#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [ পর্ব-১৮.১ ]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি
অনন্যার কোমল হাতের স্পর্শে, শিবলী তার শর্তের কথা ভুলে ঘুমে তলিয়ে যেতে লাগলো। ছোট জয় শিবলীকে চোখ বুজে নিতে দেখে বিরক্ত হলো। তারপর সে নিজের দুই হাত শিবলীর চোখের উপর রেখে জোর করে শিবলীর চোখ দুইটা টেনে মেলানোর চেষ্টা করতে লাগলো। শিবলীর কাঁচা ঘুম ভাঙতেই সে ভাগ্নের দিকে কটমট করে তাকালো।
তখনি জয় শিবলীর দিকে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে একটা চকলেট মুখে দিতে নিচ্ছিল। চকলেটা অন্ত তার টিশার্টের পকেটে পেয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছোট ভাইকে দিয়েছে খেতে। জয় আরেকটুর জন্য চকলেটটা প্রায় নিজের মুখে ঢুকিয়েই নিচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই শিবলী দাবাং মার্কা এক খাবলায় ছোট জয়ের হাত থেকে চকলেটটা ছিনিয়ে নিয়ে ঠাস করে নিজের মুখে পুরে ফেলল।শিবলী চকলেটটা চে’টে খাওয়ার বদলে,তার দাবাং মার্কা দাঁতে চকলেটটা চিবিয়ে গুড়োগুড়ো করে চোখের পলকে গিলে ফেলল।
জয় হতবাক হয়ে তার বেয়াদব মামুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। শিবলীর কাজে ছেলেটা থমথম খেয়ে বসেছিল। জয় চোখ বড় বড় করে তার চকলেটা উধাও হয়ে যেতে দেখলো শুধু। অনন্যা আর অন্তও জয়ের মতো চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে ছিল শিবলীর দিকে।জয়ের ছোট মস্তিষ্ক সচল হতেই, শিবলীকে চকলেকটা গিলে ফেলতে দেখেই এক চিৎকুরে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নিল। জয় শিবলীর বুকে বসেই, শিবলীর নাকে মুখে ছোট হাতে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। তারপর কাঁদতে কাঁদতে নেমে গেল শিবলীর বুকের উপর থেকে। জয় ফ্লোরে নেমেই চোখ কঁচলে চিৎকুর পেড়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড় লাগালো আহিয়ানের রুমের দিকে। অন্ত আর অনন্যাও দৌড়ে চলে আসলো জয়ের পিছু পিছু। শিবলী জয়ের চিৎকুর শুনে এখন মাথায় হাত রেখে বসে আছে নিজের বেডে। কি পাপ করেছে, তা স্মরণে আসতেই শিবলী নিজের মাথা চুলকাচ্ছে বারবার।
_____
জয় চিৎকুর পেড়ে চোখ কঁচলাতে কঁচলাতে আহিয়ানের রুমে ঢুকলো।রোদেলা বেলকনিতে দাড়িয়ে ফ্লোর ঝাড়ু দিচ্ছিল।জয়কে এভাবে কেঁদে কেটে ঢুকতে দেখে রোদেলা ঝাড়ু দেওয়া বন্ধ করে দ্রুত জয়ের কাছে ছুটে এলো।জয়ের পিছু পিছু অন্ত আর অনন্যাও মুখ গোমড়া করে ভিতরে ঢুকলো।
আহিয়ান পিঠ ভাসিয়ে মুখটা বালিশে ডাবিয়ে ঘুমিয়ে আছে। জয় কাঁদতে কাঁদতে সোজা আহিয়ানের পিঠের উপর এসে বসে পরলো।তার ছোট ছোট গুলুমুলু দুই হাতে আহিয়ানের মাথার চুল মুঠ করে ধরে টানতে টানতে চিৎকুর পেড়ে কেঁদে বলতে লাগলো,
—- ” মামা উতো উতো। আমি থাব্বো না একানে।নানু বায়ি পতা। পতা মামু আমাল চককেত কেয়ে পেলেচে। ”
–
