চোরাবালির_পিছুটানে (০৮)—স্পেশাল পার্ট #জেরিন_আক্তার

0
2

#চোরাবালির_পিছুটানে (০৮)—স্পেশাল পার্ট
#জেরিন_আক্তার

রাদিফ রাহার আর রাজের ব্যাপারটা সাইমনকে বলতে নিয়েও বলে না। কথা ঘুরিয়ে বলে উঠে,

“ফ্যামিলির মধ্যে একটু সমস্যা চলছে তাই ওকে এখানে নিয়ে এসেছি।”

সাইমন আগ্রহ নিয়ে বলে,

“কি এমন সমস্যা যার কারণে তু্ই ওকে এভাবে লুকিয়ে নিয়ে এলি। দেশেও তো রাখতে পারতি।”

“দেশে বিশ্বস্ত কাউকে পাইনি তাই ওকে আমার কাছেই নিয়ে এসেছি।”

“ওহ। তাহলে রাহা এখানে থাকুক। পড়াশোনা করতে চাইলে করুক।”

“হুম। সবটাই রাহার কাছে। ওর যদি এখন পড়াশোনা করতে ইচ্ছে করে করবে আর যদি ইচ্ছে করে দেশে চলে যাবে তাহলে তাই পাঠিয়ে দেবো।”

সাইমন কপালে ভাজ এনে বলে,

“দেশে পাঠিয়ে দিবি মানে? ও এখানে থাকবে না?”

রাদিফ সাইমনের দিকে তাকিয়ে বলে,

“ওর ইচ্ছে।”

সাইমন আর কোনো প্রশ্ন করলো না। মাথায় তার কিচ্ছু ঢুকছে না। একবার বলছে ফ্যামিলির সমস্যার জন্য রাহাকে নিয়ে এসেছে। আবার বলছে রাহার ইচ্ছে হলে থাকবে না হলে চলে যাবে। সাইমন মনে মনে ভাবলো,, রাহাকে কিছুতেই যেতে দিবে না। রাহার জন্যই তার এতো উড়াতাড়া করে এখানে আসা। এখানে এসে রাহার সাথে ভালো করে দুটো কথাও বলতে পারলো না আর বলছে রাহার ইচ্ছে হলে ওকে দেশে পাঠিয়ে দিবে।

সাইমন গম্ভীর হয়ে রইলো। রাদিফ নিজের মতো ড্রাইভ করতে লাগলো।

রাত দশটার দিকে রাদিফ আর সাইমন বাড়িতে ফিরলো। রাদিফ গাড়ি পার্ক করতে গেলো। আর সাইমন আগে বাড়িতে ঢুকলো। রাহা ঘুমায়নি। ড্রইং রুমে বসে ছিলো। সাইমন রাহার দিকে এগোতে এগোতে বলে,

“রাহা ঘুমাওনি?”

রাহা বলে,

“না, ভাইয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভাইয়া কোথায়, আসেনি?”

“এসেছে! গাড়ি পার্ক করতে গিয়েছে।”

বলতে বলতেই রাদিফ বাড়িতে ঢুকলো। মেইন দরজা লাগিয়ে এগিয়ে এলো। সাইমন নিজের মতো সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। রাদিফ রাহার কাছে এসে বলে,

“কিরে ঘুমাসনি কেনো এখনও? এভাবে জেগে থাকলে নিজে তো অসুস্থ হবিই আর বাচ্চাটাও অসুস্থ হবে।”

রাহা উঠে দাড়িয়ে বলে,

“ভাইয়া, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে!”

রাদিফ বলে,

“এখন কোনো কথা নয়। রুমে গিয়ে চুপটি করে শুয়ে পড়বি। আর শোন, কালকে তোকে আমার সাথে হসপিটালে যেতে হবে!”

রাহা কপাল কুঁচকে উঠে বলে,

“হসপিটালে কেনো?”

“তোর চেকাপের প্রয়োজন!”

রাহা মাথা নাড়িয়ে বলে,

“ঠিক আছে।”

“এখন গিয়ে শুয়ে পড়! আর যা বলার কালকে সকালে বলবি!”

“ঠিক আছে।”

রাহা সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো। রাদিফও উপরে নিজের রুমে চলে গেলো।

সাইমন তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো। উদ্দেশ্য রাহার সাথে কথা বলা। কিন্তু নিচে এসে রাহাকে দেখতে না পেয়ে মেইডকে বলে,

“এখানে রাহা ছিলো ও কোথায় গিয়েছে?”

