#অভিমাননামা
#md_shifu /১১পর্ব
“বাবা, আমি আর চাকরিটা করব না। আজই রিজাইনেশন লেটার পাঠিয়ে দেব। তুমি চাইলে তোমার অফিসেই জয়েন করতে পারি। তবে তার আগে কয়েকটা দিন ঘুরে আসতে চাই।”
মেয়ের কথা শুনে জামসেদ রহমানের হাত থেমে যায়। ভাতের লোকমাটা হাতেই রয়ে যায়। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন সায়মার দিকে। যেন ঠিক শুনেছেন কি না, সেটাই বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিজের হাতেই হালকা একটা চিমটি কাটলো।
বাবার এমন বিস্মিত চেহারা দেখে সায়মা শান্ত গলায় বলল,
“এত অবাক হওয়ার কিছু নেই, বাবা। তুমি ঠিকই শুনেছ।”
এরপর আর কিছু না বলে চুপচাপ খেতে লাগল সে।
অন্যদিকে জামসেদ রহমান এখনও কিছুটা হতভম্ব। কয়েক মুহূর্ত পর মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠে। সেই হাসিতে যেন স্বস্তি আর আনন্দ একসঙ্গে মিশে আছে।
“তোর যখন ইচ্ছে হবে, তখনই অফিসে জয়েন করিস। তার আগে মন ভরে ঘুরে আয়। চাইলে তোর বান্ধবীদেরও সঙ্গে নিয়ে যাস। সব খরচ আমার। এটাকে আমার পক্ষ থেকে একটা ট্রিট ভাবিস।”
বাবার কণ্ঠের উচ্ছ্বাস লুকোনোর কোনো চেষ্টা ছিল না। কথাগুলো শুনেই বোঝা যাচ্ছে, তিনি ভেতর থেকে কতটা খুশি হয়েছে।
বাবার সেই ছেলেমানুষি দেখে সায়মার মুখেও অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে। অনেক দিন পর বাবাকে এতটা নিশ্চিন্ত আর আনন্দিত দেখে সে। সেই হাসিটুকুই যেন তার মনটাকেও অদ্ভুত এক শান্তিতে ভরে দেয়।
……………………………………………..
দু সপ্তাহ পর…………
আজ চাঁদদের ডাইনিং টেবিলটা যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। সকালের নাস্তা খেতে সবাই একসঙ্গে বসেছে বলেই চারদিকে হাসি-আড্ডার আমেজ।
টেবিলে বসে আছে চাঁদের বাবা রফিক হোসেন, চাচা মোজাম্মেল হোসেন, সাইফ, তায়েবা, সাজেদ আর চাঁদ। অন্যদিকে চাঁদের মা কোহিনূর আর চাচি ব্যস্ত সবার প্লেটে নাস্তা পরিবেশন করতে।
গল্প আর হাসি-ঠাট্টায় জমে উঠে পুরো পরিবেশ। এই আনন্দের মূহুর্তে মোজাম্মেল হোসেন ঠিক করলেন আরেকটা খুশির সংবাদ জানাবেন। গতকাল রাতে স্ত্রী এবং ভাই ভাবীর সাথে পরামর্শ করেছিলেন এটা নিয়ে। সেখানে তায়েবা ও ছিলো।
তবে সংবাদ টা সবাইকে জানানোর আগেই যেন নেমে এলো একরাশ অশনি সংকেত।
হঠাৎ করেই তায়েবা কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মনে হলো চারপাশটা ঘুরছে। কয়েক সেকেন্ড নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করলেও পারল না। মুহূর্তের মধ্যেই শরীরটা ঢলে পড়ল মেঝেতে।
“তায়েবা!”
