মনের_অরণ্যে_এলে_তুমি #দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ #তাহিরাহ্_ইরাজ #অন্তিম_পর্ব [ প্রথমাংশ ]

0
1329

#মনের_অরণ্যে_এলে_তুমি
#দ্বিতীয়_পরিচ্ছেদ
#তাহিরাহ্_ইরাজ
#অন্তিম_পর্ব [ প্রথমাংশ ]

আরেকটি নতুন দিনের সূচনা। দিনমণির দীপ্তিতে উজ্জ্বল ধরিত্রী। বাংলার মাটিতে আজ অকল্পনীয়, প্রবল এক বি-স্ফোরণের তুমুল দাবদাহ! একই দিনে চতুর্দিকে তোলপাড় সৃষ্টি করে মুখোশ উন্মোচিত হলো কিছু বিশিষ্ট জনের। সমাজের উঁচু স্তরের, মান্যগণ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত তারা। এতকাল ভালোমানুষীর মুখোশের আড়ালে লুকায়িত ছিল কালো অন্ধকারময় বি’ভৎস-জঘন্য রূপ। আজ জনসম্মুখে প্রকট তাদের সত্য রূপ। দেশের জনপ্রিয় এক সংবাদ চ্যানেলের লাইভে প্রকাশিত হলো তাদের বিরুদ্ধে সকল প্রমাণাদি। অজ্ঞাত পরিচয়ের কোনো এক সুশীল ব্যক্তি এ অসম্ভবকে সম্ভব করে তুললেন। লাইভে প্রদর্শিত হচ্ছিল একাধিক কুকর্মের প্রমাণ। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে মিডিয়ার দুর্দান্ত গতিশীলতার সুবাদে দেশের আনাচে কানাচে পৌঁছে গেল এই চাঞ্চল্যকর সংবাদ। দেশবাসী লাইভে সবটাই দেখলো। চমকালো! হলো হতবিহ্বল! একাধিক মামলা দায়ের করা হলো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। পুরনো যেসব কেস উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে এতকাল মৃ•তপ্রায় ছিল আজ সেগুলোও নতুন রূপে উন্মোচিত হলো। গ্রেফতার হলো দেশের শীর্ষস্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যক্তি, কয়েকজন সুপারস্টার। পলায়ন করলো বেশ কিছুজন। তবে তাদের বিরুদ্ধে গ্ৰেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। খুঁজে পাওয়া মাত্রই গ্ৰেফতার করার নির্দেশ। এতসব প্রমাণের ভিড়ে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী খন্দকার আজগর মল্লিক ও ওনার একমাত্র পুত্র খন্দকার রুদ্রনীল মল্লিক বাদ যায়নি কিন্তু। তাদের বিরুদ্ধেও বেশকিছু ভ’য়াবহ প্রমাণের সন্ধান মিলেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে খ্যাতিমান বিজনেস পার্সন হিসেবে পরিচিত রুদ্রনীল মল্লিকের গোপন কু”ৎসিত চেহারা অবশেষে প্রকাশ্যে এলো। প্রকাশ পেল নৃ-শংস কিছু অপরাধে যুক্ত থাকার তথ্য। রুদ্রনীলের বিরুদ্ধেও মামলা হলো। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ গোপন যোগাযোগ স্থাপিত হলো। যথাসম্ভব শীঘ্রই তারা ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। ফিরিয়ে আনবে নিজ দেশের নি-ষ্ঠুর কীটকে। নিশ্চিত করবে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
_

জহির আহসান। এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ওনার নামটিও ছিল চাঞ্চল্যকর ভাবে প্রকাশিত অপরাধীদের তালিকায়। বহু পূর্বেই ওনার নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মিসেস মালিহা চৌধুরী হ;ত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ খুঁজে যাচ্ছিল তাকে। অবশেষে আজ মিললো খোঁজ। এক অজ্ঞাত ফোনকলে পুলিশকে ওনার গোপন অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করলো একজন। পুলিশ সে অজ্ঞাত ফোনকলে ঠিকানা পাওয়া মাত্রই পৌঁছে গেল মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলায়। সেখানকার এক বাড়ি থেকে জহির আহসানকে গ্ৰেফতার করা হলো। আশ্চর্যজনক ভাবে জহির পালানোর কোনোরূপ চেষ্টাও করলো না। একদম নিশ্চল রূপে ধরা দিলো। দু হাতে পড়ানো হলো হাতকড়া। পুলিশের সঙ্গে মন্থর পায়ে বেরিয়ে এলো অন্দরমহল হতে। বাহিরে আসতেই ধক করে উঠলো বুক। জ্ব’লছে চোখ। স্বল্প দূরত্বে ওই তো দাঁড়িয়ে আপন ভাগ্নে ইরহাম চৌধুরী। ওনার নির্দয় হাত দুটো দ্বারা এতিম হওয়া সে অভাগা ভাগ্নে। সবসময়ের মতো তুষারশুভ্র পোশাক জড়িয়ে দেহে। চোখে রিমলেস চশমা। চশমার অন্তরাল হতে ফিনকি দিয়ে বেড়োচ্ছে অবজ্ঞার উত্তপ্ত-বিষাক্ত তাপ। নভোনীল দু চক্ষে আকাশসম ঘৃণার আস্তরণ। যা মিটবে না কভু। শক্ত চোয়াল। কাঠিন্যতা উপস্থিত মুখশ্রীতে। মুষ্টিবদ্ধ দু হাত। পারছে না এখুনি ওনায় প্রাণে মে-রে দিতে। আফশোস! জহিরের চঞ্চল দৃষ্টি ইরহামের পাশে গেল। দীর্ঘকায়, সৌম্যরূপী মানুষটির বাঁ পাশেই দাঁড়িয়ে ওনার সহধর্মিণী। এককালের ভালোবাসা পল্লবী। জহিরের অভিব্যক্তি প্রকাশ করছিল স্ত্রীকে দেখে সে কতটা স্তব্ধ! কোনোমতেই এখানে স্ত্রীকে আশা করেনি সে। এই দুর্ভোগের সময় জীবনসঙ্গিনীর চোখে তীব্র বিরাগ দেখাও যেন মৃ•ত্যুসম যন্ত্রণার! বুকের বাঁ পাশে যন্ত্রণা হচ্ছিল। থমকে থমকে স্পন্দিত হচ্ছিল হৃৎপিণ্ড। পল্লবীর মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। হালকা জলের উপস্থিতি চোখে। কিন্তু বুক ভরা অপরিমেয় ঘৃণার স্তূপ। স্বামী হতে তাচ্ছিল্যের সহিত দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন উনি। ফিরে দাঁড়ালেন ইরহামের পানে।

