প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি #সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী #পর্ব_২৬

0
792

#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_২৬
,
বিছানার উপর থাকা ফোনটা অনবরত বেজেই চলেছে, ওয়াশরুমের দরজা খুলে টাওয়াল দিয়ে শরীল মুছতে মুছতে বেরিয়ে এলো সমুদ্র। বিছানা থেকে ফোনটা তুলে পুনরায় কল আসার আগেই সমুদ্র ফিরতি কল দিলো।

আপনি ঠিক আছেন? আন্টি বলল মাথায় আঘাত পেয়েছেন। ক্ষতটা কি অনেক গভীর? নিশ্চয়ই জ্বালা করছে আর আপনিও সেখানে ঔষধ লাগাননি৷ আমিতো চিনি আপনাকে কেমন ধরনের লোক আপনি, ঔষধ লাগাবেন কেনো আপনি তো বীর বাহাদুর তাই নাহ? বলছি আমি কি আসবো?

ফোনের ওপাশে চিকন কন্ঠে উৎকন্ঠা নিয়ে এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল শশী, গলার টাওয়াল টা বেডের এককোণে ছুঁড়ে ফেলে সটান শুয়ে পড়ল সমুদ্র । শাসন করছো আমায়? তোমার তো ভারি সাহস মেয়ে এতোটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে হয়ে আমাকে শাসন করছো। আর তুমি এসে কি করবে তুমি কি ডাক্তার নাকি?

সমুদ্রের কথাশুনে মিইয়ে গেলো শশী, কথার পিঠে আর কোনো জবাব দিলো নাহ। তখন সমুদ্রের চিন্তায় কথাগুলো বলেছে তবে এখন আর কোনো কিছু বলার সাহস হচ্ছে নাহ। শশীকে চুপ থাকতে দেখে সমুদ্র কান থেকে ফোনটা সরিয়ে সামনে এনে স্কিনের উপর চোখ বুলিয়ে হালকা হেসে নরম কন্ঠে ছোট্ট করে বলল,

ঠিক আছি আমি।

এই এতোটুক কথায় শশীর সাহস বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিলো, এবার বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে উঠল, এসব হলো কি করে? মা কাকি সবাই কত করে বলল থাকতে তাদের কথা না শুনেতো বেড়িয়ে গেলেন, এখন বুঝতেছেন তো বড়দের কথা না শুনলে কি হয়।

হুম খুব বুঝতেছি তুমি ভারী চালাক মেয়ে দেখছি নিজের লাভের জন্য আন্টিদের দিয়ে আমাকে থাকতে বলিয়েছ।

সমুদ্রের কথায় শশী বেশ অবাক হলো বিষ্ময় নিয়ে বলল, এখানে লাভের কি আছে আর আপনি থাকলে আমার কি লাভ?

হুম এখনতো সব বুঝেও না বোঝার অভিনয় করছো, তুমি বেশ ভালো করেই জানো যে তোমার কাছাকাছি থাকলে আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারবো নাহ। আর তুমি সেটার সুযোগ নিয়ে আমাকে দিয়ে ফ্রিতে আদর করিয়ে নিবা কি ভেবেছো আমি কিছু বুঝি নাহ।

সমুদ্রের কথায় শশীর চোখ বড় বড় হয়ে গেলো, ছিঃ ছিঃ এসব তো আমার ভাবনারও বাহিরে আর এই লোকটা কিসের সাথে কি মিলিয়ে কতকিছু ভেবে ফেলেছে। সত্যি ওনার লজ্জা শরমের বালাই নেই দেখছি, শশী লজ্জায় বাঁ হাতে নিজের মুখ ঢাকার চেষ্টা করলো কিন্তু ব্যার্থ হলো এই জন্য কথা ঘুরাতে ফের সমুদ্র কে প্রশ্ন করল, বলুন না এসব কীভাবে হলো?

আরে ওসব কিছু নাহ কিছু কুকুর পিছে লেগেছিলো কিন্তু কাঁমড়াতে না পেরে আহত হয়ে ফিরে গেছে৷ দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলল সমুদ্র, কথাটা বলার সময় রাগে হাত মুঠো করে সামনের দেওয়াল এর দিকে তাকিয়ে ছিলো। সমুদ্রের কথা শশী বুঝতে না পেরে ফিরতি আবার প্রশ্ন করে বসল, কিন্তু আপনি তো গাড়ির মধ্যে ছিলেন তাহলে আঘাত পেলেন কীভাবে?