“স্যার উনাকে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়তে বললো। তাই উনি চলে গিয়েছে নিজের রুমে।”

এই শুনে সাইমন কিছু বললো না। ডাইনিং টেবিলে বসে পড়লো। মেইড সাইমনকে খাবার বেড়ে দিলেন। এর একটু পরে রাদিফও এলো।

____________________

রাজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজেদেরই একটা ফ্ল্যাটে উঠেছে। কাউকে জানায়নি এখনও। আর জানানোর প্রয়োজনও মনে করছে না। সব মিলিয়ে কেমন একটা উন্মাদ হয়ে উঠেছে। তার বাবার থেকেও কিছুই জানতে পারলো না। তবে রাজ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে তার বাবাই রাদিফকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বাধ্য করেছে।

রাজ ফোনটা বের করে পুলিশকে ফোন দিলো। পুলিশের থেকেও রাহার কোনো খোঁজ পাওয়া গেলো না। রাহা কোথায় আছে, কি করছে কিচ্ছু জানতে পারছে না।

রাজ রাদিফকে কল দেয়। কালকে রাদিফের সাথে কথা হয়েছিলো। আর এরপরে রাদিফের সাথে কথা হয়নি। রাদিফ আজ রাজের প্রথম কলটাই রিসিভ করে। রাজ বলে,

“হ্যালো রাদিফ কেমন আছিস?”

“ভালো। তু্ই কেমন আছিস?”

“ভালো। রাদিফ, শোন!”

“হ্যা বল!”

“রাদিফ আমি এখনও রাহাকে খুঁজে পাইনি। অনেক খুঁজেছি, কোত্থাও রাহাকে পাইনি। পুলিশও কোনো ইনফরমেশন দিতে পারছে না।”

রাদিফ গম্ভীর গলায় বলে,

“ওহ, আর তোর বাপের থেকে থেকে কিছু জানতে পেরেছিস? কিছু বলেনি তোকে?”

রাজ থমথমে গলায় বলে,

“না, বাবার থেকে কোনো উত্তরই পাইনি। যার কারণে আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি। তবে আমি এইটুকু নিশ্চিত বাবা আমাদের থেকে কিছু লুকাচ্ছে।”

রাদিফ বলে,

“বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলি এখন একা একা কি করবি? আর রাহাকেই একা একা কি করে খুজবি?”

রাজ নিচু গলায় বলে,

“আমি নিজেও জানি না রাহাকে একা একা কোথায় খুঁজবো। এমন কোনো জায়গা বাদ নেই যেখানে ওকে খুজিনি। আর কোথায় কোথায় খুঁজবো! ও আমার প্রতি এতো রাগ নিয়ে কি করে আছে আমি ভেবে পাচ্ছি না। তখন ভুল করেছিলাম। ও তাই বলে এখনও আমার সাথে এভাবে অভিমান করে লুকিয়ে আছে। আমার বাচ্চাটার কথা ভেবেও তো ফিরে আসতে পারে।”

কথাগুলো বলতে বলতে রাজের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়ছে। রাদিফও ফোনের ওপাশে থেকে বুঝতে পারছে। রাদিফ শান্তনা দিতে বলে উঠে,

“তু্ই চিন্তা করিস না। দেখবি রাহা চলে আসবে তোর কাছে।”

“ভাই বিশ্বাস কর, আমার এখন একটা সেকেন্ডও যাচ্ছে না। কি করে কোথায় খুঁজবো আর। আমার নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছে করছে। আমার ভুলের জন্যই রাহা আমার থেকে আলাদা হয়ে গেলো।”

রাদিফ বলে,

“দেখ, আমরা চোখের সামনে যা দেখতে পাই বা যা শুনতে পাই সেটা আসল থাকে না। ঠিক তেমনই তু্ইও আমার আর মিষ্টির ব্যাপারটা শুনে রাহাকে অস্বীকার করেছিস। তু্ই তো উপরে দেখেই প্রতিশোধ নিতে গিয়েছিলি। একবারও ভিতরের খোঁজ নিসনি।”

রাজ চোখ মুছে বলে,

“ভাই আমায় বলনা কি হয়েছিলো? কি কারণে তু্ই আজ আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলি?”

