মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [পর্ব সংখ‍্যা -০১]

0
2

” আমি একজন আর্মির মেজর হয়ে কিনা,একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করবো? তাও আবার বাল‍্যবিবাহ? নো ওয়ে। মম, তুমি কিছুতেই তোমার প্রিয় ছাত্রীকে আমার ঘাঢ়ে চাপিয়ে দিতে পারো না।আমি এটা কোনো ভাবেই মেনে নিব না। ”
চিৎকার করে কথা গুলো বলতে বলতে পুরো বাড়ি মাথায় তুলেছে আহিয়ান ।সামনেই দাড়িয়ে আছে আহিয়ানের মা মিসেস মাশরিফা আঞ্জুম।তিনি ছেলের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।ছেলের এরকম ব‍্যবহারে তিনি অসন্তোষ চোখে তাকিয়ে আছেন ছেলের দিকে।মাশরিফা নিজের কালো ফ্রেমের চিকন চশমাটা ঠিক করতে করতে তাকালেন ছেলের দিকে। আহিয়ান সিড়ির সামনে রাখা ফুলদানিটায় জোরে লাথি মারতেই সেটা গুড়িয়ে পরলো সাদা ফ্লোরের উপর।সেই শব্দে অদূরে দরজার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটা ভয়ে কেঁপে উঠলো।রোদেলা ভয়ে থমথম খেয়ে আরও দরজার আড়ালে চলে গেল।মেয়েটাকে আবছা ভাবে সরে যেতে দেখে আহিয়ান দাঁতে দাঁত চেপে কটমটিয়ে তাকালো সেদিকে।আহিয়ানের সব রাগের কারণ এই মেয়টাই। রোদেলার সাথেই মাশরিফা নিজের একমাত্র ছেলের বিয়ে দিতে চাইছে। মাশরিফা ‘রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ‍্যালয়ে’র প্রিন্সিপাল ম‍্যাম।রোদেলা তার স্কুলের একজন শিক্ষার্থী। রোদেলার পুরো নাম
‘রুবাইদা জামান রোদেলা’।

__

নিজের শখের ফুলদানিটাকে এভাবে গুড়িয়ে যেতে দেখে,মাশরিফা এবার মারাত্মক রেগে গেলেন।মাশরিফা নিজের মুখটা গম্ভীর করে নিজের ছেলের সামনে গিয়ে দাড়ালেন।ছেলেকে ভালো করে পরখ করে নিয়ে তিনি মুখ খুললেন,
” এই মেয়েটাকে যদি বিয়ে না করো,তবে মনে রেখো নিজের মাকে আর চোখের সামনে দেখার সুযোগ পাবে না।আমি খুব বড় মুখ করে মেয়েটার দায়িত্ব নিয়েছি।এখন তুমি যদি ওকে বিয়ে না করো তবে,মেয়েটাকে ভালো রাখতে আমি এক্ষুনি মেয়েটাকে নিয়ে এক কাপড়ে বেরিয়ে যাবো এই বাড়ি থেকে। ”

মাশরিফার কথায় আহিয়ান আর তার বাবা হতবাক হয়ে এক অপরের দিকে তাকালেন।আহিয়ানের মাথায় রাগ যেন তরতর করে বেড়ে যাচ্ছে।অতিরিক্ত রাগে আহিয়ানের শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠেছে।নিজের মায়ের মুখে অন‍্যের মেয়ের জন‍্য এতো দরদ সহ‍্য হলো না তার।আহিয়ান তার মায়ের দিকে না তাকিয়ে অন‍্যদিকে চোখ ঘুরিয়ে মুখ খুললো,
” ওহ এখন তাহলে,এই মেয়েটা তোমার কাছে আমাদের তিন ভাই-বোন আর ড‍্যাডের থেকেও আপন হয়ে গিয়েছে?তুমি তোমার একটা সামন‍্য স্টুডেন্টের জন‍্য নিজের বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে যেতে চাইছো মম?হাউ স্ট্রেঞ্জ! ”

