#বৌপ্রিয়া #আভা_ইসলাম_রাত্রি #পর্ব – ২৩

0
1009

#বৌপ্রিয়া
#আভা_ইসলাম_রাত্রি
#পর্ব – ২৩

শাড়ি পড়ানোর এক ফাঁকে উচ্ছ্বাস বড্ড আচমকা কুসুমকে জিজ্ঞেস করে বসল,

‘ ইয়াহিয়া ভাই কি ঊষাকে পছন্দ করেন? দেখে মনে হল আমার। তুমি কি এই ব্যাপারে কিছু জানো? ‘

কুসুম এই কথা শুনে প্রচন্ড অবাক হয়েছে। চোখ কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। উত্তেজনা সহ্য করতে না পেরে মৃদু চিৎকার দিয়ে বলল,

‘ ভাইয়া আর ঊষা আপা? ‘

কুসুমের চিৎকারে উচ্ছ্বাস কানে চেপে ধরে চোখ খিচে বলল,

‘ আস্তে কথা বলো। আমি এখানেই, শুনতে পাচ্ছি। আর শেষ উত্তর হ্যাঁ। আমার কাছে মনে হয়েছে। মিথ্যাও হতে পারে এটা। আমি শিউর নই। ‘

কুসুম এখনো হতভম্বের ন্যায় চেয়ে আছে উচ্ছ্বাসের দিকে। উচ্ছ্বাস মনোযোগ দিয়ে কুসুমকে শাড়ি পরিয়ে দিয়ে শাড়ির আঁচল পিন দিয়ে আটকে দিল। মাথার চুল খুলে বেনি করে দিতে লাগল। কুসুম অন্যমনস্ক হয়ে বলল,

‘ আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। এমন কিছু যদি হয়েও থাকে, আমার চোখে কেন পরল না। শুধু আপনার চোখেই পরল? ‘

উচ্ছ্বাস উত্তর দিল, ‘ আমার মনে হচ্ছে, ওরা ঘরের মধ্যে সন্দেহজকভাবে কিছু করে নি। বাইরে ডেইট আউট, এসব হয়ত করেছে। তাছাড়া সেদিন আমি রেস্টুরেন্টে দুজনকে দেখেছি। বেশ ক্লোজলি বসে গল্প করছিল তারা। ঊষাকে দেখে যা হয়, সে এমনি এমনি একটা ছেলের এতটা কাছে ঘেঁষবে না। নিশ্চয়ই এটার মধ্যে লাভ এফেক্ট জড়িত। ‘

কুসুম দাঁত দিয়ে ঠোঁটের একপাশ কামড়ে ধরে রেখে ভাবতে বসে। উচ্ছ্বাস আয়নায় কুসুমের দিকে চেয়ে দেখে। কুসুমকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। উচ্ছ্বাস বেনি করা শেষ হলে কুসুমের সামনে এসে দাঁড়ায়। চিন্তিত কুসুমকে দেখে নিয়ে বলে,

‘ চিন্তা করছ? ‘
‘ হু। ঊষা আপা আর ভাইয়া। আমার এসব আজব লাগছে। কখনও সেভাবে এদের দুজনকে ভেবে দেখিনি। ‘

উচ্ছ্বাস নিজের দুহাত কুসুমের কাধ ছাপিয়ে গলায় আলগা করে পেঁচিয়ে ধরল। তারপর বলল,

‘ একটু চোখ রাখো ওদের উপর। আমার কাছে মনে হচ্ছে, ঊষা যদি তোমাদের বাড়ির বৌ হবে, ব্যাপারটা খুব দারুন হবে। খালামনি দেখলাম ঊষাকে প্রচন্ড পছন্দ করে। তুমিও ঊষা বলতে পাগল। আর ইয়াহিয়া ভাই তো ভালোবাসেন। জমে ক্ষীর হয়ে যাবে সবকিছু।’

কুসুমকে এখনো চিন্তিত দেখাচ্ছে। সে মাথা নাড়ালো শুধু। উচ্ছ্বাস এটা দেখে বিভ্রান্ত হল। ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল,

‘ তুমি কি চাইছ না, ঊষা এই বাড়িতে পার্মানেন্ট হোক? কিসের চিন্তা করছ? ‘

কুসুম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘ এটা হলে আমার চেয়ে বেশি খুশি আর কেউ হবে না। আমি ঊষা আপাকে ছোট থেকেই মান্য করে এসেছি। আপু আমাকে যেভাবে কেয়ার করেন, এই বাড়ির প্রতিটা মানুষকে সেভাবে আপন করে রাখেন, এটা অন্য কেউই পারবে না, আমি জানি সেটা। কিন্তু আমি চিন্তা করছি অন্য…’