একসঙ্গে কয়েকটি আতঙ্কিত কণ্ঠ ভেসে উঠল।
সবাই চেয়ার ছেড়ে ছুটে গেল তার দিকে। মুহূর্তেই হাসিখুশি পরিবেশটা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় ভরে উঠল। সবার মুখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তায়েবার প্রচণ্ড মাথাব্যথা আর মাঝেমধ্যে বমি বমি ভাব হচ্ছিল। কিন্তু সে বিষয়টাকে সাধারণ সমস্যা ভেবেই কাউকে কিছু জানায়নি।
বোনের এমন অবস্থা দেখে সাইফ যেন পাথর হয়ে গেল। চেয়ার ছেড়ে উঠতে চাইলেও শরীর যেন সাড়া দিচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কেউ তাকে শক্ত করে আটকে রেখেছে।
সাইফের এমন অবস্থা দেখে সাজেদ আর এক মুহূর্তও দেরি করে না। দ্রুত তায়েবার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার নাম ধরে কয়েকবার ডাকে। কোনো সাড়া না পেয়ে সব দ্বিধা-সংকোচ ঝেড়ে ফেলে তায়েবাকে কোলে তুলে নেয়। তারপর দ্রুত তার রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
সেই মুহূর্তে কারও মাথায় আর অন্য কোনো চিন্তা ছিল না। সবার মনজুড়ে শুধু একটাই প্রশ্ন— তায়েবার কী হয়েছে?
তবে পুরো ঘটনাটা একদৃষ্টে দেখছিল চাঁদ।
সাজেদের চোখেমুখে তায়েবার জন্য যে তীব্র উদ্বেগ, সেই দৃশ্যটা যেন তার বুকের ভেতর ছুরির মতো বিঁধে। আগে দু-একবার তাদের হাসিমুখে কথা বলতে দেখেছিল। কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো, হয়তো সাজেদ সত্যিই তায়েবাকে ভালোবাসে।
একদিকে তায়েবার এমন অসুস্থতা, অন্যদিকে নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে অন্য একজনের জন্য এতটা ব্যাকুল হতে দেখে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো তার। তবু কারও সামনে নিজের ভাঙন প্রকাশ করল না।
নিঃশব্দে চোখের কোণের জল মুছে সবার পেছন পেছন সেও তায়েবার রুমের দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারী লাগছিল।
……………………………………………………..
সায়মা ঘুরে এসেছে দু দিন হলো। আসার পরের দিন থেকে বাবার অফিসে জয়েন করে। এখন বাবা মেয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করতেছে। দুজনেই অফিসে যাওয়ার জন্য একিবারে তৈরি হয়েই নেমেছিল। নাস্তা নাস্তা করতে করতে জামশেদ রহমান সায়মা কে বললো,
” মা, আমি কি কোনোদিন তোমাকে কোনে কিছু নিয়ে মানা করেছিলাম? তোমার কাছে কি কোনো কিছু চেয়েছিলাম?”
বাবার মুখে কথা গুলো শুনে সায়মার নাস্তা করা থেমে যায়। বাবার কথা শুনে কিছুটা অবাক ও হয়েছে। ভেবে বুঝে উঠতে পারেনাই বাবা কথাগুলো কেনো বলতেছে। কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে,
” তা তো করো নাই। আর না কিছু চেয়েছ। তবে আজকে কেনো এই কথাগুলো বলতেছো?” কথাগুলো শেষ করে বাবার দিকে প্রশ্নবোধক চোখে চাই সায়মা।
জামশেদ রহমান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
” তোমাকে না জানিয়ে আমি একটা কাজ করে ফেলেছি। জানিনা আমি ভুল করেছি কিনা তবে আমার মনে হলো আমি যা করছি তা তোমার ভালোই হবে।”
একটু থেমে আবার বলে,
” আরেকটা অন্যায় করে ফেলেছি। তোমার থেকে অনুমতি না নিয়ে কথাও দিয়ে দিছি।”
বাবার কোনো কথায় সায়মা বুঝতে পারে না। বাবা কি কথা দিয়েছে আর কি ভুল করেছে। তাই জিজ্ঞেস করে,
” কি বলতে চাচ্ছো সেটা ক্লিয়ারলি বলো। আমি কিছু বুঝতেছি না।”
” তোমার সাথে আমার বন্ধুর ছেলের বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি।”
বাবার মুখে কথাটা শুনে হাত থেকে চামচ টা পড়ে যায়। তার চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। মনে হলো, এক মুহূর্তে চারপাশের সব শব্দ থেমে গেছে। শুধু বাবার শেষ কথাটাই বারবার তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
মেয়ের এমন হতভম্ব চেহারা দেখে অনুনয় করে বলে,
” তুই কোনো রিয়েক্ট করিস না। আমার কথাটা রাখ মা। তোর কাছে তো বাবা কোনোদিন কিছু চাই নাই তাই না। আমার কথাটা একটু রাখ।”
বাবার এমন অনুনয় দেখে সায়মা না ও করতে পারতেছে না আবার হ্যা ও বলতে পারতেছে না। এখনও সাজেদ থেকে মন উঠে নাই। আরে সময় লাগবে। তবুও বাবাকে নিরাশ করতে চাই নাই। তাই শান্ত কন্ঠে বলে,
” তোমার যেটা ভালো মনে হয় সেটা করো। তবে তাড়াতাড়ি কিছু করিও না। আমার কিছুদিন সময় লাগবে না।” কথাটা বলেই উঠে যায় সায়মা। আর কোনোদিক না চেয়ে সোজা বাহিরে বের হয়ে যায়।
………………………………………….