এই অমানুষটির সুবিশাল অপরাধ সম্পর্কে পল্লবী এতদিন জ্ঞাত ছিলেন না। মালিহা হ•ত্যামামলার বিষয়টি ওনার থেকে গোপন করা হয়েছিল। তবে এক সপ্তাহ পূর্বে ইরহাম, রাহিদ দুই ভাইয়ের গুরুগম্ভীর কথোপকথন দুর্ভাগ্যজনক ভাবে উনি শুনে ফেলেন। তখনি জানতে পারেন অতি স্নেহের-ভালোবাসার একমাত্র ননদের করুণ-নৃশংস মৃ•ত্যুর পেছনে ওনার কু•লাঙ্গার স্বামীও জড়িত। দুঃখ-যন্ত্রণায় পুরো রাত কেঁদে কেঁদে পার করলেন তিনি। আফশোস হচ্ছিল। বড্ড অনুশোচনা হচ্ছিল। এর মতো জঘন্য লোকের জন্য কিনা উনি একদা নিজের পরিবারকে ত্যাগ করেছিলেন! ছিঃ! ধিক্কার নিজেকে! পল্লবী আজ শেষবারের মতো ভাগ্নের সঙ্গে এখানে এলেন। দেখে নিলেন ওই মুখখানি। একসময়ের প্রিয় মুখটি আজ সবচেয়ে অপ্রিয়। মৃ•ত্যুর পূর্বে কখনো না দেখা দিক এই মুখটি, এমন প্রার্থনাই মনে মনে করলেন।

” চল বাবা। ”

এক মুহুর্তের জন্য কেঁপে উঠলো কণ্ঠস্বর। ইরহামের জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেকে সামলে গাড়ির পানে এগিয়ে গেলেন পল্লবী। পেছনের দ্বার উন্মুক্ত করে অন্দরে প্রবেশ করলেন। ভালোমতো বসে আটকে দিলেন দ্বার। ওনার ডান পাশের সিটে নির্লিপ্ত বদনে বসে রাহিদ। একমনে মোবাইল স্ক্রল করে চলেছে। ভেতরকার অবস্থা বোঝা দুষ্কর। পল্লবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে মাথা এলিয়ে দিলেন। বন্ধ চোখের পাতা ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো কয়েক ফোঁটা যন্ত্রণার ভার।

স্ত্রীকে ওভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে মৃদু হাসলেন জহির। বেদনাবিধুর সে হাস্য আভা। দু’জন পুলিশ ওনায় টেনে পুলিশের গাড়ির পানে নিয়ে গেল। দায়িত্বরত অফিসারের সঙ্গে করমর্দন করছে ইরহাম। পুলিশের গাড়িতে বসে গ্ৰেফতারকৃত জহির। নিষ্পলক নেত্রে তাকিয়ে চৌধুরীর শুভ্র রঙা গাড়িতে। দেখে নিচ্ছে স্ত্রী সন্তানকে। এই বুঝি শেষ দেখা। এ নি-ষ্ঠুর মুখ পুনরায় কেন দেখতে চাইবে তারা? অসংখ্য অপরাধের অভিযুক্ত সে। নিজ বোনের হ•ত্যাকারী। এক নি-ষ্ঠুর সত্তা। তাকে আপনজনেরা যত কম দেখবে ততই তো মঙ্গল। হায় রে নি’র্মম জীবন!