রাদিফ চোখ বন্ধ করে তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে,

“থাক ওসব। এখন রাহাকে খোজা ইম্পরট্যান্ট বেশি। আমি আমার কিছু বন্ধুদের জানাচ্ছি। দেখি ওরা কোনো খোঁজ দিতে পারে নাকি। আর তু্ই বাড়িতে ফিরে যা। আমার জন্য কেনো নিজেদের মধ্যে ঝামেলা করে আলাদা থাকবি।”

রাজ বলে,

“না, আমি আর ওই বাড়িতে ফিরে যাবো না। যদি যেতেই হয় রাহাকে আর তোকে সাথে নিয়েই যাবো। যেখানে থেকে তু্ই চলে এসেছিস, রাহা চলে গিয়েছে সেখানে আমি ফিরে যাবো না।”

এমন সময় রাজের ফোনে পুলিশের নাম্বার থেকে কল আসে। তাই রাদিফকে বলে,

“তোকে একটু পরে ফোন করছি। থানায় থেকে কল এসেছে।”

“ঠিক আছে।”

রাজ রাদিফের কল কেটে দিয়ে পুলিশের ফোনটা রিসিভ করে।

“হ্যালো, পুলিশ অফিসার বলুন!”

“আপনার থেকে একটা পারমিশন নিতে চাচ্ছি!”

“কি পারমিশন!”

“স্যার আমরা এয়ারপোর্টেও খোঁজ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন আপনি যদি বলেন তাহলে আমরা এগোবো।”

এই শুনে রাজ বলে,

“না আমার কোনো অনীহা নেই। আপনারা খোঁজ নিন। আর একটু তাড়াতাড়ি করুন।”

“ঠিক আছে!”

রাজ কল কেটে দেয়। এরপরে আবার রাদিফকে কল দেয়। রাদিফ কল রিসিভ করে বলে,

“থানায় থেকে কি বললো? রাহার কোনো খোঁজ পেয়েছে?”

“না খোঁজ পায়নি। উনারা এখন এয়ারপোর্টে খোঁজ লাগাতে চায়।”

“ওহ। লাগাক!”

__________________

পরদিন সকালে রাহার একটু আগেই ঘুম ভাঙলো। বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানা গুছিয়ে বেলকনিতে গেলো। বেলকনি থেকে বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। বাগানটায়ও খুব সুন্দর পরিবেশ। সবুজ সবুজ ঘাস। অনেক রকমের ফুল গাছ লাগানো। রাহা সকালের এই স্নিগ্ধ পরিবেশ খুব ভালো মতোই উপভোগ করতে লাগলো।

এমন সময় বাগানে এলো সাইমন। প্রতিদিনের মতো সকাল সকাল হাটাহাটি করতে বেরিয়েছে। সাইমন রাহাকে দেখার আগেই রাহা নিজের রুমে চলে এলো। এরপরে রুমের দরজা খুলে নিচে চলে গেলো।

মেইড কিচেনে রান্না করছিলো। রাহা কিচেনে ঢুকলো। মেইডটি রাহাকে বলে,

“একি তুমি কিচেনে এলে, তোমার কিছু লাগবে? লাগলে বলো আমি করে দিচ্ছি!”

রাহা মুচকি হেসে বলে,

“না, আমার কিছু লাগবে না। আসলে আপনি কি করছেন সেটাই দেখতে এলাম!”

“ওহ। তবে স্যার কিন্তু তোমাকে এখানে দেখলে খুব রাগ করবে।”

“ভাইয়া কিছুই বলবে না। আচ্ছা ভাইয়া কি উঠেছে?”

“না, তোমার ভাইয়া উঠেনি। শুধু সাইমন স্যারকে উঠতে দেখলাম।”

“ওহ।”

রাহা মেইডের সাথে টুকটাক কথা বলে চলে এলো ড্রইং রুমে। সোফায় বসতেই সাইমন বাড়িতে ঢুকলো। রাহাকে একা বসে থাকতে দেখে মুচকি হেসে এগিয়ে এসে বলে,

“রাহা, কেমন আছো?”

“ভালো। আপনি?”

“ভালো।”

সাইমন সোফায় বসলো। রাহার থেকে একটু দূরত্ব নিয়েই বসলো। এরপরে বলে উঠে,

“রাহা, তোমার এখানে ভালো লাগছে না?”