মাশরিফা এবার রোদেলার ঘরের দিকে যেতে বললেন,
” হ‍্যাঁ,চাইছি এবং আমার কথা তোমরা না শুনলে আমি চলেও যাবো।”

আহিয়ানের বাবা ‘জাবির আহমেদ’ চুপচাপ নিজের স্ত্রী আর ছেলের বাকবিতণ্ডা শুনছিলেন।এই পর্যায়ে নিজের স্ত্রীকে রণমূর্তি ধারণ করতে দেখে, ভড়কে গেলেন তিনি।মাশরিফা কখনই এতো রাগ দেখায় না পরিবারের কারো সাথে।তবে আজ যেন সব কিছুর ব‍্যতিক্রম ঘটেছে।মাশরিফার আচরণে তিনি রীতিমতো চিন্তায় পরে যাচ্ছে।জাবির সাহেব নিজের প্রিয়তামা স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলার জন‍্য পিছন থেকে ডেকেও সারা পেলেন না।মাশরিফা ঠকঠক করে দ্রুত পায়ে হেটে রোদেলার ঘরটায় চলে গেল।তারপর দরজাটা বন্ধ করার আগে মাশরিফা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-

” এই দরজা তখনি খুলবে যখন আহিয়ান রোদেলাকে বিয়ে করতে রাজি হবে।তবে সময় আজকের দিন বরাদ্দ।আর যদি সময় পেরিয়ে যায় তখন আমিই নিজ থেকে এই দরজা খুলে দিব।আর যদি নিজ থেকে দরজা খুলি তবে ব‍েশ অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটে যাবে। অর্থাৎ আমি রোদেলাকে নিয়ে এখান থেকে চলে যাবো। ”

এর পরেই ঠাস করে দরজাটা লেগে গেল।আহিয়ান আর তার বাবা যেন জমে গেল মিসেস মাশরিফার কথায়।আহিয়ান আর তার বাবার চোখাচোখি হলো।আহিয়ান কিছু না বলে গটগট করে হেঁটে নিজের রুমে চলে গেল।জাবির ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকার পর বন্ধ রুমটার দিকে তাকালো যেখানে তার স্ত্রী দরজা লাগিয়ে বসে আছে।জাবির পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মাথা চুলকালেন।কি করবে না করবেন ভেবে না পেয়ে জাবির তার বড় দুই কন‍্যাকে ফোন করলেন।

আহিয়ানরা তিন ভাই-বোন।দুই বোন আর আহিয়ান।দুই-বোন এর দুইজনই আহিয়ানের বড়।দুইজনের বিয়ে হয়ে বাচ্চাও হয়ে গিয়েছে।আহিয়ানের বড় বোনের নাম অন্বেষা আহমেদ।ছোট বোনের নাম অবন্তি আহমেদ।তাদের ফোন কলে সব জানালেন মি. জাবির আহমেদ।মেয়েরা সব শুনার পর জানালেন তারা এক্ষুনি আসছে রাজশাহীতে।

___________

বাবা মারা গিয়েছে একমাসও হয়নি,এর মধ‍্যে রোদেলার সৎ মা; রোদেলাকে চল্লিশ বছরের বুড়ো, তিন বাচ্চার বাবার সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিল।রোদেলা এইবার এস.এস.সি পরিক্ষার্থী। দুইমাস পরেই তার বোর্ড এক্সাম।মেয়েটার বয়স কম।সবে সতেরোতে পা দিয়েছে।এর মধ‍্যেই তার সৎ মা টাকার লোভে পরে রোদেলাকে এক খারাপ লোকের হাতে তুলে দিতে নিচ্ছিল।রোদেলার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল লোকটা নাকি নারী পাচার এর সাথেও যুক্ত।

