মনের_অরণ্যে_এলে_তুমি #দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ #তাহিরাহ্_ইরাজ #পর্ব_৩৫ [ শেষাংশ ]

0
1118

#মনের_অরণ্যে_এলে_তুমি
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#পর্ব_৩৫ [ শেষাংশ ]

নতুন এক দিনের সূচনায় চরম আশ্চর্যান্বিত আজগর সাহেব! সম্মুখে দাঁড়িয়ে একদল সৎ ব্যক্তি। যাদের চাহনিতে লুকিয়ে অপরাধ দমনের তীব্র স্পৃহা। পেশাগত জীবনে তারা বেশ ক্ষমতাশালী। হাজার কোটি টাকার মালিককে এক লহমায় ফকির বানিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন। আজ এই ভ’য়ঙ্কর মানুষগুলো ওনার দোরগোড়ায় কি করছে? কেন এসেছে এখানে? আবার কোন দুঃসংবাদ! বড় করে শ্বাস ফেললেন আজগর সাহেব। পুনরায় নিশ্চিত হতে কম্পিত কণ্ঠে শুধোলেন,

” কে? কে আপনারা? ”

” দুর্নীতি দমন কমিশন। সংক্ষেপে দুদক। আশা করি এবার চিনতে পেরেছেন মিস্টার আজগর? নাকি আরো ডিটেইলসে বলতে হবে? আইডি কার্ড দেখাবো? ”

দুদক থেকে প্রেরণ করা হয়েছে এদের। বিষয়টি শ্রবণ পথে নৃ;শংসভাবে কাঁটা বি দ্ধ করে যাচ্ছিল। উচ্চ র ক্তচাপ আবার তাকে কুপোকাত করতে উদ্যত হয়েছে। প্যান্টের পকেট হতে রুমাল বের করলেন আজগর সাহেব। দ্রুত অথচ কম্পিত হাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বেদবিন্দু মুছতে লাগলেন। বক্র হাসির রেখা ফুটে উঠলো সম্মুখে উপস্থিত বাহিনীর দলনেতার অধরকোণে।

” এখনই এত ভয় পাচ্ছেন? সবে তো শুরু। ”

” ক্ কিহ্? ”

মন গহীনে উঁকি দেয়া ভয়টি অতঃপর সত্য হলো। মিললো না একবিন্দুও ছাড়। কোনোভাবেই ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারলেন না আজগর সাহেব। ওনার চোখের সামনেই সব শেষ হয়ে গেল। ধপ করে বসে পড়লেন সোফার কোলে। ধূসর মেঘ রাঙিয়ে দিলো মুখখানা। নকল দেয়ালে অবিরাম আঘাত করে চলেছে স্লেজ হ্যামার। স্বল্প সময়ের মধ্যেই গুড়িয়ে গেল নকল দেয়ালটি। অতি নি-ষ্ঠুর পন্থায় বাড়ির স্টোর রুমের এই মিথ্যে দেয়াল ভাঙ্গা হলো। বেরিয়ে এলো অজস্র বান্ডিল টাকা। অব্যবহৃত পুরনো ওয়াশরুমের কমোডের ফ্লাশ ভেঙ্গে কয়েক টুকরো হলো। সেখানেও টাকা। বাড়ির বাগানে মাটির তল, স্টোররুম, এসির ফাঁকা অংশ, পুরনো আসবাবপত্র কোথায় নেই টাকা? খন্দকার আজগর মল্লিকের নিজ বাসভবন হতেই প্রায় চল্লিশ কোটি টাকা উদ্ধার করা হলো। কালো টাকা। আজ এ মুহূর্তে শুধুমাত্র নিজ বাসভবন হতেই নয়। তার অন্যান্য ডেরা, বাংলো হতে আরো টাকা উদ্ধার করা হলো। তন্মধ্যে রয়েছে জনগণকে ঠকিয়ে বিভিন্ন সময় আ;ত্মসাৎকৃত টাকা। আজগর সাহেবের কাছ থেকে দীর্ঘ পাঁচ ঘন্টার অভিযান শেষে মোট ১৪০ কোটি টাকা উদ্ধার করা হলো। সেসবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আ;ত্মসাৎকৃত অর্থ, কালো টাকা, অনৈতিক উপায়ে উপার্জনকৃত টাকা প্রভৃতি। এক লহমায় ওনার সমস্ত জারিজুরি ফাঁ স হয়ে গেল। ওনার সব কয়টি মোবাইল তখন দুদকের কব্জায়। বিন্দুতুল্য সাহায্য মিললো না বাহির হতে। চোখের সামনে দেখলেন নিজের বিনাশ।