ও তুমি বুঝবে নাহ এটা চার পা ওয়ালা কুকুর নয় মানুষ রুপি দুই পা ওয়ালা কুকুর। এখন এতো বেশি কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়ো ছোট মাথায় এতো চাপ নেওয়া মোটেও ঠিক হবে নাহ। আর এভাবে রাত জেগে শরীল নষ্ট না করে শরীলের যত্ন নাও কারণ কিছুদিন পরে তোমার ওই নরম শরীলের উপর দিয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বইবে।

কথাটা বলেই সমুদ্র খট করে ফোন কেটে দিলো, শশী হা করে ফোনের দিকে তাকিয়ে আছে সমুদ্রের কথার মাথা মুন্ডু তৎক্ষনাৎ ও কিছুই বুঝতে পারেনি তবে কিছুক্ষণ ভাবার পর যখন সমুদ্রের কথার মানেটা বুঝতে পারলো লজ্জায় ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠল৷ পাশ থেকে কাথাটা নিয়ে নিজের পুরো শরীল টা আবৃত করে নিলো, এখন আর কিছুতেই ও সমুদ্রের সাথে কথা বলবে নাহ লোকটা বড়ই বেহায়া ঠোঁটকাটা, যখন যা মুখে আসে সেটাই বলে দেয়।
,,,,,,,,,,,
তোর কি বুদ্ধি সুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে? তোকে এতোবার করে নিষেধ করার পরেও কেনো সমুদ্রের উপর আক্রমণ করিয়েছিস?

তো কি করতাম আমি ফুপি বসে বসে নিজের ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করতাম? ওই সমুদ্র একের পর এক আমার ক্ষতি করে যাচ্ছে আর আমি কিছু না করে কাপুরুষের মতো হাত গুটিয়ে বসে থাকবো?

জোসেফ রেগে কথাটা বলেই টেবিলের উপর থেকে কাঁচের গ্লাসটা ফেলে দিলো, মালবিকা চোখ বন্ধ করে নিজের রাগটাকে সংবরণ করছে। বিরবির করে বলল, একদম নিজের বাপের মতো ধৈর্যহীন একটা গাঁধা তৈরি হয়েছে। বোনটাকেও নিজের মতোই বানিয়েছে দিনরাত শুধু সমুদ্রের নাম যপে ওটাকে তো সামলে লন্ডনে পাঠিয়েছি এবার এটাকে সামলাতে হবে৷ ঠোঁট গোল করে আস্তে করে একটা শ্বাস ছেড়ে মালবিকা জোসেফ এর কাছে গেলো ওর কাঁধে হাত রেখে শান্ত করার জন্য বলল।

আচ্ছা ঠিক আছে আমি মানছি তুই যেটা করেছিস একদম ঠিক করেছিস সমুদ্রের এইটুকু আঘাত দেওয়ার দরকার ছিলো৷ কিন্তু তোকেও তো বাঁচতে হবে এখন তুই যদি না থাকিস তাহলে সমুদ্র কে নিঃশেষ করবি কীভাবে?

ফুপির কথা বুঝতে না পেরে জোসেফ মালবিকার দিকে তাকিয়ে বলল, মানে?

মানে হলো তোকে কয়দিন এর জন্য দেশের বাইরে যেতে হবে।

ওহ তারমানে তুমি আমাকে পালাতে বলছো তাইতো? তুমি এটা ভাবলেও কীভাবে ফুপি যে আমি ওই সমুদ্রের ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবো। ভুলে যেও না ক্ষমতায় আমি ওর থেকেও উপরে, আমি চাইলেই ক্ষমতার জোড়ে ওকে আমার বাড়ির চাকর বানিয়ে রাখতে পারি।

জোসেফ এর কথায় মালবিকার রাগ হলেও সেটা গিলে নিয়ে নরম কন্ঠে বোঝানোর স্বরে বলল, আচ্ছা আমি মানছি যে তুই যেটা বলছিস সেটা সঠিক, কিন্তু এটাও তোকে মানতে হবে যে সমুদ্রের ও কিন্তু ক্ষমতা কম নয়। আর সামনে ইলেকশন এখন যদি তোর উপর কোনো দোষ পড়ে তাহলে আর সামনে আগাতে পারবি? শোন রাজনীতি হলো সাদা কাপড়ের মতো যার ভিতরে অসংখ্য দাগ থাকলেও সাধারণ জনগণ এর কাছে সেটাকে ধবধবে সাদা দেখাতে হয় ওখানে এক ফোঁটা দাগ লাগলেও সেটা সবার আগে চোখে পড়ে। তাই আমি যেটা বলছি সেটা কর, আর তোকে কে বলল যে তোকে সমুদ্রের ভয়ে বাইরে পাঠাচ্ছি তোকে ওখানে গিয়ে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।

কেমন কাজ?