রোদেলা খুব ভালো আর মেধাবী স্টুডেন্ট হওয়ার কারণে পুরো কলেজের পরিচিত মুখ সে।মাশরিফা আঞ্জুম রোদেলাকে বিশেষ স্নেহ করতেন।মেয়েটার মায়াবী মুখটা তাকে খুব টানতো।তিনি সব সময় স্কুলে রোদেলার খোঁজ খবর রাখতেন ।

একদিন হুট করেই মাশরিফা জানতে পারলেন রোদেলার বাবা মারা গিয়েছেন।তিনি বেশ শোকাহত হয়েছিলেন এই ব‍্যপারে।রোদেলাকে সেদিন একটু সান্ত্বনা দেওয়ার জন‍্য পৌঁছে গিয়েছিলেন রোদেলাদের বাড়ি।সেখানে যাওয়ার পর রোদেলার বাবা মৃত আসাদুজ্জামানকে দেখে মাশরিফার পুরো দুনিয়া ঘুরে গিয়েছিল যেন।তার মনে হচ্ছিল কেউ পায়ের নিচ থেকে জমিনটুকু কেড়ে নিয়ে তাকে অতল গহব্বরে তলিয়ে দিতে চাইছে।মাশরিফা আসাদুজ্জামান এর লাশ দেখে মুখে আঁচল চেপে চুপচাপ চলে এসেছিল সেদিন।রোদেলার সাথে প্রথমে একবার দেখা করলেও রোদালের বাবার লাশ দেখার পর মাশরিফা আর দাড়ায়নি।সেদিন মেয়েটাকে বুকে নিয়ে একটু সান্ত্বনাও দিয়ে আসা হয়নি তার।

রোদেলার বাবা মারা যাওয়ার অনেকদিন পর রোদেলা স্কুলে এসেছিল।সেদিন মিসেস মাশরিফা আঞ্জুমান ক্লাস পরিদর্শনে যেয়ে রোদার জীর্ণশীর্ণ ক্লান্তিতে ডুবে থাকা মুখটা দেখে আঁতকে উঠে ছিলেন।পনেরো দিনে মেয়েটার শরীরে অর্ধেক মাংস কমে গিয়েছে যেন। মাশরিফা আঞ্জুমান বিষয়টা উপক্ষে করার চেষ্টা করেও সেদিন এসব উপেক্ষা করতে পারেন নি।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাশরিফা এগিয়ে গিয়েছিলেন রোদেলার কাছে।রোদের কাছে এসে দাড়াতেই রোদেলার গায়ের কালশিটে দাগ গুলো তার চোখে বিঁধলো।তিনি তার নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি ।কৌতুহল বসত রোদেলাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
” তোমার শরীরে কিসের দাগ আম্মু? ”

রোদেলা প্রশ্নটা শুনে জীর্ণশীর্ণ চোয়াল চেপে হাসার চেষ্টা করলো। কোমল কন্ঠে মাশরিফার দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
” মা মারা যাওয়ার পর বাবা আমার দেখাশোনার জন‍্য একটা নতুন মা আনলো।তারপর একদিন বাবাও বিদায় নিল।এখন আমি আমার গায়ে ভাগ‍্যের নির্মম পরিহাসের সাক্ষ‍‍্যি নিয়ে ঘুরছি ম‍্যাম। ”

রোদেলার কথাগুলো সেদিন এতো করুণ লেগেছিল যে ক্লাসে উপস্থিত সবার চোখ দিয়ে সেদিন অশ্রু গড়িয়ে ছিল।যারা রোদাকে ছোট করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো তারাও সেদিন রোদেলার দুঃখে পুড়েছিল।মাশরিফা সেদিন আড়ালে গিয়ে কয়বার যে চোখের জল মুছেসে তা বলে শেষ করা যাবে।