” ইয়্যু আর আন্ডার অ্যারেস্ট খন্দকার আজগর মল্লিক। বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে আপনাকে গ্ৰেফতার করা হচ্ছে। চলুন আমাদের সঙ্গে। ”

গ্ৰেফতারি পরোয়ানা! চোখের সামনে আঁধার ঘনিয়ে এলো। আরম্ভ বিনাশের সূচনা! আসন্ন পরিস্থিতি অনুধাবন করতেই বুকে ব্যথা আরম্ভ হলো। হৃৎপিণ্ড বরাবর হাত চেপে কাতরাতে লাগলেন আজগর সাহেব। দুদক কতৃপক্ষের এক অফিসার তীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকিয়ে। এগিয়ে গেল। বুকের ওপরে থাকা হাতটা হিচড়ে সরিয়ে ফেললো। দাঁড় করালো তাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

” অভিনয় অনেক তো করলেন। এবার ভদ্রলোকের মতো চলুন আমাদের সঙ্গে। চলুন। ”

শেষোক্ত শব্দে কাঠিন্যতা প্রকাশ পেল। দেশটির সাবেক যোগাযোগমন্ত্রীকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ সহানুভূতি দেখাতে নারাজ দুদক। দিনেদুপুরে দুর্নীতি ও মানি লন্ডারিং এর অভিযোগে গ্রেফতার হলো সাবেক মন্ত্রী আজগর সাহেব।
_

বিগত সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন খন্দকার আজগর মল্লিক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হাজার হাজার যোগাযোগ টাওয়ার নির্মাণ করার সংকল্পে অর্থ নিয়েছিল ওনার মন্ত্রনালয়। সে অর্থ উনি ও অধীনস্থ সহচররা আত্মসাৎ করেছে। অধিকাংশ যোগাযোগ টাওয়ার আজও নির্মাণ করা হয়নি। কোথাও কোথাও কম দামী, বাজে জিনিসপত্র ব্যবহার করে নিম্ন মানের টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছিল সেসময়ে। দুর্নীতি আইন লঙ্ঘন করা ছাড়াও ওনার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং এর অভিযোগ রয়েছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ উনি দেশের বাইরে পা চা র করেছেন। ভিন্ন ভিন্ন দুই অভিযোগে ওনার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’। সে প্রেক্ষিতেই আজ গ্রেফতার করা হলো। অসুস্থতার অভিনয় করেও মিললো না মুক্তি। সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ওনার উকিল।

.

‘ আনন্দাঙ্গন ‘ আর আগের মতো নেই। বদলেছে রূপ। পরিবর্তিত হয়েছে পরিবেশ। বাড়ির প্রাঙ্গনে চারদিকে নির্মাণ করা হয়েছে সুউচ্চ দেয়াল। দেয়ালের ওপর কাঁটাতারের বেড়া এবং তড়িৎ সংযোগ। দেয়াল টপকে কেউ অন্দরমহলে প্রবেশ করার চিন্তায় আছে? সে চিন্তা বদলে ফেলুক এখুনি। দেয়ালের উপরিভাগে ওঠা মাত্রই ধারালো কাঁটাতারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হবে পায়ের নিম্নতল। অধিক শক্তিশালী তড়িৎ দেহে ঝটকা দেবে কয়েকবার। সে মুহূর্তে অচেতন হয়ে দেয়াল টপকে মাটিতে পড়তে বাধ্য হবে সে-ই অযাচিত আগন্তুক। এছাড়াও বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দেহরক্ষীরা। তাদের সকলকে শহরের নামকরা সিকিউরিটি এজেন্সি হতে হায়ার করা হয়েছে। সকলের হাতেই আগ্নেয়া-স্ত্র। সুতীক্ষ্ণ চাহনি ঘুরে বেড়াচ্ছে আশপাশে। ‘ আনন্দাঙ্গন ‘ এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্বরত তারা ক’জন।