রাহা হাসার চেষ্টা করে বলে,

“ভালোই লাগছে!”

“রাহা, তোমাকে একটা কথা বলবো!”

“হুম। বলুন!”

“কালকে তোমার ভাইয়া বললো তুমি নাকি এখানে বিপদে পড়ে এসেছো। আর নাকি ইচ্ছে হলে চলেও যাবে?”

রাহা হাত কচলাতে কচলাতে বলে উঠে,

“হুম ভাইয়া ঠিকই বলেছে।”

সাইমন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠে,

“কিন্তু চলে যাবে কেনো? এখানে যখন এসেছো, তাহলে পড়াশোনা বা নিজের মনমতো কিছু একটা করো দেখবে এখানে মন বসে গিয়েছে। দেখবে আর চলে যেতে ইচ্ছে করবে না।”

রাহা সাইমনের কথা শুনে বুঝতে পারলো, সাইমন এখনও জানে না তার আর রাজের সম্পর্কের কথা। এমনকি বাচ্চাটার কথাও জানে না। হয়তো তার ভাই সাইমনকে ইচ্ছে করেই জানায়নি।

এর মাঝে রাদিফ নিচে নেমে এলো। রাহা ও সাইমনকে বসে থাকতে দেখে নিজে চলে গেলো কিচেনে মেইডের কাছে। মেইড রাদিফকে দেখে বলে,

“স্যার কিছু লাগবে?”

“না, শুনুন, আজ রাহাকে নিয়ে আপনাকে একটু হসপিটালে যেতে হবে। ওর চেকাপের প্রয়োজন। আর আমার আজ অফিস নেই। আমিও সাথে যাবো।”

মেইডটি মাথা নাড়িয়ে বলে,

“ঠিক আছে স্যার।”

রাদিফ কিচেনে মেইডের সাথে কথা বলে এগিয়ে আসে ড্রইং রুমে। এসে দেখে সাইমন চলে গিয়েছে উপরে। রাহা একা বসে আছে। রাদিফ রাহার পাশে বসে। এরপরে রাহার দিকে তাকিয়ে বলে,

“রাতে কি বলতে চেয়েছিলি?”

রাহা বলে,

“ভাইয়া,, রাজ এখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। এখন তুমি কি চাও, আমি কি চলে যাবো?”

রাদিফ কিছুক্ষণ চুপ রইলো। এরপরে নরম গলায় শুধালো,

“তোর জীবন, তোর সন্তানের জীবন, এখন তোর হাতে। তোর ইচ্ছে হলে তু্ই রাজের কাছে ফিরে যা। আমি তোকে বাঁধা দিবো না।”

রাহা মাথা তুলে তাকালো ভাইয়ের দিকে। রাদিফ লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,

“দেখ, এখন আমি নিজ ইচ্ছেতে চলে এসেছি। আমি আর ফিরেও যেতে চাইনা। এমন কি নিজের মতো করে জীবনটা গুছিয়েও ফেলেছি। আর তোর জীবন আর তোর সন্তানের জীবনটা সবে মাত্র শুরু। আমার কাছে বেস্ট সাজেসশন হলো তু্ই রাজের কাছে ফিরে যা।”

রাহা চুপচাপ ভাবতে লাগলো সে কি করবে। রাদিফ নীরবতা ভেঙে বলে উঠে,

“রাজ বাড়ি থেকে চলে গিয়েছে।”

রাহা কপালে ভাজ এনে বলে,

“চলে গিয়েছে? কিন্তু ও বাড়িতে থেকে কেনো চলে গিয়েছে?”

রাদিফ তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে,

“নিজের বাপের সাথে রাগারাগি করে চলে গিয়েছে কালকে। এখন মনে হয় ওদের নিজেদেরই কোনো ফ্ল্যাটে উঠেছে।”

“ভাইয়া, রাজ তো বড় আব্বুর সাথে রাগারাগি করার মতো মানুষ নয়। আর এখন কি নিয়ে এতো রাগারাগি হলো? আর বড় আব্বু, বড় আম্মু রাজকে আটকালো না কেনো?”

