে বসে গল্প করছিল। তখন সেখানে রামিশা এসেও হাজির হয়। মেহনূর রামিশাকে হেসে বললো,
—-” আরে আপু, আসো বসো আমাদের সাথে। ”

রামিশা খাটে না বসে একটা চেয়ার টেনে বসলো। তার পরনে একটা লেডিস লং শার্ট আর লেডিস জিন্স। শার্টখানার হাতা কুনুই পর্যন্ত গোটানো।রোদেলা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল রামিশার দিকে। মেয়েটা দেখতে একম পারফেক্ট। কিন্তু রোদেলার ছোট মাথায় এই বুঝ আসলো না মেয়েটা তাকে দেখলে এমন করে কেন?

রামিশা বসে রোদার দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ মাখা স্বরে বললো,
—-“এই মেয়ে যাও তো। আমার জন‍্য কফি
নিয়ে আসো। ”

রোদেলা থমথম খেয়ে রামিশার মুখের দিকে তাকালো। মেহনূর,তৃষ্ণা একে অপরের মুখের দিকে তাকালো।তারপর রোদেলার দিকে তাকালো। আসার পর থেকেই রামিশা রোদেলার সাথে কেমন অদ্ভুত বিহেভ করছে। যেটা তাদের দৃষ্টিও এরায়নি। মেহনূর বললো,
—-” ইয়ে মানে আপু, আমি নিয়ে আসছি তোমার কফি। মাকে বলছি বানিয়ে দিতে । ”

—-” নো ”
রামিশা চোয়াল শক্ত করে কথাটা বলেই বাঁধা দিল মেহনূরকে। তারপর আবার সে রোদেলার দিকে তাকালো অগ্নি দৃষ্টিতে, তেজ নিয়ে বিরক্ত প্রকাশ করে রোদেলাকে বললো,
—-” এই মেয়ে যাচ্ছো না কেন ? যাও এক্ষুনি, কফি নিয়ে এসো । ”

রোদেলা থমথম খেয়ে উঠে দাড়ালো। মেহনূর আর তৃষ্ণা রোদেলার মুখটার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো। রোদেলা টলমলে চোখের দৃষ্টি লুকিয়ে বেরিয়ে পরলো।রোদেলা বেরিয়ে যাওয়ার পর পর রামিশা তাড়া দেখিয়ে সে নিজেও রুম থেকে বেরিয়ে পরলো।

রোদেলা কয়েক কদম আগে ছিল রামিশার। রামিশা দ্রুত রোদেলার সামনে এসে রোদেলার একটা হাত চেপে ধরলো। রোদেলা হাতে ব‍্যথা পেয়ে বললো,
—-” কি করছেন আপু। ছাড়ুন,ব‍্যথা লাগছে আমার। ”

রামিশা দাঁতে কড়মড় করে বলল,
—-” ব‍্যথা হচ্ছে না? এর চেয়েও অধিক ব‍্যথা আমার হচ্ছে।যেই আহিয়ানকে ছোট বেলা থেকে নিজের জীবন সঙ্গি হিসাবে কল্পনা করে এসেছি, যেই আহিয়ানের জন‍্য নিজেকে বদলে আর্মিতে জয়েন করছি। সেই আহিয়ানকে কিভাবে তোর মতো রাস্তার একটা মেয়ে পেয়ে গেল বলতো? কি জাদু করে ওর গলায় ঝুলেছিস বল?
আমাদের তো সামনের বছর বিয়ে হওয়ারও কথা ছিল?পরিবারের সবাই এতে রাজি ছিল। তাহলে তুই এখানে হুট করে,ঢুকে গেলি কি করে? কি করে আহিয়ানের আম্মু মাশরিফা আন্টিকে বশ করে নিল? তোর মতো মেয়েকে কি আহিয়ানের পাশে মানায়? কি যোগ‍্যতা আছে, যা দিয়ে নিজেকে একজন মেজরের বউ বলে
পরিচয় দিবি বল? ”

রোদেলা হাতের ব‍্যথায় কুঁকিয়ে উঠলো।
—-” আমার হাতে ব‍্যথা হচ্ছে, আপু। আমার হাতটা ছাড়ুন আপনি। ”

