প্রনয়ের_দহন #Nusrat_Jahan_Bristy #পর্ব_৪৮

0
869

#প্রনয়ের_দহন
#Nusrat_Jahan_Bristy
#পর্ব_৪৮

ইশান রাত সাড়ে এগারোটায় বাড়িতে আসে। সদর দরজা ধাক্কা দেওয়ার সাথে সাথেই খুলে যায়। এতো রাতে এভাবে দরজা খুলা পেয়ে ইশান কিছুটা অবাক হয়। কিন্তু তারপরও কিছু না বলে দরজা আটকিয়ে সিঁড়ির মাথায় আসতেই পা জোড়া থমকে যায়। পেছন ফিরে মাকে সোফায় বসে ঘুমাতে দেখে বড্ড অবাক হয়। ইশান সোফার উপরে ব্যাগটা রেখে মায়ের কাছে এগিয়ে গিয়ে কোমল স্বরে ডাকে।

–মা…. ও মা।

কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পরেই নেহা বেগম চোখ খুলে। মাকে সজাগ হতে দেখে ইশান বলে।

–ঘরে গিয়ে শোও এখানে এভাবে সোফায় বসে ঘুমাচ্ছো কেন?

নেহা বেগম ছেলের শুকনো মুখটার দিকে এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকেন। মাকে এভাবে ধ্যান মেরে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইশান বলে।

–কি হয়েছে মা? এভাবে কি দেখছো?

নেহা বেগম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে নিচের ঠোঁট ভিজিয়ে বলে।

–দেখছি আমার ছোট্ট ইশানটা কত্ত বড় হয়ে গেছে। ছোট বেলায় কত্ত বায়না করতো মায়ের কাছে আর সেই বায়নাটা মা যেকোনো মূল্যে পূরণ করতে চাইতো। কিন্তু এখন আমার ছোট্ট ইশান বুঝতে শিখে গেছে আগের মতো আর বায়না ধরে না মায়ের কাছে। নিজের ভেতরের কষ্টটা নিজের কাছে লুকিয়ে রাখতে শিখে গেছে।

ইশান মায়ের চোখের সামনে থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলে।

–হঠাৎ এসব কথা বলছো কেন মা?

–ইশান আমি তোর মা। আমি জানি তোর মনে এখন কি চলছে? তুই চাইলে আমি আয়েশা আপার সাথে কথা বলতে পারি তোর আর তীরের ব্যাপারে।

নেহা বেগমের কথাটা বলতেই ইশান মায়ের দিকে ফিরে অস্থির কন্ঠে বলে।

–নাহ মা! তুমি প্লিজ আয়েশা আন্টির কাছে এ বিষয়ে কোনো কথা বলবে না।

–কিন্তু আমি আমার ছেলের কষ্ট সারাটা জীবন দেখতে পারবো না।

ইশান মায়ের দু হাত আঁকড়ে ধরে বলে।

–প্লিজ মা তুমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলবে না। আমি যে আয়েশা আন্টিকে কথা দিয়েছি।

নেহা বেগম ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ কুচ করে বলে।

–কথা দিয়েছিস মানে কি কথা দিয়েছিস?

ইশান কিয়ৎকাল ঠোঁট চেপে রেখে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে।

–তীরের জীবন থেকে সারা জীবনের জন্য সরে যাওয়ার।

–মানে।

ইশান ওই দিনের সবটা ঘটনা মাকে বলে। নেহা বেগম এসব শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন।

–তারপরও একটা চেষ্টা করে….