রাদিফ মুখে এক অদ্ভুত হাসি এনে বলে,

“রাজকে বলেছিলাম তু্ই তোর বাপের থেকে জেনে নিস কেনো আমি বাড়ি থেকে চলে এসেছি। মূলত এটা নিয়েই ওদের মাঝে এতো ঝামেলা এখন। করুক ঝামেলা তবে আমার এতে বিন্দু মাত্র আফসোস নেই।”

রাহা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু সুরে বলে,

“ভাইয়া, তুমি কি কারণে চলে এসেছো? আর এইটা নিয়েই কেনো এখন এতো ঝামেলা হচ্ছে সবার মাঝে? ভাইয়া তুমি আমাকে বলো!”

রাদিফ চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছেড়ে বলে,

“সেদিন বাড়িতে ফিরতে দেরি হয়েছিলো। মিষ্টিও কল দিয়েছিলো তাড়াতাড়ি ফিরতে। ওকে নাকি দেখতে এসেছিলো। ওর বাবার কাছের বন্ধুর ছেলে। আমি যাওয়ার আগেই উনারা ওকে দেখে চলে যায়। এরপরে তখনই মিষ্টি সবাইকে জানিয়েছিলো আমাদের কথাটা। সবাই স্বাভাবিকই ছিলো। কারও অনীহা ছিলো না। এর মাঝে আমি বাড়িতে ফিরতেই বাবা একটু আনন্দিত হয়েই বললো, আমাকে নাকি চাচ্চু ডেকেছে।”

রাহা কৌতূহল নিয়ে বলে,

“থামলে কেনো ভাইয়া?”

রাদিফ কয়েকটা শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করে,,,,

সেদিন রাদিফ রাশেদ চৌধুরীর সাথে দেখা করতে তার রুমে যায়। সে মূলত রাদিফের জন্যই বসে ছিলো। রাদিফ যেতেই উনি দরজা লাগিয়ে দেয়। এরপরে বলেন,

“তুমি কি সত্যিই মিষ্টিকে ভালোবাসো? ওকে বিয়ে করতে চাও?”

রাদিফ জোর গলায় বলে,

“হ্যা আমি মিষ্টিকে ভালোবাসি ওকে বিয়ে করতে চাই।”

রাশেদ চৌধুরী বলেন,

“আমি মিষ্টির বিয়ে তোমার সাথে দিবো না। মিষ্টির যদি বিয়ে হয় তাহলে সেটা আমার বন্ধুর ছেলের সাথেই হবে।”

“কিন্তু আমার কি দোষ, আমি তো মিষ্টিকে ভালোবাসি। মিষ্টিও তো আমায় ভালোবাসে। আর তোমরা সবাই তো এখন জেনে গিয়েছো তাহলে তুমি এখন অমত জানাচ্ছো কেনো?”

“আমি অমত জানাচ্ছি না। আমি তোমার সাথে ওর বিয়ে দিবোই না। আমার বন্ধুর সাথে কথা দেওয়া শেষ। বিয়ে হলে আমার বন্ধুর ছেলের সাথেই হবে।”

“তাহলে আমার কি হবে? আমি যে ওকে ভালোবাসি। আর তোমার মেয়েও তো আমায় ভালোবাসে।”

এই শুনে রাশেদ চৌধুরী তপ্ত গলায় বলেন,

“আমার মেয়েকে আমি যেখানে বিয়ে করতে বলবো আমার মেয়ে সেখানেই রাজি হবে। আমি যদি ওকে বলি তোমাকে বিয়ে করবে না, তাহলে করবে না।”

রাদিফ শক্ত গলায় বলে,

“আমাকে বিয়ে না করার কি কারণ? আমি খারাপ, নাকি আমি তোমার মেয়েকে সুখে রাখতে পারবো না।”

রাশেদ চৌধুরী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলেন,

“আমার কোনো ইচ্ছে বা মতই নেই তোমার সাথে মিষ্টির বিয়ে দেওয়া আর এখানে সুখে রাখা বা ভালো, খারাপ আমি বিচার করছি না। আশা করি তুমি বুঝতে পেরেছো।”

রাদিফ বলে,

“তুমি বাবার সাথে কথা বলেছো এই নিয়ে?”