পুলিশের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ সেরে গাড়ির পানে এগিয়ে গেল ইরহাম। দ্বার উন্মুক্ত করে পিছু ঘুরে পুলিশের গাড়ির পানে তাকালো। শেষবারের মতো ঘৃণ্য দৃষ্টিতে দেখলো ওই হৃদয়হীন কাপুরুষটিকে। ভেতরকার সত্তা ক্রো’ধে, প্রতিশোধ স্পৃহায় তীব্রভাবে কাঁপছিল। তবুও নিজেকে সংযত করে নিলো চৌধুরী। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রয়োজন নেই। যথাযথ প্রমাণ জোগাড় হয়েছে। এ জীবনে জহির আহসান কারাগারের বাহিরে এক চিলতে আলো দেখার বাসনা ছেড়ে দিক। অন্ধকার প্রকোষ্ঠের আড়ালেই ধুঁকে ধুঁকে কাটবে শেষ বয়সের রুক্ষ-নিস্পৃহ বসন্তগুলো। কিংবা দণ্ডায়িত হবে ফাঁ•সির দণ্ডে। অপছন্দনীয় দৃষ্টি সরিয়ে নিলো ইরহাম। বসলো চালকের পাশের সিটে। অল্প সময়ের ব্যবধানে বেরিয়ে গেল চৌধুরীর গাড়ি। সঙ্গে দেহরক্ষীদের গাড়ি দু’টো। কিয়ৎক্ষণ বাদে পুলিশের গাড়িও বেরিয়ে পড়লো। বিদায় গজারিয়া উপজেলা।

আঁধারে তলিয়ে ভুবন। ক্লান্তিকর এক দিনের অবসানে আপন নীড়ে ফিরলো ইরহাম। দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো হৃদয়ের দু’টো অংশে। দুই সন্তানের পানে। বিছানায় ঘুমিয়ে দুই ভাই-বোন। ছোট পাশবালিশের ঘেরাটোপে শায়িত তারা। ক্লান্ত অধরে মুচকি হাসি ধরা দিলো। ধীরপায়ে এগিয়ে গেল সে। বিছানায় এক হাঁটু উঠিয়ে বসলো। অল্প ঝুঁকে গেল। স্নেহের চুম্বন এঁকে দিলো পুত্র-কন্যার ললাটে। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ছোট ছোট চুল হালকা নড়ে উঠলো বাবার আলতো স্নেহময় স্পর্শে। হৃদয়কাড়া হাসি উপহার দিলো মানুষটি। সে হাস্যোজ্জ্বল বদনে হারালো মন। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল হৃদি। তোলপাড় সৃষ্টিকরা এক দিনের শেষে স্বামীর অপেক্ষায় ছিল। দাঁড়িয়ে ছিল জানালার ধারে। চন্দ্রাবতীর কিরণে চিন্তার আস্তরণ দূরীকরণ করার বৃথা প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। একসময় পিছু ফিরতেই সাক্ষী হলো এ চমৎকার দৃশ্যের! তৃপ্তিময় আভা ছড়িয়ে পড়লো মুখশ্রীতে। মনে মনে আওড়ালো,

‘ আলহামদুলিল্লাহি আলা কু’ল্লি হাল। ‘
_

বহু রাত বাদে আজ আরামের নিদ্রায় তলিয়ে পুরো পরিবার। ইরহাম, মধ্যখানে দুই সন্তান। ওপাশে হৃদি। ছেলে-মেয়ের পেটের ওপর স্থাপিত তাদের ভরসার হাতখানি। সে এক সুখময় চিত্রপট!

সময়ের পরিক্রমায় পেরিয়েছে কতগুলো দিন। মাস। আজকের রাতটি বেশ দ্রুতই অতিক্রম হচ্ছে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই যেন সন্ধ্যা নামলো। এরমধ্যেই হতে চলেছে মধ্যরাত। ঘড়ি নেই সাথে। জানা নেই ঠিক বাজে কয়টা। তবে আশপাশে চলমান সকল প্রস্তুতি দেখে আন্দাজ করতে পারছেন ফুরিয়ে এসেছে সময়। ঘড়ির কাঁটা বারোর কাছাকাছি। আর মাত্র স্বল্প সময়। আজ আর সে-ই বীভৎস দা-নব দেখা দিলো না। ভ’য়াবহ আতঙ্কে ছটফটানি হলো না। হবে কি করে? সে-ই দা-নবের আদৌও কোনো অস্তিত্ব রয়েছে কি! সবই তো হ্যালুসিনেশনের ভ’য়াল কারিশমা। ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশনের শিকার আজগর সাহেব। যার ফলস্বরূপ রাতের পর রাত কেটেছে যন্ত্রণাদায়ক। ভ’য়াবহ আতঙ্ক গ্রাস করে নিচ্ছিল ওনায়। প্রকৃতপক্ষে কি এই ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন?

ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন ঘটে যখন আক্রান্ত ব্যক্তি এমন কিছু দেখে যা বাস্তব নয়। বিকৃতিটি ছোট ফ্ল্যাশের ভিজ্যুয়ালাইজেশন থেকে শুরু করে মানুষ, কাল্পনিক প্রাণী এবং এমনকি জীবিত দৃশ্য পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই সমস্যার সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপশ্রেণিগুলির মধ্যে অন্যতম হলো… ‘লিলিপুটিয়েন্স।’ যেখানে আমরা যা দেখি তার আকার বাস্তবে দেখতে কেমন হবে (উদাহরণস্বরূপ, একটি দৈত্যাকার মৌমাছি) বা ²অটোস্কোপিয়া [যার দ্বারা সঙ্গতিপূর্ণ নয় ব্যক্তি তার শরীরের বাইরে থেকে নিজেকে দেখতে পারে. এই হ্যালুসিনেশনগুলি পদার্থ ব্যবহারের সাথে খুব সাধারণ।

আজগর সাহেব দীর্ঘদিন যাবত ‘সিজোফ্রেনিয়া’ রোগে আক্রান্ত। সিজোফ্রেনিয়া হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী, গুরুতর মানসিক ব্যাধি যা একজন ব্যক্তির চিন্তাভাবনা, আচরণ, আবেগ প্রকাশ, বাস্তবতা উপলব্ধি এবং অন্যদের সাথে সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। যদিও সিজোফ্রেনিয়া অন্যান্য বড় মানসিক রোগের মতো সাধারণ নয়, তবে এটি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং অক্ষম হতে পারে। আজীবন এই রোগ নিরাময় করা যায় না। কিন্তু সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আজগর সাহেবের এ রোগের কখনো সুচিকিৎসা করা হয়ে ওঠেনি। দিনের পর দিন ওনার এই রোগ প্রকট আকার ধারণ করছিল। ফলস্বরূপ ‘সিজোফ্রেনিয়া’ থেকে দেখা দিলো ‘ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন’। যখন এ ব্যাধি ভ-য়ানক রূপ নিলো উনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। যথারীতি ওনায় সুস্থ হবার পথ বাতলে দিলেন চিকিৎসক। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে উনি সুচিকিৎসা পাননি। ভুল ঔষধ খাচ্ছিলেন। এছাড়াও রাতের পর রাত ওনার সামনে দেখা দিতো রিমোট চালিত ক্ষুদ্রাকৃতির এক নকল মৌমাছি। ‘লিলিপুটিয়েন্স’ সমস্যার জন্য উনি সে-ই মৌমাছিকেই দা’নবাকার দেখতেন। বি’ভৎস দেখতেন। ভয়ে-আতঙ্কে চিৎকার করতেন। দরদরিয়ে ঘামতেন। হাতজোড় করে ভিক্ষা চাইতেন। তবে মেলেনি কখনো ছাড়। আজও ওনার অজানা কি করে ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশনের অপব্যবহার করে ওনায় চূড়ান্ত রূপে শেষ করে দিলো চৌধুরী। এ অজানা চিরকাল অজানাই রয়ে যাবে। কভু হবে না রহস্যের সমাধান।

দেখতে দেখতে সময় ঘনিয়ে এলো। হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওই কুৎসিত ভ’য়াল মঞ্চ। উনি যেতে নারাজ। চিৎকার করে উঠছে অন্তরাত্মা। আকুতিমিনতি করছে প্রাণ। তবে ভাগ্যের নি’র্মম লীলাখেলা। একফোঁটাও মিললো না মুক্তি। অবশেষে নির্দয় সত্তার সময় ফুরিয়ে এলো! ঘোর অমানিশায় হারালো পাপী আ’ত্মা। বিদায়! পৃথিবী রক্ষা পেল এক পা’ষাণহৃদয় অস্তিত্ব হতে।

ফুরফুরে এক সকাল। রবির মিঠি রৌদ্র ছুঁয়ে কায়া। বহমান চঞ্চল হাওয়া। ক্যাম্পাসে গোলাকার হয়ে বসে ‘ওরা সাতজন’ এর প্রাণবন্ত সত্তা। সবার মধ্যখানে সাবিত। ওর হাতে মোবাইল। ডান পাশে নাবিল, বাম পাশে ইভা। ইভার বাঁ পাশে হৃদি। একমাত্র সে-ই স্বাভাবিক বদনে বসে। থমথমে মুখশ্রী। এছাড়া বাকি সকলের চঞ্চল দৃষ্টি নিবদ্ধ সাবিতের হাতে থাকা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। সেথায় প্রদর্শিত হচ্ছে হৃদয়ে দোলা দেয়া প্রশান্তির খবর…

‘ গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁ সি কার্যকরের আগে আসামি খন্দকার আজগর মল্লিককে তওবা পড়ান করান স্থানীয় মসজিদের ইমাম মাওলানা আসাদুর রহমান। রাত বারোটার আগেই ওনাকে ফাঁ;সির মঞ্চের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত বারোটা এক মিনিটে ফাঁ;সি কার্যকর করা হয়। ফাঁ;সি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার মো. জব্বর মিয়া। কড়া নিরাপত্তায় ঢাকা ছিল কেন্দ্রীয় কারাগার। গতকাল রাতে সাংবাদিকরা কারাগারের প্রধান ফটক পার হয়ে সামনের চত্বরে যেতে পারেননি। তাদেরকে প্রধান ফটকের বাইরে রাস্তায় অপেক্ষা করতে হয়। সন্ধ্যার পর থেকেই গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে অনেক মানুষ এই ফটকের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেন। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের একটি পিকআপ ভেতরে ঢোকে। সোয়া বারোটার দিকে কারাগারের পেছনের দিকের গেট দিয়ে সিভিল সার্জন, স্থানীয় প্রশাসনের গাড়িসহ চারটি গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করে। আবার রাত একটার দিকে গাড়িগুলো কারাগার ত্যাগ করে। কারাগার সূত্রে জানা যায়, গত আট তারিখ সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ খন্দকার আজগর মল্লিকের ফাঁ;সির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন খারিজ করে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। দণ্ডিত এই সাবেক মন্ত্রীর ফাঁ;সি কার্যকর স্থগিত চেয়ে পনেরো তারিখে আবারও হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ওনার স্বজনরা। মঙ্গলবার সেই আবেদন খারিজ করে দেয় বিচারপতি মো. সলিম আহমেদ ও প্রবাল সেনের হাইকোর্ট বেঞ্চ। ‘