তারপর হুট করেই আবার রোদেলার স্কুলে আসা বন্ধ হয়ে যায়।এভাবে কেটে গিয়েছিল প্রায় দশ দিন।একদিন রোদার বান্ধবী হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে পৌঁছায় প্রিন্সিপাল ম‍্যামের কক্ষে।মেয়েটা অনুমতি চেয়ে দৌড়ে ভিতরে ঢুকে তারপর মাশরিফাকে জানিয়েছিল ” রোদেলার সৎ মা রোদেলাকে চল্লিশ বছরের এক বুড়োর সাথে বিয়ে দিচ্ছে তাও আবার লোকটা নাকি নারী পাচার এর সাথে যুক্ত।”
মাশরিফা আঞ্জুমান কথাটা শুনে চুপ করে বসে থাকতে পারেনি।ছুটে গিয়েছিল পুলিশ আর স্কুল কমিটির সভাপতি সাহেবকে নিয়ে।

__

রোদেলা তখন বিয়ের আসরে বসে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বলছিল,
” মা আমার এই সর্বনাশটা করো না তুমি।আমি যদি তোমার বোঝা হয়ে থাকি তবে আমি আজই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।তবুও এই লোকটার সাথে আমকে বিয়ে দিয়ে আমার এতো বড় সর্বনাশ করো না মা। ”

কিন্তু রোদেলার সৎ মা তাহমিনা বেগম নিজের লোভ চরিথার্ত করতে মেয়েটাকে বিলিয়ে দিতে চাইছিল।রোদেলার ছোট সৎ ভাই-বোন দুটো রোদেলার জন‍্য কেঁদে ভাসাচ্ছিল।কিন্তু মায়ের ধমকে আর ভয়ে বোনের কাছে ঘেঁষতে পারছিল না তারা।

.
.

মাশরিফা পুলিশ আর লোকদের নিয়ে সেখানে পৌঁছালে ‘আসলাম’ নামের পাচারকারী,মেয়েদের দালালটা ভেগে গিয়েছিল।রোদেলাকে বিয়ে করার শর্তে,তাহমিনাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল আসলামের।নিজের এতো বড় ক্ষতি হতে দেখে তাহমিনা সেদিন ডাইনির মতো রোদেলাকে ধরে সবার সামনে মারতে গিয়েছিল।মাশরিফা রোদেলাকে সেদিন নিজের বুকের ভিতর লুকিয়ে রেখেছিল।পুলিশরা আর স্কুল কমিটির সভাপতিরা তাহমিনাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রুখে দিয়েছিল।

বিয়ে ভাঙার পর রোদেলার থাকা খাওয়ার দায়িত্ব নিতে নাকোচ করে দেয় তাহমিনা।মাশরিফা কোনো উপায় না পেয়ে বলেছিল, ” সে রোদালার দায়িত্ব নিবে।আজীবন রোদেলাকে নিজের মেয়ে বানিয়ে রাখবে সে। ”

কিন্তু তাতে বাধ সাধে সমাজের লোকেরা।
সবাই বলল,
” আপনার ঘরে জোয়ান ছেলে আছে।ছেলেটা যদিও ভদ্র।শুনেছি আর্মিতে আছে।আপনাদের সাথে থাকে কম।তবুও তো এক সময় নিজের বাড়িতে ফিরবেই নাকি?এরকম জোয়ান মেয়ে,ছেলেকে এক ছাদের নিচে তো আর ভাই বোনের দোহায় দিয়ে রাখা যায় না নাকি?সমাজে খারাপ বলবে। তখন দেখা যাবে মেয়েটার ভালো করতে যেয়ে আরও খারপ হবে আপা। ”

মাশরিফার কাছে কথাটা প্রথমে উদ্ভট লাগলেও পাঁচ দিক বিবেচনা করে তিনি বুঝেছিলেন ” এরা ভুল বলছে না।”কিন্তু তাই বলে মেয়েটাকে তো আর একা ছেড়ে দিতে পারবে না সে।তাই তিনি সবার সামনে জোর গলায় বলে এসেছেন,
” যেভাবে এই মেয়েকে আমি আমার ঘরে রাখলে, সমাজ আঙুল তুলবে না, আমি সেই ব‍্যবস্থায় করব। আমি ওকে আমার একমাত্র ছেলের সাথে বিয়ে দিব। ”

রোদেলা তার ম‍্যামের আড়ালে দাড়িয়ে ছিল।মাশরিফার কথা শুনে সে চমকে তাকিয়ে ছিল তার ম‍‍্যামের দিকে।তার ছোট মাথায় ঢুকছিল না ” ম‍্যাম তার জন‍্য এতো কিছু কেন করছে? ”

….