মায়ের কথার মাঝেই ইশান বলে উঠে।

–নাহ মা। আমি চাই না কেউ এই বিষয় নিয়ে আয়েশা আন্টি বা তীরের পরিবারের অন্য কারো সাথে কথা বলো। দোষটা সম্পূর্ণ আমার আমিই না জেনেই তীরের জীবনে ডুকে গেছি। যেখানে তীরের আগে থেকেই সব ঠিক করা ছিলো।

–কিন্ত ইশান তুই তো…

ইশান মুচকি হাসি দিয়ে বলে।

–আমি ঠিক আছি মা। তোমার ছেলে এতোটাও উইক নয় যে এই সামান্য কষ্টটুকু সহ্য করতে পারবে না।

–মায়ের চোখে সব ধরা পড়ে ইশান। তোকে দেখলে বুঝা যাচ্ছে‌ কি যন্ত্রণায় আছিস তুই।

ইশান কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সত্যি কি সে এই যন্ত্রণাটা সহ্য করতে পারবে নাকি সারা জীবনেই যন্ত্রণায় কাতড়াবে। ইশানকে মৌন থাকতে দেখে নেহা বেগম বলেন।

–ফ্রেশ হয়ে নে খাবার দিচ্ছি।

নেহা বেগম চলে যেতে নিলে ছেলের ডাকে থেমে যান। ইশান কোমল কন্ঠে মায়ের কাছে আবদার করে‌ বলে।

–মা এখানে একটু বসবে তোমার কোলে একটু মাথা রাখবো।

ছেলের আবদার শুনে নেহা বেগম মুচকি হেসে আগের জায়গাতে বসে। ইশান ছোট্ট বাচ্চাদের মতো জড়সড় হয়ে মায়ের কোলে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়ে। নেহা বেগম ছেলের মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দেয়। চাইলেই আয়েশা সুলতানার সাথে কথা বলতে পারতেন কিন্তু ছেলে যেহেতু না করেছে তাই আর সাহস পাচ্ছে না কিছু বলতে পরে যদি আবার হিতে বিপরীত হয়। তবে ছেলের কষ্ট কি করে ভোলাবে সেটাই ভাবছেন, মনে মনে ঠিক করে রেখেছেন তীরের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরপরেই ইশানের বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন একটা ভালো, মার্জিত মেয়ের সাথে যাতে তীরের স্মৃতি মুছে দিতে পারে।

_____

দেখতে দেখতে কেটে গেছে দু দুটো দিন। যতো দিন যাচ্ছে ততোই ইশান আর তীরের মাঝে দূরত্ব বাড়ছে। এই দূরত্ব যেন ইশানকে ভেতরে থেকে কুরে কুরে শেষ করে দিচ্ছে তবে পরিবারের সকলের সামনে নিজেকে যথেষ্ট স্ট্রং রাখছে। কিন্তু পরিবারের সকল সদস্যরাই বুঝতে পারছে ইশানের মনের কষ্ট কিন্তু মুখ ফুটে কিচ্ছু বলার সাহস পাছে না। এতো সব কষ্টের মাঝে ফরাজী ভিলাতে একটা সুসংবাদ এসে হাজির হয়েছে। ফরাজী ভিলাতে নতুন সদস্যের আগমনের বার্তা শুনে যেন সবাই খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠেছে। ইহান তো বাবা হওয়ার কথা শুনে খুশিতে কান্নাই করে দিয়েছে। নেহাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বার বার ধন্যবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু এই খুশির মাঝে তীরের বিয়ের সময় এগিয়ে এসেছে। তীর শর্ত রেখে দিয়েছে মায়ের সামনে “নিজের তো কোনো বড় ভাই নেই তাই ইশান যেন তার বিয়েতে A to Z থাকে”। ইশানের বুঝতে আর বাকি নেই যে তীর এগুলা ইচ্ছে করে করছে তাকে আঘাত দেওয়ার জন্য। ইশানও হাসিমুখে রাজি হয়েছে সে তীরের বিয়ের প্রত্যেকটা অনুষ্ঠান নিজের হাতে করবে। তীরের ভালোবাসা তো আর এই জীবনে পাবে না তাই এই আঘাত গুলাই না হয় ভালোবাসা ভেবে হাসিমুখে সঁপে নিবে। এরপর তো এই আঘাত গুলা করার মানুষটাই আর তার আশেপাশে থাকবে না। তাই যতো দিন আছে সবটা মুখ বুজে সহ্য করে নিবে।