দেশীয় জনপ্রিয় এক চ্যানেলের চাঞ্চল্যকর এই সংবাদের এতখানি দেখে মোবাইলের ডাটা অফ করে ফেললো সাবিত। মোবাইল পুরে নিলো জিন্সের পকেটে। তাকালো বন্ধুদের পানে। দীর্ঘশ্বাস ফেললো ছেলেটা।

” অবশেষে ফাঁ সি হলো? ”

নাবিল তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,

” আল্লাহ্ সব দেখে রে দোস্ত। আজ হোক কিংবা কাল। বিচার উনি করেন। কেউ ইহকালে কেউবা পরকালে। পাপ করলে তার শাস্তি অবধারিত। পাইতেই হবে। বুড়া ব্যাটা জীবনে কম তো কুকাম করলো না। এখন বুড়া বয়সে ফাঁ-সির মঞ্চে। ইশ্!”

আফরিন শঙ্কা প্রকাশ করে বললো,

” হাইকোর্টে যখন ফাঁ;সির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করলো। আমি তো ভাবছিলাম, গেল। সব গেল। আমাদের দেশে অন্যায়ের সুবিচার খুব কমই হয় রে। সেখানে উনি তো শীর্ষস্থানীয় নেতা। ভাবছিলাম ঠিক পাড় পাইয়া যাবে। তবে লাকিলি আলহামদুলিল্লাহ্। খেল খাতাম। ”

স্বস্তিময় নিশ্বাসটা ছাড়ল আফরিন। পাশ হতে দিয়া বললো,

” খেল খাতাম না হয়ে উপায় আছে? আমাদের সুপারস্টার জিজু একের পর এক যা কামাল দেখালো না! ওই বুড়া অজগর ধ্বং-স হইতে বাধ্য। ”

নাদিরা কিছুটা দুঃখ প্রকাশ করে বললো,

” কি দুর্ভাগ্য রে! বুড়ো বয়সে এসে শেষমেষ মৃ-ত্যুদণ্ড হলো। কোথায় শেষ বয়সে ইবাদত বন্দেগী করবে। তা না। পাপের শাস্তি পাইলো। কি একটা জীবন রে ইয়ার। এ জীবনের মানেটা কি? পাপ করতে করতেই সুন্দর জীবনটা শেষ। আর বেলাশেষে ফাঁ;সির মঞ্চে বিদায়। হুহ্। ”

ইভা রাগত স্বরে বললো,

” পাপে বাপরেও ছাড়ে না। বুড়া হোক কিংবা ধুড়া। শাস্তি অনিবার্য। একদম ঠিক হইছে। ওই ব্যাটা আজ পর্যন্ত কম মানুষ মা•রছে নি? ভুলে গেছোছ আমগো জুনিয়র মুহিত? ওই ব্যাটাই তো মূল কাণ্ডারি ছিল। বুড়ে বয়সে আকাম কুকাম ছাড়তে পারে নাই। আর ফাঁ সি দিলেই দোষ? যত্তসব। ”

মুখ বাঁকালো মেয়েটা। হঠাৎ কিছু মনে পড়তে বিস্ময়মাখা স্বরে শুধালো আফরিন,

” হ্যাঁ রে। আজগর মল্লিকের না একখান কুপুত্র আছে? নীল না সবুজ নাম? ওটাও নাকি বদের হাড্ডি! তো ওই হাড্ডি এখন কই? বাপরে বাচাইতে পারলো না? হাওয়া ফুঁস? ”

সাবিত চরম আশ্চর্যান্বিত হলো বান্ধবীর কথা শুনে! মেয়েটা এসব ভুলভাল কি বকছে! স্তব্ধ মুখে বললো সে,

” তুই কি মঙ্গল থে আইছোছ? কিছু জানোছ না? ”

লজ্জায় লাল হলো মুখ। আফরিন বুঝে উঠতে পারলো না সে ঠিক কি জানে না! সাবিত এমন শকিং এক্সপ্রেশন দিচ্ছে কেন!