মাশরিফা রোদেলাকে নিয়ে বাসায় ফিরেই ছেলেকে ‘রাজশাহী সেনানিবাস’ থেকে জরুরু তলব করে আনিয়েছে বাড়িতে। মাশরিফা তার স্বামী জাবির আহমেদকে জানালে প্রথমে অবশ‍্য অমত করে ছিলেন তিনি।পরে বউ এর মন ভাঙতে পারবেন না বলে, ছেলের উপরেই ছেড়ে দিয়েছেন সবটা।আহিয়ান বাসায় ফিরেই মায়ের মুখ থেকে বিয়ের কথা শুনে, রাগে ভাঙচুর আর চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তুলেছিল।

_____

মাশরিফা রোদেলাকে দেওয়া ছোট রুমটায় রোদেলার খাটের উপর বসে আগের ঘটনা গুলো নিয়ে ভাবছিলেন এতোক্ষণ।রোদালা মাশরিফার দিকে তাকিয়ে আছে অনেক্ষণ যাবত।মাশরিফা মেয়েটাকে ডাক দিল এবার নিজের কাছে।রোদেলা মাশরিফার সামনে আসতেই,
তিনি রোদেলাকে ধমক দিয়ে বলল,
” এভাবে অল্পতেই ভয় পেলে চলবে মেয়ে?আমার ছেলের এইটুকু গর্জণেই ভয় পেয়ে গেলে,ওর সাথে সংসার করবে কি করে?শক্ত হও বুঝেছো।ও যদি সিংহ হয়।তবে তুমিও সিংহি হয়ে দিখিয়ে দিবে,বুঝেছো? ”

রোদেলা আসলে এখনও ঘোরের মাঝে আছে।ওই রাগী গম্ভীর পুরুষটার দৃষ্টি এখনো তার মনে আছে।লোকটার দৃষ্টি তাকে এখনও ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।আর তার ম‍্যাম কি না বলছে,” লোকটাকে সিংহি হয়ে দেখিয়ে দিতে।”
রোদেলা মনের কথাগুলো মনে চেপেই আমতা আমতা করে বলল,
” ম‍্যাম,আমার মনে হয় উনি খুব রাগী।আমাকে দেখলে তার রাগ আরও বেড়ে যায়।আমাদের বিয়ে দেওয়াটা কি খুব জরুরি? আমি না হয় হোস্টেলে চলে যায়? ”

মাশরিফা এবার চোখ ছোট ছোট করে তাকালেন রোদেলার দিকে।রোদেলা লজ্জা মেয়ে মাথা নুইয়ে নিল।মাশরিফা আলতো চোখে রোদেলাকে দেখে নিয়ে বলল,
” পাঁকা পাঁকা কথা বলতে হবে না। আমি যা বলেছি ভেবেই বলেছি।এখন বাকিটা আল্লাহ ভালো জানেন। ”
মাশরিফার মুখ দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।রোদেলা অপলক চোখে তার ম‍্যামের সুন্দর মুখশ্রীটায় তাকিয়ে রইল।এই মুখটায় কেন যেন সে অনেক মায়া খুঁজে পায়।

___________

জাবির আহমেদ ‘ সরকারি মহিলা কলেজে,রাজশাহী’র ‘ প্রিন্সিপাল এর দায়িত্বে আছেন।মাশরিফা রোদশীকে নিয়ে বাসায় ফেরার পর তাকে ফোন করে বাড়িতে এনেছিল।কাজের মেয়ে লতিফা চা করে দিয়ে গিয়েছে জাবির সাহেবকে।জাবির লিভিং রুমে বসে আপাদত চা খাচ্ছে।দুই মা ছেলে দুই রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে বসে আছে।এদের রাগ কখন পড়ে কে জানে?তার উপর তার গুণধর ছেলে বিয়ে করবে কিনা এটাও সন্দেহ আছে।জাবির চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন তখনি দেখলেন,আহিয়ান ইয়া বড় সুটকেস নিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে আসছে।