আনন্দাঙ্গনে আজ বসেছে আনন্দমেলা। প্রথমবারের মতো গৃহে প্রবেশ করেছে নতুন অতিথিদ্বয়। প্রায় একমাস শ্বাসকষ্ট ও হৃৎপিণ্ডজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসাধীন ছিল নবাগত-নবাগতা দুই অতিথি। আজ সুস্থ সবল দেহে বাড়ি ফিরেছে তারা। ঘুমন্ত ছেলে বাবুটি মায়ের উষ্ণ ওম পেয়ে ঘুমিয়ে। মেয়ে বাবুটি বাবার বুকে মাথা এলিয়ে নিদ্রায় শায়িত। হৃদির হাত ধরে ভেতরে প্রবেশ করলো রাঈশা। স্বামী স্ত্রীর অধরকোলে ফুটে উঠলো হাসির রেখা। একত্রে হাসিমুখে লিভিংরুমে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্যরা। নীতি, নিদিশা, রায়না ছুটে এলো ওদের পানে।

” ভাবী আসসালামু আলাইকুম। ওয়েলকাম ব্যাক। ”

রাঈশা সরে দাঁড়াতেই ভাবীকে আহ্লাদী একপেশে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে নিলো রায়না। হৃদি হাসলো। মায়াবী সে হাসি। কতদিন পর অধরকোণ প্রসারিত হলো। সকলে বিমোহিত হলো সে হাস্য আভায়। নীতি ও নিদিশা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। ইতিমধ্যে তাদের গম্ভীর জিজু’কে সালাম দেয়া হয়ে গেছে। দু’জনেই দ্বিধান্বিত চাহনিতে বাবুদের পানে তাকিয়ে। একবার ছেলে বাবু তো একবার মেয়ে বাবু। একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে ওরা। রাঈশা ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

” দরজার সামনে সঙ হয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? আমাদের ভেতরে যেতে দে। ”

” আরে যাবে তো। আমরা একটু বাবুদের কোলে নিই। এরপর তোমরা আরামসে আসো। ”

নিদিশা ভালো বুদ্ধি দিল। কিন্তু ওর বুদ্ধিমত্তায় ঠিক প্রসন্ন হতে পারলো না রাঈশা। নীতি দুঃখ ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,

” কিন্তু কোলে নেবোটা কাকে? দু’জনেই ঘুমাচ্ছে। এত কিউটিপাই হয়েছে না দু’টো! ঘুম ভাঙাতে ইচ্ছেই করছে না। এবার কি করি? বল তো হৃদু। ”

নাজরিন মেয়ে দু’টোকে সামনে থেকে সরিয়ে দিলেন। ইরহাম ও হৃদি’কে ভেতরে আসার পথ করে বললেন,

” তোমরা ভেতরে আসো। এ দুটোর কথায় কান দিয়ো না তো। দুটোই খুশিতে পা-গল হয়েছে। ”

নিদিশা তৎক্ষণাৎ শুধরে দিলো,

” আম্মু কারেকশন। পা’গল না পা’গলী হবে। আমাদের জেন্ডার বদলে দিচ্ছো কেন? ”

নিদিশা’র কথায় সেভাবে কেউ হাসতে পারলো না। এ বাড়ির লিভিংরুম হতে আজো দূরীভূত হয়নি শোকাচ্ছন্ন আভা। কি করে মনখুলে হাসবে তারা?

হৃদি বোনের পানে চেয়ে আলতো হাসি উপহার দিলো। ভেতরে প্রবেশ করলো মিস্টার ও মিসেস চৌধুরী। একত্রে পদচারণা তাদের। পাশাপাশি দু’জনে বসলো সোফায়। কোলে এখনো নিদ্রামগ্ন দুই সন্তান। পল্লবী ও ফারহানা এগিয়ে এলেন।

” কই? দেখি আমার নানুদের। ”

ফারহানা মেয়ের কোল থেকে আলতো করে নাতিকে কোলে নিলেন। লহমায় শিহরিত হলো তনুমন। ওনার ছোট মেয়ের আত্মজ এ। সে প্রথমবারের মতো অনুভূতি হলো। বড় কন্যা রাঈশার মেয়েকে কোলে নেয়ার মতো। নানা – নানু হবার আনন্দে এত সুখানুভূতি মিশিয়ে দিয়েছে আল্লাহ্! অবর্ণনীয়। ফারহানা ছলছল চোখে ঘুমন্ত নাতীর পানে তাকিয়ে। স্নেহময়ী চুম্বন এঁকে দিলেন ছোট্ট ওই কপালে। ঘুমন্ত শিশুটি ঈষৎ নড়ে উঠলো। পুনরায় তলিয়ে গেল নিদ্রায়। পল্লবী অশ্রুভেজা হাসলেন। ভাগ্নের কোল হতে নিলেন নাতনিকে। আনমনে নতুন বাবা সাবধানী স্বরে বলে উঠলো,