_

রোদেলার কথায় রামিশা তেঁতে উঠে রোদেলার হাতে আরও চাপ বাড়িয়ে দিল।তখনি নিচে সদর দরজা দিয়ে আহিয়ান আর শিবলীকে ঢুকতে দেখা গেল। আহিয়ান আগে আগে প্রবেশ করেছে। আর শিবলী তার পিছন পিছন বাইকের চাবি আঙুলের মাথায় ঘুরাতে ঘুরাতে ভেতরে ঢুকলো।

আহিয়ান বাড়িতে ঢুকতেই অন্ত,অনন‍্যা জয় তাকে ঝাপটে ধরেছে। আহিয়ান বাচ্চাদের হাত ধরেই এগিয়ে গিয়ে একটা ছোফায় বসে গা এলিয়ে দিল।শার্টের উপরের দুইটা বাটন খুলে রাখলো। শিবলী এসে আহিয়ানের পাশের ছোফাটায় বসলো।

মাশরিফা আহিয়ান আর শিবলীকে দেখে রোদেলাকে ডাকতে লাগলো,
—- ” রোদেলা মা কোথায় তুই, নিচে আয় তো একটু। ”

__________

মাশরিফার গলা শুনে রামিশা কড়মড় করে রোদলার হাত ছেড়ে দিল। তারপর সে রোদেলার আগে আগে নিচে নামতে লাগলো আহিয়ানেের সাথে দেখা করার জন‍্য।
রামিশা নিচে নেমেই সোজা আহিয়ানের সামনে এসে দাড়িয়ে সম্মোহনী কন্ঠে বললো,
—-” হ‍্যালো! কেমন আছো তোমরা ? ”

আহিয়ান আর শিবলী মেয়েলী রিনরিন কন্ঠ শুনে মাথা তুলে তাকাতেই রামিশাকে দেখে দুজনেই ভ্রু কুঁচকে নিল।
আহিয়ান রামিশাকে দেখেই তৎক্ষণাৎ নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে কোলে বসে থাকা ছোট জয়ের দিকে তাকাল। জয় কোল থেকে নেমে যেতে চাইছে দেখে আহিয়ান ভাগ্নেকে কোল থেকে নামিয়ে দিল।রোদেলা কয়েকটা সিড়ি পাড় হয়ে হতভম্বের ন‍্যায় নিজের স্বামী আর রামিশার দিকে তাকিয়ে রইলো। অজনা আশঙ্কায় রোদেলার ছোট বুকটা খচখচ করতে লাগলো। তার ছোট মাথায় এখনো রামিশার কথা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে। জয় গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল রোদেলার দিকে।রোদেলা সিড়ি থেকে নেমে আহিয়ানদের থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে ছিল। জয় তার মামীর কাছে এসেই এক হাতে রোদেলার কামিজটা খামচে ধরে টান দিতে দিতে বললো,
—-” পানি কাবো। পানি দাও ”

জয়ের কথায় রোদেলার হুঁশ ফিরতেই রোদেলা জয়ের একটা হাত ধরে জয়কে নিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।

_________

শিবলী রামিশাকে দেখে বাঁকা হেসে আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
—-” এই যা মাসাক্কালিও হাজির এখানে। মনে হচ্ছে স‍্যারও এসে পড়েছেন। ”
শিবলী গলা খাঁকাড়ি দিল।তারপর বলল,
” আমরা দুজনেই বেশ আছি। তা তুমি কখন এলে? ”

আহিয়ানকে কিছু বলতে না দেখে রামিশার মনে মনে রাগ হলো।তবুও সেটা সে এক প্রকার এরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো। শিবলীর কথায় হেসে উত্তর দিল,
—- ” আমি আর ড‍্যাড বিকেলে এসেছি। ”

শিবলী মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,
—- ” স‍্যার কোথায় আছেন এখন? ”

—-” ড‍্যাড আঙ্কেলদের সাথে বাইরে বেরিয়েছে।বলেছে তোমরা আসলে তোমাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ কি একটা আলোচনা আছে। ”

