#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_২৫
,
বন্ধ দরজার সামনে সমানে পায়চারী করে যাচ্ছে শশী। পারভিন বলেছিলো সমুদ্রের জন্য নাস্তা রেডি করে রুমে রেখে আসতে, কিন্তু সেটা করার মতো কোনো মন মানসিকতা শশীর আপাতত নেই টেনশনে ঠিক মতো এক জায়গায় বসতে অবধি পারছে নাহ। এসে পরনের জামা পযন্ত এখনো পাল্টায়নি, একবার বন্ধ দরজায় কান পাতছে তো আবার ঘন ঘন পায়চারী করছে। আব্বার সাথে কি এমন কথা থাকতে পারে ওনার যে এসেই এভাবে দরজা বন্ধ করে আলোচনা শুরু করছে। কোনো ভাবে কি ওনি কালকে রাতের কথাটা আব্বাকে বলছে? হায় হায় তাহলে তো সর্বনাশ আমি আব্বার সামনে মুখ দেখাবো কীভাবে, কি জন্য যে ওমন লোকের প্রেমে পড়তে গেলাম। আর পড়েছি তো কি হয়েছে এতো ঘটা করে ওনাকে জানানোর কি ছিলো, ভালোত দূর থেকেও বাসা যায়। ধ্যাত কেনো যে ওনাকে কথাগুলো বলেছিলাম না বললেই ভালো হতো, এই জন্যই লোকে বলে চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে।
তাহলে তুমি সত্যি বিয়েটা করবে?
জামশেদ মাস্টার এর গম্ভীর কন্ঠে কথাটা শুনে সমুদ্র এবার বিরক্তি নিয়ে গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বলল, যদি মিথ্যা বিয়ে করা যায় তাহলে ওটাও করতে পারি।
সমুদ্রের কথায় এবার ওনিও নড়েচড়ে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি কিন্তু সিরিয়াস কথা বলছি, তোমার আর শশীর বয়সের দিক টাও একটু ভাবো। ওর জন্য তোমার বয়সটা একটু নয় বরং বেশিই মনে হচ্ছে আমার কাছে, আর তাছাড়া ও এখনো অনেক ছোট।
সমুদ্রের এবার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেলো এসব কথাতো ওনার সাথে আরো আগেই হয়ে গিছিলো তাহলে এখন এসব কথার মানে কি? আর ওনি যে এভাবে সবার আড়ালে ডেকে যে এসব কথা বলবে সেটা সমুদ্রের আগে থেকেই মনে হয়েছিলো। তাই এবার তেড়্যাভাবে জবাব দিলো, কেনো আপনার মেয়েকে কি দুধের শিশুর সাথে বিয়ে দিবেন? যদি জানতেন আপনার মেয়ে ভিতরে ভিতরে কত বড় হয়ে গেছে তহলে এখনি আমার কোলে তুলে দিতেন। শেষের কথাটা আস্তে করে বলে কিছু একটা মনে হতেই সমুদ্র চেয়ারে হেলান দিয়ে বেশ আয়েশ করে বসে একটু কথার খোঁচা দিয়ে বলল, শুনেছি আপনি নাকি যে বাড়িতে লজিং থেকে মাস্টারি করতেন ওই বাড়িই মেয়েকেই ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছেন। নিজেতো ঠিকি প্রেম করে বিয়ে করেছেন তখন নাকি আপনার বয়সও অনেক ছিলো আর আন্টি নিতান্তই ছোট ছিলো। নিজে বুড়ো হয়ে একটা দুধের শিশুকে ভুলিয়ে ভালিয়ে বিয়ে করতে পারেন আর এখন আমার বেলায় এতো এতো জ্ঞান কোথা থেকে আসছে? বা বা নিজের বেলায় ষোলো আনা আর আমার বেলায় চারা-না নো নো এটা তো আমি মেনে নিবো না মাস্টার মশাই।
সমুদ্রের কথা শুনে জামশেদ মাস্টার বড় বড় চোখ করে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে কাশতে লাগল। অতঃপর গলা পরিষ্কার করে বলল, আমি মোটেও ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করিনি নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারপর পারভিন কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ছিলাম।