সেটা সময় হলেই বুঝতে পারবি, আমি সব রেডি করে দিচ্ছি আজকে রাতের মধ্যেই তুই রওনা দিবি আর তোকে একজন এর সাথে দেখা করে কথাও বলতে হবে।
,,,,,,,,,,,
এই দিয়ে পঞ্চম বারের মতো কল দিলো শশীর ফোনে কিন্তু প্রথম বারের মতোই ওপাশ থেকে চিকন মেয়েলি স্বরে ফের বলে উঠল, আপনি যাকে কল দিয়েছেন সে এই মুহুর্তে ব্যাস্ত আছে। এইটুকু শুনেই ফোন কেটে পাশে ছুড়ে ফেলল রোদ্র, এতো কিসের ব্যাস্ত তুমি শশী সত্যি তুমি আমাকে অনেক বেশি পোড়াচ্ছো একটা বার তোমায় নিজের করে নিই তারপর সবটা সুদে আসলে মিটিয়ে নেবো। কথাটা বলেই নিজের মনে হেসে উঠল রোদ্র।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে পুরোটাই দেখলো শাহানারা বুকের ভিতরটা বড্ড জ্বলছে, এক ছেলের খুশির জন্য এখন তাকে অন্য ছেলের মুখের হাসি কেড়ে নিতে হবে। মনকে শক্ত করে ঘরের ভিতরে পা বাড়ালো, হাতে থাকা জিনিসগুলো বিছানার উপর রেখে রোদ্রের পাশে বসল। মাকে হঠাৎ গহনাপত্র নিয়ে নিজের রুমে দেখে অবাক বনে গেলো রোদ্র তবুও কৌতূহল চেপে রেখে মুচকি হেসে মাকে সুধালো।

এগুলো কার মা?

শশীর জন্য আরো আগেই বানিয়ে রেখেছিলাম যেদিন কথাহলো তারপর থেকে বানাতে দিয়েছিলাম। সমুদ্র কে তো এসব বলে লাভ নেই ও এসবের কিছুই বুঝবে না তুই একটু আমার হাতে হাতে সাহায্য করে দে তো এখনো কত কাজ বাকি।

মায়ের কথাগুলো পুরোটাই মাথার উপর দিয়ে গেলো রোদ্রের, কিছু বুঝতে না পারায় শাহানারাকে প্রশ্ন করলো, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি নাহ মা। গয়নাগুলো শশীর জন্য বানিয়েছো ঠিক আছে বিয়েতে তো ওকে গয়না দেওয়া লাগবে কিন্তু তার পরের কথাগুলো বুঝতে পারেনি।

ছেলের কথায় এবার শাহানারা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে কথা ঘুরানোর জন্য হাতের ফোনটা রোদ্রের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা হলো তোর বাবার বন্ধু শফিক ভাইকে মনে আছে? ওনার মেয়ে, দেখতে মাশাল্লাহ আবার নাকি ডাক্তারি পরছে তোর বাকিটা বলার আগেই রোদ্র শাহানারার থেকে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে স্কিনে থাকা মেয়েটার ছবির দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, বাহ বেশ দেখতে তো একেতো ভাইয়ার সাথে বেশ মানাবে, তাহলে কি ভাইয়া বিয়ে করতে রাজি হয়েছে? কিন্তু তুমিতো আমাকে কিছু বললে নাহ।

সমুদ্রের জন্য নয় একে আমি তোর জন্য পছন্দ করেছি, আমি চাইছি সমুদ্রের বিয়ের পরপরই তোর বিয়েটাও দিয়ে দিতে।

মায়ের কথায় রোদ্রের হাসি মাখা মুখটা কালো হয়ে গেলো, কিন্তু পরক্ষণেই আবার হেসে বলল, ধূর আমি কেনো একে বিয়ে করতে যাবো, তুমিও না মা এমন এমন মজা করো আমাকে পুরো ভয় পাইয়ে দাও। আর তাছাড়া আমিতো তোমাকে বলেই রেখেছি যে আমি শশীকে বিয়ে, বাকিটা বলার আগেই শাহানারা রোদ্রকে থামিয়ে দিয়ে শক্ত করে রোদ্রের হাতটা চেপে ধরে বলল।

শশীর সঙ্গে সমুদ্রের বিয়ে সামনের সপ্তাহে।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here