আহিয়ান সুটকেস হাতে লিভিং রুমের দিকে আসতেই,জাবির সাহেব এবার গম্ভীর গলায় মুখ খুললেন,
” কোথায় যাওয়া হচ্ছে?তুমি শুনোনি তোমার মম কি বলেছে।তুমি যদি চলে যাও,তবে ভাবতে পারছো তো সে কি কান্ড ঘটাবে? ”

আহিয়ান তার বাবার কথায় থেমে গেল।হাতের সুটকেসটা দাড় করিয়ে রেখে বাবার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

” প্লিজ ড‍্যাড। এবার তুমি শুরু করে দিও না। জানো কত ঝামেলার মধ‍্যে থাকি আমি?তার উপর বাড়িতে ডেকে এনে অচেনা অজানা এক মেয়েকে মম বলছে বিয়ে করে নিতে।তার উপর মেয়ের বয়স এখনো আঠারো হয়নি।বাল‍্য বিবাহ করে নিলে, আমার ক‍্যারিয়ারে কতটা ইমপ‍্যাক্ট ফেলবে এই বিষয়টা তোমরা কেউ ভাবছো না কেন? নাকি পরের মেয়ের জন‍্য আমার চেয়েও বেশি মায়া জন্মেছে? তাছাড়া এতোই যখন মায়া,ওই মেয়েকে আশ্রিতা হিসাবে বাড়িতে রেখে দিলেই হয়। আমাকে এসবে না জড়ালেই ভালো হয়। এখন আসি।বাড়িতে কবে ফিরি বলতে পারছি না। ”

আহিয়ান তার বাবাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত বেরিয়ে গেল।আহিয়ান চলে যাবার খবর শুনে মাশরিফার ব্লাড প্রেশার বেড়ে গিয়েছে।আহিয়ানকে তার মায়ের অসুস্থতার খবর শুনে মাঝ পথ থেকেই বাড়িতে ফিরে আসতে হলো।
আহিয়ান তার মায়ের পাশে বসে আছে মায়ের একা হাত ধরে।রোদেলা মাথায় ঘোমটা টেনে কাঁপা কাঁপা হাতে মাশরিফার মাথায় পানি ঢেলে দিচ্ছে।মাশরিফাকে এভাবে পরে থাকতে দেখে আহিয়ানের খুব খারাপ লাগছে।এই প্রথম সে তার মায়ের অবাধ‍্য হয়েছিল।যার ফল তার চোখের সামনে।আহিয়ান তার মায়ের হাতটা টেনে তাতে ওষ্ট ছুঁইয়ে মুখ খুললো,
” পরের মেয়ের জন‍্য এতো দরদ তোমার?এই মেয়েটাকে বিয়ে করবো না বলেছি বলে, তুমি প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছ।অথচ তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে এটা একবার চিন্তা করলে না, মম? ”

ছেলের কথায় মৃদু স্বরে মুখ খুললেন মাশরিফা,
” মায়েরা সব সন্তানদের জন‍্যই চিন্তা করে বাবা।এই মেয়টার তো দুনিয়াই কেউ নেই।তুই ওকে বিয়ে করে আমার ঘরে রেখে দে বাবা।আমি তোর কাছে আর কিছু চাই না। ”