“আমি কেনো তোমার বাবার সাথে এই নিয়ে কথা বলবো? আমি তো তোমার সাথে আমার মেয়ের বিয়ে দিচ্ছি না তাহলে রুবেলের সাথেও কোনো কথা হচ্ছে না।”

রাদিফ কিছুক্ষন চুপ থেকে বলে,

“বড় আব্বু, সবাই কতটা খুশি হয়েছে দেখেছো। বাবা, মা, বড় আম্মু এমন কি মিষ্টি কতটা খুশি হয়েছে। তুমি তোমার বন্ধুর দেওয়া কথা রাখতে সবার খুশি এভাবে নষ্ট করে দিবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয় তুমি আমাদের দুজনের ভালোবাসা এভাবে শেষ করে দিবে?”

রাশেদ চৌধুরী জোর গলায় বলেন,

“হ্যা দিবো।”

রাদিফ বুঝে গিয়েছে তার বড় আব্বু যা বলছে উনি তাই করবে। কিন্তু চোখের সামনে এমন করে নিজের ভালোবাসা শেষ হয়ে যাওয়াটাও দেখতে পারবে না। প্রয়োজন হলে মিষ্টিকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যাবে।

রাদিফ রাশেদ চৌধুরীকে বলে,

“আমি সবাইকে বলে দিবো তুমি তোমার বন্ধুর ছেলের সাথে মিষ্টির বিয়ের কথা দিয়েছো বলে আমার সাথে বিয়ে দিবে না।”

এই বলে রাদিফ যেই দরজা খুলতে যাবে ঠিক তখনই পেছনে থেকে রাশেদ চৌধুরী বলেন,

“রাদিফ শোনো, তুমি এই কথা টা সবাইকে বলেও মিষ্টিকে নিজের করতে পারবে না। আমি ওর বাবা, আমি ওকে বিয়ে না দিলে তুমি হাজার চাইলেও আমার অনুমতি ছাড়া ওকে বিয়ে করতে পারবে না।”

“তুমি অনুমতি না দিলেও আমি ওকে নিয়ে চলে যাবো এখানে থেকে। আমি আমার ভালোবাসা নিজের করেই ছাড়বো।”

রাশেদ চৌধুরী রাদিফের দিকে এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাঁকা হেসে বলেন,

“তুমি মিষ্টিকে বিয়ে কেনো করতে চাইছো, নিশ্চই সম্পত্তির লোভে। তোমার বাবাও হয়তো এটাই চায়। আমার মেয়েকে তোমার বউ করে অফিস, জায়গা, সম্পত্তি হয়তো নিজেদের নামে নিয়ে নিতে চায়।”

এই শুনে রাদিফের মেজাজ তুঙ্গে উঠে যায়। চোয়ালে শক্ত করে বলে,

“তোমার মন মানসিকতা এতোটা নিচ। তুমি আমার ভালোবাসার সাথে তোমার সম্পত্তির তুলনা করলে। আর আমার বাবার, তোমার মতো এতো নিচু মন মানসিকতা নেই। সম্পত্তির লোভ থাকলে আগেই নিতো। আর আমার বাবার কি তোমার থেকে কম কিছু আছে যে তোমার ওই সম্পত্তির উপরে তার নজর পড়বে।”

রাশেদ চৌধুরী তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলেন,

“সম্পত্তির যখন লোভই নেই তাহলে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছো কেনো? এর থেকে কি দাঁড়ায় তুমি আর তোমার বাবা সম্পত্তির জন্যই…..!”

রাদিফ হাত উঠিয়ে গর্জে উঠে,

“হয়েছে, আমি আর তোমার থেকে কিছুই শুনতে চাই না। তোমার সম্পত্তি নিয়ে তুমি থাকো। আমি আর আমার পরিবার তোমার সম্পত্তির উপরে থুতুও ফেলতে আসবো না।”

এই বলে রাদিফ রুমের দরজা খুলে চলে যায়। মিষ্টি তার সামনে এসে দাঁড়ায়। রাদিফ মিষ্টিকে উপেক্ষা করে চলে গেলো। মিষ্টি নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অপলক দৃষ্টিতে রাদিফের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। রাদিফের এমন রাগের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। মনে ভাবতে লাগলো, তার বাবা কিছু বলেছে নাকি!

মিষ্টি অস্থির পায়ে এগিয়ে যায় রাদিফের রুমের দিকে। রাদিফ নিজের রুমে এসে কাভার্ড খুলে সব কিছু উলোট-পালোট করে ফেলেছে। সব কিছু লেদারে ভরছে। মিষ্টি রাদিফের কাছে গিয়ে বলে,

“তুমি এগুলো কি করছো? জামাকাপড় লেদারে ভরছো কেনো?”