” কি হয়েছে? কিসের কথা বলতাছোছ? ঠিক বুঝলাম না। ”

সাবিত অসন্তুষ্ট বদনে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

” ওরে গা’ধী! রুদ্রনীল মল্লিক ইজ নো মোর। ব্যাটা তো আরো আগেই পরলোকগমন গমন করছে। ”

” হোয়াট! ”

ব’জ্রঝড় হলো মস্তিষ্কে। চোয়াল ঝুলে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে আফরিনের। সাবু এসব কি বলছে! রুদ্রনীল বেঁচে নেই! এ কি করে সম্ভব? কবে কখন কিভাবে মৃ•ত্যুবরণ করলো সে! কবে! বারকয়েক শুকনো ঢোক গিললো মেয়েটা। তাতেও কাজ হলো না। গণ্ডস্থলে পীড়া হচ্ছে। তড়িঘড়ি করে ব্যাগ হতে ওয়াটার বটল বের করলো। বোতলের ছিপি খুলে ভালোমতো ভিজিয়ে নিলো গলা। তৃষ্ণা নিবারণ হতেই বোতলের ছিপি আঁটকে ফেললো। ব্যাগে বোতল রাখতে রাখতে শান্ত স্বরে শুধালো,

” কবে মা রা গেছে? ”

এতক্ষণ মালিহা মায়ের স্মৃতিকথায় বিভোর ছিল হৃদি। এছাড়াও মনমানসিকতা ভালো নেই। বান্ধবীর প্রশ্নটি শুনে মুখ তুলে তাকালো সে। কোমল স্বরে বললো,

” লাস্ট মান্থ। গোয়ায়। কি;লড্ বাই আইপিএস অফিসার্স। ”

বন্ধুমহলে নেমে এলো নিস্তব্ধতা। আফরিন এবং দিয়া অবগত ছিল না এ চমকপ্রদ বিষয়ে। তারা শুনলো। হলো চরম আশ্চর্যান্বিত! রুদ্রনীল ইজ নো মোর! ও এম এ! দিয়া অধর সিক্ত করে কিছু বলতে উদ্যত হলো তখনই বেজে উঠলো রিংটোন। দিয়া ও আফরিন একে অপরের পানে তাকালো। অবেলায় কার রিংটোন বেজে চলেছে? চোখের পলকে মোবাইল হাতে উঠে দাঁড়ালো হৃদি। কালবিলম্ব না করে ফোন রিসিভ করলো।

” হ্যালো আসসালামু আলাইকুম। ”

ওপাশ হতে কোনো সংবাদ এলো। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত হলো হৃদির মুখশ্রী। অস্থির হলো তনুমন। কল কেটে দ্রুত কাঁধে ব্যাগ জড়িয়ে নিলো। নাবিল উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

” কি রে! রেলগাড়ির মতো কই যাচ্ছিস? ”

” আমায় যেতে হবে দোস্ত। আমার মাহি কাঁদছে। মা’কে খুঁজছে। আই হ্যাভ টু গো‌। আল্লাহ্ হাফিজ। আসসালামু আলাইকুম। ”

ত্রস্ত পায়ে সেথা হতে প্রস্থান করলো হৃদি। বন্ধুরা পুলকিত চিত্তে তাকিয়ে। দু’দিন ধরে মাহিকা অসুস্থ। ঠাণ্ডা কাশি হয়েছে বাচ্চাটার। সময় অসময় কেঁদে ওঠে। মায়ের কোল খোঁজে। মা’কে পেলেই শান্ত। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। তাতেই আবেগী হয়ে পড়ে মা হৃদি। মাতৃহৃদয় কিনা! সন্তানের মুখনিঃসৃত একফোঁটা যন্ত্রণার আভাস, হৃদয়ের অলিগলি অ’গ্নিসংযোগ ঘটায়। মা এমনই হয়। মমতাময়ী। স্নেহের জলধারা। তাই তো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস অবলীলায় মিস্ করে সন্তানের তরে ছুটে গেল হৃদি। আপন র•ক্তের জন্য মা হাসতে হাসতে প্রাণত্যাগ করতে পারে। ক্লাস ত্যাগ করা কি এমন দুষ্কর! বন্ধুরা বেশ প্রসন্ন তাদের প্রিয় বান্ধবীর নতুন কোমলমতি রূপে।

শান্তশিষ্ট উইদাউট লেজবিশিষ্ট বধূ যখন রণমূর্তি ধারণ করে তা বড় ভ’য়ানক আকার ধারণ করে। উত্তপ্ত লাভা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। যে লাভায় জ্ব’লছে অন্তর। পু’ড়ছে বুক। ইরহাম কোলে ঘুমন্ত পুত্রের পানে তাকিয়ে জোরপূর্বক হাসলো। আস্তে ধীরে বিছানায় শুয়ে দিলো রিহাম’কে। পাশাপাশি শায়িত দুই সন্তান। ছোট পাশবালিশের ঘেরাটোপে তাদের বন্দী করে ফেললো মানুষটা। মাহিকা একটু নড়ে উঠতেই আলতো করে বুকে হাত চাপড়ে দিলো। ফের ঘুমিয়ে গেল শিশু কন্যা। ইরহাম পিছু ঘুরে তাকালো স্ত্রীর পানে। সোফায় বসে তার বধূ। মোবাইলে গেম খেলছে। কোনো অ্যাকশন গেম বুঝি! এমনভাবে খেলছে, শত্রুকে পরাস্ত করছে যেন সে শত্রু স্বয়ং ইরহাম। বোকা হাসি উপহার দিলো ইরহাম। প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে সে। বুঝে উঠতে পারছে না ঠিক কি করা উচিত। মনে হচ্ছে স্ত্রীর মন বোঝার চেয়ে বিসিএসের পেপার সল্ভ করা কয়েকশো গুণ সহজ। মেয়েদের মন বোঝা নয় রে নয় সোজা। মানুষটা আলতো করে পেছনের মসৃণ চুল চুলকে নিলো‌। ধীরজ পায়ে এগোলো স্ত্রীর পানে। বসলো বাঁ পাশে। হৃদি তখনও নড়েচড়ে হুড়ুমগুড়ুম করে গেমের শত্রুকে ঘা’য়েল করে যাচ্ছে। এমপি সাহেব উঁকি দিয়ে দেখলো। হ্যাঁ সত্যিই ফাইটিং গেম খেলছে বউপাখিটা। এবার কি করবে সে! ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। খুকখুক কাশি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের বৃথা প্রয়াস চালালো। লাভ হলো না। এবার কণ্ঠস্বর নিচু করে আমতা আমতা করে বললো,