আহিয়ান তার মায়ের কথায় অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে অথচ করুণ ভাবে কিয়ৎক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার মায়ের দিকে।তারপর আহিয়ান দৃষ্টি ঘুরিয়ে রোদালার দিকে তাকাতেই দুইজেনের চোখাচোখি হলো।আহিয়ানের গম্ভীর চোখের চাহনিতে রোদেলা নিজেকে মুহুর্তেই গুটিয়ে নিল।আহিয়ান তীর্যক দৃষ্টিতে সেটা দেখে,বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে নিল।আহিয়ান নিজের হাতটা মুঠো করে ধরে ঠাস করে উঠে দাড়ালো,তারপর রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বলল,
” তোমার কথায় মেনে নিলাম মম,আমার হাতে সময় কম তাই যা করার দ্রুত ব‍্যবস্থা কর ”

আহিয়ান বেড়িয়ে গেলেও তার পিছনে রেখে গেল তিন জোড়া অবিশ্বাস্য চোখের দৃষ্টি।জাবির মাত্রই রুমে ফিরে ছিলেন স্ত্রীর জন‍্য ঔষধ নিয়ে।রুমের দরজা পেরিয়ে ভিতরে আসতেই তিনিও ছেলের কথা গুলো শুনতে পেয়েছিলেন।মাশরিফা নিজের মাথা চেপে ধরে মুহুর্তেই উঠে পরলেন।এটা দেখে আরও বিষ্মিত হলো রোদেলা আর জাবির।জাবির অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মাশরিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
” নাটক তো ভালোই পার, তবে সিনেমা করছো না কেন? ”

মাশরিফা স্বামীর কথায় স্বামীর দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙানি দিলেন।বউ এর চোখ রাঙানি দেখে জাবির হেসে লুটিপুটি খেল।রোদেলা লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে দ্রুত কেটে পরলো।তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভাবে কাঁপছে।রোদেলা দৌড়ে নেচে চলে যাচ্ছিল, তখনি কারো শক্ত বলিষ্ঠ বুকের সাথে ধাক্কা খেয়ে পরে যেতে নিচ্ছিল।রোদেলা তার সামনে থাকা লোকটার কলার চেপে নিজেকে পরে যাওয়া থেকে বাঁচিয়েছে কোনো মতে। তারপর কলারের মালিকের দিকে তাকাতেই রোদেলা ভয়ে জমে গেল।আহিয়ান কটমটে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে ভীষণ বিরক্ত হয়েছে রোদেলার এসব কর্মকান্ডে।রোদেলা দ্রুত আহিয়ানের কলার থেকে নিজের চিকচিন লম্বা আঙুল গুলো সরিয়ে নিল। রোদেলা ছিটকে দূরে সরে গিয়ে দাড়িয়ে পরলো।তারপর সিড়ির দিকে তাকিয়ে মিনমিনে সুরে বলল,
” সরি, আসলে….”

আর বলতে পারলো না।তার আগেই অপর পক্ষ থেকে পুরষালী গম্ভীর গলায় একটা শব্দ ভেসে এলো।
” রিডিকিউলাস ”

কথাটা বলেই আহিয়ান রোদেলাকে পাশ কাটিয়ে উপরে চলে গেল।তবে রেখে গেল এক করুন মুখে দাড়িয়ে থাকা এক কিশোরীকে।যে নিজের ভুল খুঁজতে ব‍্যস্ত নিজের মাঝেই।

________

আহিয়ানের পুরো নাম ‘ আহিয়ান আহমেদ অভ্র ‘।
‘আহিয়ান আহমেদ অভ্র’ এই পুরো নামের অর্থ দাড়ায়-
“আল্লাহর দান, অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং নির্মল বা আকাশের মতো পবিত্র”।আহিয়ান তার নামের মতোই প্রশংসনীয় ব‍্যক্তিত্বের অধিকারী।