____

আজ তীরের বিয়ের শপিং করতে যাবে সবাই মিলে। সবাই মিলে বলতে ইশা, তীর, আয়েশা সুলতানা আর অভি। তাই ইশানও অফিসে যায় নি ওদেরকে শপিংয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ইশা যেতে চায় নি কিন্তু যখনেই শুনেছে আকাশও এসে তাদের সাথে যুক্ত হবে তখনেই শপিংয়ে যেতে রাজি হয়েছে। কারণ ইশা দেখতে চায় তীরের সাথে আকাশকে দেখে তার ভাইয়ের কি রকম রিয়াকশন হয়।

ইশান গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে পকেটে হাত গুজে বাগানের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বাগানেই চার বছর আগে প্রথম দেখে তীরকে। সময়টা ছিলো তখন ফাল্গুন মাস চারিদিকে নানা রকমের বাহারি রঙের ফুল ফুটে আছে। গাছে গাছে রং বেরঙের প্রজাপতিরা ডানা জাপটে এসে বসছে আর উড়ছে।

ইশানের সকালের ঘুমটা আজকে একটু তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে যায়। তাই ফজরের নামাজটা আদায় করে বেলকনিতে চলে যায় সকালের মিষ্টি রোদটা সারা গায়ে মাখানোর জন্য। ফাল্গুন মাসের শুরু তাই আবহাওয়া কিছুটা শীতল। ইশান শীতল আবহাওয়া পেয়ে বেলকনির দোলনাতেই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙ্গে ফোনের শব্দে। কিছুক্ষণ ফোনে কথা বলে যখনেই রুমে আসার জন্য পা বাড়াবে তখনেই গায়ে মাথায় ওড়না পেচানো একটা মেয়েকে দেখে পা জোড়া থেমে যায়। এতো সকালে একটা অচেনা মেয়েকে দেখে বড্ড অবাক হয় ইশা। চোখ দুটো ছোট ছোট করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বুঝার চেষ্টা করে আসলে মেয়ে করতে কি চাইছে? মেয়েটা চারিপাশটায় ভালোভাবে নজর বুলায়। উপরের দিকে তাকাতেই ইশান ঝট করে আড়াল হয়ে যায়। অচেনা মেয়েটা আস্তে আস্তে করে বাগানের দিকে এগিয়ে এসে গোলাপ ফুল ছিড়তে থাকে। মেয়েটার কান্ড দেখে আপানাআপনিই ইশানের ঠোঁটের কোণে হাসি রেখা ফুটে উঠে। কিন্তু গোলাপ ফুলগুলা তাড়াহুড়ো করে ছিড়ার সময় মেয়েটার হাতে কাটা ফুটে যায় তাতে যেন ইশানের বুকটা ধ্বক করে উঠে। ইশানের হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মেয়েটার কাছে গিয়ে মেয়েটার কাটা স্থানটা দেখার জন্য কতটুকু কেটেছে। ইশান নিচে নামার জন্য উদ্যত হতে নিলেই মেয়েটা এক দৌঁড়ে বেরিয়ে যায় ফরাজী ভিলা থেকে। ইশান চারপাশটাও নজর বুলায় মেয়েটা ঠিক কোন রাস্তা দিয়ে গেছে। তখনেই নজর পড়ে পাশের বাড়ির গেইটের দিকে মেয়েটা গেইটের সাথে মাথা হেলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। ইশানের ঠোঁটের কোণে আবার হাসি ফুটে উঠে। চোখ মেলে তাকায় মেয়েটা হাত রাখা গোলাপ ফুল গুলা নাকের কাছে এনে চোখ বন্ধ করে তার ঘ্রাণ নেয়। ঘ্রাণ নিয়ে চোখ মেলে তাকিয়ে‌ মুচকি হেসে উপরের দিকে দৃষ্টি যেতেই ইশানকে দেখে ভ’য় পেয়ে যায় এটা ভেবে ওকে ফুল চুরি করতে দেখে নেয় নি তো। ভ’য়ে মেয়েটা আর কিচ্ছু না ভেবে দৌঁড়ে বাড়ির ভেতরে ডুকে যায়।