‘ কি অন্য চিন্তা? ‘
‘ আসলে আম্মা এটা কিভাবে দেখবেন? তাছাড়া দাদাবাড়ির মানুষজন কি ভাববে! মেয়েকে এখানে পড়তে দিয়েছেন। পড়তে এসে এখানে আমাদের বাড়িতেই প্রেমে জড়িয়ে গেছেন। ফুপু প্রেম ভালোবাসা ততটা পছন্দ করেন না। তাছাড়া ঊষা আপা এসএসসি পড়াকালীন আমেরিকায় ফুপার বন্ধুর ছেলের সঙ্গে বিয়ে ঠিক। দুজনের পড়াশোনা শেষ হলে বিয়ে হবে শুনেছি। আর এখন..আমাদের বাড়িতে এসে এসব। আমার মন মানছে না। মনে হচ্ছে এটা নিয়ে বড় এক ঝামেলা হবে। অশান্তি সৃষ্টি হবে। ‘

দেখা গেল উচ্ছ্বাসও চিন্তিত। সে কপাল কুচকে কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

‘ এটা আসলেই চিন্তার বিষয়। আচ্ছা সময় আসুক। দেখা যাবে সবকিছু। এখন আপাতত প্রেম করতে দাও তাদের। সময় আসলে আমরা সবাই তোমার ফুপুকে রিকোয়েস্ট করব। আর এত ভালো ফ্যামিলি তোমার ফুপু কেন হাতছাড়া করবেন? ওয়েট করো। এভরিথিং উইল বি ফাইন। ‘

কুসুম এখনো ভেবেই যাচ্ছে। উচ্ছ্বাস কুসুমকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘অনেক ভেবেছ। চলো ঘুমাবে। রাত অনেক হয়েছে। ‘
_______________________________
সকালে ঘুম ভাঙতেই কুসুম দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ঊষার ঘরের দিকে চলল। ঊষা আপা অনেক আগেই ঘুম থেকে উঠেছে। পড়ছে টেবিলে বসে। কুসুমকে দেখে ঊষা বই বন্ধ করে কুসুমের দিকে হাসিমুখে তাকালো। কুসুম মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে আছে ঊষার দিকে। ঊষাকে এভাবে দেখতে কুসুমের বড্ড ভালো লাগছে। মনের মধ্যে কেমন আনন্দের ফোয়ারা বইছে। ঊষা জিজ্ঞেস করল,

‘ এত সকালে উঠেছিস? উচ্ছ্বাসও উঠেছে? চা খাবি? বানাব? ‘

কুসুম এবার ঊষার সামনে এসে দাঁড়ালো। আরেকটু কাছে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ঊষাকে। ঊষা চমকে উঠল। কুসুম ঊষার কাঁধে মুখ গুঁজে মৃদু স্বরে বলল, ‘ আমি খুব খুশি ঊষা আপা। খুব খুব বেশি খুশি আজকে। ‘

ঊষা বুঝতে পারে না কুসুমের খুশির কারণ। তবুও কিছু বলে না। হাত উঠিয়ে কুসুমের পিঠে হাত রাখে। মুচকি হেসে বলে,

‘ উচ্ছ্বাসের জন্যেই নাকি এই খুশি? ‘

কুসুম জড়িয়ে ধরা অবস্থায় উত্তর দিল, ‘ না, এই খুশি শুধুমাত্র তোমার জন্যে। তুমি খুব ভালো আপা। আমরা সবাই তোমাকে খুব বেশি ভালোবাসি। ‘

ঊষা একের পর এক অবাক হচ্ছে। ঊষাকে এই বাড়ির সবাই খুব ভালোবাসে, এটা ঊষা জানে। তবে কেউই সেটা মুখ ফুটে না বললে, আচরণে সেটা বোঝায়। আজ এই পাগল মেয়ের কি হল কে জানে? ঊষা মৃদু হেসে বলল,

‘ আমি জানি সেটা। আমিও তোদের খুব ভালোবাসি। ‘

কুসুম সরে এলো। আঙ্গুলের ডগা দিয়ে চোখের পানি মুছে বলল,

‘ চা খাবে? আমি বানাই আজকে? ‘

ঊষা বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। শরীরে ওড়না জড়িয়ে বলল,

‘ আমি বানাব। তুই পাশে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে গল্প করবি, এতেই হবে। চল। ‘