” যা হয়েছে তাতে আমার দোষ কোথায়? হুঁ? শুধু শুধু আমার সঙ্গে মৌনব্রত পালন করবে? ”

হৃদি এমন চাহনিতে তাকালো যে এক্ষুনি পানিবিহীন আস্ত গিলে খাবে তার বরটা’কে। এমপি সাহেব চমকিত বউয়ের নয়া রুদ্রাণী রূপ দেখে! আত্মপক্ষ সমর্থন করে পুনরায় বললো,

” আমি কিছু করিনি তো। আমি নির্দোষ। বিশ্বাস করো।”

হৃদি বুকের ভেতর তীরবি’দ্ধ করার মতো হাসি উপহার দিলো। সঙ্গে বললো,

” জ্বি আপনি তো সম্পূর্ণ নির্দূষ। দূষী আমি নিজে। ঠিক আছে? ”

বিদ্রুপাত্মক বাক্য শুনে প্রতিবাদ জানালো ইরহাম,

” এটা কি হচ্ছে? তুমি থেকে প্রোমোশন হয়ে আবার আপনিতে নেমে গেলে কেন? তুমিটাই তো মিষ্টি লাগতো। ”

গেমে মনোনিবেশ করে নির্লিপ্ত স্বরে বলল হৃদি,

” বেশি মিষ্টি ভালো না। বয়স হচ্ছে। পরে ডায়াবেটিসে পাকড়াও করবে। ”

ইরহাম তৎক্ষণাৎ তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললো,

” বুড়ো কাকে বলছো? অনলি থার্টি থ্রি চলছে। এখনো রূপ জৌলুস সব পারফেক্ট। মেয়েরা একবার দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তুমি জানো? ”

” জ্বি হ্যাঁ। কেউ কেউ তো ভালুপাশা-পাশির চিঠিও পাঠায়। তাই না জনাব? ”

সুতীক্ষ্ণ চাহনিতে তাকিয়ে হৃদি। থতমত খেল ইরহাম। ঠিক অনুধাবন করতে পারলো একটু আগে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মে•রেছে সে। ওহ্ শিট! পুরুষালি ভারিক্কি কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নরম করে ইরহাম আহ্লাদে স্বরে বলতে লাগলো,

” এই। শোনো না। ওই গিফট, চিঠি। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি। বিয়ের আগেও কয়েকবার এমন হয়েছে। এমন উদ্ভট গিফট পাঠাতো অজ্ঞাত পরিচয়ের কেউ। কখনোবা প্রশংসায় পঞ্চমুখ চিঠি। ওরা কোনো অন্ধ ফ্যানগার্ল হবে বোধহয়। আমি ওসবে পাত্তা দেয়ার মানুষ নই, ইয়্যু নো না? একবার তো নাম না জানা গিফট বক্স বিরক্ত হয়ে বিনে ফেলেও দিয়েছিলাম। সিকিউরিটি গার্ডকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া ছিল, কখনো যেন এসব কুরিয়ার বাড়ির ভেতরে না আসে। কিন্তু আজ কোনোভাবে এসে পড়েছে। আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি জান। ”

হৃদি বিশ্বাস না করে পারলো না। দু বছরের অধিক সময় ধরে এ মানুষটির সঙ্গে আছে। তার শিরায় উপশিরায় চলমান অনুভূতি সম্পর্কে অবগত। সে জানে তার মানুষটা কেমন ব্যক্তিত্বের। সে কোনো আওয়ারা পাবলিক নয়। হৃদির একান্ত পুরুষ হয়। তবুও অভিমান হলো। কি সুন্দর করে কুরিয়ার এলো। আর উনিও গদগদ হয়ে বিছানার ওপর বসে কোলে গিফট বক্স নিয়ে মোড়কমুক্ত করতে আরম্ভ করলো। ভেতর থেকে কতগুলো ছোট্ট ছোট্ট প্রশংসাবাণী যুক্ত সুন্দর লেখনীর চিরকুট আর একটা দামী পারফিউম বেরিয়ে এলো। বোঝাই যাচ্ছিল কোনো মেয়ে দ্বারা এসব প্রেরিত। ব্যাস। চট করে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। স্বামীর হাতে অন্য মেয়ের প্রশংসাবাণী দেখলে সহ্য হয়! পু’ড়বে না বুক! পু’ড়ে তো। তাই তো অভিমান হলো। ছোট্ট আদুরে অভিমান। যা এখন ধীরে ধীরে প্রণয়ধারায় তলিয়ে যাচ্ছে। একান্ত এক বেষ্টনীতে বন্দিনী হলো সে। বউপাখিটাকে মন পিঞ্জিরায় বদ্ধ করে নিলো ইরহাম। চুলে হাত বুলিয়ে সম্মোহনী স্বরে বলে উঠলো,