আহিয়ান ঘুমের মধ্যে চুলের গোড়ায় ব্যথা পেয়ে আর কানের গোড়ায় চিৎকারের শব্দে বিরক্ত হয়ে চোখ খুললো।ঠিক তখনি চুলের গোড়ায় আরেকটা টান পড়তেই আহিয়ান কটমট করে উল্টো ঘুরতে নিলেই জয়কে তার পিঠের উপর আবিষ্কার করলো। অনন্যা আর অন্তও মুখটা বেলুনের মতো চুপসে,দুইজন মামার দুই পাশে গিয়ে বসলো।আহিয়ান মুখের বিরক্তি লুকিয়ে জয়কে পিঠের উপর থেকে এক হাতে ধরে কোলের উপর এনে ফেলে, নিজেও উঠে বসলো।
আহিয়ান জয়ের চোখের পানি মুছে দিল নিজের লুঙ্গি দিয়ে। জয়ের ফোলা ফোলা গালে নাক ডাবিয়ে দিয়ে বলল,
—- ” সকাল সকাল গলা ছেড়েছিস কেন? নানু বাড়ি পঁচা কে বলেছে তোকে? ”
জয় কিছু না বলে থম মেরে বসে চোখ কক্ষচলাতে লাগলো। রোদেলা আহমকের মতো ঝাড়ু হাতে নিয়েই গোল গোল চোখে তাকিয়ে আছে জয় আর আহিয়ানের দিকে। আহিয়ান রোদেলাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে আবার জয়কে ঝাঁকাতেই জয় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,
—– ” শিব্বি পতা মামু আমাল চককেত কেয়ে পেলেচে। ”
অনন্য্যা তার মামার হাত ঝাঁকিয়ে আহিয়ানকে নিজের দিকে ফিরিয়ে আহিয়ানের কাছে বিচার দিল,
—– ” আমাদের দোকানে নিয়ে যাবে বলে মিথ্যা কথা বলে এখন পড়ে পড়ে নাক ডাকছে। ”
অন্ত বলল,
—– ” সেজো মামু আমাকে দিয়ে বেকার খাটনি খাটিয়ে শরীর টিপিয়ে নিয়ে, এখন পল্টি মেরে শুয়ে আছে। ”
জয় এবার তার গুলুমুলু হাতে আহিয়ানের থুতনিতে হাত রেখে আহিয়ানের মুখটা নিজের দিকে ফেরালো। তারপর আবার বিচার দিতে লাগলো,
—– ” পতা শিব্বি আমার হাত থেকে চককেততা ঠাস কলে তাল মুকে নিয়ে,গিলে পেলেচে। ও একতা বাদর, পতা মামু। তুমি ওকে বকা দাও ”
রোদেলা ড্যাব ড্যাব করে জয় এর নেকা কান্না দেখছিল। আহিয়ানের চোখে এখনো ঘুম। সকাল সকাল শিবলীর জন্য তার ঘুমের বারোটা বাজার জন্য আহিয়ানের চোয়াল শক্ত হলো। আহিয়ান জয়কে এক হাতে কাঁধে ফেলে ঠাস করে বিছানা থেকে নেমে পরলো। রোদেলে বিছানার সামনেই দাড়িয়ে ছিল। আহিয়ান নামতেই, আহিয়ানের সাথে রোদেলার ধাক্কা লাগলো। আহিয়ান বউ এর দিকে একবার শান্ত দৃষ্টি ফেলে সরে যেতে যেতে বলল,
—- “এই ট্যাবলেট, ক্যাপসুলের পাল্লায় পড়ে জীবন ত্যানা ত্যানা। বিয়ে করেছি সেটাও আরেক ট্যাবলেট,
ক্যাপসুল। আর ওই দিকে এক হারামি তো আছেই আমার জীবনে বাঁশ ঢুকানোর জন্য। ”
আহিয়ানের কথায় রোদেলা পিছনে ঘুরে আহিয়ানের দিকে তাকালো। আহিয়ান তা পাত্তা না দিয়ে রোদেলার একদম কাছ ঘেষে এসে দাড়ালো। আহিয়ান রোদেলার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থেকেই, আচমকা রোদেলার হাত থেকে ঝাড়ুটা ছিনিয়ে নিল। তারপর দাঁত কড়মড় করে দরজার দিকে যেতে লাগলো। তার কাঁধে ঝুলছে জয়। আহিয়ানের দুই পাশে অনন্যা আর অন্তও সৈন্যর মতো এসে দাড়ালো। তারপর মামা,ভাগ্নে-ভাগ্নিরা একসাথে রওনা হলো তাদের অপরাধীর বিচার করতে।
–