তো তাহলে কি আমি বেকার? এমন ভাবে বলছেন যেনো আমি বেকার লাফাঙ্গা ছেলে কাজ কাম কিছু করি নাহ বাবার হোটেলে বসে খাই এই জন্য মেয়ে দিতে ভয় পাচ্ছেন, শুনুন মাস্টার মশাই মেয়েকে আমার সাথে বিয়ে না দিলে কিন্তু তুলে নিয়ে যাবো। তখন বসে বসে মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে নাহ।
সমুদ্রের কথা শুনে একের পর এক ঝটকা খাচ্ছে জামশেদ মাস্টার তার জানামতে সমুদ্র মোটেও এমন নয়, কথা কম বলা গম্ভীর একটা ছেলে প্রথমে দেখে তো সেটাই মনে হয়েছিলো কিন্তু আজকের সমুদ্রের সাথে আগের সমুদ্রের কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে নাহ। ওনার ভাবনার মাঝেই সমুদ্র নিজের মুখটা একটু ওনার দিকে এগিয়ে নিয়ে এসে আস্তে আস্তে বলল, আমার কেমন জানি একটা ডাউট হচ্ছে মাস্টার মশাই।
সমুদ্রের এমন করা দেখে এবার ওনিও বেশ সিরিয়াস হয়ে নিজের মাথাটা সমুদ্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে মাথার সাথে মাথা ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল, কি বলোত?
সত্যি কি আপনারা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন? নাকি আন্টিকে কোনো জাদুটোনা করে বিয়ে করেছেন। না দেখুন আপনার মাথার সবগুলো চুল কেমন পেঁকে গেছে আবার ভূড়িটাও কেমন বেড়ে গেছে আর ওদিকে আন্টি এখনো কত সুন্দরী যেনো সাজিয়ে গুজিয়ে আবারও বিয়ে দেওয়া যাবে। সত্যি করে বলেন তো মাস্টার মশাই কাহিনী কি?
এবার বোধহয় হয় স্কুলের সবচেয়ে রাগী আর গম্ভীর জামশেদ মাস্টার হার্ট অ্যাটাক করেই ফেলবে। সমুদ্রের কথা শুনে তাড়াক করে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে এক নিশ্বাসে পুরো পানিটা সাবাড় করে দিলো। না না এই ছেলেকে এতো হালকা করে নেওয়া মোটেও ঠিক হবে নাহ, এটা ছেলে নাকি পুরো একটা তুফান বাপরে বাপ বুকের ভিতর এখনো ধুপধাপ করছে৷ কথাগুলো ভেবে পিছন ফিরে সমুদ্রের দিকে তাকালো দেখলো সমুদ্র গা-ছাড়া একটা ভাব নিয়ে চেয়ারে বসে আছে। ওকে দেখলে কেউ বলবে যে ও একটু আগে কত নিলর্জ্জ মার্কা কথা বলেছে, ওনি নিজেকে ঠিক করে হালকা কাশি দিয়ে বলল, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যাও চা নাস্তা খাও আমি তোমার মায়ের সাথে কথা বলবো।
সমুদ্র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গায়ের শার্টটা ঝেড়ে টানতে টানতে বলল, একটু জলদি কথাটা বলিয়েন আমার হাতে সময় কম।
তোমার কি লজ্জা সরম নেই নিজের বিয়ের কথা এভাবে নিজে এসে বলছো তাও আবার আমার কাছেই।
আজব এখানে লজ্জার কি আছে, বিয়ে করবো আমি সংসার করবো আমি মেহনত করে আপনাকে নানা বানাবো আমি তাহলে এখানে আমার লজ্জা পাওয়ার কি আছে। আর আমি লজ্জা পেলে আপনি নানা হতে পারবেন বলুন?