” আস্তে। ”

হালকা হাস্যোজ্জ্বল ভাব ছড়িয়ে পড়লো ঘরজুড়ে। প্রথমবারের মতো পিতৃত্বের স্বাদ কিনা। প্রথম প্রথম এমন চিন্তা, ছটফটানি হয়। ছেলেমেয়ের জন্য মন বড় পু’ড়ে। স্বাভাবিক। এজাজ সাহেব ভেজা চোখে ছেলের পানে তাকিয়ে। ওনার সে-ই গম্ভীর একরোখা ছেলেটা আজ বাবা হয়েছে। দুই সন্তানের জনক! আহ্! দাদা হবার এক চমৎকার অনুভূতি মনেপ্রাণে ছড়িয়ে পড়লো। মন কাননে ভেসে উঠলো মরহুমা স্ত্রীর মুচকি হাসি মাখা মুখশ্রী। মনে মনে অভিমান পুষে আওড়ালেন,

‘ এত আনন্দ, সুখানুভূতি তুমি দেখে যেতে পারলে না মালিহা! এভাবে চুপিসারে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে? ‘

মন গহীনের কোথায় যেন চিরন্তন সত্য রূপে সুরের মূর্ছনায় ভেসে আসছে,

‘ আলেয়ার পিছে, ছুটে মিছেমিছে
বুঝিনি তো আলোর ভাষা ও..
আজকে তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি
কাকে বলে ভালোবাসা।
আঁধারে খোঁজে মন, আলোকে সারাক্ষণ।
মেলে না, ওহোহো মেলে না। ‘
[ সিনেমা ~ সাত পাকে বাঁধা ]

এটাই চিরসত্য। আলেয়ার পিছে মিথ্যামিথ্যা ছুটতে ছুটতে আলোর ভাষাটা কখনো বোঝা হয়নি। আজ সে আলোকে হারিয়ে বোধগম্য হলো তার প্রকৃত মর্ম। হতভাগা কপাল। সময় থাকতে কেন বুঝলো না প্রকৃত মর্ম! তাহলে তো আরেকটু বেশি সুখমিশ্রিত প্রহর কাটানো যেতো। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এজাজ সাহেব। তাকালেন সকলের পানে। শোকাচ্ছন্ন বাড়িতে আজ ফিরেছে খুশির বহর। আল্লাহ্ তা’য়ালা এই খুশি, এই সুখ সদা অটুট রাখুক। সে প্রার্থনাই মনে মনে করলেন।

ভাই বোনেরা ঘিরে দাঁড়িয়ে ফারহানা, পল্লবীকে। ওনাদের কোলে ঘুমন্ত দুই পুঁচকে। সকলকে পাশ কাটিয়ে এক নিরালায় ফোনালাপে লিপ্ত ইরহাম। ওপাশ হতে শ্রবণ হলো,

” আজগর মল্লিক গ্রেফতার হয়েছে ভাই। ”

বক্র হাসির রেখা শোভা পাচ্ছে অধরকোণে। উদ্যমী স্বরে জানান দিলো চৌধুরী,

” ওয়েটিং ফর দ্য সেকেন্ড এক্সপ্লোশন। ”

তারা দ্বিতীয় বি-স্ফোরণের অপেক্ষায়। ব্যাং ব্যাং….!

দেশের মাটিতে গ্রেফতার হয়েছে পিতা। সে সংবাদ পাওয়া মাত্র গোয়ার বুকে ভ’য়াবহ হু’ঙ্কার ছাড়লো রুদ্রনীল। বিগত কতগুলো দিন তার জন্য এমনিতেই অসহ্যকর ছিল। ঘরের শত্রু বিভীষণের জন্য পরপর দু’টো বড় ডিল হাতছাড়া হয়েছে। লোকসান গুনতে হয়েছে প্রায় ষাট কোটি টাকার। বিভীষণকে চিহ্নিত করা মাত্রই তাকে পরপারের রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে সে। রুদ্রনীল একবার, সর্বোচ্চ দু’বার তোমায় শুধরে যাওয়ার সুযোগ দেবে। কিন্তু তৃতীয়বারের বেলায় সোজা ওপরের টিকিট। নৃ-শংসতার সহিত অভ্যন্তরীণ শত্রুকে হ ত্যা করলো সে। লা শে র ছোট্ট ছোট্ট টুকরো ভাসিয়ে দিলো সমুদ্রের বুকে। অতল গহ্বরে তলিয়ে গেল টুকরো গুলো। জলজ প্রাণী গিলে নিলো খাদ্য ভেবে। সে কি ভ’য়াবহতা!