তখনি সেখানে রোদেলা ট্রেতে করে তিন মগ কফি নিয়ে এলো। রোদেলা চুপচাপ মাথা নিচু করে প্রথম মগটা আহিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল। আহিয়ান রোদেলার দিকে শান্ত দৃষ্টিতে এক পলক তাকিয়ে কফির মগটা নিয়ে তাতে চুমুক দিল। রামিশা এহেন দৃশ‍্য দেখে কড়মড় করতে লাগলো। রোদেলাকে এই মুহূর্তে তার কাছে বিষ মনে হচ্ছে।

রোদেলা আরেকটা কফির মগ শিবলীর হাতে দিল। শিবলী মুচকি হেসে হাতে নিল সেটা। বাকি কফির মগটা নিয়ে রোদেলা রামিশার দিকে এগিয়ে গেলে।কফির মগটা রোদেলা রামিশার দিকে বাড়িয়ে দিতেই রামিশা ইচ্ছা করেই হাতে নাড়া মেরে দোলের হাতে আর শরীরে ফেলে দিল।রোদেলার হাতে আর বুকে গরম কফি টুকু ছিটকে পরতেই রোদেলা সাথে আর্তনাত করে উঠলো,
—-” আহহ…মা গো ”

রোদেলার অস্ফুষ্ট আর্তনাত শুনে আহিয়ান তড়াক করে তাকালো রোদেলার দিকে। আহিয়ান হাতে মগটা টেবিলে রেখে দিয়ে দ্রুত রোদেলার কাছে এসে রোদেলার হাত চেপে ধরলো। রোদেলার পেলব কোমল মুখশ্রি জুড়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। আহিয়ানের বুকটা রোদেলার চোখের জল দেখে ধক করে উঠলো। আহিয়ান রোদেলার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখলো হাতটা সাথে সাথে লাল টকটকে হয়ে গিয়েছে। আহিয়ান সেটা পরখ করে একবার শক্ত দৃষ্টিতে তাকালো রামিশার দিকে। রামিশা কুটিল চোখে তাকিয়ে ছিল রোদেলার দিকে। আহিয়ানের সাথে আচমকা তার চোখাচোখি হতেই,আহিয়ানের শক্ত চাহনি দেখে রামিশা ঢোক গিললো।আহিয়ান রামিশার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রোদেলাকে আচমকা কোলে তুলে নিল। তারপর কোনো কিছু না বলে রোদেলাকে নিয়ে আহিয়ান সোজা নিজের রুমে চলে গেল। শিবলী,মাশরিফা আর রামিশা পলক ঝাপটে হা করে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। মাশরিফা রোদেলার চিৎকার শুনে দৌড়ে এসেছিল।

_________

আহিয়ান রোদেলাকে কোলে নিয়ে নিজের রুমে এসে ওয়াশরুমে ঢুকে পরলো। রোদেলা চোখের জল নাকের জল এক করে আহিয়ানের বুকে পড়ে রইলো। কফিটা ভালোই গরম ছিল। আহিয়ান রোদেলাকে শাওয়ার এর নিচে এনে কোল থেকে নামিয়ে দাড় করিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দিল। শাওয়ার থেকে পানির ধারা এসে রোদেলার গায়ে লাগতেই সে থমথম খেয়ে তাকালো আহিয়ানের দিকে। আহিয়ান রোদেলার দিকে আগে থেকেই শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। পানির ধারা রোদেলার গা ভিঁজিয়ে দিতেই রোদেলা পিটপিট করে তাকালো আশেপাশে।আহিয়ান রোদেলার শিশু সুলভ মুখশ্রিতে তাকিয়ে থেকে আচমকা নিজের হাত বাড়িয়ে দিল রোদেলার দিকে। রোদালা পানিতে ভেঁজায় তার গায়ের জামা এতক্ষণে গায়ের সাথে লাপ্টে গিয়েছে। আহিয়ানকে নিজের দিকে হাত বাড়িয়ে আনতে দেখে রোদেলা তার দুই হাত আড়াআড়ি করে বুকের উপর চেপে ধরলো। আহিয়ান সেটা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো। তারপর নিজের হাতটা রোদেলার মুখের উপর নিয়ে গেল। আহিয়ান রোদেলার মুখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো যত্ন সহকারে কানের পিছনে গুজে দিল। রোদেলার কাছাকাছি আসায় আহিয়ান নিজেও ভিঁজে যাচ্ছে। শাওয়ার থেকে পানির ধারা নেমে ভিঁজিয়ে দিচ্ছে দুই মানব-মানবীকে।