দীর্ঘ পনেরো মিনিট পর ধীরে ধীরে তায়েবার জ্ঞান ফিরল। চোখ খুলতেই চারপাশে উদ্বিগ্ন মুখগুলো দেখতে পেল সে।
একটু আগেই পারিবারিক ডাক্তার এসে দেখে গেছেন। কিন্তু তার কথায় কারও মনেই স্বস্তি আসেনি। তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। শুধু যত দ্রুত সম্ভব কয়েকটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়ে গেছেন। রিপোর্ট না দেখে কিছু বলা সম্ভব নয়, এটুকুই বলেছেন তিনি।
তবে যাওয়ার আগে মোজাম্মেল হোসেনকে আলাদা করে এক পাশে ডেকে কী যেন বলেছিলেন। তারপর থেকেই মানুষটা অস্বাভাবিক চুপচাপ।
পরিবারের সবাই বারবার জানতে চেয়েছে ডাক্তার কী বলেছেন। কিন্তু তিনি প্রতিবারই এড়িয়ে গেছেন। মুখে যেন তালা লেগে গেছে। তার এই নীরবতা সবার মনে অজানা এক ভয় আরও বাড়িয়ে দিল।
আজ আর কারও অফিসে বা কর্মস্থলে যাওয়া হলো না। মোজাম্মেল হোসেন এক মুহূর্তও দেরি করতে রাজি নন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, আজই তায়েবাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে সব পরীক্ষা করাবেন। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“ওকে তৈরি করে দাও। এখনই বের হব।”
স্ত্রী নীরবে মাথা নেড়ে তায়েবার রুমের দিকে চলে গেলেন।
ঘরের এক কোণে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিল সাজেদ।
তার ভীষণ ইচ্ছে করছিল তাদের সঙ্গে হাসপাতালে যেতে। তায়েবার পাশে থাকতে। কিন্তু সেই অধিকার তার নেই। সাইফ আছে, পরিবারের সবাই আছে। এমন অবস্থায় সে যাওয়ার কথা বললে কেউ হয়তো অন্যভাবে ভাবতে পারে।
তাই বুকভরা অস্থিরতা নিয়েই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল সে। চোখে-মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ, অথচ সেই উদ্বেগ প্রকাশ করারও যেন কোনো অধিকার নেই তার।
……………………………
একদিন পর রিপোর্ট গুলোর জন্য এসেছে মোজাম্মেল হোসেন আর তার স্ত্রী। দুজনেই এখন ডাক্তার এর কেবিনে বসে আছেন। আর ডাক্তার রিপোর্ট গুলো দেখতেছে। কিছুক্ষণ দেখার পর ডাক্তার খুব বিনীত কন্ঠে বলে,
” আমরা রিপোর্ট গুলো ভালো করে দেখেছি। দেখে যা বুঝলাম আপনাদের মেয়ের ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। আর দু একটা পরীক্ষাদিবো এগুলো করান। তারপর সে রিপোর্ট দেখে বলতে পারবো কোন স্টেজে চলতেছে।”
ডাক্তার এর কথা শুনার সাথে সাথে তায়েবার মা বাবা দুজনেই স্তব্ধ হয়ে যায়। তাদের যেনো বিশ্বাসই হচ্ছে না ডাক্তারের কথাটি। ভুল শুনছে কিনা তা জানার জন্য মোজাম্মেল হোসেন জিজ্ঞেস করে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