আহিয়ান ৩২ বছর বয়সী, বলিষ্ঠ, সুঠাম দেহের অধিকারী একজন আর্মির মেজর । নিয়মিত শারীরিক প্রশিক্ষণের কারণে তার শরীর অনেক শক্তপোক্ত ও ফিট। উচ্চতায় সে ছয় ফুট। তার হাঁটাচলায় সর্বদা একটা দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। সর্বদা তার চেহারায় গম্ভীর ভাব , চোখে সতর্কতা মিশ্রিত চাহনি লেপ্টে থাকে। আহিয়ানকে ফর্মালে যতটা সুন্দর লাগে তার চাইতেও ইউনিফর্মে আরও স্মার্ট ও শৃঙ্খলাবদ্ধ লাগে।

আহিয়ানের গায়ের রঙটা অলিভ কালার।
অলিভ কালার গায়ের রং বলতে সাধারণত বোঝায়,
হালকা বাদামি বা গমের রঙের সাথে একটু সবুজাভ আন্ডারটোন মিশ্রিত ত্বক।এটা একদম ফর্সা না, আবার খুব কালোও না,মাঝামাঝি ধরনের। সূর্যের আলোতে আসলে আহিয়ানের ত্বকে উষ্ণতা ছড়িয়ে পরে,কখনো কখনো খেলা করে সোনালি আভা।এই ধরনের ত্বকে অনেক রঙের পোশাকের সাথে ভালো মানিয়ে যায়।
আহিয়ানের চুলগুলো আর্মি কাট করে ছেটে রাখা।তার চলাফেরায় জানান দেয়,সে যেন পুরু দস্তর এক গম্ভীর হ‍্যান্ডসাম আর্মি ম‍্যান।

_

আহিয়ান বিশ বছর বয়সে ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে’ প্রথমে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দিয়ে ছিল।এরপর কয়েক ধাপ পদোন্নতি পেয়ে ৩০ বছর বয়সে এসে সে মেজর হয়েছে।মেজর হিসাবে সে দায়িত্ব পালন করছে প্রায় তিন বছর হতে চললো।এতো বছর আর্মিতে নিষ্ঠার সাথ কাজ করতে করতে সে নিজেকে আর্মির রুলস আর রেগুলেশনে পুরোপুরি বেঁধে ফেলেছে সে।

________

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো ধরনীতে,মাগরিবের নামাজের পর কাজি সাহেবকে সঙ্গে করে নিয়ে ফিরলেন আহিয়ানের বাবা।পাড়ার কিছু গণ‍্যমান‍্য লোক আর স্কুল কমেটির সভাপতিও এসেছে বিয়ের সাক্ষী হয়ে।মাশরিফা নিজের বিয়ের লালটুকু শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছে রোদেলাকে।কোনো সাজগোছ ছাড়ায় মেয়েটাকে দেখতে ছোট লালপরী লাগছে।মাশরিফা রোদেলাকে দেখে “মাশাল্লাহ” বলে নজের কেটে দিলেন।বাহিরে পুরুষরা থাকায় মাশরিফা রোদালাকে সাজিয়ে রোদেলাকে নিয়ে রুমেই বসে রইলেন।এখানেই কাজি সাহেব এসে বিয়ে পড়াবেন।

আহিয়ানকে তার বাবা কয়েক বার ডাক দেওয়ার পর গা ছাড়া ভাবে নিচে নেমে এলো লিভিং রুমে।পরনে তার দুপরের পড়ে থাকা পোশাক গুলোই।আহিয়ান এসেই একটা ছোফায় গা এলিয়ে বসে পরলো।তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিয়ে নামক বিষয়টায় তার বিন্দু পরিমাণ আগ্রহ নেই।

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার পর বিয়ে নামক পবিত্র বন্ধনে বাধা পরলো আহিয়ান আর রোদেলা।সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে দোয়া ধরলেন।দোয়া পড়া শেষ হতেই আহিয়ান দ্রুত পায়ে হেটে নিজের রুমে চলে গেল।আর্মি সেনানিবাস থেকে তার কল এসেছে।তাকে আজকেই ফিরে যেতে হবে সেখানে।

চলবে….

#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [পর্ব সংখ‍্যা -০১]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি

( নতুন গল্প সবাই রেসপন্স করবেন।🥰❤)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here