রোদেলার চোখের পাপড়ি গুলো থেকে চুয়ে চুয়ে পানি গড়িয়ে পরছে। আহিয়ান সেই মায়া মায়া চোখদ্বয়ে তাকিয়ে ঢোক গিলল। রোদেলা চোখ পিট পিট করে নিজের সামনে দাড়িয়ে থাকা লম্বা চওড়া মানুষটার দিকে এবার ভালো করে তাকালো। আহিয়ানের চুল থেকে টুপটুপ করে গড়িয়ে পরছে পানির ফোঁটা।আহিয়ানের অলিভ রঙা গায়ের রঙে পানির ফোটা গুলো স্বর্ণের ন‍্যায় ঝিলিক খেলে যাচ্ছে। রোদেলা বিমোহিত হয়ে,সেই সুদর্শন পুরুষের সৌন্দর্য দেখতে লাগলো।ভুলে গেল নিজের গায়ের যন্ত্রণাটুকু।

আহিয়ান রোদেলার গোলাপের পাপড়ির ন‍্যায় কোমল ঠোঁটদ্বয়ে তাকিয়ে ঘোরে চলে গেল যেন। আহিয়ান রোদেলার তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁটে নিজের বৃদ্ধা আঙুলি চেপে ধরে ঠোঁটের কোমলত্ব যাচাই করতে নেমে পরলো যেন। রোদেলা হাসফাঁস করে আহিয়ানের চোখের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই মিলিত হলো দুই মানব-মানবীর দৃষ্টি। আহিয়ায়ান তার সরু লম্বা নাকটা রোদেলার তীরের ফলার ন‍্যায় খাড়া নাকের ডগায় ছোঁয়ালো। রোদেলা থরথর করে কেঁপে উঠলো এতেই। আহিয়ান নিজেও ছোট বউ এর শরীরের কম্পনটুকু উপলব্দি করতে পারলো।আহিয়ান নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো।রোদেলার নাকের ডগায় নিজের নাক ঘোঁষতে ঘোঁষতে আহিয়ান চোখ বুজে ফেলল।রোদেলা ছটফট করে আহিয়ানেরে শার্টের কলার টেনে ধরে আহিয়ানকে দূরে সরাতে ধাক্কা দিল। কিন্তু ছোট হাতের দূর্বল ধাক্কায় আহিয়ানকে এক চুলও নড়ানো গেল না।

রোদেলা এবার জোর খাটিয়ে আহিয়ানের বুকে ধাক্কা দিল।আহিয়ান এবার কিছুটা সরে গেল। আহিয়ান নিজের হুঁশে ফিরতেই রোদেলার থেকে দূরে সরে দাড়ালো। রোদেলাও কাচুমুচু করতে লাগলো। আহিয়ান বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করলো। ভুলেও আর রোদেলার দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো না। আহিয়ান অন‍্যদিকে তাকিয়ে বললো,
—-” ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি কাপড় দিচ্ছি দ্রুত চেঞ্জ করে বাইরে আসো। হাতটায় ভালো করে পানি লাগিয়ে নিও ”

আহিয়ান তার কথা শেষ করে দ্রুত বাইরে চলে গেল।তারপর ওয়ার্ডরোব থেকে রোদেলার একটা থ্রিপিস বের করে ওয়াশরুমের দরজা একটু খুলে এক হাতে বাড়িয়ে দিল তা রোদেলার দিকে। রোদেলা কাঁপা কাঁপা হাতে থ্রিপিসটা নিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। আহিয়ান নিজেও ভেঁজা গা নিয়ে ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার সামনে চুপ করে ঠাঁই দাড়িয়ে রইলো। ডুবে গেল কিছুক্ষণ আগের মুহুর্ততে।আহিয়ান সেই সম্মোহিত দৃশ‍্যটুকু মনে করে দাঁতে দাঁত পিশলো নিজের। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁত কড়মড় করে নিজের উপর নিজেই রাগ ঝারতে লাগলো।