ইশানের মাথা কাজ করছে না যে বাড়িটা এতো দিন খালি ছিলো এই বাড়িতে হঠাৎ করে এই রুপসী একটা মেয়ে কোথা থেকে আসলো। তাকে কি পরী দেখা দিলো নাকি এই সাত সকালে। ইশানের এমন অদ্ভুত ভাবনাতে নিজেই অবাক হয়। পরী যদি দেখাও দেয় তাহলে পরী এভাবে মানুষকে দেখে ভ’য়ে এভাবে দৌঁড় দিবে নাকি। পরক্ষণে ইশানের মনে পড়লো মায়ের বলা কয়েকদিন আগের কথাটা যে এই বাড়িটা একজন কিনে নিয়েছে। তখন তো আর ইশান বুঝতে পারে নাই এই পরীটাই তার তীর।

এসব ভেবেই ইশানের ঠোঁটের কোণের হাসির রেখে ফুটে উঠে। কিন্তু ইশানের এই হাসি দেখে কারোর শরীরের জ্বালা ধরে গেছে। মন চাইছে ইশানের ঠোঁট দুটো সেলাই করে দিতে যাতে এই জীবনে আর হাসতে না পারে। সে ইশানকে কাঁদাতে চায় আর এই‌ ইশান কি না হাসছে। এতো রং বইছে শরীরের।

ইশানের ধ্যান ভাঙ্গে ইশার ডাকে। ইশানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তীর আর ইশা। তীরের মুখ জুড়ে রাজ্যের রা’গ প্রকাশ পাচ্ছে কিন্তু ইশান তীরের এই রা’গে’র কারণ বুঝতে পারছে না। তার কথা মতোই সব কাজ করছে তাহলে‌ এতো ক্ষো’ভ কেন? ইশান কয়েক পল তীরের দিকে তাকিয়ে নজর সরিয়ে নিয়ে বলে।

–গাড়িতে উঠ লেইট হচ্ছে।

ইশা কর্কশ কন্ঠে বলে।

–ইচ্ছে করছে তোমাকে একদম খু…. !

বোনের কথায় ইশান ভ্রু-কুচকে নেয়। ইশা কিচ্ছু না বলেই রা’গ দেখিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। কিন্তু তীর উঠে বসে না ও এক ধ্যানে ইশানের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশান তীরকে গাড়িতে উঠার কথা বলতে যাবে এমন আয়েশা সুলতানা অভিকে নিয়ে হাজির হয়ে মেয়েকে বলেন।

–কিরে? তাড়াতাড়ি কর লেইট হচ্ছে তো।

তীর কর্কশ কন্ঠে বলে।

–উঠছি মা।

তীর উঠে যেতেই আয়েশা সুলতানা ইশানের কাছে এসে কিছু বলতে নিবে তখনেই ইশান বলে উঠে।

–আন্টি লেইট হচ্ছে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠুন।

আয়েশা সুলতানা ইশানের কষ্টটা বুঝতে পারছেন সাথেও মেয়েরও কিন্তু সে চাইলেও কিচ্ছু করতে পারবে না। ওনি অনেক চেষ্টা করেছেন বিয়েটা আটকানোর জন্য। কিন্তু ওনার বান্ধবী মানতে নারাজ। ওনি তীরকে তার পুত্রবধু করে নিবেন হয়তো আজ নয়তো কাল। বার বার ওয়াদা করার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাই আয়েশা সুলতানাও বাধ্য হয়ে রাজি হয়েছেন এই বিয়েতে। তবে মনেপ্রাণে সবসময় উপরওয়ালার কাছে দোয়া করে যাচ্ছেন এই বিয়েটা যেন না হয়। আয়েশা সুলতানা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে গাড়িতে উঠে বসে।

#চলবে______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here