আজগর মল্লিক শুধুমাত্র দুর্নীতি নয়। ফেঁসেছে শ্লী-লতাহানির অভিযোগেও। বুড়ো বাপের এই ছুঁকছুঁক স্বভাব সম্পর্কে বরাবরই অবগত ছিল রুদ্রনীল। নিজে নারীবিদ্বেষী হলেও পিতাকে কখনো শুধরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়নি। বরং সাবধানে মজা লুটে নেয়ার উপদেশ দিয়েছে। আজ কোথায় গেল সে-ই উপদেশের মর্ম? বুড়ো বয়সে কচি কচি দু’টো মেয়ের অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলো। তন্মধ্যে একটা মেয়ে বেশ অভিজাত পরিবারের সন্তান। বাবা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। সে-ই সঙ্গে সমাজসেবক। তার মেয়েকে কিনা শ্লী-লতাহানি করা! জোরালো কেস ঠুকে দিয়েছে। এত সহজে মিলবে না ছাড়। এছাড়াও দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত শক্তপোক্ত। কঠিন। আপাতত মিলবে না ছাড়।
_

নীলাভ জল আবদ্ধ বিশালাকার এ সুইমিং পুলে। স্বচ্ছ পানির বুকে দুর্ধর্ষ গতিতে সাঁতরে যাচ্ছে বলিষ্ঠদেহী পুরুষটি। দেহের উর্ধাংশ অনাবৃত। নীলাভ জল আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে দেহ। জমায়েত হচ্ছে গলদেশ, ঘাড়ে। হাত-পায়ের চমৎকার কারুকার্যে পানির বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছে মানুষটি। দীর্ঘকায় দেহের দাপটে উল্লম্ফন করছিল জলধারা। অগণ্য সময় পুলের স্বচ্ছ-শীতল গভীরতায় অতিবাহিত করলো রুদ্রনীল। ঠাণ্ডা হলো মন ও মস্তিষ্ক। সাঁতরে পুলের কিনারায় এলো সে। হেলান দিয়ে দাঁড়ালো পুলের দেয়ালে। দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটার ফলে ঘন শ্বাস পড়ছিল। দ্রুত ওঠানামা করছিল লোমহীন বক্ষপট। ভিজে চুল গড়িয়ে টুপ টুপ করে পড়ছে জলকণা। পেছনে অবস্থিত এক নারী পরিচারিকা কম্পিত হাতে যত্নের সহিত তোয়ালে দিয়ে শুষে নিলো প্রতি ফোঁটা জল। রুদ্র হাত বাড়িয়ে তোয়ালে নিলো। সে তোয়ালে জড়িয়ে নিলো গলায়। তর্জনী নাড়িয়ে ইশারা করতেই সে পরিচারিকা দ্রুত পায়ে দৃষ্টি সীমার বাহিরে হারিয়ে গেল। অতঃপর রুদ্রনীল ডান পাশে হাতটি স্বল্প বাড়াতেই এক ভৃত্য তার হাতে তুলে দিলো গ্লাস। গ্লাস হাতে নিলো বলিষ্ঠদেহী নি-ষ্ঠুর পুরুষটি। ঠোঁটে ঠেকলো গ্লাস। রঙিন পানীয়তে চুমুক দিয়ে মেটাতে লাগলো তৃষ্ণা। দু চোখে ভাবনার আনাগোনা।

কিয়ৎক্ষণ অতিবাহিত হলো। রঙিন পানীয় তখন নির্দয় পুরুষটির তৃষ্ণা নিবারণে ব্যস্ত। ভিজিয়ে যাচ্ছে গলা। ঠিক সে মুহূর্তে বেজে উঠলো রিংটোন। প্রাইভেট নম্বরে কেউ কল করেছে। যোগাযোগ করতে ইচ্ছুক। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা পি.এ দ্রুত কদম ফেলে এগিয়ে এলো। বসের হাতে তুলে দিলো আইফোনের লেটেস্ট ভার্সন স্মার্টফোনটি। কলার আইডি লক্ষ্য করে কুঁচকালো রুদ্রর দু ভ্রু। বিলম্ব না করে কল রিসিভ করলো সে। পানীয় পান করতে করতে ছোট্ট করে বললো,

” হুঁ বল।‌ ”