রাদিফ রাগী কণ্ঠে বলে উঠে,

“চলে যাবো। থাকবো না তোর বাপের বাড়িতে।”

“কি বলছো তুমি? কোথায় যাবে? আর রেগে আছো কেনো? বাবার সাথে কথা বলতে গিয়েছিলে বাবা কিছু বলেছে?”

রাদিফ ব্যাগ গুছানো রেখে বলে,

“কি বলবে তোর বাবা? আমার তো তোর বাবার কথা শুনে গর্ভে বুক ফুলে যাচ্ছে।”

মিষ্টি রাদিফকে ধরে বিছানায় বসায়। এরপরে ঠান্ডা গলায় বলে,

“কি বলেছে বাবা তোমাকে? আমাকে বলো! আর তুমি চলে যেতে চাইছো কেনো?”

রাদিফ শক্ত গলায় বলে,

“থাকতে চাইনা তোর বাবার বিলাসিতার রাজ্যে।”

মিষ্টি রাদিফের কথা কিছুই বুঝতে পারছে না। ছলছল চোখে তাকিয়ে বলে,

“থাকবে না কোথায় যাবে? আমাকে সাথে নিয়ে যাবে না?”

রাদিফ মুখ ঘুরিয়ে বলে,

“না, তু্ই তোর মতো থাক! আর আমি আমার মতো।”

মিষ্টি রাদিফের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“কি হয়েছে বলবে তো?”

রাদিফ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

“আমি নাকি তোকে তোর বাপের টাকা-পয়সার লোভে বিয়ে করতে চাইছি। তু্ই বল, আমার কিসের এতো লোভ যে এগুলোর জন্য তোকে বিয়ে করতে চাইবো। তু্ই জানিসতো আমি তোকে ভালোবাসি। আর তোর বাপ আমার সাথে তোকে বিয়ে দিবে না। তোর আর আমার ভালোবাসা লোভের সাথে তুলনা করেছে তোর ওই শয়তান বাপ। আমাদের নাকি লোভ!”

মিষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“তাহলে চলো আমিও তোমার সাথে যাবো। যেখানে তোমার কোনো সম্মান নেই আমিও সেখানে থাকবো না।”

রাদিফ চোখ-মুখ শক্ত করে বলে,

“আমি তোকে আমার সাথে নিয়ে যেতে পারবো না। তোর বাপ আমাকে কোনো অনুমতি দেয়নি। তোকে আমি চাইলে আজ এখনই সাথে নিয়ে যেতে পারি। আর তোর বাপ সত্যি ভাববে আমার আর আমার বাবার লোভ। তাই তোকে সাথে নিবোনা। আমি দেখাতে চাই তোর আমার ভালোবাসা মিথ্যে নয়।”

এই বলে রাদিফ উঠে দাঁড়ায়। মিষ্টি রাদিফকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলে,

“তুমি চলে যেও না! আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।”

রাদিফ মিষ্টির মাথায় হাত রেখে মনকে শক্ত করে বলে,

“তু্ই আমায় ভালোবাসিস তো?”

“হুম খুব ভালোবাসি।”

“তোর কি মনে হয় আমি তোকে লোভে পড়ে বিয়ে করতে চাইছি?”

“না।”

রাদিফ নিজের থেকে মিষ্টিকে ছাড়িয়ে নেয়। দুজনের চোখেই পানি। রাদিফ মিষ্টির চোখের পানি মুছে দিয়ে শুধানো গলায় বলে,

“আমার আর তোর ভালোবাসা মিথ্যে তো না! যদি আল্লাহ চায় আবার আমরা এক হবো। নয়তো আমি আর তোর সামনে আসবো না। তোর বাপের বড্ড অহংকার। আর এই অহংকারের ছায়াও আমার গায়ে লাগাতে চাই না। আজ প্রশ্ন উঠেছে আমরা লোভে পড়ে তোকে চাইছি। যা আমার এবং বাবার সম্মানে আঘাত দিয়েছে। আমি আর এখানে থাকতে চাইনা।”

মিষ্টি কাঁদতে থাকে। রাদিফ নিজের লেদার দুটো দুই হাতে নিয়ে যেই এগোতে যাবে ঠিক তখনই মিষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলে,

“তাহলে আমার কি হবে?”