” ডাক্তার আপনার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে বা রিপোর্ট এ সমস্যা থাকতে পারে। আমাদের মেয়ের এমন হওয়ার কথা না।”
” আপনাদের অবস্থা আমি বুঝতেছি। তবে আমি যা বলছি সব সত্যিই। হয়তো আপনাদের মেয়ের হাতে আর বেশিদিন সময় নাই। তবে বাকি রিপোর্ট দেখে বলতে পারবো কতদিন হাতে সময় আছে। রোগটা আজকে হয়েছে এমন না। আগে থেকেই হয়েছে। হয়তো আপনার মেয়ে গুরুত্ব দেই নাই।”
” আল্লাহ”
একটা শব্দ উচ্চারণ করতে পারলো তায়েবার মা। তারপর অজ্ঞান হয়ে যায়। আর তায়েবার বাবা নিজেও এই মানসিক ধাক্কা সামলে উঠতে পারতেছে না। তার বুক ছিড়ে যাচ্ছে। মেয়ে হলে নিশ্চিত চিৎকার দিয়ে কান্না করে দিতো। তিনি বুঝতেছেন না নিজেকে সামলাবেন নাকি স্ত্রী কে। খুব কষ্টে নিজেকে শক্ত করে স্ত্রী কে ধরে রাখলেন। ডাক্তার আগেই একজন ওয়ার্ড বয়কে ডেকে পাঠিয়েছেন একটা স্ট্রেচার নিয়ে আসার জন্য। একটু পর একজন স্ট্রেচার নিয়ে আসলে স্ত্রী কে সেখানে শুইয়ে দিলে ওয়ার্ড বয় নিয়ে যায় একটা কেবিনে। সেখানে শুইয়ে দেওয়া হয়। ডাক্তার জানাই ধাক্কা সামলাতে পারে নাই বিধায় অজ্ঞান হয়ে গেছে। তেমন কোনো সমস্যা না।
মোজাম্মেল হোসেন এক হাতে সামলাতে পারবেন না বিধায় ভাইকে কল দিয়ে আসতে বললেন। রফিক হোসেন ছোট ভাই এর কল ফেয়ে সাথে সাথে চলে আসে। এসে ভাই থেকে জিজ্ঞেস করে,
” রিপোর্ট এ কি বলছে ডাক্তার। আর তোকে এমন কেনো লাগতেছে। তোর স্ত্রী কই?”
“ভাই আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার মেয়ে, আমার মেয়ে”
আর কিছু বলতে পারলেন না কান্নায়। এতোক্ষণ পর একটা ভরসা যোগ্য কাধ পেয়ে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেই। এদিকে রফিক কিছু না বুঝে চিন্তায় পড়ে যায়। বুঝে উঠতে পারেনা কি হচ্ছে। তাই জিজ্ঞেস করে,
” তায়েবা মামনির কি হয়েছে। রিপোর্ট এ কি আসছে বল?”
” আমার মেয়ের নাকি ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। ভাই আমি কেমনে বাঁচবো। ও ভাই আমার মেয়ে।”
কান্না কান্না করতে করতে জবাব দেই মোজাম্মেল। ভাতিজীর এমন খবর শুনে রফিক হোসেন নিজেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ভাইকে জড়িয়ে ধরা হাত যেনো পড়ে যায়। ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে। ঠিক শুনছে কিনা সেটাও বুঝতে পারেনা। ভাইকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দেখতে পান মোজাম্মেল হোসেন কেমন যেন শান্ত হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ নিজে নিজে প্রলাপ করতে করতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আর রফিক হোসেন নির্বাক চোখে তা চেয়ে থাকে।
চলবে……
[ গল্পে ভুল ত্রুটি থাকলে ধরাই দিয়েন। ভালো লাগলে জানিয়েন। ধন্যবাদ ]