চা বানানোর এক ফাঁকে কুসুম জিজ্ঞেস করল,

‘ আপা, কাউকে ভালোবেসেছ কখনও? ‘

ঊষার হাত থেমে গেল। কুসুমের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,

‘ হঠাৎ এই প্রশ্ন করলি যে? ‘

কুসুম হাসলো। হাতে থাকা আপেলে কামড় বসিয়ে হাসিখুশি বলল,

‘ না এমনি মনে হল। বলো না! ভালোবেসেছ কখনো? ‘

ঊষা মৃদু হাসলো। বলল, ‘ ভালোবাসি একজনকে। সময় হলে এমনি জানবি। ‘

কুসুম হাসলো লুকিয়ে। টিপ্পনী কেটে জিজ্ঞেস করল,

‘ আমি কি চিনি তাকে? সে কি আমার খুব আপন কেউ? বলো না আপা। ‘

ঊষা কিছুটা চিন্তিত হল। অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘ খুব আপন কেউ তোর। ‘

কুসুমের বুঝতে বাকি নেই, ঊষা কার কথা বলছে। কুসুমের মন আনন্দে ভরে গেল। ইয়াহিয়া উঠেছে সবে। নিজের রুম ঠেকে চেঁচিয়ে চা দেবার কথা বলছে। ইয়াহিয়া আওয়াজ পেতেই ঊষার মুখ কেমন ঝলমল করে উঠে সেটা কুসুম এই প্রথম লক্ষ্য করল। কুসুম বলল,

‘ আরো এক কাপ লাগবে। ভাইয়া উঠে গেছে ঘুম থেকে। অফিসে যাবে। ‘

ঊষা মুখ লুকানোর চেষ্টা করে বলল, ‘ আমি বানিয়ে দিচ্ছি। তুই দিয়ে আয় গিয়ে। ‘

কুসুম নিজের ভাগের চা হাতে নিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে বলল,

‘ আমি কেন নিয়ে যাব? আমার কাজ আছে। আমি চা নিয়ে নিজের ঘরে যাচ্ছি। তুমি বানাবে, তুমি নিয়ে যাবে। বাই। ‘

দেখা গেল, কুসুম হেলেদুলে গান গাইতে গাইতে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে। ঊষা কুসুমের আজকে সকালের ব্যবহার থেকে যারপরনাই অবাক। ঊষা মনে মনে ভাবছে, কুসুম কি কিছু জেনেছে? এমন অদ্ভুদ আচরণ করছে কেন?
ঊষা কি করবে? চা বানিয়ে ইয়াহিয়ার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। ইয়াহিয়া তখন রেডি হয়ে টাই বাঁধছে। ঊষাকে দেখে সে মুচকি হাসলো। ঊষা টেবিলে চায়ের কাপ রাখার ফাঁকে ফিসফিস করে বলল,

‘ আমার মনে হচ্ছে, কুসুম আমাদের ব্যাপারে কিছু জেনেছে। ‘

ইয়াহিয়াও চায়ের কাপ নেবার ফাঁকে খুব সন্তর্পনে উত্তর দিল,

‘ কেন মনে হল এটা? ‘

ঊষা উত্তর দিল,

‘ ও আজ সকাল থেকে খুব খুশি। আমি প্রেম করি কি না জানতে চাইছে। আমার মনে হচ্ছে ও জেনে গেছে। ‘.

ইয়াহিয়া উত্তর দিল,

‘ জানবে না, ডোন্ট ওরি। জানলেও আমি সামলে নেব। কখন ঘুম থেকে উঠেছ? ‘
‘ সাতটায়। ‘
‘ পড়বে এখন? ‘
‘ হু। এক্সাম কদিনের মধ্যে। ‘
‘ ওকে। আম্মা উঠেছে? ‘
‘ না,ঘুমে সবাই।’
‘ আচ্ছা, আমি যাচ্ছি আজকে। মিটিং আছে। তোমার কিছু বলা লাগবে না। আমি আম্মাকে ফোন করে জানিয়ে দেব। গুড বাই। ‘
‘ হুঁ, সাবধানে যেও। ‘

ইয়াহিয়া সুন্দর একটা হাসি দিয়ে অফিস ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ দেখার আগে ঊষা দ্রুত ইয়াহিয়ার ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তবে কেউ না দেখলেও, কুসুমের নজরে ঠিক সবকিছু স্পষ্ট দেখা দিল।

#চলবে
গল্পের পরবর্তী সকল আপডেট পেতে যুক্ত হোন লেখিকার নিজস্ব গ্রুপে। গ্রুপ লিংক,
https://facebook.com/groups/929533097975216

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here