” অভিমানেরা ডানা মেলে শত সহস্রবার উড়ে যাক,
তোমার আমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষা সদা সর্বদা অটুট থাক। ”

একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষটির কথামতো সমস্ত অভিমানেরা ডানা মেলে দূরাকাশে উড়াল দিলো। জানে তারা, সে অভিমানের পারদ নামাতে রয়েছে এক প্রেমিকপুরুষ। যার হৃদয়ে লুকানো অনুভূতি বড় গাঢ়। সুগভীর। মন পিঞ্জিরায় সযতনে আগলে রাখে তার হৃদরাণীকে। কখনো পড়তে দেবে না বিপদের ভ’য়াল আঁচ। হৃদি চুপটি করে স্বামীর বুকে মিশে রইলো। দু হাতে আলিঙ্গনবদ্ধ পিঠ। ঘন শ্বাস পড়ছে তার। অভিমানী খেলা শেষে ঘুম ঘুম পাচ্ছে। মোবাইল অবহেলিত হয়ে পড়ে কোলে। এখনো গেম চলছে। মুচকি হেসে মোবাইলটি একপাশে রাখলো ইরহাম। তন্দ্রাচ্ছন্ন স্ত্রীর ঘাড় ও হাঁটুর নিম্নে হাত গলিয়ে তাকে পাঁজাকোলে তুলে নিলো। পা বাড়ালো বিছানার ধারে। যত্ন সহকারে শুয়ে দিলো প্রিয়তমা নারীকে। মাথার নিচে ভালোমতো বালিশ ঠিকঠাক করে দিলো। স্ত্রী তখনো দু’হাতে তার গলা জড়িয়ে। ইরহাম হাত ছাড়াতে উদ্যত হতেই চমকালো! টুপ করে অধরে অধর ছুঁয়ে দিলো মেয়েটা। ঘুমকাতুরে স্বরে বললো,

” আর কোনো মেয়ের প্রেমপত্র পড়লে একদম প্রেমবাণে মে-রে দেবো। হুম। ”

ঘুম ঘুম সে আদুরে স্বরে জাগ্রত হলো প্রেমী সত্তা। ভ’য়ানক চাহিদারা মাথা চাড়া দিয়ে তাদের উপস্থিতির জানান দিল। ঘন শ্বাস ফেলে মাথাটা এদিক ওদিক নাড়ল ইরহাম। তবুও নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ। অন্তরে জ্ব’লন হচ্ছে। দ্রুততর হৃদস্পন্দন। আর পারা গেল না। অর্ধাঙ্গীর পানে অনেকখানি ঝুঁকে গেল ইরহাম। অধরে গাঢ় এক স্পর্শ অঙ্কন করলো। ঘুমন্ত সঙ্গিনী সাড়া দিতে ব্যর্থ। শুধু কেঁপে উঠলো দু’বার। ত্বরিত সরে গেল ইরহাম। ঘন পড়ছে শ্বাস। নিজস্ব অভিলাষ ধামাচাপা দিতে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। খামচে ধরলো পেছনের চুল। ধীরে ধীরে শান্ত হলো। তপ্ত শ্বাস ফেলে তাকালো স্ত্রীর পানে। পাশ ফিরে শুয়ে মেয়েটা। পুত্রের বুকে আলতো করে স্থাপিত হাত। পুলকিত হলো তনুমন। ঘুমন্ত স্ত্রীর দেহে কাঁথা জড়িয়ে দিলো সে। নিভিয়ে দিলো ঘরের আলো। এখন তো সময় নিদ্রামগ্ন হবার।

চলবে।

[ আরম্ভ হলো অন্তিম অধ্যায়। শব্দসংখ্যা ৩২০০+. আজ আপনারাই নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করুন। আমি বাকশূন্য। বিদায় যে নিতে চলেছে তারা 💔 এ পর্বে উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী সংগৃহীত। ভুলত্রুটি হলে মার্জনা করবেন। ]

♣️ আসসালামু আলাইকুম পাঠক বন্ধুরা….

তাহিরাহ্ ইরাজ এর লেখা গল্প-উপন্যাস সম্পর্কিত ছোট-বড় অনুভূতি ব্যক্তকরণ, গল্প নিয়ে আলোচনা, ভুলত্রুটি শুধরে দেয়া, রিভিউ প্রদান এবং গল্পের চরিত্র-দৃশ্য নিয়ে পোস্ট করতে জয়েন করুন আমাদের গল্প সংক্রান্ত গ্রুপে।

গ্রুপ লিংক 🍁

https://www.facebook.com/groups/499389245208190/?ref=share

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here