আহিয়ানকে গজগজ করতে করতে ঝাড়ু হাতে নিজের রুমে ঢুকতে দেখেই শিবলী ঠাস করে বিছানা থেকে উঠে বসলো। জয় শিবলীর দিকে তাকিয়ে ফিচেল হাসলো। শিবলী তা দেখেই কটমট করে বলল,
—- ” লাড্ডুরে কি করলি তুই? একটা চকলেটি তো ভুল করে গিলে ছিলাম বাপ আমার। তাই বলে, তুই তোর সিংহ মামাকে জাগিয়ে দিবি? কাছে পেয়ে নিই, খালি তোকে,দেখিস তোকে যদি ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে না আসি আমি। ”
জয় তার সিংহ মামার কোলে ভর করে যেন সেই সাহস পেয়ে গেল। আহিয়ানের কাঁধে থেকেই জয় শিবলীর দিকে ফিরে মুখটাকে অদ্ভুত ভঙিমা করে মুখ বিজলালো,
—–” বেবে বেবে…”
শিবলী বিছানার এদিক থেকে ওদিক লাফালাফি করছে আহিয়ানের হাত থেকে বাঁচতে। এর মধ্যে ভাগ্নের এতো বড় দুঃসাহস দেখে থমথম খেয়ে দাঁত কড়মড় করলো। আহিয়ান তখন ঠাস করে এক বারি বসালো শিবলীর পশ্চাৎদেশে।শিলবী মার খেয়ে নিজের পচাৎদেশে হাত বুলাতে বুলাতে তিন হাত উপরে লাফ দিয়ে উঠলো। আহিয়ান জয়কে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে শিবলীর শার্টের কলার চেপে ধরলো,শিবলী সিংহের সামনে পড়ার মতোন কাঁচুমুচু করে ফাঁকা ঢোক গিলে বলল,
—–” ভুল করে মিসটেক হয়ে গিয়েছে ব্রো। তোর ভাগ্নের চকলেট আমি আর জীবনে খাব না। ”
কথাটা বলেই শিবলী মাথা চুলকে তিন ভাগ্নে-ভাগ্নির দিকে তাকিয়ে ফাঁকা হাসি দিল। বাচ্চা তিনটা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে শিবলীর দিকে। শিবলীর বেশ লজ্জা লাগছে।
আহিয়ান কড়মড় করে বলল,
—–” তোর জন্য ঘরে ঘুমিয়েও শান্তি পেলাম না।সারাক্ষণ লেগে থাকিস আমার আরাম হারাম করতে।আজকে তোকে উচিৎ শিক্ষা না দিয়ে ছাড়ছি না। ”
আহিয়ান শিবলীকে বগল দাবা করে ধরতেই রোদেলা,মেহনূর,তৃষ্ণা,অন্বেষা,অবন্তি সবাই দৌড়ে এলো। জয়কে অবন্তি কোলে নিতেই জয় শিবলীর নামে আদো আদো স্বরে এত গুলো বিচার দিল।আহিয়ানের হাত থেকে রক্ষা পেতে শিবলী বাধ্য হয়ে তিন বাচ্চাকে নিয়ে দোকানের দিকে রওনা হলো।আহিয়ান রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে এসে শাওয়ার নিতে ঢুকলো।
___________________
রোদেলা কয়েকটা সিড়ি পেরিয়ে উপরে উঠছিল
আহিয়ানের রুমে যাওয়ার জন্য। তার হাতে আহিয়ানের কফি। তখনি রামিশার সাথে তার ধাক্কা লাগলো। রামিশা উপর থেকে নিচে নামছিল। রোদেলা সিড়ির এক পাশেই ছিল।তবুও রামিশা ইচ্ছা করেই রোদেলাকে ধাক্কা দিয়েছে। রোদেলা হাতের মগটা চেপে ধরে, নিজেও অপর হাতে সিড়ির রেলিংটা শক্ত করে ধরে, নিজেকে পরে যাওয়া থেকে কোনো রকম বাঁচিয়েছে। রোদেলার ভীষণ রাগ হলো এবার। রামিশা তার সাথে ইচ্ছে করেই এসব করছে তা তার আর বুঝতে বাকি নেই। রোদেলা রামিশার দিকে তাকিয়ে এবার কিছুটা নিজেকে শক্ত করেই বলল,
—– ” আপনার মতো বিচক্ষণ, দায়িত্বলীল একজন মানুষের থেকে এরকম ব্যবহারে সত্যিই দুঃখ পেলাম আপু।তা আমার প্রতি এই রকম আক্রমনাত্মক হয়ে ওঠার কারণটা কি, আমি মেজর সাহেবের অর্ধাঙ্গিনি হয়ে যাওয়ায়। বলুন,এটাই কি আমার উপর বিদ্বেষ পুষে রাখার কারণ? ”