রোদেলা ওয়াশরুমের বাইরে এক পা দিতেই আহিয়ানের সাথে ধাক্কা খেল।আহিয়ানের বলিষ্ঠ শক্ত পিঠে রোদেলার মেয়েলী অবয়বের ধাক্কায় আহিয়ান সঙ্গে সঙ্গে দাঁতে দাঁত চেপে, চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। আহিয়ানের মুষ্ঠিবদ্ধ করে রাখা হাতদ্বয় আরও শক্ত হয়ে এলো।রোদেলা লজ্জায় দ্রুত সরে গেল আহিয়ানের কাছ থেকে। রোদেলা সরে দাড়াতেই, আহিয়ান রোদেলার দিকে ফিরে রোদেলা শান্ত দৃষ্টিতে একবার পরখ করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল চেঞ্জ করতে।
যাওয়ার আগে গম্ভীর গলায় বলে গেল,
—-” আমি বের হওয়ায় আগে এই রুমের বাইরে এক পা যদি দিয়েছ তো খবর আছে বলে রাখলাম। পিচ্চি বলে বস সময় ছাড় পাবে না। ”

রোদেলা আহিয়ানের ধমক মাখা বাণী শুনে আর বাইরে বের হয়নি। ছেঁকাটা বেশি হাতেই লেগেছে রোদেলার। সেটায় এখনো জ্বালা করছে। রোদেল ঠিক বুঝেছে রামিশা তার গায়ে ইচ্ছে করেই কফি ফেলেছে। রোদেলার ঠোঁট ভেঙে এলো। কেউ তার সাথে খারাপ আচরণ করলে তার খুব কষ্ট হয়। রোদেলা নিজের হাত চেপে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

আহিয়ান ঠিক পাঁচ মিনিট পর ওয়াশরুম থেকে বের হলো। তার গায়ে নেবি ব্লু রঙা একটা টাওজার।উপরের অংশে কোনো কাপড় না জড়ানোই আহিয়ানের বলিষ্ঠ হাতের মাসেলস উন্মুক্ত হয়ে আছে।অলিভ রঙা গায়ের রঙে বত্রিশ বছর বয়সি আহিয়ানকে চৎকার আকর্ষণীয় লাগছে।

আহিয়ানের গলায় একটা তোয়ালে ঝোলানো সেটার এক সাইডের অংশ দিয়েই মাথা মুছতে মুছতে সে রোদেলার দিকে এগিয়ে এলো। রোদেলা আহিয়ানের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আহিয়ান রোদেলার এই দৃষ্টি দেখে ঠোঁট বাকিয়ে বউ এর আরও কাছে এলো।
রোদেলা যেন কল্পনার জগতে চলে গিয়েছে। যেখানে তার চারপাশে আহিয়ান দাড়িয়ে দাড়িয়ে হাসছে।আর রোদেলা কেন্দ্রবিন্দুতে দাড়িয়ে সেই পুরুষকে চোখ,প্রাণ জুড়িয়ে কেবল দেখেই যাচ্ছে।

রোদেলাকে কোথাও ডুবে থাকতে দেখে আহিয়ান ভ্রু কুঁচকে নিল। আহিয়ান রোদেলার সামনে তুড়ি বাজাতেই রোদেলা ধরফড় করে কল্পরাজ‍্য থেকে বেরিয়ে বাস্তবে পদার্পণ করলো। আহিয়ানের দিকে তাকাতেই রোদেলা লজ্জায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে নিতে আমতা আমতা করলো।

আহিয়িন রোদেলাকে লজ্জা পেতে দেখে কিছু না বলে রোদেলার ডান হাতটা টেনে ধরলো। আহিয়ান রোদেলার হাতের লাল হয়ে থাকা জায়গাটায় চোখ বুলিয়ে দাঁতে দাঁত কড়মড় করলো। তারপর রোদেলার দিকে তাকিয়ে আহিয়ান আচমকা রোদেলার দুই কাঁধ চেপে ধরল।রোদেলা আহিয়ানের হাতের থাবায় পড়ে কবুতেরর ন‍্যায় ছটফট করে ঠোঁট ফুলিয়ে তাকালো আহিয়ানের দিকে। আহিয়ান মেয়েটার ঠোঁট ফুলানো দেখে হাতের জোর শিথিল করে বলল,
—-” দিন দিন বড় হচ্ছো, না ছোট হচ্ছো বলবে আমায়? ”