না না এই ছেলের সাথে আর একটা কথাও বাড়ানো যাবে না মুখ খুললেই কথা নয় যেনো এক একটা বোমা বের হচ্ছে। মনে মনে কথাটা বলে মুখে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে তুমি এখন বসার ঘরে যাও তোমার আন্টি তোমায় ডেকেছে।
সমুদ্র একবার হুবু শশুরের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে টেবিল এর উপর থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। সমুদ্র চলে যেতেই ধপ করে খাটে বসে পড়লেন ওনি বুকে হাত দিয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে নিজে নিজেই বলল, বাঁচা গেলো এই ছেলের সাথে কথা বলতে গেলে দেখছি বুঝেশুনে মেপে মেপে বলতে হবে। কথাটা বলতে বলতেই রুমের মধ্যে থাকা বড় আয়নার দিকে চোখ গেলো ওনার উঠে দাঁড়িয়ে আয়নার দিকে এগিয়ে গেলো। নিজের অবয়ব এর দিকে তাকিয়ে নিজে নিজেই বলল, সত্যিতো মাথার চুলগুলো সব পাঁকতে বসেছে আবার ভূড়িটাও দিনকে দিন বেড়েই চলেছে থামার কোনো নামগন্ধ নেই। শ্বাস বন্ধ করে পেটটা একটু ভিতরের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করলো তখনি পারভিন আঁচলের সাথে হাত মুছতে মুছতে রুমে এসে বলল।
একি সমুদ্র কোথায় গেলো আপনার সাথেই তো ছিলো, আমি আরো সবকিছু এখানেই আনতে বললাম অথচ সমুদ্রই এখানে নেই।
বাইরেই কোথাও আছে হয়ত এইমাত্রই বেড়িয়ে গেলো। কথাটা বলেই আবার আয়নার দিকে তাকালো, পারভিন তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই ওনি পিছন থেকে ডেকে বলল, আচ্ছা বড় বউ আমি কি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি? পেটটাও কেমন বেড়ে যাচ্ছে তবে তুমি যদি অনুমতি দাও তাহলে চুলে কলপ করতে পারি কি বলো নইলে তো দেখছি তোমার পাশে আমায় মানাবেই নাহ। শেষে একসাথে কোথাও গেলে লোকে তোমাকে ভাবি আর আমাকে চাচা বলবে।
স্বামীর মুখে এমন কথাশুনে পারভিন অবাক হয়ে স্বামীর দিকে তাকালো অতঃপর রেগে বলল, বুড়ো বয়সে ভীমরতি বলি দিন দিন বয়স কমে যাচ্ছে নাকি যে জোয়ান হবে। মাঝে মাঝে আপনার কি যে হয় আমি গেলাম হাতে অনেক কাজ আছে, ছোটো আর মেজো হেঁসেলে কি করছে কে জানে।
,,,,,,,,,,,,,
ছোটোমা ডেকেছিলো এইজন্য শশী রান্নাঘরের দিকে গিয়েছিলো কাজটা শেষ হতেই আবার তড়িঘড়ি করে বাবার রুমের দিকে যাচ্ছে। এতোক্ষণে লোকটা আব্বাকে না জানি উল্টো পাল্টা কি কি কথা বলেছে, এই মুখ কীভাবে আব্বাকে দেখাবো। ওনি যদি আব্বাকে বলে যে আমি ওনাকে প্রেমের প্রস্তাব দিছি তাহলে তো যেটুকু মান ইজ্জত আছে তাও আর থাকবে নাহ। এগুলো বিরবির করতে করতে করতে শশী ওর আব্বার রুমের দিকে যাচ্ছিলো তখনি সমুদ্রের সাথে ধাক্কা খেলো। সমুদ্রের বুকের সাথে ধাক্কা লাগতেই নাকে বেশ বেথ্যা পেলো ডান হাতে নাক ডলতে ডলতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি আব্বা কে কি বললেন এতো সময় ধরে? আর আব্বা কি বলল? এতো সময় লাগলো কেনো? কি কথা হয়েছে আমাকে বলুন।