রাদিফ দাড়িয়ে যায়। পেছনে ফিরে লম্বা শ্বাস ফেলে বলে,

“আল্লাহর উপরে বিশ্বাস রাখ! যদি উনি চায় তাহলে আবার আমরা এক হবো।”

এই বলে রাদিফ চলে যায়। মিষ্টি ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে। রাদিফকে আটকাতে পারলো না। আর তার বাবা তার ভালোবাসা লোভের সাথে তুলনা করেছে। মিষ্টি কাঁদতে কাঁদতে নিজেই নিজেকে সামলে উঠে দাড়ালো। মনে মনে ঠিক করলো,, যেখানে তার ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই সেখানে সেও থাকবে না। সেও চলে যাবে।

ঠিক পরেরদিনই মিষ্টিও চলে যায় তার ফুফুর বাড়িতে।

কথাগুলো শুনে রাহার চোখে বেয়ে আপনাআপনিই জল গড়িয়ে পড়ছে। তার ভাই এতকিছু সহ্য করে কি করে এতটা ঠিক আছে এটাই ভেবে যাচ্ছে। রাহা কান্নাজরিত গলায় বলে,

“ভাইয়া এতো কিছু হয়ে গেলো আর তুমি বাড়িতে কাউকে কিছু জানাওনি কেনো? বাবা-মাকে অন্তত জানাতে!”

রাদিফ গম্ভীর গলায় বলে,

“বাবাকে এইটা জানালে উনি ভেঙে পড়বে। নিজের ভাইয়ের এতো বড় কথা বাবা সহ্য করতে পারবে না।”

রাহা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলে উঠে,

“ভাইয়া আমি ফিরে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ফিরে যাবো না।”

রাদিফ বলে,

“তু্ই রাজের আর তোর বাচ্চার জন্য ফিরে যা। রাজ তোর অপেক্ষায় গুমরে গুমরে মরছে। দেখ, রাজের তো এতে দোষ নেই। ওকে আর কষ্ট দিসনা।”

রাহা চোখের পানি মুছে উঠে দাড়ালো। এরপরে কোনো কথা না বলে চলে গেলো উপরে। যাওয়ার পথে সিঁড়ির মাঝখানে সাইমনের সাথে দেখা হলো। রাহা কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজের মতো সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেলো।

সাইমন নিচে এসে খেতে বসলো। রাদিফকেও ডাকলো কিন্তু রাদিফ অসম্মতি জানিয়ে উপরে চলে গেলো। নিজের রুমে এসে বিছানায় বসে ভাবতে লাগলো কি করবে। রাহা সব জানার পরে আর ফিরতে চাইবে না এটা আগেই আচ করতে পেরেছিলো রাদিফ। আর এসব জানানোর পরে রাহা বলে দিয়েছে সে ফিরবে না। এখন রাদিফকেই,, রাহা আর রাজের দূরত্বটা শেষ করতে হবে।

বাংলাদেশ সময় সকাল নয়টার দিকে রাদিফ রাজের নাম্বারে কল দিলো। রাহার কথা আজ রাজকে জানিয়ে দিবে। রাজ রাদিফের কল পেয়ে রিসিভ করে বলে,

“হ্যালো রাদিফ কেমন আছিস?”

“ভালো। তু্ই কেমন আছিস?”

“ভালো।”

রাদিফ রাজকে বলে,

“পুলিশ এয়ারপোর্ট থেকে রাহার কোনো ইনফরমেশন দিতে পেরেছে কি?”

“না। কোনো ইনফরমেশন এখনও পায়নি। আর তু্ই তোর বন্ধুদের বলেছিলি? রাহার কোনো খবর পেয়েছিস ওদের থেকে?”

রাদিফ চোখ বন্ধ করে সোজা গলায় বলে,

“রাজ, রাহা আমার কাছে আছে।”

চলবে….

গল্পটা সন্ধ্যা ছাড়া অন্য সময় আসবে না। অন্য কোথায় পেয়ে গেলে ভাববেন না সেটা আমার লেখা। আর এই পর্বটা কেমন হয়েছে কমেন্টে জানাবেন।

ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে রেসপন্স করবেন!!!!!!

[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here