ওপাশ হতে লম্বা বিবরণে কোনো সংবাদ জানালো ব্যক্তিটি। সে সংবাদে আস্তে ধীরে পরিবর্তন হতে লাগলো মুখভঙ্গি। কঠোরতা প্রকাশ পাচ্ছে চোখেমুখে। ফুলে ফেঁপে উঠছে শিরা উপশিরা। হাতে বন্দী গ্লাসে জোরদার চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এই বুঝি গেল ভেঙ্গে। ওপাশ হতে প্রাপ্ত সংবাদ পুরোটা ক্রো ধ সংবরণ করে, ধৈর্য ধরে শুনলো রুদ্রনীল। উত্তপ্ত স্বরে দিলো এক আদেশ। কোনো নতুন ধ্বং-সলীলার। আবার কোথায় কি ঘটতে চলেছে! কোন নয়া লীলা খেলা হবে আরম্ভ!

ইরহাম ও হৃদির পুত্র-কন্যার আজ আকিকা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ধর্মীয় অনুশাসন মান্য করে আকিকা সম্পন্ন হয়েছে। এতদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল দুই খুদে সদস্য। তাই আকিকা করতে এতখানি বিলম্ব হলো। আকিকা উপলক্ষে দুই পরিবারের সদস্যরা এবং নিকট আত্মীয়রা উপস্থিত হয়েছিল ‘ আনন্দাঙ্গন ‘। বহুদিন বাদে বাড়ির অন্দরে খুশির ঝলকানি দেখা দিলো। নতুন সদস্যদের নামকরণ করা হলো ‘ রিহাম চৌধুরী ‘ এবং ‘মাহিকা চৌধুরী’। রিহাম নামের অর্থ হলো ‘হালকা বৃষ্টি বা ঝিরঝিরি বৃষ্টি’। মাহিকা অর্থ ‘পৃথিবী বা তুষার’। খুদে দুই পুঁচকে সদস্যকে নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রীতিমতো টানাহেঁচড়া আরম্ভ হয়েছে। কে ধরবে আগে। কে নেবে কোলে। কে দেবে চুমু। আরো কত কি। সে এক হুলস্থুল আনন্দঘন পরিবেশ। মালিহা মা বিহীন…

.

তমসাচ্ছন্ন রজনী। নিজ ঘরে বিছানায় বসে ইনায়া। কোলে সযত্নে শায়িত ভাতিজা রিহাম। ছোট ছোট চোখ দু’টো খোলা। একদৃষ্টিতে দেখছে এই সুন্দরী তরুণীকে। মনে করার চেষ্টা করছে বুঝি, এ যেন তার কি হয়! বাবার বোন তো। হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ফুপি হয়। এই সুন্দরীটা তার কিউট ফুপি। ইনু ফুপি। রিহাম সোনাটা তার ছোট্ট মুখে পেলব চারটে আঙ্গুল পুরে রেখেছে। ফুপি’কে দেখছে। আলতো করে হাসছে। ইনায়া ব্যস্ত নিজ কর্মে। সে মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করলো রাহিদ। এদিক ওদিক না তাকিয়ে সোজা বসলো বিছানায়। পরক্ষণে মাথা এলিয়ে দিলো স্ত্রীর কাঁধে। কিছু মুহূর্ত বাদে ক্লান্ত স্বরে শুধালো,

” কি করছিস বউ? ”

সে এখনো দেখেনি কি করছে তার ছোট বউ। ইনায়া বিরক্তিকর শব্দ করে লহু স্বরে বললো,

” হুশশ্। চুপ থাকো‌। কাজ করছি তো। ”

রাহিদ নাকমুখ কুঁচকে বললো,

” কোন রাজকার্য করছিস শুনি যে ক্লান্ত বরকে এক গ্লাস পানি দেয়ার সময় নেই? দেখি। ”

মাথা তুলে স্ত্রীর পানে ভালোমতো তাকালো রাহিদ। পুঁচকের দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসলো। চকিতে চমকালো বেশ!

” এসব কি? ”

চলবে.

[ প্রথম শিকার তবে আজগর ই হলো। শেষমেষ হলো নাস্তানাবুদ। হৃ’হাম দম্পতির পুঁচকে দু’টোর নাম কেমন লাগলো বন্ধুগণ? দুঃখময় পর্ব বাদে এখন বড় বড় সুখময় পর্ব দিচ্ছি। সুন্দর রূপে মন্তব্য চাই কিন্তু 💚 ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here