শশীর কথাশুনে সমুদ্র প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে শশীর দিকে একটু ঝুঁকে মুখটা ওর কানের কাছে নামিয়ে এনে ক্ষীণ স্বরে বলল, তোমার আব্বা বলেছে ওনার মেয়েকে বেশি বেশি ভালোবাসতে আর অনেক অনেক চুমু দিতে।
কথাটা বলেই সমুদ্র সোজা শশীকে পাড় করে শিস বাজাতে বাজাতে চলে গেলো, শশী এখনো হা করে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। আব্বা ওনাকে এই কথা বলেছে? নিজে নিজেই কথাটা ভেবে পরক্ষণেই আবার বলল, আমিও না ওনার কথা বিশ্বাস করে কি সব কথা ভাবছি আব্বা কেনো ওনাকে এই কথা বলবে।
,,,,,,,,,,,
সবাই এতো এতো অনুরোধ করেও সমুদ্র কে থামাতে পারেনি। রাতেই বেরিয়ে পড়েছে রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকবে তাই কোনো সম্যসা হবে নাহ এই বলে। আপাতত রাস্তায় তেমন কোনো গাড়ি নেই ফুরফুরে মেজাজে গাড়ি টেনে চলেছে সমুদ্র, শশীর মুখটা চোখের সামনে ভাসতেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুৃঁটে উঠল। বিকেলে জামশেদ মাস্টার এর সাথে হওয়া কথপোকথন মনে হতেই বেশ উচ্চ স্বরে হেসে উঠল সমুদ্র, এখন যদি শশী ওকে দেখতো তাহলে মেয়েটা বেশ চমকে যেতো। সামনে বড় আলো দেখতেই গাড়ির স্পিড খানিক কমায়ে দিলো সমুদ্র, সামনে ঠিক কি গাড়ি আর গাড়িটা কতবড় সেটা আন্দাজ করা যাচ্ছে নাহ প্রখর আলোতে পিছনের অংশ অদৃশ্যের মতন। এবার বেশ ধীর গতীতে গাড়ি চলাচ্ছে সামনে যেতেই চোখের সামনে সারি সারি দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাক দেখে সমুদ্র গাড়ি থামিয়ে দিলো। সামনের রাস্তা পুরোটাই বন্ধ, কিছু একটা মনে হতেই সমুদ্র তড়িঘড়ি করে সিট বেল খুললো যখনি গাড়ির দরজা খুলতে যাবে ওমনি পিছন থেকে একটা গাড়ি এসে সমুদ্রের জিপটাতে জোরে ধাক্কা মারল। সিট বেল না থাকায় সামনে খানিকটা ঝুঁকে সামনের গ্লাসের সাথে মাথায় আঘাত লাগল। পিছনের গাড়িটা হয়ত বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ফলো করছিলো কিন্তু অন্যমনষ্ক থাকায় সমুদ্র সেটা বুঝতে পারেনি। সোজা হয়ে বসে কপালে হাত দিতেই বুঝতে পারলো রক্ত, কপালের কোনায় কেঁটে গেছে। সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই দেখলো দশ চাকার বেশ বড়সড় একটা মালবাহী ট্রাক সেটাই ওর গাড়িটিকে ধাক্কা দিয়েছে। ট্রাকটা এখন পিছনের দিকে যাচ্ছে হয়ত আবারও ধাক্কা দেওয়ার প্লান আছে।
ওহ শিট।
কথাটা বলেই সমুদ্র তড়িঘড়ি করে ফোনটা বের করলো পিছনে তাকিয়ে থেকেই কাউকে কল দিলো। ফোন রিসিভ হতেই সমুদ্র বলা শুরু করলো, ইমরান তোমাকে একটা লোকেশন পাঠিয়েছি যলদি গাড়ি নিয়ে সেখানে চলে এসো সময় অনেক কম হারিআপ৷ আর হ্যাঁ আসার আগে কি করতে হবে মনে আছে তো?
অবশ্যই স্যার আপনি শুধু কয়েক মিনিট ওদিকটা সামাল দেন আমি যত দ্রুত সম্ভব আসছি।
#চলবে?