রোদেলা আহিয়ানের এরকম প্রশ্নে থমথম খেয়ে তাকালো। তারপর কিছু বলতে নিয়ে রোদেলা আবার চুপ করে গেল। রোদেলাকে চুপ করে থাকতে দেখে আহিয়ান এবার ধারালো আওয়াজে বলল,
—- ” এই ভুবনে অবুঝ সেজে থাকলে,নিজের ক্ষতি মেয়ে। কাউকে এতটাও ভালো মানুষি দেখাতে যেও না,যাতে সে তোমাকে দূর্বল ভেবে আঘাত করার সাহস করে বসে। ”

আহিয়ানের কথায় রোদেলা তড়াক করে আহিয়ানের চোখের দিকে তাকালো। এক মুহুর্ত মিলিত হলো দুই জোড়া চোখ একে অপরের দিকে।আহিয়ান আর কিছু না বলে উঠে পরলো। তারপর ওয়ার্ডরোব থেকে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে সেখান থেকে BurnAid Gel বের করলো।
আহিয়ান BurnAid Gel নিয়ে রোদেলার পাশে এসে কাঁধ ঘেঁষে বসে পরলো। আহিয়ানের খোলা বুকে রোদেলার হাতের বাহু লেগে আছে। আহিয়ান বসে থেকেই রোদেলার কোমরে এক হাত চেপে ধরে রোদেলাকে আরও নিজের কাছাকাছি নিয়ে এলো।তারপর একটানে রোদেলাকে নিজের কোলে বসিয়ে দিল। রোদেলা লজ্জায় থ হয়ে গুটি শুটি মেরে খরগোসের ছানার মতো বসে রইলো আহিয়ানের কোলের উপর। আহিয়ান রোদেলার ডান হাতের কামিজের হাতাটা কুনুই পর্যন্ত গুটিয়ে দিল। তারপর পরম যত্নে যেখানে বার্ন জেলটা লাগিয়ে দিল। জেল লাগানোর সময় টপটপ করে পানি পরছিল রোদেলার চোখ দিয়ে। আহিয়ান সেদিকে একবার তাকিয়ে আর দ্বিতীয় বার তাকায়নি। আহিয়ানের কেন যেন এই মেয়ের চোখের জল দেখতে ভালো লাগে না।বার্ন জেল লাগানো শেষ হলে আহিয়ান রোদেলাকে কোল থেকে নামিয়ে বিছনায় বসিয়ে দিল। আহিয়ান বিছানা থেকে নেমে রোদেলার পিছনে এসে দাড়ালো। আহিয়ান নিজের কাঁধে রাখা তোয়ালে দিয়ে রোদেলার চুল যত্ন করে মুছে দিতে লাগলো। রোদেলা হাতের জন‍্য মাথার চুল ঠিক মতো মুছতে পারেনি।আহিয়ান সেটা লক্ষ‍্য করেই রোদেলার মাথা নিজ হাতে মুছে দিতে লাগলো।আহিয়ানের এটুকু যত্নে রোদেলার ছোট মনটায় ঘুড়ি উড়তে লাগলো যেন।রোদেলা হাতের যন্ত্রণার কথা ভুলে লজ্জায় মুচকি মুচকি হাসতে লাগলো।আহিয়ানের সেদিকে চোখ পড়তেই আহিয়ান নিজেও বাঁকা হেসে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো।

চলবে…

( অসুস্থতা নিয়ে গল্প লিখছি আপনাদের আগ্রহ দেখে।সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করবেন। এই পর্বে ২৪ ঘন্টায় 1.5 k রিয়েক্ট আসলে কালকে গল্প দিব। নয়তো দেরি হবে এক দুই দিন। আর গ্রুপে সবার আগে গল্প আপলোড করা হবে।আজকেও করা হয়েছে। তাই সবাই গ্রুপে জয়েন হয়ে যাবেন)

গ্রুপ লিংক-https://facebook.com/groups/1483760089647195/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here