রোদেলা কথাটা বলতে না বলতেই রোদেলার নরম তুলতুলে গালে একটা শক্ত থাপ্পড় আঁচড়ে পরলো।রোদেলা হতবাক হয়ে চোখে টলমলে জল নিয়ে তাকালো রামিশার দিকে। রামিশা রোদেলার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
—– ” লজ্জা করে না নিজেকে মেজর সাহেবের অর্ধাঙ্গিনী বলতে? আহিয়ানের পাশে দাড়ানোর কি যোগ্যতা আছে তোর? ছল চাতুরি করে বিয়ে বসেছিস। এসব কি অজানা আমার? তাছাড়া আহিয়ান আর তোর সম্পর্ক কেমন সেসব কি আমার অজানা? সেই তো বিয়ের দিন থেকে বউ মানি না শুনে শুনেও এখনও তার গলার কাটা হয়ে ঝুলে আছিস। এই বাড়িতে আশ্রই পেয়েছিস বলেই বেঁচে আছিস। নয়তো এতদিনে রাস্তায় ঘুরে মরে টরে পড়ে থাকতি। এখন আবার আসছে আমার সাথে চাপার জোর দেখাতে। ”
রামিশার কথাগুলো শুনে রোদেলার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগলো।রোদেলার মনে হলো কেউ তার ছোট বুকটায় ধারালো ছুড়ি বসাচ্ছে বার বার। কথার আঘাতেই ছোট মেয়েটা চূর্ণবিচূর্ণ হতে লাগলো। রামিশা সেসবে পাত্তা না দিয়ে,রোদেলার হাত থেকে কফির মগটা ছিনিয়ে নিল। তারপর সেটা নিয়ে রোদেলাকে দেখিয়ে দেখিয়ে গটগট করে আহিয়ানের রুমের দিকে চলে গেল।
রোদেলা পিছু ঘুরে এক দৌড়ে বাড়ির বাইরে চলে গেল।এসব কিছু তার কাছে অসহ্য লাগছে।একটু শান্তি দরকার তার,চায় না তার এসব প্রতিপত্তি , অহংকারে ঘেরা মানুষদের মাঝে বসবাস।
_________
আহিয়ান গোসল করে বের হয়ে নিজের রুমে রামিশাকে বসে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। আহিয়ান রামিশার দিক থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
—– ” মিস. রামিশা আপনি এখানে কেন? ”
আহিয়ানের এরকম কাটখোট্টা সম্মোধনে রামিশা বাঁকা হাসলো।
—– ” মেজর. আহিয়ান এটা আপনার কর্মস্থল নয়।
আহিয়ান কন্ঠে দ্বিগুন গাম্ভীর্য টেনে জবাব দিল,
—–” হুম, সেটা নিশ্চয়ই আমার অজানা নয়। ”
রামিশা বাঁকা হেসে বলল,
—– ” তো,সব সময় রোবটের মতো আচরণ করবেন না।
আমাকে তুমি বলে সম্মোধন করলেই বোধহয় বেশি ভালো হয়।তাছাড়া আমি অর্ণের সমবয়সী। ”
আহিয়ান ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
—- ” আমি আমার স্ত্রী,মা,চাচী,বোনদের ছাড়া, কোনো নারীকে তুমি সম্মোধন করে অভ্যস্ত নই। ”
আহিয়ানের সোজাসাপ্টা জবাবে রামিশা ঠোঁটে ঠোঁট চাপলো।মাথ মুষ্টিবদ্ধ করে নিল রাগের ঠেলায়।রামিশার সব রাগ আবার রোদেলার উপর জমতে শুরু করলো।
–
রোদেলা নিজে আহিয়ানের জন্য কফিটুকুও নিয়ে এলো না এটা ভাবতেই আহিয়ানের রাগ হচ্ছে। রোদেলার বদলি তার কফির মগটা রামিশার হাতে দেখে আহিয়ানের রাগটা যেন এখন আরও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে।
আহিয়ান রামিশার হাতে কফি দেখেও না দেখার মতো রোদেলাকে ডাকতে লাগলো,
—- ” রোদেলা, এই মেয়ে কোথায় তুমি? দ্রুত রুমে আসো।নয়তো খবর করে ছাড়বো তোমার। ”
চলবে…..
( এই পর্বে 1.5 k রিয়েক্ট আসলে নতুন পর্ব আসবে)

